হিপনোটাইজ #তাজনিন_তায়্যিবা পর্বঃ64

0
30

#হিপনোটাইজ
#তাজনিন_তায়্যিবা
পর্বঃ64

(এতোদিন গল্প না দেওয়ার কারনে পেজের রিচ কমে গিয়েছে।সবাই একটি করে কমেন্ট করলে উপকৃত
হবো🙏)

অন্ধকার ঘর।তবে খুব বেশি নয়।দিনের আলো জানালার ফাঁক গলে হুটোপুটি খাচ্ছে অন্ধকারে।তেমন একটা আলোকিত করতে না পারলেও,খুব বেশি অন্ধকারও নেই।চেয়ারে হাত পা বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছে নিস্পাপকে।সেই আগের মতো অনুভূতি,তার নিভু নিভু ঝাপসা চোখের পাতায় ভেসে উঠছে সেই বিভৎষ স্মৃতি। যখন একই রকম ভাবে ফ্লোরেন্সাকে বেঁধে রাখা হয়েছিল,অন্ধকারে আঁটকে রাখা হয়েছিলো দিনের পর দিন।

ভয়ে নিস্পার হাত পা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে।পুরনো স্মৃতি গুলো বড্ড পীড়া দিচ্ছে তাকে,সে কি করবে বুঝতে পারছে না,কাঁপছে কণ্ঠনালী, তিরতির করে ঘামছে পুরো শরীর,সে ডাকলো,মৃদু সুর তুললো কন্ঠে,আয়মানকে উদ্দেশ্য করে বললো,

“আপ,,,আপনি কি করতে চাইছেন আয়মান?”

আয়মানের হাতে এসিডের শিশি,নিস্পার ঠিক সামনে বসে আছে সে। চোখ দু’টি অদ্ভুত শান্ত, অথচ সেই শান্তির আড়ালে জমে আছে ঝড়ের উত্তাপ।নিস্পার প্রশ্নের জবাবে সে শান্ত কন্ঠে আওড়াল,

““যে রূপ মানুষকে পাগল করে দেয়, তাকে বাঁচিয়ে রেখে কি লাভ?”

নিস্পা আঁতকে উঠলো, আতংকের তরল গলা বেয়ে নেমে এলো তার,সে কাঁপা কন্ঠে বললো,

“আমি সুন্দর এটা আমার দোষ?”

“তুমি সুন্দর এটার দায়ভার তো তোমাকেই নিতে হবে।”

আয়মানের প্রতিটি শব্দ গা হীম করে দিচ্ছে নিস্পার,সে নিজেকে কিভাবে বাঁচাবে ভেবে পেলো না,তার সামনের সব পথ বন্ধ।আয়মানের হাতে এসিডের বোতল,আর কিছুক্ষণের মধ্যে হয়তো তাকে ঝলসে দেওয়া হবে এই এসিড নিক্ষেপ করে।নিস্পার বুক কাঁপছে,কাঁপছে কণ্ঠনালী,

“আমাকে ছেড়ে দিন প্লিজ,এই এসিডে আমার চামড়া পুড়ে যাবে ভীষণ কষ্ট হবে আমার।”

নিস্পার অনুনয়ে অভিব্যক্তি পাল্টালো আয়মানের,তার চোখেমুখে ধরা দিলো বেদনার ছাপ,সে বুকে হাত চেপে আকুল কন্ঠে বললো,

“আমারও তো কষ্ট হয় নিস্পা,আমারও তো ভীষণ পুড়ে,বুকের ভেতর বা পাশটা ভীষণ পুড়ে আমার।তোমার রুপের আগুনে।”

কথাটা বলেই এসিডের শিশিটা খোলার জন্য উদ্যত হয় আয়মান।নিস্পা ঘাবড়ায়,কন্ঠে শক্তি সঞ্চার করে আতংকিত কন্ঠে চেচিয়ে উঠে,

“এটা কিন্তু অপরাধ,আপনি এটা করতে পারেন না।”

বিনিময়ে শ্লেষ হাসলো আয়মান,বিকৃত কন্ঠে বললো,

“তোমাকে ভালোবাসার মতো অপরাধ করতে পারলে এটাও করতে পারবো।যা আমার না তা কারো না।”

