#বলো_কোন_প্রিয়_নামে_ডাকি:~
#পর্ব_৩২
#সমৃদ্ধি_রিধী
আড়াই মাসের মতো সময় চলে গিয়েছে। পুনমের থার্ড ইয়ারের এক্সাম শেষ হয়েছে গতকাল। তাই ও ভীষণ ফুরফুরে মেজাজে আছে। কিন্তু পুনম ফুরফুরে মেজাজে থাকলেও সকাল থেকে নওশাদ বিন নাসিরের মন-মেজাজ ভীষণ খারাপ। সকাল বলতেও আজ শনিবার হওয়ার দরুণ ওর সকাল হয়েছে বেলা দশটায়। ঘুম ভেঙেছে নিশার ফোনকলে। পুনমও রিংটোনের শব্দে উঠে পড়ে। নওশাদ আড়মোড়া ভেঙে উঠে সোজা ওয়াশরুমে চলে গিয়েছিল। গোসল করার সময় শুনতে পায় পুনম নিশাকে ঠেস মেরে বলছে,
“কেনো জোর করে না জানিয়ে বিয়ে যখন দিয়েছো তখন মনে ছিল না ননদ যখন তখন আসতে পারবে না? তোমাদের ম্যারিজ ডের খাওয়া তোমরাই খাও। তোমার দেবরের বিয়েও তোমরাই দাও। মেয়ে ঠিক করে জানাচ্ছে শুক্রবারে আক্দ। আমার জামাই আমাকে তেহারি খাওয়াতে পারে।”
তিন চার লাইনের কথায় প্রথম লাইনের কথা শুনেই নওশাদের মন মেজাজ খারাপ। গতকাল হোসনেআরার ঘর, ড্রয়িংরুম পরিষ্কার করার পর ঠিক করে রেখেছিল আজ বেডরুম পরিষ্কার করবে। সেই কথা মতো নওশাদ বিছানার উপর চেয়ারে দাঁড়িয়ে ফ্যান পরিষ্কার করছে। মুখে থমথমে ভাব। পুনম ড্রেসিংটেবিল থেকে সব কসমেটিক ফ্লোরে রেখে ড্রয়ার মুছছে। আড়চোখে বেশ কয়েকবার নওশাদের দিকে তাকায়। গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,
“মুড অফ?”
রসকষহীন গলায় জবাব এলো, “না।”
“তাহলে?”
“কি তাহলে?”
“মুখ এমন কালো হয়ে আছে কেনো?”
“তোমার কপাল খারাপ সেজন্য আমার মুড খারাপ হয়ে আছে।”
“মানে? আমার কপাল খারাপ হবে কেনো?”
“ওমাহ হবে না? বাজে খারাপ লোকের সাথে তোমাকে সংসার করতে হচ্ছে। মুড তো খারাপ হবেই।”
“মানে?”
“তোমার তো খুব আফসোস বিয়ে করে।”
“না তো!”
“নাহলে বারবার বলো কেনো জোর করে বিয়ে দিয়েছে। বলেছি না আমার সামনে বলবে না।”
পুনম অবাক হয়ে বলে, “শুনে ফেলেছেন?”
“না আড়ি পেতেছি।”
পুনম গা দুলিয়ে হেসে উঠে। নওশাদ ভ্রু কুচকে তাকিয়ে থাকে। পুনম হাসি থামিয়ে বলে,
“একটা কথা তো জানেনই। আমি প্রচন্ড পরিমাণে শাই আর ভীষণ ইন্ট্রোভার্ট। জীবনে কিছুর সাথে এডজাস্ট করা মানে যুদ্ধ করা। আম্মু, আব্বু, বড় ভাইয়া, ছোট ভাইয়া ছাড়া কারো সাথেই তেমন ফ্রি হতে পারি না। অন্য কারো সাথে এডজাস্ট করতেই পারি না। সেই হিসেবে আপনার সাথে এত তাড়াতাড়ি কি করে মিশে গেলাম?”
নওশাদ ছ্যাতছ্যাত করে বলে, “জেরিন, জাইমার সাথেও তো তোমার মারাত্মক বন্ডিং। ওদেরকে আগে থেকেই চিনতে?”
“আহারে! ওরা মেয়ে। আমরা মাত্র দেড়, দুই বছরের ছোট বড়। ওদের সাথে আমার মেন্টালিটি মিলে। ওরা আমার সাথে মিশতে চেয়েছে, তাই আমিও ফ্রিলি মিশে গিয়েছি। রুমঝুম তো আমারই বয়সী। ওর সাথে মিশি না তা না, তাও আমাদের মধ্যে একটা মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব রয়েছে। ওর সাথে আমার থটস মিলে না। সম্পর্ক খারাপ তা নয়, কিন্তু ইসরাত, রিমি, তাহিয়ার সাথে আমার জাইমা, জেরিনের মতো বন্ডিং নেই।
এর মধ্যে আপনি হলেন গিয়ে পুরুষ মানুষ। আপনি আমার থেকে বয়সেও বড়। জেদ করে তো বিয়ে করে ফেলেছিলাম, কিন্তু পরে মাথায় আসতো আয়হায় কি করলাম! চিনি না, জানি না একটা লোকের সাথে তো বেড পর্যন্ত শেয়ার করতে হবে? এটা একটা মেয়ের জন্য কি ভয়ংকর ব্যাপার আপনি জানেন?”
