ফালাক #লেখিকা_ইনায়া_জারিশ #পর্ব______________৪০

0
20

#ফালাক #লেখিকা_ইনায়া_জারিশ
#পর্ব______________৪০

ফালাক অনেক কষ্টে আরিশ আর আইরাকে ঘুম পাড়িয়েছে। আজ সাদ পাশের রুমে কাজ করছে অনেকক্ষণ হলো।

এরপর ফালাক ডাকতে যায়! ফালাক ধীরলয়ে দরজা ঠেলে ভেতরে পা রাখল। পুরো রুমটা ড্রিম লাইট দিয়ে আলোকিত করে রাখা হয়েছে। সাদ কোথাও নেই। ফালাক এদিক ওদিক তাকিয়ে ডাকল

“কোথায় আপনি?

ফালাক রুমের মাঝখানের দিকে এগোতে লাগল। হঠাৎ করে কিছু একটার সাথে পা লেগে ফালাক হোঁচট খেল। টাল সামলাতে না পেরে সামনের বিছানাটার ওপর ধপ করে পড়ে গেল। ঠিক তখনই সিলিংয়ের ওপর থেকে শত শত রঙিন বেলুন আর হার্ট শেপের বেলুন ঝরঝর করে ফালাকের গায়ের ওপর পড়তে লাগল।
ফালাক সম্পূর্ণ অবাক! মুহূর্তের জন্য মনে হলো বাস্তব জগতে নেই, কোনো এক স্বপ্নের রাজ্যে হারিয়ে গেছে। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক অনাবিল হাসি।
বিছানায় উঠে বসে দুহাতে বেলুনগুলো সরাচ্ছিল, মনটা এক লহমায় খুশিতে ভরে উঠল।
হুট করেই মৃদু আলোগুলোও নিভে গেল। পুরো ঘর একদম ঘুটঘুটে অন্ধকার! ফালাক এক মুহূর্তের জন্য ঘাবড়ে গেল, অন্ধকারের বুক চিরে শুধু সাদের উপস্থিতির ঘ্রাণ পাচ্ছিল। ঠিক তখনই একটা ‘ক্লিক’ শব্দ হলো আর সাদের হাতে জ্বলে উঠল একটা ছোট লাইটার।
ছোট্ট আগুনের শিখায় ফালাক দেখল সাদের মুখটা। আগুনের আভায় সাদের তীক্ষ্ণ চাউনি ফালাকে যেন হিম করে দিলো। সাদের অন্য হাতে ধরা ছোট্ট একটা চকলেট কেক—

“শুভ জন্মদিন আমার নিশিরাতের জোনাকি। এই অন্ধকার ঘরে আমার এই এক চিলতে আলো হয়েই থেকো সারাজীবন।”

ফালাক নির্বাক। শুধু অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সাদের দিকে। লাইটারের শিখাটা কাঁপছে, আর সেই সাথে ফালাকের বুকের ভেতরটাও দুলছে এক অপূর্ব আবেশে। সাদের এই ‘নিশিরাতের জোনাকি’ ডাকটা যেন ফালাকের আত্মার খুব গভীরে গিয়ে ধাক্কা দিল।

“আপনি… আপনি এই সব কিছু কখন করলেন?

“যে যাকে ভালোবাসে, তার জন্য সময় আর সুযোগ তৈরি করে নিতে হয় ফালাক।
এরপর ফালাক কে কেক খায়িয়ে দেয়!ফালাক মনে মনে খুব খুশি। তার জন্মদিন পালন তো দূর কেউ কখনো মনেই রাখে নি। আর আজ….

মনে মনে চাইলো যেন জীবনের প্রতিটি জন্মদিন এই মানুষটার বাহুডোরেই কাটে।

ফালাকও কাঁপাকাঁপা হাতে এক টুকরো কেক সাদকে খাইয়ে দিল।

ফালাক আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। কেকটা একপাশে রেখে সাদের বুকে আছড়ে পড়ল। সাদের শার্টটা খামচে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। এ এক অদ্ভুত সুখের কান্না। সাদ ওকে দুই বাহু দিয়ে পিষ্ট করে জাপটে ধরল।

“আমি খুব ভাগ্যবতী । খুব বেশি ভাগ্যবতী। আপনি না থাকলে আমি জানতামই না যে ভালোবাসা এতোটা সুন্দর হতে পারে।”
সাদ ফালাকের চুলে গভীর একটা চুমু খেল।

বেলুনগুলো বিছানার চারধারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, সাদ আর ফালাক শুয়ে আছে। ফালাক সাদের প্রশস্ত বুকের ওপর মাথা রেখে হৃদস্পন্দন শুনছে—যে হৃদস্পন্দন এখন শুধু ফালাকের নামেই স্পন্দিত হয়।

সাদ এক হাত দিয়ে ফালাকের এলোমেলো চুলগুলো সরিয়ে দিচ্ছিল।

অনেক রাত হলো… ঘুম আসছে না তোমার?”

