#আমার_বোবাফুল(৪৮)
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরা
হসপিটাল থেকে আজ দ্রুত ফেরা হলো মেহরাবের। শাওয়ার সেরে মীরাভের সাথে অনেক্ষণ সময় কাটিয়ে বাচ্চাটা ঘুমিয়ে গেলে মায়রার কাছে গছিয়ে দেয়।পরে দু ভাই-বোন একত্রে ডিনার টেবিলে বসে।
‘ ভাইয়ার সাথে কন্টাক্ট করা যাচ্ছে না অনেকদিন।তোর সাথে কথা হয়েছে ?’–পানির গ্লাসে চুমুক দিয়ে জানতে চাইলো মেহরাব।
মায়রার মুখখানা থমথমে হয়ে যায় ।ভাত নড়াচড়া করতে করতে হাসার চেষ্টা করে বলল,
‘ খাওয়ার সময় ওর নাম নিয়ে মেজাজ খারাপ করিস নাতো। ফুসরত আছে মহারাজের বউ বাচ্চাকে সময় দেওয়ার?রাজ্য সামলাতেই উনি সদা ব্যস্ত। সংসার গোল্লায় যাক!’ – রেগে গেল শেষের দিকে।মেহরাব অবাক হয় ঈষৎ।সরু চোখে চেয়ে বলে,
‘ এমন রেগে যাচ্ছিস কেনো?’
‘ খেয়ে নে!খুব ভালো করেই জানিস খাবার টেবিলে এতো কথা পছন্দ নয় আমার।’
‘ ভুল হয়ে গেছে মা আমার।ক্ষমা দে!’
এটুকুই ছিল দু’জনের কথোপকথন। এরপর মেহরাব শোবার ঘরে চলে এলো। মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে যায় আকম্মাৎ। অনুভত হয় মনটা কু ডাকছে। কারণ অনিশ্চিত।
রুম থেকে বেরিয়ে এলো। ড্রয়িং রুমে টিমটিমে ল্যাম্প লাইট জ্বলছে টেবিলে।মানে, আপু এখনো জেগে? মেহরাব ফোনে সময় দেখে।৩টা বাজতে মাত্র সাত মিনিট বেঁচে। বিশেষ কারণ ছাড়া মায়রা এতো রাত অব্দি কখনো জাগে না।
‘ আপু আছিস?’
রুমের দরজা খোলা ছিল।নক করেও সাড়া শব্দ না পেয়ে সন্দেহী চোখে আশেপাশে দেখে।নাহ, ড্রয়িং রুমে সে নেই। ভাবল, রুমেই ঘুমিয়ে আছে।দোর আটকাতে ভুল করেছে।বুক ভরে চাপা শ্বাস ছেড়ে মেহরাব হাত বাড়িয়ে দোর আটকাতে গেলে বেখেয়ালে বেডে নজর গেল। মীরাভ ঘুমন্ত।পাশে মায়রা নেই। কোথায় সে?
