#আফরিন_আখ্যান
#পর্ব_১৭ (খ)
#সমৃদ্ধি_রিধী
ফারিন আহিয়ানকে ইশার কাছে দিয়ে এসেই ঘর গোছানো শুরু করে। আহিয়ান জিনিসপত্র ছোড়াছুঁড়ি করে অবস্থা খারাপ করে ফেলেছে ঘরের। একদণ্ড কোথাও স্থির থাকে না ইদানীং। কোনোরকমে দাঁড়িয়ে কয়েক পা ফেলে ধুমধাম পড়ে যায়৷ তারপর চিল্লিয়ে কাঁদা আরম্ভ করে। তাছাড়া এই রুমের বারান্দায় গ্রিল নেই। স্টিলের রেলিংয়েও অনেক ফাঁকা ফাঁকা জায়গা। পাকাপোক্ত সিমেন্টের রেলিং না। অবশ্য এই কটেজের দোতলার কোনো রুমেই গ্রিল, উঁচু রেলিং নেই।
আহিয়ান তো তুরতুরিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে এখানে, ওখানে চলে যায়। ফারিনের ভয়ই লাগে। দেখা যাবে ফারিন ঘর গোছাচ্ছে আর আহিয়ান ওই ফাঁকে বারান্দায় গিয়ে নাহলে অন্যকোনো চিপায় গিয়ে আকাম কুকাম করছে। বিকালেও দেখেছে চোখের পলকে বারান্দায় এসে গ্রিলের ফাঁকে মাথা ঢোকাচ্ছে। বারান্দায় একটা থাইগ্লাস থাকলেও হতো। তাও নেই।
ফারিন দশমিনিটের মাথায় ঘর গুছিয়ে ফেলে। ফ্লোর থেকে সব খেলনা উঠিয়ে ব্যাগে ঢুকিয়ে হাফ ছাড়ে। কাজ শেষ, এখন গিয়ে আহিয়ানকে নিয়ে আসবে। গায়ে চাদর জড়িয়ে ঘর থেকে বের হওয়ার সময়ই আহসান ঘরে ঢোকে। ফারিনকে এইসময় বেরোতে দেখে বলে,
“কোথায় যাচ্ছো?”
“আহিয়ানকে নিয়ে আসতে।”
ভ্রু কুঁচকে বলে, “আহিয়ান কোথায়?”
“ইশার কাছে দিয়ে এসেছি।”
“কেনো?”
“ঘর গোছাতে পারছিলাম না ওকে নিয়ে। ঘরের অবস্থা নাজেহাল করে ফেলেছিল।”
“আমাকে কল করতে। ওদেরকে ডিস্টার্ব করতে গেলে কেনো? পাগল নাকি?”
“চেক করো কল করেছি কিনা। তারপর কথা বলো।”
“কল করলে শুনতে পেতাম না?” বলে আহসান পকেট থেকে মোবাইল বের করে। সেকেন্ডের মাঝেই বলে,
“ওহো! সাইলেন্ট করা ছিল। সেইজন্য শুনতে পাইনি।”
“আমাকে আগ বাড়িয়ে দোষ দিতে তুমি ওস্তাদ।”
বলে আহসানকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলে আহসান ফারিনের হাত ধরে আটকায়। আহসানের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকালো। কিন্তু মুখে কিছু বলে না। আহসান ফারিনের হাত ধরে ওর দিকে দু পা এগিয়ে এসে বলে, “চলো একটু হেঁটে আসি।”
“এত রাতে কি উপলক্ষে? আমার বিয়ে নাকি তোমার?”
“এমনিতেই। চলো। বেশি রাতও না, এগারোটা কেবল।”
“আহিয়ানকে নিয়ে আসি।”
“ওকে এত রাতে ঠান্ডায় বের করার কোন দরকার নেই। ঠান্ডা লেগে যাবে। আমরাই যাই চলো। ও আদৃত, ইশার কাছে থাকুক।”
“এখন ওদের ডিস্টার্ব হবে না?”
