#আমার_বোবাফুল(২৩)
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরা
থকথকে মেঝেতে ছিটকে পড়েছিল সুখ।তড়িঘড়ি করে উঠে বাহিরে ছুটে আসে।গায়ের ওড়নাটি পড়ে রইলো মেঝেতে।
গ্রাউন্ড ফ্লোরে লাগাতার সাইরেন বাজছে।সকলে তেড়ে এসে জড়ো হলো একজায়গায়।রুবাইয়্যাত দ্রুত কদমে ছুটে চলে সিঁড়ি বেয়ে।আইজা, মাহির এবং আযাদ শিকদারও চললেন। ভদ্রলোক শুয়েছিলেন।চোখও বুজে এসেছিল প্রায়। কিন্তু সাইরেনের তীব্র গর্জনে ঘুম উবে গেছে।
চোখে মুখে আতঙ্ক। রুবাইয়্যাত মুসিবতের দোয়া পাঠ করে সর্বস্ব দিয়ে পা চালাচ্ছেন।হানিফা বেগম সিঁড়ি চড়তে পারেন না। সিঁড়ির নিকটে দাঁড়িয়েই হাঁকডাক করছেন।
সাইমা,রামসা প্রথমে আতিফ,আসলামের কাছে ছুটে গেলো পরপর তাদের নিয়ে দৌড়ে গেলো উপরে।
এটা ফিফ্থ ফ্লোর থেকে কেউ বাজাচ্ছে।ছেলে মেয়েরা যেহেতু থাকার জন্য শেষ ফ্লোরই বেছে নিয়েছে; আযাদ শিকদার এই সাইরেন সিস্টেম স্থাপন করেছেন।কোন বিপদ হলে যেনো তারা নিচে সংকেত দিতে পারে।
এমন সাইরেন শেষ কবে বেজেছিল সময়টা ঠিক মনে নেই। সেদিন আগুন লেগেছিল তুহফার কক্ষে।আরো দুটো কক্ষ ছেয়ে গিয়েছিল সেই ধ্বংসাত্মক স্ফুলিঙ্গ। ভাগ্যিস তুহফা সময় মতো রুম ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিল সেদিন।নয়তো…
আজ নিশ্চয়ই তেমন কোন কিছু হয়েছে? রুবাইয়্যাত বিড়বিড় করে রবের কাছে চাইছেন তার ছেলে মেয়েগুলো যেনো সুস্থ থাকে।
দোয়া হয়তো কবুল হয়েছে।সুখ ফিফ্থ ফ্লোরের সিঁড়ির গোড়াতেই বিবর্ণ মুখে দাঁড়িয়ে।কপালে রক্ত ঝরছে। রুবাইয়্যাত বিচলিত হয়ে মেয়ের মুখে হাত বুলিয়ে দিয়ে উদ্বিগ্ন হলেন,
“ কী হয়েছে আম্মা,কপাল ফেটেছে কীভাবে..?
রুবাইয়্যাত এদিক ওদিক চোখ বুলালেন। আগুনের চিহ্নটুকুও দেখা যাচ্ছে না।তবে?
“ তুহফা কোথায়?ওর কিছু হয়েছে কী?”
