আফরিন_আখ্যান #পর্ব_২০(গ) #সমৃদ্ধি_রিধী

0
57

#আফরিন_আখ্যান
#পর্ব_২০(গ)
#সমৃদ্ধি_রিধী

আজ দোসরা আগষ্ট, আনহা অহনার জন্মদিন। ওদের এক বছর পূরণ হয়েছে। আহসান-ফারিন আহিয়ানের জন্মদিনের মতো ওদের জন্মদিনও পার্টি করে, হুলুস্থুল আয়োজন করে পালন করতে চায়নি। ফারিন নিজের হাতে রান্না করে অনাথ আশ্রমের বাচ্চাদের খাইয়েছে। আহসান অনাথ আশ্রমের বাচ্চাদের নতুন জামা কিনে দিয়েছে। আজ সকাল সকাল ফারিন, আহসানই শুধু অনাথ আশ্রমে গিয়েছিল। বাচ্চাদের নেয়নি। পরশু রাতেই আহসান ফারিন ছেলে-মেয়েদের নিয়ে, আদৃত ইশাও ওদের সাড়ে চারমাসের ছেলেকে নিয়ে একসাথে ধানমন্ডি এসেছে। বলা বাহুল্য ফারিন আনহা, অহনার ছয়মাস বয়সেই আহসানের সাথে উত্তরা চলে গিয়েছিল। ওদের জন্মদিন উপলক্ষে আজ মাস দুয়েক পর ধানমন্ডি আসা হলো। ফারিন একা হাতে আনহা, অহনা, আহিয়ানকে সামলে জার্নি করতে পারে না।

সকালেও অনাথ আশ্রমে যাওয়ার সময় ওদেরকে নেয়নি। একে তিনজনকে নিয়ে ওখানের কাজ করে সামলাতে পারবে না, দুই বাইরে প্রচুর গরম। শাশুড়িদের কাছে আনহা, অহনাকে রেখেছে আর আহিয়ানকে অনি ধানমন্ডি ব্রাঞ্চে নিয়ে গিয়েছিল। ওখানে গিয়ে রান্না করে, বাচ্চাদের খাইয়ে, বাচ্চা, স্টাফ সকলকে নতুন জামাকাপড় দিয়ে বাসায় ফিরতে ফিরতে ফারিন, আহসান সাড়ে তিনটার মতো বেজে যায়। ফারিনের তিন জান বাচ্চাই সকালে ঘুমাচ্ছিলো যখন ওরা বেরিয়েছে।

অনি তখনও আহিয়ানকে নিয়ে ফিরেনি। ফারিন গোসল করে দুই মেয়েকে কোলে নিয়ে রুমে আসে। আনহা অহনা সারাদিন পর মায়ের ছোঁয়া পেয়ে চিল্লাচিল্লি করা শুরু করে দেয়। ফারিনের কান ধরে যায়। দুইজনকে একসাথে কোলে নিয়ে হাঁটতে থাকে। আহসানও ওয়াশরুম থেকে তড়িঘড়ি করে বের হয়। এসে অহনাকে কোলে তুলে নেয়। অহনা আঙুল চুষতে থাকে। আহসান তা লক্ষ্য করে বলে,

“ফারিন ওদের মনে হয় খিদে পেয়েছে।”

“হুহ খাওয়াবো। তুমি অনিকে কল দিয়ে বলো আহিয়ানকে নিয়ে আসতে।”

আহসান অহনাকে কোলে নিয়েই অনিকে কল দিলো। অহনা আঙুল চুষতেই থাকে। ফারিন আনহার জামা বদলে দেয়। গায়ে পাউডার মেখে পেটে নাক ঘষে। আনহা হেসে ওঠে। আহসান অনির সাথে কথা বলে বিছানার অপরপ্রান্তে বসে। অহনাকে ঠেসে চুমু খেয়ে বলে,

“তোমার বড় মেয়ের কিন্তু ভালোই বিষ আছে।”

ফারিন চোখ ছোট ছোট করে বলে, “আহি কি করেছে?”

“অহির হাত খামচে লাল বানিয়ে দিয়েছে। দেখো!”

বলে ফারিনকে অহনার বাহু দেখালো। ফারিন অহনাকেও কোলে নেয়। আনহার দিকে চোখ রাঙিয়ে বলে,

“হাত একদম বেঁধে রাখবো পাঁজি মেয়ে। ভাইয়াকে খামচি দাও, বোনকে খামচি দাও, ছোট ভাইয়াকে খামচি দাও। বেশি বেশি তোমার।”

আহসান বালিশ টেনে চিৎ হয়ে শুয়ে বলে, “খুব বুঝেছে ও। অনেক বুঝে ফেলেছে। ওকে এইসব না করে নখ কেটে দিলেই তো পারো।”

“কাটি না আমি?”

“কাটো ঠিক আছে, কিন্তু দুই দিন পর পরই বড় হয়ে যায়। কিয়ানকে কালকে খামচি দিয়ে গালের চামড়া উঠিয়ে ফেলেছে। ইশা কেমন মুখ কালো করে ছিল দেখোনি?”

ফারিন কটমট করে আনহার দিকে তাকায়। আনহা অহনার গালে থাবা বসিয়ে দেয়। অহনা ঠোঁট উল্টে কাঁদা আরম্ভ করে দেয়। ফারিন কোল থেকে আনহাকে নামিয়ে দেয়। ধমকে বলে,

“বেশি বেশি এটার। তোমাকে আর কোলে নিবো না আমি ফাজিল মেয়ে।”

আনহা আঙুল চুষে। ফারিন অহনাকে আদর করে কান্না থামায়। আনহা আর ফারিনের কাছ ঘেঁষে না। হামাগুড়ি দিয়ে আহসানের কাছে চলে আসে। ফারিন আঙুল তাক করে বলে,

“ওকে একদম কোলে নেবে না আহিয়ানের বাবা।”

আহসান ফিচেল হাসলো। আনহাকে বুকের উপর বসিয়ে আনহার গাল টেনে বলে, “তোমার কথা শুনবো কেনো আমি? মেয়ে তার বাবার কাছে আসলে বাবা ফিরিয়ে দিতে পারে?”

আনহা বাবার বুকে মাথা রেখে আঙুল চুষতে চুষতে ফারিনের দিকে তাকায়। ফারিন কপাল কুঁচকে তাকিয়ে থাকে। আনহা আহসানের বুকে মুখ ঘষে আবার ফারিনের দিকে তাকায়। আহসান ছোট্ট শরীরটাকে বাহুডোরে আবদ্ধ করে বলে,

“আজকে ওদের জন্মদিন না? আজকে ওদের উপর রাগ করো না। দেখো খিদে পেয়েছে। দুইজনকেই খাওয়াও। আম্মু তো বললোই তেমন একটা খায়নি দু’জনেই।”

ফারিন হাত বাড়িয়ে আনহাকে ডাকলো। ফারিনের হাত বাড়াতে দেরী, আনহা আহসানের বুক থেকে নেমে হামাগুড়ি দিয়ে ফারিনের কাছে চলে আসতে দেরী হলো না। ফারিন সময় নিয়ে দুইজনকে খাওয়ালো। ওদেরকে খাওয়ানোর পর আর ধরতেও হয়নি। বিছানায় খেলতে খেলতে দুজনেই ঘুমিয়ে গেল। যদিও দুজনকে একসাথে রাখা যায় না। ফারিন মাঝে শুয়ে ছিল, দুইজন দুইদিকে। নাহলে একটা আরেকটার চুল টেনে, মুখে থাবা মেরে অবস্থা খারাপ করে ফেলে। অহনা খুবই কম হাত তোলে, ও মার খায় বেশি। আহিয়ান এইজন্য অহনাকে খুব পছন্দ করে। কোলে নিয়ে চুপটি করে বসে থাকে। আনহার মতো মারে না। আহসান ঘুমন্ত আনহার দিকে তাকিয়ে বলে,

“তোমার বড় মেয়ে পুরো তোমার মতো বিষওয়ালা হয়েছে। গায়ে হাত তোলার বেলায় ওস্তাদ।”

“একদম আলতু ফালতু কথা বলবে না বলে দিলাম।”

“আগে ছেলেকে নিয়ে বললে রাগতে, এখন মেয়েদের নিয়ে বললেও রাগো যে?”

