#শেহরোজ – ২৪
#শেষাংশ_ক.
#ইসরাত_জাহান_দ্যুতি
***
সিটবেল্ট বাঁধা৷ সিটে বসিয়ে রাখলে তেমন অসুবিধা হতো না শাজের। যেদিকে ওর মাথা কাত করে দিতো‚ সেদিকে সেভাবে মাথা রেখেই ঘুমিয়ে থাকত সে। ঘুমের মাঝে ওর নড়চড় করার অভ্যাস একদম নেই। কিন্তু শেহরোজের কী হলো কে জানে! ঘুমন্ত শাজকে কোলে তুলে নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে এলো রেবেকার বাসা থেকে৷ তারপর গাড়িতে শাজকে বসিয়ে সহসা ওকে এক হাতে জড়িয়ে ধরল বুকের কাছে আর অন্য হাতে ড্রাইভ শুরু করল। কেমন যেন বিমর্ষ দেখাচ্ছিল তাকে সারা পথ।
নক্ষত্রনিবাসের সামনে গাড়িটা থামল এসে রাত প্রায় বারোটাই। পাশ ফিরে শেহরোজ দেখে শাজ ঘুমে বিভোর। হয়তো আর কিছুক্ষণের মাঝেই ঘুম ভাঙবে৷ তার আগেই ওকে ওর ঘরে পৌঁছে দেওয়া দরকার। বাসার মূল ফটক খুলে ইব্রাহীম বেরিয়ে এলো৷ তাকে দেখে শেহরোজও গাড়ি থেকে নেমে এসে চাবিটা উড়িয়ে দিলো তার দিকে। সেটা লুফে নিয়েই জিজ্ঞেস করল ইব্রাহীম‚ “কাজ হয়াছে‚ বাপ?”
সঙ্গে সঙ্গেই জবাব দিলো না শেহরোজ৷ শাজকে কোলে তুলে বের করে আনতেই ওকে ঘুমন্ত দেখে ইব্রাহীম ভাবল‚ ও বোধ হয় জ্ঞানহারা৷ চিন্তায় বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়ল সে। “কী হয়েছে শাজের? ও ঠিক আছে তো?”
“ডোন্ট ওরি”‚ ভার সুরে আশ্বস্ত করল শেহরোজ। “ঘুমাচ্ছে। আর হ্যাঁ‚ কাজ হয়েছে। গাড়িটা গ্যারেজে রেখে বেসমেন্ট যান। আসছি আমি।”
ইব্রাহীমের ভালো লাগল না কী একটা বিষয়। যাওয়ার সময় শাজকে যেমন অস্বাভাবিক গম্ভীর দেখাচ্ছিল। শেহরোজকে এখন তেমনই লাগছে আর বেশ বিষণ্নও লাগছে তার চোখের ভাষা৷ হয়েছে কী? লেন্সের বিষয়ে কি শাজ খুব বেশি সন্দেহ করেছে? ঝামেলা করেছে নাকি মেয়েটা? ধুর! এত টেনশন নিয়ে চুপ থাকা যায়? পিছু থেকে তাই জিজ্ঞেস করে বসল‚ “ও কি কিছু আন্দাজ করতে পেরেছে আপনার ব্যাপারে?”
প্রশ্নটা শুনতে পেতেই থমকে পড়ল শেহরোজ দরজার মুখে৷ কয়েক পল মৌনাবলম্বন করা শেষে ম্লান সুরে বলে উঠল‚ “করতে পারলে আমাকে ও কীভাবে নেবে‚ ইব্রাহীম ভাই?”
গত চার মাসে যে ভাবনাকে কখনো গুরুত্ব দেয়নি তা মাত্র দুদিনেই শেহরোজকে ভাবিয়ে অস্থির করে তুলছে। একটা সময়ে শাজ সকল সত্যের মুখোমুখি তো হবেই। স্বাভাবিকভাবেই মেয়েটা ভাই আর চাচার প্রতি অভিমান করবে‚ কষ্টও পাবে সব কিছু ওর থেকে গোপন করার জন্য৷ কিন্তু তার প্রতি ওর ধারণাটা কী হবে?
