আমার_বোবাফুল(৩৭/২) #তৃপ্তি_এহসান_নাওরা

0
61

#আমার_বোবাফুল(৩৭/২)
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরা

|৩৭– শেষার্ধ|
“ বাবার ভরসা’য় জল ঢেলে পঞ্চম সন্তানটাও ছেলের পরিবর্তে মেয়ে হয়ে জন্মালাম।কী অসম্মান জনক ব্যাপার স্যাপার!একটা নয় দুটো নয় পাঁচ পাঁচটি কন্যা সন্তান কোন বাবার ঘরে হতে আছে? কন্যা সন্তানের বাবা পরিচয় দিতে গেলেও সমাজের সামনে মাথা হেঁট!
অসন্তুষ্ট বাবা একদিন সুযোগ বুঝে মায়ের অগোচরে আশ্রমে দিয়ে এলেন আমায়।সেখানেই বড় হতে লাগলাম। আশ্রমের পরিচালিকা মাতা স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়। ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট ছিলাম।ক্লাস ফাইভে, তারপর এইটে, এরপর মাধ্যমিকেও বৃত্তি পেয়েছি। ফলস্বরূপ আমার পড়ালেখার খরচ আশ্রমকে বহন করতে হয়নি কখনো। ওনার্স সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি তখন।দু তিনটে টিউশনি করে বেশ আয়েশি জীবন চালাতে পারি।গরিবী আমার কোনকালেই পছন্দ ছিল না।যা আয় করতাম তার কিছু ভাগ আশ্রমে দিয়ে বাকিটায় সাধ্যমত টোকা মেরে চলতাম একপ্রকার। আমার অবস্থান কোথায়,কোন পরিবেশে আছি, কোথায় বেড়ে উঠেছি ধ্যানে নেইনি কোনদিন। আশ্রমে প্রায়শই একজন ভদ্রলোক আসতেন সাহায্যের খাতিরে।সবাই তাকে ‘সাহেব’ নামেই জানতো।

সাইমা স্মিত হেসে থামলো হঠাৎ করে। চোখের পানি মুছে অন্যত্র চেয়ে বুক ভরে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। ভারাক্রান্ত মনে রুবাইয়্যাত নির্বাক চেয়ে শুনছে সব।কোন প্রশ্ন করে না মাঝপথে।বর্ণ দুহাত পিছু নিয়ে পিঠে ভাঁজ করা সটান বুকে দাম্ভিকতার সাথে দাঁড়িয়ে আছে।একদৃষ্ট নজর সম্পূর্ণ ঘুমন্ত সুখের ফ্যাকাশে মুখশ্রীতে। আশেপাশের এতো সবে তার আগ্রহ নেই বললেই চলে।

“ আমি তখন যথেষ্ট সুন্দরী।পুরো আশ্রমেও এই নিয়ে বেশ নামডাক ছিল। হঠাৎ একদিন সাহেব বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসলেন।কতো বিষ্ময়কর ঘটনা!এতো উচ্চস্তরের লোক হয়ে আশ্রমের এক সামান্য মেয়েকে পছন্দ করে বিয়ে করার ইচ্ছে পোষণ করেছেন!মাতা অবশ্য অবাক হলেন না।হয়তো আগে থেকেই আন্দাজ ছিল –এমন কিছু একটা হবেই। সাহেবের প্রস্তাব গ্রহণ-নাকচ এর সিদ্ধান্ত আমার উপরই এলো।উচ্চাকাঙ্ক্ষা তো ছিল মনে মনে তবে, লোভী ছিলাম না। কিন্তু সেদিন বিলাসবহুল জীবন যাপন করার কল্পনা করে মনটা লোভী হয়ে উঠলো।রাজিও হয়ে গেলাম।
বিয়ে হলো। পরে জানতে পারলাম বিয়েটা কেবল সাহেবের পছন্দতেই হয়েছে। পরিবারের কেউ রাজি ছিলেন না। শুরু হলো মানসিক টর্চার। শাশুড়ি মা, দেবর উঠতে বসতে অপমান করতেন আশ্রমের মেয়ে বলে। অবশ্য ননদ একটু রহম দিল ছিল।সে তেমন কিছু বলতো না।আমি সবার করা অপমান ভুলে গায়ে মেখে নিতাম সাহেবের অসীম ভালোবাসায়। বাড়ির সকলে আবার সাহেবকে খুব মানে।উনার সামনে কেউ চোখটাও অব্দি রাঙায়নি।তাই আমিও তাদের ভেতরের কুৎসিত রূপের ব্যাখা কখনো সাহেবের সামনে তুলে ধরিনি। ইচ্ছে ছিল না এমন কিন্তু নয়! সাহেবকে সবকিছু জানাবো এমন মনস্থির করার পর হঠাৎ মনে হলো –উনারা তো শুকনো জমিতেই লাফাচ্ছেন। সাহেবের সামনে গেলে সবাই ঠিকি আমাকে সীমিহ করে।এতেই আমার জয়।