“ওমাহ তাই তো! ওরা তো আমার সতীনের মেয়ে। রাগছি কেনো আমি?”

আহসান হাসলো। ফারিন চোখ পাকিয়ে বলে, “আমার মতো মানে? কার গায়ে হাত তুলি আমি? তোমার ছেলে-মেয়ে যে এত জ্বালায় আমাকে, কখনো ধৈর্যহারা হয়ে ওদের মেরেছি আমি? আন্দাজে একটা অপবাদ দিয়ে ফেললেই হলো না?”

“আমাকে দাও না হুটহাট বাঘের থাবা?”

“বাদ দাও, বাদ দাও। তোমার সাথে কথা বলে লাভ নেই। তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না।”

আহসান হাসলো। ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসে। উপুড় হয়ে ওভাবেই শুয়ে থাকে। ফারিন বিরস গলায় বলে,

“ছেলেদের সুখ দেখলে…ঘুমাও। তোমাদেরই দুনিয়া।”

আহসান বালিশে মুখ গুঁজেই হাসলো। ফারিন মেয়েদের গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে নিজেও একটু ঘুমিয়ে নেয়।

______________

অনি ছয়টা নাগাদই বাড়ি ফিরেছে। চাচা, ভাতিজা, দুই দাদা আজকে অফিসের ক্যান্টিনে খেয়েছে। অনি আহিয়ানকে ফারিনের হাত তুলে দিয়ে একগাদা বিচার দিয়ে গেল। আহিয়ান কমপক্ষে হলেও নাকি খাওয়ার সময় দেড়ঘন্টা সময় নিয়েছে। ফারিন হাসলো, একদিনেই ছোট দেবরের শখ মিটে গিয়েছে। অনি লাফাতে লাফাতে গিয়েছে এখন আদৃত-ইশার ঘরে। কিয়ানকে কিছুক্ষণ কচলাবে ও। ইশার ধমক না খাওয়া অব্দি কিয়ানকে কচলাতেই থাকবে। ফারিন আহিয়ানের জামা বদলে দেওয়ার জন্য ডাকলে আহিয়ান বিছানায় বসে মুখ ঘুরিয়ে ফেলে। মাকে বোঝায় ও অনেক রেগে আছে। রেগে গাল ফুলিয়ে থাকা যাকে বলে। বিছানার একপাশে আনহা, অহনা ঘুমে। আহসান আধশোয়া হয়ে বসে ল্যাপটপে মেইল চেক করছে। ফারিন আহিয়ানকে জড়িয়ে ধরে বলে,

“আমার আব্বার এত রাগ কেনো?”

শরীর ঝাড়া দিয়ে বলে, “কেউ ভালোবাসে না আমাকে।”

আহসান ল্যাপটপের স্ক্রিনেই চোখ রেখে বলে,

“আবার কি হয়েছে?”

“বেরু গিয়েছো যে আমাকে নিয়ে গিয়েছো?”

“বেরু যাইনি তো। কাজে গিয়েছি।” ফারিন বলে।

“চাচ্চু বলেছে বেরু গিয়েছি।”

ফারিন আহসানের দিকে তাকায়। আহসান আজকে অনিকে দুঘা দিবেই দিবে। রীতিমতো প্রতিবার আসলেই একটা না একটা আগুন লাগাবেই। আহসান ল্যাপটপ রেখে বলে,

“সত্যি কাজে গিয়েছি।”

“আমি রাগ করেছি।”

“আচ্ছা আব্বা আমরা পরেরবার তোমাকে নিয়ে যাবো। তোমাকে ফেলে আর কোথাও যাবো না” ফারিন আহিয়ানকে আদর করে বলে।

আহিয়ান আঙুল তাক করে বলে, “মার সাথে রাগ করিনি। তোমার সাথে রাগ।”

আহসান মুখ লটকে বলে, “আমি কি করেছি?”

“তোমার সাথে কথা নেই।”

আহসান ল্যাপটপ ফেলে, কাজ ফেলে ছেলের কাছে আসে। আহিয়ানকে জিজ্ঞাসা করে,

“আব মেনে কেয়া কিয়া?”

আহিয়ান মুখ কুঁচকে বলে, “মা পঁচা কথা বলে বাবা।”

ফারিন হেসে উঠে। আহসান আহিয়ানের ছোট পায়ের উরুতে মাথা রেখে বলে,

“আমি কি তোমাকে কিছু করেছি? বকেনি, কিছু বলিওনি। তাহলে আমার উপর রাগ কেনো?”

আহিয়ান মুখ ঘুরিয়ে ফেলে। আহসান আহিয়ানের মুখ চেপে নিজের দিকে ফেরায়।

“কি হয়েছে?”

“চাচ্চু সব বলে দিয়েছে আমাকে।”

“ওরে বাবা! কি বলেছে তোমার পেয়ারে চাচ্চু?”

আহিয়ান ঘ্যানঘ্যান করে বলে, “আমাকে ডাস্টবিন থেকে কুড়িয়ে এনেছো কেনো? আমি তো এখন ছোটা ভীমের বাড়িতে থাকতাম। তুমি ওখান থেকে কেনো তুলে এনেছো?”

আহসান তব্দা খেয়ে ফারিনের দিকে তাকায়। ফারিন দাঁত কিড়মিড় করে বলে,

“তোমার ভাইকে আমার হাত থেকে কেউ বাঁচাতে পারবে না বলে দিলাম আমি।”

আহসান আহিয়ানকে বলে, “তোমাকে ডাস্টবিন থেকে আনবো কেনো? তোমাকে তো আমাদের কাছে আল্লাহ দিয়েছে।”

“কিভাবে দিয়েছে?”

“যেভাবে বোনুরা এসেছে সেভাবে।”

“মায়ের পেট থেকে?”

আহসান থতমত খেয়ে বলে, “হ্যাঁ।”

“ছোটা ভীম থেকে মায়ের পেটে গেলাম কি করে?”

আহসান ফারিনের দিকে আবারও তাকায়। ফারিন বলে, “আল্লাহ যেভাবে আহি, অহিকে পাঠিয়েছে সেভাবে এসেছো।”

“আল্লাহ আহিকে পাঠালো কেনো? ও শুধু মারে। অহি ভালো মেয়ে। আল্লাহ কি ভালো মেয়ের সাথে পঁচা মেয়েও পাঠায়?”

“আল্লাহ ওকে দুষ্টু বুড়ি হিসেবে পাঠিয়েছে যাতে তুমি ওকে আদর করে ঠিক করে দাও।”

আহিয়ান হুবুহু ফারিনের মতো কপাল কুঁচকে তাকায়। আহসান আহিয়ানের গাল টিপে দিয়ে বলল,

“তুমি না বড় ভাইয়া? বড় ভাইদের কাজ হলো বোন দুষ্টুমি করলে বোনকে আদর করে ঠিক করে দেওয়া।”

“আমাকে সত্যি ডাস্টবিন থেকে আনোনি?”

