#আমার_বোবাফুল(৩৩)
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরা
ডঃ মেহরাব তীক্ষ্ণ খেয়ালে তাকাতেই বর্ণ’র চক্ষু হাসলো যেনো।দুচোখের কার্নিশ হালকা কুঁচকে আসে।তাতে খেলা করে দুষ্টুমি মিশ্রিত গাম্ভীর্যতা।আলগোছে হাত বাড়িয়ে দিয়ে পরিচয় দেয়ার মতো করে বললো ভ্রু উঁচিয়ে,
“ আসফিয়ান বর্ণ!”
মেহরাব হাতটার দিকে চেয়ে সৌজন্য হাসে। হ্যান্ডশেক করে বলে,
“ রকস্টার!”
কাঁধ ঝাঁকায় বর্ণ। দৃষ্টি চঞ্চল পঙ্খির মতো ডানে বাঁয়ে ঘুরে।হাত গুটিয়ে মেহরাব বুকে ভাঁজ করে ছোট ছোট চোখে বললো দ্বন্দ্ব মিশ্রিত গলায়,
“ ম্যা-বি গানের জগতের বাহিরে গিয়ে আপনাকে অন্য ভাবে চিনি –আই মিন দেখেছি!”
“ কিন্তু আমার তরফ থেকে আমাদের সাক্ষাত এই প্রথম।ইতোপূর্বে আপনাকে কখনো দেখেছি মনে হয়না।
জিভে চুক চুক শব্দ তুলে বলে,“স্যরি!”
সময় ব্যয় না করে মুখের উপর নাকচ করে দিয়ে মৃদু হাসলো বর্ণ।তার কন্ঠে কোন ইতস্তত বা সংকোচ ছিল না। অবশ্য থাকার কথাও নয়। এভাবে মুখ চালাতে সে বরাবরই পটু। ডঃ মেহরাব কিঞ্চিৎ অপমানিত বোধ করলেও তা প্রকাশ না করে অপ্রস্তুত হাসলো।ঘাড় ঈষৎ ঝুঁকিয়ে তর্জনীতে কপাল চুলকে বলে,
“ হতে পারে আমার দেখার ভুল। আপনার বোন নাকি?”
তার শেষের ইঙ্গিত ছিল সুখের দিকে।এক মূহুর্তের জন্য বর্ণ থমকাল।ফুল তার বোন? অনেকটা তেমনই, তবে ভেতর থেকে কেউ একজন বিরোধ করে উঠলো যেনো। অযথাই শীতল মেজাজ বিগড়ে যেতে ধরে।বোবফুল কোন সুখে তার বোন হতে যাবে?
.
তামিজ শিকদার অল্পকিছু আহার করলেও রুবাইয়্যাত মুখে কোন কিছু তুলতে নারাজ। তিনি মেয়েকে ছাড়া কিছুতেই মুখে খাবার তুলবেন না।গলা দিয়ে খাবার নামবে না যে!আযাদ শিকদারকে মান্য করেন সকলে।পরবর্তীতে তিনি বুঝিয়ে শুনিয়ে বলতে – গুনে গুনে পাঁচ লোকমা ভাত খেলেন।আযাদ শিকদারের ফ্ল্যাটে রান্না করেছিলেন সাইমা বুয়া আর তুহফা মিলে।ফ্রিজে গরুর মাংস রাখা ছিল।
বৈঠকে বসেছিলেন দুভাই।মেয়ের এই অবস্থার জন্য যে বা যারা দায়ী তাদের উপযুক্ত শাস্তি না দেওয়া পর্যন্ত তামিজ শিকদার ক্ষান্ত হবেন না।তবে এসবের আগে সুখকে সুস্থ হওয়া চাই!
.