“এইসব বলতে হবে না।”
“এইজন্যই কারণ আমাদের যদি মাখো মাখো বিয়ে হতো তাহলে আমি জীবনেও আপনার সাথে এত সহজে জীবনেও ফ্রি হতে পারতাম। জড়তা নিয়েই বসে থাকতাম। জেদ করে বিয়ে করায় আমার মধ্যে এই টেনডেনসি কাজ করেছে সবাইকে সংসার করে দেখিয়ে দিবো। রান্না করতে বিরক্ত লাগলেও ওই জেদের বশে শিখে ফেলেছি। জেদের বশেই আপনার সাথে ফ্রি হওয়ার চেষ্টা করেছি। আর দেখুন ফ্রি হয়েও গিয়েছে।”
নওশাদ চুপ করে থাকে। ফ্যানের পাখা মোছায় মনোযোগ দেয়। পুনম ড্রয়ারে সব কসমেটিক রেখে ড্রয়ার লাগায়। বিছানায় উঠে চেয়ারে দাঁড়িয়ে থাকা নওশাদের পা জড়িয়ে ধরে। নওশাদ বিরক্ত হয়ে বলে,
“পড়ে যাবো কিন্তু।”
“পড়বেন না আমি ধরেছি।”
“ধরতে হবে না। একটা পাখাই বাকি। সরো।”
“না সরবো না।”
“মাথায় ময়লা পড়বে কিন্তু।”
“পড়ুক। আপনি ময়লা গুলো সরিয়ে দিবেন।”
“এত হিরিত দেহান লাইগদোনো।” (এত পিরিত দেখাতে হবে না।)
“নোয়াখাইল্লা রিটার্ন।”
“ভালা হইছে।” (ভালো হয়েছে।)
“ওহহ মধু?”
“আই কিন্তু মাথামুতা..” (আমি কিন্তু মাথা..)
“শুদ্ধ ভাষায় কথা বলেন। আমি মাঝেমাঝে কিছু ওয়ার্ডের মিনিং বুঝি না।”
“হাইত্তানো।” (পারবো না।)
পুনম নওশাদের পা দুহাতে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। নওশাদ একটু পর চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,
“মাথাত কাচরা হরেননি?” (মাথায় ময়লা পড়ছে নাকি?)
পুনম নড়েও না, চড়েও না। নওশাদ একটু পর হাতে থাকা ময়লা পরিষ্কার করার কাপড়টা মেঝেতে ছুঁড়ে মারে।
“সরো।”
“রাগে থাকলে সরবো না।”
“রেগে নেই।”
কপাল দেখিয়ে বলে, “চুমু দিয়ে বলুন রেগে নেই।”
নওশাদ চুমু খেয়ে খাট থেকে নেমে যায়। পুনম ঠায় দাঁড়ানো। ও মুখ কুচকে বলে,
“এভাবে অবহেলা করলেন কেনো? এমন ভাব করলেন মনে হলো চুমুর জন্য ভিক্ষা করেছি?”
নওশাদ উত্তর না দিয়ে বিছানার উপর থেকে চেয়ার নামিয়ে রাখে। পুনম ময়লার উপরই জেদ করে শুয়ে পড়ে। নওশাদ কোমরে হাত দিয়ে পুনমের পিঠের দিকে তাকিয়ে থাকে। একটু পর পুনমের মুখের সামনে যায়। পুনম নওশাদকে দেখে আবার অপরদিকে ঘুরে যায়৷ নওশাদ এবার পুনমের হাতে টান দিয়ে ওকে বসায়। মুখোমুখি বসে বলে,
“সমস্যা কি?”
পুনম ভ্রু কুচকে অন্যপাশে তাকিয়ে থাকে৷ নওশাদ পুনমের কপালে চুমু দিয়ে বলে, “এইযে রেগে নেই।”
“লাগবে না এইসব আদিখ্যেতার।”
“লাগবে না?”
“দান-খয়রাতি নেই না আমি।”
“এইসবকে দান-খয়রাতি বলে না।”
“আপনি তখন এমন দাম দেখালেন কেনো?”
“তোমার মা ভাই দিনে তিনবার কল দেয়, তুমিও তিনবেলা তিনবার খালি বলো কেনো জোর করে বিয়ে দিয়েছে, জোর করে বিয়ে দিয়েছে।”
“জোর করেই তো বিয়ে দিয়েছে। মিথ্যা বলেছি?”
“তোমাকে মনে হয় আমি বানের জলে ভাসিয়ে দিয়েছি এমনভাবে বলো।”
“আপনি কিভাবে বুঝবেন বিয়ের দিন আমার কেমন অনুভূতি ছিলো?”
“কেমন ছিল? আত্মহত্যা করার মতো অনুভূতি ছিল?”
“জ্বি না। নওশাদ বিন নাসিরকে খুন করার মতো অনুভূতি ছিল।”
“ওমাহ কেনো?”
“তাকে এত ভালো হতে হবে কেনো যে খোঁজখবর নিয়েই, লোকমুখে তার সুনাম শুনেই আমার বড় ভাই তার হাতে বোনকে তুলে দেওয়ার জন্য একদম পাগল হয়ে গিয়েছে?”
