#বলো_কোন_প্রিয়_নামে_ডাকি:~
#পর্ব_২৫
#সমৃদ্ধি_রিধী
পুনম টেবিলে গালে হাত দিয়ে বসে কলম কামড়াচ্ছে। দৃষ্টি জানালার বাইরে। ঘড়ির কাঁটা সাড়ে তিনটার ঘরে। নওশাদ এক হাতে খাবারের প্লেট, আরেক হাতে পানির গ্লাস নিয়ে রুমে আসে। চেয়ার টেনে পুনমের পাশে বসে।
“না পড়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছো কেনো?”
পুনম গালে হাত দিয়েই জবাব দেয়, “ভাবছি।”
“কি?”
“আরিফ কি পাগল না অন্যকিছু?”
নওশাদ করলা ভাজি দিয়ে ভাত মাখে। পুনমকে এক লোকমা ভাত খাইয়ে দেয়।
“পাগল না হলে এমন কিছু করতো না।”
পুনম মুখ কুচকে বলে, “করলা ভাজি দিলেন কেনো? বিশ্রি রকমের তিতা। ইয়াক।”
“সব খেতে হয়।”
“করলা আমি পছন্দ করি না।”
নওশাদ এক লোকমা নিজে খেয়ে বলে, “পছন্দ না করলেও অনেকসময় অনেক কিছু করতে হয়।”
“আমি আমার অপছন্দের জিনিস করি না।”
“তুমি আমাকেও পছন্দ করো না। আমার সাথে থাকছো না?”
“আপনাকে আমি কবে বলেছি আপনাকে আমি পছন্দ করি না?”
নওশাদ চিবোতে চিবোতে পুনমের মুখের সামনে খাবার ধরে বলে, “পছন্দ করো তাহলে?”
পুনম খায়। চিবোতে চিবোতে বলে, “আপনার সাথে কথা বলার থেকে করলা খাওয়া ভালো।”
নওশাদ হাসে। পুনম ধরা পড়ে যায়। দৃষ্টি লুকোতে পানি খায়। প্লেটের দিকে ইশারা দিয়ে বলে, “মুরগি দেন। করলা আর খাবো না আমি।”
নওশাদ ঝোল দিয়ে মেখে পুনমকে খাইয়ে দেয়, নিজেও খায়। পুনম বই বন্ধ করে নওশাদের দিকে ঘুরে বসে। নওশাদ বলে,
“কালকে পরীক্ষা গাধা। পড়াশোনা করো। এবার ফেল করলে সোজা আউট।”
“খেয়ে আবার পড়তে বসছি।”
“ফাঁকিবাজির উপর পিএইচডি পাশ করা।”
পুনম শুনেও পাত্তা দিলো না। গালে হাত দিয়ে বলে,
“প্রথম প্রথম জাইমা, জেরিনের কথা শুনে ভাবতাম আপনি অনেক রুড। শুধুশুধু সবার সাথে চোটপাট করেন। ওদের অযথা ধমক টমক দেন। এখন দেখছি ওরা যে বাঁদর, কাজটা ভুল কিছু করেন না। আচ্ছা আরিফ কি করে পারলো এভাবে হাওয়া হয়ে যেতে?”
“সেটা আরিফকেই জিজ্ঞাসা করো।”
“আপা, দুলাভাইয়ের কতটা ফেসলস হলো? যতই তৌহিদা বেয়াদব হোক, ড্রেসআপ গেটআপ যতই খারাপ হোক ও তো বিয়ের আশা নিয়ে বসে ছিল না?”
নওশাদ এক লোকমা খায়। চিবোতে চিবোতে বলে,
“ওই মেয়েকে বিয়ে করেনি একদিকে ভালোই হয়েছে। আবার আরিফের বয়স তো কম না। পাশাপাশি একজন সিআইডি অফিসার হয়েও ওর থেকে এই ধরনের আচরণ আশা করা যায় না। এখন এগুলো বলতে গেলেই তো খারাপ হয়ে যাবো।”
পুনম মাথা নাড়ে৷ “আচ্ছা হাওয়া যে হয়েছে! কোথায় গিয়েছে?”
“বলে গিয়েছে মনে হয়?”
“জেরিন বললো ইসরাত, বড় আপা নাকি ভীষণ খুশি হয়েছে। কিন্তু এভাবে হুট করে উধাও হয়ে যাওয়ায় আপা দুশ্চিন্তা করবে না?”
