অবাধ্য_হৃৎস্পন্দন (৬৩) #সোফিয়া_সাফা

0
51

#অবাধ্য_হৃৎস্পন্দন (৬৩)
#সোফিয়া_সাফা

সকাল সকাল ঘুম ভেঙে উদ্যান অবচেতন মনেই পাশে হাতড়াতে লাগল। কিন্তু তার কাঙ্ক্ষিত সেই নরম শরীরটা খুঁজে পেল না। ঝট করে চোখ মেলে দেখল বিছানা খালি; ফুল পাশে নেই। তন্দ্রাচ্ছন্ন কণ্ঠে সে ডাকল, “ফ্লাওয়ার হোয়ার আর ইউ? ওয়াশরুমে গেছিস?”

​কোনো উত্তর এল না। উদ্যান শরীরটাকে টেনে আলসেমি করে গড়িয়ে এল ঠিক সেই জায়গায়, যেখানে ফুল শুয়ে ছিল। বালিশে নাক ঘষে গভীর এক শ্বাস নিয়ে বিড়বিড় করল, “দিজ স্মেল… ইটস স্টিল হেয়ার।”

সে কিছুক্ষণ গড়াগড়ি খেয়ে উঠে বসল৷ ওয়াশরুমের দরজাটা বাইরে থেকে লাগানো দেখে তার তন্দ্রা এক নিমেষেই ছুটে গেল।
বিছানা ছেড়ে প্রথমেই চলে গেল ক্লোজেটে, কিন্তু ফুল সেখানে ছিল না। নিজেকে ধাতস্থ করে সে এরপর ফিটনেস স্টুডিও চেক করল, তারপর পা বাড়াল স্টাডি রুমের দিকে। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই তার নজরে এলো; ফুল একটা বুকশেলফের সামনে জড়োসড়ো হয়ে মেঝেতে বসে আছে।

ফুলের দেখা পেয়ে ঠোঁট প্রসারিত হলো দানবটার। মেয়েটার গায়ে উদ্যানের সাদা শার্ট। ভোরবেলা গোসল সেরে উদ্যান তাকে সেটা পরিয়ে দিয়েছিল। শার্টটা লম্বায় হাঁটু পর্যন্ত হওয়ায় প্যান্ট পরার প্রয়োজন হয়নি। যার কারণে শার্টের নিচ দিয়ে ফুলের সরু পা দুটো দৃশ্যমান। উদ্যানের গায়েও সাদা শার্ট আর ব্রাউন রঙের বড়সড় ঢিলেঢালা ট্রাউজার; যাকে বলা হয় ব্যাগি প্যান্টস। দুই পকেটে হাত গুঁজে সে ধীরলয়ে ফুলের দিকে এগোতে লাগল। স্টাডি রুমে তখন এক অদ্ভুত স্তব্ধতা, আর সেই স্তব্ধতা ভেঙে উদ্যান গেয়ে উঠল:

“আইম ইন লাভ উইথ দ্য শেপ অফ ইউ
উই পুশ অ্যান্ড পুল লাইক আ ম্যাগনেট ডু
অলদো মাই হার্ট ইজ ফলিং টু
আইম ইন লাভ উইথ ইয়োর বডি…”

গানটা শুনে ফুল মুখ তুলে তাকাল। তার চোখের দিশেহারা অভিব্যক্তি দেখে উদ্যান ভ্রু কুঁচকে শুধাল, “এখানে কী করছিস?”

ফুল কথা না বলে পিছিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু পারল না। ঝড়ের বেগে এগিয়ে গিয়ে উদ্যান তাকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই উদ্যানের চোখ পড়ল টেবিলের ওপর থাকা লাল রঙের বইয়ের ওপর; ‘The 48 Laws of Power’। মনে পড়ে গেল গতরাতে সে এই বইটাই পড়ছিল। তখনই অ্যালেক্স জানিয়েছিল ফুল এসেছে। সে হয়তো তাড়াহুড়োয় বইটা বন্ধ করতেও ভুলে গিয়েছিল।
উদ্যান ফুলকে কোলে নিয়েই টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। বইটা খোলা ছিল Law 8 এর পাতায়। সেখানে মার্কার দিয়ে লাইনের নিচে দাগিয়েও রাখা আছে।

উদ্যান ফুলের বিবর্ণ হয়ে যাওয়া ফ্যাকাশে মুখটার দিকে তাকিয়ে বরফশীতল কণ্ঠে প্রশ্ন করল, “পড়েছিস?”