“আমার দোষ?”
“তারপর না আপনাকে চিনি, না কাউকে চিনতাম। অদ্ভুত লাগেনি এই বাসায় এসে? সব এর উপর নোয়াখাইল্লা। না বুঝি ভাষা, না বুঝি মজা। তার উপর ঘুমাতে গেলে ভয়ে ভয়ে থাকা লাগতো।”
“কেনো?”
“যদি কিছুমিছু করে বসতেন?”
নওশাদ কপাল কুচকে বলে, “পাগল মেয়ে একটা।”
“তাই ওদেরকে খোঁটা দিয়ে বলি। মনের শান্তি।”
নওশাদ পুনমের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। নীরবতা ভেঙে একটু পর বলে,
“সত্যি কথা বলো তো! সুখী হতে পারছো আমার সাথে? শুধুই খোঁটা দিয়ে বলো নাকি রাগ ক্ষোভ থেকে?”
পুনম নওশাদের গলা জড়িয়ে ধরে। “সব গায়ে মাখেন কেনো? আপনাকে তো বলি না। ওদেরকে বললে শান্তি লাগে।”
নওশাদ পুনমের দিকে তাকিয়ে থাকে। পুনম নওশাদের দুগালে হাত রেখে শয়তানি করে বলে,
“আপনি কি জানেন আপনি বিয়ের পর মোটা হয়ে গিয়েছেন? আগে একটু হ্যান্ডসাম ছিলেন। আর এখন..”
বলে হাসতে থাকে। নওশাদ কপাল কুচকে বলে,
“এখন?”
নওশাদের পেটে হাত রেখে পুনম বলে, “বড় হয়ে যাচ্ছে। কেনো? সুখবর আছে?”
“তবে রে!” নওশার পুনমের হাত ধরে ওকে বিছানায় ফেলে কাতুকুতু দেওয়া শুরু করে। পুনম হাত পা ছুঁড়ে হাসতে থাকে। হাসতে হাসতে চোখে পানি চলে আসে। নওশাদ তখন ওকে ছেড়ে দিয়ে বলে,
“আর শয়তানি করবে?”
পুনম হাঁপাতে হাঁপাতে সোজা হয়ে বসে বলে,
“করবো।”
নওশাদ আফসোস করে বলে, “কুত্তার লেজ সোজা হওয়ার নয়।”
পুনম শোয়া থেকে চট করে উঠে দাঁড়ায়। নওশাদ অবাক হয়ে বলে,
“কি হয়েছে?”
“আপনি এভাবে কাতুকুতু দিলেন কেনো? আমার এখন ভীষণ বমি পাচ্ছে।”
“কাতুকুতু দিলে বমি পায় কার? পাগল নাকি!”
পুনম এক দৌঁড়ে ওয়াশরুমে চলে যায়। নওশাদ ঘাড় ঘুরিয়ে কপাল কুচকে তাকায়। উঠে ওয়াশরুমের সামনে গিয়ে দেখে পুনম দরজা লাগিয়ে দিয়েছে। নওশাদ দরজায় নক করে বলে,
“এই সময় লাগবে বমি হচ্ছে?”
পানি পড়ার শব্দ আসছে। পুনম জবাব দেয় না। নওশাদ দরজার সামনে দাঁড়িয়েই থাকে। পুনম পাঁচ মিনিট পর বের হয়। নওশাদ কপাল কুচকে বলে,
“বমি হয়েছে?”
“সব আপনার জন্য হয়েছে। কাতুকুতু দিলেন কেনো?”
“কাতুকুতু দেওয়ায় কিছু হয়নি। সকাল থেকে না খাওয়া তাই গ্যাস্টিক হয়ে গিয়েছে। গ্যাস্টিক থেকে বমি হয়েছে।”
“হতে পারে।”
নওশাদ রুম থেকে বেরিয়ে যায়৷ পুনম ওয়ারড্রবের কাছে যায়। ড্রয়ারের অবস্থা আউলা ঝাউলা। ও সময় নিয়ে নিজের, নওশাদের ড্রয়ারের জামাকাপড় গুছিয়ে রাখে। নওশাদ তখন ফিরে দুই মগ কফি আর বিস্কিটের বোয়াম নিয়ে রুমে আসে। পুনম ড্রয়ার লাগিয়ে বলে,
“চা এনেছেন? খাবো না। ইচ্ছে করছে না।”
“কফি এনেছি।”
টেবিলের উপর ট্রে রেখে নওশাদ বিছানার চাদর উঠিয়ে ফেলে। ফ্যান মোছার পর ময়লা পড়েছে। পুনম চেয়ার টেনে বসে। নওশাদও চেয়ার টেনে পুনমের মুখোমুখি বসে। বিস্কিটে খেতে খেতে বলে,
“তোমার ভাবি কল করেছিল কেনো?”
“যেতে বললো। শুক্রবারে নাকি ছোট ভাইয়ার আক্দ।”
“মেয়ে দেখলো কবে?”
“মেয়ে দেখতে হয়? প্রেমিকাকে বিয়ে করবে। এই প্রেমিকাকে বিয়ে করতেই তো আমার নামে উল্টোপাল্টা কথা বলেছে।”
“তো তোমার দুই ভাইয়েরই লাভ ম্যারেজ?”