“যা ডিস্টার্ব করার তুমিই করে ফেলেছো। আর দশমিনিটে কিছু হবে না।”
ফারিন আহসানের হাত ছাড়িয়ে আগে আগে বের হলো। আহসান ওদের রুমে দরজা লক করে ফারিনের পিছন পিছন আসে। ফারিন কটেজ থেকে বেরিয়ে বলে, “কোনদিকে যাবে?”
“এমনিতেই হাঁটি আসো।”
ফারিন দিক বেদিক না দেখে হাঁটতে থাকে। আহসান ফারিনের হাত ধরে বলে,
“তুমি আমার সাথে হাঁটছো। আমি জলজ্যান্ত একটা মানুষ আছি তোমার পাশে। একটু কথাবার্তাও তো বলতে পারো।”
“কথা না বলতে বলতে আর কথা বলতে ইচ্ছে করে না।”
“কেয়ারটেকার চাচার মেয়ের বিয়ে। আমি শোকেসের টাকা দিবো বললাম ওনাকে।”
“কিসের শোকেস?”
“উনি বিয়েতে দিবে বললো।”
“নিজ থেকে দিবে নাকি ছেলেরা চেয়েছে?”
“বললো তো দিবে। কিন্তু মনে হলো চেয়েছে।”
“যৌতুককে সাপোর্ট করছো?”
“না, কিন্তু উনি স্বীকার না করলে তো আমি জোর করতে পারি না। ওনার ব্যক্তিগত জীবনে তো অনধিকার চর্চা করতে পারি না।”
ফারিন চুপ করে হাঁটতে থাকে। আহসান ফারিনের কাঁধে হাত রাখে। “বি নরমাল ফারিন। আর কতদিন?”
“কি আর কতদিন?”
“আর কতদিন এভাবে আলগাভাবে থাকবে? আমি তো ক্ষমা চেয়েছি। আর কি করবো? মানুষ ভুল করে না?”
“মাত্র দুইমাস আহসান। মাত্র দুইমাস তোমাকে জেনে বুঝে ইগনোর করেছি। তুমিও জানো, আমিও জানি যে আমি এখন তোমাকে মন থেকে ইগনোর করছি না। তাও তোমার সহ্য হচ্ছে না। এদিকে তুমি যে দুইবছর ভুল বুঝে উল্টাপাল্টা কথা বলেছো, ইগনোর করেছো তা আমি কি করে সহ্য করেছি? আমাকে কষ্ট দিয়েছো তা কিভাবে ভুলি?”
আহসান শব্দ করে শ্বাস ফেললো। ফারিন বলে, “বাদ দাও। আমার অনেক কষ্ট হয় ওইসময় গুলোর কথা মনে পড়লে। একরাতে কোলে মাথা রেখে দুই তিনবার সরি বললে, সব নতুন করে শুরু করি সেই কথা বললে কি সব মিটে যায়? স্মৃতি থেকে অতীত মুছে যায়? সুখের সময় তাড়াতাড়িই চলে যায়, দুঃখের সময় যায় না।”
আহসান তপ্তশ্বাস ফেলে বলে, “এভাবেই থাকবো তাহলে? আমি অপরাধবোধ নিয়ে, তুমি রাগ নিয়ে?”
