শেহরোজ — ৫ #ইসরাত_জাহান_দ্যুতি

0
23

#শেহরোজ — ৫
#ইসরাত_জাহান_দ্যুতি
***

ক্যানে চুমুক শেষে শাজ জিজ্ঞেস করল প্রিয়া আর তানহাকে, “মিতুর সাথে তোদের কথা হয়েছে?”

“হয়েছে। কিন্তু কেমন নিষ্প্রাণ লাগছিল ওর গলা।” বলল তানহা।

“ও আসলে ট্রমাটাইজড হয়ে পড়েছে, বুঝলি।” প্রিয়া আফসোস করল, “সামনেই এক্সাম। ও মনে হয় পড়তেও আগ্রহ পাবে না রে।”

“আমি ওর বড়ো আপার সাথে একটু কথা বলব ভাবছি। ওকে বাসায় রেখে শুধু সেবাশুশ্রূষা দিলেই হবে না৷ আদর যত্নের সঙ্গে ওকে মানসিকভাবে সাহসও জোগাতে হবে। আরও ভালো হত যদি আমরা ওর সাথে প্রতিদিন দেখা…” কথাটুকু শেষ করা হলো না শাজের। ক্যান্টিনের দরজা দিয়ে সাদিয়া, মুন্নী আর লাবণ্যকে ঢুকতে দেখে চোখ-মুখ কঠিন হয়ে এলো ওর।

কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে এ বছর কমনরুম আর ক্যাফেটারিয়ার সম্পাদক হয়েছে ছাত্রশক্তির নেত্রী ইরা মির্জা। সাদিয়া, মুন্নী, লাবণ্যসহ আরও কিছু শিক্ষার্থী আছে — যারা ইরার সাঙ্গপাঙ্গ নামেই পরিচিত ভার্সিটিতে। এরা যে হলে বসত করে, সে হলে এদের দাপটেই অন্যান্য শিক্ষার্থীরা অস্থির। এদেরকে তোয়াজ করে চললে এরা শিক্ষার্থীদের জন্য বড়ো বোন বা ভাই৷ আর তোয়াজ না করলে পদে পদে অপমান আর লাঞ্ছিত হওয়ার গল্প শোনা যায় অহরহ। কেবল হলই নয়, কমনরুম আর ক্যাফেটারিয়াতেও এদের একই প্রতাপ। যে জন্য শাজ অধিকাংশ সময়ই মেয়েদের হলের ক্যাফেটারিয়া এড়িয়ে চলে। আদতে এদের আনাগোনা যেখানে বেশি থাকে, সেই স্থানগুলোতেই শাজ মাড়াতে চায় না৷

“ওরা আজকে ওদের বাপের সম্পত্তির ক্যান্টিন ছেড়ে এখানে কেন এসেছে?” প্রিয়া বলল ফিসফিসিয়ে।

কিন্তু শাজ হঠাৎ ধমকে উঠল ওকে, “বললে স্বাভাবিকভাবে বল। ফিসফিস করছিস কেন?”

থতমত খেয়ে প্রিয়া কোনো কথায় আর বলল না৷ তানহা তা দেখে হাসল৷ তবে শাজকে বলল, “তুই তো আর হলে থাকিস না, তাই আমাদের ফিসফিসানির কারণও বুঝবি না।”

“বুঝি। আর বুঝি বলেই ভয় করতে বারণ করি তোদের৷ আমরা সাধারণ শিক্ষার্থী সবাই এক হলে ওদের ক্ষমতা ছিল কারও জীবন নষ্ট করার? গত বছর র‍্যাগিংয়ের নামে প্রান্ত ছেলেটাকে রাতভর উলঙ্গ করে নির্যাতন করেছিল শাখা ছাত্রশক্তির দুই জানোয়ার৷ রাত বারোটা থেকে সাড়ে চারটা পর্যন্ত লালনের হলে এই ঘটনা ঘটেছে, তা কিন্তু হলের সবাই জানে। অথচ কারও প্রতিবাদ করার সাহস নেই।”

