ফালাক #লেখিকা_ইনায়া_জারিশ #পর্ব___________২১

0
22

#ফালাক #লেখিকা_ইনায়া_জারিশ
#পর্ব___________২১

সাদ আরিয়ান কে মেরে চলে যায়।।।

“তাড়াতাড়ি গাড়ি বের কর! রক্ত পড়ছে অনেক!” সাদের মেঝো চাচার চিৎকারে সবার সম্বিত ফিরল।
ফারদিন আর আয়ান মিলে আরিয়ানকে গাড়িতে তুলল। আরিয়ানের জ্ঞান হারানো অবস্থা, শার্টটা রক্তে ভিজে সপসপে। দ্রুত তাকে শহরের নামী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো।
বাড়ির ড্রয়িংরুমে তখন এক গুমোট স্তব্ধতা। ফালাক এক কোণে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে কাঁপছে। ছোট চাচি আর মেজো চাচি নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করছেন। সাদের বাবা রাগে কাঁপতে কাঁপতে সোফায় ধপ করে বসে পড়লেন।

মেজো চাচি:

“আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না! আরিয়ান ছেলেটা কত ভদ্র, ও কী এমন করতে পারে যে সাদ ওকে মারবে?

সাদের বাবা: “সাদের এই জানোয়ারের মতো আচরণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। ও কি মনে করে ও এই বাড়ির মালিক? আরিয়ান আমাদের মেহমান ছিল। এই খবর ওর ফ্যামিলি জানলে আমরা মুখ দেখাব কী করে?”

সবাই একে অপরকে প্রশ্ন করছে, কিন্তু আসল উত্তরটা কারো কাছে নেই। সাদের রাগের কারণটা সবার কাছে এক কুয়াশাচ্ছন্ন রহস্য। কেউই জানে না কাল বিকেলে পেয়ারা বাগানে কী হয়েছিল, আর সাদ ওপর থেকে কী দেখেছে।

হাসপাতাল থেকে খবর এসেছে আরিয়ানের নাকে আর পাঁজরে চোট লেগেছে, তবে ও বিপদমুক্ত। এই খবরের পর বাড়ির সবাই যখন যে যার রুমে ফিরে গেছে, তখন সাদের গাড়ি মির্জা বাড়ির গেটে এসে থামল।
সাদ একদম শান্ত। সোজা সিঁড়ি বেয়ে নিজের রুমে ঢুকে গেল।
ফালাক তখনো জেগে ছিল। সাদকে দেখেই ভয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সাদ কোনো দিকে না তাকিয়ে আলমারি থেকে একটা টি – শার্ট বের করল।

“আপনি ওনাকে ওভাবে মারলেন কেন? বাড়ির সবাই আপনাকে এখন অপরাধী ভাবছে।”

সাদ ফালাকের দিকে একবার শীতল চোখে তাকায়। তারপর খুব কাছে এসে নিচু কিন্তু রুক্ষ স্বরে বলল—

“কে কী ভাবল তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমার সামনে থেকে যা এখন। বেশি কথা বললে তোর জন্য ভালো হবে না।”

সাদ তোয়ালে নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল।
_________

আরিয়ানের ওই ঘটনার পর থেকে সাদ বাড়িটাকে শুধু একটা হোটেল বানিয়ে ফেলেছে। সকালে যখন সবাই জেগে ওঠে, সাদ তখন ঘুমায়। আর দুপুরে যখন বাড়ি সরগরম থাকে, তখন ও নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। ফালাকের সাথে ওর কথা তো দূর, চোখের দেখাও ঠিকমতো হয় না।