“না।”

আহিয়ান বোকার মতো বলে, “চাচ্চু মিথ্যা বললো কেনো?”

“মজা করেছে।”

ফারিন হাত বাড়িয়ে বলে, “এবার আসো মার কাছে। সারাদিন আমার কাছে আসোনি।”

আহিয়ান আহসানের দিকে তাকিয়ে বলে, “বাবা তো কোলে মাথা দিয়ে রেখেছে।”

আহসান আহিয়ানকে জড়িয়ে ধরে বলে, “তুমি না রাগ করেছো? তোমার রাগ না মেটা অব্দি আমি ছাড়বো না।”

“আচ্ছা আর রাগ নেই।”

আহসান আহিয়ানের পেটে কাতুকুতু দিয়ে বলে, “না, আহুর রাগ না কমা অব্দি ছাড়বোই না।”

আহিয়ান হেসে দেয়। খিলখিল করে ধ্বনিত হয় সেই হাসি। আহসানকে সরাতে চায়। আহসান আরো কাতুকুতু দিতে থাকে। ফারিন হাসে। আহসানকে সরিয়ে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে। আহিয়ান লাফিয়ে ওঠে।

“মার শক্তি বেশি, মার শক্তি বেশি। বাবা মার সাথে পারে না।”

আহসান ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো। সেই হাসি দেখে ফারিন অস্ফুটস্বরে আহসানকে বকা দিয়ে আহিয়ানকে ফ্রেশ করিয়ে দিলো। আহসান আদৃতকে ধরে বেঁধে বাইরে নিয়ে গেল। ছেলে হয়েছে পর থেকে অফিসে যাওয়া ছাড়া ঘর থেকেই বের হয় না। আর আগে এই আদৃত নাকি এক নাম্বারের পুরুষবাদী ছিল। এখন বউবাদী, ছেলেবাদী হয়ে গিয়েছে।

আনহা, অহনা ঘুম থেকে ঘরময় হাঁটছে। ফারিন খাটের উপর বসে ওদের ধোঁয়া কাঁথা, জামাকাপড় ভাঁজ করছে। কিছুক্ষণ পর পর ওদের দিয়ে একপলক দেখে নিজের কাজ করছে। যেকেনো সময় চোখের পলকে হাতাহাতি শুরু হয়ে যায় ওদের। এদিকে আহিয়ান খাটের উপর লাফাচ্ছে। হঠাৎ-ই লাফাতে লাফাতে বলে,

“ফাইয়াজ ফ ফর ফাজিল, ফিহা ফ ফর ফাজিল, ফিজাও ফ ফর ফাজিল। সবাই ফাজিল, সবাই ফাজিল, সবাই ফ ফর ফাজিল।”

ফারিনের কপাল কুঁচকে গেল। আহিয়ানকে ডেকে বলে, “এদিকে এসো।”

আহিয়ান মাথা নেড়ে লাফাতেই থাকে। ফারিন আহিয়ানকে ধরে বেঁধে জিজ্ঞাসা করে,

“কে শিখিয়েছে এটা?”

“চাচ্চু, চাচ্চু।”

ফারিন যা সন্দেহ করেছিল ঠিক তাই। ও আহিয়ানকে বলে,

“চাচ্চুকে ডেকে নিয়ে আসো তো।”

“কেনো?”

“এমনিতেই। যাও।”

আহিয়ান অনিকে ডেকে নিয়ে আসলো। অনি আনহা, অহনার গাল টেনে দিয়ে ফারিনকে জিজ্ঞাসা করে,

“ভাবি ডেকেছিলেন?”

আলমারিতে আহসানের জামা রাখতে রাখতে বলে,

“বসেন, কাজ শেষ করে বলছি।”

অনিরুদ্ধ খাটে বসলো। আহিয়ান বলে, “মা ছোট ভাইয়ার কাছে যাই?”

“যাও।”

আহিয়ান দৌঁড় দিয়ে বেরিয়ে গেল। ফারিন অনিরুদ্ধর সামনে এসে বুকে হাত গুঁজে দাঁড়ায়। অনি চোখ পিটপিট করে বলে,

“কি ভাবি? আমি কিছু করিনি।”

“আপনি খুব ভালো। আপনি কিছু করতেই পারেন না।”

“সেটাই। আপনিই বুঝেছেন শুধু।”

ফারিন সাথে সাথে অনিরুদ্ধর কান মলে দিয়ে বলে,

“ফ ফর ফাজিল না?”

অনিরুদ্ধ কুঁকড়ে উঠে বলে, “আল্লাহ ভাবি আহিয়ান বলে দিয়েছে?”

কান আরো জোরে মুচড়ে দিয়ে বলে, “বলবে না আমার ছেলে আমাকে?”

“আরেহ ও খাচ্ছিলো না দুপুরে। তাই বলেছি ফাইয়াজ ফ ফর ফাজিল।”

“তাহলে তো ফিজা, ফিহাও ফাজিল।”

“তো! ওরা ভালো? আমার গলা খামচে আপনার মেয়ে কি করেছে দেখুন। অহনাও চুল টেনে মাথা ব্যথা উঠিয়ে ফেলেছে।”

ফারিন কান ছেড়ে দিলো। “তাহলে তো ফ দিয়ে ফারিনও হয়। ফারিনও ফাজিল?”

কান ডলতে ডলতে বলে, “আল্লাহ না ভাবি। আমি এতকিছু মিন করে বলিনি।”

“ওহ ভালো কথা মনে পড়েছে। আহিয়ানকে ডাস্টবিনে পেয়েছি না? নাহলে ও ছোটা ভীমে থাকতো?”

“আরেহ মজা করেছি।”

“আমিও মজা করি এসো।”

ফারিন ফের কান ধরার আগেই অনি এক লাফে ঘরের অপর প্রান্তে চলে গেল। ফারিন লুকিয়ে ঠোঁট চেপে হাসে। অনি মুখ কুঁচকে বলে,

“সেজো ভাবির সাথে কম মেলামেশা করবেন। দিনকে দিন ওনার মতো হয়ে যাচ্ছেন। ভুলে যাবেন না ওরা আমার ভাতিজা। আমি যা ইচ্ছে শেখাবো।”

“তুমিও তো আমার ছোট ভাইয়ের মতো। এসো আমাকে বড় বোন মনে করো কানমলা খেও যাও। আমিও আমার ছোট দেবরের সাথে যা ইচ্ছে করতে পারি, তাই না?”

কানে হাত ঘষতে ঘষতে বলে, “আপনার হাতে সেরা শক্তি মাইরি! আমার চুলুবুলুগুলো মারবেন না কখনো। ভেটকি মাছের মতো পড়ে থাকবে এটা মাইর খেলে। আমি বোধহয় আর ডান কানে শুনতে পারবো না কিছু। খোদা গো!”