ফুল কোনো উত্তর দিল না, শুধু উদ্যানের শার্টের কলারটা খামচে ধরল। তার ঠোঁটদুটো থরথর করে কাঁপছে। উদ্যান বইটার দিকে একপল তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। সে নিচু স্বরে ফুলের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “যা পড়েছিস ভুলে যা। লেট মি হেল্প ইউ টু ফরগেট দিস অল।”

হঠাৎই উদ্যান টেবিলের ওপর রাখা সবগুলো বই এক ঝটকায় মেঝেতে ছুড়ে ফেলল। বইগুলো আছড়ে পড়ার শব্দে ফুল আতঙ্কে কেঁপে উঠল। উদ্যান তাকে টেবিলের ওপর বসিয়ে দিয়ে প্রবল আক্রোশে তার ঠোঁটজোড়া কামড়ে ধরল।

ফুল চোখ বুজে ফেলল। উদ্যানের প্রতিটি স্পর্শে মনে হচ্ছে সে যেন ফুলকে পিষে নিজের সত্তার সাথে মিশিয়ে নিতে চাইছে। সে ফুলের এতটা গভীরে হারিয়ে গেল যে, কয়েক মিনিটের মধ্যেই যন্ত্রণায় আর মানসিক চাপে ফুল জ্ঞান হারাল। উদ্যান তবুও থামল না, অবশ্য পুরোপুরি স্যাটিসফাই না হওয়া পর্যন্ত থামেও না সে। প্রায় ঘন্টা দুয়েক পর, উদ্যান ফুলের নিথর শরীরটা ওয়াশরুমে নিয়ে গিয়ে দরজা লক করে দিল।

বিকালে ফুলের জ্ঞান ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই উদ্যান ডাক্তারকে তলব করে। ফুলের বিধ্বস্ত দশা দেখে ডাক্তার নিজেও মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। মেয়েটার ফ্যাকাশে মুখ আর শরীরের নীলচে দাগগুলো বলে দিচ্ছে, সে কেবল শারীরিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও ধ্বংস হওয়ার শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।

ডাক্তার যখন ফুলের রক্তচাপ পরীক্ষা করছিলেন, উদ্যান গ্লাসে পানি ঢালতে ঢালতে আড়চোখে তাকাল।
“ওভাবে ওর দিকে তাকিয়ে আছেন কেন? লাস্ট ওয়ার্নিং দিচ্ছি আপনাকে। নিজের দৃষ্টি সংযত করুন।”

ডাক্তার ভয় মেশানো অস্বস্তি নিয়ে দ্রুত চোখ সরিয়ে নিলেন। তিনি ফুলকে কিছু ওষুধ খাইয়ে দেওয়ার পর উদ্যান নিজেই আগ বাড়িয়ে বলল, “ওকে রেগুলার পিল খাওয়ার নিয়মটা ভালো করে বুঝিয়ে দিন।”

তার এহেন কথা শুনে ডাক্তার খানিক অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। কারণ তিনি তাড়াহুড়োয় চশমাটা ফেলে রেখেই চলে এসেছেন। এখনকার ঔষধ গুলো আগে থেকেই গুছিয়ে রাখা ছিল বলে সমস্যা হয়নি। কিন্তু এখন ব্যাগ থেকে সঠিক ঔষধ বের করতে গিয়ে তাকে বেগ পেতে হবে। উদ্যান তীক্ষ্ণ চোখে তার প্রতিটা নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করছিল। ডাক্তার কোনোমতে ব্যাগ হাতড়ে ওষুধ বের করে ফুলকে বুঝিয়ে দিয়ে হাফ ছেড়ে বাঁচলেন।
তারপর চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে দরজার দিকে পা বাড়াতেই উদ্যানের শক্ত কণ্ঠ ভেসে এলো, “জিনিসপত্র গুছিয়ে নিন। আপনার মেক্সিকো যাওয়া কনফার্ম হয়ে গেছে।”

ডাক্তার বুঝে গেলেন উদ্যান খেয়াল করেছে সে চশমা ফেলে রেখে এসেছে। উদ্যান কাজের ক্ষেত্রে খুবই স্ট্রিক্ট। তাই তার সামান্য ভুলটুকুও সে মেনে নিতে পারেনি। উপরে উপরে নাখোশ হওয়ার ভান করলেও ভেতরে ভেতরে খুশিই হলেন ডাক্তার। এখানে উদ্যানের কাছে ডিউটি করার চেয়ে মেক্সিকোতে ফিরে বাড়তি কাজ করাও ভালো। আগে তো কখনো উদ্যানের প্রয়োজনই হতো না তাকে, দেশে আসার পর থেকেই উদ্যানের বিশেষ প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছেন। কারণটা হলো ফুল। অবশেষে তিনি এখন একটু রিলিফ ফিল করলেন।

ডাক্তার চলে যাওয়ার পর উদ্যান নিজে সব মেডিসিন চেক করে দেখল। তাকে এমন করতে দেখে ফুল বেশ বুঝে গেল উদ্যান কোনোপ্রকারেই চায় না; ফুল প্রেগন্যান্ট হয়ে যাক। এই উপলব্ধি ফুলের মাঝে অবশিষ্ট থাকা অনুভূতিগুলোকে এক নিমিষেই ফিকে করে দিল।
,
,
,
“মাস্টার আপনি মেয়েটাকে নিজেদের সাথে করে নিয়ে যেতে চাইছেন?” সাইকিয়াট্রিস্ট সায়মনের প্রশ্নে উদ্যান নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে সিগারেটে লম্বা টান দিল। ধোঁয়া ছেড়ে দিয়ে নিস্পৃহ গলায় বলল, “ওহ-হো আমি চাইছি না, মেয়েটা নিজেই যেতে চাইছে আমাদের সাথে।”

সায়মন ভ্রু কুচকে তাকাল, “দেখুন মাস্টার আমাদেরও প্ল্যান ছিল মেয়েটাকে আপনি সাথে সাথেই রাখবেন। কষ্ট দেবেন, যন্ত্রণা দেবেন। কিন্তু পরবর্তীতে সামনে এলো মেয়েটার সবচেয়ে বড় ভয় হচ্ছে আপনাকে হারিয়ে ফেলা। তো সেই প্রেক্ষিতেই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম মেয়েটাকে ফেলে রেখে চলে যাবেন আপনি। তাহলে হঠাৎ সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ আসছে কেন?”

