#প্রিয়_নীলপদ্ম —২৩.
#মুশরাফা_মিরা
[কোনো প্রকার কপি নিষিদ্ধ]
নৌমির পাঁচমাসের উঁচু পেট নিয়ে চলাফেরা করতে বড্ড কষ্ট হয়।একটুতেই হাঁপিয়ে যায় মেয়েটা।রোগ তার পিছু ছাড়ছেই না কদিন পরপর প্রেশার ফল করবে,খাওয়ায় অরুচি আরো কত-কি।তারউপর মুড সুইং তো আছেই একটু পরপর মেজাজ খারাপ হচ্ছে তার।দিনে হাজার বার মন খারাপ করে বসে থাকবে।আর নিজের সমস্ত রাগ ঝাড়বে ফোনে,তূর্যের উপর। বর্তমানেও রেগেমেগে গজগজ করছে বারংবার। কারণ হলো তূর্য এখনও বাড়িতে আসে নি।আসার কথা সেই দুপুরে অথচ বিকেল হতে চললো আসার নামই নেই। গায়ে শাড়ি জড়িয়ে এই অসহ্য গরমে বসে থাকতে ইচ্ছে হচ্ছে না ওর আর তূর্য যদি ফেনটাও একটু তুলতো।কোথায় আছে না আছে তা-ও জানা নেই ওর।এক্সিডেন্টে পর থেকে তূর্যকে নিয়ে ওর চিন্তার শেষ নেই।লোকটা তো তা-ও যানে জেনেশুনে ওকে এমন চিন্তায় ফেলার মানে আছে কোনো? নৌমি অধৈর্য হয়ে তূর্যের কলিগ সাজিদের কাছেও ফোন দিয়েছিলো।সাজিদ জানায় আরো কয়েক’ঘন্টা আগেই বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে তূর্য।তাহলে এখনও আসছে না কেন?নৌমির কান্না পেলো।তবে কান্না করতেও পারছে না।তাসফি কি সুন্দর করে সাজিয়ে দিয়ে গেলো এখন যদি কাঁদে তাহলে সাজ নষ্ট হয়ে যাবে না?যাবেই তো।পুরো বাড়িতে নৌমি একা আর বাকিরা সেই কখন চলে গেছে বিয়ের ভ্যেনুতে।আর ও এখানে বসেবসে মশা মারছে।তুলি ওকে রেখে যেতে চাইছিলো না তবে নৌমি তূর্যের তারাতাড়ি ফেরার আসায় পাঠিয়ে দিয়েছে।
আয়রা ওর বান্ধবী তার বিয়েতে কই ও সবার আগে যাবে কিন্তু দেখো তার আর পারছে কই?সবকিছুর মূলে তূর্য।যেতে চেয়েছিলো আরিফদের সাথে কিন্তু লাটসাহেবের হুকুম সে ক্যান্টেনম্যান্ট থেকে ফিরে নিয়ে যাবে তার বউকে।অগত্যা আরিফরা নৌমিকে রেখেই চলে গেলো।নৌমি নিজের পেটে হাত বুলালো।অভিমানী কন্ঠে অনাগত সন্তানের কাছে অভিযোগ করে তূর্যের নামে,
‘দেখলি বাবু তোর বাপের কাণ্ডজ্ঞান দেখলি?কেমন ধরনের লোক!এখনও আসছে না।তুই বল তোর বাপের শাস্তি কি দেওয়া উচিত? কথা না বলা নাকি এড়িয়ে চলা কোনটা?’
‘কাকে শাস্তি দেওয়ার কথা চলছে ম্যাডাম?’
