#আমার_বোবাফুল(৩১)
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরা
ছিমছাম গড়নের কোমল শরীরে ছোট বড় জখমের পাশাপাশি পুরুষালী নখের আঁচড়ের দাগ পাওয়া যায়;হাতে,বাহুতে,ঘাড়ে। অর্থাৎ সে”ক্সু”য়াল হ্যারা/সমেন্ট পেয়েছে খানিক। অতঃপর? ধারনা করা যায়,নিজেদের কার্য হাসিল করার লক্ষ্যে থার্ড ফ্লোরে সুখকে অবরুদ্ধ করেছিল তারা।স্বীয় সম্ভ্রম রক্ষার্থে ভীতু হৃদয়ের সুখ সকল বাঁধা ছিন্ন করে, জানের ভয় উড়িয়ে সেই ছাদ থেকেই নিচে ঝাঁপ দিয়েছে।
রুবাইয়্যাতের ক্রন্দন থমকে গেলো এমন স্তব্ধ মিশ্রিত সু-সংবাদে।চোখ ভেজা,তবু কাঁদে না আর।বুকের ভেতরটা গুমোট হাহাকারে খাঁক হয়ে আছে,তাও ঠোঁটে একচিলতে হাসি ফুটলো।তার মেয়ে শু/য়োরের লুলুপ আগ্রাসন পায়ে পিষে নিজেকে পবিত্র রাখতে পেরেছে।এই শিক্ষাটা তো সে-ই দিয়ে এসেছে –যখন থেকে সুখ বাহিরের জগৎ-কে বুঝতে শিখেছে। একজন নারীর কাছে অমূল্য সম্পদ হলো তার ‘সম্ভ্রম’!প্রয়োজনে প্রাণ’টা উৎসর্গ করে দেবে,তাও যেনো নিজের পবিত্রতা না খোয়া যায়!এই উপায় বেঁচে না নিলে হয়তো সুখকে ছিঁড়ে খেতো ওই জা/নোয়ার গুলো।
ধফ করে বেঞ্চে বসে পড়েন রুবাইয়্যাত।ঠিক বসে পড়লেন নাকি ভারসাম্য হারিয়েছেন বোঝা গেলো না।চট করে নজর নামাতেই একফোঁটা অশ্রু বেয়ে পড়ে।তার ঘরের সুখপাখি দেয়ালের ওপাশে নিরুত্তাপ পড়ে আছে। দম ভরে নিঃশ্বাস টাও টানতে পারছে না।শরীরে এতো এতো র-ক্তাভ কালচে ক্ষত – রুবাইয়্যাতের শ্বাস আটকে বুকের পাঁজরটা ভেঙে আসছিল দুমড়ে-মুচড়ে!মেয়েটা এতো নির্বিকার কেনো?তার ব্যাথা অনুভত হচ্ছে না? যন্ত্রণা?
সুখের কাছে কাউকে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি ডক্টর।মাহিরকে দিয়ে বহু কষ্টে রুবাইয়্যাতকে আযাদ শিকদারের ফ্ল্যাটে পাঠিয়ে দিলেন তামিজ।
বর্ণ আর তামিজ শিকদার গেলেন ডঃ মেহরাবের চেম্বারে। মেহরাব তাদের অপেক্ষাতেই ছিল। কম্পিউটারে পরপর দুটো ছবি দেখালো।একটা র-ক্তক্ষরিত লিভার এবং হেড! ডঃ মেহরাব জানালো —খুব উঁচু থেকে মাটিতে অপরিকল্পিত ভাবে ছিটকে পড়ায় লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; ইন্টার্নাল ব্লিডিং হয়েছে প্রচুর পরিমাণে।যার ফলে হেমোরেজিক শক নামের একটি অবস্থার উন্মোচন হয়েছে। হৃৎপিণ্ড যথাযথ র-ক্ত পাম্প করতে ব্যর্থ।ফলে শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন পৌঁছুতে পারছে না। তাছাড়া হেড ইনজুরিও দেখা যাচ্ছে।
বর্ণ দাঁতে দাঁত পিষে পাথর অনুরূপ চোয়ালে চেয়ারের হাতল শক্ত করে চেপে ধরলো।পারলে এখনি গুঁড়িয়ে দেবে সেটা।মনে মনে অনেক কিছু প্রতিজ্ঞা নিচ্ছিলো সে।মেহরাব কথার ফাঁকে একবার চোখ তুলে নিশ্চুপ অথচ বিক্ষিপ্ত বর্ণকে দেখলো।তামিজ শিকদার ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলেন। রক্তশূন্য চাহনি। ডঃ পুণরায় বললো গম্ভীর গলায়,
“ প্রায়শই এমন কন্ডিশনে খুব দ্রুত-তই শরীরের অরগান-গুলো ফেইল করতে থাকে।ব্রেইনেও ইফেক্ট পড়তে পারে!”