স্ট্রেয়ারিং-য়ে হাত চালানোর ফাঁকে ফাঁকে আড়চোখে বর্ণকে অবলোকন করছে মাহির।চোখ বুজে বর্ণ সিটে মাথা এলিয়ে রেখেছে।মুখে এখন মাস্ক-টাস্ক নেই।ডান হাতের মুঠোয় প্রেসিং বলে চাপ প্রয়োগ করছে নিজ ধ্যানে। মস্তিষ্কে কী খেল চলছে মাহির ধরতে পারছে না।তবে, কিছু একটা যে চলছে তা নিশ্চিত।জানতে চাইলো অল্প আওয়াজে,
“ বস.. আপনাকে কেমন অন্য-রকম দেখাচ্ছে। কোন বিষয়ে চিন্তিত?”
বর্ণ খানিক ঘাড় বাঁকিয়ে এক চোখ খুললো প্রথমে। সূচালো চোখে তাকিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলো ভ্রু নাচিয়ে,
“ তোর এমন মনে হচ্ছে?”
আলবাৎ মনে হচ্ছে!অবোধ শিশুর মতো মাথা ঝাঁকায় মাহির।বর্ণ সোজা হয়ে বসলো। প্রলম্বিত এক শ্বাস ছেড়ে চুলে হাত গলিয়ে এলোমেলো করে ঠোঁটে ঠোঁট গুঁজে হঠাৎ মাহিরের দিকে ফিরলো। বর্ণ’র মনে কী চলে সব কিছু মাহিরকে কিংবা যে কাউকে বলার প্রয়োজন বোধ মনে না করলেও –কিছু কিছু বিষয়ে নির্বিকারে বলে দেয় স্বেচ্ছায়।এবারেও বোধকরি ব্যাতিক্রম হলো না।মাহির সামনে ধ্যান রেখে ক্ষণে ক্ষণে তার মতিগতি ধরার চেষ্টা করছে।বুকের বাঁ পাশে ডান হাতের তর্জনী ঠেকালো বর্ণ। বক্ষস্থলে গোল গোল করে ঘুরিয়ে বললো,
“ শহর ছাড়তে ইচ্ছে করছে না। এখানে কেমন অস্থির লাগে।মনে হচ্ছে কী যেনো হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ!,এর কী কারণ হতে পারে জানিস?এ_এমন সব অনুভূতি হয়না তো বহুদিন!”
মাহির অনেক্ষণ তার কথাগুলোর মর্মার্থ আয়ত্ত করার লক্ষ্যে চুপ করে রয়। অতঃপর বুঝতে পারে ‘শহরে সুখকে রেখে ফিরতে অস্থির লাগছে বর্ণ’র’! চকচক করে উঠলো মাহিরের চোখ।বললো,
“ বোনকে মুমূর্ষু অবস্থায় রেখে যে-কোনো ভাইয়েরই দূরে যেতে কষ্ট হবে। টেনশন নেবেন না সস..
“ সি ইজ নট মাই সিস্টার!”
দাঁতে দাঁত নিষ্পেষিত করে বর্ণ হিসহিসিয়ে উঠলো।মাহিরকে এমন চোখে দেখলো -যেনো এখুনি টুটি চেপে ধরবে।সে ভড়কায়। জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করে ডোরের সাথে সেঁটে গিয়ে মিনমিন করে বললো,
“ তাহলে কী স্যার!”
“ কাজিন!”
“ ও তো একই হলো!”
“ এক নয়!শুনিসনি,বললাম না মাত্র!”
মাহির বিস্মিত দৃষ্টিতে মাথা ঝাঁকিয়ে “হ্যাঁ” বুঝিয়ে স্ট্রেয়ারিং-য়ে চোখ রাখে। কেটে যায় অল্পক্ষণ।বোধ সংকটে পড়ে মাহির।তুহফাকে বোন ডাকতে দ্বিধা না হলে সুখের বেলায় অন্য নিয়ম কেনো? দু’জনেই তো কাজিন-ই!তুহফাকে ইঙ্গিত করে বহুবার বোন সম্বোধন করে কথা বলেছে সে –তখন তো বর্ণ এমন রিয়াক্ট করেনি।
“ ইউ্যু নৌ?ও রোজ আমার স্বপ্নে আসে!”