আচমকা তূর্যের কন্ঠে লাফিয়ে ওঠে নৌমি।নিজের খেয়ালে এতোটাই মজে ছিলো যে ততক্ষণ ধরে যে তূর্য দরজার সামনে দাড়িয়ে তা লক্ষ্য করেনি।আড়চোখে তূর্যকে দরজার হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মুখ ফুলিয়ে অন্যদিকে ফেরে,কথা বলে না।তূর্য হেঁসে সোজা হয়ে দাঁড়ায়।আগের থেকে একটু মোটা হয়েছে নৌমি
দৈহিক পরিবর্তন এসেছে আগের থেকে। তবে এতে আরো সুন্দর, মিষ্টি লাগছে মেয়েটাকে।তূর্য তো সময় পেলেই চেয়ে থাকে ওর দিকে।
তূর্য দরজার কাছে আর না দাঁড়িয়ে ধীর পায়ে হেটে কাঁধের আর হাতের ব্যাগটা সোফায় রেখে সোজা ওয়াশরুমে চলে যায়।তূর্যের ওমন ভাবে চলে যাওয়াটা আরো কষ্ট বাড়িয়ে দিলো নৌমির।উচিত ছিলো না আগে নৌমির সাথে কথা বলার? রাগ ভাঙানোর?ছিলো তো উচিত।তূর্য ওর অভিমান লক্ষ্য করে নি তাহলে কথাটা ভাবতেই চোখ বেয়ে একফোঁটা পানি গড়িয়ে পরে।মা হওয়ার যাত্রা শুরু হওয়ার পর থেকে মেয়েটার অভিমান,রাগ,জেদ বেড়েছে। ন্যাকামি বেড়েছে বহুগুণ।তবে সব তূর্যের জন্য। বেচারা কাজ আর বউয়ের চাপে পৃষ্ঠ হচ্ছে দিনকে দিন। হাতমুখ ধুয়ে বের হয়েই বসে নৌমির সামনে হাঁটু গেড়ে। নৌমি মুখ ঘুড়িয়ে অন্যদিকে ফেরে।কথাই বলবে না আর তূর্যের সঙ্গে। তূর্য অভিমানীনির নিছক অভিমান দেখে নিঃশব্দে হাসে।পেট থেকে শাড়ির আঁচল সরিয়ে সময় নিয়ে চুমু খায় সেখানটায়।নৌমি নড়েচড়ে ওঠে তবে মুখে কিছু বলে না।তূর্য দুহাত প্রসারিত করে নৌমির কোমড় জড়িয়ে বলে,
‘অভিমানীনি আমার আজকের অভিমান বুঝি খুব গাঢ়?’
নৌমি নিশ্চুপ, মুখে তার কথা নেই কোনো। মৌন থেকে বোঝায় হ্যা তার অভিমান গাঢ়,আজকে খুব করে গাঢ়।তূর্য বউয়ের রাগ ভাঙানোর কৌশল বেশ ভালো জানে।এরআগেও বহুবার করেছে কি-না। একটু সোজা হয়ে টুপ করে চুমু খায় নৌমির ঠোঁটে।বারংবার খায় যতক্ষণ না নৌমি জবান খোলে।মিনিট পেরোতেই নৌমি হাল ছেড়ে আত্মসমর্পণ করে কর্তার কাছে।দু’হাতে তূর্যের ঢেলে সরিয়ে দিতে চায়।না চাইতেও হেঁসে বলে,
‘সরুন..সরুন অসভ্য লোক।এভাবে চুমু খাচ্ছেন কেন?আমার ঠোঁট কে কি পেয়েছেন?দূরে সরুন।কাছে আসবেন না মোটেও।আপনি খারাপ খুব।জানেন যে আপনার চিন্তায় আমার সমসময় থাকে তবুও একটা বার-ও কল ধরেননি,কল দে নি।সেই কখন বাড়ি আসার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন।উচিত ছিলো না একটিবার ফোন করে জানানোর?’
‘ভিষণ অন্যায় হয়ে গেছে বউজান।স্যরি স্যরি!এতো জ্যাম ছিলো রাস্তায় যা বলার মতো না।ফোন দিবো যে ফোনের চার্জ শেষ হয়ে গেছিলো তো।’
নৌমি মুখ বাকায়।সবসময়ই উত্তর রেডি থাকে জনাবের,হুহ্।রাগ না থাকলে-ও মিছে রাগ দেখিয়ে বলে,
‘সরুন আপনি।হয়েছে আর নাটক করতে হবে না’
তূর্য সরে না ফের হাটু গেঁড়ে ওর সামনে বসে ওর নরম হাতদুটো নিজের হাতের মুঠোয় নেয়।হাতের পিঠে ঠোঁট ছোঁয়ায়।
‘এভাবে রেগে থাকে না বউ।কষ্ট হয়না বলো?ওই চোখে রাগের থেকে বেশি প্রেম মানায়।অথচ প্রেম নয় রাগই পাই আমি।কেন?কেন বউ কেন?’