“ওদের বাপ বেটার কাজই তো আমার আপাকে অযথা টেনশন দিয়ে মেরে ফেলার। ফালাও এইসব। আরিফ যে বিয়ে করলো না রুমঝুম খুশি হয়নি? সেই খবর পাওনি?”
“ও পাগল। ওকে আমি ম্যাচিউর ভেবেছিলাম কিন্তু দেখলাম ও একটা বদ্ধ পাগল।”
“রুমঝুম ম্যাচিউর কোনোকালেই ছিল না। আগে আরিফকে ম্যাচিউর ভাবতাম৷ এখন দেখছি আরিফ রুমঝুমের চাইতেও বড় ইমম্যাচিউর।”
“আরিফ কি না বলে, কয়ে উধাও হয়ে গিয়েছে কারণ ও রুমঝুমকে বিয়ে করতে চায়?”
“এটাই হবে।”
“তাহলে এইসব নাটক না করে সবাইকে ভালো করে বোঝালে হতো না? এরকম আরেকটা মেয়েকে ইনভলভ করার কি দরকার ছিল?”
“নিরপেক্ষভাবে চিন্তা করো। আরিফ সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলো। আমরা বুঝি নাই।”
পুনম বিরক্ত হয়ে বলে, “ধূরর! ওদের ভেজালের চাইতে আমার মাইক্রোবায়োলজি বেশি ইজি। আত্মীয়দের মধ্যে বিয়ের ক্ষেত্রে বুঝি এভাবে ভেজাল লাগে?”
“আত্মীয়দের মধ্যেই বিয়ের ক্ষেত্রে ভেজাল লাগে। লাগবেই লাগবে কারণ এইক্ষেত্রে মানুষ আগে থেকেই পরিবার সম্পর্কে জানে, পারিবারিক সমস্যা জানে, নেগেটিভ দিক জানে। অ্যারেঞ্জ ম্যারেজের ক্ষেত্রে অরিচিত একটা পরিবারে বিয়ে ঠিক করা হয়। আশেপাশের মানুষ থেকে খবর নেওয়া হয় ছেলে কেমন, ছেলের পরিবার কেমন সেই বিষয়ে। দূর সবাই ভালো ভালো বলে। বড় আপারা বাইরে ভালো, দেখলে বোঝার উপায় নেই ঘরের ভিতর এত ঝামেলা। সবাই দূর থেকে দেখে ভালোই বলে। আরিফ, রুমঝুমের অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ টাইপ কিছু হলে বা আগে থেকেই পরিবার সম্পর্কে সবটা না জানলে সেজো আপা সবার আগে মেয়েকে আরিফের হাতে তুলে বিয়ে দিতো। কিন্তু দিতে চায়নি কারণ সেজো আপা জানে বড় আপা কি পরিমাণ কষ্ট করেছে।”
নওশাদ পুনমকে খাইয়ে দেয়। পুনম চিবোতে চিবোতে ভাবুক হয়ে বলে, “আসলেই তো। এটা তো ভেবে দেখিনি।”
নওশাদ পানি খায়। দুজনেরই ভাত খাওয়া শেষ। নওশাদ উঠে দাঁড়ায়। পুনমকে বলে,
“আমি প্লেট ধুয়ে আসছি, তুমি মুখ ধুয়ে পড়তে বসো।”
পুনম মাথা কাত করে। নওশাদ চলে যায়। পুনম মুখ ধুয়ে টেবিলে বই নিয়ে বসে। দুমিনিটের মাথায় ফিরে আসে। পুনমের পাশে চেয়ার টেনে বসে বলে,
“কোনো সমস্যা আছে?”
পুনম পেজ উল্টায়। বলে, “আছে তবে সামনে। এখন যেটা পড়ছি সেটায় সমস্যা নেই।”
“যেটা পারো ওইটা রাতে পড়ো। এখন সমস্যা দেখাও।”
পুনম প্রবলেম দাগিয়েই রেখেছিল। ওগুলো নওশাদকে দেখায়। পুনমের তিন, চারটা টপিকে সমস্যা। নওশাদ খাতায় লিখে লিখে পুনমকে সময় নিয়ে বুঝিয়ে দেয়। পুনম বুঝে। একটা টপিক বুঝিয়ে দিয়ে নওশাদ কলমের ঢাকনা লাগিয়ে বলে,
“বুঝেছো সবটা?”
