#আফরিন_আখ্যান
#পর্ব_২০(ক)
#সমৃদ্ধি_রিধী
আজ দোসরা আগষ্ট। সকাল থেকেই ফারিনের শরীরটা ভীষণ খারাপ। হাসফাস লাগছে ওর ভীষণ। সময় গড়াতে গড়াডে এখন বেলা একটা বাজে। ফারিন কপালে হাত চেপে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। পাশেই আহিয়ান রাজ্যের খেলনাপাতি নিয়ে বসা। খেলতে খেলতে একটু পর পর ফারিনের দিকে তাকাচ্ছে। আহিয়ান একটা খেলনা নিজের সর্বশক্তি দিয়ে ফ্লোরে ছুঁড়ে মারে। কিন্তু ফারিনের কোনো হেলদোল নেই। ছোট্ট আহিয়ানের মস্তিষ্কে একটা জিনিস খুব ভালো মতো গেঁথে গিয়েছে মা ওর সাথে কথা বলছে না মানে মা রেগে আছে। ও তাড়াতাড়ি খাট থেকে নেমে খেলনা উঠিয়ে রাখে। আবারও খাটে উঠে ফারিনের গালে হাত রাখে।
ফারিন চোখ খুলে তাকায়। আহিয়ান ফারিনের গালে চুমু দেয়। “আল কববো না।”
“কি করেছো?”
“খেলনা আল ফেলবো না।”
ফারিন শীতল চোখে তাকিয়ে থাকে। আহিয়ান ফারিনের বুকে মাথা রেখে বলে, “লাগ?”
“না বাবা।”
“তাইলে চুপ যে?”
“শরীর ভালো না।”
“অনেক খালাপ?”
“একটু খারাপ।”
আহিয়ান ফারিনের বুকে মাথা রেখে ওকে জড়িয়ে ধরে। পা দিয়ে বারবার পেটে লাথির মতো মারতে চায়। ফারিন ওর পা চেপে ধরে রাখে। আহিয়ান ফারিনের গলায় মুখ গুঁজে বলে,
“আদুল কলো ইট্টু।”
ফারিন আহিয়ানের গালে চুমু দিলো। মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। “হয়েছে?”
“না, আলো কলো।”
ফারিন হাসলো। আহিয়ানের পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। আহিয়ান শরীর মোচড়ামুচড়ি করে সরে গেল। খাট থেকে নেমে পাউডার নিয়ে আসে। হাঁটুর উপর বসে ফারিনকে বলে,
“দিয়ে দাও।”
ফারিন আহিয়ানের মাথায় হাত বুলিয়ে চুল ঠিক করে দেয়। “এখন তো গোসল করবে। পাউডার এখন দিতে হবে না।”
“দাও নাআআ?” আহিয়ান লাফিয়ে ওঠে।
“তাহলে মার পাশে শুয়ে পড়ো।”
আহিয়ান রোবটের মতো হাত টান টান করে শুয়ে পড়ে। ফারিন আহিয়ানের বুকে পিঠে পাউডার মেখে দেয়। আহিয়ান কিছুক্ষণ দাঁত বের করে হাসে। ফারিনও ছেলের হাসি দেখে হাসে। আহিয়ানকে পাউডার মেখে দিতেই ও আবারও খেলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ফারিন গালের নিচে হাত রেখে পাশ ফিরে চোখ বোজে। আহিয়ান খেলতে খেলতে আবারও ফারিনের দিকে তাকায়। আচমকা চেঁচিয়ে ডাকে, “ওওহহ মাআআআ?”
ফারিন চোখের পাতা কেঁপে ওঠে। আহিয়ানের দিকে চোখ বড় বড় করে তাকায়। আহিয়ান খিকখিক করে হাসতে থাকে। ফারিন হাতে ভর দিয়ে উঠে বসে। আহিয়ানের গাল আলতো করে চেপে ধরে বলে, “দুষ্টু হয়েছো খুব? চাচ্চুর মতো দুষ্টু?”
আহিয়ান হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে। ফারিনের চোখ জুড়িয়ে যায়। ও উড়ে আহিয়ানের তোয়ালে আর প্যান্ট বের করে। আহিয়ান ফারিনের পিছন পিছন হাঁটে। ফারিন হাঁটা থামিয়ে দিলে আহিয়ানও হাঁটা থামিয়ে দেয়। ফারিন ছেলের কাণ্ডে এই দুর্বল শরীরেও হাসে।
জেসমিন তখন ঘরে আসে। জেসমিনকে দেখে আহিয়ান ফ্লোরে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে। ফারিন ছেলের ভণ্ডামি বোঝে। এখন জেসমিনকে ঘোল খাইয়ে ছাড়বে এই ছেলে। জেসমিন আহিয়ানকে কোলে তুলে নেয়। আহিয়ান শরীর শক্ত করে রাখে। জেসমিন ওকে বাথরুমে নিয়ে বলে,
“গোসল করতে হবে তো দাদুভাই।”
আহিয়ান হুবুহু নকল করে। পানি ছোঁড়াছুঁড়ি করা শুরু করে। জেসমিন চাইলেও থামাতে পারে না। জেসমিনকে অর্ধেক ভিজিয়ে ফেলেছে ও। দাদি, নাতির কার্যকলাপ আঁচ করতে পেরে ফারিন বাথরুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ঠান্ডা গলায় ডাক দেয়,
“ফাইয়াজ?”
