#আমার_বোবাফুল(২৯)
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরা
পিচঢালা রাস্তায় ঝড়ের বেগে বাইক নিয়ে ছুটছে বর্ণ। তীব্র হাওয়ায় গায়ের শার্ট পেছনের দিক ফুলে উঠেছে অল্প। মস্তিষ্ক নিষ্ক্রিয় প্রায়।অগোছালো চিন্তাধারা।তামিজ শিকদার বাচ্চাদের মতো করে হুঁ হুঁ কান্নায় ভেঙে পড়েছেন।সুখ কলেজে নেই। বাড়িতেও পৌঁছায়নি। প্রায়শই স্বেচ্ছায় টেক্সি অথবা রিকশা নিয়ে ক্লাস পূর্ণ না করেই বাড়ি ফিরে সুখ। যেদিন যায় সেদিন আব্বুকে ইনফর্ম করে দেয় মেসেজে।আজ কোন মেসেজ আসেনি সুখের নাম্বার থেকে; তবে কল এসেছিল।তামিজ শিকদার তখন মিটিংয়ে ছিলেন বিজনেস ক্লায়েন্টদের সাথে।মেয়ের কল পেয়ে দ্রুত রিসিভ করলেন ভদ্রলোক।ভীতও হলেন কিঞ্চিৎ। সচরাচর সুখের নাম্বার থেকে অডিও কল আসেনা,মেসেজই আসে!
“ উমঃ উমঃ ” অবরূদ্ধ কন্ঠস্বর ভেসে আসছিলো সুখের।সাথে সমন্বিত কিছু পৌরুষ স্বর। ধারনা করা যায় –ধস্তাধস্তি হচ্ছিল ওপাশে।পরবর্তীতে কল কেটে যায় আপনাআপনি। এরপর বারবার চেষ্টা করেও তিনি সুখের ফোনে কল প্রবেশ করাতে পারেননি। উপায়ান্তর না পেয়ে মিটিং ছেড়েছুড়ে কলেজে ছুটে এসেছিলেন; কিন্তু সুখ নেই কোথাও!
মাহির পেছনের একটা টেক্সি থেকে মাথা উঁচিয়ে “ ভাই..ভাই” করে ডাকছে। বর্ণ’র কানে পৌঁছায়না সেই স্বর।তাকে এখন যেতে হবে; এক্ষুনিই!হাতের কব্জিতে ক্ষত-বরাবর মেডিটেপ লাগানো। পাঁচ সেলাইয়ের প্রয়োজন পড়েছিল সেখানে।ক্ষত পুরোপুরি সারেনি আজো;মুঠো করলে এখনো ব্যথা লাগে। অবচেতন মনে গতি দ্রুত করতে বাইকে হাতের চাপ প্রয়োগ করতেই বেদনায় চোখ কুঁচকে আসে বর্ণ’র।হাত ছাড়িয়ে ঝাঁকা দিতেই নিয়ন্ত্রণ হারায়। তৎক্ষণাৎ বাইক সহ উল্টে পড়ে গেলো রাস্তার কিনারায়।ডান পায়ের গোড়ালির ক্ষত শুকিয়ে আসছিল কেবল; পুণরায় আঘাত লাগতেই ব্যান্ডেজের উপর থেকে তরল র/ক্ত বেরিয়ে আসে তরতরিয়ে!
মাহির চলন্ত টেক্সি থেকে ঝাঁপ দিয়ে ছুটে এলো বর্ণ’র কাছে। আশপাশে মানুষ জড়ো হয়। বর্ণ’র সমস্ত ব্যর্থতা,ক্ষোভ গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের উপর। দাঁতে দাঁত নিষ্পেষিত করে শক্ত চোয়াল এমন হিংস্র দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো –এখনি যেনো দুনিয়া ভষ্ম করে সব চুরমার করে দেবে।
“ ভাই আপনার পা থেকে র/ক্ত বেরুচ্ছে। আমাদের এখুনি রওনা দেওয়ার কথা ছিল; আপনি এভাবে, এই সময় কোথায় ছুটে যাচ্ছেন?”
মাহির দুহাতে জাপটে ধরে তাকে উঠতে সাহায্য করলো। বর্ণ’র কপালে ভাঁজ পড়ে। সত্যিই তো –সে এভাবে উদ্ভ্রান্তের মতো কোথায় ছুটছে?
“ বস আপনি বাইক চালানোর অবস্থায় নেই!আমি.. আমি চালাই?”
বিরোধ করলো না বর্ণ।মাহিরের পিছু উঠে বসলো। কপালে হাত ঘঁষতে ঘঁষতে বলে,
“ আপাতত চাচ্চুর কাছে চল!”