“ওদের জন্য সব জায়েজ। আমি করলেই হরতাল।”
“তো যাবে না?”
“যাবো তো অবশ্যই।”
“কবে?”
“মঙ্গলবারে। বৃহস্পতিবারে নাকি ছোটখাটো হলুদের আয়োজন করবে।”
“হলুদও করতে হয়?”
“তো সবাই আপনার মতো নাকি? আমার কাজিন সিস্টারগুলোও আসবে। ভাবি দেখলাম নাচ গানের কথাও তুলেছে। আমরা কাপল ডান্স করবো হ্যাঁ?”
“আমি নাচতে পারিও না, নাচতে পছন্দও করি না।”
“না নাচুন গিয়ে। সবাই নাচলে আমিও নাচবো। মজাই হবে।”
“কার সাথে নাচবে?”
“কাজিনদের সাথে।”
“তুমি ম্যারিড হয়েও ঢ্যাং ঢ্যাং করে নাচবে?”
“কি হবে? আমার বয়স কি আহামরি নাকি? মাত্র বাইশ বছর।”
“না, নাচবে না তুমি।”
“কেনো?”
“আমি পছন্দ করি না।”
“আপনার মন মানসিকতা বুড়োদের মতো।”
“ঘরে নাচো, কিন্তু সবার সামনে স্টেজে নাচতে হবে না।”
“কেনো?”
“ঘরে নাচো না? লাফিয়ে নাচো, চিৎ হয়ে শুয়ে নাচো, বাঁকা হয়ে নাচো, উপুড় হয়ে নাচো। নিষেধ করবো না। তাও সবার সামনে না।”
“সমস্যা কি বলুন?”
“বেখেয়ালে শাড়ি সরে গেলে? তুমি যে ইররেসপন্সিবল।”
“পিনআপ ভালো করে করলেই হয়।”
“যা ইচ্ছা করো।”
পুনম অতিষ্ঠ হয়ে বলে, “এই! আবার মুখ কালো করে ফেলেছেন। কথায় কথায় তো এভাবে আমিও মুখ ফুলাই না।”
নওশাদের কফি খাওয়া শেষ। ও খালি মগ টেবিলে রেখে চেয়ার টেনে উঠে দাঁড়ায়। পর্দা খুলে ফেলে। এগুলো সব ধুতে হবে। পুনম নওশাদকে ভেংচি কেটে বলে,
“নাচবোও না, আপনাকে মানাতেও আসবো না।”
পুনম টেবিলে খালি মগ, বিস্কিটের বোয়াম রেখে আসে। বিছানায় নতুন চাদর বিছাতে নিলে নওশাদ বলে,
“সিলিং ঝাড়া বাকি আছে। নতুন চাদর পেতো না। তুমি এক কাজ করো। পর্দা, বেডশিট, বালিশের কভার সব ভিজিয়ে রাখো।”
পুনম তাই করলো। এসে বারান্দা পরিষ্কার করে ফ্লোর মুছে নেয়। নওশাদ লম্বা ঝাড়ু দিয়ে সিলিং ঝাড়ে। পুনম রুমে এসে বলে,
“আমাদের বারান্দায়ও কিছু টব লাগানো উচিত।”
“আম্মার ঘরের বারান্দায় আছে না?”
“আমাদের রুমে বারান্দায় তো নেই।”
“যত্ন নিতে পারবে না।”
“এহহ! লাগে যেন নিজে যত্ন নিয়ে তড়ায় ফেলে। কয়দিন গাছে পানি দিয়েছেন? আম্মার ঘরের ফুলগাছ, মানিপ্লান্ট সবগুলোর যত্ন তো আমিই করি।”
“আচ্ছা লাগিয়ো গাছ।”
নওশাদ চেয়ার থেকে নিচে নেমে চেয়ার জায়গা মতো রাখে। ঝাড়ুও জায়গা মতো রাখে। রান্নাঘরে চলে যায়। পুনম আরেকটা ছোট কাপড় নিয়ে আলামরির গা মুছে। যে হারে ধুলা ঢোকে ঘরে! খাটের কার্ডবোর্ড মুছে বিছানার চাদর বিছায়। ফ্লোর ঝেড়ে মুছে জোরে ফ্যান চালিয়ে দেয়, যাতে ফ্লোর দ্রুত শুকিয়ে যায়।
রান্নাঘরে গিয়ে নাক কুচকে বলে, “ছিহ কি রান্না করছেন? কি গন্ধ!”
নওশাদ অবাক হয়ে বলে, “মুরগি ভিজিয়েছো তো নিজেই। মুরগি রান্না করছি। তোমার না ফেভারিট? তাহলে নাক কুচকাচ্ছো কেনো?”
পুনম তিন কাপ চাল নেয়। চাল ধুয়ে নিতে নিতে বলে,
“কে জানে! ভালো লাগছে না।”
এক চুলায় মাংস রান্না হচ্ছে, অন্য চুলায় পুনম ভাত বসিয়ে দিয়ে বলে,
“আপনি না আমাকে কক্সবাজার নিয়ে যাচ্ছিলেন?”