আহিয়ান মায়ের দিকে চোরা চোখে তাকায়। ফারিনের চাহনি দেখে ভদ্র বাচ্চা হয়ে যায়। জেসমিন আহিয়ানের মাথায় জনসন বেবি শ্যাম্পু দিয়ে দিতে দিতে বলে,
“এমন দুষ্টুমি তো করা যাবে না। তুমি না বড় ভাই হবে সহসাই? বড়রা দুষ্টুমি করে?”
ফারিন ভ্রু কুঁচকে ফেলে। আহিয়ানের বয়স কি আহামরি? ও দুষ্টুমি করবে না তো কে করবে? আহিয়ান হাসতে হাসতে মাথা দুলিয়ে বলে,
“কলে কলে।”
জেসমিন বলে, “না বড় ভাইয়েরা দুষ্টুমি করে না।”
“না না কলে।”
“তুমি তো এখন ভদ্র বাচ্চা হয়ে থাকবে।”
“মাল সাথে দুষ্ট কলবো।” আহিয়ান মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে বলে।
“নতুন বাবুরা এলে মায়ের কাছে যাওয়া যাবে না। মা তো নতুন বাবুদের নিয়ে থাকবে তখন। মার সাথে দুষ্টুমি করলে মা ওদেরকে সামলাবে কি করে? তাই মার কাছ থেকে দূরে থাকতে হবে।”
আহিয়ান মুখ কালো করে ফেলে। ফারিন কপালের ভাঁজ দ্বিগুণ হলো। আহিয়ান ঠোঁট উল্টে ফারিনের দিকে তাকায়। ফারিনের অনেক রাগ উঠে। ওর শাশুড়ী এত বড় হয়েও কি করে এমন অবুঝের মতো কথা বলছে? মায়ের কাছে যেতে নিষেধ করছে কেনো? আহিয়ান আর একটুও দুষ্টুমি করলো না। জেসমিন ওকে গোসল করিয়ে গা মুছে দিয়ে খাটে বসিয়ে চলে যায়। এখন আহিয়ানের জন্য ভাত নিয়ে আসবে।
জেসমিন চলে যেতেই ফারিন আহিয়ানের কাছে আসে। আহিয়ানের হাত ধরলে আহিয়ান ফারিনের হাত ধরে না। মুখ ঘুরিয়ে ফেলে। বোঝাচ্ছে ও রাগ করেছে। ফারিন দরজা লাগিয়ে দেয়। আহসানকে রেগে কল করে। আহসান রিসিভ করা মাত্রই ফারিন অনেকটা চেঁচিয়ে বলে,
“তোমার মায়ের সমস্যা কি?”
আহসান বুঝলো না। “মানে?”
“আমার ছেলেকে বলে আমার কাছে না আসতে। এগুলো কি ধরনের কথাবার্তা?”
“আম্মু এমনটা কেনো বলবে?”
ফারিন সব বলে। আহসান তো জানে ফারিন আহিয়ানকে নিয়ে কেমন করে। আহসান অন্যসময় সামান্য কিছু বললেও তেড়ে আসে, এখন তো আরো শরীর ভালো না, মুড শুধু চেঞ্জ হয়। চাপা শ্বাস ফেলে বলে,
“আচ্ছা আম্মু ওই মিনিংয়ে বলেনি। তারপরও আমি আমার মতো করে নিষেধ করে দিবো। তাও হাইপার হইও না। শ্বাসকষ্ট উঠবে আবারও।”
“আমার ছেলের বয়স কত? মাত্র দুই বছর সাড়ে আটমাস। ওর থেকে আর বেশি কিছু কি আশা করবে? আহামরি বড় হয়ে গিয়েছে ও? অনেক বড় ও? বড় ভাই হওয়ায় অনেক ম্যাচিউরিটি চলে এসেছে ওর মধ্যে?”
“নিষেধ করবো বললাম তো।”
ফারিন আহিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে, “তুমি আসবে কবে?”
“আজকেই আসবো।”
“আমার কিন্তু শরীর ভালো লাগছে না। অনেক খারাপ লাগছে।”
“পেইন উঠেছে?”
“না তাও খারাপ লাগছে। তাড়াতাড়ি এসো আজকে।”
“আচ্ছা। আহিয়ানকে দাও।”
ফারিন আহিয়ানকে মোবাইল দিলো। আহিয়ান মোবাইল নিলো। বাপ-বেটা কিছুক্ষণ কথা বলে রেখে দিলো। ফারিন বিছানায় বসে আহিয়ানকের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়। “মায়ের কাছে আসো।”
আহিয়ান ফারিনের কোলে মাথা রেখে বলে, “লাগ কলচি আমি।”
ফারিন হেসে উঠে। “কিভাবে রাগ ভাঙাই?”
“আদুল কলো।”
ফারিন ওকে আদর করে বলে, “মার তো শরীর ভালো না।”
আহিয়ান ফারিনের গালে চুমু খেয়ে মাথায় হাত বুলানোর নাম করে চুল এলেমেলো করে দেয়।
“আদুল কলে দিচি। আল খালাপ আচে?”
“না, আর নেই।”
আহিয়ান খিকখিক করে হাসতে থাকে। দরজায় ঠকঠক শব্দ হয়। ফারিন উঠে দাঁড়ায়। দরজা খুলে জেসমিনের কাছ থেকে প্লেট নেয়। জেসমিন খাওয়াতে চাইলে ফারিন ভদ্রতার সহিত নিষেধ করে দেয়। দরজা লাগিয়ে খাটে বসে। আহিয়ান খাবার দেখেই ফিট খাওয়ার মতো করে বিছানায় হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে থাকে। সাতারু যেভাবে পানি হাত পা ছড়ি ভাসে, ঠিক ওভাবে পড়ে থাকে। ফারিন অল্প একটু ভাত নিয়ে বলে,
“আব্বা উঠো?”
