আমার_বোবাফুল(২৫) #তৃপ্তি_এহসান_নাওরা

0
65

#আমার_বোবাফুল(২৫)
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরা

দূর হতে ল্যাম্পপোস্টের হলদেটে রশ্মি আঁচড়ে এসে বিছিয়ে পড়েছে পিচঢালা রাস্তায়।তাতে বর্ণ’র কালো পোশাকে আবৃত নিস্তেজ দেহ অল্পস্বল্প দৃশ্যমান। আশেপাশে কোন মানব অস্তিত্বের টিকিটিও নজরে পড়ছে না।শহরকে তখন রাতের আধার গ্রাস করে নিয়েছে পুরোপুরি। অম্বরের ফালি চাঁদ খানা ঢেকে গেছে মেঘের ওপারে।

বর্ণর শ্বাস প্রশ্বাস চলছিলো ধীমি গতিতে। অসাড় শরীর। ক্ষণকাল স্থির পড়ে থেকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও পিটপিট চোখের পাতা খুলে সে। ক্ষীণ শক্তি ব্যয় করে হেলমেট খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিক শূন্য।হাতের কব্জিতে চিনচিন করছে। কীভাবে কীভাবে যেনো ঘড়ির কাঁচ বিঁধে গেছে। পায়ের গোড়ালি,হাঁটুতে, ঊরুতেও ব্যাথা অনুভব হয়।মুখ ভেঙে অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে আসে বিরক্তি সূচক।এই মূহুর্তে যন্ত্রণার চেয়ে বেশি বিরক্তে আচ্ছন্ন হয়েছে তার মুখশ্রী।রাস্তায় হাত ঠেসে ধীরস্থির উঠে বসে বর্ণ। দাঁতে দাঁত খিচে আছে।চোখের দৃষ্টি নিভু নিভু।

দাঁড়াতে গিয়েও পুণরায় রাস্তায় ঢলে পড়ে গেলো সে। বিতৃষ্ণা মনে চোখের সামনে হাত তুলে আনে। কব্জি বেয়ে টুপটাপ তরল র/ক্ত গড়িয়ে পড়ছে।ভাঙা সরু কাঁচ তখনো সেখানে সেঁটে রয়েছে। দুবার ঝাড়া মেরে বর্ণ’ মুখের উপর হাত নিয়ে দাঁতের ফাঁকে চেপে কাঁচ টেনে বের করে নিলো।পরপর থু দিয়ে ফেলে দিলো মুখে নেওয়া কাঁচের টুকরো। ঠোঁটজুড়ে রক্তের মাখামাখি। নিঃশ্বাসের শব্দে আশপাশ ভারী হয়ে উঠেছে ইতোমধ্যে।

দুটো গাড়ি চোখের সামনে দিয়ে চলে গেলো সাঁই সাঁই। রাস্তার কিনারে কেউ আহত দেহে পড়ে আছে ,তা দেখার প্রয়োজন বোধই মনে করলো না। অবশ্য করলেও বর্ণ’র প্রতিক্রিয়া নিশ্চয়ই ইতিবাচক হতো না।

রাস্তার দু’পাশে মেহগনি গাছের সারি।বাইক ওই দূরে ছিটকে গিয়ে গাছের সাথে টেক্কা লেগে ওপাশের মাঠে পড়ে গেছে।

‘ পকেট হাতড়ে ফোন বের করলো বর্ণ।ভাসা ভাসা দৃষ্টিতে স্ক্রিন ঝাঁপসা দেখতে পাচ্ছে।মাহির কলের উপর কল দিয়েছিলো রাত দুটো পর্যন্ত। লিস্টে তার নামটা প্রথমেই আছে।

মাত্রই চোখ লেগে এসেছে।ফোনটা রেখে দিয়েছিলো কানের গোড়ায়। স্বশব্দে ফোনখানা বেজে উঠতেই ধড়পড়িয়ে শোয়া থেকে উঠে গেলো মাহির।ঘুমের ঘোরে এমন অপ্রত্যাশিত কিছু হওয়ার বুক ধুপধাপ করছে। ধাতস্থ হয়ে সে বালিশে নজর নিবদ্ধ করে। অতঃপর বুকে হাত চেপে প্রলম্বিত শ্বাস ত্যাগ করলো।তখন এক মূহুর্তের মনে হয়েছিল ভূমিকম্প শুরু হয়েছে। বিল্ডিং ধ্বসে পড়ে ক্ষণিকের ব্যবধানে আজরাইল নামবে জান কবজ করতে!