“তার আগের বছরের ঘটনা ভুলে গেছিস, শাজ?” তানহার মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি। বলল সে, “ওই বছরে কত বড়ো ক্রাইম করল স্বামী-স্ত্রী স্টুডেন্ট দুটোর সঙ্গে! স্টুডেন্টরা ক্যাম্পাসে কত হইচই সৃষ্টি করেছিল সেজন্য। মিডিয়াতেও গেল ঘটনাটা। অথচ তাতে কী লাভ হলো, বল? পুলিশ ঠিকই আটক করেছিল রেপিস্টদের৷ কিন্তু বিচার আর হয়নি৷”

ওই বছর প্রথম বর্ষের দুজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে ঘটেছিল ঘটনাটা। তারা স্বামী-স্ত্রী হলেও তাদের মধ্যে ভার্সিটির হলে সিট পেয়েছে কেবল মেয়েটি। আর ছেলেটি গণরুমে থাকত। কারণ, শামসুল আলম হলে বিবাহিত দম্পতিদের জন্য থাকা সব সিট বুক ছিল। কথা ছিল সিট ফাঁকা হওয়ার পর ওরা সেই হলে থাকতে পারবে।

এই ভার্সিটিতে গণরুমে থাকা শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা শেখানোর সংস্কৃতি চলে গেস্টরুমে। সেই ছেলেটি একদিন ক্যাফেটেরিয়ার ভেতর ছাত্রশক্তির জুয়েল নামের এক নেতার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় সালাম করেনি তাকে৷ তারপর আরেকদিন ওদের সভা মিছিলে ছেলেটিকে যোগ দেওয়া হুকুম দিয়েছিল ওরা। কোনো কারণবশত ছেলেটি যেতে পারেনি। এরপর থেকেই ছেলেটিকে নানান বাহানায় অপমান, অপদস্থ করতে শুরু করে ছাত্রশক্তির কর্মীরা। কিন্তু এই সাথে মেয়েটিও ওদের দ্বারা বহুবার উত্ত্যক্তের শিকার হয়। আর এর মাঝেই এই দম্পতি শামসুল আলম হলে সিট পায়।

তারপর মূল ঘটনাটি ঘটে জনশক্তির সমাবেশের দিন। মেয়েটি অসুস্থ হয়ে পড়ায় সমাবেশে থাকতে পারবে না বলে ছেলেটি জুয়েলের দলের কাছে যায় হলে ফেরার অনুমতি নিতে। স্বাভাবিকভাবেই তখন জুয়েলরা তাদের যাওয়ার অনুমতি দেয়। শামসুল আলম হল সেদিন ফাঁকায় ছিল। তারা হলে ফেরার পরই ওই তথাকথিত নেতা জুয়েলসহ ওদের চারজন শিক্ষার্থী কর্মী হঠাৎ হলে চলে আসে৷ ছেলেটিকে খুব নির্যাতনের পর তাকে আটকে রেখে মেয়েটিকে ছজন মিলে ধর্ষণ করে।

“হইচই সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু অপরাধীদের বিচার না হওয়া পর্যন্ত আওয়াজ তোলার কাজটা কি করেছিল? এই কুত্তাশক্তিদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে পারার সাহস না করতে পারলে সারাজীবনই এদের কাছে গোলামের মতো হয়ে থাকতে হবে।” প্রচণ্ড মেজাজে শাজ একটু উঁচু গলাতেই বলে ফেলল।

ক্যান্টিন মালিকের সাথে কথা বলতে এসেছে সাদিয়ারা৷ প্রিয় এক ছাত্রশক্তি নেতার জন্মদিন উপলক্ষে খানাপিনার আয়োজন করবে ওরা। তারই ব্যবস্থা করার ব্যাপারে আলোচনা করছিল। এর মাঝেই লাবণ্য মেয়েটির নজর শাজের টেবিলে ছিল শুরু থেকে। কারণ, শাজকে মিতুর কাছের বন্ধু হিসেবে ছাড়াও সব থেকে বেশি ভালো চেনে ওরা হল সংসদের নেতা রনির প্রেমিকা হিসেবে। আর এই রনিকে ঘিরে ভার্সিটির বহু মেয়ের মাঝেই আগ্রহ রয়েছে। কেননা ক্ষমতার সঙ্গে রনি ছেলেটি দেখতে শুনতেও ভালোই৷ সেই রনি গত বছর দ্বিতীয় বর্ষের এক ছাত্রীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে যায়। আর সে খবর আলোর গতিতে ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়ে৷ সেই থেকে শাজকে ঘিরে কত মেয়ের হিংসাত্মক মনোভাবের সৃষ্টি হয়েছে — তা শাজেরও জানা নেই। সে মেয়েদের ব্যতিক্রম নয় সাদিয়া, লাবণ্য, মুন্নীও।