গুনগুন চাপা কান্নার আওয়াজ ভেসে এলো মনে হয় একবার। অচেতন মস্তিষ্ক তাকে ছাদের দিকে ইঙ্গিত দিল। মেহরাব ধীরে হেঁটে যায় সিঁড়ি বেয়ে।
অচিরেই বুকটা ধ্বক করে উঠল যেনো।মায়রা ছাদের মেঝেতে হাঁটু মুড়ে বসে।পিঠ দেখা যাচ্ছে শুধুই।তবু, শরীরের কম্পনের তীব্রতা দেখে অনুমান করা যায় –সে কাঁদছে। গোঙানির শব্দ কানে এসে লাগে।
‘ আপু ঠিক আছিস?’ –কন্ঠে ঈষৎ উৎকণ্ঠা।ধফ করেই বোনের পাশেই বসল। ভেজা আঁখি পল্লব তুলে মায়রা। ঠোঁট কামড়ে আচমকা মেহরাবের বুকে হামলে পড়ে হুঁ হুঁ ডুকরে উঠে।
‘ আমি ঠিক নেই ভাই। ভেতরটা চূর্ণ বিচূর্ণ করে দেওয়া হয়েছে আমার। প্রতিনিয়ত মৃ ত্যু যন্ত্রনা অনুভব হচ্ছে।’ –অবুঝ স্বরে ক্রন্দনরত গলায় সিঁড়ি পেরিয়ে,দেয়াল ভিড়িয়ে বেডে ঘুমন্ত নিষ্পাপ মুখশ্রীটির ইশারা করে ফের বলল,
‘ য্_যদি আমার কোলে মীরাভ না থাকতো, হয়তো এতোক্ষণে সু-ই-সাইড করে নিতাম।’
হাতের আঁজলায় বোনের বেদনা-সিক্ত মুখ তুলল মেহরাব। অস্থির হলো,
‘ বনু.. ভাইকে পৃথিবীতে একা রেখে যাওয়ার চিন্তা মাথায় আনে না!কে দুঃখ দিয়েছে বল আমায়? এতো বড় স্পর্ধা কে দেখিয়েছে?’
ঝরঝর অশ্রু গড়ায়, চোখ ভিজে।মায়রা দুহাতে মুখ চেপে ধরল। কলিজাটায় যেন কেউ ক্ষুরধার ছুড়ি চালিয়েছে। বড্ড যন্ত্রণা হচ্ছে।
‘ জোসেফ..!’
‘ ভাইয়া?কী করেছে?’ –মেহরাব প্রশ্ন করল শীতল স্বরে।
‘ ও ঠকিয়েছে আমায়। ভীষণ বাজে ভাবে।ত্_তুই জানিস ভাই?আমি ওর জীবনের প্রথম নারী, প্রথম ভালোবাসা ছিলামই না।ওর আরো স্ত্রী আছে।দু নয়, তিন নয়, পাঁচ পাঁচজন। আলাদা আলাদা দেশে। ওদের অনেকের সন্তান মীরাভের চেয়ে বড়।’
‘ হোয়াট?’ –চোখে অবিশ্বাস্য।কন্ঠে কিঞ্চিৎ বিষ্ময়,-‘ কী আবোল-তাবোল বকছিস?আরো পাঁচজন স্ত্রী আছে মানে?’
‘ আমিও প্রথমে বিশ্বাস করিনি। কিন্তু চোখের সামনে থাকা প্রমাণ কীভাবে উপেক্ষা করি
বল?’ –চোখ মুছে অনূভুতি শূন্য গলায় বলল মায়রা।তবু, বাঁধা ছিন্ন করে অশ্রু ঝরে আসে নিশ্চুপ।
তড়িঘড়ি করে ফোন চেপে কতক ভিডিও প্লে করে দিল। প্রতিটি ভিডিওতে জোসেফ আলাদা আলাদা নারীর সাথে টাইম স্প্যান্ড করছে। ঠোঁটে সেই মন্ত্রমুগ্ধ হাসি। যেমনটা মায়রার নিকটে এলে তার ঠোঁটে ফুটে উঠে।মীরাভকে আদর দিতে গিয়ে উচ্ছ্বাসিত হয়।
মেহরাব দেখেছিল বোনের বদলে জোসেফের অন্য নারীর সংস্পর্শে যাওয়া।তাদের সন্তানদের প্রতি প্রীতি। এটা ফেইক ভিডিও নয়।সিসি টিভি ফুটেজ। ধীরে ধীরে মস্তিষ্কে আগ্নিউৎপাত হচ্ছিল।এই চিটার এতো দিন ধরে তার বোনের সাথে চিট করে এসেছে? দিনের পর দিন!মাসের পর মাস!তার সরলতার সুযোগ নিয়ে এতো বাজে ভাবে ঠেকিয়ে দিল? ভেঙে দিল তার কোমল হৃদয়!
