#শেহরোজ – ২০
#ইসরাত_জাহান_দ্যুতি
***
মাথা মুছতে মুছতে শাজ বাথরুম থেকে বের হতেই চিৎকার করে উঠল বুস্তানি‚ “কলিং ইউ‚ বেবি! কলিং ইউ।”
নতুন বাসাতে আসার পর থেকে পাখিটা শুধু ওর বিছানা জুড়েই ঘুরে বেড়াচ্ছে। ভাবখানা দেখে মনে হচ্ছে বিছানাটা সে দখল করে নিয়েছে তা শাজকে বোঝাতে চাইছে সে৷ কয়েক পল পাখিটার দিকে নিষ্পলক চেয়ে থেকে শাজ বসল এসে ওর কাছেই৷ সঙ্গে সঙ্গেই বুস্তানি হেলেদুলে হাঁটতে হাঁটতে ছুটে এলো‚ দাঁড়াল শাজের গা ঘেঁষে। ও যে ভীষণ মিশতে চাইছে শাজের সঙ্গে তা শাজ বুঝতে পারছে বেশ। কিন্তু ভেতরকার অশান্তি আর কষ্টের জন্য শৈশবের স্বপ্নের কাকাতুয়াকে পাওয়ার আনন্দটা কেমন ফিকে হয়ে আছে। তাই তো তেমন কথাও শেখাতে মন চায়নি ওকে। কিন্তু এখন যেভাবে কাছে ঘেঁষে আছে তা দেখে আর পারল না চুপটি করে থাকতে৷ বুস্তানিকে চমকে দিয়ে সুরেলা এক শিস বাজাল সে আর অনামিকা আঙুলে ওর মাথায় আলতো ঘষতে থাকল৷ আহ্লাদে আটখানা হয়ে গেল বুস্তানি। মাথাটা এলিয়ে রাখল একটু সময় শাজের আঙুলের সাথে। কিন্তু শাজের শিস শুনে আর সেও চুপচাপ থাকতে পারল না। খুশিতে মাথার ঝুঁটি প্রসারিত হলো আর এবার শাজকে চমকে দিয়ে নিজের শেখা এক চমৎকার মিউজিক বাজাতে শুরু করল৷ মুগ্ধ হয়ে শাজ শুনল সুরটা। জিজ্ঞেস করল‚ “কে ছিল রে তোর মালিক? কী কী শিখেছিস তার থেকে?”
বুস্তানি বোঝেনি শাজের বাংলা কথা৷ সে মুখ ঝাঁকিয়ে আপনমনে মিউজিক করতে থাকল। এর মাঝে হঠাৎ ফোন কেঁপে উঠল শাজের—কল এসেছে কারও৷ ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল‚ নাম্বারটা অচেনা। তখনো তাহলে কল এসেছিল বলেই বুস্তানি ‘কলিং ইউ’ বলছিল?
গতকাল আইয়াজের ফোন আসার পর থেকে কোনো অচেনা নাম্বার থেকে কল আসলেই সে ভেবে বসছে ওর ভাইটা বোধ হয় দেশে এসেছে সত্যিই৷ রাগ করে যা-ই বলুক‚ ভাইকে কতদিন দেখে না! বছর দুই আগে সামনে পেয়েও তীব্র রাগে মুখটাতে তাকায়নি৷ বুকটার মাঝে ভাইয়ের জন্য কষ্ট বয় খুব৷ ওর অন্তরিন্দ্রিয় আজ-কাল কী একটা খারাপ সঙ্কেত দেয়—মনে হয় খুব শীঘ্রই ওর আত্মাটাও ওকে ত্যাগ করে ছেড়ে যাবে ওকে সাড়ে তিন হাত মাটির নিচে। ভেতরে ভেতরে সে নিজেকে সেভাবেই প্রস্তুতও করে নিচ্ছে একটু একটু করে৷ কে জানে সামনে কী হয়! যদি ভাইটা সত্যিই একবার সামনে এসে দাঁড়ায় এরই মধ্যে তবে রাগ দেখালেও খুব বেশি বকবে না।
ছোটো এক প্রলম্বিত শ্বাস ফেলে ফোনটা কানে ঠেকাল আর অমনিই ওপাশ থেকে ভেসে এলো আবেদন‚ “ডার্লিং‚ প্লিজ কাম টু দ্য পুল সাইড। আই অ্যাম হিয়ার ফর ইউ।”
শেহরোজ! প্রেমিকের মতো অমন করে ডাকতে শুনে শাজ কিঞ্চিৎ অবাকই হলো প্রথমে। তারপরই খেঁকিয়ে উঠল‚ “ডার্লিং মানে কী? কে ডার্লিং‚ হুঁ?”