“দাও আরেকবার টেনে ঠিক করে দেই।”

“লাগবে না। আপনি খারাপ হয়ে যাচ্ছেন। আগেই ভালো ছিলেন।”

“ইশাকে বলবো তো আমি তুমি আমার কাছে এসে ওর বদনাম করো।”

“বলেন গিয়ে। কোহিনূরকে বিয়ে করার আগে বেডিকে ভয় পেতাম। বোন দিবে না বলে হুমকি দিতো। এখন ভয় পাই না।”

“আসলেই বলবো, ওয়েট করো।”

অনি অহনা, আনহাকে জাপ্টে ধরে একসাথে কোলে নিলো।

“আমার মতো এত ভালো দেবর পেয়েছেন তো গায়ে লাগে না। পেতেন একটা টল্টু দেবর, তাহলে বুঝতেন মজা।”

ফারিন ঠোঁট চেপে হাসলো। অনি আল্লাহ হাফেজ বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ফারিন কাজে মন দিলো। খেলনাগুলো গুছিয়ে ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখলো। কাল সকালেই চলে যাবে ওরা উত্তরা। ঘর গুছিয়ে বিছানায় বসে হাফ ছাড়তেই ইনায়া এসে নিয়ে গেল। আনহা, অহনার জন্য আহসান, আদৃত কেক নিয়ে এসেছে। আনহা, অহনাকে কেক কাটানোর পর ওই কেক আবার আহিয়ান কাটে। জেসমিন আদৃতকে টিটকারি মেরে খোঁচাতে থাকে। আদৃতেরও তো জন্মদিন। ওকেও কেক কাটতে বলে। আদৃত তিন লাফে উপরে উঠে যায়। এই বুড়ো বয়সে কিসের কেক কাটা? আদৃত কোনো কেক টেক কাটবে না। ওর একটা প্রেস্টিজ আছে।

________________

ফারিন আটটার দিকে আনহা, অহনাকে ধরে বেঁধে অল্প একটু খিচুড়ি খাইয়ে দেয়। আহিয়ান গালে হাত দিয়ে বসে আছে। অহনা, আনহার খিচুড়ি টেস্ট করে ও ওয়াক ওয়াক করেছে। ওর ওয়াক ওয়াক দেখে আনহা, অহনা হাসতে হাসতে খেয়ে ফেলেছে। আহিয়ান তো অবাক। এই খিচুড়িতে একটুও মজা নেয়। তাও ওরা খেলো কি করে?

ফারিন বাটি বেড সাইড টেবিলে রেখে আহিয়ানকে বলে,

“আব্বা বোনদের ড্রেসের ব্যাগটা নিয়ে এসো তো।”

আহিয়ান খাট থেকে নেমে ওদের জামাকাপড়ের ব্যাগ নিয়ে এলো। ফারিন আনহাকে কোলে নিয়ে বলে,

“আব্বা অহনাকে কোলে নিয়ে বসে থাকো তো। ও যাতে না নামে খাট থেকে।”

আহিয়ান অহনাকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকে। ফারিন আনহার মুখ মুছে ওর জামা খুলে দেয়। ঘামিয়ে গিয়েছে পুরো। আনহার চুল আঁচড়ে ক্লিপ লাগিয়ে দেয়। আনহাকে আহিয়ানের কাছে দিয়ে অহনাকেও মুখ মুছে জামা পাল্টে দেয়। পাউডার হাতে নিয়ে আহিয়ানের দিকে তাকায়। আহিয়ান কাঁধ ঝাঁকায়।

“কি? দুষ্টু করিনি তো।”

ফারিন আহিয়ানের হাতে পাউডার দিয়ে বলে,

“বোনুদের গায়ে দিয়ে দাও তো।”

আহিয়ান পাউডার হাতে মাখে লোশনের মতো। আঙুল তাক করে দেখিয়ে বলে, “ওকে না ওকে?”

“দুইজনকেই।”

আহিয়ান আনহা, অহনার গায়ে পাউডার মাখা হাত ঘষে। ফারিনের দিকে তাকিয়ে বলে, “এভাবে?”

আনহা, অহনা খিলখিল করে হাসে। ফারিন হেসে আহিয়ানকে কোলে তুলে নেয়। গালে টপাটপ করে কয়েকটা চুমু দিয়ে বলে, “আমার ছেলেটা কত কাজ পারে। বোনদের টেককেয়ারও করতে পারে। আমার লক্ষ্মি ছেলে। আমার সোনা ছেলে।”

আহিয়ান ফারিনের গলা জড়িয়ে ধরে। আবদার করে বলে, “ভাইকেও দিয়ে আসি?”

“আদ্রকে?”

আহিয়ান মাথা ঝাঁকায়। ফারিন বলে, “যাও। কিন্তু আগে সেজোম্মুকে জিজ্ঞাসা করবে সেজোম্মু আমি কি ভাইকে পাউডার দিয়ে দিবো? যদি বলে দাও, তাহলেই দিবে। ঠিক আছে?”

আহিয়ান মাথা কাত করে। ফারিন বলে, “কখন দিবে?”

“যদি দিতে বলেএ, তাহলে দিবো।”

“যাও।”

আহিয়ান পাউডার নিয়ে দৌঁড় দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। বড় ভাইয়ের দায়িত্ব পালন করতে যাচ্ছে ও। ফারিন আনহা, অহনাকে লোশন মেখে ডায়পার চেঞ্জ করে আরেকটা ডায়পার পড়িয়ে দিলো। মেয়েরা খিলখিল করে হাসতেই থাকে। আহসান ঘরে আসে তখন। আহসান দুই মেয়েকে একসাথে কোলে নিয়ে সারা ঘরে হাঁটে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে মেয়েদের সাথে সুখ দুঃখের আলাপ করা শুরু করে দেয়। একটা দুটো মশার কামড় খাওয়ার পর চলে আসে ঘরে। ফারিনকে মশার কথা বলা যাবে না। বললেই চিল্লানো আরম্ভ করে দিবে।

আনহা, অহনার কেক কাটার সময় পর ইশা ঘরে আসতেই দেখে কিয়ান সবে মাত্র ঘুম থেকে ওঠেছে। বাপ বেটাকে ব্যবসায়িক কাহিনি শোনাচ্ছে। কিয়ান অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। ইশা ঘরে ঢুকে বেডে বসে। আদৃত কিয়ানকে কোলে নিয়ে বলে,

“ঘরে ঢুকে দেখি দার্শনিকের মতো সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছে।”

“সাড়ে চারমাসের বাচ্চা আর কি করবে?”

“তাও ঠিক।”

ইশা চুল খুলে ফেলে। সামনে এনে চুলের আগা দেখতে থাকে। আদৃত কিয়ানকে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। হাঁটতে হাঁটতে বলে,

“আমার গিফট কোথায়?”

“আপনার জন্মদিনে আপনাকে আমি এই জীবনে কিছু দিবো না। গিফটের আশা ভুলে যান।”

“কেনো কেনো?”

“যা যা করেছেন আপনি আমার সাথে নিজের জন্মদিনগুলোতে! মুখ আর না খুলি।”

“আচ্ছা আসো একটা চুমু দিয়ে যাও।”

ইশা “ব্লে ব্লে” বলে ভেঙ্গায়। আদৃত কিয়ানকে দুলাতে দুলাতে বলে, “শুধু আমার ছেলের মা দেখে কিছু বললাম না।”

“এই কিয়ানের বাবা? একটা কথা বলি?”

“হুহ।”

“চাকরিটা ছেড়ে দেই?”

শক্ত গলায় বলে, “না।”

“কেনো? চাকরি শুরু হলে কিয়ানকে রাখবো কোথায়? মানুষের কাছে বড় হবে আমার ছেলে?”