নৌমি এবার মিছে রাগটাও ধরে রাখতে পারলো না ওই পাগলের কান্ডে।ঠোঁট দুটো প্রসারিত করে হেঁসে ফেললো।বললো,
‘পাঁচবছরের ঝাঁজ এখনও মেটানো হয়নি কর্তামশাই।তাই মাঝেসাঝে রাগ করি বুঝলেন? বুঝে নিবেন আমার অভিমান। সময় নিয়ে রাগে-অভিমান ভাঙাবেন। ভালো বরের বৈশিষ্ট্য এটাই বউদের রাগ ভাঙানোর যত্ন নিয়ে।’
তূর্য খুশি হলো নৌমির কথায়। হাসি-হাসি মুখে জানতে চায়,
‘তাহলে বলছো আমি ভালো?ভালো বর?’
নৌমি এবার পূর্ণদৃষ্টিতে চায় তূর্যের দিকে।চোখমুখে উচ্ছ্বাস বউয়ের কাছে ভালো বরের ট্যাগ পাওয়ার।নৌমি উত্তর দিলো এ প্রশ্নের বদলে হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেয় তূর্যের থুতনির কাটা দাগটায়।এইতো কয়েকমাস আগের এক্সিডেন্টের ফলে কেটে গেছিলো তূর্যের থুতনি। সেবার কতটা পাগলামোই না করেছিলো সাজিদের মুখে তূর্য নেই ওমন কথা শুনে।নাওয়াখাওয়া ভুলে সারাক্ষণ তূর্যের চিন্তায় বিভোর ছিলো,পথের দিকে চেয়ে ছিলো তূর্যের আশায়।এই বুঝি ফিরলো তূর্য।অপেক্ষায় অবসান ঘটলো তিনদিন পরে।যেখানটাতে এক্সিডেন্ট হয়েছিলো সেখানর হাসপাতাল থেকে খবর আসলো তূর্যের।তূর্যই কল করলো জ্ঞান ফেরার পরে।খবর শুনের পরে নৌমি যা একটু স্বাভাবিক হয়েছিলো।তখন বেশ ভালোই তূর্য আঘাত পেয়েছিলো।সেই আঘাতের দাগ হিসেবে রয়ে গেছে এই থুতনির এই দাগটা,নৌমির চোখে এক বিষাক্ত স্মৃতি হয়ে।
‘আবার ওসব মনে করছো?কেন?মন খারাপ হবে তো আবার!’
তূর্য নৌমিকে একধ্যানে ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখেই বুঝে যায় নৌমি ফের এক্সিডেন্টের কথাই স্মরণ করছে।ওটা তো একটা খারাপ স্মৃতি! মন থেকে মুছে ফেলা উচিত অথচ নৌমি পারছে না।বারংবার মনে করছে।তূর্য আবারও ডাকে নৌমির কাঁধে মৃদু ধাক্কা দিয়ে,
‘এই..এই নৌমি শুনছো?’
‘শুনছি তো বলুন!’
‘আবারও ওসব ভাবছো কেন?’
‘আপনি কি আর বুঝবেন আমার জ্বালা?ওমন পরিস্থিতি কি চাইলেও ভোলা যায়?অন্যরা পারলেও আমি পারিনা।’
তূর্য মেঝে থেকে উঠে বিছানায় নৌমির পাশে বসে।ঠাট্টা করে বলে,
‘দেশের হয়ে যারা কাজ করে তাদের জন্য এসব কিছুই না।মৃত্যু-ও ধরা কথা।আমিও সেদিন যদি মা..’
নৌমি সহসাই আঁতকে উঠল। দুহাত নিয়ে ঠেকালো তূর্যের মুখে।চোখমুখে বিষাদের রেখা ফুটিয়ে তুলে বলে,
‘ছিহ,ওমন বাজে কথা বলবেন না আপনি।আপনার কিছু হবে আমি তা কল্পনাও করতে পারি না তূর্য।প্লিজ বাজে কথা বলবেন না!’