“ওহো শেরি! কে আবার? তুমি! আসবে না?”
“না”‚ ধমকে বলল শাজ।
“তবে কি তোমার বেডরুমে ডাকছ? সেটাও ভালো। ইন ফ্যাক্ট বেশি ভালো। কিছু স্পেশাল মোমেন্টস ক্রিয়েট করব দুজন মিলে।”
“খবরদার আমার বেডরুমে আসবেন না”‚ বিদ্যুৎ বেগে দাঁড়িয়ে পড়ল শাজ। “নয়তো আমি চিৎকার করে বাড়ি মাথায় তুলব।”
“দেন কাম টু দ্য পুল সাইড ইন টু মিনিটস।” যেন গম্ভীর আদেশে বলল শেহরোজ‚ “আই রিপিট ফর দ্য লাস্ট টাইম‚ জাস্ট টু মিনিটস।”
অবাক চোখে ফোনের স্ক্রিনে চেয়ে থাকল শাজ৷ বলা শেষেই খট করে কলটা কেটে দিয়েছে শেহরোজ৷ এমন গুরুগম্ভীর সুরে ওকে আদেশ করার সাহস আসে কোথার থেকে এই লোকের? কেন আদেশ করবে ওকে? দুদিন সে খোলাখুলি কথা বলেছে বলে নিজেকে লোকটা ওর কাছের মানুষের মতো ভেবে নিয়েছে মনে হয়। তাহলে তো তার জায়গাটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে হয়!
বিছানার ওপর থেকে ওড়নাটা গায়ে মেলে চলে এলো ভাইয়ের ঘর দখল করে নেওয়া দৈত্যটার কাছে। ছাদে পৌঁছেই দেখল‚ পুলের পাশে বসে আছে শেহরোজ। বাহ্! এর মাঝে দুটো চেয়ার পাতাও হয়ে গেছে?
থপথপ পা ফেলে আসার শব্দ শুনে শেহরোজ পেছন ফিরে তাকাল আর মুহূর্তেই মুগ্ধতা ছেয়ে ধরল তাকে৷ আজই প্রথম দেখল মেয়েটিকে সেলোয়ার-কামিজে। শুভ্রতার মাঝে মাঝে লাল রঙা ফুলের নকশা তোলা জামাতে। আচ্ছা জামাটা সুন্দর বলেই কি ওকেও বেশি ভালো লাগছে দেখতে? না‚ ঠিক তা না। শেহরোজ ধরতে পারল এই লাস্যময়ীর দেহাকৃতিই মনোরম। যেজন্য ওকে সবরকম পোশাকেই মানিয়ে যায়৷
অদ্ভুত দাম্ভিকতার সঙ্গে শাজ হেঁটে এসে বিনা অনুমতিতেই বসল শেহরোজের মুখোমুখি চেয়ারে৷ ওড়নাও আজ সাধারণভাবে সে বুকের ওপর মেলে রেখেছে বলে গলাটা সম্পূর্ণ দেখা যাচ্ছে। গলায় ঝুলছে হীরার ছোটো একটি পেন্ডেট। নীলাভ আলো ছড়াচ্ছে হীরার মাঝখান থেকে। গলার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে তারপর সারা শরীরেই চোখ বুলিয়ে নিলো শেহরোজ। মধু বাদামী রঙা ভেজা চুলগুলো কাঁধ আর পিঠের মাঝ অবধি ছড়িয়ে রাখা। বেশ সুন্দর শ্যাম্পুর ঘ্রাণটাও। কিন্তু এই ঘ্রাণকে অবজ্ঞা করে বাতাসে ভেসে আসা গোলাপের হালকা সুবাসটুকু শাজের অগোচরে বুক ভরে টেনে নিলো সে।
সত্যটা হলো‚ শাজকে পুরোদস্তুরই নতুনভাবে দেখার সুযোগ পাচ্ছে শেহরোজ একই ঘরে থাকতে পারার জন্য। এবং বুঝতে পারছে‚ সামনে মেয়েটিকে সে আরও নতুন নতুনভাবে আবিষ্কার করারও সুযোগ পেতে চলেছে৷ এবং এটা উপভোগ্য লাগছে তার এখন থেকেই। বিড়বিড়িয়ে স্বগতোক্তি করে সে‚ “এবারের অনুভূতি আমার কেমন অন্যরকম। সামথিং স্পেশাল।”
“কী বললেন”‚ ভ্রু কুঁচকে ভারী সুরে জিজ্ঞেস করে উঠল শাজ।
“পারফেক্ট”‚ চোরা নজরে শাজের দেহাবয়ব আরেকবার দেখে নিয়ে জবাবটা দিলো শেহরোজ। তারপর নির্বিকার ঢঙে চুমুক দিলো চায়ের মগে।
“কী পারফেক্ট?”