“চাকরি শুরু হলে ওয়ার্ক টাইম সাতটা টু দুইটা না? সকালে আমার কাছে থাকবে, দরকার হলে আমি অফিসে নিয়ে যাবো। ছোটবেলা থেকেই কাজকর্ম শেখাবো। সমস্যা হবে না। বাকি সারাদিন তো তুমিই রাখবে।”

“আমি চাকরি ছাড়লে আপনার সমস্যা কি? এমন তো না যে আমি সংসারে একটা টাকাও খরচ করি। ঘরের একটা সুতাও আমার টাকার না। সব তো আপনিই করেন। লিট্রেলি আমি আপনার কাছ থেকে যাতায়াতের ভাড়া নেই। তাহলে সমস্যা কি?”

“আমার ইনডিপেনডেন্ট ওম্যান পছন্দ। যদি ঘরে বসিয়েই বউকে খাওয়ানোর, বাচ্চাকাচ্চা দিয়ে বসিয়ে দেওয়ার চিন্তা থাকতো তাহলে চাকরিজীবী বিয়ে করতাম না, কিংবা বিয়ের পর তোমাকে চাকরি করতে দিতাম না।”

“আমি পুরোপুরি বাচ্চা সামলাতে চাচ্ছি। কিয়ানকে রাখবো কোথায়?”

“আমার আম্মু বা তোমার আম্মু রাখবে। নাহলে ভাবি রাখবে।”

“আনহা, অহনা, আহিয়ানই ছোট। ভাবির কাছে তো দিতে পারি না। উনিই তিন বাচ্চা নিয়ে হিমশিম খায়৷ আর আম্মুদের নিজেদের সংসার নেই? আমাদের পিছনে পড়ে থাকবে?”

“তাও না। বেশিদিন কষ্ট হবে না। হায়েস্ট এক, দুই বছর কষ্ট হবে। আমরা ম্যানেজ করে নিবো।”

“চাকরি ছাড়লে সমস্যা কি?”

“তুমি যে মাঝেমাঝেই নিজের টাকায় আমাকে ট্রিট দাও, আমাকে খাওয়াও, আমাকে হাবিজাবি গিফট করো আমার ভালো লাগে। তাই ছাড়া যাবে না।”

“মশকরা করছি না।”

“তোমার আব্বু চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। তুমি ওনাদের বড় মেয়ে। ওনাদের দায়িত্ব নেওয়া তোমার কর্তব্য। তোমার ভাইও নেই যে সে করবে। তাই তোমাকেই করতে হবে। ওনারা অবশ্য জামাইয়ের টাকায় খাবে না? মানসম্মানেরও একটা ব্যাপার আছে নাকি? ইনায়া তো উড়নচণ্ডী স্বভাবের মেয়ে। ওকে দিয়ে হবে এই কাজ?”

“আমার ব্যক্তিগত ইচ্ছে নেই?”

“কেমন মেয়ে তুমি? একসময় ওনারা নিজেদের ইচ্ছা অনিচ্ছা বির্সজন দিয়ে তোমাদের মানুষ করেছে, ওনাদের বৃদ্ধ বয়সে তুমি দায়িত্ব নিবে না? এখন কিয়ানের জন্য চাকরি ছাড়বে বলছো, ভবিষ্যতে কিয়ান নিজের বাচ্চার জন্য তোমাকে অবহেলা করলে কেমন লাগবে?”

ইশা মুখ ঘুরিয়ে নেয়। আদৃত কিয়ানকে একহাতে ধরে দাঁড়িয়েই ইশার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। ইশা আদৃতকে ওভাবে জড়িয়ে ধরে। ইশারা মাথা আদৃতের পেটে গিয়ে ঠেকে।

“সব খালি আমাকে করতে হবে। ইনু অপদার্থটা ছোট থেকেই রাজরানী আর আমি চাকরানী।”

কিয়ান ডেকে ওঠে, “অ্যাইই!”

আদৃত ইশার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। এই মেয়ে চরম ডিপ্রেশনে ভুগছে এখন। হরমোনাল ইমব্যালেন্স ওর ম্যাচিউর বউকে বোকা বানিয়ে দিয়েছে মাথায় আসতেই আদৃত আফসোস করে ওঠে। আদৃত মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে, “একটা হার্ড টাইম যাবে, ব্যাপার না। যাদের মা চাকরি করে ওইসব বাচ্চা স্বাবলম্বী হয়। আমাদের কিয়ানও হবে।”

আহিয়ান তখন ঘরে আসে। আদৃত দূরে সরে দাঁড়ায়। আহিয়ান কাচুমাচু করে বলে,

“সেজোম্মু আমি ভাইকে একটু পাউডার দিয়ে দেই?”

ইশা আহিয়ানের হাতের পাউডারটা দেখে। কিয়ানকে ও এটাই দিয়ে দেয়। ইশা হেসে গাল টেনে বললো,

“দাও।”

আদৃত কিয়ানকে শুইয়ে দেয়। কোমরে হাত দিয়ে বলে, “কি উপলক্ষে পাউডার?”

“বোনুদের দিলাম। তাই ওকেও দিতে এসেছি।”

ইশা কিয়ানের গায়ের কাঁথা সরিয়ে দেয়। “দিয়ে দাও। গরমে পাউডার দিলে ভালো লাগে।”

আহিয়ান জিহ্বায় কামড় দিয়ে বলে, “ন্যাংটু পুটু দেখে ফেললাম।”

ইশা প্যান্ট পড়িয়ে দিল। আহিয়ান অবুঝ গলায় বলে, “ডায়পু পড়বে না?”

“না। গরম তো! ভাই কাঁদে ডায়পার পড়লে।”

আহিয়ান কিয়ানকে পাউডার দিয়ে দিলো। কিয়ান হাত পা ছোঁড়া আরম্ভ করে দেয়। আহিয়ান কিয়ানের গালে চুমু খায়। আদৃত আহিয়ানকে কাঁধে তুলে নেয়। “বড় ভাইয়া হয়েছো না?”

“হ্যাঁ হ্যাঁ।”

আদৃত আহিয়ানকে কিছুক্ষণ চটকে ছেড়ে দেয়। আহিয়ান দৌঁড় দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। আদৃত দরজা লাগিয়ে ইশাকে জাপ্টে ধরে বলে,

“বেটার হাফ বার্থডে গিফটটা যদি দিতেন।”

“দিবো না। বুড়োই তো হচ্ছেন, আর কি গিফট দিবো?”

“তাহলে গিফট না পাওয়া অব্দি ছাড়বোও না।”

“কি চাই?”

“এত কষ্ট করে বাবা বানিয়েছেন। বেশি কিছু চাই না যদি একটু কিসমিস দিতেন?”

“কেমন কিসমিস?”

“আপনি বুঝেছেন। জলদি দিন।”

ইশা আদৃতকে কিসমিস উপহার দিয়ে বলে, “হবে?”

“খুব হবে।”

ইশা ছেলেকে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। আদৃত মাথা চুলকে হাসে।

আহিয়ান কিয়ানকে পাউডার নিয়ে ঘরে ঢুকতেই শুকনো মেঝেতে উপুড় হয়ে পড়ে গেল। ফারিন আহসানের সাথে তখন কথা বলছিলো। মেয়েরা বিছানায় খেলনা দিয়ে খেলছে। আহিয়ানকে পড়ে যেতে দেখে ও তড়িঘড়ি করে আহিয়ানকে ধরে ওঠায়। আহিয়ান ফুঁপিয়ে কাঁদা আরম্ভ করে দেয়। ফারিন আহিয়ানকে খাটে বসিয়ে জিজ্ঞাসা করে,

“কোথায় ব্যথা পেয়েছো?”