“ বিয়ের দুবছরের মাথায় কনসিভ করি। দু’জনের কতো স্বপ্ন, কতো আকাঙ্ক্ষা। কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর একদিন রাতে সাহেব ঘুমের ঘোরে কেমন ছটফট করছিলেন।আমি ভয় পেয়ে গেলাম।রাতের বেলা।সবাই তখন ঘুমন্ত। সাহেবের ছটফট বেড়েই চলেছে ক্রমশ।কথা বলতে পারছিলেন না, তবে ইশারায় কিছু একটা বুঝাতে চাইছেন। কিন্তু আমি আজো বুঝতে পারিনি সেই ইশারার ব্যাখা। সেদিন দেবর, শাশুড়ির দরজা ধাক্কালাম অনেক। আমার শশুর নেই।এক সময় তারা অতিষ্ঠ হয়ে বেরিয়ে এলো। সাহেবের অবস্থা দেখে হসপিটালে ছুটলো তাড়াহুড়োয়।”

চোখ বুজে সাইমা। গড়িয়ে পড়ে অশ্রু। শরীরে লোমকূপ সিধে হয়ে উঠেছে। রুবাইয়্যাত অবচেতনেই হঠাৎ কৌতুহল দেখায়,

“ তারপর? তোমার সাহেব এখন কোথায়?”

শুষ্ক ঠোঁটে হেসে সাইমা জবাব করে,
“ তিনি আর নেই। হসপিটালে নিয়ে যাওয়ার তেরো মিনিট পরেই মৃ!ত্যুকে বরণ করে নেন। ক্ষণিকের ব্যবধানে আমার শেষ আশ্রয়স্থল চলে গেলো পরপারে। অথচ ঘন্টা খানেক আগেও যিনি হাসিখুশি ছিলেন।চোখ ভরা স্বপ্ন –বাবা হবেন, আঙুল আঁকড়ে বাচ্চাকে হাঁটা শেখাবেন। নিমেষেই সব মিথ্যা হয়ে গেলো।

শশুর বাড়িতে এতো দিন কথা শুনাতো শুধু, সাহেবের মৃ!ত্যুর পর গায়ে হাত তুলতেও দ্বিধাবোধ করে না।আমিও নিয়তিকে মেনে নিলাম। স্বামীর শেষ স্মৃতি হিসেবে পেটে যেই ছোট্ট প্রাণ বেড়ে উঠছে তাকে নিয়ে আমাদের রুমটায় আশ্রয় চেয়েছিলাম শুধু। কোন টাকা কড়ি চাইনা।তারা মানলো না।ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিলো চিরতরে। আমার অনাগত সন্তানকেও তারা গ্রহণ করবে না।”

“ আশ্রম ছাড়া অন্য কোথাও ঠাঁই নেওয়ার জায়গা ছিল না। সেখানেই গেলাম। শশুর বাড়ি ছেড়ে বাবার বাড়ি উঠলেও কদিন যেতে না যেতেই যেখানে স্বয়ং বাবা মাও আড়চোখে চেয়ে অসন্তোষের শ্বাস ফেলে, সেখানে আশ্রম তো…
আমায় পড়ালেখা করিয়ে যথেষ্ট শিক্ষিত বানিয়ে বিয়েও দিয়ে দিয়েছে। ওখানেই তাদের দায়িত্ব শেষ।মাতা ‘র কাছে সময় চেয়ে নিলাম ডেলিভারি ডেট পর্যন্ত।

“ চাঁদের টুকরোর মতো একটা মেয়ে হলো আমার। সৃষ্টিকর্তা বুঝি নিজের হাতে খুব যত্নে বানিয়েছেন। কিন্তু আমি সন্তুষ্ট হতে পারছিলাম না।বাবা নামক বটবৃক্ষের ছায়া যার মাথার উপর নেই।সে সুন্দর হলেই বা কী!সবাই তাকে ঠিকই এতিম বলেই জানবে!সমাজ তাকে হেও করবে।ধারনা করতে পারছিলাম, আমি যেই জীবন পার করে এসেছি তাকেও সেটার সাধ গ্রহণ করতে হবে অল্পবিস্তর।