“এখানের সবকিছুই।”
হঠাৎ শাজ লক্ষ করল শেহরোজ কালো চা পান করছে। আর সেটা দেখেই কেমন অদ্ভুত কিছু দেখার ভঙ্গিমায় তাকাল সে শেহরোজের দিকে‚ “আচ্ছা আপনি কি তুর্কি কোনো অ্যাক্টরকে ফলো করেন?”
“পিয়ার্স ব্রসনান।” সরল চোখে চেয়ে জানাল শেহরোজ‚ “টিনএজ গণ্ডিতে তাকে ফলো করতাম।”
“কিন্তু সে তো আইরিশ অ্যাক্টর। আমি তুর্কি অ্যাক্টর ক্যান ইয়ামানের কথা জিজ্ঞেস করছি।”
“কেন জিজ্ঞেস করছ তার কথা?”
“আপনার বডি স্ট্রাকচার‚ দাড়ি-গোঁফ আর”‚ ইশারায় শেহরোজের চুলকে দেখাল শাজ‚ “ঝুঁটি স্টাইল প্রথম দেখাতে ক্যান ইয়ামানকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিল।”
ফিচেল হাসল শেহরোজ‚ “এজন্যই কি তাহলে তার ছবির মাঝে তুর্কিশ স্টাইলে ‘Şehroz’ লিখে রেখেছিলে?”
অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল শাজ‚ “আমার তুর্কি কিছু হিরোদের প্রতি একটু দুু্র্বলতা আছে।”
“তাই? আর চায়ে?” বলে এগিয়ে দিলো দ্বিতীয় মগ। চেয়ারের পায়ার কাছে থার্মস কফি মগটা রাখা ছিল।
“যদিও কালো চা আমার পছন্দ নয়”‚ তবু চাটা গ্রহণ করল শাজ। মগের ঢাকনাটা খুলে এক চুমুক দিতেই বুঝল চায়ের স্বাদ আর ঘ্রাণটাও একটু ভিন্ন‚ “চাটা কি আপনি আমেরিকা থেকেই এনেছেন?”
“না।” চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে জানাল শেহরোজ‚ “ইরান থেকে।”
“ইরানিদের প্রধান চা কালো চা। আর তুর্কিদেরও পছন্দ বেশি এটাই। আপনিও কি কালো চাতে অভ্যস্ত?”
“চা হলে কালো চাতেই।”
“এটাও ক্যান ইয়ামানের বৈশিষ্ট্য। আমি এবার সত্যিই কনফিউজড হচ্ছি৷ এতগুলো বৈশিষ্ট্য কী করে মিলছে?”