“উঁহু, মোটেও না। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে আমি চোখ বুজলেই এই সুন্দর স্বপ্নটা ভেঙে যাবে।

সাদ ফালাকের চিবুকটা ধরে মুখটা উঁচিয়ে ধরে । চাঁদের আলোয় ফালাকের মুখ জ্বলজ্বল করছে।

“তাহলে একটা গান শুনবে?

ফালাক অবাক হয়ে সাদের দিকে তাকালো। সাদ মির্জা গান গাইবে? তাও নিজে বলছে!

“আপনি গান গাইবেন? সত্যি?

“সাদ গাইতে শুরু করলো –

Zindagi rok doon main
Ab tere samne
Pal do pal jo ruke
Tu mere sath main

Toota jo kabhi tara
Sajna ve
Tujhe rab se maanga
Rab se jo maanga mileya ve

Tu mileya toh
Jaane na doonga main

Itni bhi haseen main nahi hoon yaara ve
Mujhse bhi haseen toh tera yeh pyar hai

Haan itni bhi haseen main nahi hoon yaara ve
Mujhse bhi haseen tera pyar…

Ke tere mera pyar ye
Jaise khwab aur dua
Haan sach kar raha inhe
Dekho mera khuda

Toota jo kabhi tara
Sajna ve
Tujhe rab se maanga
Rab se jo maanga
Mileya ve

Tu mileya toh
Jaane na doongi main

ফালাক মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতে লাগলো!

_____________________

দেখতে দেখতে তিনটি বছর পেরিয়ে গেলো ! মির্জা বাড়ি এখন আগের চেয়েও দ্বিগুণ কোলাহল, দ্বিগুণ প্রাণচাঞ্চল্য।
আয়ান আর নীলার এক বছরের ছেলে হয়েছে।ঈশান-রিমার আট মাসের ফুটফুটে রাজকন্যা ‘রোজ’।
মীরার বিয়ে হয়ে গেছে।মির্জা বাড়ির আদুরে মেয়েটা এখন অন্য এক ঘর আলো করে আছে,।

এদিকে সেই ছোট্ট আরিশ, আইরা ও বড় হয়ে গেছে এখন কথা বলতে পারে, ঘর জুড়ে হেটে বেড়ায়!

মীরার বিয়ে উপলক্ষে সাদ আর ফালাক বাংলাদেশ এসেছে!
বাবা-মায়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ফালাক আজ অঝোরে কেঁদেছে। পাশে দাঁড়িয়ে ফারদিনও নির্বাক। সাদ ফালাকের কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনা দিয়েছে। জিয়ারত শেষ করে ওরা গাড়িতে ফিরল। সাদ ড্রাইভিং সিটে, পাশে ফালাকের কোলে ছোট্ট আইরা। পেছনের সিটে ফারদিনের কোলে আরিশ।

রোদের তাপে ফালাকের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।” খুব পানি তেষ্টা পেয়েছে। একটু পানি আনবেন?”

সাদ গাড়িটা মেইন রোডের পাশে একটা ছোট বাজারের সামনে থামায় ।

সাদ গাড়ি থেকে নামতে চাইল, কিন্তু আইরা তখন বাবার শার্টের কলার শক্ত করে ধরে কান্না জুড়ে দিল। ও বাবাকে ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতে নারাজ।

“আপনি ওকে কোলে নিন। আমি বরং দোকান থেকে পানিটা নিয়ে আসছি।”

ফালাক রাস্তা পার হয়ে সামনের একটা মুদি দোকানে গেল। সেখানে চার-পাঁচটা বখাটে ছেলে টুলে বসে আড্ডা দিচ্ছিল। ফালাকের গায়ে একটা দামী সিল্কের শাড়ি,। তাকে দেখেই ছেলেগুলো শিস দিয়ে উঠে ।

“আরে জোস তো! এই এলাকায় এমন মাল আগে তো দেখি নাই।”

“যাবেন নাকি আপা আমাদের সাথে? পানি না খেয়ে কোল্ড ড্রিঙ্কস খাওয়াই?”

ফালাক জলদি পানির বোতল নিয়ে টাকা দিয়ে দ্রুত পায়ে গাড়ির দিকে ফিরতে লাগল। ফালাক প্রায় দৌড়ে গাড়ির কাছে এল। ফালাকের ফ্যাকাশে মুখ দেখে সাদের রক্ত মাথায় চড়ে গেল। সাদ গাড়ির জানালা দিয়ে পুরো দৃশ্যটা দেখেছে।

সাদ একদম শান্ত ভঙ্গিতে গাড়ি থেকে নামল। কোলে আইরা। ফালাকের কাছে গিয়ে খুব ধীরস্থিরভাবে আইরাকে ফালাকের কোলে তুলে দিল।

“ফালাক, আইরাকে ধরো।

ধীরপায়ে দোকানটার দিকে এগিয়ে গেল। বখাটে ছেলেগুলো তখনো হাসাহাসি করছিল। কিন্তু সাদকে কাছে আসতে দেখে ওদের হাসি উবে গেল। সাদের ব্যক্তিত্বই এমন যে সাধারণ মানুষ ভয়ে পিছিয়ে যায়।

সাদ কিছু না বলে পাশের একটা ডাব বিক্রেতার ভ্যান থেকে একটা ধারালো ‘দা’ তুলে নিল। চকচকে ইস্পাতের সেই দা-টা সাদের হাতে দেখে চারপাশের লোকজন চিৎকার করে উঠল। কিন্তু সাদ নির্বিকার।

“এই… আপনি কে? মারামারি করবেন নাকি?”