উদ্যান এবার বিরক্ত হলো। সিগারেটটা জুতোর নিচে পিষে ধরে খিটখিটে মেজাজে বলল, “আমি বলেছি ও যেতে চাইছে। আমি ওকে নিয়ে যাবো তা তো বলিনি।”

“তাহলে কী বলেছেন মেয়েটাকে?”

“কিছুই বলিনি।”

সায়মন দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “মাস্টার আপনি কেন যে দেরি করছেন বুঝতে পারছি না। উপরন্তু আপনি প্রতিনিয়ত মেয়েটার সাথে রাত কাটাচ্ছেন।”

উদ্যান অন্যদিকে তাকিয়ে বলল, “ডোন্ট ওয়ারি। আমি দুর্বল হয়ে পড়বো না। কারণ ও নিজেই প্রতিরাতে আমার কাছে আসে, আমি যাইনা। আর তুই তো বলেইছিলি এটা জাস্ট ‘ফিজিক্যাল অ্যাট্রাকশন’। আর এই ধরনের অ্যাট্রাকশন তো ক্ষণস্থায়ী হয়, তাই না?”

সায়মন জাস্ট কথা হারিয়ে ফেলল। উদ্যান ত্যাড়া চোখে তাকাল তার দিকে। আবারও আত্মপক্ষ সমর্থনে বলল, “আমি ওর কাছে গেলে সেটা আমার দুর্বলতা হতো বাট ও যেহেতু আমার কাছে আসে সেহেতু এটা ওর দুর্বলতা, আমার নয়।”

সায়মন বিড়বিড় করল, “হ্যাঁ মাস্টার, বুঝেছি।”
,
,
,
উদ্যান খাটের ওপর আধশোয়া হয়ে বসে ফোন টিপছে আর বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছে। এর মাঝে একবার ঘড়িতে নজর বুলিয়ে দেখল; এখন রাত সাড়ে বারোটা, উদ্যান ভেতরে ভেতরে অস্থিরতা অনুভব করল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “কী এমন কাজ করছে, যে এখনো আসার সময় পাচ্ছে না? উহ, মনে হচ্ছে রাতের বেলা অন্যান্য কাজগুলো ওকে দিয়ে আর করানো যাবে না।”

অধৈর্য হয়ে ধুপধাপ পা ফেলে দরজার সমুখে আসতেই উলটো দিক থেকে আসা ফুলের সাথে ধাক্কা লেগে গেল তার। সামলাতে না পেরে ফুল পড়েই যাচ্ছিল, কিন্তু উদ্যান ক্ষিপ্রতার সাথে তার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিল। ফুলকে বুকে পেয়ে একটু শান্ত হলো উদ্যান। তাকে সেভাবেই চেপে ধরে রুমে ঢুকে দরজা আটকে দিল।
প্রতিদিনকার মতো অ্যালেক্সকে ‘শাট ডাউন’ হওয়ার নির্দেশ দিয়ে ফুলের দিকে তাকাল সে। মেয়েটা তখনও গুটিসুটি মেরে তার বুকের সাথে লেপ্টে ছিল।

“কী করছিলি এতোক্ষণ?” উদ্যান তাকে ছেড়ে দিয়ে খানিকটা রুক্ষ স্বরে প্রশ্নটা করল।

​ফুল ধীরপদে পিছিয়ে দাঁড়াল। লাইটের শুভ্র আলোয় তাকে আপাদমস্তক দেখে নিয়ে উদ্যানের চোখের মনি স্থির হলো। ফুল আজ শাড়ি পরেছে, সেই লাল বেনারসিটা যেটা সে বিয়ের দিন পরেছিল।
উদ্যান মোহগ্রস্তের মতো ফুলের দিকে এগোতে নিলে ফুল তার প্রশস্ত বুকে হাত ঠেকিয়ে থামিয়ে দিল। চিবুক উঁচিয়ে ম্লান কণ্ঠে প্রশ্ন করল, “এই শাড়িটাতে কেমন লাগছে আমায়?”

উদ্যান দৃষ্টি নামিয়ে ফুলের হাতের দিকে একবার তাকাল, মেয়েটা চুড়ি পরে সাধারণত তার কাছে আসেনা। আজ এসেছে, গাঢ় লাল রঙের চুড়িতে তার ফর্সা হাতজোড়া মাখনের মতো মসৃণ দেখাচ্ছে। উদ্যান ফের ফুলের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে ঘোরলাগা কণ্ঠে বলল, “খুবই লোভনীয় লাগছে তোকে।”

ফুলের শরীর শিরশিরিয়ে উঠল। কাজল কালো চোখে বিদ্রুপের হাসি ফুটিয়ে বলল, “আমি কোনো ভোগ্যপণ্য নই যে লোভাতুর চোখে দেখছেন।”

উদ্যান আচমকা তাকে দুহাতে নিজের কাছে টেনে নিল। গালে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, “প্রতিদিন ভোগ্যপণ্যে পরিণত হয়েই তো আমার ক্ষুধা মেটাচ্ছিস। তবুও সেটা অস্বীকার করলি কোন মুখে?”