মনে মনে হাসল শেহরোজ আর ভাবল‚ “মিলছে তো এজন্যই যে তোমার উইকনেস আছে তার প্রতি৷” শাজের অধিকাংশ পছন্দ‚ অপছন্দ সে জেনেশুনেই নিজেকে পরিবর্তন করেছে আর তারপরই শাজের সামনে এসেছে৷ চার মাস হলো নিজের চুল‚ দাড়ি আর গোঁফের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই তার। ওদেরকে স্বাধীনভাবে বাড়তে দিয়েছে। পরিকল্পনার অংশ মোতাবেক জরুরি ছিল শাজকে আকৃষ্ট করাটা৷ যে পরিকল্পনাটি এখনো চলমান।
“আপনি সত্যিই তেমন চেনেন না এই অ্যাক্টরকে”‚ সন্দেহ গলায় জিজ্ঞেস করল শাজ।
কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল শেহরোজ‚ “চিনি না তো। হতেই পারে এটা তোমার মনের ভুল৷ অ্যাক্টরের প্রতি তুমি বোধ হয় খুব অবসেসড। তাই আমার মাঝে তাকে খুঁজে নিয়েছ।”
“মোটেও অবসেসড নই”‚ প্রতিবাদ করল শাজ মুহূর্তেই। “হলেও আপনার মাঝে তাকে খুঁজে নেব কেন? আপনি কি তার মতো দেখতে? আপনার মতো গুণ্ডামার্কা না তার চেহারা।”
“আচ্ছ”‚ মাথা ওপর-নিচ দুলাল শেহরোজ। “এত বাজে দেখতে আমি! আমার তো কনফিডেন্স কমতে শুরু করেছে”‚ কপট আহত সুরে বলল।
চায়ে চুমুক দিতে দিতে মিটিমিটি হাসল শাজ। মেয়েদের মনের ভাষা ভাগ্যিস সহজে টের পায় না ছেলেরা! আদতে ওই তুর্কি হিরোর সৌন্দর্য তো এই সুন্দর দৈত্যের কাছে হার মেনে যায়। নয়ত কি আর প্রথম দর্শনেই থমকে যায় সে? কোনা চোখে তাকাল শাজ। শেহরোজ ওর দিকেই চেয়ে আছে। চোখাচোখি হতেই একটু বিব্রত হয়ে পড়ল৷ শেহরোজ হঠাৎ শান্ত স্বরে স্বীকারোক্তি দিলো তখন‚ “ইরা মির্জার সঙ্গে আমি কোনো কমিটমেন্টে যাইনি‚ শাজ৷ পাবলিকলি একটা মেয়ে ওভাবে প্রপোজ করে বসায় মোটামুটি সবাই চাইছিল যেন অ্যাক্সেপ্ট করি। তবে সবার চাওয়াতে আমি গোলাপটা নিইনি৷ মেয়ে বলেই সবার সামনে রিজেক্ট না করে আড়ালে করেছি। যাতে সে সবার কাছে উপহাস্য না হয়।”
ছলাৎ করে উঠল বুকের বাঁ পাশে শাজের৷ আকস্মিক এই স্বীকারোক্তির মানে কী? চায়ের মগটা ঠোঁটের কাছ থেকে নামিয়ে বিমূঢ় হয়ে পড়ল। রাগের বশে গতকাল কী না কী বলে দিয়েছিল। যে কথার মূল সারাংশই ছিল‚ কেন শেহরোজ ওর কথা না ভেবে ইরাকে গ্রহণ করল? তার মানে মনের অগোচরেই সে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে ফেলেছে? ইস! লজ্জায় শক্তভাবে বুজে ফেলল চোখদুটো।
“তুমি চাও তো কল করি ইরাকে আর এ ব্যাপারটা ক্লিয়ার করি তোমার সামনে?”
“না না।” তড়িঘড়ি গলায় বারণ করে শাজ অপ্রস্তুত হয়ে বলল‚ “কোনো প্রয়োজন নেই। আমি আসলে কাল রাগের মাথায় উলটো পালটা বলে ফেলেছিলাম। আই অ্যাম এক্সট্রিমলি স্যরি৷”
“রাগের মাথায় মানুষ সত্য কথায় বলে বেশি। তুমি আমাকে আসলেই উইমেনাইজার ভাবো।”
“আরে নাহ!” কী যে বলে কথাটাকে ঘোরাবে শাজ! তা ভেবে না পেয়ে মনের কথাটাই বলে দিলো সে‚ “আপনি ক্যাজুয়াল ডেটিংকে প্রায়োরিটি দেওয়া মানুষ। এটা আমার ধারণা বা বিশ্বাস বলতে পারেন।”
“আর সেটা ভুল নয়”‚ অকপটেই স্বীকার করল শেহরোজ। “আই হ্যাভ গট আনফেটারড ফ্রিডম। আই ওয়াজ ডিসিপ্লিনড আনটিল আই ওয়াজ সিক্সটিন।” এটুকু বলে চুপ হয়ে গেল শেহরোজ৷ শাজের থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে চাঁদের আলোয় ঝিকিমিকি করা পুলের পানিতে চেয়ে কথা বলল আবার‚ “আমার আব্বু মারা যান যখন আমি টুয়েলভ আর আম্মা সিক্সটিন-এ। আফটার অ্যাডাল্টহুড যে সকল মেয়ে আমার জীবনে এসেছে‚ তারা কখনো ধরে রাখতে পারেনি আমাকে আর আমিও পারিনি তাদেরকে।”
“কেন”‚ ফিসফিসানির মতো শোনাল শাজের কণ্ঠ।
“বিকজ দে ডিজার্ভ সামওয়ান বেটার দ্যান মি।”
“অদ্ভুত! এমনটা কেন?”