বর্ণ’ অন্যমনস্ক। চোখের তারা জ্বলজ্বল করছে অদৃশ্য এক অনুভবে।ঠোঁটে অবচেতন মনা হাসি লেপ্টে আছে।মনে হলো সিটে হেলান দিয়ে দুনিয়া থেকে ভিনগ্রহে পাড়ি দিয়েছে কীসব এলোমেলো ভাবনা সমেত। অস্ফুট স্বরে কথাটি বললেও মাহিরের কানে সূচের মতো গিয়ে বিধঁলো। তখনি ধড়পড়িয়ে তাকালো পাশে। চোখের পলক না ফেলে সন্দিহান গলায় জানতে চাইলো,
“ সে স্বপ্নে দেখা দিলে আপনার ভালো লাগে?”
“ আগে খুব রাগ হতো,আজকাল হয়না!ভালোই লাগে!”
মাহির বুকে হাত চাপে নিজের।তার বুক কেনো ধকধক করে? হার্ট অ্যাটাক আসবে নাকি? ফ্যালফ্যাল করে সে বর্ণ’র দিকে চাইলো।এই প্রথম নারী বিষয়ক অনুভূতি কথন হচ্ছে তাদের।এর আগে বর্ণকে কোন মেয়ের ভাবনায় আনমনা হয়ে দেখেনি।তার অন্তত মনে পড়ে না।
“ ওর কথা মনে হলে হৃদয় কাঁপে?”
“ একটু আধটু কাঁপে হয়তো!”
বর্ণ বোধহয় নিজের খেয়ালে নেই অথবা আছে। আঙ্গুলে ঠোঁটে ছুঁয়ে চোখ বুজে আছে।মাহিরের মন বলছে –বস নির্ঘাত এখন সুখকে কল্পনা করছে।দুয়ে দুয়ে চার মেলাতে ব্যস্ত হয় মাহির। পুণরায় জানতে চাইলো,
“ বস..বস.. ওর দিকে ঘন্টার পর ঘন্টা তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে?দূরে থাকলে ভেতরে অস্থির অস্থির লাগে,মনে হয় কিছু একটা নেই?”
বর্ণ “হুঁ” এর মতো কিছু একটা বললো মনে হয়। মাহির স্পষ্ট শুনতে পায়নি।তার মনে নেচেকুদে উঠে অবিলম্বে। ঠোঁটে প্রশস্ত হাসি টেনে বর্ণ’র অপছন্দনীয় কথা খানা বলে বসলো ফুরফুরে সুরে,
“ বস আপনি প্রেমে পড়েছেন!”
“ যেভাবে তুই তুহফার উপর পড়েছিস?”
প্রজ্বল্লিত মোমে পানি পড়লে যেমন কালবিলম্ব না করে আগুন নিভে যায় ধপ করে, তেমনি মাহিরের ঠোঁট থেকে হাসি বিলুপ্ত হয়ে গেলো তৎক্ষণাৎ। স্ট্রেয়ারিং চালাতে ভুলে বসলো প্রায়। হতবুদ্ধি হয়ে তাকিয়ে রইলো স্তব্ধ মুখাবয়বে।বর্ণ চোখ বুজেই হুঁশিয়ারি দেয়,
“ সামনে তাকা। এ্যা/ক্সি/ডেন্টে আমার কিছু হলে মাটির তলায় জ্যান্ত পুঁতে রেখে দেবো তোকে!”
.
পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা নেমে যায়।বাড়িতে পা রাখতেই ছুটে আসে নূরা।বর্ণ হাতের মুঠোয় তার ছোট হাত আঁকড়ে সামনে এগিয়ে যায়।নূরা হাস্য হীন মুখে কাতর গলায় বারবার করে বলছে,
“ সুখকে দেখতে যাবো। এরপর আবার যখন যাবে তখন আমায় নিয়ে যাবে তো বর্ণ?”
হানিফা বেগম ড্রয়িং রুমে ছিলেন সেসময়।বর্ণ পাশ কাটিয়েই যাচ্ছিল, তিনি থামিয়ে দিলেন একবাক্যে,
“ মাইয়াটার কী অবস্থা এখন দাদুভাই?”