“কাবু না।”
ফারিন ভাত মেখে আহিয়ানের দিকে তাকায়৷ আহিয়ান মাথা নাড়িয়ে বলে, “ভাত কাবু না।”
“ফাইয়াজ?”
আহিয়ান ঘ্যানঘ্যান করতে থাকে। ফারিন ঠান্ডা গলায় বলে,
“মায়ের শরীর ভালো লাগছে না। এরমধ্যে তুমি দুষ্টুমি করছো। আমি কিন্তু চলে যাবো।”
“কুতায় যাবে?”
“চলে যাবো। তুমি খুঁজেও পাবে না।”
আহিয়ান উঠলো। আঙুল তাক করে বলে, “কুলে বসি?”
“পরে বসো? আমার অনেক খারাপ লাগছে।”
“আচ্চা।”
আহিয়ান বাবু হয়ে বসলো। দুই লোকমা খেয়ে চড়কির মতো ভনভন করে আবার এক লোকমা খেয়ে ফিট খেয়ে পড়ে থাকে। ফারিন আহিয়ানের উপর কখনোই বিরক্ত হয় না, কিন্তু আজ চরম ধৈর্যহারা হচ্ছে। কাহিল হয়ে যাচ্ছে।
“ফাইয়াজ?”
আহিয়ান এসে আবার খেয়ে যায়। চড়কির মতো ঘুরে ঘুরে খাওয়া শেষ করতেই ফারিন ওকে মুখ ধুইয়ে দিলো। প্লেট সেন্টার টেবিলে রেখে আহিয়ানকে খেলনা দিয়ে বসিয়ে শুয়ে পড়ে। আহিয়ান ফারিনের দিকে তাকিয়ে বলে,
“তুমি খাবা না?”
“পরে খাবো।”
আহিয়ান ফারিনের গা ঘেষে শুলো। “লাগ?”
“না বাবা।”
“তাইলে?”
“শরীর খারাপ।”
“আদুল কলে দিবো?”
“দাও।”
আহিয়ান ফারিনের মাথা নিজের কোলে নিয়ে আহসান যেভাবে ওর মাথায়, গালে হাত বুলায় ও ঠিক সেভাবেই মায়ের মাথায় গালে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। ফারিনকে আদর করতে করতে ও নিজেই ঘুমিয়ে পড়ে। ফারিন আহিয়ানকে সোজা করে শুইয়ে দেয়। আহসানকে কল করে। আহসান রিসিভ করা মাত্রই ফারিন বলে,
“এই শোনো?”
“শরীর কি বেশি খারাপ?”
“হ্যাঁ। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। কাজের প্রেশার না থাকলে চলে এসো।”
“তুমি ঘরের দরজা খোলা রাখো। আহিয়ানকে আম্মুর কাছে দাও।”
“আহিয়ানকে দিতে হবে না। ও ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি দরজা খোলা রাখছি, তুমি প্লিজ তাড়াতাড়ি এসো।”
“আচ্ছা আসছি। সাবধানে কিন্তু। ইনহেলার কাছে আছে?”
“হুম।”
“আসছি আমি।”
“আচ্ছা।”
ফারিন কল কেটে দিলো। ঢকঢক করে পানি খায়। ভাত খাওয়া স্পৃহা নেই, গলা শুকিয়ে যাচ্ছে খালি।
_____________________
আহসানের ধানমন্ডি আসতে আসতে ছয়টার মতো বেজে যায়। কাকতালীয় ব্যাপার ফারিনের বিকাল থেকে পেইন ওঠলেও সন্ধ্যায় ওর মারাত্মক অসহনীয় পর্যায়ের ব্যথা ওঠে। ফারিনকে নিয়ে ওরা খুব দ্রুত হসপিটালে চলে যায়। ফারিনের ব্যথা উঠে শ্বাসকষ্টে চোখ মুখ উল্টে যাওয়ার মতো অবস্থা। ইমিডিয়েট সিজার করতে হবে। এরমধ্যে আহিয়ান মায়ের এমন অবস্থা থেকে বারবার ফারিনের কাছে যাওয়ার জন্য গগনবিদারী চিৎকার করছে। কাঁদতে কাঁদতে সারা মুখ লাল বানিয়ে ফেলেছে।
একে তো ফারিনের এমন অবস্থা, অন্যদিকে আহিয়ানের অহেতুক জেদ আহসান দুইদিক সামলাতে না পেরে আহিয়ানকে জোরে ধমক দিয়ে বসে। আহিয়ান নিজের দুই বছর সাড়ে আটমাসের জীবনে এই প্রথম কারো ধমক খেলো। তাও ওর বাবার কাছে। ও রীতিমতো কাঁদতে কাঁদতে হসপিটালের ফ্লোরে শুয়ে পড়ে। অনি কোলে নিয়ে ভুংভাং বুঝিয়ে সামলাতে গিয়েও পারে না। ফারিনের কাছে যাওয়ার জন্য জেদ করতে থাকে। ফারিনকে যখন ওটির ভিতর নেওয়া হচ্ছিলো তখন ফারিন আহিয়ানকে খোঁজে।
অনি আহিয়ানকে ফারিনের কাছে নিয়ে যায়। আহিয়ানকে ফারিনের গলা জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। কাঁদতে কাঁদতে নাশিল দেয় বাবা ওকে বকেছে। ফারিনের এক হাতে ক্যানুলা। ও একহাতে আহিয়ানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে দুর্বল গলায় বলে,
“চাচ্চুর কাছে লক্ষ্মী হয়ে থাকবে। মা একটু পরেই চলে আসবো, ঠিক আছে?”