ফারিন হাসলো। মাথা নেড়ে বলে, “তুমি আর আমি সমান দোষী। ভুল আমিও করেছি। বিয়ের প্রথম প্রথম তোমাকে সহ্য করতে পারতাম না। অনেক মুখ চালিয়েছি, কিন্তু আমার পরে পরে মজা করে হলেও ওগুলো বলা উচিত হয়নি। ওগুলো না বললে তোমার সাব-কনশাস মাইন্ড ওই কথাগুলোকে এতটা বাজেভাবে ক্যাচ করতো না। আর আমার আরো একটা ভুল আছে। আরো আগেই তোমাকে তোমার প্রিয় রশিদ আঙ্কেলের কথা বলে দেওয়া উচিত ছিল। শুধু শুধু তোমার মুখে তোমার রশিদ আঙ্কেলের একগাদা সুনাম শুনে ঝগড়া না করে তার সব মহান মানবতার কথাগুলো যদি বলে দিতাম তাহলে ওই মহিলার কথা বিশ্বাস করতে না আমি জানি। তোমার রাগ, অভিমান জায়েজ ছিল। তোমার দৃষ্টিকোণ থেকে তুমি ঠিক। কিন্তু আমরা এইসব নিয়ে আর কথা না বলি প্লিজ।”
“তাহলে সমস্যা কোথায় ফারিন?”
ফারিন বসে পড়ে মাঠের মাঝে। ক্লান্ত গলায় বলে,
“সবটাই আমার ভাগ্যের দোষ। আমি ভেবেই পাই না আমার জীবন এমন কেনো। এই ভালো তো এই খারাপ। কেমন যেন।”
আহসানও ফারিনের পাশে বসলো। হাত বাড়িয়ে দিলো। ফারিন আহসানের বুকে মাথা রাখে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেশ কয়েকবার। আহসান ফারিনের চুল খুলে দিলো। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,
“আগের মত হয়ে যাও ফারিন।”
“আম ট্রায়িং। চাইলেও তো এতকিছুর পরে আগের মতো হয়ে যেতে পারবো না। আমি তোমার মতো এত সহজে এডজাস্ট করতে পারি না।”
“তুমি এমন নির্লিপ্ত না থেকে আমাকে কিছু শুনিয়ে দিলেও পারো ফারিন। তাহলে আমার অপরাধবোধটা কমে যায়।”
“তোমাকে কি শোনাবো বলো? আমি বুঝতে পেরেছি তোমার দিকটা। তুমি আমার কথা না শোনা ছাড়া আর কোনো ভুল করোনি। তুমি তোমার জায়গা থেকে ঠিক। আমি প্রতিনিয়ত তোমাকে ফিল করিয়েছি যে আমি তোমাকে চাই না, আমি তোমার ঘর করবো না। তুমি ওই মহিলার কথা শুনে রাগ না করে কিই-বা করতে! তোমার জায়গায় আমি থাকলে হয়তো-বা আমিও একই কাজ করতাম।”
“করতে না একই কাজ। তুমি আমাকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করতে। তুমি স্পষ্টবাদী। অনেক কষ্ট পেলেও আমার মুখ থেকে সত্যিটা শুনে পদক্ষেপ নিতে।”
“তাহলে তো বুঝেছোই। আমি একটা কথা বলি আহসান?”
“হুহ?”
“আমাদের আর এগুলা নিয়ে কথা বলা উচিত না। আমি পুরোনো দিনের কথাগুলো মনে করতে চাই না। আমার সত্যিই কষ্ট লাগে। আমরা বুঝেছি যা হয়েছে তাতে আমাদের দুজনেরই দোষ আছে। নিজেদের ভুল বুঝে আমরা আগের মতো হওয়ার চেষ্টা করছি তো, অন্তত আমি। এখন যতই বলো তুমি আমার দিকটা বুঝেছো কিন্তু আসল কথা হলো তুমিও বুঝবে না। আমি একটা হার্ড টাইমে কাউকে পাইনি। সেই কষ্ট আমি ভুলতে পারবো না। তাই আমাদের উচিত ওইসব নিয়ে আর কথাই না তোলা। সেটাই ভালো হবে আমাদের জন্য।”
“আমাকে আজীবন অপরাধবোধে জর্জরিত হয়ে বাঁচতে দেখলে তোমার ভালো লাগবে?”