“রেজাল্ট বের হোক। রেজাল্ট ভালো হলে কোনো কথা নেই। সোজা কক্সবাজার।”
“পরীক্ষা ভালো হয়েছে। সো রেজাল্টও ভালো হবে।”
“অনেকের পরীক্ষা ভালো হলেও রেজাল্ট ভালো হয় না।”
“আমার ছোট ভাইয়ার।”
পুনম সরে আসে। “বিরক্ত লাগছে।”
“কি?”
“চুলার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে। আমি টিভি দেখতে গেলাম।”
“তোমার মধ্যে আমি পাগল হওয়ার সব সিম্পটম দেখতে পাচ্ছি।”
“আপনিই তো বানিয়েছেন।”
“খুব।”
“আমি গেলাম। আপনি রেঁধে খাওয়ান আমাকে।”
পুনম বেরিয়ে গেল। রুমে গিয়ে ফ্যান অফ করে সোফায় কাত হয়ে শুয়ে পড়ে। টিভি ছেড়ে পাকিস্তানি ড্রামা দেখতে থাকে। নওশাদ রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসে। পাশের সিঙ্গেল সোফায় বসে বলে,
“এইতো শুরু হয়ে গিয়েছে। তু মুঝসে পেয়ার কারতি হে ইয়া নেহি কারতি।”
“তো আপনি এসেছেন কেনো? রুমে গিয়ে ভোস ভোস করে ঘুমান।”
“আমি পাহারা দিচ্ছি তুমি উল্টাপাল্টা কিছু দেখছো না।”
নওশাদকে ব্যঙ্গ করে বলে, “আইছে পাহারা দিতে।”
“জাইমা, জেরিন না এইসময় বাসায় আসে?”
“আপনি থাকলে তো আসে না।”
“কেনো?”
“ওরা তো বলে আমাদেরকে প্রাইভেসি দেয়। মেইন কথা আপনাকে ভয় পায়।”
নওশাদ মজা করে বলে, “আসো প্রাইভেসির কাজ করি।”
পুনম বিরক্ত হয়ে উঠে বসে। “ধূর আবার বমি পাচ্ছে। আপনি উল্টাপাল্টা কথা বললেই, উল্টাপাল্টা কিছু করলেই আমার বমি পায়।”
“হ্যাঁ আমি একসপ্তাহ ধরে কিছু বলি আর তোমার শুধু বমি পায় না? খেতে বললে বমি পায়, পড়তে বললে বমি পায়, ঘুমাতে বললে বমি পায়।”
“আপনি জড়িয়ে ধরলেও বমি পায়।”
নওশাদ উঠে দাঁড়ায়। “আমি এখন আবার জড়িয়ে ধরবো।”
“সত্যি বলছি আপনি কাছে আসলেই বমি পায়।”
নওশাদ পুনমকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। পুনম নওশাদের বুকে কিল ঘুষি মেরে বেসিনের সামনে ছুটে যায়। সত্যি সত্যিই বমি করে। নওশাদ পুনমের পিছন পিছন আসে। অসহায় চোখে তাকিয়ে বলে,
“আসলেই বমি পায়?”
“মশকরা করেছি নাকি?”
“তোমার কি হয়েছে বলো তো?”
“আপনি দূরত্ব মেইনটেইন করুন৷ ঠিক হয়ে যাবে।”
নওশাদ রান্নাঘরে চলে গেল। পুনম একটু পর টিভি বন্ধ করে রান্নাঘরে গিয়ে নওশাদের পিছনে দাঁড়ায়। নওশাদ বলে, “কি?”
পুনম নওশাদকে পেঁচিয়ে জড়িয়ে ধরে। নওশাদ বলে, “বমি পাচ্ছে না?”
“না। প্রেম পাচ্ছে।”
“বিকালে প্রেমের উপর ক্লাস নিবো।”
“তখন কিন্তু বমি পাবে। একদম গায়ে বমি করে দিবো।”
“দিও। মুখ চেপে ধরে রাখবো।”
নওশাদের পিঠে গাল ঘষে বলে, “করবেন না জানি।”
নওশাদ কড়াইয়ে ঢাকনা দিয়ে চুলার আঁচ কমিয়ে দেয়। হাত ধুয়ে পুনমের দিকে তাকায়। ভ্রু নাচাতেই পুনম নওশাদকে ছেড়ে রুমে চলে যায়। অলস মস্তিষ্ক যে শয়তানের বাসা সেটা নওশাদকে শুক্রবার, শনিবার দেখলেই বোঝা যায়। বাসায় থাকবে আর শয়তানি, ভোগলামি করার চিন্তা করবে।
________________________
আরিফ খেয়েদেয়ে রুমে এসে দরজা লাগাতেই রুমঝুম আরিফকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে। আরিফ অবাক হয়ে বলে, “কি হয়েছে?”
রুমঝুম আরিফের সামনে এসে আরিফের পায়ের উপর দাঁড়িয়ে বলে, “হাতের ব্যান্ডেজ খুলেছো দুইদিন হবে। তাও তো আমাকে পাত্তাই দিচ্ছো না।”
এতদিন ভাঙা হাত নিয়ে সব কাজ করতে আরিফের ভীষণ কষ্ট হয়েছে। এখন হাতও ভালো হয়েছে, অনেক বড় একটা কাজের ধকলও গিয়েছে। আরিফ ক্লান্ত গলায় বলে, “কাজের প্রেশার। আর কিছু না।”
“বেশি ক্লান্ত?”