“আমিও যাবু।”
“এমন করে না আব্বা। আমি তাড়াতাড়ি চলে আসবো। অপেক্ষা করো তুমি।”
“না আমিও যাবু।”
“ফাইয়াজ?”
“আচ্চা।”
আহসান ফারিনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই ফারিন মুখ ঘুরিয়ে নেয়। ফারিনকে ওটিতে নেওয়া হলো। আহসান বুঝলো আহিয়ানকে বকা দেওয়ার জন্য মুখ ঘুরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আহসান আহিয়ানকে কোলে নিতে গেলে আহিয়ান বাবার কাছে আসে না। অনির গায়ের সাথে লেগে থাকে। আহসান তাও কোলে নিতে চাইলে কাঁদা আরম্ভ করে দেয়। অনি পড়ে বিপাকে। কান্না থামাতে নিচে নিয়ে যাও। চিপস, চকলেট কিনে দেয়। “টাক টাক টাকলা রে” গানটা শোনায়। তবেই ছেলের কান্না থামে। আহিয়ানকে নিয়ে অনি চেয়ারে বসে আরো উদ্ভট উদ্ভট গান শোনাতে থাকে।
এদিকে প্রথম বিশ মিনিট পার হওয়ার পর আহসানের অস্থিরতা বাড়ে। ও ঘাড় বাঁকিয়ে দেখে জেসমিন আর ইনায়া খুব স্বাভাবিকভাবে বসে কথা বলছে। আহিয়ান অনির সাথে খেলছে। ও বুকে হাত গুঁজে ঠোঁটের কাছে আঙুল ঠেকিয়ে ওটির লাইটের দিকে তাকিয়ে থাকে। আদৃত আসে তখন। আহসান ওকে একপলক দেখে চোখ সরিয়ে নেয়। পুরো ঘন্টাখানেক পর নার্স দুজন বাবুকে নিয়ে বের হয়। একজন বাবুকে প্রথমে দেওয়া হয় আহসানের কোলে, অপরজনকে দেওয়া হলো জেসমিনের কোলে। ইনায়া ফটাফট বাবুদের ছবি তুলে তিন্নি, ইশা, শিরিনার কাছে পাঠিয়ে দিলো। বাবুরা সবার কোলে একবার সফর করে আবারও চলে গেল। দুটোই মেয়ে বাবু হয়েছে। নাম রাখা হয়েছে আনহা, অহনা।
তাদের আগমনে সবাই খুশি হলেও আহিয়ানের মুখ বেজায় ভার। ছোট চাচ্চু বারবার বোনদের দেখতে বললেও ও দেখেনি। ও মার কাছে যাবে। আর কারো কাছে যাবে না। কেউ মায়ের কাছে নেয় না। সবাই খারাপ। ফারিনকে পুরোপুরি অজ্ঞান করা হয়নি। ওকে, দুই বাবুকে আধঘন্টার মধ্যেই কেবিনে দেওয়া হলো।
সময় পার হয়। আহিয়ান ফারিনের বেডেই ফারিনের বামপাশে বসে চুপচাপ ঘাপটি মেরে বসে আছে। ফারিনের বাহু সংলগ্ন দুটো বাবুর দিকে তাকিয়ে আছে। ফারিন ক্লান্তিতে চোখ বুজে আছে, ঘুমিয়েও পড়েছে। আহিয়ান এভাবে পাথরের মতো বসে থাকার কারণ ওর ছোট্ট মস্তিষ্ক জানে মা ঘুমাচ্ছে। মাকে এখন ডাক দেওয়া যাবে না। আহসান আহিয়ানের জন্য খাবার নিয়ে আসে। খাবার টেবিলে রেখে চেয়ার টেনে আহিয়ানের মুখোমুখি বসে। আহসান আহিয়ানের হাত টেনে ওর দুই হাতে চুমু খায়।
“সরি বাবা। তুমি রাগ করেছো বকা দিয়েছি বলে?”
আহিয়ান উপর নিচে মাথা নাড়ে। আহসান আহিয়ানের গোলুমলু গাল দুটোতে চুমু খায়।
“অনেকগুলো সরি বাবা। অনেক বেশি রাগ? আর বাবার সাথে কথা বলবে না?”
“বলবো।”
আহসান হাসে। আহিয়ানের গালে চুমু খেয়ে বলে,
“আমার সোনা বাবা।”
“আদুল কলো। তাইলে কতা বলবো।”
আহসান আহিয়ানকে চ্যাংদোলা করে কোলে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো। কেবিনের এইপ্রান্ড থেকে ওই প্রান্তে হাঁটতে হাঁটতে চুমু খেলো, খেলতে খেলতে কাতুকুতু দিলো, আহিয়ানের পেটে নাক ঘষলো। আহিয়ান খিলখিল করে হাসে। আহসানের চুল টেনে ধরে। আহিয়ান হাঁপিয়ে উঠলে আহসান আহিয়ানকে ফারিনের পাশে পুনরায় বসিয়ে দিয়ে বলে, “আর রাগ আছে?”