‘ কী করবো আমি?এসব সহ্য করতে পারছি না আর।খুব কষ্ট হচ্ছে ।’ –চুল খামচে কেঁদে উঠে উম্মত্ত হয় মায়রা,
‘ এতো বড় ভুল কীভাবে করলাম। আমার কাছে তো আর কোন অনূভুতি, কোন ভালোবাসা বেঁচে নেই।সব ওর নামে উৎসর্গ করে দিয়েছিলাম.!এর প্রতিদান এতো জঘন্য হবে কখনো কল্পনাও করতে পারিনি!’
‘ কাঁদিস না। অশ্রু সংযত কর আপু। চরিত্রহীন কাপুরুষদের জন্য অশ্রু বিসর্জন মানে অ-পাত্রে দান ছাড়া কিছুই নয়!’
‘ পারছিনা যে!’ –হৃদযন্ত্রের দিকে ইঙ্গিত
করে,-‘ এখানে খুব লাগলে চোখ বাঁধা মানতে নারাজ।এখন বুঝতে পারছি ও কেনো দিনের পর দিন যোগাযোগ না করে থাকতো।আমিই বা কতো বোকা। বিশ্বাস রেখেছিলাম আর যাই করুক ও শুধু.. আর শুধু আমারই আছে,থাকবে আজীবন। বিজনেসে বিজি বলে যোগাযোগ করার সময় বের করতে পারে না।’
‘ রা-স-কে-ল..ওকে আমি ছাড়বো না।আমার বোনের প্রতিটি চোখের জলের হিসেব সুদে আসলে ফেরত দেবো। আই কিল হিম’ –মেহরাব হাত মুষ্টিবদ্ধ করে কঠোর প্রতিজ্ঞায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো। রাগে কাঁপছিল প্রতিটি নিঃশ্বাসও।তার হাত চাপল মায়রা,
‘ ছাড় ওসব!ওর সাথে সকল যোগাযোগ অফ করে দিয়েছি।হয়তো কখনো এদেশে ফিরবেই না ও।সেই মুখ আছে নাকি ওর?’
মেহরাব প্রশ্ন করে হঠাৎ,
‘ চার বছরের সংসারে যেখানে ওই ক্যারেক্টারলেসের আসল চরিত্র আঁচ করতে পারিসনি। হঠাৎ এসব কীভাবে জানতে পারলি?’
কান্না থামিয়ে মায়রা স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে। অন্যমনস্ক হয়ে বর্ণনা দিল,
‘ দুজন লোক এসেছিল কদিন আগে।রাতের বেলা।তুই তখনো ফিরিসনি। লোকগুলো কালো পোশাকে আবৃত ছিল।মুখ দেখার কোন উপায় নেই। মাথায় হেলমেট। দরজা খুলে দিতেই হুট করে ভেতরে চলে এলো, মাথায় গান ধরে চুপ থাকতে বলল।ভয় পেয়ে আমি চুপ হয়ে যাই। এরপর একজন ল্যাপটপ বের করে ভিডিওগুলো একে একে প্লে করে দেখাল। আমি তখনো বিশ্বাস করিনি কিন্তু…’
‘ কিন্তু?’
‘ ওরা জোসেফকে কল দিতে বলল।আমি দিলাম। যেভাবে প্রশ্ন করতে বলল সেভাবে করতে করতে একসময় সে নিজেও স্বীকার করে নিল এ্_এসব স্_সত্যি!’
‘ লোকগুলো কে ছিল?’
‘ জানি না। বাইকে করে এসেছে।আমি পিছু নিয়েছিলাম, কিন্তু এতো স্পিডে বাইক রাইড করছিল যে চোখের পলকে উধাও হয়ে গেল।ওরা আরো দেখিয়েছে… জোসেফ কেবল একজন সফল বিজনেসম্যান নয়।সাথে অনেক অ-বৈ-ধ কাজে জড়িত। নারী পাচার, ড্রা-গ স্মা-গ-লিং আরো কতো কী!’। – ঘেন্নায় নাক কুঁচকে
নিল,-‘ ছিহঃ.. সহানুভূতি হচ্ছে এখন আমার নিজের প্রতি।এ আমি মন প্রাণ উজাড় করে কাকে ভালোবাসলাম?যে আদৌ সেই ভালোবাসার যোগ্যও ছিল না।’
‘ আমাকে আগে জানাসনি কেনো এসব?’