আইজা বেরিয়ে এলেন উদ্ভ্রান্তের মতো।ছেলে মেয়ে শূণ্য বাড়িটা কেমন প্রাণহীন হয়ে আছে গত কয়েকদিন ধরে।কেউ হাসে না খিলখিলিয়ে,কেউ খুনসুটি করে না।রোজ ভিডিও কলে ওপাশের অবস্থা দেখতে ভুল না হলেও –সুখকে দেখতে পেয়েছেন মাত্র একবার।তাও অল্পক্ষণের জন্য।বর্ণ ফিরবে তা মাহির অবগত করে দিয়েছিল।হানিফা বেগমের প্রশ্নে বুঝতে পারলেন তিনি সহ সকলে বর্ণ’র অপেক্ষায় বসেছিল। যদিও সকলে বলতে বর্তমানে –হানিফা বেগম,নূরা এবং আইজা-ই আছেন।
হানিফা বেগমের “ মাইয়াটার কী অবস্থা” প্রশ্নটার উত্তর একদিন আগে অবশ্য তামিজ শিকদার দিয়ে দিয়েছিলেন,
“ শুনে কী করবেন আম্মা? মৃত্যুর সাথে লড়ছে আমার মেয়েটা! আপনি তো ওকে কখনো মেনে নেননি নাতনি হিসেবে। খুশি হোন এবার!”
ফোনের এপাশে থম মেরে বসেছিলেন বৃদ্ধা।খানিক পর ধরা আসা গলায় জবাব দিয়েছিলেন,
“ ওরে আমি কোনদিন আদর দেইনাই তা ঠিক। কিন্তু ওর সাথে এমন কিছু হোউক এটাও চাই নাই বাপ!ওর এখন কী অবস্থা তুই একবার নিজের মুখে আমারে ক না?বড় বউমা কয় ও নাকি ঘুমাইয়া আছে? কখন উঠবে কেউ জানে না?”
হানিফা বেগম এবং আইজার যা যা প্রশ্ন কিংবা উৎকণ্ঠা, তার উত্তর দিয়েছে মাহির।আইজার সাথে দুয়েকবাক্যে কথা শেষ করেই বর্ণ নিজের কক্ষে চলে গিয়েছে তখন।
.
আমিন সরদার।তামিজ শিকদারের মতোই একজন বিজনেসম্যান।লস খেয়ে বিজনেস প্রায় লাটে উঠার পথে। এবারের সাড়ে তিন কোটি টাকার ডিল হাতছাড়া হয়ে গেলে পথে বসা থেকে কেউ আটকাতে পারবে না। কিন্তু এই পথে বাঁধা ছিলেন শিকদাররা।ডিল পাওয়ার সম্ভাবনা তাদের বেশি রয়েছে।তাই ফোনকলে নিয়ম করে হুমকি দিতেন তামিজ শিকদারকে –ডিল ছেড়ে না দিলে যেকোনো একদিক দিয়ে যেকারো ক্ষতি করে দেবে।
রাত নয়টা। শহরে ধূসর কালো আঁধারের হাতছানি।রোডে ছোট বড় যানবাহনের চলাচল লেগেই আছে।আমিন সরদার বাড়ি ফিরছিলেন পায়ে হেঁটে।কাছেই উনার তিন তলা বাড়িটি। স্ত্রী এবং চার সন্তান নিয়ে সেখানেই তার বসবাস।
হঠাৎ একটা গাড়ি এসে থামলো।আমিন চলা থমকে দিয়ে তাকাতেই চোখের পলকে তাকে কোন একটা দানবীয় হাত হিঁচড়ে তুলে নিয়ে সাঁই সাঁই করে চলে বাকি গাড়িদের সাথে মিলি মিশে গিয়ে একসময় কোথাও ফারার হয়ে গেলো।
#চলবে 🍂
[কে কাকে তুলে নিয়ে গেলো আবার?
ভুল ক্রুটি ক্ষমা দৃষ্টিতে দেখবেন। সাইলেন্ট রিডার্সদের একটু রেসপন্স করার অনুরোধ!!]