আইজা,আযাদ শিকদার ও পাশে এসে অস্থির গলায় জানতে চাইছেন,
‘আসলে কী ঘটেছে’।
সুখ খেই হারিয়ে ফেলে। শরীর কাঁপছে থরথর।চোখ ভিজে গেছে অশ্রুতে।
“ আঃ আঃ ”
মৃদু অস্ফুট স্বরে অক্ষরটি আওড়ে বর্ণ’র রুমের দিক অস্থির ইশারায় কিছু বলতে যেয়েও গুলিয়ে ফেলছে।অপারগ হয়ে আযাদ শিকদারের হাত ধরে দ্রুত কদমে হেঁটে গেলো সেদিক। পিছু ছুটলো বাকিরাও।
ভেতরে প্রবেশ করেই চোখের সামনে অপ্রিয় এবং অপ্রত্যাশিত একটি দৃশ্য দেখে আইজা আতকে চিৎকার দিয়ে উঠল। দিগ্বিদিক ভুলে ছুটে গেলেন সামনে।
বর্ণ’র মুখশ্রীতে অদ্ভুত হিংস্রতা।চোখের দৃষ্টিতে স্ফুলিঙ্গ। বাঁ হাতে অভ্র’র গলা চেপে দেয়ালে মিশিয়ে রেখে একদৃষ্টে তার চোখের দিকে চেয়ে আছে।যেনো তার অসহায়ত্ব, বাঁচার জন্য আকুতি দেখে চোখের তৃষ্ণা মিটাচ্ছিল।চোখ উল্টে গেছে অভ্রর।জিভ বেরিয়ে এসেছে।আইজা বর্ণ’র হাত ছাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে ক্রন্দনরত গলায় চেঁচিয়ে উঠলো,
“ কী করছো তুমি বর্ণ?ছেড়ে দাও.. আমার ছেলেটা মরে যাবে! ”
মূহুর্তেই কক্ষে আহাজারিপূর্ণ হয়ে উঠলো।গা ছমছমে পরিবেশ।মাহির থম মেরেছিল কিছুপল। ছুটে যাওয়ার মাঝেই বর্ণ ঝাটকা মেরে আইজার হাত ছাড়িয়ে নেয়।
“ আমার কাজে বাঁধা…
পিছু ফিরে হাত মুঠ পাকিয়ে তুলল বর্ণ’।থেমে গেলো সম্মুখের থমকে যাওয়া নারী মূর্তি দেখে।আইজা থম মেরে মূর্তির ন্যায় চেয়ে। স্থির চোখে বর্ণ’র কাঁধ বরাবর উঠে আসা মুঠো পাকানো হাতের দিকে তাকিয়ে ।অনূভুতি শূন্য চোখের গহীনে অবিশ্বাস্য।বর্ণ তাকে আঘাত করার নিমিত্তে হাত উঠিয়েছে? এখন মাকেও..
মাহির দুহাতে বর্ণ’র পেছন থেকে পেট ঝাপ্টে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়।
“ ভাই রিল্যাক্স!উনি আন্টি.. আপনার মা!এরা আপনার প্রিয়জন। আপনি সবাইকে খুব ভালোবাসেন।না?”
বন্দিত্ব হতে ছাড়া পেয়ে ফ্লোরে বসে পড়ে অভ্র।গলা ধরে কাশছে শব্দ তুলে। জোরে জোরে এতোক্ষণের আটকে থাকা নিঃশ্বাস ছাড়ছে হা করে।রুবাইয়্যাত পাশে হাঁটু ফেলে বসে বুকে জড়িয়ে নিলো তাকে।সুখ পানি এনে দেয়।
আযাদ শিকদার স্তব্ধ দাঁড়িয়ে আছেন। এখানে তার কী করণীয় মাথা কাজ করছে না। এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে দুঃস্বপ্নেও তিনি ভাবতে পারেননি।
কক্ষের বাহিরে রামসা,আতিফ আসলাম এবং সাইমা বুয়া এসে থামলো। ভেতরে পারিবারের সদস্যদের মধ্যে কিছু হয়েছে। অনুমতি ছাড়া ঢোকা বারণ।তবে মূল বিষয়টি জানার উৎকণ্ঠা তাদেরও।
বর্ণ’র উগ্রভাব কমে এলো ধীরে ধীরে। একসময় মুখশ্রীতে কঠোরতা জমানো হিংস্র ভাব অদৃশ্যে মিলিয়ে যায়।আইজা ধফ করে ফ্লোরে বসে পড়েছেন ততোক্ষণে। দৃষ্টি শূণ্য। ফ্লোরে কাঁচের ভাঁজ ভাঙার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র টুকরো পড়ে আছে।অভ্র নিজেকে বাঁচাতে হাত ছুড়াছুড়ি করার সময় পাশ থেকে ছিটকে পড়েছিল। ফ্লোরে হাত ঠেস দেওয়ায় কাঁচের টুকরো বিঁধে গেছে আইজার হাতে।বর্ণ ঢোক গিলে একবার ঘাড় নামিয়ে অভ্রকে দেখে নিয়ে পরপর তাকালো আইজার দিকে। শান্ত হয়ে আসতেই মাহির ছেড়ে দেয় তাকে।
“ এটা কী করে ফেললেন ভাই?”