.
আইজার তীব্র মাথা ব্যথা উঠেছে হঠাৎ।কপাল হতে মাথার অর্ধভাগ অব্দি টনটনে ব্যাথার তাড়নায় চোখটাও খুলে রাখা দায়।একটা শুকনো রুটি ছাড়া সকাল থেকে আর কিছু মুখে তুলেনি।হাতে চায়ের কাপ নিয়ে রুবাইয়্যাত এলেন রুমে।লেবু চা খেলে হয়তো একটু আরাম লাগতে পারে।
“ কাম্মা.. কাম্মা!”
কোত্থেকে হন্তদন্ত হয়ে তেড়ে এলো অভ্র। হাঁটুতে হাত ভর করে জোরে জোরে নিঃশ্বাস টানে।রিতিমত হাঁপাচ্ছে ছেলেটা। আধশোয়া হয়ে চোখ বুজে চা পান করছিলেন আইজা।উনার শিয়রে রুবাইয়্যাত; কপালে মলম ম্যাসাজ করে দিচ্ছিলেন বড়জা’য়ের! দু’জনে সচকিতে অভ্র’র দিকে চাইলো।তার আগমন এবং কন্ঠই ছিল মানব মনে ভীতি জাগানোর মতো।
“ চাচ্চু বললো সুখ আপিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না!”
ঘন্টা খানেক আগে তামিজ কল করেছিল।সুখ ফিরলো কিনা জানতে চাইছিলেন। রুবাইয়্যাতের উত্তর নেতিবাচক পেয়ে তামিজ অভয় দিয়ে তখন বলেছে, “ তেমন কোন ব্যাপার নয়!সুখ হয়তো কলেজেই আছে!”
স্ত্রী যেনো অহেতুক চিন্তায় জর্জরিত না হয়।তাই এমন বলেছিলেন তিনি। কিন্তু কতোক্ষণ সত্যিটা লুকিয়ে রাখা যাবে?সুখের কোন খবরই এখনো পাওয়া যায়নি।
.
ব্যান্ডেজ গলে পা থেকে রক্ত ছুঁইয়ে ছুঁইয়ে পড়ছে বর্ণ’র।পা চালাচ্ছে টেনে হিঁচড়ে। ইতোমধ্যে পুরো কলেজ ছানবিন মেরে খুঁজ করা শেষ। সুখের অস্তিত্বের ঘ্রাণও পাওয়া যায়নি।ফাহিমা নূর ফাহা –মেয়েটা সুখের সঙ্গী।তার ভাষ্যমতে ‘ সুখ ১২:১৫ তে কলেজ ছেড়েছে’!অথচ এখন ঘড়িতে ০৩:৩৫!
কলেজ প্রায় ফাঁকা। কিছু সংখ্যক ছেলেমেয়েকে চোখে পড়ছে।মাহির ভবনের এদিক ওদিক ছুটছে। শরীর ঘেমেনেয়ে একাকার।সুখের সমবয়সী তারও একটা বোন আছে। সবসময় তার মতোই দেখে এসেছে সুখকে।
শুট ক্যান্সেল করেছে বর্ণ। পুলিশ নিয়ে সুখের নাম্বারের লাস্ট লোকেশন ট্রেস করে একটা জনমানব শূন্য রাস্তায় এসে পৌঁছালো তারা। সচেতন মস্তিষ্কে বর্ণ আশেপাশে নজর ছিটায় ভ্রু গুটিয়ে।এই রাস্তাটা ‘শিকদার নিবাসে’ যাওয়ার উপযুক্ত নয়, বরং তার উল্টো পথ।জনমানবহীন এই রাস্তায় সুখ কীভাবে এলো? এপথে তার কী কাজ?
পুলিশ অফিসার আতিক ল্যাপটপ থেকে চোখ তুলে মুখ খুলেন গম্ভীর গলায়,
“ এখানেই লাস্ট লোকেশন দেখাচ্ছে। আশেপাশেই থাকবে!”