“শাজ।” শেহরোজ বিব্রতস্বরে বলল‚ “ডিজকমফোর্ট লাগছে এই বিষয়ে কথা বলতে। প্লিজ!”
কথাগুলো দ্বারা শেহরোজকে বিচার করা যাচ্ছিল বটে। এমন স্বভাবের পুরুষদের প্রেমিক হিসেবে মানালেও আদর্শ জীবনসঙ্গিনী রূপে বিশ্বস্ত হতে পারে না বলেই মনে করে শাজ৷ কিন্তু তবুও কিছু একটা ভিন্নতা উপলব্ধি করছিল শাজ শেহরোজের মাঝে। কথাগুলো বলার সময় তার চোখের তারায় কেমন উদাসীনতা‚ শূন্যতা কিংবা তার থেকেও বেশি একাকিত্বের ছায়া দেখতে পাচ্ছিল ও৷ আরও কি ভিন্ন কিছু ছিল এই কথাগুলোর মাঝে? থাকলেই বা সেটা কী—তা আপাতত মাথায় আসছে না শাজের৷ তবে সেই ভিন্নতার কারণেই শেহরোজকে ‘উইমেনাইজার’ অথবা ‘প্লে বয়’ ট্যাগদুটো দিতে একটু অস্বস্তি বোধই হচ্ছে ওর। “ঠিক আছে”‚ জানিয়ে শাজ জিজ্ঞেস করল‚ “আপনার দাদা-দাদীকে নিয়ে আসবেন না এখানে?”
“না। তারা আর শহরমুখী হতে চাইছে না৷ আমাকেই ফিরতে হবে তাদের কাছে৷”
“তাদের রেখে একা থাকতে আপনার ভালো লাগে?”
প্রশ্নটা শুনে শেহরোজ তাকাল। কোমল‚ আদুরে চোখে-মুখে বেদনাটুকু আড়াল করতে পারেনি শাজ৷ নিশ্চয়ই বাবা-মা‚ ভাইকে মনে পড়ছে? বলল‚ “তুমি জানো‚ শাজ৷ একা থাকাটা ভালো লাগার নয়।”
কয়েক পল শাজ তাকিয়ে রইল শেহরোজের মায়া দৃষ্টিতে। হ্যাঁ‚ এ মুহূর্তে তার চোখের ভাষাতে সেই পাথুরে কঠিন‚ নির্দয়তা অনুভব হচ্ছে না৷ কিন্তু নিজের চোখদুটো টাটিয়ে ওঠায় ঠোঁট চেপে চিবুকটা মিশিয়ে ফেলল বুকের সাথে৷ তবু পারল না নোনাপানিকে বাধ সাধতে৷ দু-তিন ফোঁটা অশ্রুকণা গিয়ে পড়ল চায়ের মাঝেই৷
ওকে কাঁদতে দেখেও শেহরোজ কিছু বলল না। সান্ত্বনা দেওয়ার সময় নয় এখন। সে অপেক্ষায় আছে শাজের মনে জমানো সকল কথা শোনার জন্য।
মিনিটখানিক পর শাজ কান্নাটুকু সামলে বলতে শুরু করল‚ “আব্বু নিজের পেশার কারণে খুব বেশি সময় পেত না আমাদের জন্য৷ আম্মুও মানিয়ে নিয়েছিল৷ কিন্তু বিপত্তি ঘটল আমাকে জন্ম দেওয়ার পরই৷ আসলে আব্বু আম্মুর বিয়েটা আম্মুর পরিবারের অমতে হয়েছিল তো। সেটা আমার ভাইয়া জন্মানোর পর কিছুটা ঠিকঠাক হলেও আমার নানা আর মামারা আব্বুর যে কোনো ব্যাপারে দোষ-ত্রুটি খুঁজে পেতই‚ অপমানও করে বসত মামারা সুযোগ পেলে৷ যে কারণে আব্বু খুব একটা যাতায়াত করত না নানাবাড়িতে৷ তাই পরবর্তীতে আম্মুও যেত না একদম। আমি জন্ম নেওয়ার সময়টাতে আম্মু তাই পুরোপুরি একা ছিল। নানি আসতে চাইলেও মামারা তাকে আসতে দেয়নি জেদ ধরে যে‚ কেন আম্মু আসবে না তাদের কাছে? এই পারিবারিক দ্বন্দ‚ আব্বুকে