ফুলের চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠল। উদ্যান সেই আর্দ্র চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করল, “এতো সেজেছিস কেন?”

“ইচ্ছে হলো তাই।”

“ম’রে যাওয়ার ইচ্ছে হয়েছে? এমনিতেই তো অর্ধেক বেলা সেন্সলেস হয়ে পড়ে থাকিস।”

“হুম মে’রে ফেলুন আমায়।”

“তুই নিজে কেন ম’রছিস না? সুই`সা`ইড করার পরামর্শ তো তোকে আগেই দিয়েছি।”

ফুল ম্লান হাসল, “চেষ্টা করেছি কয়েকবার, মন সায় দিচ্ছে না। আপনি বলেছিলেন না আমার মন আমাকে আ`ত্মহ`ত্যা করতেও দেবেনা, সেটাই হচ্ছে। আমি না পারছি বাঁচতে, আর না পারছি ম’রতে।”

উদ্যান অজান্তেই একবার ঢোক গিলল। তবুও নিজেকে ভাবলেশহীন দেখিয়ে বলল, “তুই ম’রে গেলে আমি শান্তি পেতাম।”

“আমার অবর্তমানে আপনার সব শান্তি অশান্তিতে পরিনত হোক।”

“অভিশাপ দিচ্ছিস?”

“দিচ্ছি।”

“আমি জানতাম তুই কারো সুখশান্তি সহ্য করতে পারিস না; বিশেষ করে আমার। তুই আসলেই একটা ডাইনী।”

ফুল হেসেই উড়িয়ে দিল। উদ্যান একটু ভড়কে যেতেই সে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দৌড়ে অন্যদিকে চলে গেল। উদ্যান নির্লিপ্ত চোখে তাকাতেই ফুল নিজের চুলগুলো বাধনমুক্ত করে ঠোঁট কামড়ে কাছে যেতে ইশারা করল। উদ্যান ঘাড় কাত করে তাকাল, ফুলের পরনের লাল বেনারসির ফাঁক দিয়ে তার ফর্সা কোমর উঁকি দিচ্ছে।

উদ্যানকে একভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ফুল খাটের ওপর একপা রেখে শাড়িটা উঁচু করে তার আলতা রাঙা পা উন্মুক্ত করে দিল। তারপর বেশ অনেকটা ঝুকে আবেদনময়ী অঙ্গভঙ্গি করতে লাগল। উদ্যান আর নিজেকে দমিয়ে রাখতে পারল না, ছুটে গিয়ে ফুলকে খাটের সাথে পিষে ধরল। হিংস্র প্রানীর মতো হামলে পড়ল তার ওপর। এরইমধ্যে ফুলের হাতের কাঁচের চুড়িগুলো উদ্যানের হাতের বলিষ্ঠ চাপে পিষ্ট হয়ে মড়মড় শব্দে ফ্লোরে ভেঙে পড়ল, কতগুলো ভাঙা কাঁচের টুকরো ফুলের নরম চামড়া ভেদ করে ভেতরেও ঢুকল।

ঘড়ির কাটায় রাত তিনটা। উদ্যান একমনে ফুলের হাতে অয়েন্টমেন্ট লাগিয়ে দিচ্ছে। আর ফুল অপলক চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে।

“চুড়ি পরে আসবি না আর।” বলতে বলতেই উদ্যান তাকাল ফুলের দিকে। ঘাড়ের দিকে ইশারা করে বলল, “তোকে যেই মেডিসিন দিয়েছিলাম লাগাচ্ছিস না ঠিকমতো? আগের হিকি গুলো এখনো মিলিয়ে যায়নি কেন?”

ফুল মাথা নামিয়ে ভালোভাবে শুয়ে বলল, “হিকি নয়, লাভ বাইট বলুন। আই লাভ দেম।”

উদ্যান ছোট্ট করে শ্বাস ফেলে বলল, “আগের দাগগুলো না গেলে নতুন করে বসাবো কোথায়?”

“কক্সবাজারের সেই রাতে আপনি গিয়েছিলেন আমার কাছে, তাই না?”

উদ্যান শুনেও শুনল না, ফুল যোগ করল, “ওই মেডিসিনের কারণেই সকালে উঠে আমি দাগগুলো খুঁজে পাইনি? আচ্ছা আপনি আমাদেরকে অতো তাড়াতাড়ি খুঁজে পেয়েছিলেন কীভাবে? আর খুঁজে পেয়েও কেন তক্ষুণি তুলে আনেন নি?”

“হারিয়ে যাওয়া জিনিস খুঁজে পাওয়ার অনেক উপায় জানা আছে আমার, আর সঙ্গে সঙ্গেই তুলে আনিনি কারণ ভালোমানুষির অভিনয় করা শিখতে সময়ের প্রয়োজন ছিল।”

“আপনি ক্যামেরা লাগিয়ে রেখে এসেছিলেন তাই না?”