শাজের কথার শেষ বাক্যটি চট করেই কানে পৌঁছল লাবণ্যর। ছাত্রশক্তিকে গালি দিয়ে ‘কুত্তাশক্তি’ বলে থাকে অনেকেই৷ সেটা কারওই অজানা নয়৷ শাজের বলা এই কথাটি সাদিয়া আর মুন্নীকে অবগত করতে দেরি করল না সে। ক্যান্টিনে এখন সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভীড় বেশি৷ সবাই সকালের নাশতা সাড়ছে। সাদিয়া তীক্ষ্ণ চোখে শাজকে দেখতে দেখতে ভেবে ফেলল, এই মুহূর্তে ওরা কীভাবে অপদস্থ করবে শাজকে এবং এত স্পর্ধার জন্য কী শাস্তি বরাদ্দ করবে!

ক্যান্টিন মালিকের সাথে কথাবার্তা বলা শেষে সাদিয়া বান্ধবীদের নিয়ে বেরিয়ে এলো ক্যান্টিন থেকে। তারপর ফোন করল কাউকে। রনির সাথে শাজের সম্পর্ক ভেঙে গেলেও কোনো এক অজ্ঞাত কারণে রনি শাজের প্রায় সবরকম খবরই রাখে৷ শাজের জন্য তার মাঝে নাকি এখনো গাঢ় অনুভূতি রয়ে গেছে। এজন্যই ছাত্রশক্তির অন্য কোনো কর্মীরা শাজকে বিরক্ত করা বা প্রেমের প্রস্তাবও দেওয়ার চেষ্টা করে না। কিন্তু বর্তমান ছাত্রশক্তির মাঝে নতুন একটি মুখের জন্ম হয়েছে — মাস্টার্সের এক ছাত্র। মাত্র চার মাসের ব্যবধানে ছাত্রশক্তির একজন কর্মী হিসেবে এই ছাত্রের কিছু কর্মকাণ্ড আর বুদ্ধিমত্তা ছাত্রশক্তির সভাপতিকে এত বেশি প্রভাবিত করেছে যে, সংগঠনের সাধারণ সম্পাদকের থেকেও এই ছাত্রের প্রতি বেশি আস্থাবান হয়ে পড়েছে সে। অথচ এজন্য কখনো ক্যাম্পাসে সেই ছাত্রকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বা কোনো মিটিং, মিছিল, সমাবেশে অন্য কোনো নেতাকর্মীদের সাথে অহংকার, দাম্ভিকতা, দাপট নিয়ে চলতে দেখা যায়নি৷ বাংলাদেশ জনশক্তির সভাপতি মহসিন খন্দকারের জন্য কিছু করতে পারাটাই নাকি তার জন্য বড়ো কিছু। আর তাই কোথাও জনশক্তি বা ছাত্রশক্তির বিন্দুমাত্র বদনামও সে সহ্য করতে পারে না — প্রতিবাদের আগুন জ্বলে ওঠে তার দুই চোখে।

ছেলেটি সাদিয়াদেরই ব্যাচমেট। গত চার মাসে মিছিল, সমাবেশে ওদের সঙ্গে বেশ কবার দেখা সাক্ষাৎ হয়েছে তার, ভালো সম্পর্কও তৈরি হয়েছে৷ তার চালচলন, কথা বলার ভঙ্গিমা যথেষ্ট আকর্ষণীয়, আচরণ ভীষণ বন্ধুসুলভ। অথচ মায়া মায়া মুখটাতে কেমন কাঠিন্য আর চোখে নিষ্ঠুরতা। আজ-কাল তাই ছাত্রশক্তির নেত্রী সদস্যদের মাঝেও তাকে নিয়ে আলোচনা চলে বেশ।

