#ফালাক #লেখিকা_ইনায়া_জারিশ
#পর্ব____________৩৮
সাদের শরীরের প্রতিটি কোষ যেন ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছে। গায়ের ওপর দিয়ে এক তীব্র বরফশীতল স্রোত বয়ে গেল। দীর্ঘ নিঃশ্বাসগুলো এতোটাই ভারী হয়ে উঠেছিল যে, মনে হচ্ছিল দম বন্ধ হয়ে যাবে। ঠিক তখনই একটা পরিচিত সুবাস নাকে ঠেকে।
সাদ ধড়ফড় করে উঠে বসল। কপাল বেয়ে অঝোরে ঘাম ঝরছে । চোখ মেলে প্রথমেই দেখে ফালাকের —শিয়রে হেলান দিয়ে আছে সাদ। আর গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে ফালাক।
সাদ কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে ফালাকের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ফালাকের শান্ত চেহারা, —সব ঠিক আছে! সাদ কাঁপাকাঁপা হাত বাড়িয়ে ফালাকের নাকে নিঃশাস পড়ছে কিনা দেখলো ।
“স্বাভাবিক। ও জীবিত! আর সাদের পাশেই আছে!
ওই যে চিঠিটা, ডাক্তারদের ওই রক্তমাখা গ্লাভস, আর ফালাককে হারিয়ে ফেলার সেই তীব্র হাহাকার—সবই কি তবে স্বপ্ন ছিল? সাদ বুঝতে পারল, ফালাককের শিয়রে বসে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল। অবচেতন মনের আতঙ্কটাই ভয়ংকর এক দুঃস্বপ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে ।
সাদ খুব সন্তর্পণে ফালাককে বুকের কাছে টেনে নিল। ঘুমে থাকা ফালাক একটু নড়েচড়ে সাদের বুকেই মুখ লুকালো। সাদের মনে হলো, ও যেন হারানো কোনো স্বর্গ ফিরে পেয়েছে।
স্বপ্নটা এতোটাই বাস্তব ছিল যে সাদের চোখ থেকে দুফোঁটা নোনা জল গড়িয়ে ফালাকের চুলে পড়ল। ফালাকের কপালে দীর্ঘ এক চুমু খেল।
___________
সাদের মা আর চাচি চলে এসেছে আজ এই সময়ে থাকা দরকার ! সাদ জানে, মা আর চাচি আসাতে ফালাকের মানসিক শক্তি অনেক বাড়বে। ফালাকও এতোদিন পর মায়ের হাতের ছোঁয়া পেয়ে যেন নতুন প্রাণ ফিরে পেল।
দেখতে দেখতে । ফালাকের গর্ভকালীন নয় মাস পূর্ণ হলো। এই কয়েকটা মাস সাদের জন্য ছিল এক অগ্নিনগ্ন পরীক্ষা। সেই ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের পর থেকে সাদ ফালাককে এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল করেনি। সাদের মা আর ছোট চাচিও যখন ফালাকের শারীরিক জটিলতার কথা শুনলেন, শুরুতে ভেঙে পড়লেও পরে তারা নিজেদের কে সামলে ফালাকের সেবায় আত্মনিয়োগ করছে । সাদ এর দিন কাটত জায়নামাজে, আর রাত কাটত ফালাকের শিয়রে বসে অনাগত সন্তানদের আর ফালাকের আয়ু ভিক্ষা করে।
অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত। ডেলিভারির দিন নির্ধারিত হলো। হসপিটালের করিডোরে আজ যেন এক থমথমে নিস্তব্ধতা। সাদের বাবাও দুদিন আগে দেশ থেকে চলে এসেছেন। অপারেশন থিয়েটারের দরজার সামনে সাদ পায়চারি করছে, ওর কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে। অস্থিরতা দেখে মনে হচ্ছে নিজেই বুঝি জ্ঞান হারাবে। ডাক্তাররা ভেতরে যাওয়ার আগে বলে গেছেন, “আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।”
সাদের বাবা সাদের কাঁধে হাত রাখলেন, “শান্ত হ সাদ, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখ।” কিন্তু সাদ কিছু শুনছে না, ওর কান শুধু অপারেশন থিয়েটারের ভেতর থেকে কোনো আওয়াজ পাওয়ার অপেক্ষায় আছে।
সাদ এক জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারছে না। করিডোরের এক মাথা থেকে অন্য মাথা পর্যন্ত পাগলের মতো পায়চারি করছে। এখন কোনো সান্ত্বনা চায় না, কোনো যুক্তি শুনতে চায় না। শুধু চায় ওটির ওই ভারী দরজাটা খুলে কেউ একজন এসে বলুক— “ফালাক সুস্থ আছে।”