“হুম, তো অন্য একটা ছেলের সাথে থাকবি আর ক্যামেরা লাগাবো না? তাছাড়াও তোর আচরণ গুলো অবজার্ভ করার দরকার ছিল।”

ফুল একটু নীরব থেকে বলল, “মেডিসিন টা সত্যিই জাদুর মতো কাজ করে, তবুও আপনি নিজের পিঠের দাগগুলোয় লাগাচ্ছেন না কেন?”

উদ্যান অয়েন্টমেন্ট টা বেডসাইড টেবিলে রেখে ফুলের গা ঘেঁষে শুয়ে পড়ল। বিড়বিড়িয়ে বলল, “আমি চাইনা দাগগুলো মিটিয়ে দিতে, কারণ সেগুলো আমাকে মনে করিয়ে দেয় যে তুই আমার শত্রু।”

ফুলের ঠোঁট কেঁপে উঠল কিছু বলার জন্য, কিন্তু উদ্যান তাকে সেই সুযোগ দিল না। সে আবার মত্ত হয়ে উঠল ফুলের শরীরটাকে ছিন্নভিন্ন করে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে।
,
,
,
ভোর ছয়টা, ফুলকে গোসল করিয়ে খাটে শুইয়ে দিল উদ্যান। তারপর নিজে চলে গেল ক্লিন হতে। বিশ মিনিট পর সে পাশে এসে বসল ফুলের। ভালোভাবে কমফোর্টার দিয়ে ফুলের শরীরটা ঢেকে দিল। যদিও ফুলের গায়ে জামা আছে। বিশেষ প্রয়োজনে কয়েক সেট জামা-কাপড় উদ্যান রেখে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিল।

উদ্যান ভাবল ফুলের সেন্স নেই, তাই সে পাশ ফিরে শুয়ে ফুলকে দেখতে লাগল। এতোকিছুর পরেও কীভাবে মেয়েটাকে এতোটা সুন্দর দেখাতে পারে ভেবে পেল না। সে অবচেতন মনেই ফুলের ভেজা চুলে মুখ ডুবিয়ে দিয়ে এক হাতে তাকে জাপ্টে ধরল। ঠিক তখনই ফুল আধো-বোজা চোখে অস্পষ্ট স্বরে বলল, “আমাকে নিয়ে কবে ফিরবেন মেক্সিকোতে?”

উদ্যান চমকে উঠল। ফুলের কণ্ঠ শুনেই তার ভেতরকার সেই কোমলতা নিমেষেই উধাও হয়ে গেল। সে ঝট করে দূরত্ব বাড়িয়ে দিয়ে প্রসঙ্গ পাল্টে বলল, “আজ এতো তাড়াতাড়ি সেন্স ফিরে এলো? খুব ভালো, তুই আস্তে আস্তে মানিয়ে নিতে পারছিস।”

“আমি আপনার সাথেই থাকতে চাই তেহজিব। আমাকে রেখে কোথাও যাবেন না।”

উদ্যান কোনো উত্তর দিল না। ফুলের চোখের কোণে জল জমে উঠল। ভেজা কণ্ঠে বলল, “আজ অন্তত চুপ করে থাকবেন না।”

মুহূর্তেই উদ্যানের মেজাজ বিগড়ে গেল। খেঁকিয়ে উঠে বলল, “আমি তোকে কোথাও নিয়ে যাবো না। আর বড়জোর কয়েকটা দিন, আ’ম ড্যাম শিওর তারপর আর তোকে ভালো লাগবে না আমার। তুই যেচে পড়ে কাছে এলেও আমাকে আকৃষ্ট করতে পারবি না।”

ফুল বিছানায় উঠে বসলো, “তখন কি আপনি ফ্লোরার কাছে যাবেন?”

উদ্যান গর্জে উঠল, “হ্যাঁ, যাবো! যাকে ভালো লাগবে তার কাছেই যাবো। একই খাবার কতোদিন খেতে ভালো লাগবে?”

কথাটা ফুলের বুকে ছুরির মতো বিঁধল। সে শারীরিক যন্ত্রণা উপেক্ষা করে উদ্যানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তার শার্টের কলারটা শক্ত করে চেপে ধরে চেঁচিয়ে বলল, “আমি তোর ভালোলাগার জিনিস চায়ের মতো নই। আমি পানির মতো, ভালোলাগার জন্য নয় বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয়।”

উদ্যান এবার হিতাহিতজ্ঞান হারিয়ে ফেলল। সে এক ঝটকায় ফুলকে বিছানার অন্যপ্রান্তে ছুড়ে মারল।
“তোকে ফেলে রেখে গিয়ে আমি বুঝিয়ে দেবো তুই চায়ের মতোও নোস এবং তোর প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়েছে। হ্যাঁ, আজই ফিরে যাবো আমি।”

ফুলের চোখের বাধ ভাঙলো। শব্দ করে কেঁদে উঠল মেয়েটা। উদ্যান তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে দাঁত খিঁচে বলল, “বের হ আমার রুম থেকে।”

বলেই উদ্যান চেপে ধরল ফুলের কবজি। ব্যাথায় গুমরে উঠল ফুল। ভাঙা গলায় বলল, “ক্ষমা করে দিন, ভুল হয়ে গেছে। আমি আর কখনো নিজেকে প্রয়োজনীয় দাবি করবো না। শুধু আমাকে ফেলে রেখে চলে যাবেন না। আমি আপনার কাছে অপ্রয়োজনীয় হলেও আপনি আমার কাছে খুব প্রয়োজনীয়।”