“তোমার খারাপ চাই না আমি। আমার মধ্যে সেকেলে মেন্টালিটি একটুখানি আছে। স্বামী যতই খারাপ হোক আমি তার সহধর্মিণী হয়ে তো তার খারাপ চাইতে পারি না।”
“আমি যে ধুঁকে ধুঁকে মরছি? মাঝে মাঝে তোমার আর আহিয়ানের দিকে তাকালে আমার যে অপরাধবোধ হয়? মনে হয় অন্তত আহিয়ান হওয়ার সময়ই রাগ অভিমান পুষে না রেখে তোমার সাথে সব মিটমাট করে নেওয়া উচিত ছিল? আমি কতটা ব্রেনলেস হলে মিথ্যে কথার ভিত্তিতে তোমাকে ডিভোর্স দিতে চাচ্ছিলাম। তুমি বুঝতে পারছো? এই সব কথাগুলো যখন অবসরে, কাজের ফাঁকে আমার মাথায় ঘুরপাক খায় তখন মনে হয় অদৃশ্য কেউ আমার গলায় পা দিয়ে আমার শ্বাসরোধ করে আমাকে মেরে ফেলছে। ফিল্টির যে একটা গিলিংস তা মানুষকে পাগল বানিয়ে দেয় ফারিন। এভাবে চলতে থাকলে আমি মরে যাবো।”
“আজেবাজে কথা বলছো কেনো? আমার কথা না-ই ভাবলে! তোমার ছেলের কথা ভাবতে পারো।”
“তুমি জানো না আমার কেমন লাগে। আমি কতগুলো দিন আমার জীবন থেকে হারিয়েছি। চাইলেও আমি ওগুলো পাবো না। তুমি মা, যাকে আমরা হারিয়েছি তারজন্য আমি যদি মানসিক কষ্ট সহ্য করলেও তুমি শারীরিক, মানসিক দুই কষ্টও সামলেছো। আর সেইসময় আমি তোমাকে একগ্লাস পানি পর্যন্ত এগিয়ে দেইনি। আহিয়ান হওয়ার সময়ও অনেক কষ্ট করেছো। খাওনি ঠিকঠাকভাবে, ডাক্তার দেখাওনি। সুমাইয়া আপু তোমার ডেলিভারির আগে অনেক কথা বলেছি। আমার কেয়ারলেসনেসের কারণে তোমার আহিয়ান দুইজনেরই ক্ষতি হতে পারতো। আম জাস্ট এ গুড ফর নাথিং।”
ফারিন আহসানের গালে হাত দিয়ে বলে, “তুমি বেশি ভাবছো তাই। একটা চরম হার্স রিয়েলিটি হলো আমি চাইলেও ভুলতে পারি না। তাই আমি মনেও আনতে চাই না সেইসব কথা। এইসব পুরোনো কথা মনে পড়লে দুনিয়া আমার কাছে বিষের মতো লাগে। এখন, এইমুহূর্তে আমি যদি মিথ্যা কথা বলি যে আমি সব ভুলে গিয়েছি, আমি সব আবার আগের মতো শুরু করে দিয়েছি সেটা তো উচিত হবে না। তোমার অনুভূতিকে মেরে তোমাকে খুশি করার জন্য তো আমি মিথ্যে আশ্বাস দিতে পারি না। আমার বিবেকে বাঁধে। তাই যেভাবে আমি সেইসবের দিনের কথা মনে করি না, এড়িয়ে চলি তুমিও তাই করো। দেখবে আর খারাপ লাগবে না।”
নিজের গালে থাকা ফারিনের হাতে উপর হাত রেখে,
“আমি পারি না সব ভুলতে। রাতের অন্ধকারে সবকিছু নীরব হয়ে গেলে আমার মাথায় সব ভাসতে থাকে। আমি কতগুলো সময় নষ্ট করেছি। আমার মাথায় এটা ঘুরপাক খায় ফারিন আমাকে কিছু বলতে চেয়েছিল। আমি যদি ওগুলো সময় মতো শুনতাম তাহলে আমাদের এতগুলো দিন নষ্ট হতোই না। আহিয়ান যেভাবে হলো! আমি জোর করেছিলাম তোমাকে। ম্যারিটাল রেপ ছিল ফারিন ওটা। আমি ওগুলো মানতে পারি না। অল হ্যাপেন্ড বিকজ অফ মাই ইগো।”