রুমঝুমকে ছেড়ে দিয়ে ঔষধের বক্স থেকে টাফনিল বের করে খায়। রুমঝুম বলে, “মাথা ব্যথা?”
“হুম।”
“ওহহ।”
“কালকে ছুটি আমার।”
“কেনো?”
“ছুটি নিয়েছি।”
“কি উপলক্ষে?”
“এমনিতেই। আজকে একটা কাজ শেষ হলো। একটু ব্রেক লাগবে।”
“ওহ আচ্ছা।”
রুমঝুম ওয়াশরুমে যায়। বের হয়ে দেখে আরিফ লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়েছে। রুমঝুম মুখ মুছে আরিফের পাশে শুয়ে পড়ে। রুমঝুম আফসোস করে বলে,
“তোমাকে বিয়ে করে কত লস হলো জানো?”
“মানে?”
“প্রথমে ভাঙা হাত নিয়ে ঘুরলে আড়াইমাস। কোথাও যেতে পারিনি। কোনো ফটোশুট করতে পারিনি। কিছু করতে পারিনি। লাস্ট পনেরোদিন ঘুরলে কাজের পিছনে পিছনে। আমাকে এক চিমটি পরিমাণ সময়ও তো দিতে পারলে না ঠিকঠাক।”
“সময় দিতেই তো কাল ছুটি নিলাম।”
“কি আর করবে? হাতিরঝিল নিয়ে বাদাম খাওয়াবে।”
“তো কি করতে চাচ্ছো?”
“কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সিলেট কোথাও তো ঘুরতে নিতে পারো। আমি কোথাও যাইনি।”
“বড় ছুটি পেলে নিবো।”
“তোমার আর ছুটি। বিয়ে করলে আরো ঘরবন্দী হয়ে গেলাম। আগেও ঘর বন্দী ছিলাম, এখনও ঘর বন্দী।”
আরিফ তাকিয়ে থাকে। রুমঝুম বলে, “এভাবে তাকিয়ে আছো কেনো? আম্মুকে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার কথা বললেই আম্মু বলতো জামাইকে নিয়ে যেও। এখন জামাই নিজে কোমরে রিভলবার নিয়ে নিজে টইটই করে ঘুরে, আমি কোথাও যেতে পারিনা।”
“আফসোস করতে করতে মরে যাহ এখন।”
“লস হলো আমার বিয়েটা করে। ধূরর!”
“আমাকে বিয়ে করে পস্তাচ্ছিস?
রুমঝুম মজা করে আরিফের গলা জড়িয়ে ধরে বলে, “হ্যাঁ অনেক।”
“তোর মনে হচ্ছে তোর মা, মামা, খালা যা বলেছে ঠিক?”
“হ্যাঁ।”
“তুই বল আমি তোকে কেনো বিয়ে করলাম?”
রুমঝুম অবাক হয়ে বলে, “মানে?”
“আমার তো সারাজীবন অবিবাহিত থাকাও ভালো ছিল, তোকে বিয়ে করার চাইতে।”
“মানে?”
“কম কাহিনি করিসনি বিয়ের আগে। তুই তো কাহিনি করেছিসই, তোর মা, খালা, মামা সবাই কাহিনি করেছে। সুস্থভাবে প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলাম, ফিরিয়ে দিয়েছে। কি বলে ফিরিয়ে দিয়েছে? উল্টাপাল্টা ব্লেম করে যা ইচ্ছা তা লেইম কথাবার্তা বলেছে। একবার তোর কাছে, একবার তোর নানার গুষ্টির কাছে রিজেক্টেড হওয়ার পরও আমার এত কিসের ঠেকা ছিল তোকে বিয়ে করার? তোর ভাগ্য ভালো আমার বাপকে কথা শোনানো হয়েছিল বলে আমার বাপ নিজ থেকে গিয়েছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। নাহলে আমি যেতামও না। তিক্ত হলেও সত্যি আমার ইগো বেশি, তোর মামার কি ইগো? আমার এর চাইতে দশগুণ বেশি ইগো।
তোর পা পর্যন্ত ধরেছিলাম। বারবার জিজ্ঞাসা করেছিস বল কি হয়েছে? দাম দেখিয়েছিলি। নায়িকা সাবানা হতে চেয়েছিলি হয়তো। তারপরও আম্মুকে নিয়ে তোর মাকে প্রস্তাব দিলাম। সেদিন আমাকে যেভাবে তোর মা, খালা, মামা কথা শুনিয়েছে, তৌহিদার সাথে বিয়ে ভাঙার পরও আমি জীবনেও আর প্রস্তাব নিয়ে যেতাম না। তৌহিদাকে বিয়ে করতাম না সেটা আগে থেকেই ঠিক করা। ওটা আমার বাপকে টাইট দেওয়ার জন্য। দিয়েছিও। যে টাকা লস হয়েছে আমার বাপকে কয়েকদিনের মধ্যেই পাবনা নেওয়া লাগবে। হোয়াটএভার আমাদের বাপ, ছেলের মধ্যকার সেই চ্যাপ্টার তোর না জানলেও চলবে।
তোকে মারা উচিত হয়নি, আগেও সরি বলেছি, এখনও সরি বলছি। গে বলার কারণে মার খেয়েছিস আবার একই সাথে সেই সময় তোর পেট থেকে কথা বের করার জন্য আমার অন্য উপায় জানাও ছিল না। তখন টু বি অনেস্ট মাথাও কাজ করেনি। আর তোর পেট থেকে কথা বের না করতে পারলে এতকিছু বুঝতাম না।
আমি আমার জায়গা থেকে ক্লিয়ার। এখন আমি এগ্রেসিভ হলে এগ্রেসিভ। বাপের মতো হলে বাপের মতো হয়েছি। বাপের ছেলে হয়ে চাচার মতো হবো না। কিছু না করে টরে দোষী বানিয়ে দিয়েছিল সবাই। ওয়াও ফ্যান্টাস্টিক। এত সহজে ভুলবো সব? সবার সাথে হাসি মুখে থাকি, বেয়াদবি করি না বলে সব ভুলে গিয়েছি? তোর মা, মামা এসে ভাব জমাতে চাইবে ভাব জমিয়ে ফেলবো? আরিফ মেরুদণ্ডহীণ?”