উদ্যান তার কথায় কর্ণপাত করল না। ফুলকে টেনেহিঁচড়ে নামাল খাট থেকে। খাটের বাইরে পা রাখতেই ফুল ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। উদ্যান তাকে কাঁধে তুলে নিয়ে দরজার দিকে রওনা হয়। তারপর বাইরে বসিয়ে রেখে সশব্দে দরজাটা লাগিয়ে দেয়।

ফুলের শরীরে উঠে দাঁড়ানোর মতোও শক্তি অবশিষ্ট ছিল না। সে হাঁটুতে মুখ গুজে কাঁদতে লাগল। তখনই অনুভব করল কেউ একজন তার পাশে এসে বসেছে।

“তেহ তোমাকে মে’রেছে?” সোহমের কণ্ঠ শুনে ফুল মাথা নাড়ল। চোখের জল মুছে তার দিকে তাকিয়ে কোনোমতে বলল, “মা’রেনি।”

“তাহলে কাঁদছো কেন?”

“সে বলেছে আজই মেক্সিকো ফিরে যাবে, তাই কাঁদছি।”

​সোহমের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ফিকে হাসি ফুটে উঠল। সে নিচু স্বরে বলল, “তোমার তো খুশি হওয়ার কথা, তা না করে কাঁদছো?”

ফুল অসহায় কণ্ঠে বলল, “সে বলেছে আমাকে রেখেই নাকি চলে যাবে। আমি তাকে ছাড়া থাকতে পারবো না।”

সোহম কিছুক্ষণ নিরবতা পালন করল, যেন কোনো এক জটিল অংক মেলাতে ব্যস্ত সে। ফুল আরও কিছুটা জড়োসড়ো হয়ে বসল। ওড়নাটা উদ্যানের রুমেই রয়ে গেছে। অবশ্য চুলের জন্য তাকে খুব একটা অস্বস্তিতে পড়তে হচ্ছে না।

“আজ ৫ই নভেম্বর, আমাদের দেখা হওয়ার একবছর পূর্ণ হলো।” সোহমের মুখে হঠাত তারিখটা শুনে ফুল চমকে উঠল। সোহম দূরে শূন্যে তাকিয়ে বলল, “ঠিক এক বছর আগে এই দিনেই তুমি প্রথমবার এই এস্টেটে পা রেখেছিলে।”

“আপনার মনে আছে?” ফুল চকিত নয়নে তাকাল।

​“হ্যাঁ। আসলে আমার বিশেষ দিনগুলো এমনিতেই মনে থাকে।”

​ফুলের কণ্ঠস্বর বুজে এল, “বিশেষ দিন?”

​সোহম নিঃশব্দে হাসল। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না। “কেন? আমাদের প্রথম দেখা হওয়াটা বুঝি বিশেষ ছিল না?”

ফুল থমকে গেল। সোহমের কথাগুলো আজ কেমন যেন খাপছাড়া লাগছে। তার লাল লাল চোখজোড়া দেখে ফুল বুঝে নিল সে নেশাগ্রস্ত। ফুলের চোখে ভয়ের আভা দেখে সোহম আরও একটু সরে বসল। অভয় দিয়ে বলল, “আনকম্ফোর্টেবল ফিল কোরো না। আমি কন্ট্রোলেই আছি।”

ফুল ওঠার চেষ্টা করল কিন্তু পারল না। তার পাজোড়া এখনো বোধশূন্য।

“আজ ফিরে গেলে আমাকে তো এখনই রেডি হয়ে নিতে হবে।” সোহম মৃদু স্বরে বলল।

ফুল আবারও হাঁটুতে গাল ঠেকিয়ে ঘোরের মাঝে আওড়াল, “সে আমাকে ফেলে রেখে গেলে আমি বোধহয় ম’রেই যাবো, সোহম স্যার। আমাদের শেষ দেখাটাও আজই হবে।”

সোহমের চোখে বিস্ময় ধরা পড়ল। “মরে যাবে কেন? ভালোবাসলেই কি মরে যেতে হয়?”

“তা হয়না, কিন্তু আমার কাছে বেঁচে থাকার কোনো কারণই থাকবে না। উপরন্তু আপনাদের তেহুও চায়না আমি বেঁচে থাকি।”

সোহম কিছুক্ষণ কথা খুঁজে পেল না। তারপর নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, “ও কি তোমাকে ম’রে যেতে বলেছে?”

ফুল হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল। “বলেছে, প্রতিদিনই বলে। আমি ম’রে যাইনা কেন? আমার ম’রে যাওয়াই উচিত। আর সত্যি বলতে আমি হয়তো ম’রেও যেতাম কিন্তু সে অন্য কারো কাছে যাবে সেটা আমি ম’রে গিয়েও সহ্য করতে পারব না সেই জন্যই…” ফুলের গলা আটকে এল। বহু কষ্টে বলল, “উনি মেক্সিকোতে ফিরে নিশ্চয়ই ফ্লোরা বা অন্য কারো কাছে যাবেন…”

ফুলকে আতঙ্কিত হয়ে পড়তে দেখে সোহম অন্য প্রসঙ্গ টানল, “একটা গল্প শুনবে?”