“জ্বি।”
বুকে হাত গুঁজে চেয়ারে হেলান দিয়ে নওশাদ বলে,
“যা বুঝেছো সেগুলো এখন আমাকে বুঝিয়ে দাও।”
পুনম সুন্দর করেই বুঝিয়ে দিলো। নওশাদ ওভাবে থেকেই বলে,
“ব্রেইন তো মাশাল্লাহ। পড়াশোনা করো না কেনো? ফাঁকিবাজি না করলে তো ভালো রেজাল্ট করতে।”
পুনমের বইয়ের দিকে তাকায়। বইয়ের পাতায় চোখ রেখেই বলে,
“আপনি কি আমাকে খারাপ ছাত্রী মনে করেন?”
“ওনেস্টলি হ্যাঁ।”
“আপনি জানেন আমার ফাইভে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি, এইটে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি, এসএসসিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি ছিল?”
“তাহলে এখন পড়াশোনার এই হাল কেনো?”
পুনম মাথা তুলে না। বলে, “কারণ এখন আব্বুর মতো এপ্রেশিয়েট করার মতো কেউ নেই। আব্বু আমাদেরকে পড়াশোনায় কখনোই প্রেশার দিতো না ঠিকই কিন্তু বড় ভাইয়া, ছোট ভাইয়া, আমি যখন ভালো রেজাল্ট করতাম তখন আব্বু অনেক খুশি হতো। এপ্রেশিয়েট করতো, ঘুরতে নিয়ে যেতো, গিফট দিতো। পড়াশোনা করেও মজা পেতাম। এখন আর আগের মতো কাউকে খুশি করার পড়িও না, পড়তে মজাও লাগে না, তাই ভালো রেজাল্টও করি না।”
নওশাদ সোজা হয়ে বসে। পুনমের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,
“তুমি থার্ড ইয়ারে ভালো করলে তোমাকে নিয়ে কক্সবাজার যাবো প্রমিস।”
পুনম নওশাদের দিকে তাকিয়ে বলে, “কক্সবাজারে নিবেন?”
“কেনো আগে গিয়েছো?”
“যাইনি তবে..”
“তবে?”
“কালকের এক্সামে ভালো করলে কি দিবেন?”
“কি চাও?”
“এই মাসের বেতন পেলে তো টিভি কিনবেন বলেছেন?”
“হ্যাঁ?”
পুনম গা জ্বালিয়ে দেওয়া হাসি দিয়ে বলে, “প্রমিস করুন রেজাল্ট ভালো হলে আমার সাথে বসে টিভিতে বিবাহ মুভি পুরোটা দেখবেন।”
“ফাজিল।”
পুনম হেসে উঠে। নওশাদ বই নিয়ে আরেকটা টপিক বের করে বলে,
“এটায়ও সমস্যা না?”
পুনম হেসে বলে, “জ্বি।”
“না হেসে বুঝিয়ে দিচ্ছি। বুঝে নাও।”
পুনম মন দিলো। নওশাদ পড়া বোঝানোর মাঝে থেমে যায়। পুনম নওশাদের দিকে প্রশ্নবোধক চাহনি নিক্ষেপ করে। নওশাদ গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করে,
“বাবার ভালোবাসা ঠিক কেমন পুনম?”
পুনমের বুক ধকধক করে উঠলো। নওশাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। বাবার ভালোবাসাকে ভাষায় কি করে প্রকাশ করে ওর আসলে জানা নেই। নওশাদ ভ্রু চুলকে বলে,
“হেয়াটএভার! আমরা কথা বলে সময় নষ্ট করছি। পড়ায় মন দাও।”
পুনম পড়ায় মন দিতে পারলো না। নওশাদকে প্রশ্ন করে, “আপনার কি আব্বার কথা মনে পড়ে?”