রুমঝুমের চোখে পানি আসে। “খালু প্রস্তাব না নিয়ে গেলে তুমি আর বলতে না? বিয়ে করতে না আমাকে?”
আরিফ কাটকাট গলায় বলে, “না।”
রুমঝুম ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকে। “কি মনে হচ্ছে জীবনে ঠকে গিয়েছিস? তুই আগে থেকেই জানতি আমার ইগো বেশি, তুই শুরু থেকেই সব থেকে সম্পর্কে জড়িয়েছিস। আমার ফ্যামিলির এ টু জেড, যেটা আমিও জানতাম না সেটাও তুই জানতি। আমি তোকে রিলেশনে যাওয়ার আগেও জোর করিনি, রাগ উঠলেও, ভালোবাসার দাবি করলেও টক্সিকদের মতো জোর করে বিয়েও করিনি। এন্ড মোস্ট ইম্পর্ট্যান্ট তোর মতো ফালতু লুকোচুরিও খেলিনি। আমি স্ট্রেট ফরওয়ার্ড বলেই আমি বেয়াদব। এন্ড আম ফাইন উইথ দ্যাট। তোদের মা, খালা, মামার মতো লুকোচুরি খেলে সাধু হই না।”
আরিফ পাশ ফিরে শুয়ে পড়লো। আর এদিকে রুমঝুম সারারাত কাঁদলো। কাঁদতে কাঁদতে চোখ মুখ ফুলিয়ে যা তা অবস্থা। আরিফ ধরলোও না, রুমঝুমের দিকে তাকালোও না। টাফনিল খাওয়ার প্রভাবে দারুণ একটা ঘুম দিয়ে উঠলো। মাঝে মাঝে কাঁদার দরকার আছে। চোখের ময়লাও পরিষ্কার হয়ে যায় সাথে বেশি কাঁদলে নাকি আবার স্ক্রিনও গ্লো করে।
___________________
আরিফের ঘুম ভাঙলো নয়টা নাগাদ। উঠে রুমঝুমকে পাশে পেলো না। আরিফ আড়মোড়া ভেঙে উঠে যায়। বিছানা গুছিয়ে গোসল করতে চলে গেল। মেয়ে আবার কেঁদে কেটে রাগে ক্ষোভে বাপের বাড়ি চলে গেল নাকি? যেতেও পারে বলা যায় না।
আরিফ গোসল টোসল করে রুম থেকে বের হয়। ড্রয়িংরুমে শুনশান নীরবতা।
ট্রাউজারের পকেটে হাত ঢুকিয়ে সোজা কিচেনে গেল। রুমঝুম একা রুটি বেলছে। আরিফ আশেপাশে চোখ বুলিয়ে দেখে কেউ নেই। ও শীষ বাজাতে বাজাতে রুমঝুমের পাশে এসে দাঁড়ায়। রুমঝুম আরিফের দিকে এক পলক তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নেয়।
“আম্মু কোথায়?”
“ঘরে।”
“উঠে নাই?”
“উঠেছিল।”
“তো এখন ঘরে কেনো?”
“শরীর ভালো লাগছে না বললো। শুয়ে আছে।”
“এখনও নাস্তা রেডি হয়নি যে?”
রুমঝুম উত্তর দিলো না কোনো।
“আব্বু ভ্যানভ্যান করেনি?”
“খালু খেয়েদেয়ে কাজেও চলে গিয়েছে।”
আরিফ রুটির দিকে তাকিয়ে বলে, “এইসব কোন দেশের মানচিত্র বানাচ্ছিস? রুটি হয় গোল, তোরটা কি শেইপ হয়েছে?”
রুমঝুম তাকালো রুটিগুলোর দিকে। গোলই আছে। ইচ্ছে করে আরিফ এমনটা বলেছে। রুমঝুমের অন্যকিছুর দিকে মানুষ হাজারও আঙুল তুললেও রান্নাবান্নায় কেউ খুঁত পায়না।
“তোর এই হাফ গোল রুটি তুই খাস।”
রুমঝুম কিছু বললো না। চুলা জ্বালিয়ে তাওয়ায় রুটি সেঁকতে থাকে।
“আব্বু কি গাড়ি নিয়ে গিয়েছে নাকি এমনিই গিয়েছে?”