ফোন কানে ধরে রাখে বর্ণ। চোখ বুজে আলগোছে মাথা এলিয়ে দেয় রাস্তায়। ওপাশে রিসিভ করতেই সে স্বল্প আওয়াজে আওড়ালো,

“ মা_হির..!”
.
রাত ৪টা ২৫ মিনিট। ঘড়ির কাঁটা জানান দিচ্ছে এখন রাতের শেষভাগ চলমান।হেলানি চেয়ারে হাত পা ছড়িয়ে বর্ণ আধশোয়া হয়ে আছে। কপালে এবং হাতের কব্জিতে ব্যান্ডেজ করে দিয়ে পায়ের অবস্থা দেখে আহত চোখে বর্ণ’র মুখশ্রীতে নজর ঘুরালো মাহির। বর্ণর চোখ তখন বন্ধ ছিল। সেভাবেই হঠাৎ মুখ খুললো,

“ হোয়াট? ”

মাহির নজর সরিয়ে আনে অতিদ্রুত।তাকালেও দোষ?তখন বর্ণ’র কল পেয়ে আগেপিছে না ভেবে ছুটেছিল সে।তার জ্ঞান ছিল কিন্তু শরীর অবশ প্রায়।হসপিটাল নিয়ে যেতে চেয়েছিল মাহির কিন্তু মহাশয় নিষেধ করে দিয়েছে। টক্কর লাগার মূহুর্তে তৎক্ষণাৎ বাইক থেকে ছিটকে পড়ে আসায় শরীরে গুরুত্বর আঘাত লাগেনি,তাই বলে জখম গুলোকেও হেলাফেলা করার মতো নয়।

মাহির অগত্যা বর্ণ’র ফ্ল্যাটেই নিয়ে এসেছে তাকে।আর সে যতটুকু পারে র-ক্তক্ষরণ বন্ধ করার চেষ্টা করছে।তুলাতে সেভলন লাগিয়ে গোড়ালির আশেপাশে ছুঁইয়ে শুকিয়ে যাওয়া র-ক্ত পরিষ্কার করার সময় মৃদু স্বরে বললো,

“ বস ফ্র্যাকচার/ইনফেকশন এসব হতে পারে!”
“ দ্যান?”

মনক্ষুণ্ণ চোখে পুনর্বার চাইলো মাহির।হাতে,পায়ে, হাঁটুতে,কপালে আঘাতে জর্জরিত হলেও মুখের ভাষা একদম কাটকাট! কিছু বললেই আগুনের গোলার মতো জবাব ফিরিয়ে দিচ্ছে কঠিন স্বরে

দ্বিতীয় বার কিছু বলার সাহস কিংবা ইচ্ছে কোনটাই দেখালো না সে।এখন কথা না বাড়ানোই শ্রেয়।রাত পোহালেই বরং তাকে কিছু একটা করতে হবে।
.
সুখের রুমের পাশাপাশি লাগোয়া একটি সিক্রেট রুম আছে।যদিও সম্পূর্ণ সিক্রেট বলা যায় না।রুমটির ব্যাপারে বাহিরের মানুষ ছাড়া বাড়ির প্রত্যেকে অবগত।আব্বু এবং বড় আব্বুর কাছ থেকে এই রুমটা চেয়ে নিয়েছিল সুখ।

ছোটকাল থেকে আঁকিবুঁকি নিয়ে তার খুব আগ্রহ।বইয়ে থাকা বিভিন্ন ছবিগুলো প্রথম প্রথম এলোমেলো অপরিপক্ক হাতের লেখালেও একসময় নিখুঁত ভাবে স্ক্যাচ করতে পারে। বছর দুয়েক আগে পেইন্টিং করার শখ জাগে তার। চারপাশের সবুজ শ্যামল নজর কাড়া পরিবেশ তুলির আঁচড়ে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলার ইচ্ছে হয়।
অতঃপর আর কী?আব্বুকে জানালো। ভদ্রলোক মেয়ে চাইলে জান হাজির করে দিতে পারে সেখানে তার আবদার ছিল কেবল পেইন্টিং করার ক্যানভাস, রঙ তুলি সহ যাবতীয় সামগ্রী।

একবছর ধরে সময় নিয়ে ভীষণ যত্নে একটি পেইন্টিং করছে সুখ। যেখানে তাদের পরিবারের প্রতিটি সদস্যের উপস্থিতি রয়েছে।এক তৃতীয়াংশ সম্পন্ন হয়েছে সেটার;আর কিছুটা বাকি। অনেকদিন এই রুমে প্রবেশ করা হয়না তার।আজ রাতে সময়ের কাঁটা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে মনে হচ্ছিল।মনের ব্যাকুলতা কমার বদলে বেড়ে চলছিল হুরহুর। চোখে নিদ্রাও ধরা দিতে নারাজ। উপায়ান্তর না পেয়ে ছটপটে হৃদয়ে শান্ত করতে বহুদিন পর এই রুমে আগমন ঘটেছে তার। অসম্পূর্ণ পেইন্টিংয়ে কিছুক্ষণ হাতও চালিয়েছিল সে।