মিনিট বিশেক পর।
নাশতার পর্ব চুকিয়ে শাজ বান্ধবীদের সঙ্গে বের হলো ক্যান্টিন থেকে৷ সাড়ে বারোটায় ক্লাস। নিজেদের ফ্যাকাল্টির দিকে রওনা হবে ওরা, সে সময়ই শাজ থমকে পড়ল কয়েক হাত দূরত্বে দাঁড়ানো কজন ছেলে-মেয়ের মাঝে দারুণ এক দৈত্যকে দেখে। গতরাতের কিছু স্মৃতি নিমেষেই মানসপটে এসে ভিড়তেই মেঘ গম্ভীর শাজের ঠোঁটের পাশে আনমনেই রোদ ঝিলিক দিলো। এতদিন যদি ভার্সিটি মিস না দিতো, নিশ্চয়ই এভাবে চলতে পথে এক আধবার দেখা হতো তাদের!

“আজকে আর সবগুলো ক্লাস করা হবে না।” মন খারাপের গলায় বলল তানহা।

“কেন?” চলতে চলতে শাজ জিজ্ঞেস করল। দৃষ্টি নিবদ্ধ তখন সামনের সেই মানুষটির দিকে।

“তিনটায় টিএসসিতে ছাত্রশক্তির সমাবেশ আছে তো।” বলল প্রিয়া।

শাজের কানে সে কথা পৌঁছলেও পূর্ণ মনোযোগ অদূরের জটলাটিকে ঘিরে। সে জটলার মাঝে উপস্থিত ইরা মির্জাসহ তার সাঙ্গপাঙ্গ, আরও কিছু শিক্ষার্থী আর শেহরোজ। এদের সঙ্গে শেহরোজকে দেখে একটুও ভালো লাগল না ওর। কী করছে সে এদের সাথে? জবাবটা পেতে সময় লাগল না শাজের।

জটলার পাশ ঘেঁষেই যাচ্ছিল শাজ৷ “এই, দাঁড়াও” কথাটা এলো এক ছেলের থেকে তখনই৷ ভ্রু কুঁচকে শাজ দাঁড়িয়ে পড়ল। জিজ্ঞেস করল, “কাকে বললেন? আমাকে?”

“হুঁ, তোমারেই”, জবাব দিলো ইরা। তারপর আদেশ গলায় বলল, “দরকার আছে তোমার সাথে৷ গেস্টরুমে চলো।”

“কিন্তু…” হাতঘড়ি দেখল শাজ, “আমার ক্লাস আছে এখন। স্যরি, যেতে পারছি না তাই।” নির্বিকার গলায় জানিয়ে সে শেহরোজের দিকে তাকাল৷ তাকিয়ে আছে তখন শেহরোজও।

“ও যাবে না, আপা”, বলল সাদিয়া৷ “ওর ত্যাড়ামি স্বভাব আছে শুনছি৷ রনি ভাইয়ের জন্য আশকারাও হেব্বি।”

“প্লিজ কারেক্ট দ্য ওয়ার্ডিং” সঙ্গে সঙ্গেই বলল শাজ। প্রতিবাদটা স্পষ্ট টের পেলো প্রত্যেকে ওর কঠিন হয়ে ওঠা মুখটা দেখে। বলল আবারও, “রনি ভাইয়ের জন্য আমার কোনো কিছুই হেব্বি নয়। কিন্তু বুঝিনি আপু, কোন ব্যাপারে আশকারা বেশি দেখেছেন আমার?”