“আব্বার চেহারা মনে পড়ে না। কিছু কিছু ঘটনা আবছা মনে পড়ে তবে খেয়াল নেই এতটা। আমি আসলে কাউকেই মিস করি না।”
এটা বলে নওশাদ নিজেকে কেবল বুঝ দিলো। যারা সব মুখে বলতে পারে না তাহা হয়তো এভাবেই নিজেকে বুঝ দেয়? পুনম তো জানে নওশাদ মাঝেমাঝেই বাবা-মা মিস করে। পুনম বইয়ের দিকে তাকালো। নওশাদ বুঝিয়ে দিতে লাগলো। একে একে পুনমের সব সমস্যাই ক্লিয়ার হয়ে যায়। বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পড়ে পুনমের বিরক্ত লেগে উঠেছে। নওশাদ বই বন্ধ করে বলে,
“ব্রেক নাও। হাঁটাহাঁটি করো।”
পুনম আড়মোড়া ভেঙে উঠে দাঁড়ায়। হাঁটাহাঁটি করার ইচ্ছে নেই। বিছানায় ধপ করে শুয়ে পড়ে। পাশবালিশ জড়িয়ে ধরে। নওশাদও আধশোয়া হয়ে বসে।
“ঘুমিয়ে পড়ো না আবার। এখন ঘুমালে রাতে ঘুম হবে না। রাতে ঘুম না হলে পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট আসবে না।”
“হ্যাঁ জানি তো। রেজাল্ট ভালো না হলে আপনার সাথে বসে বিবাহ মুভি পুরোটা দেখতেও পারবো না। রেজাল্ট তো আমাকে ভালো করতেই হবে।”
নওশাদ ফোঁস করে শ্বাস ফেলে। পুনমের চোখ লেগে আসতেই নওশাদ টেনে তুলে। দুজনে নামাজ পড়ে নেয়। নামাজ পড়ে পুনম টেবিলে বই নিয়ে বসে। ভালো রেজাল্ট আনতেই হবে। নওশাদকে নাকানিচুবানি খাওয়াতেই হবে। নওশাদ দুইকাপ চা বানিয়ে নিয়ে আসে। নওশাদ পুনমের পাশে বসে প্রশ্ন বানাতে থাকে। রবিবারে কোচিং ক্লাস আছে, ওখানে পঞ্চাশ মার্কের পরীক্ষা নিবে ও।
পুনম পড়তে পড়তে নওশাদের দিকে তাকায়। নওশাদ সিরিয়াস ভঙ্গিতে প্রশ্ন বানাচ্ছে। পুনম বইয়ের মাঝে কলম রেখে বই বন্ধ করে। গালে হাত দিয়ে বলে,
“কি লিখেন?”
“প্রশ্ন বানাই।”
“এক্সাম না সেদিন শেষ হলো?”
“ওটা ফার্স্ট সেমিস্টার ছিল। সেকেন্ড সেমিস্টারের একটা চাপ্টার পড়ানো শেষ। ওইটার উপর রবিবারে এমসিকিউ ক্লাস টেস্ট।”
“কত মার্কসের?”
“ফিফটি।”
“পাশ মার্ক কত?”
“ফিফটি।”
“এ্যাঁ?”
“যা শুনেছো তাই। পঞ্চাশে এক্সাম, পঞ্চাশেই পাশ মার্ক। একসপ্তাহ আগে এক্সামের ডেট দিয়েছি, প্লাস যেভাবে পড়িয়েছি এক নাম্বারও কম পেলে সবগুলোকে ফাটিয়ে ফেলবো।”
পুনম চোখ বড় বড় করে ফেলে, “আপনি মারেন নাকি?”
নওশাদ ফার্স্ট ইয়ারের বইয়ের পেজ উল্টিয়ে প্রশ্ন লিখতে লিখতে বলে, “মেয়েদেরকে তেমন মারি না। সিরিয়াস খারাপ করলে হাতে স্টিলের স্কেল দিয়ে মারি আর ছেলেরা প্রায়ই চোরের মতো মার খায়।”
“সিরিয়াস খারাপ না করলে কি করেন?”
“ক্লাসে পড়াই। ডেইলি পড়া দেই, তবে ডেইলি পড়া ধরি না। চোরের দশদিন, গৃহস্থের একদিন শুনেছোই তো? সেই প্রবাদের মতোই রেন্ডমলি একদিন পড়া ধরি। যেদিন পড়া ধরি, যে পারে তাকে কি বলবো? পড়লে তো ভালোই। আর যারা পড়া না সেগুলোকে আগে একাধারে কান ধরে পুরো ফ্লোর ঘুরাতাম। কিন্তু মেয়েগুলো এমন বেশরমের বেশরম! শাস্তি দেই উল্টো হাসে। পিকনিক মনে করে যেন।
তাই এখন পুরো ক্লাস এক পায়ে কান ধরিয়ে দাঁড়া করিয়ে রাখি। হোমওয়ার্ক দেই মাঝেমধ্যে, হোমওয়ার্কও ডেইলি চেক করি না, মাঝেমাঝে হুট করে চেক করি। হোমওয়ার্ক না করলে বিশবার কানে ধরে উঠবস করাই, সাথে স্কেলের বাড়ি ফ্রি। ফেল করলে গার্ডিয়ান ডাকাই। মোটামুটি একটা স্যারকে অপছন্দ করার মতো যে সকল গুণাগুণ দরকার, তার সবটাই আমার মধ্যে আছে।”
পুনম বই খুলে। “আল্লাহ বাঁচিয়েছে আপনার মতো স্যার আমার কপালে জুটেনি।”
নওশাদ পুনমের দিকে তাকায়। হেসে বলে, “গাধা।”
“গাধা বললেন কেনো? এখন গাধা বলার মতো কি করেছি?”