“ একদিন হসপিটাল থেকে বেরোনোর সময় একটা ভদ্রমহিলার সাথে ধাক্কা লেগে পড়ে যেতে গিয়েও সামলে নিলাম। অবাকই হলাম বটে। অশ্রুসিক্ত চোখে মহিলা উম্মাদের মতো আচরণ করছিলেন “ আমার সোনা বাচ্চা, আমার সন্তানকে এনে দাও” –এমনি বিলাপ বকছিল আর সামনে কোন ছোট বাচ্চা দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। বুকে ঝাপ্টে ধরে চুমুর পর চুমু আঁকছিল।উনাকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে একজন ভদ্রলোক।একসময় জ্ঞান হারিয়ে যান আর ভদ্রলোক উনাকে নিয়ে গাড়িতে উঠে নিয়ে চলে গেলেন। দেখতে যথেষ্ট উচ্চবিত্ত ঘরের মনে হলো তাদের।আমি উনাদের পিছু নিলাম।একটা শিশু পার্কে নামলেন তারা। এতোক্ষণ যেই ভদ্রমহিলা পাগলামি করছিলেন ছোট ছোট বাচ্চাদের সান্নিধ্য পেলেই তিনি হয়ে উঠেন ভদ্র,সভ্য শান্ত দীঘির মতো।

“ হসপিটালে একজন পেশেন্টের ডিটেইলস অন্যজনকে দেয় না।আমি ডক্টরের হাতে পায়ে ধরে জানতে পারলাম – দীর্ঘ পাঁচ বছর পর ভদ্রমহিলা বহু ডক্টরের নানা চিকিৎসা সেবার পর সন্তান সম্ভাবা হয়েছিলেন।তাও মিসক্যারিজ। জরায়ুতে টিউমার।তাই চিকিৎসার খাতিরে আর জীবন বাঁচাতে জরায়ু নিয়ে ফেলা হয়েছে।আর কখনো মা হতেও পারবেন না।”

রুবাইয়্যাত ঠোঁট কামড়ে ছলছল চোখে অন্যদিকে নজর ঘুরিয়ে নেয়।কিছু মিলে যাচ্ছে তার সাথে।সাইমা তখনো মেঝেতে বসা।চোখের কোণে রুবাইয়্যাতকে লক্ষ্য করে বলে গেলো,

“ মেয়েকে সুন্দর, সুস্থ জীবন উপহার দেওয়ার ছিল আমার।বেশ কয়েকদিন উনাদের নজরে রেখে, একদিন…
আমার নাড়ি ছেঁড়া ধনকে তাদের গাড়ির পেছনের সিটে রেখে একটু আড়ালে গিয়ে দাড়ালাম। পার্ক থেকে ফিরে ছোট এক নিশ্চুপ বাচ্চার অস্তিত্ব পেয়ে ভদ্রমহিলা উতলা হয়ে উঠেন আনমনেই।একা বাচ্চা দেখে উনার চোখের মণি এমন ভাবে দ্যুতি ছাড়াচ্ছিল যেন হাত বাড়িয়ে চাঁদ ছুঁতে পেরেছেন। নিশ্চিন্ত হলাম আমার মেয়ের আদরে কমতি পড়বে না। অবহেলা তাকে কখনো গ্রাস করতে পারবে না।ভদ্রমহিলার প্রাণ হয়েই সে বেড়ে উঠবে আমাকে ছেড়ে।আর সেই মহিলাটিই ছিলেন আপনি ছোট ভাবী”

থমকে যাওয়া চোখে বেফাঁস চেয়ে রয় রুবাইয়্যাত। পুরোনো কিছু স্মৃতি চোখের তারায় হানা দেয়। বৈবাহিক জীবনের দীর্ঘ পাঁচ বছর পর মাতৃত্ব সাধ গ্রহণের সুযোগ পেয়েও যখন পুণরায় হারিয়ে গেল, -পাগল প্রায় হয়ে পড়েছিলেন তিনি। কারো কোলে বাচ্চা দেখলেই ‘ ও আমার বাচ্চা,তুমি নিলে কেনো?’ বলে কেড়ে নিতো। বেহিসেবি কতো শত উম্মাদনা। হঠাৎ একদিন তাদের সংসারে সুখ পাখির মতো উড়ে এসেছিল সুখ। রুবাইয়্যাত জানতে চায়নি ‘সে কে?’ ‘ কী তার পরিচয়!’ জানার চেষ্টাও কখনো করেনি।