কাছে পেতে ইচ্ছে করলেও না পাওয়া‚ মনের কষ্টগুলো না বলতে পারা‚ সব মিলিয়ে সে মুহূর্তে আম্মু খুব ডিপ্রেশনে ভোগে। এ অবস্থার মাঝেই আমার জন্ম। তারপর যত সময় যায় ততই আম্মু খুব ভয়াবহভাবে পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনে আক্রান্ত হয়৷ ব্যাপারটা শুরুতে কেউ টের পায়নি। আব্বু ছুটিতে বাড়ি ফিরলে আব্বুর সঙ্গে ছোটো-বড়ো যে কোনো বিষয়ে ঝগড়াঝাটি শুরু করে আম্মু৷ তবে আব্বু সব সময়ই সামলে নেওয়ার চেষ্টা করত। কিন্তু দেখা গেল আব্বুর ছুটি শেষ হলেই আম্মু আবার সিন ক্রিয়েট করত নানান কথাবার্তায়। আর এর মাঝে নানাবাড়ির মানুষগুলোর উলটো পালটা কথাবার্তা‚ ব্যবহার নাকি চলছিলই। যে কারণে আব্বুর প্রতি আরও বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছিল আম্মু৷ আব্বুকে পর্যাপ্ত সময় কাছে না পাওয়া‚ বাড়ি ফিরলেও আবার ঝুট-ঝামেলা শুরু আব্বুর সঙ্গে‚ আব্বুও ঠিকমতো আম্মুকে না বুঝতে পেরে রিয়্যাক্ট করে ফেলা‚ বাবার বাড়ির মানুষকেও পাশে না পাওয়া আর এর সঙ্গে আমার বিরক্ত সহ্য না করতে পারা। সব মিলিয়ে আম্মুর অসুখটা সাংঘাতিক পর্যায়ে চলে যায়৷ যেদিন আম্মু সুইসাইড করল সেদিন সকালে আব্বুর সঙ্গে আম্মুর সব থেকে বড়ো ঝামেলা হয়েছিল৷ আম্মু কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করে বলেছিল‚ ‘তুমি হয় আমাকে বেছে নেবে আর নয়তো তোমার সেনা জীবনকে। আমাকে না বেছে নিলে আমি চলে যাব আমার বাবার কাছে।’ আব্বুও তখন রাগের মাথায় জবাব দিয়েছিল‚ ‘তুমি মূলত সেটাই চাইছ। আর শুধু শুধু আমার কর্মজীবনকে বাহানা বানাচ্ছ। আমার কাছে আমার সেনাজীবনই আগে‚ এই দেশের প্রতি আমার দায়িত্বটাই ফার্স্ট প্রায়োরিটি। তোমার যাওয়ার হলে যেতে পারো৷ কিন্তু আমার মেয়েকে নিতে পারবে না।’ এ কথা শেষেই আব্বু বেরিয়ে যায় সিলেটের উদ্দেশ্যে। আর ওই কথায় আম্মুকে কতটা আঘাত করেছিল তা এখন বুঝতে পারি। হয়ত সুস্থ থাকলে যতই কষ্ট পাক সুইসাইড করার মতো চিন্তায় করত না৷ আমি আম্মুকে একেবারে হারিয়ে ফেলেছি তা নিশ্চিত হয়েছিলাম নানাবাড়ি থাকার সময়। আব্বুকে আম্মুর মৃত্যুর জন্য দায়ী করে‚ কাকু আর ফুপুদের সাথে ঝগড়া করে মামারা আমাকে জোর করে আর জেদ করেই নিয়ে গিয়েছিল। অথচ আমার খেয়াল রাখার বেলায় কেবল নানি ছাড়া আর কেউ ছিল না৷ সে বুড়ি মানুষ বলে খুব একটা পারতও না আমাকে যত্ন করতে। না খেতে চাইলে আম্মুর মতো কেউ গল্প শুনিয়ে‚ ঘুরিয়ে নিয়ে