“না নাই।”
“ভাত খেতে হবে তো এখন।”
“মার হাতে কাবো।”
“দেখো মা ঘুমায়। মা অনেক টায়ার্ড।”
“মা উতলে কাবো।”
“মা অনেকক্ষণ ঘুমাবে।”
“মা উতুক।”
“বাবার হাতে খাবে না?”
“না।”
আহসান মিছেমিছি মুখ কালো করে রাখে। হাতে মুখ গুঁজে বসে থাকে। আহিয়ান আহসানের কাছে এসে আহসানের মাথা ধরে বলে, “লাগ?”
“অনেক রাগ।”
“আচ্চা ভাতু কাবো।”
আহসান হাসলো। আহিয়ানকে প্রথমে ফিডার থেকে পানি খাওয়ালো। তারপর আস্তে আস্তে ভাত খাওয়ালো। আহিয়ান পুরো একঘন্টার মতো সময় নিয়েছে। আহিয়ানকে খাওয়ানো শেষ হতেই আহসান সোজা হয়ে দাঁড়ায়। পিঠ পুরো ধরে গিয়েছে। ফারিন এতক্ষণ ধরে এই শরীরেও কি করে ঘুরে বেরিয়েছে কে জানে? আহিয়ানের মুখ মুছে দিতেই ও ফারিনের গা ঘেঁষে শুয়ে পড়লো। বুকে মাথা ঘষে জড়িয়ে ধরে পেটে পা রাখতে গেলেই আহসান চটজলদি আহিয়ানকে কোলে তুলে নেয়। আহিয়ানের ঘুমের সময় অনবরত লাথি মারার অভ্যাস আছে। এই ছেলে এখন কাঁচা সেলাইয়ে লাথি মেরে একটা হেস্তনেস্ত অবস্থা করেই ফেলবে।
আহিয়ান হাত পা ছুঁড়ে। “মার কাছে যাবো। মার কাছে যাবো।”
আহসান হাত ধুয়ে আহিয়ানকে নিয়ে সোফায় শুয়ে পড়ে। আহিয়ানকে বুকের উপর শুইয়ে দিয়ে বলে,
“আজকে আমার কাছে ঘুমালে কালকে চকলেট কিনে দিবো।”
“তত্যি?”
“হুম।”
আহিয়ান আহসানের বুকে মাথা রাখে। তবে একটু পর পরই মাথা তুলে ফারিনের দিকে তাকায়। আহসান ওর পিঠে চাপড় মারতে থাকে। আহিয়ান মুখ তুলে বলে,
“ওগুলো কি?”
“কোনগুলো?”
“মার পাচে।”
“বেবি। তোমার বোন ওরা।”
“মার কাচে কেন? তাইলে আমিও যাবু।”
“ওরা তো ছোট। তাই ওরা এখন মার কাছে থাকবে।”
“আমি থাকবু না?”
“কালকে থেকে তুমিও থাকবে। তোমরা তিনজনই থাকবে।”
“আচ্চা।”
আহসান বলে, “ওদের একজনের নাম আনহা, আরেকজন অহনা।”
আহিয়ান বুকে হাত রেখে বলে, “আমি পাইয়াজ।”
“হ্যাঁ তুমি ফাইয়াজ, ফিহা আর ফিজার বড় ভাই।”
আহিয়ান খিকখিক করে হাসে। আহসান আহিয়ানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে, “কি ছোট বাবু দেখেছো?”
“ওরা কি ভাতু কায়?”
“না।”
“তাইলে?”
“ওরা দুধু খাবে। তোমার মতো বড় হলে ভাত খাবে।”
আহিয়ান আহসানের বুকে মুখ লুকালো। মাথা নেড়ে নেড়ে বলে, “তুতু তিতা। তুতু তিতা।”
আহসান শব্দ করে হেসে উঠে। ফারিন কফির সাহায্য নিয়েছিল আহিয়ানকে দুধ খাওয়া ছাড়াতে। তারজন্য ছেলে এমন করবে? আহসান আরো কিছুক্ষণ ছেলের সাথে আলাপ করে ওকে ঘুম পাড়িয়ে দিলো। তারপর আহিয়ানকে ফারিনের বাম পাশে শুইয়ে দিলো। ডান দিকে উপরে নিচে আনহা, অহনা, বামপাশে আহিয়ান। আহসান একটা সেলফি তুললো পাঁচজনের। ফ্রম টু টু ফাইভ।
একটু পরই ফারিনের ঘুম ভাঙে ব্যথায়। ধীরে ধীরে ওর অ্যানেস্থেসিয়ার রেশ কাটতে থাকে। আহসান আহিয়ানকে সরিয়ে ফেলে। আহনা, অহনাকেও দোলনায় শুইয়ে দেয়। ফারিনের পাশে গিয়ে বসে। ফারিনের কাঁটাছেড়া সহ্য হয় না। অবশের রেশ কাটার পরের কিছুক্ষণ মেয়েটা ছটফটালো। পানি খেতে চাইলেও দেওয়া হলো না।
ফারিন প্রথমে ছটফট করলেও পরে নিজেকে সামলে নেয়। দুর্বল গলায় বলে, “ওদেরকে এনে দাও।”
“আহিয়ানকে?”
“আহিয়ানকে, আনহা, অহনাকেও। প্রত্যেককে, আমার সন্তানদেরকে।”
আহসান এনে দিলো। ফারিন দু চোখ ভরে নিজের তিন সন্তানকে দেখে। চোখ পিটপিট করে বলে, “কি খাইয়েছো ওদের? মেয়েরা তো দুধ পায়নি না?”