নিস্পার চোখের পানি ঝড়ছে মুক্ত দানার মতো।আয়মানের এরুপ ভয়ংকর রুপের দ্বিতীয় সাক্ষাৎ পেয়ে সে বুঝে গিয়েছে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হবে।আবারও মরতে হবে,এখান থেকে বেঁচে ফিরলেও তাকে মরতেই হবে।ইতিহাস একই ঘটনা আবার ঘটাচ্ছে একইভাবে,একই নিয়মে।

নিস্পা ডুকরে উঠলো,আয়মানকে ধিক্কার জানিয়ে বললো,

“আপনি শোধরালেন না,আগের জন্মেও একটা মেয়েকে হাত পা বেঁধে রেখে তার ভালোবাসা পেতে চেয়েছেন,আর এজন্মেও।আপনি একটা কাপুরষ।একটা পুরুষ হয়ে নিজের প্রতিপক্ষ একজন নারীকে বেঁধে রেখে লড়াইয়ে নেমেছেন।সাহস থাকলে আমার হাত পা খুলে দিয়ে লড়াই করুন।”

নিস্পার এমন অপমানজনক কথায় ভীষণ অপমানিত হলো আয়মান।ভেতর ভেতর ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠলো রাগে,ক্রোধিত কন্ঠে বললো,

“তুমি নিজেকে কি মনে করো নিস্পা?তোমার হাত বাঁধা না বাঁধায় কিচ্ছু যায় আসে না আমার।”

“তবে খুলে দিন,দেখি আপনার বুকে কত দম!”

গলায় দ্বিগুণ জোর দিয়ে কথাটা বলতেই এগিয়ে এলো আয়মান।প্রচন্ড ক্ষিপ্রতার সাথে নিস্পার হাতের বাঁধন খুলতে খুলতে বললো,

“তুমি আমাকে রাগালে নিস্পা।এবার কিন্তু আরও বাজেভাবে তড়পাবো তোমায়।”

নিস্পা মুক্ত হতেই সুযোগ লুপে নিলো,আয়মানের মনযোগ পাওয়ার আগেই শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে ধাক্কা দিলো আয়মানকে,উন্মাদের মতো দৌড়াতে দৌড়াতে স্বগোতক্তিতে বললো,

“ত্রিজয় না আসা পর্যন্ত আমি আমার কোন ক্ষতি হতে দেবো না।”

আয়মান ভড়কালো, নিস্পার কাছ থেকে এমন কিছু আশা করে নি সে।নিস্পা যেন নাগালের বাইরে যেতে না পারে তারজন্য নিজেও ছুটলো পিছুপিছু,চেচিয়ে বললো,

“তোর কি মনে হয় ত্রিজয় এখানে আসতে পারবে?”

নিস্পা দৌড়াতে দৌড়াতে প্রবল আত্মবিশ্বাসী কন্ঠে বললো,

“উনি আসবে।”

আয়মান থমকালো,নিস্পার গলার জোর আর আত্মবিশ্বাস থমকাতে বাধ্য করলো তাকে।কিছুক্ষণ থমকে থেকে পায়ের গতি বাড়ালো আয়মান,ঘূর্ণিঝড়ের মতো নিস্পাকে ধাওয়া করে আওড়াল,

“তার মানে তো আসবেই।তার আগে তোর মাথা নষ্ট রুপ নষ্ট করে দিতে হবে আমার।”

__________

গতকাল রাতে মারা গিয়েছে মালেকা বেগম।দীর্ঘদিন ধরে মৃত্যুর অপেক্ষারত পথিক অবশেষে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করেছে।ডক্টর কিয়ান নিজ হাতে সেরেছে সেই শুভ কাজ।যেই মালেকাকে বছরের পর বছর বাঁচিয়ে রেখেছিলো তার রুপাঞ্জেলের হাতে মারার জন্য, সেই মালেকাকে সামান্য একটা ইঞ্জেকশন দিয়েই নিজের হাতে মেরে ফেলেছে সে।যুগের পর যুগ জন্মের পর জন্মান্তর যেই আশা বুকে পুষে রেখেছিলো সেই আশায় হটাৎ চিড় ধরার কারণ তার নিজেরও জানা নেই।বা হয়তো হিসেব মিলাতে পারছে না।

মালেকার দাফন কাজ শেষ করে মাত্রই বাসায় ফিরলো কিয়ান।অনুর উদ্বিগ্ন নয়ন জোড়া কেন যানি কিয়ানের ফেরার অপেক্ষাতেই ছটপট করছিলো এতোক্ষণ।কিয়ানের গাড়ির শব্দ পেয়ে জানালা দিয়ে উঁকি মেরেছে এক পলক।