কয়েকদিন এভাবেই চলল। সাদ মাঝরাতে ফেরে, ফালাকের পাশে এসে নিঃশব্দে শুয়ে পড়ে। ফালাক জেগে থাকলেও সাদের সেই পাথরের মতো শীতল পিঠের দিকে তাকিয়ে কথা বলার সাহস পায় না। সাদের রুক্ষতা এখন এক বিষাক্ত গুমোট স্তব্ধতায় রূপ নিয়েছে।
সেদিনও সাদ বের হয়েছিল বিকেলের দিকে। রাত তখন প্রায় ১০টা। সাদ যখন মির্জা মঞ্জিলের সদর দরজায় এসে পৌঁছাল, দেখল পুরো বাড়ি আলোয় ঝলমল করছে। বাইরে কয়েকটা দামী গাড়ি দাঁড়ানো। গেটে ফুলের সাজ।
সাদ ভ্রু কুঁচকে ভেতরে ঢুকল। বাড়ির ভেতর থেকে হাসাহাসি আর মেহমানদের গুঞ্জন ভেসে আসছে। সাদ ড্রয়িংরুমের দরজায় আসতেই ওর পা দুটো যেন মাটিতে গেঁথে গেল।
ভেতরে আরিয়ান আর ফালাক পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।… ফালাককে দেখে সাদের মনে হলো ওর হৃৎপিণ্ডটা কেউ ছিঁড়ে নিচ্ছে। ফালাক সেজেছে।ওকে অবিকল এক নতুন কনের মতো দেখাচ্ছে। আরিয়ানের সাথে ওর এই উপস্থিতি যেন এক নিখুঁত ‘বর-বউ’ এর ফ্রেম।
সাদের বাবা আর ছোট চাচা পাশে দাঁড়িয়ে তৃপ্তির হাসি হাসছেন।
সাদের চোখের সামনে পৃথিবীটা দুলতে শুরু করল। ওর মনে হলো, বাড়ির সবাই মিলে ওর অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে আরিয়ান আর ফালাকের এনগেজমেন্ট সেরে ফেলছে। আরিয়ান তো ফালাককে পছন্দ করেই, আর এখন বাড়ির বড়রাও বোধহয় সাদের মতো ‘পাগল’ এর হাত থেকে ফালাককে বাঁচাতে এই বিয়ের আয়োজন করে ফেলেছে।

“সবাই মিলে আমাকে শেষ করে দিল? আমার চোখের সামনে আমার ফালাককে অন্য কারও করে দিচ্ছে? তাও ওই আরিয়ানের?”

সাদের মাথায় রক্ত উঠে গেল। ওর ইচ্ছা করল ভেতরে গিয়ে সবকিছু তছনছ করে দিতে, আরিয়ানকে খুন করতে। কিন্তু হঠাত এক তীব্র অভিমান আর ঘৃণা ওকে গ্রাস করল। ভাবল—ফালাক এর মতো মেয়ের কে নিয়ে ওর ভাবাই ভুল হয়েছে।

সাদ আর চিৎকার করে বাড়ি মাথায় তুলল না, আরিয়ানকে আক্রমণ করতে গেল না। কারণ মনে হলো, ফালাক নিজেই তো এখন আরিয়ানের পাশে স্বেচ্ছায় দাঁড়িয়ে আছে।

​”Everything is gone. My pride, my girl, my sanity. I am nothing to her… just a monster she finally escaped from.” ( “সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। আমার অহংকার, আমার মানুষ, আমার মানসিক শান্তি—সব। ওর কাছে আমি কিছুই না… শুধু একটা দানব, যার থেকে শেষ পর্যন্ত মুক্তি পেয়েছে।”)

সাদ আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না। নিজেকে সামলাতে না পেরে পেছন ফিরে বাইরে বেরিয়ে এল। গাড়ির টায়ার রাস্তার ওপর ঘর্ষণ খেয়ে এক বিকট শব্দ করল।

সাদ জানল না যে ভেতরে আসলে কী হচ্ছে। শুধু দেখল তার সর্বস্ব কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।
সাদ পাগলের মতো গাড়ি চালিয়ে শহরের বাইরে নির্জন হাইওয়ের দিকে ছুটতে লাগল। চোখে এখন শুধু ফালাকের সাজের মুখটা ভাসছে।

আসলে ওটা ছিল ছোট চাচা-চাচির বিবাহ বার্ষিকীর রি-ম্যারেজ থিম পার্টি। যেখানে ফালাক সহ সবাই গর্জিয়াস ভাবে সেজেছে।কিন্তু সাদের অন্ধ রাগ আর ভুল বোঝাবুঝি ওকে এক ভয়ংকর অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
________
পাগলের মতো গাড়ি চালিয়ে হাইওয়ের দিকে ছুটতে ছুটতে সাদ চিৎকার করে উঠে

“Fuck! I’m losing her! I’ve lost everything!”

সাদের মাথা কাজ করছে না। চোখের সামনে ফালাককে অন্য কারও পাশে কনের সাজে দেখার দৃশ্যটা সাদের ভেতরের সবটুকু ধৈর্য পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে। গাড়িটা হাইওয়ের এক নির্জন ধারে এসে থামল।
একের পর এক বোতল সাবাড় করতে লাগল। প্রতি চুমুকে ওর মনে হচ্ছে ফালাকের ওই হাসিমাখা মুখটা পুড়ছে।

“সব শেষ… ফালাকও হাতছাড়া হয়ে গেল। আমাকে পাগল বানিয়ে ও এখন ওই আরিয়ানের গলায় মালা দিবি? আমি কি এতটাই খারাপ?”

রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে সাদের চেতনার সবটুকু আলো নিভে গেল। টালমাটাল পায়ে দোকান থেকে বেরিয়ে রাস্তার ধারে এসে দাঁড়ায়। অন্ধকার হাইওয়ে, হু হু করে বাতাস বইছে। সাদ আর হাঁটতে পারল না; রাস্তার ধারের ধপ করে পড়ে গেল। জ্ঞান হারানোর আগে ও শেষ মনে হলো— বুকটা ফেটে যাচ্ছে।

ভোরবেলা যখন কুয়াশাচ্ছন্ন রাস্তায় কিছু পথচারী আর ট্রাক ড্রাইভার যাচ্ছিল, তখন তারা দেখল একটা দামী গাড়ির পাশে এক যুবক রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে আছে। লোকটা যে সম্ভ্রান্ত ঘরের, তা ওর বেশভূষা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল।

“আরে, এ তো মার্ডার কেস হতে পারে! পুলিশ ডাকব?”
“না না, আগে হাসপাতালে নাও। শ্বাস চলছে এখনো।”
কয়েকজন মিলে ধরাধরি করে সাদকে স্থানীয় একটা সরকারি হাসপাতালের ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডে ভর্তি করাল। ফালাক গত রাত থেকে কয়েকশ বার ফোন করেছে, কিন্তু সাদ এখন সাদা চাদরের নিচে এক অঘোর ঘুমে আচ্ছন্ন। ওর শরীরে স্যালাইন চলছে।

সাদ বাড়ি আসে নি।সবাই ভেবেছিল সাদ হয়তো রাগে কোথাও গেছে, ফিরে আসবে। কিন্তু যখন দুপুর গড়িয়ে গেল, তখন সবার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল।
ফারদিনের ফোনে হঠাৎ একটা অপরিচিত নম্বর থেকে কল এল।
ফারদিন: “হ্যালো? কে বলছেন?”
ওপাশ থেকে: সাদ মির্জার বাড়ির লোক? উনি হাইওয়ের পাশে অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিলেন। আমরা ওনাকে সিটি হাসপাতালে ভর্তি করেছি। তাড়াতাড়ি আসুন।”
ফারদিনের হাত থেকে ফোনটা পড়ে গেল।

ফালাক: “কী হয়েছে?
ফারদিন কাঁপা গলায় বলল—
“ভাইয়া… ভাইয়া হাসপাতালে। রাস্তায় পড়ে ছিল।”

ফালাক আর কারো কথা শুনল না। ওভাবেই দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে গেল।

হাসপাতালের করিডোর দিয়ে দৌড়ানোর সময় ফালাকের পায়ের স্যান্ডেলটা খুলে গেছে, কিন্তু সেদিকে খেয়াল নেই। শুধু খুঁজছে সেই মানুষটাকে,
ফারদিন যখন ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডের সামনে এসে থামল, ফালাক সেখানেই থমকে দাঁড়ায়। ভেতর থেকে দেখা যাচ্ছে—সাদ একটা সাদা বিছানায় নিথর হয়ে পড়ে আছে। ওর হাতে স্যালাইনের পাইপ, নাকে অক্সিজেন মাস্ক। সাদের উদ্ধত আর রুক্ষ চেহারাটা আজ বড় বেশি অসহায় দেখাচ্ছে।
ফালাক দরজার হাতলটা ধরল, কিন্তু ফালাকের হাত কাঁপছে। আর ভেতরে ঢোকার সাহস পাচ্ছে না।
ফালাকের বুক ফেটে কান্না আসছে। দরজার পাশেই মেঝেতে ধপ করে বসে পড়ল।

“ভাবি, নিজেকে সামলান। ডাক্তার বলেছেন ভাইয়ার স্টমাক ওয়াশ করা হয়েছে। অত্যাধিক মদ্যপানে এমন হয়েছে, তবে এখন আশঙ্কামুক্ত।

ফালাক ডুকরে কেঁদে উঠল।
ঠিক তখনই ভেতর থেকে নার্স বেরিয়ে এল।

নার্স: “পেশেন্টের জ্ঞান ফিরেছে। উনি খুব ছটফট করছেন আর কারো নাম ধরে ডাকছেন। আপনারা কেউ একজন ভেতরে যেতে পারেন।”
ফালাক তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়াল। চোখের জল মুছে পা বাড়াল কেবিনের দিকে। দরজায় দাঁড়াতেই দেখল সাদের চোখ দুটো অর্ধেক খোলা। সাদ ঘোরের মধ্যে বিড়বিড় করছে—

“ফালাক… তুই কেন করলি এমন? তুইও কি আমার হাত ছেড়ে দিলি? আরিয়ান… আমি ওকে ছাড়ব না…”

সাদের গলায় প্রচণ্ড যন্ত্রণা। ফালাক আর নিজেকে স্থির রাখতে পারল না। ও দৌড়ে গিয়ে সাদের বুকে এর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।।।

চলবে–
( আমার শরীর টা ভালো না তাই গল্প দিতে পারি নি। )

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here