আহিয়ান হাত বাড়িয়ে বলে, “হাতে।”

ফারিন ওর হাত ডলে দেয়।

আহিয়ান ফোপাঁতে ফোপাঁতে হাতের তালু দেখিয়ে বলে, “চুমু দিয়ে দাও। ব্যথা চলে যাবে।”

ফারিন আহিয়ানের হাতের তালুতে চুমু দিয়ে দিলো, অনেকগুলো। আহিয়ানের দেখাদেখি আনহাও হাত বাড়িয়ে দেয়। ফারিন বলে, “ব্যথা কমেছে?”

আহিয়ান মাথা উপর নিচে মাথা নাড়ে। চোখ মুছে বলে,

“আহিকেও দাও।”

ফারিন আনহাকেও দিলো। অহনা হাত বাড়ায়নি। আহিয়ান নাক টেনে বলে, “এবার অহিকেও দাও।”

ফারিন হাসলো। অহনার হাতের তালুতেও চুমু খায়। আহসান বিটলামো করে নিজেও ডান হাত বাড়িয়ে দেয়। ফারিন চোখ রাঙিয়ে তাকায়। আহিয়ান আহসানের কোলে উঠে বসে। “বাবাকেও দাও।”

ফারিন দিলো। আহসান আহিয়ানকে জাপ্টে ধরে গালে টপাটপ চুমু দেয়। “তুমি আসলেই একটা চুলুবুলু।”

আহিয়ান চোখ পুরো মুছে ফারিনের গালে চুমু দিয়ে বলে, “আর ব্যথা নেই।”

অহনা হামাগুড়ি দিয়ে আহসানের হাঁটুতে থাবা মারতে থাকে। আহসান হাত বাড়িয়ে অহনাকেও কোলে নেয়, আনহাকেও নেয়। তিন ভাই বোন বাবার কোলে বসে থাকে। ফারিন হাত বাড়িয়ে মোবাইল নিয়ে ছবি তুলে রাখলো। একটা সেলফিও তুললো পাঁচজনের।

_____________

ঘড়ির কাঁটা তখন রাত একটার ঘরে। আহিয়ান আহসানকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাচ্ছে। ফারিন আনহা, অহনাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে অহনার পাশে বালিশ রাখে। আনহা অহনার গায়ে হাত রেখে পাশ ফিরে শুয়ে আছে। ফারিন ঝুঁকে মেয়েদেরকে চুমু খেলো। লাইট নিভিয়ে ডিম লাইট জ্বালিয়ে আহসানের পিছনে এসে শুয়ে পড়ে। আহসানকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলে,

“অনি বিচার দিয়েছে?”

“কিসের?”

ফারিন সব বললো। আহসান আহিয়ানকে সোজা করে ফারিনের দিকে ফিরে। “ভালো করেছো। দরকার আছে।”

“মাইন্ড করলো নাকি?”

“আরেহ না। মাইন্ড করেনি।”

ফারিন আহসানের বুকে মাথা রেখে আহসানকে জড়িয়ে ধরে। আহসান ফারিনের চুলে বিলি কেটে বলে,

“বাট ব্যাপারটা সুন্দর। ফ ফর ফাজিল। ফারিন একটা ফাজিল।”

“সাফওয়ান সিদ্দিক একটা রামপাঠা।”

“তুমি মিসেস টাফ ওয়ান।”

ফারিন ওকে ছেড়ে দিয়ে বালিশে মাথা রেখে আহসানকে বলে, “আরেকটু ওদিকে যাও। শুতে পারছি না আমি।”

আহসান একটু চেপে শুলো। “একটা বড় খাট কিনবো?”

“কিনো। সপ্তাহে, মাসে তো আসাই হয়। সমস্যা হয়ে যায়।”

“ওকে।”

আহসান ফারিনের দিকে ফিরলো। “আহু কিন্তু মারাত্মক দুষ্ট হয়েছে।”

“আমাদের সাথেই করে। আম্মা, জেঠিম্মু, ইনায়া, ইশা, আদৃত ভাই ওদের সাথেও কিন্তু করে না। শুধু তোমার আর আমার সাথেই করে।”

“বাপের মতো দুষ্ট হয়েছে।”

আহসানের বুকে আলতো করে চাপড় মেরে বলে,

“এতদিন পরে একটা পারফেক্ট কথা বলেছো।”

“আহুকে স্কুলে ভর্তি করাতে হবে।”

“হুম। এই জানুয়ারিতেই করাবো। অহি, আহিকে সামলে আবার আহিয়ানকে স্কুলে আনা নেওয়া করতে করতে আমি তো পাগল হয়ে যাবো।”

“আমি স্কুলে দিয়ে আসবো। তুমি শুধু নিয়ে আসবে। সময় পেলে আমিও নিয়ে আসতে পারবো। সমস্যা হবে না।”

“হুম। ইশার তো কলেজ শুরু হয়ে যাবে সামনের মাস থেকে। ছুটি শেষ ওর।”

“আদ্র কোথায় থাকবে?”

“আদৃত ভাই রাখবে বলেছে। আর ইশার আম্মু রোজ সকালে সকালে আসবে বলেছে। মেট্রো দিয়ে তো কাছেই।”

“থাকুক ওদের সাথে। ডেইলি এমন করে কিভাবে আসবে?”

“ইশার আব্বুরও শরীর ভালো না। নাহলে তো থাকতোই। মাঝেমাঝে জেঠিম্মু গিয়ে থাকবে। কিছু তো করার নেই।”

“তুমি অফার করোনি আদ্রকে রাখার?”

“আমি পারবো না আহসান। ওরা আরেকটু বড় হোক, অন্তত দুই, তিন বছর হলে আদ্রকে আমিই রাখবো। কিন্তু এখন কিছুতেই পারবো না। আমর পক্ষে যেটা সম্ভব নয়, সেটায় মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে কি হবে? আদ্রর মাত্র চার, পাঁচ মাস বয়স। অহি, আহির এক বছর। আহিয়ানের লাফানো, তিড়িং বিড়িং করা বেড়ে গিয়েছে। আদ্রকে মাঝেমধ্যে এক দুইদিন রাখতে পারবো, ইশার রোজ রোজ কলেজ টাইমে পারবো না। আনহা কিভাবে ওকে মারে সেটাও তো দেখেছো। আমি ঘরের কাজ করবো নাকি চারটাকে সামলাবো?”

“আচ্ছা বুঝেছি আমি।

ফারিন আহসানের বুকে মাথা রেখে আবারও ওকে জড়িয়ে ধরে। আহসান ফারিনের পিঠে হাত রেখে বলে,

“ফারিন ফ ফর ফাজিলের কি মন খারাপ?”

“আমি ভীষণ ক্লান্ত। ওদেরকে সামলাতে সামলাতে আর পারছি না। বিচ্ছু দুটো বড্ড জ্বালায়। আহিয়ান তো আছেই।”

“আহিয়ানের লেখাপড়ার দায়িত্ব আমি নেবো। তোমাকে এইদিকটা সামলাতে হবে না।”

“তোমাকে জ্বালিয়ে খাবে।”

“লেখা শেখালাম না আমি? জ্বালাবে না।”

“নতুন নতুন জিনিস পেয়েছে তাই আগ্রহ দেখিয়েছে। চেপে ধরলে আর মজা পাবে না।”

“চেপে ধরবো কেনো? মজা করেই পড়াবো।”

“দেখা যাবে। একটু মাথায় হাত বুলিয়ে দাও না?”

আহসান ফারিনের মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া শুরু করে। আহসানের এক হাত ফারিনের পিঠে, আরেক হাত ফারিনের চুলের ভাঁজে। আহসান ফারিনের মাথায় ঠোঁট ছোঁয়ায়।

“কি রে তোমাকে কি অনেকদিন পর জড়িয়ে ধরলাম নাকি?”