শাজের প্রতি মায়া অনুভব করত সে প্রথম থেকেই। মেয়েটার নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়ে এ দেশে আসার পর প্রতিটা সময় না চাইতেও ওকে নিয়ে ভাবনায় মগ্ন থেকেছে৷ কখন আর কীভাবে ওর ওপর আক্রমণ আসতে পারে‚ কীভাবে ওকে বিপদ থেকে আগলে রাখবে‚ কীভাবে ওর ভরসাযোগ্য হবে আর কী করলে কাছের মানুষের মতো তাকে বিশ্বাস করবে শাজ‚ সর্বক্ষণ এসবই চিন্তা করে গেছে সে। এমনকি কিশোর সময় থেকে হৃদয়ঙ্গম করা মায়ের পছন্দের শায়েরীগুলো এই প্রথম সে উৎসর্গ করেছে কোনো নারীকে—যে কিনা মায়েরই মতো বাঙালি। তাই সে মুহূর্তগুলোতে আপাতদৃষ্টিতে উদ্দেশ্য চরিতার্থের জন্য আবৃত্তি করলেও আদতে তা যে ওর হৃদয়ের গহিন থেকেই আবৃত্তি হতো। কারণ‚ মনে হতো তার শায়েরীর প্রতিটা পঙক্তি উৎসর্গ করার যোগ্য নিশ্চয়ই সাধারণের মাঝে লুকায়িত অসাধারণ এই বাঙালি লাবণ্যময়ী। এবং সব থেকে চমৎকৃত সত্য হলো‚ শাজকে নিয়ে প্রতিটা দিন ভাবনার জালে কবে যেন আটকা পড়ে গেছে তার হৃদয়ানুভূতিও৷ আর তা উপলব্ধি করতে অনেকটা দেরি করে ফেলল সে।
***
পুলের এক পাশ দিয়ে লোহার সিঁড়ি নেমে গেছে নিচে। সে সিঁড়ি বেঁয়েই শেহরোজ নিচে এসে বেসমেন্টে প্রবেশ করল। দরজায় নির্দিষ্ট সেকেন্ডের বিরতিতে তিনবার ঠকঠক করলে তারপর দরজাটা খোলা হলো৷ কর্নেল রাশিদ খুলেছেন। শেহরোজ তাকে দেখে জিজ্ঞেস করল‚ “আপনি এখনো যাননি ডিউটিতে?”
“আজ আকাশের ডিউটি।” হাসলেন রাশিদ‚ “ভুলে গেছেন?”
“ওহ! স্যরি‚ কর্নেল। হ্যাঁ‚ ভুলে গিয়েছিলাম”‚ বলতে বলতে ভেতরে এলো শেহরোজ।
দরজা বন্ধ করে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন রাশিদ। আজ চারটা মাসে শেহরোজের মুখ থেকে এই প্রথম ‘ভুলে গিয়েছিলাম’ কথাটা শুনলেন তিনি৷ নিশ্চয়ই তা স্বাভাবিক বিষয় নয়। কেমন যেন মলিনও লাগছে শেহরোজের চোখ-মুখ৷ কিছু নাকি হয়েছে তার‚ একটু আগে তা ইব্রাহীমও বলছিল৷ ঘটনা তবে মনে হচ্ছে বেশ গুরুতর!
বসার ঘরের বড়ো সোফা জুড়ে আইয়াজ পা ছড়িয়ে বসে আছে‚ কোলে ল্যাপটপ নিয়ে। শেহরোজকে দেখে পা গুটিয়ে নিলো সে। চুপচাপ তার পাশে এসেই বসল শেহরোজ‚ “সবাই কোথায়?”
“ইব্রাহিম ভাই আর আকাশ কিচেনে৷” বলল আইয়াজ নিস্পৃহতা নিয়ে‚ “ডিনার করছে আকাশ।”
“মেজর?”
“বেডরুমে শিফান।”
পাশ ফিরে তাকাল শেহরোজ। আইয়াজের নাখোশ চেহারাটা দেখে হাসল একটু‚ “এখনো রেগে আছ‚ ব্রাদার?”