“আহুকে ভাত, অহি-আহিকে জিরো টু সিক্স ফর্মুলা মিল্ক।”
ফারিন একহাতে ছেলে-মেয়েদের আদর করে দেয়। আবারও চোখ বন্ধ করে পড়ে থাকে। আহসান ফারিনের কপালে চুমু খায়।
“থ্যাংক ইউ, এত কষ্ট সহ্য করে আমাকে বাবা বানানোর জন্য।”
“আহিয়ানকে আর বকো না। ও আহামরি বড় না।”
“সরি। টেনশনে মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল।”
“বুঝেছি আমি।”
ফারিন চোখ বুজে রাখে। পানি খেতে খেতে আরো ঘন্টা দুয়েক। ফারিন ক্লান্ত ভঙ্গিতে আহসানের দিকে তাকায়।
“কিছু খাওনি?”
“না।”
“দুপুরে?”
“তুমি কল দেওয়ার পর পরই বের হয়ে গিয়েছিলাম। রাস্তায় জ্যামে বসে থাকার কারণে আসতে আসতে সন্ধ্যা হয়েছে। সন্ধ্যার পর থেকে তো এই কাহিনিই। আর খাবো কখন?”
“খেয়ে নিতে পারতে।”
“সমস্যা নেই।”
“পানি খাও।”
“সমস্যা নেই।”
ফারিন আহসানের দিকে তাকায়। আহসান ফারিনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে মজা করে বলে, “তুমি যখন পানি খাবে তখন আমিও খাবো। ভালোবাসা বুঝেছো?”
“চেহারা, ঠোঁট শুকিয়ে কেমন হয়ে গিয়েছে। খাও কিছু। সিজার আমার হয়েছে না তোমার?”
“সিজার তোমার হয়েছে। বাচ্চা আমাদের হয়েছে। এইটুকু সহ্য করাই যায়।”
“আনহা, অহনা হওয়া উপলক্ষে কিছু করোনি? আহিয়ানের সময় তো কম্বল বিতরণ করেছিলে।”
আহসান চেয়ার টেনে বসে। ফারিনের হাত ধরে বলে,
“মসজিদে কালকে টাকা দিবো। কিন্তু আমি বুঝেছো আহিয়ানকে ঘুম পাড়াতে পাড়াতে অনেকক্ষণ ধরে ভাবছিলাম কি করা যায়, কি করা যায়। আহিয়ানের সময় তো ঠান্ডা ছিল। তাই কম্বল দিয়েছি। এখন কি দিবো? ছাতা? বৃষ্টি পড়ে তাই ছাতা দিবো?”
ফারিন মুখ ঘুরিয়ে ফেললো। মেয়েদের পিঠে হাত রেখে বলে, “বাদ দাও, বাদ দাও। তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না।”
“কিন্তু তোমাকে দিয়ে ওরা মানুষের মতো মানুষ হবে।”
আহসান উঠে গণহারে চারজনের কপালে চুমু খেলো। তারপর ফারিনের ঠোঁট চারবার নিজ থেকে নিজের গাল লাগিয়ে বলে,
“একটা ফৌজিয়া ফারিনের পক্ষ থেকে, একটা ফাইয়াজ সিদ্দিক আহিয়ানের পক্ষ থেকে, একটা আনহা সিদ্দিক ফিজার পক্ষ থেকে, একটা অহনা ফিহার পক্ষ থেকে।”
ফারিন আফসোসের সুরে দুর্বল কণ্ঠেই হেসে বলে,
“তোমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না।”
___________________
অনি, ইনায়া, জেসমিন রাত এগারোটা নাগাদই চলে এসেছে। ইনায়া গোসল করে বের হয়। হসপিটালে গেলে ওর গা ঘিনঘিন করে। তাই হসপিটাল থেকেই বাসায় ফিরেই ও গোসল করতে সোজা বাথরুমে ঢুকেছে। মাথায় তোয়ালে পেঁচিয়ে বের হতেই দেখেই রুদ্ধ পায়ের উপর পা তুলে বুকে মোবাইল ঠেকিয়ে স্ক্রল করছে। ইনায়া খাটে বসে চুল থেকে তোয়ালে খুলে ফেলে। মাথা মুছতে মুছতে বলে,
“নিজে একটা লেজ ছাড়া হনুমান, আহিয়ানটাকেও হনুমান বানাচ্ছো।”
রুদ্ধ মোবাইল রেখে বসলো। আড়মোড়া ভেঙে বলে,
“তাতে তোর কি?”
ইনায়া চোখ ছোট ছোট করে তাকায়। রুদ্ধ বিছানার এপ্রান্ত থকে ওপ্রান্তে হাঁটুতে ভর দিয়ে ইনায়ার কাছে আসে। ইনায়ার কাঁধে হাত রেখে বিড়াল ডাকার মতো, সোজা বাংলা ভাষায় বখাটেদর মতো ইশারা দিয়ে বলে,
“চুচু আয় একটা ডিম ফুটাই।”
ইনায়াও ঠোঁট চোকা করে ইশারা দিয়ে বলে, “আয় ফুটাই।”
“সিরিয়াসলি?”
“হ্যাঁ।”
“তুই খালি ভাব আমার বড় ভাইয়ের বিয়ের বয়স এই বছরই পাঁচ হলো আর ওরা বিয়ের পাঁচ বছরেই তিন বাচ্চার বাপ মা। কেমন ফাস্ট ভাব শুধু। আমরা কি করলাম এই জীবনে? আমি প্রায় চার বছর ধরে বিয়ে করে কি করলাম?”