“এই, ওরে গেস্টরুমে নিয়ে আয় তো। বসে কথা বলা যাক।” ইরা সাদিয়াদের নির্দেশনা দিয়েই শেহরোজকে বলল, “তোমারে খালি খালি ডাকছে সাদিয়া, বুঝছ রোজ? এসব ফালতু ব্যাপারে তোমার সময় নষ্ট করা লাগবে না। তুমি সরাসরি টিএসসিতে চলে যাও।”

“ডেকেছেই যখন, লেটস সলভ্ দ্য ম্যাটার। গেস্টরুমে যেতে হবে না কাউকে।” বলে শেহরোজ ঠান্ডা সুরে জিজ্ঞেস করল শাজকে, “ক্যান্টিনে বসে যা যা বলছিলে, সেটা আবার রিপিট করো এখন।”

কয়েক পলের জন্য মূক হয়ে গেল শাজ। ‘রোজ’ নামটা গত দু’মাসে বেশ কবার শুনেছে সে সালমান আর অঙ্কনের মুখে৷ ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীদের ভেতর নাকি ইদানিং টুকটাক দ্বন্দ, বিরোধ চলছে এই নামের মানুষটিকে নিয়ে। কারণ, তাদের জোরালো প্রতিবাদ হলো — হুট করে এসে জুড়ে বসেছে ছেলেটি সবখানে। সাধারণ এক ছাত্র থেকে রাতারাতি ‘হিরো’ বনে গেছে ছাত্রশক্তির সভাপতি রুবেলের কাছে৷ এমনকি ছাত্রশক্তির বহু কর্মীদের কাছেও। যে কোনো কাজে বা ছাত্রশক্তির যে কোনো বৈঠকে সবার আগে ডাক পড়ে এখন রোজ নামের ছেলেটির। ব্যাপারটি তাই রীতিমতো অন্যান্য নেতাদের কাছে হয়ে উঠেছে বাড়াবাড়ি আর হিংসার। এবং এই ছেলে জনশক্তির জন্য কতটা নিবেদিত — সে গল্পও শুনেছে শাজ বন্ধুদের কাছে৷ নিজের পকেটের টাকাও নাকি দেদারসে খরচা করছে সে ছাত্রশক্তিতে যুক্ত হওয়ার পর থেকে। আর এজন্যই অসংখ্য কর্মীদের বিরাট একটা অংশ ভক্ত হয়ে উঠেছে রোজের।

কী বোকা শাজ! প্রথমবার ‘শেহরোজ’ নামটা শোনার পর একবারও ওর মাথায় এলো না এই সেই ছাত্রশক্তি নামক সন্ত্রাস সংগঠনের নতুন এবং ভবিষ্যত নেতা — ‘রোজ?’ তার বাহ্যিক সুন্দরতায় মুগ্ধ হয়ে পড়েছিলই বলেই বুঝতে পারেনি সে। আহ্! প্রমাণিত আবারও, কারও বাহ্যিক রূপই ভেতরের সত্যটা প্রকাশ করে না।

ধাক্কাটা সামলে শাজ স্মিত হাসল, “দীর্ঘ কনভারসেশন, ভাইয়া৷ কিন্তু আপনারা রেসপেক্টেড সিনিয়র যেহেতু, তাই ক্লাসটা মিস করে হলেও বলা উচিত বোধ হয়।”

ইরা মির্জা মনে মনে অবাকই হচ্ছে শাজের কথাবার্তার ধরন দেখে৷ গত পনেরো বছরে ছাত্রশক্তি রাজধানীতে কতটা আতঙ্কের, তা কি এই মেয়ের ধারণা নেই? ছেলেগুলোর বাঁকা নজরে একবার পড়লে কী হতে পারে, সে ধারণাও কি নেই? পড়ে তো তৃতীয় বর্ষে। নিশ্চয়ই দেখেছে, বিগত বছরগুলোতে কত শিক্ষার্থীকে ভুগতে হয়েছে এবং বর্তমানেও হচ্ছে কেবল ছাত্রশক্তির বিরুদ্ধাচারণ করার জন্য। তারপরও মেয়ে হয়ে এত সাহস! শুধুই কি রনির সুনজরে আছে বলে?