ফুল তার অশ্রুসিক্ত চোখে তাকাল। সোহম ধীরলয়ে বলতে শুরু করল, “তেহুর ব্যাপারে কিছু বলবো না। আমি জানি তুমি ওর ব্যাপারে কিছু বললে বিশ্বাস করবে না। তাই আজ আমি নিজের ব্যাপারে বলবো।”

“কী এমন কথা?”

“আমি নিজের বাবাকে নিজের হাতে খু’ন করেছিলাম।”

ফুলের পুরো শরীর যেন এক লহমায় বরফ হয়ে গেল। সে রুদ্ধশ্বাসে বলল, “মজা করছেন?”

সোহম সফলভাবে ফুলের মনোযোগ সরাতে সক্ষম হয়েছে। সে নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে বলল, “একদম না। আমি তাকে এই হাত দিয়ে মে’রেছি।”

ফুলের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। ভয়ে সে দরজার সাথে আরও সিটিয়ে যেতে চাইল। সোহম নির্বিকার।

“কেন মেরেছি জানতে চাইবে না?”

ফুল মাথা নাড়ল দ্রুত। “কারণ যা-ই হোক না কেন, আপনি কাউকে মারতে পারেন না সোহম স্যার। এটা পাপ।”

“পেরেছি তো, তিনি আমার মাকে মে’রেছিলেন তাই আমিও তাকে মে’রে ফেলেছি।”

“আপনার মাকে মে’রেছিল?”

“হ্যাঁ, তিনি সবসময়ই টাকা চেয়ে চেয়ে আমার মাকে টর্চার করতেন। আমার মা অন্যদের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালাতো। মা চেয়েছিল আমাকে স্কুলে পড়াতে, কিন্তু তিনি গ্যামব্লিং-এ এতোটাই আসক্ত ছিলেন যে প্রতিবার আমাকে ভর্তি করানোর জন্য মায়ের জমিয়ে রাখা টাকা মারধর করে নিয়ে নিতেন। তাছাড়াও তার নারীদোষ ছিল। অন্যান্য মহিলাদের পেছনে টাকা ওড়াতেন। একদিন আমার মা প্রতিবাদ করায় তিনি তাকে শ্বাসরোধ করে মে’রে ফেলেন। আমি যে সেটা দেখে নিয়েছিলাম; তিনি টের পান নি।”

ফুলের মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। “তারপর?”

সোহম একটু থেমে গিয়ে বলল, “মাকে মে’রে ফেলে তিনি খুব কান্নাকাটি করেছিলেন যার জন্য সবাই ধরেই নিয়েছিল মায়ের স্বাভাবিক মৃ’ত্যু হয়েছে।”

“আপনি কেন সবাইকে সত্যিটা বলেন নি?”

“বলিনি কারণ আমরা যেই বস্তিতে থাকতাম সেখানের প্রায় সব পুরুষরাই নারীদের নিপীড়ন করতো। সেখানকার নিয়মই ছিল নারীরা ঘরেরসহ বাইরের কাজগুলোও করবে আর পুরুষেরা তাদের শাসনের নামে শোষণ করবে।”

“আপনি যখন বুঝলেন আপনার বাবা পর্যাপ্ত শাস্তি পাবেন না তখন আপনি নিজেই তাকে শাস্তি দিলেন তাইতো?”

​সোহম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ফুল কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, “তারপর আপনি মেক্সিকো কীভাবে গেলেন?”

সোহম একটু থমকাল। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে বলল, “বাবাকে মে’রে রাতের আঁধারে পালিয়ে গিয়েছিলাম। ঘটনাক্রমে একসময় পৌঁছে গিয়েছিলাম মেক্সিকোতে।”

ফুলকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই সোহম উঠে দাঁড়িয়ে সাবলীলভাবে ফুলের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “তুমি চাইলে আমি তোমাকে তোমার রুমে রেখে আসতে পারি।”

ফুল আঁতকে উঠল। সোহম জানতো ফুল এমনটাই করবে। তবুও সে জাস্ট কথা ঘোরাতে চেয়েছিল। কথায় কথায় অনেক কথা বলে ফেলেছে; আরও কিছু বলা ঠিক হবেনা।

​সে হাঁটা ধরল করিডোর দিয়ে। যাওয়ার সময় শুধু বলে গেল, “মেইডদের পাঠিয়ে দিচ্ছি। তারা তোমাকে রুমে যেতে হেল্প করবে।”

মেইডরা ফুলকে রুমে রেখে যাওয়ার পর সে পেইন কিলার খেয়ে অঘোরে ঘুমিয়ে পড়েছিল। শরীর আর মনের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝড়ের রেশ তাকে অবশ করে দিয়েছিল। যখন ঘুম ভাঙল, ঘড়ির কাঁটা তখন একটা ছুঁইছুঁই। ফুল ধড়ফড় করে উঠে বসল। হাতমুখ ধুয়ে কোনোমতে নিজেকে গুছিয়ে সে কিচেনের দিকে পা বাড়াল; শরীরের তীব্র যন্ত্রণা উপেক্ষা করেই সে দৈনন্দিন রুটিন ফলো করতে লাগল।

অন্যদিকে, ফোনের একঘেয়ে রিংটোনে উদ্যানের তন্দ্রা কাটল। কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে লুহানের নির্লিপ্ত স্বর ভেসে এল, “ইটস লাঞ্চ টাইম।”

​উদ্যান কথা না বাড়িয়ে কল কেটে দিল। ফ্রেশ হয়ে যখন সে ঘর থেকে বেরোল, দেখল লুহান, মেলো আর সোহম আগে থেকেই সেখানে দাঁড়িয়ে। তাদের গম্ভীর মুখচ্ছবি দেখে উদ্যানের ভ্রু কুঁচকে গেল।
“লাঞ্চ করার জন্য ডাইনিং হলে না গিয়ে আমার রুমের সামনে কী করছিস তোরা?”