নওশাদ বাঁকা হেসে বলে, “ওদের টিচার তো আমি শুধু দুই বছরের জন্য। কিন্তু তোমার?”
পুনম চোখ বড় বড় করে বলে, “মানে?”
“মানে এটাই, তোমার থার্ড ইয়ার, ফাইনাল ইয়ার পুরোটা আমার হেফাজতে কাটবে। মাস্টার্স বাকি আছে। তোমাকে আমি বিসিএসও দেওয়াবো। যতবার বিসিএস ক্র্যাক করতে পারবে না, মোদ্দা কথা যতবার বিসিএস দেওয়া যায়, কিন্তু তোমার না হওয়া পর্যন্ত ততবার দেওয়াবো। শেষবারেও না হলে কিছু করা নেই কিন্তু আমি শেষ পর্যন্ত ট্রাই করে যাবো। কোনো ছাড় নেই। আমি ওদের চব্বিশ মাসের টিচার, তাও দিনে ত্রিশ মিনিট বা পঞ্চাশ মিনিটের জন্য। কিন্তু তোমার তো ডে, মর্নিং, নাইটসহ সারাজীবনের টিচার। রিটেক দিয়ে নাও, তারপর তোমাকে ধরছি ভালো মতো। যদি ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট না বানিয়ে ছেড়েছি তাহলে আমিও নওশাদ বিন নাসির না। সব থেকে বড় অভাগা তো তুমি গাধা।”
পুনম বুকে হাত দেয়। চোখ মুখ উল্টে বলে, “আল্লাহ আমার বুকে ব্যথা করছে।”
নওশাদ হাসে। ফের বইয়ের দিকে তাকায়। পুনম বলে,
“সোজা প্রশ্ন বানাচ্ছেন না কঠিন?”
“এমন প্রশ্ন বানাচ্ছি যাতে পাশ করা দায় হয়ে যায়। তারপর সবগুলোকে মজা দেখাবো। বহুত ফাজলামো করেছে কদিন। ফাজিলগুলোকে চিনে রেখেছি, খারাপ করলেই এনকাউন্টার।”
পুনম বুকে হাত দিয়ে আর্তনাদ করে উঠে। “আল্লাহ গো আমার কি হবে? আমি তো বাঁচবো না আল্লাহ। আমার ভাগ্যে এটা কাকে লিখে রেখেছিলে? ওহ আল্লাহ! আমি কার কি ক্ষতি করেছিলাম আল্লাহ! এ কোন জল্লাদের হাতে ফেললে আল্লাহ? ওহ আল্লাহ!”
নওশাদ হাসতে হাসতে বলে, “আল্লাহর কাছে লাখ লাখ শুকরিয়া তোমার মতো বিনোদনকে আমার কপালে রাখার জন্য। ভাগ্যিস বিয়ের আগে তোমার ভাই তোমার সাথে আমাকে কথা বলতে দেয়নি। নাহলে কত বড় বিনোদন জীবন থেকে মিস করে ফেলতাম।”
পুনমের ফোনে কল আসে। পুনম সোজা হয়ে বসে। পাপিয়া কল করেছে। পুনম রিসিভ করে। পাপিয়ার সাথে কথা বলতে বলতে পুনম এক পর্যায়ে বলে,
“কালকে আমার পরীক্ষা।”
“পড়াশোনায় সমস্যা হয় না?”
“কেমন সমস্যা?”
“এইযে সংসার সামলে পড়তে অসুবিধা হয় না? পরীক্ষার সময় তো তুই নিজ হাতেও ভাত খাস না। এখন কাজটাজ করে পড়তে অসুবিধা হয় না?”
পুনম ঠেস মেরে বলে, “কেনো জোর করে, না জানিয়ে বিয়ে দেওয়ার আগে মনে হয়নি মেয়ের পড়াশোনায় সমস্যা হবে? অবিশ্বাস করার আগে মনে হয়নি মেয়ের পড়াশোনার ক্ষতি হবে? এখন বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর পড়াশোনা নিয়ে দুশ্চিন্তা উতলে পড়ছে না?”
পুনম স্বাভাবিকভাবে কথা বলে কেটে দেয়। কল কেটে নওশাদের দিকে তাকিয়ে দেখে নওশাদ পুনমের দিকেই তাকিয়ে আছে। পুনম মোবাইল রেখে বলে,
“এভাবে তাকিয়ে আছেন কেনো?”