অনড় হাতে রঙের তুলি; কোমল স্নিগ্ধ গালেও কিছু রঙ লেগে রয়েছে। রমণী ক্যানভাসের পাশে থাকা ছোট টেবিলে হাতের উপর মাথা রেখে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কখন চোখ লেগে এসেছে হয়তো নিজেরও বোধগম্য নয়।

ফজরের আযানের ধ্বনিতে ঘুম ভাঙ্গে সুখের। দৃষ্টি মেলে ক্ষণকাল পর নিজের অবস্থান বুঝে উঠার চেষ্টা করে তড়িঘড়ি করে সোজা হয়ে বসে চোখ কচলে আশেপাশে তাকায়। পরপর জিভ কেটে কপালে হাত রাখে। সত্যিই ঘুমে বুদ হয়ে কখন টেবিলে ঢলে পড়েছে কে জানে!
.
দু দিন অতিবাহিত হওয়ার পরও বাড়ি ফিরেনি বর্ণ।আইজা ছেলের চিন্তায় ভেতরে ভেতরে অস্থির।অন্য দিন হলে বোধহয় নিশ্চিত থাকা যেতো –ছেলে এখন বড় হয়েছে,নিজের খেয়াল নিজে রাখতে পারে,নিজের ভালো নিজেই বুঝে। কিন্তু মাহিরের কথাগুলো শুনার পর থেকে মায়ের দরদী মন আত্মচিৎকার দিয়ে যেনো বলে চলেছে,

“ ছেলেটাকে যদি আঁচলের তলায় লুকিয়ে রাখা যেতো!তার জন্য খুব বেশি কী খারাপ হয়ে যেতো? ”

আযাদ শিকদারের নিষেধ আছে বর্ণকে নিজ থেকে কল দিতে। স্বামীর নিষেধ অমান্য করার সাধ্য তার নেই।ছেলের নাম্বারের দিকে হতাশ চোখে চেয়ে মাহিরকে কল দিলো আইজা।ভোর ফুটেছে বেশি দেরি হয়নি।এই নিয়ে পঁয়ত্রিশ বার কল দিয়েছে ভদ্রমহিলা।মাহির এখনো জানায়নি বর্ণ’র এ্যা/ক্সি/ডেন্টের ব্যাপারটা। খামোখা চিন্তা করবেন তারা; যেখানে আসল ব্যাক্তিরই এই নিয়ে কোন ধ্যান জ্ঞান নেই। কিন্তু এখন ভাবতে বসেছে সে –বিষয়টি জানতে পারলে কান থেকে নিশ্চয়ই ফোন রাখার সুযোগ দেবেন না আন্টি।

চেয়ারে হেলান দিয়ে ব্যান্ডেজ করা পা টুলের উপর রেখে ডানে বাঁয়ে নাচাচ্ছে বর্ণ। চোখের উপর হাত দিয়ে রেখেছে। গতকাল বহু কষ্টেসৃষ্টে তাকে ডাক্তারের মুখোমুখি বসাতে সক্ষম হয়েছে মাহির।তার একটাই কথা,

“ দুনিয়ার মানবজাতির মুখাপেক্ষী হওয়া তার ধর্মে নেই!”

আইজার সাথে কথা বলে মাহির কাছাকাছি এসে থামলো।বললো মৃদূ স্বরে,
“ ভাই বাড়ি থেকে ফোন আসছে! ফিরবেন না?”

বর্ণ’ চোখের উপর থেকে তৎক্ষণাৎ হাত সরালো না। প্রত্যুত্তর ও করলো না তখন।খানিক পর চোখ খুলে অদৃশ্যে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললো,

“ না!”

মাহির খানিকটা আশ্চর্য হয়েই অবচেতন মনে প্রশ্ন করে বসলো,

“ কিন্তু কেনো বস?”

#চলবে🥀
[বর্ণর এই এ্যা/ক্সিডে/ন্টে কিছুমিছু হয়ে যাওয়া উচিৎ ছিল। কিন্তু আন-ফরচ্যুনেটলি বেঁচে গিয়ে চ্যাটাং চ্যাটাং কথায় বলে যাচ্ছে শুধু!রাত যতোততো বেড়ে চলছে আর বড় করতে পারলাম না রিডার্স! আজকের মতো এটুকুই পড়ে নিন 🫶❤️]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here