“কথা ঘুরিয়ে নে, শাজ”, ফিসফিসিয়ে সাবধান করল তানহা। “প্লিজ মাথা গরম করে বাকবিতণ্ডায় জড়াস না। এই রোজের ব্যাপারে অনেক কিছু শুনেছি। পরে জানাব তোকে।”

কথাগুলো শুনে শাজ কিছু একটা ভাবল৷ বান্ধবীর অনুরোধে রাজি হলো কি হলো না, তা মুখ দেখে বোঝা গেল না। শেহরোজ চুপচাপ চেয়ে আছে তখন ওর দিকে। তার অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে শাজ হঠাৎ আঙুল তুলে ইশারা করল সাদিয়াদের দিকে, “আমার বান্ধবীকে এরা নিজেদের রুমে ডেকে নিয়ে রাতভর টর্চার করেছে। যার জন্য আমার বান্ধবী মরতে মরতে বেঁচে ফিরেছে। তাই এদেরকে গালি দিয়েছি ছাত্রশক্তির কুত্তা বলে।”

“এই মেয়ে” চেঁচিয়ে উঠল সাদিয়া। “তুমি না জাইনা মিথ্যে ব্লেম দিচ্ছ কোন সাহসে? প্রমাণ দিতে পারবা তোমার বান্ধবীরে আমরা টর্চার করছি?”

“আমার বান্ধবী গতকাল দুপুরেও মেডিকেলে ভর্তি ছিল”, সাদিয়ার চেয়েও বেশি গলা চড়াল শাজ। “রাত দুটোই ওকে হল থেকে সেন্সলেস অবস্থায় হসপিটাল নিয়ে যায় তানহা আর প্রিয়া। ওদের সঙ্গে ছিল আমার বন্ধু সালমান, অঙ্কন।”

“ওরা দেখছে আমরা টর্চার করছি তোমার বান্ধবীরে?” বলল লাবণ্য।

“মিতুর হলের প্রত্যেকে স্বাক্ষী, ওকে যখন ডেকে নেওয়া হয় তখন ও দিব্যি সুস্থ ছিল।” রাগে চেঁচিয়ে উঠল শাজ, “তাহলে আপনাদের রুম থেকে ও গায়ে জখম নিয়ে বের হলো কেন? সারা রাত ও রুমের বাইরে থেকেছে কেন? প্রত্যেকের রুমে রুমে বালতি ভর্তি পানি টেনে দিয়েছে কেন? তারা বলেছিল দিতে?”

ক্যান্টিনের আশেপাশে থাকা সকল শিক্ষার্থী দাঁড়িয়ে পড়ল শাজের চিৎকারে। ব্যাপারটা কোনা চোখে দেখতে পেয়েই সাদিয়াদের মুখ খোলার আগেই সে মুখ খুলল আবার, “ওর মেডিকেল রিপোর্টে ওর শরীরের ইনজুরি স্পষ্ট উল্লেখ আছে। প্রমাণস্বরূপ সেটা আমি যদি দেখাতে পারি, কী করবেন?” প্রশ্নটা রাখল সে শেহরোজের চোখে চেয়ে।

“কালকের মধ্যে রিপোর্ট এবং তিনজন সাক্ষী হাজির করবে”, উত্তর দিলো শেহরোজ মুহূর্তেই।

“তারপর?” চোখে তিরস্কার নিয়ে মুচকি হাসল শাজ।

“তারপর কী? সেটা সবকিছু হাজির করার পরই জেনো। আর যদি সাক্ষী না রাখতে পারো…” বাক্যটা শেষ করল না শেহরোজ। “ক্লাসে যাও এখন।” ধীর গলায় সে আদেশ দিলো শাজকে।

#বিশেষ_বার্তাঃ পড়তে কি বোরিং লাগছে? উপন্যাসটির প্লট আসলে বুঝতে হলে ধৈর্য নিয়ে আরেকটু সামনে এগোতে হবে। এটুকু বলি, এটা অ্যাকশন থ্রিলার এবং রোমান্টিক জনরার হবে৷ বেশ জটিলতা আছে কাহিনিতে। তাই চট করেই ধরতে পারছেন না বিষয়বস্তু কী। যদি ধৈর্য নিয়ে পড়তে রাজি থাকেন, তাহলে আগামীতে অন্যরকম ভালো কিছু পাবেন। কথা দিচ্ছি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here