বেরিয়ে‚ আমার পিছু পিছু দৌড়ে খাওয়ানোর চেষ্টা করত না। ওভাবেই না খেয়ে দিন কাটাতাম। রাতের বেলা খুব খিদে পেলে নানির হাতে কয়েক লোকমা খেয়ে ঘুমিয়ে যেতাম। মামা-মামিরা তাদের ছেলে-মেয়ে আর আমার মাঝে যে ভেদাভেদটা করত‚ তা যেদিন বুঝলাম সেদিনই উপলব্ধি করলাম আম্মু আর ফিরবে না—আব্বুর কাছেই আমি থাকতে চাই। তারপরই আমি আব্বুর কাছে যাওয়ার জন্য ছটফট করি‚ কান্নাকাটি করি। আর তা দেখেই নানাভাই একদিন আব্বু আর কাকুকে ডেকে আমাকে তুলে দিয়েছিল তাদের হাতে।”
“সবার মতো তুমি তখন মনে করতে না তোমার আব্বুর জন্যই তোমার আম্মু সুইসাইড করেছিল?”
“না‚ তখন আমি অবুঝ৷ তিন বছর বয়সে ওসব বিচার করার মতো বুঝজ্ঞান তো আমার ছিল না৷ আর যখন বোঝার বয়স হলো তখন তো দেখতাম আব্বু বাড়ি ফিরলে রাতের বেলা সবাই ঘুমালে সে একা একা আম্মুর শোবার জায়গায় বসে কাঁদত আর আম্মুর ছবির সঙ্গে কথা বলত‚ বারবার সেদিনের জন্য খালি ক্ষমা চাইত‚ নিজের অপারগতা স্বীকার করত আর নিজের মৃত্যু কামনা করত নৃশংস উপায়ে। যেন মৃত্যুর সময় আম্মুর ওই কষ্টটা সেও অনুভব করতে পারে। আম্মু চলে যাওয়ার পর আমার প্রতি আব্বুর টান আর ভালোবাসাও মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যায়৷ ছুটি পেলেই আমাকে নিয়ে আমেরিকা ছুটত। দেশের ভেতরও অনেক জায়গায় ঘুরেছি আব্বুর সঙ্গে৷”
“কিন্তু তিন বছর”‚ সন্দিগ্ধ শেহরোজ। “তোমার আম্মু তোমার আব্বুর ওই কথার কারণে সুইসাইড করে। তাদের সেই কনভার্সেশন তুমি শুনেছিলে অত ছোটো সময়ে। সেটা তোমার এখনো মনে থাকল‚ শাজ?”
“থাকবে না?” বিষাদপূর্ণ হাসল শাজ‚ “আমার মনে ছিল বলেই তো যখন সবাই আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল আব্বু আম্মুর ঝগড়ার কথা আর আমি তখন অবুঝ হয়ে এই কনভার্সেশন‚ ওইদিনের পুরো পরিস্থিতি তাদের জানিয়ে দিয়েছিলাম। সেটা জেনেই তারা আব্বুকে দোষারোপ করতে পেরেছিল। এমনকি…” একটু কাঁপল শাজের গলা‚ “আমার ভাইও আব্বুকে আম্মুর খুনী বলে অভিযুক্ত করে গেল সব সময়।”
শেহরোজের চেহারাতে হঠাৎ চিন্তার ছায়া নামল। ঠোঁট কামড়ে কী এক ভাবনায় পড়ল সে৷ এবং মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলো‚ আজ রাতেই খালিদ উসমানের সঙ্গে কথা বলতে হবে তার।
আপনরা ভীষণ অলস আর নির্দয়‚ বুঝলেন? ঠিকঠাক রিয়্যাক্ট‚ কমেন্ট করছেন না পড়া শেষে৷ ফেসবুক আপগ্রেডের কারণে আর আপনাদের রিয়্যাক্ট‚ কমেন্ট না করার কারণেই রিচ পাচ্ছে না গল্পটা৷ 😒