সাইমা বলে যায় একমনে,
“ আমার,আমাদের ভালোবাসার শেষ চিহ্নকে দূরে রেখে দিন পার হচ্ছিল না। নিজেকে নিকৃষ্ট মা মনে হচ্ছিল তখন। কিন্তু ততক্ষণে আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞা বদ্ধ হয়ে গেছি তাকে আমার কাছে রাখবো না।সে কিছুই পাবে না আমার কাছে বড় হলে।না পারবে চাহিদা পূরণ করতে, না পারবে সমাজে মাথা উঁচিয়ে চলতে।মা হয়ে প্রতিনিয়ত মেয়ের মনোবল ভাঙছে কল্পনা করলেই যেখানে সবকিছুর প্রতি বিতৃষ্ণা চলে আসে। স্বচক্ষে কীভাবে দেখতাম?”

জড়তাহীন শুদ্ধ বাংলায় এক নাগাড়ে কথাগুলো বলছে সাইমা। ইতোপূর্বে তার মুখে এমন নির্ভুল বাক্য কখনো শোনা যায়নি।

“ খালাম্মা (হানিফা বেগম) গ্রাম্য সাদাসিধে একজন বুয়ার তালাশ করেছিলেন।যে বাড়ির প্রয়োজনীয় সব কাজ করবে, শিকদার নিবাসেই খাবে-দাবে, থাকার ব্যবস্থাও আছে।শর্ত একটাই –মেয়ে গ্রামীণ হওয়া চাই।মেয়ের কাছাকাছি থাকার এই সুযোগ। আমার সামনে কেবল আমার মেয়ে।আর কোন পিছুটান ছিল না। সার্টিফিকেট, সব দামী কাপড় চোপড়ে আগুনে জ্বালিয়ে গায়ে জড়ালাম তেনা কম দামী শাড়ি। অথচ এমন বাজে রকমের সুন্দর শাড়ি দেখলে একসময় নাক সিঁটকাতাম। শিকদার বাড়ি পা রাখার পর মূহুর্তে থেকে অর্জিত জ্ঞান সব পিছনে ছেড়েছুড়ে ,বনে গেলাম নিরক্ষর,অজ্ঞ,গ্রামের ক্ষ্যাত।শার্মিলি থেকে সাইমা।নামের পাশে পদবী যোগ হলো –’বুয়া’!” সেই থেকে ঊনিশটি বছর ধরে পড়ে আছি শিকদার নিবাসে।

রুবাইয়্যাত ধীর পায়ে সাইমার কাছাকাছি এসে মুখোমুখি হয়ে বসে পড়ল আচমকা। অমূল্য কিছু হারানোর ভয় জেঁকে বসেছে মনে।নেত্রকোণ ভেজা। নিষ্প্রাণ গলায় জোর দিয়ে বললো,

“ সেদিনও স্বার্থপর ছিলাম।একবারের জন্যও জানতে চাইনি ‘কে সে?’!তাকে ছেড়ে তার মায়ের মনের ভাঙন কেমন বর্ণ ধারণ করেছে –পোড়া কয়লা নাকি স্তব্ধ মাটি! অবশ্য মা-তো স্বেচ্ছায় আমাকে নতুন করে বাঁচতে তাকে আমার কাছে শপে দিয়েছিল।আজ আবার স্বার্থপরের মতো বলছি –ও আমার মেয়ে।
বুকের দিকে আঙুলের ইশারা করে বললো, “ এখানে চেপে ধরে লালন করেছি তাকে।চলে যাও আমাদের ছেড়ে। অনেক দূরে। তোমায় কোন দুঃখ করতে হবে না।আমি চালাবো তোমাকে। মাসের শেষে একাউন্টে টাকা পৌঁছে যাবে। অভাবের ছায়াও পড়বে না।”

রুবাইয়্যাত অশ্রুসিক্ত চোখে হাত জোড় করে ধরে আছে। ঠোঁট কামড়ে আছে, রুদ্ধ শ্বাস-তাও অশ্রু কণা গড়িয়ে পড়ে। বুকটায় প্রচুর ব্যাথা হচ্ছে।উনার জোড় হাতদুটো নিজের মুঠোয় পুরে হুঁ হুঁ কেঁদে উঠলো সাইমা।

“ স্বার্থপরতার এ-কোন পর্যায়?আমি কখনো মা হিসেবে ওর সামনে দাঁড়াবো না।তবু..