সাদ দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ল। সাদের চোখের সামনে বারবার ফালাকের মায়াবী মুখটা ভেসে উঠছে। সাদ ওটির দরজার দিকে ছুটে গেল। কাঁচের ভেতর দিয়ে দেখার চেষ্টা করল,মনে হচ্ছে, যদি নিজের প্রাণটা দিয়ে ফালাককে বাঁচিয়ে আনতে পারত, তবে ও এক সেকেন্ডও দেরি করত না।
মনে হলো ওর শরীরটা অবশ হয়ে আসছে। অস্থিরতার এমন এক চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সাদের চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এল। দেখল ওর বাবা আর মা এদিকে এগিয়ে আসছেন, সাদ করিডোরের মাঝখানে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল, মাথাটা নুয়ে পড়ল মেঝের দিকে।
সাদের কাছে এখন প্রতিটি সেকেন্ড এক একটা যুগের মতো দীর্ঘ।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর হঠাৎ নিস্তব্ধতা চিরে একটা কান্নার আওয়াজ ভেসে এল। একটু পর ওটি-র দরজা খুলে নার্স বেরিয়ে এলেন। তাঁর কোলে একটা ছোট্ট মোড়ানো মোড়ানো তুলতুলে শিশু।
“অভিনন্দন মিস্টার মির্জা! আপনার পুত্রসন্তান হয়েছে।” It’s Baby boy!
সাদ কাঁপাকাঁপা হাতে নীল রঙের তোয়ালেতে মোড়ানো বাবুটাকে কোলে নিল। নিজের রক্ত-মাংসের প্রথম স্পর্শ! অদ্ভুত এক অনুভূতিতে সাদের চোখের কোণ ভিজে উঠল। বাচ্চার নরম গাল চুমু দিলো। সাদের বাবা মা চাচি এগিয়ে দেখতে লাগলেন নাতিকে!সাদের বাবা-মা আর চাচি তখন খুশিতে আত্মহারা। তাঁরা ঘিরে ধরলেন নতুন অতিথিকে। সাদের মা চোখের জল মুছতে মুছতে নাতির কপালে হাত রাখলেন,, ঠিক তখনই নার্সের কণ্ঠস্বর ভেসে এল— “ইটস আ বেবি গার্ল!” গোলাপী তোয়ালেতে মোড়ানো ফুটফুটে রাজকন্যাকে যখন সাদের অন্য হাতের ওপর দেওয়া হলো, সাদের হৃদপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
একপাশে ওর রাজপুত্র, অন্যপাশে ওর রাজকন্যা। যমজ দুই ভাই-বোনকে যখন একসাথে বুকের কাছে আগলে ধরল, বাচ্চাদের কপালে পর্যায়ক্রমে ঠোঁট ছোঁয়ালো। ।”
সাদ একবার মুখ তুলে ওর বাবা-মায়ের দিকে তাকাল, যাদের চোখে আজ আনন্দের বন্যা। কিন্তু পরক্ষণেই ওর দৃষ্টি চলে গেল ওটি-র বন্ধ দরজার দিকে। নার্সকে জিজ্ঞেস করল—
“ফালাক? আমার wife কেমন আছে?
“আপনার wife ভালো আছেন, তবে প্রচুর ব্লিডিং হয়েছে, তাই এখনই ব্লাড দিতে হচ্ছে। আপনি যে ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন, সেই ব্লাড ব্যাগগুলো অলরেডি ট্রান্সফিউশন শুরু হয়েছে। ওনার সেন্স ফিরতে কিছুটা সময় লাগবে।”
আজ আল্লাহর অশেষ রহমতে ভয়ংকর জটিলতা কাটিয়ে ফালাক ফিরে আসছে।
সাদ মনে মনে বলল— ” আলহামদুলিল্লাহ!
বাড়ির বড়দের মুখে এখন খুশির হাসি। সাদের বাবা নাতি-নাতনি কোলে নিয়ে আযান দিচ্ছেন। আর সাদ শুধু ওটি-র দরজার দিকে তাকিয়ে আছে—কখন ওই ট্রলিতে করে ওর ফালাক সুস্থভাবে বেরিয়ে আসবে।
____________
নার্স যখন এসে জানালো যে ফালাকের জ্ঞান ফিরেছে এখন ভেতরে যেতে পারবে, সাদ দ্রুত কেবিনের ভেতর ঢুকে পড়ল।
সাদা ধবধবে বিছানায় ফালাক শুয়ে আছে। । খুব ধীরলয়ে চোখের পাতা মেলল। সাদ মাথার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো, ফালাক ম্লান একটা হাসি দিল।
সাদ কোনো কথা বলতে পারল না। ফালাকের পাশে বসে একটা হাত নিজের দুই হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরল।
আমাদের… আমাদের বাচ্চারা ?”