“তো? এখন সময় হয় নাকি তোমার আমাকে দেওয়ার জন্য?”

“তুমি না আমাকে পছন্দ করো না?”

“অপছন্দও তো করি না।”

“না আসলেই। অনেক শুকিয়ে গিয়েছো মনে হচ্ছে।”

“সারাদিন দৌঁড়ের উপর থাকলে শুকবো না? শুধু একদিন আমার দায়িত্বগুলো পালন করো। মনে হবে অফিস সামলানো অনেক সহজ।”

“ট্রু। ওরা আমাকে সন্ধ্যা থেকেই পাগল বানিয়ে ফেলে। তুমি তো সারাদিন রাখো।”

ফারিন চাপা শ্বাস ফেললো। আহসান মনে মনে পরিকল্পনা করে সবাই মিলে কোথাও থেকে ঘুরে আসবে। ফারিন একইভাবে বাচ্চাদের সামলাতে সামলাতে, ঘরের কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। একটু ঘোরাঘুরিও দরকার আছে। ফারিনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতেই আহসানের ইচ্ছে হলো ফারিনের সাথে একটু দুষ্টুমি করতে। আহসান ঠোঁট কামড়ে হেসে বলে, “এই সুন্দরী আমাদের একটু ভাবা উচিত।”

“কি ব্যাপারে?”

“সন্তানাদির ব্যাপারে।”

শোনামাত্রই ফারিনের কপাল কুঁচকে গেল। মুখ তুলে বলে, “মানে?”

“আহু এসেছে আমাদের ভাঙা সংসার জোড়া লাগাতে, অপ্রত্যাশিতভাবে। আহি, অহি এসেছে সুখের সংসারে ভুলে ভালে। আমাদের উচিত এখন একটা ওয়া ওয়া প্ল্যান করে নেওয়া। হ্যাপি ফ্যামিলি। প্ল্যান মতো একটা বাচ্চাও হলো না আমার। এই অফসোস কোথায় রাখি?”

ফারিন দাঁতে দাঁত চেপে আহসানের দিকে তাকায়। আহসান দুষ্ট হাসি দিয়ে বলে, “ভালো বলেছি না?”

“শেষ বয়সে আমার মুখ খুলিয়ো না, নিজেও গালি খেও না।”

“কথাটাকে সিরিয়াসলি নিচ্ছে না মেয়েটা।”

“তুমি আসলেই একটা নিম্নমানের লুইচ্চা।”

“তুমি তো বিয়ের এত বছর পরও উচ্চমানের হওয়ার সুযোগ দাও নি।”

“তোমাকে দিয়ে আসলেই কিছু হবে না।”

“তুমি বিয়ে করতে চাওনি। তোমাকে জোর করে বিয়ে করে নিজের মায়ায় ফেলে আমার তিন বাচ্চার মা বানিয়ে দিলাম, সংসার ভেঙেচুরে আগুন লাগিয়ে আবার আগুন নিভিয়ে সংসার জোরাও লাগালাম, আমার সংসারের তোমাকে পার্মানেন্ট সংসারী গৃহিণীও বানিয়ে দিলাম। এখন আমার বাচ্চা, আমার সংসারের পিছনে ছুটেই কোমরের হাড় ক্ষয় করছো। তাও বলছো আমাকে দিয়ে কিছু হবে না?”

ফারিন অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। আহসান নিজের ঠোঁট কামড়ে ফারিনের কোমরে জোরে চিমটি বসিয়ে দেয়। ফারিন কপাল কু্ঁচকে কোমরে হাত ঘষতে থাকে। আহসান ফের দুষ্ট হাসি দিয়ে বলে,

“কি গো ফৌজিয়া ফারিন? কেমন লাগে?”

“তোমার কথা শুনলে আমার প্রতিবার এত রাগ ওঠে! না পারি সইতে, না পারি কিছু বলতে।”

“তোমাকে সইতে বলেছে কে? চুপ থাকতেই বা বলেছে কে?”

“টানি? আনহা, অহনার মতো চুল টানি? সাদা, সাদা দুই একটা চুল দেখা যায় এখন। টেনে সাদা, কালো সব চুল উঠিয়ে ফেলি?”

আহসান ফারিনের কোমরে হাত রেখে হেঁচকা টান মারলো। ফারিন একটু থতমত হয়ে যায়। দুজনের মাঝে দুরত্ব চুল পরিমাণ। আহসান ফারিনের ঘাড়ের দিকের চুল খামচে ধরে মুখ এগিয়ে আনে। বলে,

“টানো। যা ইচ্ছে করো। কখনো নিষেধ করেছি?”

“আহির মতো মুখে খামচি মারি?”

“এখানে আহি, অহির কথাও আসবে না, বড় মিঞা আহুর কথাও আসবে না। কথা হবে শুধু আমাদের। মিস্টার এন্ড মিসেস সাফওয়ানের।”

আহসান পিঠে হাত রেখে ব্যঙ্গাত্বক স্বরে বলে, “ঢং। মজা করো না তো। বাচ্চাকাচ্চা আর না। আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি।”

“মজা করছি? আমি তো ভালাবাসা দেখাচ্ছি।”

দুজনেই দুজনের লাভ ল্যাঙ্গুয়েজ বোঝে। দুজনেই খোঁচাখোঁচি করেই শান্তি পায় যেন।

“বুড়া বেডার ঢং! তিন বাচ্চার বাপ হয়েও পিরিত উতলে উতলে পড়ছে না?”

“তিন বাচ্চার বাপ হলেও কি? বয়স কি আমার আহামরি?”

“না, আপনি কচি খোকা।”

আহসান ফারিনকে চুমু খেলো। ফারিন কপাল কুঁচকে ফেলে। আহসান ওর কুঁচকানো কপাল অবলোকন করে বলে,

“এত বিরক্ত কেনো?”

“ঠিকঠাক মতো কিস করতেও পারো না।”

আহসান চোখ বড় বড় করে ফেলে। “এমাহ! ফৌজিয়া ফারিন বলে কি?”

ফারিন মাথা নাড়িয়ে বলে, “ঠিকই বলেছি।”

“তো শিখিয়ে দাও কিভাবে চুমু খায়।”

ফারিন হাসলো। আহসানের ডান গালে হাত রেখে আহসানের চোখের দিকে তাকায়। আহসান নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে। ফারিনও আহসানের দিকে তাকিয়ে থাকে। চোখ নামিয়ে আহসানের পুরু ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে ফারিন ধীরে ঠোঁট নাড়িয়ে বলে,

“মিস্টার ইগোস্টিক রামপাঠা মে আই?”

ফারিনকে পেঁচিয়ে জড়িয়ে ধরে আহসান বলে,

“ইয়েস ফ ফর ফাজিল ইউ মে।”

ফারিন হেসে আহসানের চোয়াল ধরে মুখ ঘুরিয়ে দিলো। আহসানের গলা দৃশ্যমান হতেই গলায় কামড় বসিয়ে দেয়। আহসান ফারিনকে সরিয়ে দেয়।

“এরথেকে ভালো কিস করি আমি। অস্বাস্থ্যকর ভালোবাসা কামড়ের নাম করে কামড়াকামড়ি করি না।”

“অস্বাস্থ্যকর ভালাবাসা কামড় কি?”