কিয়ান বাড়িতে ঢুকে সোজা নিজের ঘরে ঢুকে গিয়েছে।দরজা লাগানোর দাপটিয় শব্দ স্পষ্ট শুনতে পেয়েছে অনু।লোকটার জন্য খুব মায়া হলো অনুর।শুনেছে বাবা মা নেই।এই বৃদ্ধা দাদি ছাড়া আপন বলে কেউ ছিলো না উনার,আজ সেই দাদিও মারা গিয়ে একা করে দিয়ে গেল উনাকে।কথাটা ভাবতেই বেশ শোকাহত হলো অনু।একটু সহানুভূতি জানানোর উদ্দেশ্যে ধিরে ধিরে এগিয়ে গেলো কিয়ানের ঘরের দিকে।

অনু পা টিপে কিয়ানের ঘরে ঢুকতেই দেখতে পেলো কিয়ান হুইস্কির বোতলে চুমুক দিচ্ছে একের পর এক।
লোকটাকে আজ বেশ অগোছালো লাগলো,লাগাটাই স্বাভাবিক।অনু তপ্ত শ্বাস ফেলে এগিয়ে এসে দাড়ালো কিয়ানের পেছনে,বিরস কন্ঠে বললো,

“আপনার দাদির মৃত্যুতে আপনি নিশ্চয়ই খুব কষ্ট আছেন।”

অনুর কন্ঠ কানে আসতেই ভ্রু গোটালো কিয়ান।তড়িৎ পেছনে ঘুরে তাকিয়ে দেখতে পেলো অনুর নাজুক বদন।চিবুক নামিয়ে ঠোঁট দিয়ে ঠোঁট টিপে দাঁড়িয়ে আছে অনু।কিয়ান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো অনুর দিকে,অবিচল কন্ঠে বললো,

“কষ্ট নামের থার্ডক্লাস জিনিস আমার ভেতর নেই।”

কিয়ানের এমন উত্তরে অপ্রস্তুত হলো অনু,কিঞ্চিৎ ভড়কালোও বটে,বিহ্বলিত কন্ঠে বললো,

“তাহলে কি?খুশি হয়েছেন!”

কিয়ান গলার স্বর স্বাভাবিক রেখে ভনিতা করে বললো,

“খুশি আবার কার মায়ের নাম?”

কিয়ানের ঠান্ডা কন্ঠের অপমান গুলো ঠিকই ধরতে পেরেছে অনু।সেধে সহানুভূতি জানাতে এসে চরম আক্কেল হয়েছে অনুর,এই লোক এসবের যোগ্যই নয়।কথাটা ভেবেই রাগে নাক ফোলালো অনু,চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,

“নিজেকে সত্যিই থার্ডক্লাস মনে হচ্ছে,নয়তো কি আপনার মতো একজনকে সহানুভূতি দেখাতে আসতাম।”

“ইট’স ওকে।দেরিতে হলেও বুঝেছ।”

কিয়ানের প্রত্যেকটি উত্তর ঠান্ডা মাথায় অপমানের তীর ছুড়ে দেওয়ার মতো,যা সরাসরি বিদ্ধ করছে অনুর শান্ত মেজাজ।বিগড়ে দিতে চাইছে বারকে বার।অনু নিজের বিগড়ে যাওয়া মাথাটা নিয়ন্ত্রণে রেখে দাঁতে দাঁত পিষে বললো,

“আমি আরেকটা কথা বলতে এসেছি।”

“কবরে যেতে চাও নাকি নিজের বাসায়?শর্টকাটে বল।”

কিয়ানের নিটোল কন্ঠ থেকে ধেয়ে আসা এবারকার কথায় চরম ক্ষেপে উঠলো অনু,তিরিক্ষি কন্ঠে বলতে চাইলো,

“আপ,,,,”

“উফসস ওয়ান মিস্টেক হয়ে গেলো,তোমার তো যাওয়ার মতো বাসা নেই,তাহলে নিশ্চয়ই কবরেই যেতে হবে।”

অনুকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে নিজে নিজেই বলে উঠলো কিয়ান।অনুর শান্ত মস্তিষ্ক ইতিমধ্যে ঘেটে গেছে,খুব কষ্ট করে দমিয়ে রেখেছে তার কাকের মতো কর্কষ কন্ঠটা।তবে কিছু একটা না বলা অব্দি শান্ত হতে পারছে না সে,তাই মনের ভেতর প্রচন্ড আক্রোশ চেপে রেখে দমিত কন্ঠে বললো,