বর্ণ নিজেও স্তব্ধ।নিজের চুলে একবার হাত বুলিয়ে আহত চোখে একবার মাহিরের দিকে চেয়ে আইজার সামনে বসে পড়লো হঠাৎ। অদ্ভুত করুন গলায় ডাকলো,
“ আ..আম্মু!”
আঁচলে মুখ চেপে তিনি মুখ ঘুরিয়ে নিলেন অন্যত্র।
বর্ণ ক্ষণকাল স্থির থেকে হঠাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে সুখের নেতানো মুখশ্রীতে নজর রাখলো সেকেন্ডের জন্য।কপালের কোণ ছুঁয়ে রক্তের রেখা কানের লতি পর্যন্ত এসেছে। তখন অভ্র’র গলা থেকে হাত ছাড়িয়ে নিতে চাইলে ঝাঁটকা মেরেছিল সে।ফলে সুখ ছিটকে পড়ে ড্রেসিং টেবিলের কোণায়, সেখান থেকে ফ্লোরে।
বর্ণ উদ্ভ্রান্তের মতো বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে চুল খামচে ধরে উদ্দেশ্যহীন এদিক ওদিক নজর ছিটালো।একসময় দুহাতে সামনে এনে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগে।
“হাউ ডিড আই ডু দিস ?”
বিড়বিড় করে চোখ বুজে লম্বা শ্বাস ছেড়ে ডান হাতটা মুঠো করে হঠাৎ দেওয়ালে ঘুষি বসালো সজোরে।বাড়ির শক্ত ইমারতের ভিত্তিগুলোও যেনো এক মূহুর্তের জন্য কেঁপে উঠলো এই আঘাতে।এই হাত আজ মায়ের উপর উঠতে যাচ্ছিল।এই হাত…
পরপর আরো দু তিনটে ঘুষি মারল। রক্ত না আসা পর্যন্ত মনের খোয়াইশ মিটছিলো না।বাইকে চড়ে বসে সর্বোচ্চ স্পিড বাড়িয়ে বেরিয়ে গেলো সে। গন্তব্যের নাম জানা নেই।
→
মাহির কী করবে না করবে বুঝে উঠতে পারে না। পরিস্থিতি মনে হলো হাতের বাহিরে।আজ সব জানাতে হবে আন্টিকে।নয়তো বর্ণকে ভুল বুঝবে সবাই।ঘৃণাও করতে পারে।
বর্ণ’র পিছু যেতে গিয়েও পুণরায় ফিরে এলো সে।আইজা কাঁদছে নিঃশব্দে।চোখের জলগুলো ঝড়ে পড়ে অবাধে।সুখ উনার পাশে বসে শান্ত হতে কাঁধ ছুঁয়ে দিচ্ছে আলতো। সিঁড়ি চড়ার ধুপধাপ আওয়াজ কর্ণকোহর হতেই তুহফা নেমে এসেছিল ছাদ থেকে।সেও নিরবে এদিক ওদিক পরখ করছে সকলকে।অভ্রকে উঠে দাঁড় করিয়েছে আযাদ সাহেব।হেলে পড়তে চাইছে ছেলেটা। গলায় দানবীয় আঙুলের রক্তিম কালো রেখা।
মাহির মাথা নিচু করে একবার অভ্রকে অবলোকন করে অশ্রুগলিত চোখে পাথরের ন্যায় বসে থাকা আইজা এবং আযাদ শিকদারের উদ্দেশ্যে বললো,
“ আমি কিছু জানাতে চাই আপনাদের?”