ফারিন হাঁটু গেড়ে বসে আহসানকে জড়িয়ে ধরে। আহসান ফারিনের গলায় মুখ গুঁজে ওর পিঠ জড়িয়ে ধরে। ফারিন আহসানের চুলে হাত গলিয়ে বলে,
“এগুলো নিয়ে আর ভেবো না। আমি তোমাকে সময়মতো কিছু বলিনি, তুমিও আমার কথা সময় থাকতে শোনোনি। আমাদের দুইজনেরই ইগো বেশি তাই আমরা সাফার করেছি। মনে করো স্বামী স্ত্রীর পুরো জীবনে যত ঝগড়া হয়, আমরা তা একেবারেই করে কাটিয়ে দিয়েছি। ইন ফিউচার আমাদের যাতে আর এমন কিছু না হয় সেটা মাথায় রাখলেই হবে। তুমি অযথা এইসব ভাবনা সব মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো। পথে গাড়ি চালাও, কি না কি ভাবতে থাকো, ঘোরের মধ্যে থাকো কখন কোন বিপদ-আপদ হয়৷ তোমাকে এখন ভরসা করতে পারছি না। নিজের জন্য না হোক, আমার জন্য না হোক, আহিয়ানের জন্য তো সুস্থ থাকতে হবে নাকি? মানুষ এর থেকেও বড় ভুল করে, আমি তো মাফ করে দিয়েছি তোমাকে। আর এমন করো না।”
আহসান ধাতস্থ হলো। রয়েসয়ে বলে, “তুমি ইগো দেখানো ছেড়ে দাও।”
“তুমি কিছু জিনিস স্বীকার করলেই দিবো।”
“কি?”
“তুমি স্বীকার করো তোমার মাথায় বুদ্ধি নেই। তুমি নিবোর্ধ।”
“তুমি স্বীকার করো তোমার মুখ বেশি চলে।”
ফারিন রেগে আহসানকে ছেড়ে দিলো। আহসানকে ছেড়ে দিয়ে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। আহসান টিটকারি মেরে বলে, “এভাবেই বোবা থেকো। তুমি কথা বলেই প্যাঁচ লাগাবে।”
ফারিন রেগে উঠে চলে যেতে নিলে আহসান ফারিনের হাত টেনে ওকে নিজের দিকে আনে। পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে পেট চেপে ধরে বলে,
“কোথায় যাচ্ছো?”
“একা থাকতে দাও। তুমি মানুষ হবে না। তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না।”
“আগে প্রাইভেসি দিয়েছি অনেক। এখন আর দেওয়া যাবে না। একই ভুল বারবার করবো নাকি?”
“ছাড়ো অনি, ইনায়া বাইরেই বোধহয়।”
আহসান ছাড়লো। তবে পোলাইটলি হাত ধরলো। ফারিন তপ্তশ্বাস ফেলে বলে,
“তোমাকে দিয়ে আসলেই কিছু হবে না।”
“কি করেছি এখন?”
“বউয়ের কথায় উঠবস করা বান্দারা সোজা বাংলা ভাষায় ভেড়া হয়।”
আহসান ভ্যাবাচ্যাকা খেলো। “মানে?”
“বেশি ভালো স্বামী হওয়ার ভান করো? আমি যা বলি তাই করে নিজেকে ভদ্র ছেলে প্রমাণ করতে চাও?”
“তুমি চাচ্ছিলে আমি তোমাকে ধরে রাখি?”
ফারিন তেজি গলায় বলে, “মোটেই না।”
“তবে?”