“পাঠিয়ে দিন কবরে,ভালোই হবে, এই মিছে পৃথিবীর মায়ায় নিজের মনটাকে পচেগলে নিঃশেষ হতে দিতে চাই না।”

কিয়ান শ্লেষ হাসলো, বিদ্রুপ করে বললো,

“অপূর্ণ বাসনা নিয়ে মরলে আবার জন্মানোর চান্স আছে।”

অনু কাঠকাঠ কন্ঠে প্রত্যুত্তর করলো দ্রুত,

“কোন চান্স নেই,আর নাতো কোন বাসনা আছে।আমি জাস্ট মরে যেতে চাই।কাউকে পাওয়ার বাসনা আমার ভেতর অবশিষ্ট নেই।”

কিয়ান আচমকা হুইস্কির বোতলটা ছুড়ে মারলো দেয়ালে।কাচের বোতল ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হলো কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই।ঘটনার আকস্মিকতায় ভড়কালো অনু,ঘাবড়ে তাকালো কিয়ানের দিকে।

কিয়ানের চোখ দুটো ভয়ংকর রকমের লাল।সে উল্কার গতিতে চেপে ধরলো অনুর চিকন কোমর,গমগমে কন্ঠে বললো,

“আমাকেও না?”

অনু হকচকালো,দিশেহারা হলো কিয়ানের আগ্নি চোখের অনলে,অস্ফুটে আওড়াল,

“মানে!”

দৃষ্টিতে নমনীয়তা আনার চেষ্টা চালালো কিয়ান কিন্তু হলো না।কন্ঠে প্রেম ফোটাতেও ব্যার্থ হলো অচিরে,রাশভারি কন্ঠে বললো,

“হাসবেন্ড হিসেবে মানবে আমাকে?”

অনু বিব্রত, কিয়ানের শ্বাসরুদ্ধকর প্রশ্নে সত্যি সত্যিই শ্বাস রোধ হয়ে এলো তার,কি বলবে বুঝতে না পেরে থতমত খেয়ে আওড়াল,

“আমি কোথাকার কোন থার্ডক্লাস মেয়ে।”

কিয়ান ঝুঁকলো অনুর মুখের উপর, নিজের ঠোঁট অনুর ঠোঁটের অনেকটা কাছে এগিয়ে নিয়ে আওড়াল,

“আমার একটা থার্ডক্লাস পার্টনার চাই যে কথায় কথায় মনে করাবে ডক্টর কিয়ান ফার্স্টক্লাস জেন্টালম্যান।”

কিয়ানের কথা হজম হলো না অনুর,দম বন্ধ করে তাকিয়েই রইলো কিয়ানের দিকে।অস্পষ্ট বললো,

“মজা করছেন?”

কিয়ান চট করেই ছেড়ে দিলো অনুর কোমর,অনুকে এক প্রকার ধাক্কা দিয়েই দূরে সরে দাড়ালো সে,কটাক্ষ করে বললো,

“ওসব থার্ডক্লাস জিনিস করতে জানিনা আমি।”

কথায় কথায় থার্ডক্লাস শুনতে শুনতে কান পচে যাওয়ার উপক্রম অনুর,সিরিয়াস কথায় কি এসব না বললেই নয়?চরম রাগ হলো অনুর,কড়া কন্ঠে বললো,

“থার্ডক্লাস কথাটা বাদ দিয়ে কথা বলতে পারবেন?”

কিয়ান কেয়ারলেস ভঙিতে তুলে নিলো আরেকটা হুইস্কির বোতল,গম্ভীর কন্ঠে বললো,

“আমার স্ত্রী হতে পারবে?”

অনু উত্তর দিলো না,কিয়ানের প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে বললো,

“আমি আগে প্রশ্ন করেছি।”

কিয়ান কম যায় না,সে এগিয়ে এসে খপ করে চেপে ধরলো অনুর হাত,হেচকা টানে অনুকে নিয়ে এলো নিজের খুব কাছে, কথার মারপ্যাঁচে আঁটক করলো কৌশলে,জবানবন্দি নিতে বললো,

“কিন্তু উত্তর তো আমার প্রশ্নের সাথে সংযুক্ত।”

কিয়ানের এমন হুটহাট কাছে আসা একদম পছন্দ হলো না অনুর,দম বন্ধকর অনুভূতিতে শুখিয়ে এলো গলা,দিশেহারা কন্ঠে বললো,

“আপনি প্লিজ দূরে সরুন।আমার অস্বস্তি লাগছে।”

“বউয়ের সাথে অস্বস্তিমূলক কাজ করা জায়েজ।”

কিয়ানের সোজাসাপ্টা উত্তরে প্রতিবারের মতো এবারেও চমকালো অনু,অবাক কন্ঠে বললো,

“আপনি আমাকে বউ মানছেন?”