ড্রয়িং রুমে অভ্রকে ও বসতে বললো মাহির। সত্যিটা তারও জানা প্রয়োজন।নয়তো আজকের পর ভয়ে হয়তোবা বর্ণ’র কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখবে সে।
সুখ এসে রুবাইয়্যাতের সোফায় পিছু গিয়ে দাঁড়ালো।তুহফা কপালে অনেয়মেন্ট লাগিয়ে দিতে চেয়েছিলো কিন্তু সে আগে মাহিরের কথা শুনতে চায়। বর্ণ’কে নিয়ে জানতে চায় -যা সে অজ্ঞাত।মাহিরের মুখনিঃসৃত বাক্যে ড্রয়িং রুমে যেনো বাজ পড়লো।
“ স্যারের পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার আছে! অন্যভাবে যাকে বলা যায় সাইকোপ্যাথ!”
আইজা চমকে উঠলেন অবিশ্বাস্য মুখাবয়বে। অস্ফুট স্বরে বললেন,
“ কী বললে তুমি?”
মাহির দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। বর্ণ’র নিষেধ আছে এসব ছোটোখাটো ব্যাপার পরিবারকে জানাতে।আজ তার মনে হলো বিষয়টি মুটেও ছোটোখাটো না।
সে বললো নিচু স্বরে,
“ যেমন –সহানুভূতির অভাব, অনুশোচনাবোধ নেই বললেই চলে এবং অ্যাগ্রেসিভ বিহেভিয়ার।অন্যদের অনুভূতি বুঝতে বা তাদের কষ্ট সহজে অনুভব করতে পারে না।তবে প্রিয়জনের ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।”
“ তুমি বলতে চাইছো আমার ছেলে হৃদয়হীন,পাষণ্ড?অ্যান্টিসোশ্যাল পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার মানে অসামাজিক ব্যাধিতে আক্রান্ত?”
আযাদ শিকদার হুমকি মিশ্রিত কঠোর গলায় বলে উঠলেন।আইজার চোখের অশ্রু শুকিয়েছে খানিক আগেই। পুণরায় চোখের কোটর ভরে এলো।ধরে আসা গলায় বললেন,
“ যারা প্রচুর ট্রমায় থাকে; একাকিত্ব বরণ করে নেয় অথবা নিঃসঙ্গ বেড়ে উঠতে উঠতে পৃথিবীর মানুষের প্রতি ঘৃণা ধরে যায় তাদের অধিকাংশের মাঝে এই রোগ হয় –আমি অনেক শুনেছি। আমার ছেলের কীসের অভাব পড়েছে যে সাইকোপ্যাথ -এ আক্রান্ত হবে? কীসের অভাব রেখেছি তাকে বড় করতে?আমার হাসিখুশি ছেলেটার নামে মিথ্যে বলছো, তুমি বলো মাহির?
পরপরই আতকে উঠে বিড়বিড় করে বললেন,
“শুনেছি সাইকোপ্যাথ নিকৃষ্ট কাজকর্ম,বীনা দ্বিধায় মানুষের জীবনও নিয়ে নিতে পারে। আমার ভালো ছেলে এসবের পথে হাঁটতেই পারে না।আমি বিশ্বাস করি না!যদি কখনো এমন হয় আমি মা হয়ে এটা কীভাবে বরদাস্ত করবো?হয়তো সেক্ষণ মরেই যাবো।”
আযাদ শিকদার আবার বলেন,
“ যা বলার বুঝিয়ে বলো?”