নৌমির আতংকিত চেহারার পানে দৃষ্টি দিয়ে ঠাট্টা আর করলো না।এলোমেলো চুলগুলো কানের পিছনে গুঁজে দিয়ে বলে,
‘অনেক অপেক্ষা করিয়েছি আজ?অনেকক্ষণ শাড়ি পরে বসে থাকতে হয়ছে না?বিশ্বাস করো আমি তোমায় এতো অপেক্ষা করাতে চাইনি।’
নৌমি এবার যেনো আদুরে বাচ্চা হয়ে গেলো।পরম শান্তিতে ঠাই নিলো তূর্যের প্রশস্ত বুকে।অভিযোগ তুলে বললো,
‘আজ কেন বিয়ের পর থেকে আপনার জন্য আমি এতো..এতো অপেক্ষা করেছি যে, আমার মনে হয় অপেক্ষা করানোর জন্য যদি আদালত বসানো হতো তাহলে আমার অপেক্ষায় আদালতে আপনার জামিন মিলতো না কোনোদিন।’
তূর্য ঠোঁট কামড়ে হাসলো দু’হাতে আগলে নিলো স্ত্রীকে।কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইলো,
‘অপেক্ষার আদালতে জামিন পাই বা না পাই তোমার মনের আদালতে জামিন পেয়েছি কি আমি?ঠাঁই হয়েছো তোমার মনের জেলে?’
নৌমি হালকা মুখ তুলে পিটপিট করে কর্তার মুখের দিকে চেয়ে।লাজুক হেঁসে বলে,
‘জামিন না দিলে কি আর আপনার অস্তিত্ব নিজের পেটে ঠাই দিতাম?’
তূর্য বউয়ের কথায় জোরে হেঁসে ফেললো।নৌমি মুখ লুকালো তূর্যের বুকে।ওমন কথাখানি বলে বেজায় লজ্জা পাচ্ছে এখন।তবে ওদের খুনসুটি বুঝি পছন্দ হলো না ফোন বাবাজীর।বিকট শব্দে বেজে উঠলো।তূর্য বেজায় বিরক্ত হলো ফোন ভাজার রং-টাইমিং এ।নৌমির ফোন বাজছে।তূর্যের কাছ থেকে সরে এসে বালিশের উপর থেকে ফোন উঠায় ‘আয়ু’ নামটা থেকে জিভ কাটে।এইরে তূর্য আসার আগে যাওয়ার জন্য কতই না হম্বিতম্বি করছিলো আর যেই আসলো সব ভুলে বসে আছে।সন্ধ্যা নাগাদ বিয়ে আর এখন প্রায় চারটে বেজে গেছে এখনও যায় নি ও ভ্যেনুতে!ইশ,বান্ধবীর বিয়েতে এমন কাজ সাজে?ফোন রিসিভ করার আগে তূর্যের বললো তারাতাড়ি রেডি হতে।
‘না গেলে হয়না?তুমি-আমিই তো বেশ আছি।’
‘যান বলছি।সব গুছিয়ে রাখা আছে টেবিলে উপর গিয়ে চটপট জামাকাপড় পরে আসুন।’
নৌমির চোখ গরমে কাজ হলো।ক্যাপ্টেন বাবু বউয়ের চোখ গরমে ভয় পেলেন সুরসুর করে চলে গেলেন ওয়াশরুমের দিকে।তূর্য যেতেই একদফা হেঁসে নিলো নৌমি।যাক বরটা তাহলে ওকে বেশ ভয় পায়।শান্ত হয়ে ফোন রিসিভ করলো।কিছু বলবে তার আগেই শুনলো আয়রার রাগী কন্ঠ,
‘আপনি না কনের প্রানপ্রিয় বান্ধবী? আসলেই কি তাই?হলে নিশ্চয়ই তার পাশে থাকতেন কিন্তু আপনার তো দেখাই নেই। কোথায় আছেন আপনি?’
‘আসলে আয়ু আসলে’
‘আসলে আসলে কি হ্যা?কি?আমি জাস্ট তোমার কান্ডে অবাক হচ্ছি।তুমি কোথায়?এখনও আসতে পারলে না।তুমি যানো আমি কতক্ষণ ধরে তোমার আসার জন্য অপেক্ষা করছি!অন্য কনেরা বর আসার অপেক্ষা করে, পথ চেয়ে বসে থাকে।অথচ আমি? আমি আমার বান্ধবীর পদধূলি পাওয়ার অপেক্ষায় আছি।’
‘স্যরি সোনা।তোমার দুলাব্রো সবে আসলো।রাগ করে না লক্ষীটি।একটু অপেক্ষা করো আমারা আসছি,এক্ষুনি আসছি।’
‘হু, আচ্ছা।তারাতাড়ি আসবে কিন্তু!’