“ ঊনিশটি বছর চরম সত্যিটা নিজের কাছে পুশে রেখে আজ যেমন বাধ্য হয়ে আমার কাছে স্বীকার করলে।হয়তো এমন একদিন এলো সুখের সামনেও বলে ফেললে কথাটি।ও এটা সহ্য করতে পারবে না।আর সত্যিটা ওর সামনে প্রকাশ পেলে আমি শান্তিতে মরতে পারবো না।ও আমৃত্যু এটাই জানবে যে –‘তামিজ শিকদার এবং জাহানারা রুবাইয়্যাতের একমাত্র মেয়ে ফারিস্তা সুবহান সুখ! অনুরোধ করছি চ্_চলে যাও দয়া করে”

দুজন মা মুখোমুখি বসা।তারা উভয়েই কাঁদছে।বর্ণ তাকালো হঠাৎ করে।সেসময় সাইমাও চায় করুন চোখে। দৃষ্টিতে একটা আকুতি ছিল।হয়তো বর্ণ যেনো রুবাইয়্যাতকে বুঝায় –“তাকে যেনো শিকদার বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে না বলে।”
সে শুধু সুখের নয়,বাড়ির প্রতিটি মানুষ-জন,ইট- পাথরেরও মায়ায় পড়ে গেছে। দূরে সরে যাওয়ার কথা ভাবনায় আনতেও বুকের ভেতরটা বড্ড পুড়ছে।
.
রাতের শেষ প্রহরের দিকে বর্ণ একা এলো সুখের কাছে। দরজা চাপিয়ে দেয়।টুল টেনে বসে অনেক্ষণ চেয়ে রইল অনিমেষ। হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে সুখের মাথার পাশে বাঁ হাত রেখে ভর করে কিঞ্চিৎ ঝুঁকে গেলো।নিজে থেকেই বললো,

“ মনে হয় তোকে অনেক-কাল চোখ খুলতে দেখিনা।আর কতো ঘুমাবি,এবার অন্তত উঠ?’

অন্যরকম কাতর শোনায় তার পরবর্তী স্বর,
“ দ্যাখ আমিও কাঁদছি।নাহ,আমি নই; অনিয়ন্ত্রিত হৃদয় কাঁদছে বোধহয়। সঠিক ধরতে পারছি না কিন্তু পাঁজরটাতে প্রচন্ড ব্যথা অনুভূত হচ্ছে জানিস?

“ নিজেকে নিয়ে সাফাই গাওয়ার অভ্যাস ছেড়ে দিয়েছি বহুকাল।আজ তোর কাছে সামান্য সাফাই গাই, কেমন?”

একটু নিরবতা। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ঘনঘন তিনবার পল্লব ঝাপ্টে নজর পুণরায় স্থির করে বর্ণ।আরো খানিকটা ঝুকে সুখের বন্ধরত চোখে চোখ রেখে বললো অদ্ভুত মিহি গলায়,

“ আমার নিশানা আপাতত আমার মঞ্জিল।যা এখনো ছুঁতে পারিনি।আর কিছুটা পথ বাকি।আর প্রেম ভালোবাসা কখনো আমার মঞ্জিল ছিল না।ইভেন আই হেইট লাভ।তুই ঠিকই ভাবিস –এমন এক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছি হাজারো মেয়েরা আবেগে ভেসে ভালোবাসার কথা শোনাতে আসে।ওসব সো কল্ড লাভ দেখে মেয়েদের প্রতি অনিহা চলে এসেছে। এরা ভেতরের আমিটাকে নয়, আমার সোরত আর ফেম’কেই ভালোবাসে।
ফুল…
ডাকটা এতোটা কোমল ছিল যে, সুখ চেতনায় থাকলে নির্ঘাত হৃদস্পন্দন খেই হারাতো।বর্ণ বলে যায়,
“ আমার কাছে তুই, এখনো নূরার মতোই ছোট।কেনো যেনো মনকে মানাতে পারিনা সেই ছোট্ট বোবাফুল আজ অনেক বড়।এতোটাই বড় যে, আমাকে ভালোবাসার বিষ পান করতেও পিছু হটলো না।ভেবেছিলাম বাকিদের মতো তুইও একই গর্তে পা দিয়েছিস। এবং সেটা ভেবেই মেজাজ চড়ে গিয়েছিল। আমার বাড়ির মেয়েরা হবে সবার চেয়ে আলাদা, অন্যরকম। সেখানে তুই ওদের মতো কেনো হবি?কোন সাহসে?আর যখন হয়েই গেছিস তখন শাস্তি তো পাওয়ারই ছিল!আর সেটা হলো চোখের অশ্রু আর..