মাহির নড়েচড়ে বসে।আযাদ শিকদার নামের ভদ্রলোককে অজানা কারণে ভয় লাগে তার।সে বললো,
“ দিনকে দিন বস নিজের ব্যবহারে নিজেই শঙ্কিত হচ্ছিলেন ।উনি উপলব্ধি করেন উনার মন, মস্তিষ্ক এমনকি পুরো অস্তিত্বটাই সময়ে সময়ে নিজের কন্ট্রোলের বাহিরে চলে যাচ্ছে।সামান্য বিষয়াদিতে ওভার রিয়্যাক্ট, অ্যাগ্রেসিভ বিহেভিয়ার, নিজের দ্বারা অন্যকেউ দুঃখ পেলে উনার অনুশোচনা তো হতোই না উল্টো মনের তৃপ্তি মিটছে।গত ছ মাস আগে আমার কথায় একজন সাইকো থেরাপিস্ট এর সাথে সাক্ষাৎ করেন।আর ভদ্রলোক নিশ্চিত করেন উনি…
অর্ধ পথে থেমে গেলেও বাকিরা কথা উপস্থিত সকলে বুঝে নিলো।আইজার চোখের পানি গড়িয়ে পড়ে পুণরায়। জিজ্ঞেস করলো,
“ আমাদের জানাওনি কেনো তখন?”
“ স্যারের বারণ ছিল!
মাহির অন্যমনস্ক হয়ে গলা ঝাড়ি দেয়।চোখের তারায় একটা দৃশ্য ভাসছে।বর্ণ যেতে চাইছিলো না থেরাপিস্ট এর কাছে।সে তখন বলেছিল,
“ বস সময় থাকতে চলুন, দেখা করে আসি একবার। আপনার বিহেভিয়ারে সাইকো সাইকো ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে!এটা কিন্তু সাধারণ ব্যাপার নয়!”
সাইকো বলার অপরাধে ওইদিন গুনে গুনে মোটা লাঠি দিয়ে দশটা আঘাত করেছিল তাকে। তিনদিন হসপিটালের বেডে থাকতে হয়েছিল।তবে হ্যাঁ,মাহির একবারের জন্যও তখন বর্ণ’র সঙ্গ ছাড়ার কথা ভাবেনি। কেননা,সে যেমন আঘাত করেছিল পরবর্তীতে মলমটাও নিজেই লাগিয়ে দিয়েছিল। গাঁ কাঁপিয়ে জ্বর উঠেছিল তার। সজ্ঞানে ছিল না। সুস্থ হওয়ার পর ডিসচার্জের দিন ডক্টর সহাস্যে বলেছে বর্ণ নাকি দুদিন পর্যন্ত তার পাশেই থেকেছিল। আশ্চর্যের ব্যাপার না?বস পাহারায় ছিল তার এ্যাসিস্ট্যান্ট এর? অবশ্য বর্ণ ডাক্তারের কথাটি শুনেনি।পরে তার কাছে জানতে চাওয়ায় তাচ্ছিল্য স্বরে বলেছিল,
“ আ’ম রকস্টার আসফিয়ান বর্ণ!দেশ থেকে বিদেশে নাম,জস ছড়িয়ে আছে যার।সে কী না তোর পাশে বসে তোকে পাহারা দেবে হসপিটালে? বিশ্বাস হয় তোর? ডোন্ট থিংক ইউর্সেল্ফ সো ইম্পর্ট্যান্ট ফর মি।বেয়ার ইন মাইন্ড, তুই এক মাহির গেলে হাজারো মাহির লাইন ধরে দাঁড়াবে!”
শেষের কথাটি বলার সময় বর্ণ অদ্ভুত কায়দায় নজর লুকিয়েছিল। পূর্ব থেকে তার অভিব্যক্তি লক্ষ করায় দৃশ্যটা মাহির স্পষ্ট দেখতে পেয়েছে। তখন তার কান্না মিশ্রিত হাসি পেয়েছিল। আনন্দ ঘিরে ধরেছিল চারপাশ থেকে। সেদিনই সে নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা বদ্ধ হয়েছে -জীবন থাকতে সে বর্ণ’র সঙ্গ ছাড়বে না।হয়তো নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে তাকে আঘাত করে বসবে মাঝে মাঝে। কিন্তু সে উপলব্ধি করতে পেরেছে -বর্ণর জীবনে ভালোবাসার মানুষ খুবই অল্প;আর অগোচরে তাদের আগলে রাখার পথও তার রপ্ত।হয়তো সেই অল্পবিস্তর ভালোবাসার সীমানার কোন এক অবহেলিত স্থানে তারও জায়গা আছে। হ্যাঁ আছে,নয়তো এ্যাসিস্ট্যান্ট আরো দুটো থাকতে সে-ই কেনো বিশ্বস্ত?ভালো , খারাপ সব কাজেই কেনো তার হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য?