তামিজ শিকদার ভয়ার্ত ঢোক গিললেন।গাড়ি থেকে তড়িঘড়ি করে নেমে সরু পথটা পরখ করে নিয়ে অল্প একটু যেতেই মাটিতে বসে পড়েন।
“ বর্ণ.. এই দ্যাখ আমার মেয়ের ফোন! আমার আম্মা কোথায় গেলো রে?…
ধুলো মাখা রাস্তায় নিথর পড়েছিল ফোন খানা।ডিসপ্লে মাঝবরাবর ভেঙে গুড়গুড়। দেখে মনে হচ্ছে –কেউ ইচ্ছে করেই এটা ভেঙেছে।তামিজ শিকদার অবুঝের মতো চোখের পানি ঝারছেন। কলিজাটা যেনো কেউ খাবলে ধরে আছে। যতোক্ষণ মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরতে না পারবেন ততোক্ষণে ওটা সুস্থির হবে না।বর্ণ নির্বাক চোখে চাচ্চুর কাঁধে হাত রেখে আস্বস্ত করে,
“ রিল্যাক্স চাচ্চু! বাচ্চাদের মতো কাঁদছো?ফুলকে আমরা ঠিকই খুঁজে নেবো।ওকে ফিরতে হবে।”
ফোনে অগণিত কল আসছে –রুবাইয়্যাত, আযাদ শিকদার,আইজার।
রাস্তার শুরুতে সিসি ক্যামেরা লাগোয়া। কম্পিউটার স্ক্রিনে কতো নিষ্ঠুর এক চিত্র ভেসে উঠেছে তামিজ শিকদারের।প্রথম স্ক্রিনে সুখের মুখশ্রী স্পষ্ট না দেখালেও টেক্সির ভেতরে দৃশ্যমান কলেজ ড্রেস দেখেই তিনি মেয়েকে শনাক্ত করে নিলেন।দেখে মনে হচ্ছিল না সুখকে কেউ জোরপূর্বক ভুল রাস্তায় নিয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু দ্বিতীয় দৃশ্যটি ছিল বাবার চোখে বড্ডো নির্মম, অসহায়। কোত্থেকে পালিয়ে আসার মতোন ছুটে আসছিল সুখ।সামনে থেকে হঠাৎ একটা গাড়ি এলো।তিন তিনটে মুখোশের আড়ালে চুপায়িত মুখ তাকে টেনে হিঁচড়ে গাড়িতে তুলার চেষ্টা করছে।সুখ ছুটতে চাইছিল তাদের কবল থেকে। কিন্তু শেষমেশ রেহাই পায়নি।তামিজ শিকদার এবং তার সহধর্মিণী রুবাইয়্যাত খানমের বেঁচে থাকার সম্বল তাদের কলিজার টুকরা আম্মাকে নিয়ে ওই
জানো/য়ারেরা কোথাও চলে গেলো। এরপর সিসি ক্যামেরায় তাদের আর দেখা যায়নি।
অফিসার আতিক সবটা অবলোকন করে বললেন,
“ সব পূর্ব পরিকল্পিত মনে হচ্ছে! আপনার কাউকে সন্দেহ মিস্টার শিকদার?”
বর্ণ’র শিরা উপশিরা ধপধপ করছে। মুষ্টিবদ্ধ হাতে ধীরস্থির টকটক আওয়াজ তুলছে টেবিলে। দৃষ্টি কম্পিউটার স্ক্রিনে। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে সুখের নখের আঁচড়ে একজনের মুখের গামছা খুলে পড়ে গেছে।লোকটা পুণরায় সেটা মুখে পেচালেও স্ক্রিনে তার মুখশ্রী স্পষ্ট।
.
“ ও ছুড়ু ভাবী.. ভাইজানরে আরেকবার কল কইরা দেহেননা?সুখ আম্মার কোনো খুঁজ পাইছে কী না?”
রুবাইয়্যাত আঁচলে মুখ গুঁজে কেঁদে চলেছেন ঠোঁট কামড়ে।মেয়েকে নিজেই খুঁজে বের করবেন বলে একটু আগে বাড়ি থেকে ছুটে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। পরবর্তীতে অভ্র আর তুহফা জোরপূর্বক বাড়িতে ঢুকিয়েছে। আইজার মাথা ব্যাথা পুরোপুরি উবে না গেলেও ,যা অল্পস্বল্প রয়ে গেছে তা উপলব্ধি করতে পারছেন না পরিস্থিতির চাপে পড়ে।কী থেকে কী হয়ে গেলো। আজ সকালেও সুখ পাখি বেরোনোর আগে কতো মিষ্টি হেসে হাতের ইশারায় বিদায় নিলো।কতো স্নিগ্ধা,কী কোমল দেখাচ্ছিল তাকে।
চঞ্চল নূরাও গোমড়া মুখে বসে আছে এক কিনারে।সবার কান্না দেখে নিজেও ঠোঁট উল্টেপাল্টে নিরবে কাঁদছে।ভাই বোনের মধ্যে পছন্দের তালিকায় প্রথমেই তার –সুখ!সবাই তাকে বকলেও সুখ তাকে নিঃশব্দে বুঝিয়ে দেয়।ভুলটা শুধরে দেয়।হাতের ইশারায় না পারলে কলম দিয়ে। মাঝেমধ্যে চোখ রাঙানি দেয়; তাও ভালোবেসে!