শূণ্য কাতর চোখে একবার বর্ণ’র দিকে চাইলো তামিজ। কন্ঠ কেঁপে উঠলো,
“ আমার মেয়ে কবে সুস্থ হয়ে উঠবে ডক্টর?ঠিক আগের মতো!”
“ তিনি এখন যেই অবস্থায় আছে তাকে বলা হয় কোমা!”
বর্ণ’র নিষ্প্রভ অথচ কঠিন দৃষ্টি ছিল অদৃশ্যে।ডান হাতের তর্জনী আর মধ্যমায় বৃদ্ধা আঙুল ঘঁষে একধ্যানে কীসব ভাবনায় মত্ত ছিল।‘কোমা’ –শব্দ শুনে চট করে চোখ তুললো চোখ কুঁচকে। যে কাউকে বিব্রত করতে পারে সেই দৃষ্টি। মেহরাবের প্রতিক্রিয়ায় তেমন বিব্রতবোধ পরিলক্ষিত হলোনা অবশ্য।বর্ণ অল্প আওয়াজে জানতে চায়,
“ চোখ মেলবে কখন?”
“ হতে পারে কিছু দিন, কিছু সপ্তাহ,মাস,বছর অথবা বছরের পর বছর.. হো নোজ!”
_
“ আজও ভোররাতে বেরিয়েছিলি?”
মায়রা’র হতাশ স্বর। চোখে মুখে স্পষ্ট অসন্তোষ।মেহরাবের পা জোড়া থামলো।ঘড়িতে সময় দেখে নিলো একবার –সকাল ৯টা!পাশে ঘাড় ঘুরিয়ে চায় মেহরাব। অতঃপর এগিয়ে যায় মৃদু হেসে।মায়রাকে একহাতে জড়িয়ে সোফার দিকে কদম বাড়িয়ে বললো,
“ আপু.. তোমার ভাই যেই প্রফেশনে আছে তাতে এমন হতেই থাকে।
সাফাই গাওয়ার মতো বলে,
“একজন ক্রিটিক্যাল পেশেন্ট এসেছে হসপিটাল।তার ডক্টর অন্য হসপিটালে আটকা পড়েছিল,আমি…
“ থাক আর বলতে হবে না।শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা প্রায়।নিজের যত্ন না নিয়ে সবসময় পেশেন্ট নিয়ে কেনো ভাবতে হবে?”
মেহরাব হাসলো। সত্যিই কী নিজের যত্নে অবহেলা করে সে? বিশেষ করে ঘুমের ব্যাপারে। পেশেন্টদের সুস্থতায় দিনে আট ঘন্টা ঘুমানোর পরামর্শ দিলেও সে নিজেই বোধহয় গত কয়দিন ধরে এই নিয়মে বড্ড হেলাফেলা করছে।মায়রার ঠিক এই জায়গাতেই সমস্যা।মেহরাব জানতে চাইলো,
“ মিরাভ কোথায়?”
“ জানিনা!”
চট করে বিতৃষ্ণা গলায় প্রত্যুত্তর করে মায়রা।মেহরাব তেরছা চোখে চাইতেই নড়েচড়ে উঠে মুখ বাঁকিয়ে বললো,
“ তোর গলার আওয়াজ পেয়েছে না এতোক্ষণে?এখুনি সুড়সুড় বেরিয়ে আসবে!”
কথা শেষ হবার পরপরই ড্রয়িং রুমের ডানে অবস্থিত মায়রার শোবার ঘর থেকে গুটিগুটি পায়ে বেরিয়ে এলো ছোট্ট একটি মানুষ। চোখ দুটো চিকচিক করছে। ঠোঁট জুড়ে প্রাণবন্ত খুশির ঝিলিক। একরাশি উচ্ছাস নিয়ে আধভাঙা স্বরে সে বলছে বারবার,
“ মা_ম্মা.. মা_ম্মা”
মেহরাব উঠে কোলে তুলে নিলো ছোট দেহটি।বুকে বন্দিনী করে নরম কোমল গালে ঠোঁট দাবিয়ে আদর করে দেয়,
“ মাই প্রিন্সেস,কিউটি পাই..!”
.