মাহির সেদিন বর্ণ’র কথার প্রেক্ষিতে জবাব দিয়েছিল তারই মতো করে,
“ ভুল ভেবে ফেলেছি বস!আসলে মাথায় ছিল না যে আপনি আঘাত করে আবার আপনিই কেনো সেবা করবেন?রিয়্যালি স্যরি !”
তার পরদিন বর্ণ নিজেই থেরাপিস্ট এর কাছে যাবার কথা বলেছে।
ভাবনা ঝেড়ে মাহির দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে আইজার কথা শুনলো,
“ একজন স্বাভাবিক মানুষের হঠাৎ করে এই পরিণতি হবে না।বড় কোন শক,কোন দুঃখ পেয়ে সেটা তিলতিল করে মনে প্রভাব না ফেললে এমন হিংস্র মনোভাব তৈরি হওয়ার কথা না।আমার ছেলের কী হয়েছিল?খুব বড় আঘাত পেয়েছে? –যার জন্য দিনের পর দিন তিলতিল গুমড়ে মরেছে আমাদের অজান্তেই! আল্লাহ_!আমি.. আমরা কী কোন ভুল করে ফেললাম! সঠিক ভাবে মায়ের দায়িত্ব পালন করতে পারিনি”
স্বামীর মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে বলে গেলেন আইজা।খানিক আগে বর্ণ’র করা কাজ ভুলে গেলেন নিমেষেই। অভিমানগুলো মূহুর্তেই যেনো উবে গেলো।মায়েরা বুঝি এমনই হয়!আযাদ শিকদার স্ত্রীর হাতে আস্বস্তের হাত রাখলেন,
“ যতোদিন আমাদের বুকের খাঁচায় ছিল ততোদিন আমরা আমাদের দায়িত্ব বলো বা ভালোবাসা কোনোটাই ত্রুটি রাখিনি।তবে এমন হলো কেনো?কারণ কী?”
মাহির হতাশ শ্বাস ফেলে বললো,
“ জানি না আঙ্কেল!স্যার আমাকে তো দূর থেরাপিস্টকেও কোনোকিছু শেয়ার করেনি। উল্টো..
“ চিকিৎসা নেয়নি বর্ণ?”
ভদ্রমহিলার কন্ঠ আকুল।মাহির জবাব দিলো,
“ এটার নির্দিষ্ট কোন চিকিৎসা নেই।তবে কন্ট্রোলে রাখার মেডিসিন অবশ্যই আছে।বস নেয় কিন্তু এরপরো মাঝে মাঝে অ্যাগ্রেসিভ হয়ে যায় যদি কেউ উনার অপছন্দের কাজটি করে বসে ওনারই সামনে।”
মাহির এই পর্যায়ে গলা পরিষ্কার করে অভ্র’র দিকে চাইলো। গুটিসুটি মেরে বসে আছে সে।ক্ষণে ক্ষণে গলায় হাত মাজছে! প্রশ্ন করলো মাহির,
“ তুমি তখন কী করেছিলে ভাইয়ের সামনে?”