জবাব দিলো না আইয়াজ৷ শাজের ঘুমন্ত মুখটা দেখছে নীরবে সিসিটিভি ফুটেজে। বিকালে ওরা বের হওয়ার আগে শেহরোজের সঙ্গে তার কথা কাটাকাটি হয়েছিল ভালোই। কারণ‚ শাজের খুব কাছাকাছি শেহরোজের যাওয়ার চেষ্টাটা সে কোনোভাবেই মেনে নিচ্ছে না৷ হ্যাঁ‚ সে একটা সময় চাচার কথা অনুযায়ী সবটাই মেনে নিয়েছিল শাজের ব্যাপারে৷ কারণ‚ শাজের জীবন মরণের প্রশ্ন জড়িয়ে যে। কিন্তু এ বাড়িতে আসার পর চোখের সামনে শেহরোজের কর্মকাণ্ড কেন যেন তার সহ্য হচ্ছে না আর অভিনয়ও লাগছে না শেহরোজের আচরণগুলো৷ বরং রীতিমতো শেহরোজের হাবেভাবে তার মনে হচ্ছে‚ শাজের সঙ্গে মানসিক‚ শারীরিক‚ উভয়ভাবেই ঘনিষ্ঠ হতে চাইছে সে৷ যার কোনোটাই সমর্থন দেবে না আইয়াজ কোনোদিনই।
“কী খবর‚ বাজার্ড?” সামনের সোফায় এসে বসল শেহনান শিফান। জিজ্ঞেস করল শেহরোজকে‚ “ইব্রাহীম ভাই বলছে তোমার নাকি মন ভালো নেই? হয়েছে কী?”
“নাথিং স্পেশাল”‚ কাঁধ ঝাঁকাল শেহরোজ। “সবাইকে জলদি আসতে বলো।”
“আমরা হাজির‚ ওস্তাদ”‚ হাতে খাবারের ট্রে নিয়ে এলো ইব্রাহীম আর আকাশ। টি টেবিলের ওপর শেহরোজের খাবারগুলো রাখতে রাখতে জিজ্ঞেস করল‚ “শাজের ঘুম ভাঙেনি?”
“ভাঙার তো কথা। কিন্তু দেখে মনে হলো আজ রাতে আর জাগছে না ও।”
“কেন?” আইয়াজ চিন্তিত হয়ে পড়ল মুহূর্তেই‚ “অসুস্থ হয়ে পড়েছে না-কি?”
ওর কাঁধে হাত রাখল শেহরোজ। শান্ত করতে বলল‚ “বেশ অনেকক্ষণ হিপনোটাইজ ছিল। মে বি হার ব্রেইন ইজ স্ট্রেসড। এজন্য ঘুম ভাঙতে যদি সময় লাগে, তাতে ভালোই হবে। রেবেকা গোমেজ প্রচণ্ড স্কিলড হিপনোটিস্ট। তার হিপনোটিজম থেকে বের হতে সময় লাগবে বলেছে।”
“শেহরোজ‚ আগে তুমি খেয়ে নাও। তারপর কথাবার্তা শুরু করি।” বলল শিফান।
তেমন ক্ষুধা অনুভব হচ্ছে না শেহরোজের৷ মূল প্রসঙ্গে ঢুকে পড়ল তাই‚ “কথাবার্তা শেষে খাবো। তোমাদের চিন্তাভাবনা এখন কোনদিকে যাচ্ছে সেটা জানাও একে একে।”
শাজের কথাগুলোর রেকর্ড সে ওই মুহূর্তেই সবার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিল৷ তথ্য প্রমাণের সন্ধান জানার পর সবার মাঝে ইতোমধ্যে একতরফা আলোচনা শেষ। সেটাই শেহরোজকে সবাই জানাতে শুরু করল। পরিকল্পনার শেষ ধাপে এসে শেহরোজ বলল‚ “কম্পিউটার চিপটা শাজ নিজে থেকেই আমার হাতে তুলে দেবে। সে ব্যবস্থাই করব আমি।”
“আর সেই ব্যবস্থাটা কী?” গুরুভার স্বরে প্রশ্ন তুলল আইয়াজ চকিতেই।
“কালই জানতে পারবে।”
“এখনই কেন নয়?” উত্তেজিত হয়ে পড়ল আইয়াজ‚ “আমার জানাটা জরুরি এখনই৷ এমন কোনো স্টেপ যদি নেন আপনি যেটা আমার বোনকে ইন ফিউচার হার্ট করতে পারে! সেক্ষেত্রে আমি পারমিশন দেবো না আপনাকে।”
“হার্ট করতে পারে”‚ নীর্জব চোখে চাইলো শেহরোজ‚ “এটা কোন পার্সপেকটিভ থেকে বললে তুমি?”