“তুমি একদম শুরু থেকে হিসেব করো। একদম শুরু থেকে ভাবো কি কি করেছো?”
আহসান একটু ভেবে বলে, “তোমার যা যা আনকমফর্টেবল লাগতো তা তা তো করা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। এটাতে কি ভেড়ার মতো কাজ করেছি?”
“ভাবতে থাকো।”
আহসান অনেকক্ষণ ভেবে আবুলের মতো ফারিনের দিকে তাকালো। ফারিন ভ্রু উঠিয়ে বলে, “পাওনি কিছু?”
“তোমার ইচ্ছা না থাকার পরও বিয়ে করেছি সেটা?”
“ওটার জন্যই বিয়ের পর মুখ চালিয়েছি। তুমি পারতে আমার মন জয় করার চেষ্টা করতে। তা না করে আমার মতামতের দাম না দিয়ে থার্ডক্লাস চিপদের মতো বিয়ে করে ফেলছো।”
“তোমার মুখ আবারও বেশি চলছে।”
“হোয়াটএভার। সেটা না, তারপরে কি করেছো তা ভাবো।”
আহসান আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো। কিছুক্ষণ পর ফারিনের দিকে তাকিয়ে বলে, “এই রিসোর্টে বাসর করার জন্য?”
ফারিন চোখ বন্ধ করে শ্বাস ফেলে। “বাদ দাও বাদ দাও। তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না।”
ফারিন উল্টো পথ ধরে রিসোর্টের দিকে হাঁটা দেয়। আহসান ওর পিছন পিছন আসতে আসতে বলে,
“আমার তিনবছর আগের কাহিনী মনে পড়ছে না ফারিন। তুমি কখন কোন কোথায় মাইন্ড করেছো সেগুলো খুলে না বললে বুঝবো কি করে?”
“বলো তো তিনবছর আগে তুমি যখন পারমিশন না নিয়ে আমাকে ছুঁতে তখন আমি তোমাকে কি বলেছিলাম?”
“তুমি আমাকে রাস্তার ক্যারেক্টারলেস ছেলের সাথে তুলনা দিয়েছিলে।”
“এটা তো ঠিকই মনে আছে৷ ওটা মনে নেই না?”
“সত্যিই না।”
“এই ব্রেন নিয়ে অফিস চালাও? তোমার থেকে আমার ব্রেন ভালো।”
ফারিন কটেজের সামনে এলে অনি আর ইনায়াকে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকে। দাঁড়িয়ে নেই ওরা, দুইজনেরই দুইজনের দিকে আঙুল তাক করে কথা বলছে। ফারিন চোখ সরিয়ে কটেজের সিঁড়ির দিকে গেলে শুনতে পায় ইনায়া খেঁকিয়ে উঠে বলছে,
“তোর মতো ছাগল আমি একটাও দেখি নাই।”
অনিও তাচ্ছিল্যের স্বরে বলে, “তোর মতো গাভীও আমি একটাও দেখি নাই। ব্রেনলেস গাভী।”
“এক্সামে ফেল করোস তুই, ব্রেনলেস আমি না?”
“ফেল করাও একটা আর্ট। পারলে একবার ফেল করে দেখা।”
ফারিন উপরে উঠে এলো। আহসানও ওর পিছন পিছন আসে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে জুতা খুলে আহসান বলে,
“ওরা কি তুই তোকারি করে কথা বলে?”
নিজের জীবনের খেয়াল নেই, এসেছে মানুষের তুই তাইয়ের হিসেব করতে। ফারিন ভিতরে ঢুকে চাদর ঠিক করে বলে,
“নিজের চরকায় তেল দাও।”
বলে ইশাদের দরজার রুমে নক করে। আহসান ফারিনের পাশে দাঁড়িয়ে বলে, “তাহলে সুন্দরী ডাকা বন্ধ করেছি বলে?”