রাস্তার ধারের ডাব বিক্রেতা থেকে শুরু করে পথচারী—সবার চোখ তখন ওই দীর্ঘকায় মানুষটার দিকে। সাদের পরনে দামী শার্ট। রোদের আলোয় দা-এর ইস্পাতটা ঝিলিক দিয়ে উঠল, এই অবস্থায় সাদকে দেখে সেখানে উপস্থিত সবার কলিজা যেন শুকিয়ে এল।

সাদ এক পা এক পা করে বখাটেদের দিকে এগোচ্ছে। ওর হাঁটার মধ্যে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, আছে এক অদ্ভুত শিকারি বাঘের মতো ছন্দ। বখাটে চার-পাঁচটা ছেলে যারা একটু আগেও ফালাককে নিয়ে নোংরা মন্তব্য করছিল, তাদের বুক এখন দুরুদুরু কাঁপছে।

“কার দিকে তাকিয়ে হাসছিলি তোরা? কোন মুখ দিয়ে কথা বলছিলি?”

সবচেয়ে সাহসী ছেলেটা রুখে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল, “ঐ মিয়া! দা নিয়া ভয় দেখান? আমরা এই এলাকার…”

কথা শেষ হওয়ার আগেই সাদ বিদ্যুৎবেগে এগিয়ে এল। সাদের হাতের দা-টা বাতাসের বুক চিরে সপাং করে নামল। সবাই ভাবল বুঝি ছেলেটার মাথা দুভাগ হয়ে গেল! কিন্তু না, সাদ লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়নি। দা এর উল্টো পাশ দিয়ে এমন এক জোরালো আঘাত করল ছেলেটা আর্তনাদ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

বাকি তিনজন তেড়ে আসতে চাইলে সাদ এক লাথিতে একজনকে দোকানের ভেতরে ফেলে দিল। এ যেন সেই পুরোনো মাস্তান সাদ মির্জা। সাদ দা-টা ঘুরিয়ে একজনের হাতের কব্জিতে আলতো করে কোপ দিল, যাতে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটে এল। ছেলেটা হাত চেপে ধরে চিৎকার করতে করতে পিছু হটতে লাগল।

” আমি যখন এই শহর দাপিয়ে বেড়াতাম তোরা তখন হয়তো হাফপ্যান্ট পরে ঘুরতি।”

সাদ এবার বাকি দুজনকে কলার ধরে টেনে হিঁচড়ে রাস্তার মাঝখানে নিয়ে এল। একজনের চুলের মুঠি ধরে মাথাটা ডাবের ভ্যানের ওপর সজোরে ঠুকল। টপ টপ করে রক্ত ঝরছে ওর কপাল থেকে। সাদ দা-টা ওর গলার খুব কাছে ঠেকিয়ে ধরল।

“আমার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে নোংরা মন্তব্য করা,?? শিক্ষা পেয়েছিস?? আর কোনো মেয়ের সাথে এমন করতে যদি দেখি তবে এই দা দিয়ে তোদের শরীরের প্রতিটি জয়েন্ট আলাদা করে দেব। মনে থাকবে?”

আশেপাশের মানুষজন ভয়ে জটলা পাকিয়ে আছে, কিন্তু কারো হিম্মত নেই সাদকে থামানোর। এক লোক পাশ থেকে বলে উঠল, “আরে, এ তো মির্জা বাড়ির বড় ছেলে! সেই যে যমদূত ছিল এককালে!”

সাদ দা-টা ভ্যানের ওপর থাকা ডাবের মধ্যে গেঁথে দিল। তারপর পকেট থেকে একটা সাদা রুমাল বের করে খুব আয়েশি ভঙ্গিতে নিজের হাতের রক্তের ছিটেফোঁটাগুলো মুছল।

ফালাক গাড়ির ভেতরে বসে থরথর করে কাঁপছে, ওর দুহাতে আইরাকে চেপে ধরে রেখেছে। সাদ ড্রাইভিং সিটে বসে ইঞ্জিন স্টার্ট দিল।
গাড়িটা ধুলো উড়িয়ে চলে গেলো —

“পানিটা দাও ।

ফালাক কাঁপাকাঁপা হাতে পানির বোতলটা বাড়িয়ে দিল। ফালাক বুঝতে পারে,সাদ মির্জা’র ভেতর যে এক ভয়ংকর ‘ মাস্তানটা ‘ এখনো জ্যান্ত আছে।

চলবে ~

#everyonefollowers #উপন্যাস #উপন্যাসপ্রেমী #গল্পফ্যাক্ট #গল্পপ্রেমী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here