“জানি না।”
আরিফ রুমঝুমের পিছনে দাঁড়িয়ে রুমঝুমের কোমরে হাত রেখে কাঁধে থুতনি ঠেকায়। “গাড়ি না নিলে লং ড্রাইভে যাবো।”
রুমঝুম আরিফের হাত সরিয়ে দিয়ে বলে, “যাবো না আমি কোথাও।”
“ওরে বাবারে! রেগে তো ফুলে আছে।”
রুমঝুম শব্দ করে সিঙ্কে খুন্তি রাখে। আরিফ হেসে বলে, “খুব ভয় পেয়েছি। ভয়ে কাঁপছি দেখ।”
রুমঝুম রেগে চিৎকার করে ওঠে। “ভালো লাগছে না কিন্তু।”
রুমঝুমকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে আরিফ হেসে বলে, “আরেহ খালাতো বোন তো চরম রেগে আছে।”
নিজেকে ছাড়াতে ছটফট করে বলে, “গায়ে হাত দিবে না।”
কোমরে চিমটি কেটে বলে, “তুমি যে দাও? আমার ভাঙা হাতের সুযোগ নিয়ে কি কি করেছো মনে নেই?”
রুমঝুম তাও ছটফট করতে থাকে। “ছাড়তে বলেছি না?”
“কেনো ছাড়বো? আমি প্রথমে ছোঁয়াছুঁয়ি শুরু করেছিলাম নাকি তুই?”
“কিছু করি নাই আমি।”
রুমঝুমকে নিজের দিকে ফিরিয়ে বলে, “কিছু করো নাই বেবি? বিয়ের পর আমার ভাঙা হাতের সুযোগ নিয়ে প্রথম জড়িয়ে ধরেছিলো কে? প্রথম কিস করেছিল কে? শাড়ি পড়ে আমার সামনে রংঢং করেছিলো কে? তখন তো হাত ঠিক না বেঁচে গিয়েছিলি। এখন তো পার পাবি না মনা।”
রুমঝুম রেগে বলে, “হ্যাঁ সবকিছু প্রথমে আমিই করেছি। ভালোবাসার কথাও বলেছি আমি প্রথম, বিয়ের পর জড়িয়ে ধরেছি, কিসও করেছি আমি প্রথম। সবকিছু করে আমার অন্যায় হয়ে গিয়েছে। মাফ করে দেন আমাকে।”
“আমার ভাঙা হাতের সুযোগ নিয়ে যা যা করেছিস শোধ নিতে হবে না?”
“ছাড়ো বলছি।”
“ছাড়বো না।”
“আমি কিন্তু কামড় দিবো। কামড় দেওয়ার পর তুমি মারলে আরো কামড় দিবো।”
“দেখ বিয়ের আগে মার খেয়েছিস কেনো? কারণ আমার তোকে ছোঁয়ার বৈধতা ছিল না। এখন তো আছে। ওইযে তোর ডার্ক রোমান্সে থাকে না? বিয়ের আগে কিস করে টাইট দিয়ে ফেলা টাইপ জিনিসপত্র? বিয়ের আগের ওসবের সাথে আমার যায় না। তাই এখন তো মারবো না বেবি। এখন ওই ডার্ক রোমান্সের ওগুলো করে। কিভাবে করবো দেখবে?”
“কিচেনে গা ঘেঁষাঘেঁষি করবে না বলে দিলাম।”
আরিফ রুমঝুমের ঘাড়ের পিছনে হাত রেখে অধরে অধর চেপে ধরে। রুমঝুম প্রথমে ছটফট করলেও পরে আর করে না। আরিফ ছেড়ে দেয়।
“জাদু কেসা থা?”
রুমঝুম ফ্লোরে বসে কাঁদা শুরু করে। আরিফ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। রুমঝুমের পাশে বসে বলে,
“এভাবে মরা কান্না জুড়ে দিয়েছিস কেনো?”
“তুমি খুব খারাপ, খুব খারাপ, খুব খারাপ।”
আরিফ হাত বাড়িয়ে বলে, “সব মিটমাট। তুই কাহিনি করেছিস, আমিও কাহিনি করে তোকে কাঁদিয়েছি। সব ঝামেলা ডিসমিস। আবার জানিসই তো কাপলদের ঝগড়া হওয়ার জন্য কোনো টপিক লাগে না। কি থেকে কি যেন হয়ে যায়। এই যেমন ঘোরাঘুরির টপিক থেকে আমাদের ঝামেলা লেগে গেল। এখন আমার হাতও ঠিক করে গিয়েছে। আর এইসব করবোও না। এখন থেকে ভালোভাবে সংসার করবো ওকে? এবার আয়।”
রুমঝুম আরিফকে জড়িয়ে ধরে। কাঁদতে কাঁদতে আরিফের বাহুতে, টিশার্টে নাকের পানি মুছে।
“ছিহ খবিশ। বিয়ে করেছিস এখনও তুই মানুষ হবি না? আমার গায়ে সর্দি মুছছিস কেনো বেয়াদব? আমি একটু আগেই গোসল করেছিলাম। ইয়াক!”
চলমান…
(হ্যাপি রিডিং)