‘আচ্ছা বাবা আচ্ছা। এবার আমাদের অপেক্ষা না করে সামিদ ভাইয়ের অপেক্ষা করো তো বাপু। অনেক সাধনার ফল কিন্তু সামিদ ভাই,বুঝলে ছোট’জা?’
আয়রার কৃত্রিম ভাবে লাল করা গালদুটো এবার সত্যিই লাল হয়ে এলো লজ্জায়। কম তো কষ্ট করেনি সামিদকে পেতে।আজ.. আজ অবশেষে হচ্ছে তার শখের পুরুষ তার,একান্তই তার।
তূর্যের এক্সিডেন্টের পরের সময়গুলোতে বেশ ভালোই যাচ্ছে ওদের।এইতো সামিদ-আয়রার বিয়ে হচ্ছে। পরিবার মানানো এতো সোজা ছিলো না নৌমি-তূর্য আর বিশেষ করে আরিফের সহযোগিতার আজ দুই প্রেমিকযুগল গাঁটছড়া বাঁধছে। অন্যদিকে তাসফিরও বিয়ে ঠিক। মেয়ে ছোট বলে বিয়ে নামক শব্দটা শুনতেই চাইছিলো না ওরা তবে ইয়াসিন এর পিড়াঁপিড়িঁতে শেষমেশ বাধ্য হলো তাসফিকে তার হাতে তুলে দিবে এই প্রতিজ্ঞা করতে।বাগদান করিয়ে রাখা হয়েছে পরীক্ষা শেষ হলেই চারহাত এক করে দেওয়ার চিন্তাভাবনা আছে দুপরিবারের।সময় কতো দূর বদলায় তাই-না? কখনো ভালো আবার কখনো খারাপ।বউ বলে মানবে না বলে পাঁচটা বছর বাড়ি ছেড়ে দূরে ছিলো।সেই ছেলে এখন বউয়ের জন্য পাগলপ্রায়।
নৌমি কথাগুলো কল্পনা করে প্রশান্তির হাসি হাসলো।নিজেকে খুব সুখী মনে হয় এমন বর,শ্বশুরবাড়ির লোকজন পেয়ে।এই বিয়ে নিয়ে একসময় কতটা আক্ষেপ ছিলো,রাগ ছিলো ওর মনে এখন তা সবই অতীত।ফোলা পেটে হাত রাখলো নৌমি.. আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে নিচু কন্ঠে বলে,
‘আমার সোনা বাবা শুনে রাখো তোমার বাবা একজন খুব ভালোমানুষ। সে তোমার আম্মুকে খুব ভালোবাসে,যত্নে রাখে।আমি তার প্রতি সন্তুষ্ট!’
‘এই যে সুন্দরী একা-একা কি বিরবির করছো? দেখতো পাঞ্জাবিতে মানিয়েছে কিনা।’
চকিত নয়নে নৌমি পিছনে ফেরে।তূর্য ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখছে আর নৌমির কাছেও প্রশ্ন করছে ভালো লাগছে কিনা।নৌমি গালে হাত দিয়ে ওরদিকে ফিরে বসে।সাদা রঙে ওর শুভ্র পুরুষটাকে দারুণ লাগছে।থুতনিতে থাকা দাগটা মনে হয় তূর্যের সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।মুগ্ধ চোখে দেখলো তারপর ধীরে নামে বিছানা থেকে।মুখোমুখি হয় তূর্যের।নিজের কাজল টানা চোখ থেকে কনিষ্ঠ আঙুলে একটু কাজল লাগিয়ে তূর্যের কানের পিছনে লাগিয়ে দেয়।মৃদুস্বরে বলে,
‘কারো নজর না লাগুক আমার সুদর্শন বরটার দিকে।’
তূর্যে শান্ত চোখে দেখছিলো নৌমির কর্মকান্ডগুলো।কাজল লাগানোতে হাসি পেলো ওর।মেয়েটা ওকে নিয়ে কিসব বাচ্চামি করছে তবে মুখে কিছু বলে না নৌমির ঠোঁটে হাসিটা ভালো লাগছে ওর।চেয়ে থাকে ওর দিকে।নৌমি ওভাবে তূর্যকে নিজের দিকে চেয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করে,
‘কি হলো?থম মেরে গেলেন কেন চলুন যাবেন না’
বলেই উদ্ধত হয় রুম ছাড়তে তবে তূর্য টেনে ধরে ওকে।কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে,
‘আমায় নজর কাটা দিলে তাহলে তোমাকে দিতে হবে না?তুমি তো বেশি সুন্দর! যদি কারো নজর লাগে?’