লুহান সরাসরি প্রসঙ্গের অবতারণা করল, “তুই নাকি বলেছিস আজই মেক্সিকো ফিরে যাবি?”

উদ্যান থতমত খেয়ে গেল। হ্যাঁ সে বলেছিল, কিন্তু রাগের মাথায়। সেই কথাটা মেয়েটা আবার ওদেরকেও বলে দিয়েছে? ভাবতেই আবারও চটে গেল উদ্যান। এখন যদি সে কথা ঘুরিয়ে ফেলে, তবে সবার সামনে তার দুর্বলতা প্রকাশ পাবে; যেটা তার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

“হ্যাঁ ফিরে যাবো, তোরা সব গুছিয়ে নে।”

মেলো খুশি হয়ে গেল। তার এখানে আর ভালো লাগছে না। এরপর তারা নরওয়ে যাবে ভাবতেই খুশি খুশি লাগছে। যতো যাই হোক নরওয়ে তার জন্মভূমি।

সোহম একটু ইতস্তত করে মৃদু স্বরে বলল, “কোনোভাবে কি হেইটফুলকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া যায়না?”

উদ্যান জ্বলন্ত চোখে তাকাতেই সোহম চুপসে গেল।
“না মানে…”

লুহান কথা টেনে নিয়ে বলল, “তুই ফুলকে রেখে কীভাবে যেতে চাইছিস? ভুলে যাসনা তুই রুমার সাথে কী করেছিস। যদি ফুলকে নিয়ে যেতে না চাস তাহলে ওকেও…”

উদ্যান ধমকে উঠল, “আমি ওকে এখন মা’রতে পারবো না। কেন পারবো না সেটাও বলেছি তোদের।”

মেলো বলল, “তাহলে নিয়ে গেলেই তো হয়।”

উদ্যানের মেজাজ এবার সপ্তমে চড়ল। সে খিটখিটে গলায় বলল, “হয় না, আমি নিয়ে যাবো না ওকে। আর তোদের যদি ওকে জীবিত রেখে যাওয়ায় সমস্যা থাকে, তবে যা… নিজেরা গিয়ে মে’রে ফেল।”

বলেই উদ্যান পা বাড়াল সিঁড়ির দিকে। তারা তিনজন একে অপরের দিকে চাওয়াচাওয়ি করে শুকনো ঢোক গিলল। তারা মা’রবে ফুলকে? অসম্ভব! উল্টো তারা তাকে বাঁচানোর চেষ্টা শেষ পর্যন্ত করে যাবে।
লুহান চোখ দিয়ে সোহমকে ইশারায় বলল উদ্যানকে গিয়ে বোঝাতে কিন্তু সোহম মাথা নেড়ে বোঝালো সে গেলে উদ্যান সঠিক না বুঝলেও ভুল অবশ্যই বুঝবে।

লুহান হার মানল না। সে দৌড়ে গিয়ে উদ্যানের পাশাপাশি হাঁটা ধরল। “বলছিলাম কী… আজ না গেলেই হয় না?”

উদ্যান নির্বিকার কণ্ঠে বলল, “তুই যেতে না চাইলে থেকে যা। কে জোর করেছে?”

​অকস্মাৎ লুহান উদ্যানের হাত চেপে ধরল। উদ্যান সরু চোখে তাকাতেই লুহান জোরপূর্বক হেসে বলল, “আজ মেয়েটার জন্য একটা বিশেষ দিন। তাই ভেবেছিলাম একটা সারপ্রাইজ রাখবো।”

উদ্যান থমকে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করল, “বিশেষ দিন?”

“হ্যাঁ, আজই ওর সাথে আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিল। ওকে তুই এই এস্টেটে আনার এক বছর পূর্ণ হয়েছে আজ।”

উদ্যানের পা দুটো যেন মাটির সাথে গেঁথে গেল। কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় তার মুখ দিয়ে অস্ফুট স্বরে বেরিয়ে এল, ​“আজ আমাদের ম্যারেজ এনিভার্সারি?”

চলবে,,,

শব্দসংখ্যা: ৩৪০০+

(দেখতে দেখতে ফুলোদ্যানের বিবাহবার্ষিকীও চলে এলো এই উপলক্ষে আপনারা 5k রিয়্যাক্ট তো দিতেই পারেন। কি পারেন না? যদি পারেন তবে আমিও সঙ্গে সঙ্গেই পরবর্তী পর্বটা দিয়ে দেবো। যদি পাঁচ ঘন্টায় হয়ে যায় তবে পাঁচ ঘন্টা পরেই দিয়ে দেবো।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here