“আসলেই! কি করলি তুই এই জীবনে?”
“এভাবে তো জীবন যুদ্ধে পিছিয়ে থাকলে চলবে না বল?”
“হুম। এভাবে চলবে না।”
“সো, আয় ফুটাই।”
“আয় না চল!”
“তো কিভাবে কি শুরু করতে হবে?”
“যেভাবে মানুষ শুরু করে।”
“হোপ, আমি কি মানুষকে জিজ্ঞাসা করবো ডিম ফুটানোর আগে আপনারা কিভাবে কি শুরু করেন? আমার লজ্জা আছে না?”
ইনায়া রুদ্ধর দিকে গভীর চোখে তাকিয়ে রুদ্ধর পিঠে হাত বুলিয়ে দুষ্টু হাসি হেসে বলে, “তোমার লজ্জাও আছে সোনা? ও মাই গড! লজ্জা বানান করো তো!”
রুদ্ধ সাথে সাথে ইনায়াকে ছেড়ে দেয়। দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “শালী লুইচ্চা।”
ইনায়া দুষ্ট হাসি দিয়ে ‘চুচু’ শব্দ করে বলে, “আয় না ডিম ফুটাই।”
“আচ্ছা ডিম ফুটানোর পর কি করতে হবে?”
“আমার থেকে দুই হাত দূরে থাকতে হবে।”
“কয়দিন?”
“এইযে মনে কর প্রেগন্যান্সির নয় দশমাস। তারপর বাচ্চা হওয়ার পর ছয় সাত মাস।”
“সত্যিই?”
“হ্যাঁ। তো মিথ্যা নাকি?”
রুদ্ধ চুলে হাত গলিয়ে বলে, “তোর থেকে দূরে থাকা কোনো ব্যাপার না। আরো ভালো। ব্যাড টাচের হাত থেকে বেঁচে যাবো।”
“ব্যাপার না?”
“আমি তোর কাছেই আসি-বা কয়বেলা যে ব্যাপার হবে?”
“ওহহহ তাই?”
“হ্যাঁ আমি পিউর ভা ভা ভা।”
“হোয়াট ইজ দিস ভা ভা ভা।”
“ওই যে ওই ওই ওই ওইটা।”
ইনায়া চোখ ছোট ছোট করে তাকায়। রুদ্ধ সেই চাহনি দেখে বলে, “আমার দেহ মন সব শুদ্ধ। তুই আমাকে ব্যবহার করিস। আমার মতো পাক পবিত্র এই দুনিয়ায় কেউ নাই।”
“ওমাহ তাই?”
“তুই আমাকে যেভাবে ব্যাড টাচ করিস, আমি তোকে ওইভাবে করি?”
রুদ্ধর গাল টেনে বলে, “না, তুমি ভদ্র লক্ষ্মী বাচ্চা।”
“সেটাই। যেহেতু আমি তোর কাছে যাই না সেহেতু একবার ডিম ফুটিয়ে ফেলে আর কোনো সমস্যা নেই।”
“মারা খা।”
বলে ইনায়া উঠে গেল। আলমারি খুলে রুদ্ধ যাতে দেখতে না পায়, সেইভাবে কাপড় নিয়ে চলে গেল। রুদ্ধ ক্রুর হাসে। আবারও শুয়ে পড়ে। পা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বেবি ড্রেস দেখতে থাকে। আনহা, অহনাকে ও ভালো ড্রেস দিবে, আনকমন ড্রেস দিবে। অনিরুদ্ধর চয়েজ সেরা সেই প্রশংসা সবাই আবারও করবে। একটু পরই ইনায়া বের হয় একটা পাতলা শাড়ি পড়ে। রুদ্ধ মোবাইল থেকে চোখ সরিয়ে ইনায়াকে একপলক দেখে অভ্যাসবশত চোখ সরিয়ে ফেললেও আবারও সঙ্গে সঙ্গে তড়িৎবেগে ইনায়ার দিকের দিকে তাকায়।
ইনায়া চুল উড়িয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ায়। রুদ্ধ হা করে উঠে বসে। ইনায়া আয়নায় রুদ্ধর এই রিয়েকশন দেখে। রুদ্ধ শিষ বাজিয়ে উঠে।
“জান লুকিং সো গরম।”
ইনায়া চুল উঠিয়ে বলে, “ফাটাফাটি লাগছে না বেব?”
“সেরা। কাছে এসো না? আরো কাছে এসো না?”
ইনায়া হেসে বলে, “অভদ্র হয়েছি আমি তোমার প্রেমে ওহোহো? সেটাই নাকি?”
“পুরো খাপ্পে খাপ।”
ইনায়া আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রংঢং করা আরম্ভ করে। রুদ্ধ ইনায়ার কাছে আসতে নিলে ইনায়া রুদ্ধর দিকে ঘুরে আঙুল নাড়িয়ে বলে,
“উহু মুরুব্বি, উহু। কাছে আসবেন না। আপনি না আমার কাছে আসেন না?”
“আসি, আসি। একটা টাইট হাগ দে প্লিজ?”