‘লেগেছে তো!’
‘কার?!’
‘আপনার।’
বলেই লাজুক হাসে নৌমি।শুরুতে সিরিয়াস হলেও শেষে হেসে ফেলে তূর্য।মজা ধরতে পেরে চোখ ছোটছোট করে ফেলে।নৌমিকে ছেড়ে নিজের চুলসেট করতে করতে বলে,
‘মজা করে বলো আর যাই করো না কেন। সত্যি কথা তো এটাই তোমার দিকে নজর তো আমি দিয়েছিই।যে-সে নজর নয়..’
‘অসভ্য নজর তাই তো?’
তূর্যের মুখের কথা টেনে নিজের অধিপত্যে বিস্তার করার স্বভাব আগেরই।এবারও অন্যথা হলো না তার।তূর্য তবে এবার সম্মতি জানালো না।নৌমির কপালে চুমু খেয়ে বলে,
‘অসভ্য নজর নয় বউ ভালোবাসার আর প্রেমের নজর!’
_____________
একে তো ওরা লেট করে ফেলেছে বাড়ি থেকে বের হতে তারউপর আবার এই অসহ্যকর জ্যাম।সবমিলিয়ে বিরক্তি যেনো পিছু ছাড়ে না নৌমির।আয়রা-সামিদ বারবার কল করে যাচ্ছে তূর্য নৌমিকে।কোথায় ওরা..কেন আসতে পারে নি?আরো কত প্রশ্ন জবাব দিতে দিতে তূর্যের মাথা ধরে গেছে। গাড়ির ভিতর থেকে মাথা বের করে সামনের দিকটা দেখে লম্বা জ্যাম ধরে আছে রাস্তায়। ছাড়তে আরো অনেকক্ষণ যে লাগবে তার আর বুঝতে বাকি রইলো না তূর্য।নৌমি ক্লান্ত হয়ে গেছে একটুতেই, জার্নি এখন আর মোটেও সহ্য হয়না ওর।ক্লান্ত শরীরটা সিটের সাথে সিটিয়ে আছে একপ্রকার।সিটে মাথা এলিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে।হঠাৎ পেটে হাতর স্পর্শ পেলে কিঞ্চিৎ হাসে।যখন থেকে শুনেছে নৌমি মা হতে চলেছে তখন থেকে তূর্যের পাগলামি বহুগুণ বেরেছে পারলে ওকে মাথায় তুলে নাচে।কতবার যে ওর পেটের কাছে মুখ নিয়ে কথা বলে,ফিসফিস করে তা নৌমি গুনেও শেষ করতে পারবে না।না চাইতে চোখজোড়া টেনে খোলে।তূর্য ততক্ষণে ঝুঁকে গেছে ওর পেটের কাছে। নৌমি কান খাঁড়া করে শুনতে পেলো,
‘প্রিন্সেস তুমি কি ঘুমাচ্ছো?তারাতাড়ি চলে আসো না।বাবা যে তোমাকে কোলে নেওয়ার জন্য অনেক আশা নিয়ে বসে আছে। জানো তুমি তোমার আম্মুর অনেক কষ্ট হচ্ছে তুমি চলে এসো তাড়াতাড়ি হু?বাবা তোমায় মিস করে মা।’
‘সারাদিন মেয়ে মেয়ে যে করেন যদি ছেলে হয়?’
তূর্য সোজা হয়ে বসলো।কপালে ভাজ ফেলে বলে,
‘বেশি বুঝো না তো।মেয়েই হবে আমার আরেক মা আসবে।’
‘আপনি বেশি বুঝেন।আমার মন বলছে ছেলেই হবে।’
‘আমি সপ্নে দেখেছি একটা ছোট হাত আমার মুখে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে বাবা বাবা বলে ডাকছে।তাই আমি জানি প্রিন্সেস আসবে!’