অবজারভেশনে রাখা হয়েছে সুখকে। রুবাইয়্যাত পুণরায় এলেন হসপিটালে।দূর থেকে একবার সুখকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন খুব অনুরোধ করার ফলে।মুখে অক্সিজেন মাস্ক,হাতে কীসব তারের মতো লাগিয়ে রেখেছে। চারপাশে নাম না জানা কতো রকমের যন্ত্রপাতি। এদের ভেতরে হার্টবিটের রেখা উঠাচলার যন্ত্রটাকেই চেনা চেনা মনে হচ্ছিল কেবল।এসবের মাঝে সুখ কতো আরামে ঘুমিয়ে আছে। নড়চড় নেই কোন,এতো আঘাতেও কোন বেদনা নেই অথচ সামান্য কাঁটা বিঁধলেও ছোট্ট সুখ ঠোঁট ভেঙে কেঁদে ফেলতো।আম্মু,আব্বুর ঠোঁটের আদুরে ছোঁয়া পেতে বারে বারে ওই ক্ষতস্থানটা চোখের সামনে তুলে ধরতো।আজ সুখ এক সমুদ্র ব্যাথা নিয়েও এতো নিশ্চুপ? কেনো?ওই জা/নোয়ার গুলোর হাত থেকে সঠিক সময়ে রক্ষা করতে পারেনি বলে অভিমানের পাল্লা ভীষণ ভারী হয়েছে কী? রুবাইয়্যাতের কান্না আসতে চায় বুক ভেঙে কিন্তু কাঁদল না। ডঃ আঁচল ঠিকই বলেছে,—সে একজন সাহসী মেয়ের জননী।তাকে শক্ত থাকতে হবে।মেয়েকে আরো আরো সাহস জোগাতে হবে।যেনো মৃত্যুর সাথে লড়ে পুণরায় তাদের বুকে ফিরে আসতে পারে। কিন্তু…
লড়াই তো মানুষের সাথে করা যায়! ভাগ্যের সাথে না!ভাগ্য কী এবারের মতো সহায় হবে?
কেবিন নেওয়া হয়েছে। রুবাইয়্যাত জায়নামাজে বসে নফল নামাজ আদায় করে মোনাজাতে খুব কাঁদল।রবের কাছে মেয়েকে ভিক্ষা চেয়ে নিলো।তাকে এখনো কোমার ব্যাপারে জানায়নি তামিজ।
কাল দুপুর থেকে কিছু মুখে তুলা হয়নি।পেট চিরচির করছে কিন্তু মুখে কিছু গুঁজার রুচি বোধ নেয়।মাহির রেস্তোরাঁ থেকে তিনটে প্যাকেট এনে দিয়েছে।খুলেও দেখা হয়নি কী আছে ওতে
। তিনি খাবেন না।মেয়েটাও তো উপোস।তারও খিদে পেয়েছে নিশ্চয়ই?বলার সামর্থ্য নেই বিধায় মুখ বুজে চুপচাপ পড়ে আছে হসপিটালের পাতানো বেডে।
সাথে সাইমা,তুহফাও এসেছিল।অভ্র বাহিরে। দু’জনকে খেয়ে নিতে বললেন রুবাইয়্যাত।
.
“ কিছু জানার আছে আমার!”
তামিজ শিকদারের মুখটা দেখে মায়া লাগবে যেকারো।মনে হচ্ছে কয়েকঘণ্টার ব্যবধানে ভদ্রলোক অনেক শুকিয়ে গেছেন। আসলেই শুকিয়েছেন নাকি মেয়ের শোকে মুখশ্রী ফ্যাকাশে হয়ে আছে বলে এমন দেখাচ্ছে বলা যায় না সঠিক। বর্ণ’র দিকে চাইলেন অনূভুতি শূন্য চোখে। ছেলেটাকে আজ ভোররাতেও বিধ্বস্তের মতো লাগছিল।তবে বিগত কয়েক ঘণ্টা যাবৎ মুখের ভাবটা অদ্ভুত হিংস্র হিংস্র দেখাচ্ছে। চোয়াল কঠোর, দৃষ্টি ক্ষুরধার। টগবগে মস্তিষ্ক ।এই যেমন খানিক আগে একটা অভ্র’র বয়সী ছেলে এলো।বর্ণ তখন করিডোরের শেষ প্রান্তে জানালার নিকটে দাঁড়িয়েছিল।ছেলেটা এলো সহাস্যে। রকস্টার বর্ণকে এতো কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়ে একটা সেল্পি নেওয়ার আবদার রেখেছিল কেবল।বর্ণ এমন স্ফুলিঙ্গ উতলে পড়া চোখে তাকালো,মনে হয় তখুনি ভষ্ম করে দিবে সব।তামিজ শিকদার তা’র প্রতিক্রিয়া দেখে কিছু একটা আন্দাজ করেছিলেন। আগ্রাসী হাতে ছেলেটার গলায় নয়তো কলারে হাত চালানোর আগে বর্ণ’র হাত আটকে ধরে ছেলেটাকে যেভাবে এসেছিল সেভাবে পাঠিয়ে দিয়েছেন তিনি।
“ থানা থেকে ফোন করেছিল অফিসার!”