“রামছাগল একটা।”
আহসান আবারও প্রশ্ন করে। ফারিন আহিয়ানকে নিয়ে ঘরে চলে আসে। আহিয়ানকে খাটে বসিয়ে গরম কাপড় খুলতে থাকে। আহসান ঘরের দরজা বন্ধ করে বলে,
“এটাই নাকি?”
“আমি কি জানি।”
আহসান খাটে এককাত হয়ে শুয়ে পড়ে। কনুইয়ে ভর দিয়ে বলে, “ওরে শ্লা! তুমি তো সেই পল্টিবাজ মেয়ে।”
ফারিন আহিয়ানের ডায়পার চেক করে। ডায়পার চেঞ্জ করে দেয়। আহসান ঠোঁট চোকা করে বলে,
“সুন্দরীদের মনে তবে এইসব ঘুরপাক খায়?”
“চুপ করো।”
“তারপর আর কি কি? যা যা নিষেধ করতে সব ভং? হুহ?”
ফারিন আহিয়ানকে বসিয়ে রেখে চাদর ফেলে ওয়াশরুমে চলে যায়। আহসান ছেলেকে বুকে নিয়ে শুয়ে পড়ে। ফারিন জামা বদলে বের হলে আহসান ওয়াশরুমে যায়। ফারিন লাইট নিভিয়ে আহিয়ানকে নিয়ে শুয়ে পড়ে। আহিয়ানকে ঘুম পাড়িয়ে আড়মোড়া ভেঙতেই আহসান ওকে চেপে ধরে। ঘাড়ে নাক ঘষে বলে,
“আর কি কি অভিনয় করেছো?”
ফারিন ছটফটিয়ে ওঠে। “তুমি ছাড়ো আমাকে। বেশি বেশি করছো তুমি।”
“এখন থেকে আমি জোরই করবো। স্বৈরাচারী হবো। তবুও তোমাকে প্রাইভেট স্পেস দিবো না। মহিলা মানুষের প্রাইভেসি ভেবে ইন্টারফেয়ার করিনি। এখন মনে হচ্ছে বউয়ের আবার কিসের প্রাইভেসি এইসব বললেই ভালো হতো।”
“এখন ছাড়ো আমাকে।”
আহসান ফারিনের কোমরে চিমটি দিয়ে বলে, “আর কি কি ভালো লাগতো সুন্দরী?”
ফারিন কোমরে এক হাত চেপে আহসানের হাতে আরেক হাত দিয়ে ঠাসঠাস করে চাপড় মারে।
“এইসব কিন্তু আমার খুব অপছন্দের।”
“তোমার তো সবই অপছন্দের।”
“এটা সত্যিই আমার অপছন্দের।”
আহসান ফারিনকে কোলে তুলে নিলো। “এটা অপছন্দের?”
“না।”
ওভাবেই ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরে। বিছানায় বসিয়ে বলে, “এটা?”
“খুব খুব খুব অপছন্দের।”
আহসান আরো আরো শয়তানি করলো। ফারিন লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে বলে, “এগুলো সবগুলোই আমার খুব অপছন্দের।”
আহসান গগনবিদারী অট্টহাসি দিয়ে বলে, “আমি গোটাটাই তো তোমার অপছন্দের।”
ফারিন আহসানকে পিছন থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। “তুমি নিজে নিজে অনেক কিছু ভাবছো। আর কিছু ভেবো না। তুমি অসুস্থ পড়লে আমাদের মা, ছেলের কি হবে? আমার মাথার উপর তোমার ছায়া ছাড়া আর কেউ নেই। আহিয়ানের মাথার উপর আমাদের ছায়া ছাড়া আর কেউ নেই। আমার তোমার উপর অভিমান আছে ঠিকইই কিন্তু আমি তোমাকে ঘৃণা করি না। তোমাকে গোটা প্রেগন্যান্সির সময় আমার একটুও সহ্য হতো না, কিন্তু তোমার বাসায় ফিরতে দেরী হলেই আমার দম বন্ধ হয়ে যেতো।
আমি তোমার উপর রেগে থাকতে পারি, অভিমান করে থাকতে পারি কিন্তু আমি তোমাকে ছাড়া থাকতেও পারি না। তোমাকে ছাড়া থাকতে পারলে তো অনেক আগেই চলে যেতাম। তাই সব দোষ নিজের উপর না চাপিয়ে এইসব ভাবাই বন্ধ করে দাও। আমার মনে হবে আমি ঠিক। তোমার মনে হবে তুমি ঠিক। তাই এই চ্যাপ্টার ক্লোজ। একদম ক্লোজ।”
“দাম দেখাও যে তুমি?”