“ওয়েল‚ ইউ ড্র সার্টেইন বাউন্ডারিস ফর শাজ। অ্যান্ড ডোন্ট গো আউটসাইড অফ দ্যাট”‚ কিছুক্ষণ থমথমে মুখে চুপ থেকে বলে উঠল আইয়াজ কথাগুলো।
স্থিরদৃষ্টিতে শেহরোজ ওর দিকে চেয়ে রইল। তারপর সবাইকে আশ্চর্য করে সে মুচকি হেসে সায় জানাল আইয়াজকে‚ “ইউ ক্যান রেস্ট অ্যাশিওরড।”
কিন্তু সবাই-ই টের পেলো‚ শেহরোজকে কথাগুলো বেশ বিদ্ধ করেছে৷ এবং এই ব্যাপারটাতেও অবাক হয়েছে ওরা।
“আমি শাজের কাছে আগামীকাল সবটা কনফেস করব ভেবেছি”‚ সবার উদ্দেশ্যে বলে উঠল শেহরোজ। “ও আমাকে অবিশ্বাস করবে না এটা আমার বিশ্বাস। নিজে থেকেই হেল্প করবে আমাকে।” বলেই উঠে দাঁড়াল সে। তারপর আইয়াজকে জানাল‚ “তোমাকে কাল ওর মুখোমুখি হওয়ার পারমিশন দিলাম।”
“আপনি কি ইমোশনালি ট্রিগার হলেন?” জিজ্ঞেস করল ইব্রাহীম‚ “ভেবেচিন্তে কনফেস করার কথা ভাবছেন তো? না-কি আইয়াজের কথায় হার্ড-হিট হলেন?”
“ইব্রাহীম ভাই”‚ রাশভারী সুর শেহরোজের। “আমি আজ অবধি মিশনের স্বার্থে কখনো ইমোশনালি ডিসিশন নিইনি।” বলা শেষে আর দাঁড়াল না৷ না খেয়েই বেরিয়ে গেল বেসমেন্ট থেকে।
আকাশও বেরিয়ে পড়বে বাড়ির চারপাশে নজর রাখার দায়িত্ব পালনে৷ কিন্তু যাওয়ার আগে আইয়াজকে বলে গেল‚ “তুমি অভার রিয়্যাক্ট করলে‚ ভাই৷ এই পরিস্থিতিতে নিজেদের মাঝে দ্বন্দ বিরোধ সৃষ্টি করায় বিপজ্জনক। এমনকি ইমোশনাল সেন্টিমেন্টকেও গুরুত্ব দিলে বিপদ।”
এমনকি এ মুহূর্তে ইব্রাহীমের মতো রসিক মানুষও নারাজ হলো‚ “শেহরোজকে তুমি কী নজরে দেখো‚ আইয়াজ? সে কি কখনো শাজের জন্য ক্ষতিকর হবে বলে মনে করো?”
বিরক্ত হয়ে উঠল আইয়াজ‚ “আপনারা আমার জায়গাতে থাকলে একইভাবে রিয়্যাক্ট করতেন‚ ভাই। আপনারা কি খেয়াল করছেন না শেহরোজ নিজেও অ্যাট্রাকটেড শাজের প্রতি? ইন্ট্রেস্টেড সেও।”
“তাতে ক্ষতি কী‚ বাছা?” বললেন রাশিদ‚ “হি ইজ আ জেম। তাকে পাওয়ার ক্ষমতা সবার হয় না।”
“হি ইজ আ জেম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড অফ এসপিওনাজ। তার নিজের দেশের জন্য সে জেম। কিন্তু আমার বোনের জন্য সে সত্যিই সঠিক নয়‚ আঙ্কেল। আমি কোনোদিনই চাইবো না তার মতো কোনো পুরুষ আমার বোনের সঙ্গী হোক। যার জীবনের কোনো নিশ্চয়তা নেই সে কী করে আমার বোনের জন্য ব্লেসিং হতে পারে?”