সুখের বুকের বাঁ পাশে ইঙ্গিত করে বলে, “ এই হৃদয় যেনো দ্বিতীয় বার ভালোবাসার নাম নিতেও প্রতিবার চুরমার হয় নিষ্ঠুর আঘাতে।”

“ শাস্তিটা একটু হৃদয়হীন পাষণ্ডের মতো হয়ে গেলো, না?কী করবো বল?আমার ভীতু মানুষ সহ্য হয়না। দেখলে মন হয় চোখের পানি ঝরলে আরেকটু মানাবে।তুই ভীতু সেজে ভীষণ ভুল করেছিস ফুল।জানিস অনুশোচনা বোধ হয় না আমার!মাঝে মাঝে হয়তো আবার হয়; ঠিক অন্ধকার আকাশের বুকে হঠাৎ বিজলীর মতো।এই ক্ষণস্থায়ী অনুশোচনা নিয়ে আমি কী ধুয়ে পানি খাবো।

“ তোকে এতো কথাই বা বলছি কেনো আজ?জানি না,মুখ স্টপ রাখতে পারছি না।এতো কথার মূল পয়েন্ট কী জানিস?

বর্ণ ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো। ফিসফিসিয়ে বললো,
“ আন-ফরচ্যুনেটলি,মেবি আ’ম অ্যাডিক্টেড ট্যু ইউ্যু!আজ এই মূহুর্ত থেকে তুই চাইলেও আমার, না চাইলেও।হোকনা ওই ভালোবাসা তোর আবেগ অথবা বিবেক। আমার মঞ্জিলের আগে ভালোবাসার দাবি নিয়ে তুই-ই কিন্তু দাঁড়িয়েছিলি!

.
সুখের বেডের খানিক দূরে আরেকটা মিনি সাইজের বেড। সেখানে রুবাইয়্যাত থাকে। মেয়েকে একা ছাড়তে তিনি নারাজ।সেদিন ভোর বেলা। সুখের পাশে খানিকক্ষণ কাটিয়ে।একা একা কতো কী বলে অপর কেবিনে এলেন ভদ্রমহিলা।আইজা এসেছে শেষ বারের মতো সুখকে দেখতে। আজকেই শিকদার নিবাসে ফিরবে তারা।সাইমা একপাশে চুপচাপ বসে আছে।নূরা তাকে এটা ওটা জিজ্ঞেস করছে।মাঝে মাঝে সেও জবাব করছে বিরস মুখে।তামিজ শিকদারের সাথে যোগাযোগ বিছিন্ন করে পুণরায় আইজার পাশে এসে বসলেন রুবাইয়্যাত।তামিজ নিজেদের জেলায় গিয়েছিল মাঝে। আবার ফিরে এসেছেন গতকাল।
আইজা ঠোঁট নাড়িয়ে কিছু একটা বললো বোধহয়।সেটা চাপা পড়লো ধুমম.. একটা শব্দে। ফ্লোরও কেঁপে উঠলো বোধহয় সেই শব্দে। আঁতকে পরষ্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে রুবাইয়্যাত উঠে পা বাড়ানোর আগেই সাইমা ছুটে গেলো সামনের কেবিনে। দরজা নিকটে গিয়েই থম মেরে বাকশূণ্য হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। অস্ফুট চেঁচিয়ে রুবাইয়্যাত ঢুকে পড়ে ঝড়ের গতিতে।সুখ বেডের নিচে, ফ্লোরে পড়ে আছে। নিঃশ্বাস ভারী। গোঙানির আওয়াজ হয় মৃদুমন্দ। মেয়েকে তড়িৎ বুকে আঁকড়ে ধরলো রুবাইয়্যাত। শরীর অস্বাভাবিক কাঁপছে সুখের। থরথর সেই কাঁপুনি। রুবাইয়্যাত কপালে চুমু এঁকে অস্থির গলায় আহ্বান করে,

“ এই তো আম্মু.. কষ্ট হচ্ছে?চোখ খুলো।আপা ডক্টরকে ডাকো.. নার্স! আমার মেয়ে কেমন যেন করছে।”

#চলবে🥀
|ভুল ক্রুটি ক্ষমা দৃষ্টিতে দেখবেন। রেসপন্স করার অনুরোধ|

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here