“তুমি আমাকে স্বামী মানছো?”

অনু কিয়ানের মুঠো থেকে নিজের হাত ছাড়ানোর জন্য মোচড়াতে মোচড়াতে বললো,

“ভীষণ কষ্ট হবে।”

কিয়ান ছাড়লো না, বরং আরেক হাত দিয়ে চেপে ধরলো অনুর ঘরের অংশ,উদাসীন কন্ঠে বললো,

“কষ্টে অর্জিত জিনিস বরাবরই মিষ্টি হয়।”

“মিষ্টি আমার অপছন্দ।”

“তেতোও পছন্দ নয়।”

“তাতে আপনার কি?”

“আমি তেতো লাইক করি না তবে সুস্বাস্থ্যের জন্য খাই।”

কিয়ানের এমন আজগুবি কথাবার্তা মাথার উপর দিয়ে গেলো অনুর,সে চোখ উল্টে বললো,

“আপনার কথা বুঝতে পারছি না আমি।”

কিয়ান ভারি কন্ঠে বললো কয়েকটা ভারি ভারি শব্দ,

“মানুষ যেটা অপছন্দ করে সেটা তাদের জন্য উপকার বয়ে আনে।”

অনু হাত দিয়ে ধাক্কা দিলো কিয়ানের বুকে,তপ্ত কন্ঠে বললো,

“মদ খেয়ে মাতাল হয়ে যা-তা বলছেন আপনি।”

অনুর একটা কথাও গায়ে মাখলো না কিয়ান,ডোন্ট কেয়ার ভাব দেখিয়ে এড়িয়ে গেলো সব।ভরাট কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

“করলা পছন্দ কর?”

কিয়ানের এমন আবোলতাবোল কথায় চোখ উল্টে তাকালো অনু,ভ্রুকুটি তুলে আওড়াল,

“কেন?”

“বল।”

“না।আমি খেতে পারিনা।”

“কিন্তু করলা রক্ত বিশুদ্ধ করে।তোমার শরীরের জন্য উপকার।”

“যানি আমি।মাঝে মাঝে খেতে হয়।”

“এই যে পছন্দ না জিনিস টাও ইচ্ছের বিরুদ্ধে কেন খাও বলতো?”

“কারণ এটায় উপকার।”

“দেট’স মিনস তোমার অপছন্দের মানুষ টাও তোমার উপকারে আসতে পারে।”

কথাটা বলেই অনুকে ছেড়ে দিলো কিয়ান।অনু হাঁপ ছেড়ে বাঁচলো,ঘনঘন নিঃশ্বাস টেনে তিরিক্ষি কন্ঠে বললো,

“এতো প্যাচালো উদাহরণ দিয়ে নিজেকে ফার্স্টক্লাস প্রমাণ করতে চাইছেন?নাকি আমাকে থার্ডক্লাস প্রমাণ করতে চাইছেন?”

কিয়ান নির্লিপ্তে ঢকঢক করে শেষ করলো পুরো হুইস্কির বোতল,নেশাময় কন্ঠে বললো,

“বউ প্রমান করতে চাইছি।আমি আমার লাইফের সবচেয়ে অপছন্দ করা মেয়েটাকে নিজের জীবনের জন্য কবুল করে নিলাম।
এবার তুমিও তোমার লাইফের সবচেয়ে বেশি অপছন্দ করা পুরুষকে কবুল করে নেও।”

অনু জ্বিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজালো,এক অজানা অনুভুতির দংশনে ভেতরটা ভীষণ রকম নাজেহাল তার।সে কি করবে বুঝতে পারলো না।কলের পুতুলের ন্যায় উত্তরে ঠোঁট নাড়ালো কেবল,

“আজগুবি লাগছে।”