‘কচু জানেন, বিশেষজ্ঞ হয়েছেন?আমার ছেলেই হবে।’
তূর্য হার মানলো এই পাগলের কাছে।হাতদুটো উপরের দিকে উঠিয়ে স্যারেন্ডারে ভঙ্গিমা করে বলে,
‘ওকে..ওকে তোমার কথাই সই।যেই আসুক আমি তাতেই খুশি।একসাথে দুজন আসলে তো আরো খুশি!’
নৌমি ওর কথার বিপরীতে ভেংচি কাটে।মুখ ফুলিয়ে গাড়ির বাইরের দৃশ্য চোখ রাখে।ব্যাপাটা কি হলো?তূর্য বুঝলো না হঠাৎ রাগের কারন।তবে ঘাটালো না অযথা রাগ তো নিত্যদিনের ব্যাপার।এগুলো তূর্য সয়ে নিয়েছে।ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে ভাবতে থাকে এই পাগল রমনীর অভিমান ভাঙাবে কিভাবে?চিন্তিত ভঙ্গিতে বাহিরে দৃষ্টি ফেলতেই চোখ যায় ফুটপাতে ফুলে নিয়ে বসে থাকা এক চাচির পানে।হরেকরকম ফুলের সমাহার দেখে।তূর্য ভাবলো ফুল দিয়েই না হয় অভিমান ভাঙার চেষ্টা করা যাক।ভাবনা অনুযায়ী গাড়ি থেকে বের হয় ওয়ালেট হাতে।হঠাৎ মাঝরাস্তায় গাড়ি থেকে তূর্যকে বের হতে দেখে নৌমির কপালে ভাজ পরে।লোকটা কই যাচ্ছে? তবে মুখ ফুটে কারণ জিজ্ঞেস করে না রাগ করছে না ও?কেন জিজ্ঞেস করবে?চেয়ে রইলো তূর্যের গমন পথে তবে কিছু সুরাহা করতে না পেরে দৃষ্টি নিজের পাশের জানালার বাহিরে রাখে।ব্যস্ত পথযাত্রী ব্যক্তিদের চলাচলে মনোযোগ দেয়।কিছুক্ষণ বাদে নিজের কানের কাছে কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে লাফিয়ে ওঠে একপ্রকার।তরিত গতিতে পাশ ফিরে তাকাতেই দৃষ্টিগোচর হয় তূর্যের বলিষ্ঠ হাতজোড়া। কিছু লাগালোর চেষ্টায় আছে সে হাত।ফ্রন্ট মিররে নৌমি কৌতূহল বশত তাকায় কথা ছাড়া। দৃষ্টি আঁটকায় সাদা-ধবধবে একটা বেলীফুলের মালায়।নৌমি চেয়ে থাকে অনিমেষ তূর্যের মুখের দিকে।যে মুখটা সম্পূর্ণ মনোযোগে নৌমির খোঁপায় মালা গুঁজতে ব্যস্ত।আশেপাশে কিছু খেয়ালে নেই।একটু পরপর মুখের রিয়াকশন পরিবর্তন হচ্ছে কখনো কপালে ভাজ পরছে আবার কখনো মুখে হাসি।তূর্য যে চুলে মালা গুঁজতে অনাবিজ্ঞ তা হাতের টানেই বেশ বুঝেছে নৌমি।মালা খোঁপায় লাগাতে যেয়ে বেশকয়েকবার চুলে টান খেয়েছে ওর।ব্যাথা পেলেও টু শব্দটি করে নি।মুগ্ধ চোখে দেখতে থাকে যত্নশীল পুরুষটির কান্ডগুলো।বেশ অনেকক্ষণ চেষ্টার পরে তূর্য সফল হয়, মুখে বিস্তৃত হাসি ফুটিয়ে নৌমির থুতনি নিজের দিকে ফেরায়।বলে,
‘ এটারই কমতি ছিলো!এখন মনে হচ্ছে একটুকরো নীলমেঘ নেমে এসেছে আমার ঘরে।’
প্রশংসা পেয়ে নৌমির রাগ পানি হয়ে যায়।ধরে রাখতে পারে না মিছে রাগ।মুখে হাসি ফুটিয়ে বলে,
‘সত্যি? আমি ভেবেছিলাম আপনি হয়তো আমায় খেয়ালই করেন নি।ভালো করে দেখননি আমার সাজ!’