বাতের ব্যথায় হাঁটতে অসুবিধা হচ্ছিল হানিফা বেগমের।আজ সারাদিন রুম থেকেই বের হোননি। সাইমা বুয়া ওয়াক্তের খাবার রুমে দিয়ে এসেছে।বাহিরের কান্না মিশ্রিত গোঙানির আওয়াজ পেয়ে আর রুমে মন টিকলো না।ধীর পায়ে ব্যথা নিয়েই বেরিয়ে এলেন।
সুখ হারানোর সংবাদে বৃদ্ধা স্তব্ধ হয়ে চেয়েছিলেন।এই চাহনিতে সুখের প্রতি বিতৃষ্ণা কিংবা অবজ্ঞা ছিল না আজ।
.
পুরো উপজেলা খুঁজেও সুখকে না পেয়ে যখন প্রত্যেকে দিশেহারা। হোয়াটসঅ্যাপে একটি ভিডিও দেখে থমকালো বর্ণ।
ছয়তলা তলা ফাউন্ডেশনে আন্ডার-কন্সট্রাকশন বিল্ডিং।তিনটি ছাদই উঠেছে কেবল। প্রাচীর নির্মাণ হয়নি এখনো।রড, পিলার লম্বালম্বি দাঁড়িয়ে আছে উর্ধ্বমুখী। আশেপাশে সেগুনবাগিচায় ঢাকা। জায়গাটা শুনসান। খানিক দূরে একটা শেওলা ধরা দুতলা বাড়ি তালা ঝুলানো।
প্রকৃতি বলছে –একটু পরেই সন্ধ্যা নামবে।গাড়ি থেকে তামিজ শিকদার নামেন।পরপর ফ্রন্ট সিট থেমে বর্ণ।মাহিরও আছে সাথে।
“ ফুল..
“ সুখ..আম্মু..
যে যার মতো হন্তদন্ত ছুটে ডাকছে সর্বস্ব দিয়ে।তামিজ শিকদার মেয়েকে না দেখে পাগলের মতো ছুটছেন সামনে। এরিমধ্যে বাড়ি যাওয়া হয়েছিল একবার।অনেক কষ্টে স্ত্রীকে বুঝিয়েছেন ভদ্রলোক।কথা দিয়েছেন –যে কোনো কিছুর বিনিময়ে হলেও সুখকে তার বুকে ফিরিয়ে দেবেন।
যতো এগুচ্ছে ততোই বুকটা অদ্ভুত ভাবে কাঁপছিল বর্ণ’র। অস্থির হচ্ছিল হৃদস্পন্দন। দ্রুত লয়ে এলোমেলো পা চালিয়ে খানিক এগুতেই থমকে গেলো সে।জিমে গড়া কঠোর গা কম্পিত হয় থরথর। জীবন চলার পথে এই নিয়ে তৃতীয় বার এমন অনুভূত হচ্ছে বর্ণ’র।
সাদা ইউনিফর্মটা জায়গায় জায়গায় ছিঁড়ে গেছে। ইউনিফর্মের রঙ এখন আর সাদা নেই।
র/ক্তের ছিটা ছিটা দাগে ভয়ানক আকর্ষণীয় লাগছে।গোটা দেহ নিস্তেজ,নিথর পড়ে আছে মাটিতে। মুখশ্রী র/ক্তে রঞ্জিত! মুখে রক্তের উপস্থিতি এতোটাই শোচনীয় যে খুব খেয়াল করে না দেখলে –কে,তা চিহ্নিত করা দুষ্কর।
তামিজ শিকদার পাথর বনে নির্বোধের মতো থমকে তাকিয়ে রইলো মাটিতে নির্তেজ, নির্ভীক পড়ে থাকা মেয়েটির দিকে।এটাই কী উনার কলিজার টুকরা?না নাহ,এমন হতেই পারে না।এমন হওয়ার কথা ছিল না।
বর্ণ শূন্যে ফাঁকা হাত তুলে অবুঝের মতো চাচ্চুর দিকে চাইলো। আবার তাকালো মাহিরের দিকে।সে ঢোক গিলে শুকিয়ে আসা গলা ভিজাতে চায়। আচমকা ধুপ করে বসে পড়লো নিচে। অল্পক্ষণ একদৃষ্টে চেয়ে থেকে কানের কাছে মুখ নিয়ে খুব ধীরে ডাকলো,
“ ফুল.. শোন!”