“না, না, না। কথার খেলাপ করা পছন্দ করি না মুরুব্বি। হবে না কোনো কাছে আসাআসি।”
রুদ্ধ ইনায়ার হাতে টান মেরে ওকে বুকে ফেলে। ইনায়া গোলগোল চোখ করে বলে, “ছিহ মুরুব্বি ছিহ! এটা তো আপানাকে শোভা পায় না।”
“রাখ তোর মুরুব্বি।”
রুদ্ধ ইনায়াকে শক্তপোক্ত চুমু খেলো। ইনায়া টিটকারি মেরে বলে, “মুরুব্বি দেখি কাছে আসে না বলে আবার চুমুও খায়।”
রুদ্ধ ইনায়াকে বিছানায় ফেলে ওর হাত চেপে ধরে বলে, “হ্যাঁ তারপর কি?”
“হাত ছাড় এরপর দেখাচ্ছি তারপর কি।”
রুদ্ধ ইনায়ার গালে চুমু দেওয়া শুরু করে। ইনায়াও রুদ্ধর গালে ফিরতি দুটো চুমু দিতেই অনিরুদ্ধ ইনায়ার গলায় জোরে কামড় বসিয়ে দেয়। ইনায়া আচমকা এমন হওয়ায় চেঁচিয়ে উঠে, “জালিমের বাচ্চা, কামড়াকামড়ি করতে নিষেধ করেছি না?”
“আহিয়ানকে নিয়ে নিচে নামার সময় একটা সুইসাইড কেস দেখেছিলাম। মাত্রই মনে পড়লো। বল তোকে এখন কি করা উচিত।”
“আমি কি করেছি? আমি বলেছি নাকি সুইসাইড করতে?”
“কিন্তু তুই তো একসময় করেছিলি না?”
“ভালো হয়েছে করেছি।”
রুদ্ধ ইনায়ার চুল টেনে ওকে ঝাঁকাতে থাকে। “তোর ভালো বের করছি আমি।”
ইনায়াও রুদ্ধর চুল টেনে ধরে। রুদ্ধ ইনায়ার চুল ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলে,
“আজকে তুই মরলে কি আমার হতো?”
“চুল ছাড় এনিমেল।”
চুল তো ধরেছিই, রুদ্ধ এবার ইনায়ার গাল চেপে ধরে, আলতো করে। ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে বলে, “বল মরলে বেশ হতো না?”
ইনায়া নখ দিয়ে রুদ্ধর গলায় আঁচড় বসিয়ে দেয়। “মরি নাই দেখে এখন ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে মেরে ফেলবি নাকি? কি আজব!”
“আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ কথা শোন।”
“কি?”
“এখন তো ভুলেও ডিম ফুটানো যাবেই না।”
“কেনো?”
“কাছে না আসা গেলে তোকে কেলানোও যাবে না। কেলাতে না পারলে তো অসুবিধা। ডেইলি তোকে দুই তিনটা চড় দিতে না পারলে হাত ইশপিশ ইশপিশ করে।”
ইনায়া রুদ্ধ পেট বরাবর হাঁটু দিয়ে জোরে এক বাড়ি মারে। রুদ্ধ পেটে পেটে কুঁকড়ে উঠে। বিছানায় পিঠ এলিয়ে দিয়ে বলে,
“কুত্তা! আমি ব্যথা পেয়েছি।”
ইনায়া রুদ্ধর চুল টেনে বলে, “তো ওকে আদর করতে মেরেছি?”
রুদ্ধ আরো কিছুক্ষণ বিছানায় গড়াগড়ি করলো।
ইনায়া সিরিয়াস হয়ে যায়। ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলে,
“এই বেশি ব্যথা পেয়েছো?”
রুদ্ধ কথা বলে না। পেটে চেপে গড়াগড়ি করতে থাকে। ইনায়া কাঁধে আঁচল তুলে রুদ্ধ পেটে হাত ঘষে বলে,
“সরি সরি। এত জোরে লাগবে বুঝতে পারিনি।”
“গরু মেরে জুতা দান করতে হবে না।”
“আচ্ছা আচ্ছা জুতা মেরে গরু দান করবো না। বেশি ব্যথা পেলে বলো।”
“যাহ সর।”
ইনায়া রুদ্ধকে জড়িয়ে ধরে। পেটে হাত রেখে বলে, “সরি জান। তোমার বেবি কি ব্যথা পেয়েছে? মা হয়ে সরি বলে দিচ্ছি।”
“কোন বেবি?”
“ভুড়ি বেবি।”
“এক লাথি দিবো যে ইতরামি সব সুরসুর বের হয়ে যাবে। কিসের ভুড়ি? আমার কোনো ভুড়ি নেই।”
“তুই খালি একটা লাথি দিয়ে দেখ, একটা শুধু। এরপর কয়টা খাবি সেই হিসেব আমি করবো।”
“যা সর।”
ইনায়া রুদ্ধর গালে চুমু খায়। “বেশি ব্যথা পয়েছো? অনেক অনেক সরি। কান ধরছি।”
রুদ্ধ আচমকা ইনায়ার হাত টেনে ইনায়ার উপর ভর দিয়ে শুয়ে পড়ে। শাড়ির আঁচলে হাত রেখে বলে,
“অনেক জ্বালিয়েছো জান। সময় এখন আমার।”
দুটোর মাঝে এরপরও একটা ধস্তাধস্তি হলো। শেষরাতে ইনায়া রুদ্ধর গালে, গলায় আঁচড় লাগা জায়গায় তুলো দিয়ে হেক্সিসল লাগিয়ে দিলো। রুদ্ধ সেবা সুশ্রুষা পেয়ে সাথে সাথেই নেইল কাটার দিয়ে ইনায়ার সব নখ কেটে দিলো।
চলমান……
(হ্যাপি রিডিং…)