কিয়ান ধেয়ে এসে মুঠো বন্দী করলো অনুর হাত।অনু কিছু বুঝে উঠার আগেই তাকে টানতে টানতে নিয়ে গেলো ঘরের বাইরে।তারপর অনুর মুখের উপর দরজা আঁটকে দিতে দিতে বললো,

” আজ বরং এটুকুই থাক।”

_______

দুই জোড়া ঈগল চোখের সমস্ত মনযোগ একটা চলমান সিসিটিভি ফুটেজের দিকে।যেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে একটা লোক নিস্পার মুখে রুমাল চেপে কালো গাড়িতে তুলে নিয়েছে।গাড়িটা হাইওয়ে ধরে এগিয়েছে,বেশ কয়েকটা ফুটেজে স্পষ্ট যেতে দেখা যাচ্ছে সেই গাড়িটা।ত্রিজয় স্থির হয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ভিডিও টা দেখলেও,তাকরিম স্থির হতে পারলো না কিছুতেই।সে অস্থির ভঙিতে উত্তেজিত কন্ঠে বললো,

” হাইওয়ের কালো গাড়িটা দিয়েই আমার আলেকজান্দ্রাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।দ্রুত একশন নিন অফিসার।”

থানার এএসপি এর সামনে দাঁড়িয়ে আছে ত্রিজয় আর তাকরিম।ত্রিজয় বরাবরই স্থিতিশীল, শান্ত প্রকৃতির।খুব বড় কোন বিষয় নিয়েও উত্তেজিত হয় না সে,বরং বিচক্ষণতার সাথে হ্যান্ডেল করে সমস্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতি। তাই তাকরিমের এমন ওভার রিয়েক্ট মোটেও সহ্য হলো না ত্রিজয়ের, বিদ্রুপ করে বললো,

“কথায় কথায় আমার বলা বন্ধ করুন এমপি মশাই গায়ে ফোস্কা পরে।দু’দুবার নো প্রটেকশনে বাসর শেষ,মামা হওয়ার প্রস্তুতি নিন।”

এমন একটা পরিস্থিতিতে ত্রিজয়ের এমন লাগামহীন কথায় ক্ষেপে গেলো তাকরিম,ক্ষিপ্রতায় সোজা গলা চেপে ধরলো ত্রিজয়ের,আগ্নেয়গিরি কন্ঠে বললো,

“মুখ সামলে কথা বল জানোয়ারের বাচ্চা।”

ত্রিজয়ের অভিব্যক্তি এবারেও শান্ত।অথচ তাকানোর ধরন ভয়ংকর।সে তাকরিমের হাতের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা কন্ঠে বললো,

“আপনি আপনার হাত সামলান,আমার মুখ নিয়ে ভাবতে হবে না।”

তাকরিম ত্রিজয়ের গলা চেপে রেখেই এক নজর তাকালো পুলিশ অফিসারের চোখের দিকে,অফিসার ছাড়ার মিনতি জানালো ইশারায়।তাকরিম ভেতরকার ক্রোধ সামলিয়ে ছেড়ে দিলো ত্রিজয়ের গলা,তাচ্ছিল্য করে বললো,

“নিস্পাকে আদৌও একফোঁটা ভালোবাসিস তো তুই?ওর কিডন্যাপিং নিয়ে তো দেখছি টেনশনের ছিটেফোঁটাও নেই তোর মধ্যে।”

ত্রিজয় শ্লেষ হেসে বললো,

“টেনশন তো মাথায় থাকার জিনিস এমপি মশাই।আমার নীল রক্তের মেয়ে তো আমার হৃদয়ে।সেখানকার রক্তক্ষরণ যদি দেখতেন তবে আপনি নিজেই নিস্পাকে তুলে দিতেন আমার হাতে।”

তাকরিম বিদ্রুপ কিরে বললো,

“ভালোবাসার মানুষের বিপদে অস্থির না হলে সেটা কীসের ভালোবাসা?”

“আমি আপনার মতো অস্থির হই না।আর তাই আমি ভালোবাসা জয় করে নিয়েছি এমপি মশাই।”

“তাহলে বাজি ধরা যাক। দেখি কে আগে উদ্দ্বার করতে পারে নিস্পাকে। কার ভালোবাসার দম কতদূর।”

ত্রিজয় এগিয়ে এসে দু’হাতে জড়িয়ে ধরলো তাকরিমকে,গলায় গলা লাগিয়ে রাশভারি কন্ঠে আওড়াল,

“চ্যালেঞ্জ একসেপ্ট।”

চলবে,,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here