উপলব্ধি করল সবাই—আসলেই তো তাই। ভাইয়ের জায়গা থেকে আইয়াজের সিদ্ধান্তে কোনো ভুল নেই৷ শিফান তাই সমর্থন করল ওকে‚ “তুমি একদম ঠিক আছ‚ ভাই। শাজ ডিজার্ভস আ নাইস নরমাল লাইফ।” একটু হাসল তারপর‚ “তবে শেহরোজ হচ্ছে সেই রত্ন‚ যাকে পেলেও ধারণ করার ক্ষমতা সবার থাকে না৷”
শেষ কথাটাই আইয়াজও সমর্থন করতে বাধ্য হলো৷ আর শিফানকে বলল‚ “আমার কথাতে তুমিও নিশ্চয়ই কষ্ট পেলে! আব্বুর পছন্দের মানুষ ছিলে তুমি৷ শাজকে তোমার হাতেই তুলে দিতো সে। কিন্তু এখন তো পরিস্থিতি বদলে গেছে। তুমিও খুব শীঘ্রই ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি ইনটেলিজেন্সের একজন হয়ে যাবে। আমি আমার বোনটাকে সত্যিই হাসিখুশি‚ স্বাভাবিক জীবনে দেখতে চাই।”
“আর তোমার চাওয়াকে আমি অ্যাপ্রিশিয়েট করছি”‚ মুচকি হেসে বলল শিফান।
বিনিময়ে আইয়াজও ছোট্ট করে হাসি ফিরিয়ে দিয়ে চলে গেল শোবার ঘরে। সে মুহূর্তে ইব্রাহীম আহত গলায় বলে উঠল‚ “সিরিয়াসলি শেহরোজ ইজ ইন লাভ উইথ হার! আই নেভার ইমাজিনড ইট উড হ্যাপেন।”
“কিন্তু আমি অবাক হচ্ছি না”‚ হাসতে হাসতে বলল শিফান। “শাজের প্রতি ও ফল করছে এটা আমার সব সময়ই মনে হত।”
“আমারও”‚ সহমত প্রকাশ করলেন রাশিদ। “কারণ‚ ওর কথাবার্তাতে বুঝতে পারতাম বাঙালি সুন্দরী নারীদের প্রতি ওর এক বিশেষ দুর্বলতা আছে।”
“হ্যাঁ”‚ সায় দিলো শিফান৷ “এ কারণেই। ওর মায়ের জন্যই হয়তোবা।”
“কিন্তু আমি এসব ভাবছি না।” ইব্রাহীম মন খারাপের সুরেই বলল‚ “ও যদি কনফেস করে শাজের কাছে সবটা। শাজও কি আইয়াজের মতোই ব্যবহারটা করবে না ওর সাথে? এটা ভেবেই আমার ওর জন্য কষ্ট হচ্ছে।”
দীর্ঘশ্বাস ফেলল শিফান‚ “কালকে অনেক কিছুই ঘটবে‚ ইব্রাহীম ভাই।”
***
ভোর পাঁচটা।
প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে শাজ চোখ মেলেছে। কোনোরকমে ফ্রেশ হয়েই ঘর থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরে ছুটে এসেছে পেটের ছুঁচোটাকে থামানোর জন্য। ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে গরম করতে করতে কালকের কথা ভাবতে শুরু করল। রেবেকা গোমেজের বাড়ি থেকে কী হলো আর কখন‚ কীভাবে নিজের বাড়ি এসে পৌঁছলো কিছুই তো বুঝতে পারছে না সে। শেহরোজকে জিজ্ঞেস করতে হবে।
খাওয়াদাওয়ার পর্ব চুকিয়ে এক মগ কফি নিয়ে রওনা হলো সে ছাদে। গতরাতের ঘুমটা এত ভালো হলো যে কী করে! সেটাও বুঝছে না সে৷ এসব ভাবতে ভাবতে এসে ছাদে পৌঁছলো আর মুহূর্তেই হৃৎস্পন্দন এক পলের জন্য থেমে গেল ওর৷ এত দ্রুত গতিতে কোনো ছেলেকে পুশ আপ দেওয়া সামনাসামনি এই প্রথমই দেখল শাজ।
ছাদের মৃদু নীলচে আলোটা এখনো জ্বলছে। তার মানে শেহরোজ অনেকক্ষণ ধরেই ব্যায়ামে মগ্ন৷ কিন্তু সবে পাঁচটা। এত ভোরে কেউ ব্যায়াম করে? পরনে কেবল কালো স্পোর্টস ট্রাওজার—গা আবরণশূন্য। শাজ মন্থর পায়ে এগিয়ে এলো। শেহরোজের পেছনে এসে দাঁড়াল চুপচাপ। ঘামে চিকচিক করছে সারা শরীর। কতক্ষণ ধরে ব্যায়াম করছে এই ছেলে? ও চুপিচুপি দাঁড়িয়ে থেকেই গুণে ফেলল বিশবার পুশআপ দেওয়া শেষ। তারপরই থেমে পড়ল শেহরোজ। ওকে চমকে দিয়ে না ফিরেই বলে উঠল‚ “শাজ‚ চেয়ার থেকে টাওয়ালটা আনবে প্লিজ?”