“ কী বলছে তারা?”
ছোট করে জানতে চায় বর্ণ। ফোঁস ফোঁস শ্বাস ফেলছেন ভদ্রলোক। বোধ হয় মেজাজ ক্ষিপ্র হচ্ছে।নিরুপায় হয়ে মেয়েকে খুঁজে বের করতে তাদের মুখাপেক্ষী হয়েছিলেন তিনি কিন্তু এরা..?কথায় বলে না,যার হারায় সেই বুঝে!তারা হাল ছেড়ে দিলো অল্পতেই।উনার দুঃখ, ভঙ্গুর অবস্থা তাদের ছুঁতে পারেনি।পরে বর্ণ পেয়েছিল সুখের ঠিকানা। কিন্তু কীভাবে?
“ এসব কী চাচ্চু?ফুলের এই অবস্থার সাথে তোমার কোন যোগসূত্র আছে.. আই মিন ঠু স্যে– আগে কোন আঁচ পেয়েছিলে?”
তামিজ শিকদার মনে পড়ার মতো করে উপর নিচ মাথা ঝাঁকিয়ে ফোন বের করলেন নিজের। কোম্পানি সাড়ে তিন কোটি টাকার ডিলে আবদ্ধ হয়েছিলেন কয়েকদিন আগে। এরআগে থেকে একটা আননোন নাম্বার বারে বারে ফোনে হুমকি দিয়ে যাচ্ছিল ডিল ক্যান্সেল করতে।নয়তো যে কোনো সময় যা কিছু ঘটিয়ে দিতে পারে। তিনি সেসব আমলে নেননি।গত ছয়দিন পর্যন্ত অপর পক্ষ থেকে কোন আভাস না পেয়ে ভেবে নিয়েছেন হয়তো সে অথবা তারা হাল ছেড়ে দিয়েছে। ভদ্রলোক হঠাৎ চমকে তাকালেন।গা শিরশির করে উঠলো যেনো।
“ বর্ণ.. ও_ও কাল এমএমএস পাঠিয়েছিল আমায়।আম্মার কলেজ থেকে বের হওয়ার ভিডিও দেখিয়েছে।আমি আমি এখনই দেখছি এটা।কাল কেনো দেখলাম না..
হতাশায় চুল টেনে ঠোঁট কামড়ে চোখ বন্ধ করে নিলেন ভদ্রলোক।গা দুলে উঠছে থরথর।এটা কাল চোখে পড়লে হয়তো আজ সুখকে এমন পরিস্থিতিতে থমকে যেতে হতো না।সব দোষ তারই!
ভিডিও-তে সুখ কাঁধে বেগ চেপে কলেজের ফটক থেকে বের হচ্ছিল।ডাকার আগেই একটা টেক্সি তার সামনে এসে থামলো। এরপর সে চড়ে বসতেই ছুটে চলে গেলো।
ভিডিও-র সাথে একটা মেসেজ।
“ মানা করেছিলাম শুনিসনি!তোলে নিয়ে যাই তোর আদরের দুলালি মেয়েকে?এতে আমার একটা সুবিধা হবে জানিস?মুখে কাপড় বাঁধতে হবে মেয়েটার! বেচারি বাঁচাও বাঁচাও বলে সাহায্যটাও চাইতেও পারবে না।কী করুন দৃশ্য!আফসোস বাট ইন্টারেস্টিং! এবার মজা আসবে”
লেখাগুলো গভীর মনোযোগে ছ’য়ের অধিক বার পড়লো বর্ণ। প্রতিবার পড়ার সাথে সাথে ধীরে ধীরে মুখশ্রী রঙ পাল্টাচ্ছিলো কঠোর থেকে নিষ্ঠুরতায়। কপালের দুপাশের শিরা ফেঁপে উঠছে ক্রমশ; ধপধপ করছে!একসময় কপালে হাত রাখলো বর্ণ। স্লাইড করতে করতে ভীতি জাগানিয়া স্বরে হিসহিসিয়ে বলে ধীর গলায়,
“ পিপীলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে!”
#চলবে🥀
[ পাখা গজানো পিপীলিকার কামড় কিন্তু সারাজীবন মনে রাখার মতো নির্দয় হয়। যাহোক ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন!❤️🖤]
–ইচ্ছে হলে গ্রুপ ট্রুপে জয়েন হতে পারেন🫰
https://facebook.com/groups/1742671159995086/?mibextid=rS40aB7S9Ucbxw6v