“তোমাকে কি দাম আমি নতুন দেখাই?”
“নিজেকে পাড়ার সদ্য দাড়িগোঁফ গজানো ছোঁচা মনে হয় যে একটা সুন্দরী মেয়েকে উত্যক্ত করে।”
“যৌবনে করোনি তো, তাই বুড়ো বয়সে করার সুযোগ পাচ্ছো।”
“তোমার ভালো লাগে ওভাবে পিছন পিছন ঘুরলে?”
“না। কেউ আমার পিছনে ঘুরবে বিষয়টা আমার চরম অপছন্দের। কিন্তু তুমি করলে বিষয়টা ভিন্ন রকমও হতে পারে।”
“স্বীকার করো আমাকে ভালোবাসো।”
“একদেশে এক রাজা ছিল। রাজা রানীর মতের বিরুদ্ধে গিয়ে জোর করে রানীকে বিয়ে করেছিল। রানীর মনে ছিল প্রচুর অহংকার। রানীর মনে এতটাই অহংকার ছিল যে কেনোকিছু রানীর মন মতো না হলে রানীকে ধরে রাখা যেতো না, কিছুতেই না। সেই রাজা আবার বোকা ছিল। সুষ্ঠভাবে রাজ্য চালানোর মতো ক্ষমতা থাকলেও রানীর মন বোঝার মতো ক্ষমতা, বুদ্ধি খুবই কম ছিল। বোকা রাজা নিজের অজান্তেই নিজের ব্যবহার, কাজকর্ম দিয়ে রানীর অহংকারকে পুরো চুরমার করে দিলো। খুব বেশিদিন সময় নেয়ওনি সে। তার পারিবারিক শিক্ষা, তার ব্যক্তিগত আদর্শ এতটাই ভালো ছিল যে সে রানীকে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়ে রানীকে মাত্র সপ্তাহের মাথায় তার মায়ায় ফেলে দিলো।
রানী কোনো বস্তুকে ভালো না বাসলে সেই বস্তুর দিকে ফিরেও তাকায় না। আর একবার ভালোবেসে ফেললে সেই বস্তু থেকে মনও ওঠাতে পারে না। সেই অহংকারী রানীকে রাজা একসময় অনেক কষ্ট দিয়েছিল। কষ্ট পেলেও রানী একেএকে রাজার সংসারের কাজ শিখলো, ফুটফুটে একটা রাজপুত্র জন্ম দিলো, রাজার ছেলেকে বড় করতে থাকলো, সারাদিন রাজার চিন্তায় মরিয়া হয়ে থাকার পর দিন শেষে ঘরে ফিরে এসে রাজা জিজ্ঞাসা করে, ‘রানী তুমি কি আমাকে ভালোবাসো?’ তখন রানীর কি করা উচিত বলো আমাকে।”
আহসান ফারিনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। পর্যায়ক্রমে কপালে, নাকে, দুই গালে, ঠোঁটে চুমু খেয়ে বলে, “তখন রানীর চুপ করে থাকা উচিত আর উত্তর খুঁজে বের করতে, রানীর নীরবতার মাহাত্ম্য উপলব্ধি করতে রাজার একটু পরিশ্রম করা উচিত।”
চলমান……
(হ্যাপি রিডিং….)