“তুমি কি আমাদের বিয়ে নিয়ে আফসোস করো? বাইরে স্বাভাবিক দেখালেও মনে মনে আনহ্যাপি তুমি? সত্যি করে বলো তো।”
“না তো!”
“তোমার কি ড্রিম ছিল এমন ছেলে বিয়ে করবে, তোমার হাসবেন্ডকে এমন হতে হবে? যা যা ইমাজিন করতে সেগুলো আমি মধ্যে না থাকায় আফসোস হয়?”
“আমি কখনোই আমার হাসবেন্ডকে এমন হতে হবে, এটা হতে হবে, ওটা হতে হবে এইসব ইমাজিন করিনি। ভাগ্যে যা আছে তেমনই হবে। বিয়ে, স্বামী ব্যাপারটাকে আল্লাহর উপর ছেড়ে দিয়েছিলাম। কারণ আমার সম্পূর্ণ বিশ্বাস ছিল আল্লাহ আমার সাথে যা করবেন আমার জন্য তা উপযুক্ত হবে। আপনি আমার জন্য উপযুক্ত তাই আপনার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে। আল্লাহকে বিশ্বাস করেছি, আফসোস করার প্রশ্নই আসেনা।”
“তাহলে সবসময় জোর করে বিয়ে দেওয়া, মতের বিরুদ্ধে গিয়ে বিয়ে করা এইসব বলবে না।”
নওশাদ গাইড খোলে। পুনম নওশাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। কিছুক্ষণ পর বলে,
“আপনি কি মাইন্ড করেছেন?”
“না।”
“আমি তো আম্মুকে ঠেস দিয়ে বলি। সিরিয়াসলি বলি না।”
“তোমাদের মা মেয়ের ভিতর ঢুকবো না আমি। যা খুশি বলো, তবে এইযে জোর করে বিয়ে দেওয়া, মত ছিল মা বিয়েতে এইসব আমার সামনে বলবে না।”
পুনম নওশাদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ক্ষীণ গলায় বলে, “আচ্ছা সরি।”
“মাইন্ড করিনি আমি।”
পুনম বই খুলে। পড়ে মাঝেমাঝে নওশাদের দিকে তাকায়। নওশাদ চল্লিশটা প্রশ্ন বানিয়ে ফেলেছে। নওশাদ মুখ না তুলেই বলে,
“পড়ো গাধা। আমার মুখে পড়া লিখা নেই।”
“সত্যি তো মাইন্ড করেননি?”
“না।”
পুনম কিছু বলবে তার আগেই কলিংবেল বেজে উঠে। নওশাদ উঠতে নিলে পুনম উঠে। বলে,
“আমি যাই। জাইমা বা জেরিন হতে পারে।”
নওশাদ কিছু বলে না। পুনম আড়াআড়িভাবে গায়ে ওড়না দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে পড়ে। একটু পর ফিরে একটা খাম নিয়ে। চেয়ারে বসে বলে,
“এই?”
“কি?”
“আরিফ আপনাকে খাম পাঠিয়েছে।”
নওশাদ খামটা নেয়। “কে দিয়ে গিয়েছে?”
“জানি না একটা ছেলে। জিজ্ঞাসা করলো এটা কি নওশাদ বিন নাসিরের বাসা? আমি বললাম জ্বি। এরপর দিয়ে গেল। বললো ওনার বোনের ছেলে আরিফ স্যার পাঠিয়েছে।”
নওশাদ খামটা নেয়। “আমাকে ডাকলে না কেনো?”
“সময় কোথায় পেলাম? দিয়েই তো চলে গেল।”
নওশাদ খাম খুলে দেখে একটা কাগজ। পুনম বলে,
“চিঠি নাকি?”
নওশাদ কাগজের ভাজ খুলে বলে, “হুম।”
“আমি পড়ি?”