“আরে!” বিস্মিত হলো শাজ‚ “কীভাবে বুঝলেন আমার উপস্থিতি?” কথার মাঝেই তোয়ালেটা আনল সে। শেহরোজ উঠে এসে ওর মুখোমুখি দাঁড়ালে বাড়িয়ে দিলো তোয়ালে।
শরীরটা মুছতে মুছতে নীরবে‚ নিষ্পলক চেয়ে রইল শেহরোজ ওর মুখটাতে। জবাবের আশায় শাজ আবারও জিজ্ঞেস করবে ঠিক তখনই ওকে বলল সে‚ “আমার কিছু কথা আছে‚ শাজ। সবটা শোনার পর তুমি যা বলবে আমি তাই শুনব এবং মানব৷ বাট ইউ মাস্ট লিসেন টু মি কমপ্লিটলি। অ্যাগ্রি?”
শেহরোজের চোখের ভাষা এই মুহূর্তে শাজ খুব ভালোভাবে পড়তে পারছে কী করে যেন। খুব গুরুতর কিছু ঘটেছে—তা প্রকাশ পাচ্ছে শেহরোজের চোখে৷ আর সেটা কি গতকালই ঘটেছে রেবেকা গোমেজের বাসা থেকে? সে বলে ফেলেছে সব? বুক ধড়ফড় আরম্ভ হলো শাজের‚ “কী কথা?”
“আমি আরও কিছু বলেছি তোমাকে”‚ নিস্পৃহ স্বর শেহরোজের।
স্নায়ু দুর্বলতায় গলা শুকিয়ে এসেছে মনে হলো শাজের৷ “আই অ্যাগ্রি”‚ ঢোঁক গিলে বলল।
ওর হাতটা ধরে শেহরোজ চেয়ারে এনে বসাল ওকে। আর সে বসল নিচে ওর পায়ের কাছে এক হাঁটু ভেঙে। শাজের হাতটা জড়িয়ে ধরেই রাখল নিজের দু হাতের মুঠোতে৷ “তোমাকে অনুভব করতে তোমার রোজ স্মেইলই যথেষ্ট আমার জন্য।” বলার পর কোমল হাতের পিঠে ঠোঁটটা ছোঁয়াতে গিয়েও থেমে পড়ল সে। প্রলম্বিত শ্বাস ফেলল নিজের সীমাবদ্ধতা মনে করে। সস্নেহে বলল শুধু‚ “আমার জন্য তোমার ফিলিংস আমি কখনো জানতে চাই না। তুমি বলতে চাইলেও না। কারণ‚ আমি তা অনুভব করতে পারি। কিন্তু…”
“ডু ইউ ওয়ান্ট টু কনফেস ইয়োর ফিলিংস অ্যাগেইন?” একটু আগের রক্তশূন্য চেহারাটা ধীরে ধীরে লালিমা বর্ণ ধারণ করতে থাকল শাজের।
শেহরোজের কথা মাঝপথেই থেমে গেছে এ প্রশ্নে। শাজের লাজুক হয়ে ওঠা মুখটা দেখে ‘না’ বলতে দ্বিধা হচ্ছে খুব৷ যে প্রসঙ্গে আস্তে আস্তে প্রবেশ করতে চাইছিল সে‚ তাও ভুলে যেতে মন চাইছে এ মুহূর্তে। সবটা জানার পর এমন মুখটা দেখার সুযোগ আর ভাগ্য আর কি হবে তার? না‚ হবে না৷ তাই শেষবারের মতো সীমা লঙ্ঘন করল সে৷ আইয়াজের নিষেধাজ্ঞাকে অবমাননা করল শাজের ডান হাতের পৃষ্ঠে গাঢ়ভাবে ঠোঁট ছুঁইয়ে। শাজ বোধ হয় তার আকস্মিক এ কাণ্ডে একটু চমকে উঠল। যার ফলে কেঁপে উঠল ওর হাতটা।
#নোট__ নীরব পাঠক‚ এই শেষ দুই পর্বে অন্তত মন্তব্য রেখে যেয়েন।