এই সেই ফুল –যে তার শ্বাস প্রশ্বাসের উপস্থিতি পেতেই একসময় ছুটে এসে খানিক দূরে অথচ খুব নিকটে এসে দাঁড়িয়ে থাকতো। লুকিয়ে চুরিয়ে তাকে দেখে যেতো ক্ষণের পর ক্ষণ।এই ফুল –একসময় সে ডাকার চিন্তা ভাবনা নেওয়ার আগেই সামনে হাজির হয়ে তার হুকুমের প্রতিক্ষায় মুখিয়ে থাকতো।
অথচ আজ সেই একই ফুলকেই বর্ণ খুব কাছ থেকে ভীষণ আদুরে গলায় ডাকলো। কিন্তু আফসোস; ফুল তাকে শুনলো না।সাড়া দিলো না তার এক ডাকে।
জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে নেয় বর্ণ। কন্ঠণালী ফুঁড়ে কথা বের হতে চাইছেনা।কী মুশকিল।সে কাঁপা হাতটা নির্বিকার পড়ে থাকা সুখের আদলে রাখে। র/ক্তে তার ভয় ডর কোন কালেই ছিল না।তবে এখন নতুন কিছু আবিস্কার করেছে নিজের মধ্যে।তার অল্পবিস্তর ভয় লাগছিলো। কিন্তু এসব তোয়াক্কা করার আগ্রহ এখন নেই।পুণরায় ডাকে,
“ ফুল.. শুনতে পাচ্ছিস আমায়?”
ভঙ্গুর গলায় হুঁশিয়ারি স্বরূপ আবারো মুখে আলতো চাপড়ে ডাকলো,
“ কথা বলছিস না কেনো রে অবাধ্য মেয়েটা? চুপচাপ কথা বল আমার সাথে!”
সুখ তাও কথা বলে না।চোখটা পর্যন্ত খুললো না। নিঃশ্বাস চলছে ধীমি গতিতে।বর্ণ পাগলের মতো করে হেসে ফেললো নিঃশব্দে।মাথা চুলকাতে চুলকাতে আচমকা সুখের রক্তাক্ত মাথাটা কোলে তুলে নিলো, উদ্ভ্রান্তের মতো ডাকতে লাগে,
“ এ্যাঁই ফুল এ্যাই!অপেন ইউ্যুর আইস!টক ঠু মি!ফুল.. কথা বল না আমার সাথে।
স্তব্ধ মূর্তি বনে যাওয়া তামিজ শিকদারের দিকে চেয়ে বললো, “চ্_চাচ্চু ওকে কথা বলতে বলো।ও_ও শুনছে না আমাকে!”
তামিজ শিকদার যেনো বাকশক্তি হারালেন। শরীর অবশ।প্রায় কিছুক্ষণ পর ছুটে এসে আচানক মেয়েকে বুকে তুলে ঝাপ্টে ধরলেন তামিজ।ঝরঝর চোখের পানি ছেড়ে আর্তনাদী গলায় চিৎকার দিয়ে উঠল,
“ আম্ম.. আম্মা রে!আব্বা আসছে দ্যাখ।চোখ খুল না-রে আম্মা! তোকে খুঁজে পেতে বড্ড দেরী করে ফেলেছি তাই অভিমান হয়েছে আম্মা?আম্মা এই দ্যাখো কানে ধরেছে আব্বু; চোখ খোলো। তোমার আম্মুকে কী জবাব দেবো আমি?কথা দিয়ে এসেছি তোমায় সুস্থ শরীরে তাকে ফেরত দেবো। এভাবে বেইমান বানিয়ে দেবে আমায়!আম্মা.. ও আম্মা!”
“ আম্মা তোমায় কে ব্যথা দিছে বলো?ওই জা/নোয়ার কু/ত্তার বাচ্চাদের শাস্তি আমি দেবো। তোমার আব্বু এখনো বেঁচে আছে।ও_মা চোখটা খোলো না!”
মাহির চোখের পানি মুছে দ্রুত এগিয়ে গেলো নিকটে।আহত নজরে সুখের মুখশ্রী দেখে ঠোঁট কামড়ে অন্যত্র নজর সরিয়ে নিলো। শান্ত দীঘির মতো নিরব সুখকে দেখে তারও যেখানে বুক ফাটছে, সেখানে সুখের আপনজনদের কেমন অনুভূতি হবে?
বহু কষ্টে মাহির উচ্চারণ করলো,
“ প্লিজ স্যার আগে হসপিটাল চলুন।নয়তো দেরী হবে যাবে!”
#চলবে🖤
[আমিও বাকরুদ্ধ 🥹💔]