“আনহেলদি লাভ বাইট।”

“ওহ ওহ। তোমাকে আমি পারমিশনের ব্যাপারটা শেখালাম। লাভ বাইট শেখায়নি।”

“সাত বছরের পুরাইন্না বউ থেকে এত পারমিশন নিতে পারবো না।”

“গালে হাত তো রাখতে পারো?”

“রাখি না?”

“এ্যাঁ রাখে! শুরুর দিকে ভদ্র ছিলে, তারপর তোমার লুচ্চামো দেখে ভদ্রতা জানালা দিয়ে লুঙ্গি তুলে দৌড় দিয়েছে।”

“আসো না আবার প্ল্যান করি?”

ফারিন আহসানের বুকে থাবা বসিয়ে দিল। আহসান বলে,

“আরেহ বাচ্চার প্ল্যানিং করতে বলিনি। ট্যুরের প্ল্যানিং করতে বলেছি। মানে মহিলাটার মাথায় ডিস্টার্ব আছে। তোমার এই বাঘের থাবা খেতে খেতেই আমার পরাণ একদিন বেরিয়ে যাবে। এমনে না মরলেও ওমনে ঠিকই মরবো। আমার মরণের বেশি দেরী নেই।”

আহসানের ঠোঁটে আলতো করে চাপড় মেরে বলে,

“বাদ দাও, বাদ দাও। তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না। তোমার কথাবার্তা শুনলেই আমার রাগ উঠে। তুমি বরং চুপই থাকো রামছাগল।”

আহসান হাসলো। মুখ খোলার আগেই ফারিন ফুঁসে ওঠে বলে,

“বুইড়া হচ্ছে কিন্তু বিচার বুদ্ধি এখনও হয়নি। তিন তিনটে ছেলে মেয়ে আছে, তাও প্রতিদিন তাকে মরার বুলি আওড়ানো লাগবে। আমার কথা তো ভাবতে বলিনি, ছেলেমেয়ের কথা ভেবে মুখে লাগাম টানতে বলেছিলাম তাও পারে না। গর্দভ একটা, ছাগল একটা। মাথাটাই আছে কিন্তু মাথায় বুদ্ধি নেই।”

আহসান ফের হাসলো। ফারিন আঙুল তাক করে বলে,

“এত পড়াশোনা করে লাভ কি হলো যদি মাথায় বুদ্ধিই না থাকে, কথা মনে না থাকে? তোমার থেকে তো আমি ঢের ভালো। কোনোরকমে ঠেলেঠুলে অর্নাস পাশ করলেও আমার সাংসারিক বুদ্ধি আছে। তোমার মতো মেন্দামার্কা হইনি।”

আহসান ফারিনের হাতের ভাঁজে হাত ঢুকালো।

“চুপ। এত রাগতে হবে না।”

“তুমি রেগে যাওয়ার মতো কথা বলছো কেনো?”

“আর বলবো না।”

ফারিন মুখ ঘুরিয়ে নেয়। আহসান ওর মুখ নিজের দিকে ফিরিয়ে কপালে কপাল ঠেকিয়ে গাঢ় শ্বাস ফেলতে ফেলতে বলে,

“ফৌজিয়া ফারিন?”

“বাদ দাও, বাদও দাও। কথা বলো না তুমি। আমাকে রাগানো ছাড়া তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না।”

“আমাকে দিয়ে সত্যিই কিছু হবে না?”

ফারিন আহসানের গলা জড়িয়ে ধরলো। মাথা নাড়িয়ে বলে, “না। তোমাকে দিয়ে কিছুই হবে না।”

“সত্যি? মন থেকেও তো কিছু বলতে পারো। সবসময় মনের ভিতর ঢুকে কথা বুঝে নেওয়ার মতো এনার্জি থাকে না।”

“আজও নেই?”

“উহু। ভীষন টায়ার্ড।”

“সংসার বিদ্বেষী ফৌজিয়া ফারিনকে সংসারের লাল, নীল, কালো সব রং দেখিয়ে ফেলা ছাড়া তোমাকে দিয়ে কিছুই হয়নি। মাঝেমাঝে দুই একটা ধমক দিয়ে ফেলে একশোবার সরি বলে ছেলের রাগ ভাঙিয়ে আহিয়ানের সব দুষ্টমি মুখ বুজে সহ্য করা ছাড়া তোমাকে দিয়ে কিছুই হয়নি। নিজের কাজ ঠিকঠাকভাবে সামলে, আহিয়ানকে ওর পর্যাপ্ত সময় দিয়ে আনহা, অহনাকেও সময় দিয়ে বেস্ট বাবা হওয়া ছাড়া তোমাকে দিয়ে কিছুই হবে না। সারা সকাল অফিস করে, সন্ধ্যা থেকে বাচ্চাদের সামলে আমাকে একটু রেস্ট নেওয়ার, ঘুমানোর, সংসারের অন্যান্য কাজ করার জন্য সময় করে দেওয়া ছাড়া তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না। বাচ্চারা ঘুমিয়ে পড়লে আমার হাতে ভাত খেতে খেতে অফিসের কাজ করা ছাড়া তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না। সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ ইগোস্টিক রামপাঠা।”

“মাই প্লেজার।”

“দিন শেষে আমাকে, আহুকে, অহিকে, আহিকে ভালোবাসা ছাড়া কিছু হবে না। আমাদের মাথার উপরের ছাতা হওয়া ছাড়া তোমার দ্বারা আর কিছুই হবে না। আমাদের প্রিয় হওয়া ছাড়া তোমার দিয়ে আর কিছুই হবে না।

“স্বীকার করলে অবশেষে?”

“মিথ্যে বলি না। প্রতিবারই একটু ঘুরিয়ে বলি, কিন্তু তুমি আজ বেশি ক্লান্ত দেখে সরাসরি বললাম। যত যাই হোক আমার মেন্টালিটি সেকালের মেন্টালিটি, স্বামীকে বেশি কষ্টে থাকতে দেখতে পারি না আবার সামনে এলে সহ্যও করতে পারিনা।”

“সত্যিই তো?”

“বেশি ভেবে ফেলো না আবার। তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না।”

আহসান মাথা ঘুরিয়ে, ছেলে-মেয়েদের দিকে তাকালো। ফের ফারিনের কপালে কপাল ঠেকিয়ে বলে, “সেটাই। নির্বোধ আহসানের জীবনে থাকা ফারিন, ফাইয়াজ, ফিজা, ফিহা নামক ফ ফর ফাজিলগুলোকে মন প্রাণ দিয়ে ভালাবাসা ছাড়া বুদ্ধু আহসানের দ্বারা কিছুই হবে না।”

ফারিন আহসানের গালে হাত রাখলো। “সত্যিই একটা ভাঙাচুরা সংসারের দুটো ত্রুটিপূর্ণ মানুষের দুই থেকে পাঁচ হওয়ার গল্পটাকে স্বয়ংসম্পূর্ণ বানানো ছাড়া তোমাকে দিয়ে এরচেয়ে বেশি কিছুই হবে না।”

আহসান ঠোঁট কামড়ে হাসে। “সুন্দরী ম্যাডাম আমার জীবনের স্পেশাল ম্যাজিক্যাল লাইনটা যদি একটু বলতেন?”

ফারিন উচ্চশব্দে হেসে ওঠে। আহসানের গলা জড়িয়ে ধরে বলে,

“বাদ দাও, বাদ দাও। তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না।”

………..………..সমাপ্ত…………………..

~১২/০৩/২০২৬ টু ২৩/০৪/২০২৬~

অবশেষে শেষ। পুরো ঘেঁটে ঘ করে দিলাম। ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। উংগা বুংগা একটা গল্প পড়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here