নওশাদ পড়লে না। পুনমকে দিলো। “জোরে পড়ো।”
পুনম পুরোটা পড়লো। তবে শেষ লাইনে এসে মুখ কুচকে মুখে অস্বস্তি নিয়ে তোতলাতে লাগলো। “সুস্থ থাকিবেন, ভালো থাকিবেন, আমাকে অতিশিঘ্রই ব, ব, ব, ব…”
নওশাদ পুনমের হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে নিলো। পুনম যদিও পড়ে শুনিয়েছে তাও নিজে মনে মনে পুরোটা পড়লো।
“আমার নানুমণির একমাত্র সাধের ধন, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী, বিশেষ করিয়া পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে পিএইচডি উত্তীর্ণ করিয়া কে কাহার ধারায় বড় হইয়াছে, সেই বিষয়ে সর্বাধিক জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিকে জানাই আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়াবারকাতুহু।
ধারণা করিতে পারি, একমাত্র পুত্রের সন্ধান না পাইয়া ইতোমধ্যে আপনার বড় আপা কান্নাকাটি আরম্ভ করিয়া দিয়াছেন। তাহার মনে সচরাচরই ঘুরিয়া বেড়ায় যে তাহার পুত্র যে পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করিয়াছে, সেই পেশায় শত্রুর অভাব নাই এবং যেকোনো সময় তাহার পুত্র গুম হইয়া যাইতে পারে।
অতএব বিনীত প্রার্থনা এই যে অনুগ্রহপূর্বক তাকে জানাইয়া দিবেন, আমি বর্তমানে সিলেটে অবস্থান করিতেছি। ঘন্টাখানেক পরেই জৈন্তাপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হইব। জানেন অবশ্যই, কিছুদিন পূর্বেই বান্দরবান হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়াছি। ভাবিয়াছিলাম খুনি ধরা পরিয়া গিয়াছে, সমস্যার সমাধান হইয়া গিয়াছে। কিন্তু ভুলিয়া গিয়াছিলাম সেখানকার কেসটি মোটেই স্বাভাবিক ছিল না এবং তাহারই রেশ ধরিয়া আজ সিলেটে আসিয়াছি। আপনারা আমার সহিত আর যোগাযোগ করিতে পারিবেন না। আমি সম্পূর্ণ নেটওয়ার্কের বাইরে অবস্থান করিবো।
আপনার বড় আপার স্বামীকে বলিবেন, তিনি যেন ঘরে অযথা অশান্তি সৃষ্টি না করেন। কেননা তিনি তাহার পছন্দের পাত্রীর সহিত আমার বিবাহ স্থির করিয়া আমারই মতামত গ্রহণ করিবার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন নাই। অতএব, প্রতিশোধ স্পৃহায় মত্ত হইয়া আমিও তাহার মান-সম্মানের বিষয়টি নিয়ে একেবারেই ভাবিলাম না। এক প্রকার ভাবিবার প্রয়োজনীয়তা বোধ করিলাম না। বিবাহ করিবো বলিয়াও বিবাহ করিলাম না। কারণ বিবাহে আমার সম্মতি নাই। আমি কোনো ভেড়া নহি যে মত না থাকিবার পরও বিবাহ করিতে বাধ্য হইবো। তাহারা আমার মত গ্রহণ করিলো না, অতএব যাহা ঘটিল, তাহার দায় সম্পূর্ণ তাহাদেরই। আমি ত্রুটিমুক্ত, দায়মুক্ত।
আমার ব্যাপারে যাহারা ভাবে না, আমিও তাহাদের ব্যাপারে ভাবিয়া সময় অপচয় করিতে ইচ্ছুক নহি। আমাকে কেহ কষ্ট দিলে আমিও তাহাকে সমমানের কষ্ট ফিরাইয়া দিই, আবার অধিকও ফিরাইয়া দিতে পারি, কিন্তু কখনোই কম ফিরাইয়া দিই না। কারণ আমি আপনার ন্যায় কৃপণ নহি। একই সঙ্গে আমি ব-এ-কার, য়-আকার, দ, ব এবং ঋণ রাখিতে পছন্দ করি না।
আপনি আপনার আব্বা-আম্মার বড় সন্তানকে আমার অবস্থান সম্পর্কে জানাইয়া দিবেন– এই আশাই রাখিলাম।