সাদ ফালাকের কপালে দীর্ঘ চুমু খেল। চোখের এক ফোঁটা জল ফালাকের গালে গিয়ে পড়ল।
“ওরা একদম ঠিক আছে ফালাক। আমাদের একটা রাজপুত্র আর একটা রাজকন্যা হয়েছে।
ফালাকের চোখে আনন্দের জল চিকচিক করে উঠল। অস্ফুট স্বরে বলল, “আপনি কাঁদছেন কেন? আমি তো ঠিক আছি ।”
সাদ ফালাকের হাতটা নিজের ঠোঁটের সাথে চেপে ধরে ফুঁপিয়ে উঠল। যে ভয় গত কয়েক মাস ধরে নিজের বুকে পাথর করে চেপে রেখেছিল, আজ তা জলের মতো বেরিয়ে আসছে।
ফালাক অন্য হাতটা বাড়িয়ে সাদের চুলে বিলি কেটে দিল। সাদের মতো শক্ত মনের মানুষ আজ একদম ভেঙে পড়েছে। ফালাক আর কিছু বললো না,থাক কাঁদুক কিছু কিছু অনুভূতি এভাবেই প্রকাশ করুক।
ঠিক তখনই সাদের মা আর চাচি দুই কোলে দুইটা বেবিকে নিয়ে কেবিনে ঢুকলেন। ফালাকের বুকের ওপর যখন ওর সন্তানদের রাখা হলো, তখন ফালাক যেন এক স্বর্গীয় সুখে ভরে উঠল। ওদের মুখ দেখে ওর সব কষ্ট এক নিমেষে মুছে গেল।
সাদ একপাশে দাঁড়িয়ে ফালাক আর তার দুই সন্তান এর দিকে তাকিয়ে আছে।” সাদের পৃথিবী “!
_______________
কেবিনে এখন সাদ আর ফালাক আছে!
ফালাক সাদের একটা হাত টেনে নিজের গালে রাখল। ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠেছে হাসি। আজ সাদ আর ফালাকের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে উষ্ণ সুন্দর দিন ।
দশদিন পর ____
ফালাক আর বাচ্চাদের নিয়ে সাদ এখন বাড়িতে!
একপাশে সাদের রাজপুত্র হাত-পা ছুড়ে কাঁদছে, সাদ তখন খুব কায়দা করে তার রাজপুত্রের ডায়াপার চেঞ্জ করার চেষ্টা করছে। কপালে ভাঁজ, চরম মনোযোগ দিয়ে এই কাজটা করছে যেন কোনো বড় বিজনেস ডিল সাইন করছে।
“আপনি উল্টো পরিয়েছেন! ওই দিকটা সামনে হবে।” ফালাক হাসতে হাসতে বলল!
সাদ থমকে গিয়ে নিজের কাজের দিকে তাকালো, তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফালাকের দিকে তাকালো।
ফালাক হাসতে হাসতে সাদের হাত থেকে বাবুকে নিয়ে নিল। সাদের এই ‘বাবা’ রূপটা ওর কাছে সবচেয়ে প্রিয় লাগছে । সাদ ফালাকের পাশে ধপ করে বসে পড়ল।
ফালাক এক হাতে বাবুকে আগলে, অন্য হাত দিয়ে সাদের গাল ছুঁয়ে দিল।
“আপনি অনেক ক্লান্ত হয়ে গেছেন । সারারাত আপনি ওদের সামলান, আমাকে ঘুমানোর সুযোগ দেন। অথচ আপনার নিজেরও তো বিশ্রাম দরকার।”
সাদ এবার ফালাকের হাতটা নিজের ঠোঁটে চেপে ধরে চুমু খেলো ।
“তুমি নয় মাস যে ধকল সহ্য করেছ, তার তুলনায় আমার এই কয়েক রাতের জাগা তো কিছুই না।
ঠিক তখনই সাদের রাজকন্যাও জেগে উঠে সরু গলায় কান্না শুরু করল। সাদ চট করে ওকে কোলে তুলে নিয়ে রুমময় হাঁটতে লাগল আর নিচু স্বরে গুনগুন করে গান গাইতে শুরু করল। ফালাক অপলক দৃষ্টিতে ওর জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যটা দেখতে লাগল।
চলবে ~~~~
#everyonefollowers #গল্পফ্যাক্ট #উপন্যাসপ্রেমী #উপন্যাস