অভ্র জড়োসড়ো হয়ে বসলো।ভাইয়ার রুমে অনেকদিন যাওয়া হয়না।তাই উঁকি দিয়েছিল আজ।বর্ণ তখন ল্যাপটপ সামনে নিয়ে কাউচে বসে।
মুখোমুখি বসে বর্ণকে এটা ওটা বলে হাসাতে চাইছিলো সে। বেশ কয়েকদিন থেকে তার মনে হচ্ছিল ভাইয়া প্রাণ খুলে হাসে না বহুদিন। একপর্যায়ে উঠে গিয়ে পুণরায় তার গিটার নিয়ে বসলো।কথাটি বলতেই মাহির বললো,
“ এটা ভাইয়ের প্রিয় গিটার! কাউকে ছুঁতে দেয়না এমনকি আমাকেও কখনো না।”
অভ্র মুখ গুঁজ করলো।গিটার নেওয়ার পরেও বর্ণ কিছু বলেনি। একঝলক চেয়ে পুণরায় ল্যাপটপে মুখ ডুবিয়েছিল আর তার কথায় একটু পরপর হুঁ হা জবাব করছিল।অভ্র বলে উঠলো,
“ হঠাৎ হাত ফসকে গিটার ফ্লোরে পড়ে গিয়েছিল..
সুখ উঠে চলে এলো সেখান থেকে।অভ্র কী বলবে বাকিটা আন্দাজ করা যাচ্ছে এখন।তাই বলে পুরুষটি এতোটা হিংস্র হয়ে উঠবে?
সুখের গলা শুকিয়ে আসে।যদি সঠিক সময়ে সে না যেতো? তখন কী হাল করতো অভ্রর? আধমরা করে ছেড়ে দিতো নাকি …
আর ভাবতে পারে না সুখ।ওই নিষ্ঠুর গাঁ ছমছমে দৃশ্য ভাবতেও চায়না।
বর্ণ’ কীসের যের ধরে এমন হিংস্র হয়ে উঠলো?কী হতে পারে কারণ?সুখের এই মূহুর্তে একটা কথাই মনে পড়লো। বর্ণ ইন্টারমিডিয়েট শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছিল। ওখানেই চলে গিয়েছে তখন।তিন মাস অতিবাহিত হওয়ার পর দশ দিনের জন্য এসেছিলো বাড়িতে। এরপর?
একদিন আযাদ শিকদারের নাম্বারে টেক্সট এলো তার নাম্বার থেকে,
“ আমায় খুঁজো না আব্বু! একদিন ঠিকই তোমাদের মাঝে ফিরবো আমি!”
মেসেজের ধরণ দেখেই আইজা কেঁদে উঠেছিল ডুকরে। এরপর হাজার চেষ্টায়ও বর্ণ’র ফোনে কল ঢুকছিলো না।ফোন সুইচ অফ।আযাদ শিকদার ছুটে গিয়েছিলেন ঢাকা।উনার ব্যবসার প্রসার তখনো ঢাকা অবধি পৌঁছে নি। ভার্সিটি,তার বন্ধুবান্ধব কেউ বর্ণ’র খুঁজ দিতে পারেনি সেদিন। জলজ্যান্ত একটি ছেলে এভাবে কীভাবে উধাও হয়ে যেতে পারে?পাগলা কুকুরের মতো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেও তিনি পরের দুটোদিন বর্ণকে খুঁজে পায়নি।
বর্ণ ফিরেছিল হাতে গুনা ৫৫৩ দিন পর,প্রায় দেড় বছর।আইজার অবস্থা তখন শোচনীয়।ছেলে হারানোর শোকে পাগলপ্রায়। রোজ ছেলের অপেক্ষায় গেইটের কিনারে গিয়ে বসে থাকতো। বর্ণ’র দেওয়া ওই টেক্সটে চুমু দিতো,বুকে জড়িয়ে রাখতো।নিজ মনে কাঁদতো, আবার ছেলের সৌন্দর্য বর্ণনা করে মুগ্ধময় হাসতো। সেদিন ছেলেকে ফিরে পেয়ে অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েছিলেন আইজা।
আজ সুখের বড্ড জানতে ইচ্ছে হলো -এই দেড় বছর কোথায় ছিল বর্ণ ভাই?কেননা…
#চলবে🥀
[ওই ইনজেকশন ড্রাগস না হয়ে মেডিসিন ও তো হতে পারে!
পারে না রিডার্স? 💜🦋]