সর্বশেষে বলিয়া রাখি, আপনি শিক্ষর মানুষ, জ্ঞানী মানুষ, আপনি যাহা বলিবেন তাহাই সঠিক। নির্দ্বিধায়, অস্বীকার করিবার কোনো অবকাশ নেই। চিঠিতে সাধু ভাষা প্রয়োগ করিবার ক্ষেত্রে কোন প্রকার ভুল হইয়া থাকিলে ক্ষমা করিবেন, এই প্রার্থনাই করিলাম। যেহেতু আপনি দয়ার সাগর, ক্ষমা পাইবো সেই বিষয়ে শতভাগ নিশ্চিত।
ধন্যবাদ এবং একই সাথে দুঃখিত, আপনার মহামূল্যবান সময় অপচয় করিবার জন্য। আপনি পুনরায় আপনার পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ক জ্ঞানার্জনে মনোনিবেশ করুন। কে কাহার ধারা পাইয়া বড় হয়, কে কাহার স্বভাব পাইয়া থাকে, সে বিষয়ে মনোযোগ সহকারে জ্ঞান অর্জন করুন যাতে ভবিষ্যতে আরো সুন্দর, নিখুঁতভাবে প্যাচ লাগাইতে পারেন। (আল্লাহ দিলে তো মাথায় আবার নোয়াখাইল্লা প্যাচের অভাব নাই। নিঃসন্দেহে ভবিষ্যতে আরো নিখুঁত প্যাচ লাগাইবেন।)
আপনার মহামূল্যবান সময় অপচয় করিয়া আমি আমার স্বল্প মূল্যবান বক্তব্য এখানেই সমাপ্ত করিলাম। আপনার বড় আপাকে আমার কথা বলিতে আবার ভুলিয়া যাইবেন না আবার।
সুস্থ থাকিবেন, ভালো থাকিবেন, আমাকে অতিশিঘ্রই বড় ভাই বানাইবেন।
ইতি,
বেয়াদব বাবার বেয়াদব পুত্র।”
নওশাদ পুনমের দিকে তাকালো। পুনম বলে, “পরের পেজেও কি যেন লেখা।”
নওশাদ পাতা উল্টালো। লেখা, “দুঃখিত মহান ব্যক্তি, আমার নানার বংশের বাতি। ক্ষমা করিবেন কেননা আংশিক ভুল বলিয়াছি। ইতি, যোগ্য মামার, যোগ্য ভাগিনা। আপনার মতোই যোগ্য হইয়াছি কেননা একসময় আপনি এবং আমি একই জায়গায় মলমূত্র ত্যাগে অভ্যস্ত ছিলাম। ফলশ্রুতিতে আপনার ভাইরাস আমার কোথায় কোথায় প্রবেশ করিয়াছে তাহা এই বয়সে লজ্জার মাথা খাইয়া বলিতে পারিবো না।
আপনার বড় আপাকে আমার সংবাদ সুষ্ঠুভাবে পৌঁছাইয়া দিয়া যদি আমাকে বড় ভাই একটু জলদিই বানাইয়া দিতেন! ভুলভাবে গ্রহণ করিবেন না! আপনার তো স্বভাবই প্যাচিয়ে পাচিয়ে সকল জিনিসকে ভুলভাবে গ্রহণ করিবার। এই কাজ হইতে বিরত থাকিবেন, মন এবং মস্তিষ্ককেও সুস্থ রাখিবেন।
ভাবিয়া দেখুন আপনারই লাভের কথা বলিয়াছি। কেননা আপনি নানা হইবার পথে। বাবা হইবার পূর্বেই নানা হইয়া যাওয়া খুবই নেক্কারজনক ব্যাপার। একটা নেক্কারজনক কাজ এমনিতেই করিয়া ফেলিয়াছেন। একই নেক্কারজনক কাজ ফের না করিবার অনুরোধ। আমার অনুরোধ রাখিয়া আপনি আর একই নেক্কারজনল কাজ করিবেন না সেই প্রত্যাশাই করিলাম। আপনার বলদ ভাগ্নিকে ঈর্ষান্বিত অনুভব করাতে বাধ্য হইয়া একটি নিম্নমানের ইয়ের সাথে নাচানাচি করিয়াছি। গা ঘিনঘিন করিবার দরুণ ভোররাতে ঠান্ডা পানি দিয়া গোসল সারিয়া শীতে কাঁপিতে কাঁপিতে আপনার উদ্দেশ্যে চিঠিখানা লিখিয়াছি। আমার এই অক্লান্ত পরিশ্রমকে বৃথা পরিশ্রমে রূপান্তর করিবেন না সেই কামনাই করিলাম।”
নওশাদ দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় বলে, “কেইচ্চাডা লাগে!”
নওশাদ পুনমকে বলে, “তোমার তাও মনে হয় আমি ওদেরকে সাথে বাড়াবাড়ি করি?”
“প্লিজ এখন থেকে একটা থাপ্পড়ের জায়গায় দুটো দিয়েন। প্লিজ। এত চড় খাওয়ার পরও এমন৷ চড় না খেলে কি করতো?”
নওশাদ নোয়াখালির কিছু প্রত্যন্ত, অতন্ত প্রচলিত, বিখ্যাত গালিগুলো দেওয়া থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারলো না।
চলমান…..
(হ্যাপি রিডিং….)