‘তা-কি হয়?তুমি শাড়ি পরবে,ঠোঁটে লিপস্টিক দিবে,সাজবে আমি তা লক্ষ্য করবো না?তা-কি হয়?আমি তো সেই শুরু থেকেই খেয়াল করেছি তোমায়।’
নৌমি লজ্জায় আরক্ত হলো। নীল শাড়ির আঁচলটা আরেকটু কাঁধে টেনে মাথা নিচু করে ফেললো।তূর্যের সাথে সংসার করছে আজ সাত-আট মাস তা-ও ওর লজ্জা কমছে না।একটু আদুরে কথাতেই এভাবে লজ্জা পায়।যার বাচ্চার মা হতে চাচ্ছে তার দুটো ভালোবাসার কথায় লাজে শেষ হওয়ার মানে আছে কোনো? নেই তো!তবুও নৌমি পায়,পাচ্ছে আর ভবিষ্যতে হয়তো পাবেও।তূর্য কিছুসময় নৌমিকে দেখে স্ট্রেয়ারিং-এ হাত দেয়।নৌমিকে জিজ্ঞেস করে,
‘তো যাওয়া যাক?’
স্বামীর দুটো ভালো কথায় কল্পনার জগতে ভাসতে থাকা মেয়েটা হঠাৎ তূর্যের কথার মানে বুঝলো না।বোকার মতো জিজ্ঞেস করে,
‘কোথায়?’
তূর্যের দৃষ্টি ছিলো সামনে চলতে থাকা গাড়ির পিছনে। নৌমির ওমন বোকা কথায় ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো।নৌমির ডানহাত নিজের বাহাতের মুঠোয় নেয়।অন্য হাতে গাড়ির স্ট্রেয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতে বলে,
‘আপাতত বিয়ের ভ্যেনুতে তবে জীবনের গন্তব্যের শেষ সীমা পর্যন্ত যেতে চাই।জীবনের বাকিটা পথ শেষ করতে চাই পাশে বসা জীবন্ত আমার প্রিয় নীলপদ্মের সাথে।’
—সমাপ্ত—
[শেষ? সত্যি! এতোদিন গল্পটা কত তাড়াতাড়ি শেষ করা যায় এই চিন্তায় থাকা আমি এখন খালি খালি অনুভব করছি।একটু খারাপ লাগছে ওদের শেষ করে দিতে এভাবে,অগোছালোভাবে।কতকিছু লেখা বাকি ছিলো, বোঝাপড়া ছিলো অথচ লিখতে গেলে মস্তিষ্ক ফাঁকা হয়ে যেতো।বিতৃষ্ণায় চোখমুখ কুঁচকে যেতো।তাই শেষ করার চিন্তা ঘুরঘুর করছিলো মাথায়।তাই তো সবশেষে ইতি টানলাম গল্পের। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে ইচ্ছে হচ্ছে। একটা কথা কি জানো?পরিকল্পনা ছাড়া গল্প লেখা শুরু করলে মাঝপথে লেখার তাল হারিয়ে যাবেই আমি বুঝেছি এবেলায়।শুধু শুরুটা ভেবে যে আমার আগানো উচিত হয়নি তা মাঝপথে এসে আমার মোটামাথায় ঢুকেছে।গল্পটা যে কিভাবে আগাবো তাই নিয়ে কতো চিন্তা! খেয়াল করলে দেখবে শেষের পর্ব অধিকাংশই কেমন অগোছালো!তৃপ্তিদায়ক ছিলো না।আমি শান্তি পাইনি লিখে তোমরাও হয়তো পাও নি পড়ে তাই-না? যাকগে শেষ করে ফেললাম।গল্পে কি কি ভুল ছিলো?সবকিছু জানাবে,ভালো-মন্দ দুটোই।আমার অনেক কিছু শিখতে হবে তো পাখি।তুমি না জানালে আমি কিভাবে বুঝবো আমার ভুল?আজ মন খুলে মন্তব্য করবে, হু?অভিযোগ,লেখার ভুল কমেন্ট বক্সে জানাতে যদি অস্বস্তি হয় তাহলে ইনবক্স তোমার জন্য পাখি।
শেষ পর্ব তো মন খুলে গঠনমূলক মন্তব্যের আশা রাখছি।দেখা হবে নতুন গল্পের সাথে ইনশাআল্লাহ ততদিন ভালো থেকো,নিজের যত্ন নিও।ভালোবাসা পাখিই,আমার প্রিয়তমা]