মলিন হাসে মায়রা,
‘ নিজের পছন্দের মানুষকে আপন করে পাওয়ার রাস্তায় তুই কতো এক্সাইটেড!আমি কীভাবে সেই খুশিতে বিঘ্ন ঘটাই?ওতোটাও খারাপ বোন হতে চাইনি। কিন্তু আজ পারলাম না। তোকে মুখ ফুটে না বলতে পারায় কষ্টগুলো দ্বিগুণ হচ্ছিল!’
•
ধ্রিম.. ধ্রিম.. আওয়াজটা মেবি তোর হৃদয়ে বাজছে ফুল! শুনতে ইন্ট্রেস্টিং ’ –হিম শীতল কন্ঠের আবেশ মাখা সেই বাক্যটি এখনো কানের গোড়ায় সেকেন্ডে সেকেন্ডে বাজছে সুখের।রাত তিনটে পেরিয়েছে। অথচ চোখে ঘুম নেই।এটা অবশ্য নতুন কিছু নয়।কতো রাত যে এমন নির্ঘুম কেটেছে তার ইয়াত্তা নেই।শেষ কখন শান্তিতে চোখ বুজেছিল,তাও হিসেবে নেই।
বুকের বাঁ পাশে হাত রাখে।এখনো বাজছে বোধহয়।ধ্রিম.. ধ্রিম.. ধ্রিম..!
সুখ তখন প্রতিবাদ অবশ্যই করেছিল আসফিয়ান বর্ণ’র ভাবনা মিথ্যে দাবি করে। দেখিয়ে দিয়েছিল পুরুষটির বক্ষস্থলে ইশারা করে,
‘ আওয়াজটা এখান থেকে বেরোচ্ছে!’
বর্ণ ভ্রু কুটি করে তাকিয়েছিল সেদিক। সত্যিই হৃদয় কাঁপছিল তখন।একেই কী তবে হৃদস্পন্দন বলে?প্রিয়দের সান্নিধ্য পেলে হৃদয় এমনই ছটপট করে –বর্ণ শুনেছিল কোথাও একটা।
·
সুখের বুকের ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। রেলিংয়ে হাত রেখে দূর আকাশে নজর স্থাপন করে। ছাদের প্রান্তে দাঁড়িয়ে সে একান্তে।পাশে কেউ নেই।
হাত দুটো চোখের সামনে মেলে ধরে। কব্জিতে সরু দুটো চুড়ি আটকে।বেশ সুন্দর ডিজাইন করা। ঝিকমিক ডায়মন্ড পাথর খচিত।হাতেও বেশ মানিয়েছে।যেন তার জন্যই তৈরি করা হয়েছে খুব যত্নে।বর্ণ জোরপূর্বক সবটুকু অধিকার কাটিয়ে পরিয়ে দিয়েছিল তখন।এ-ও বলেছে,
‘ যদি খুলার চেষ্টা করেছিস।তবে এই হাত দুটো আর আস্ত থাকবে না ফুল।গড
প্রমিজ!’ –কতোবড় ক্রিমিনাল। হুমকি দেয় তাকে? আদেশ হোক বা হুমকি..শেষ বারের মতো বরদাস্ত করেছে সুখ।চুড়ি জোড়া প্রথম তুহফা দেখে চকচকে চোখে জানতে চেয়েছিল –কোথা থেকে পেলো এমন আকর্ষণীয় ডায়মন্ড চুড়ি?’
তখন তার জবাব ছিল,
‘ বিয়ে উপলক্ষে বর্ণ ভাইয়ের দেওয়া গিফট!’
এরপর যে জানতে চেয়েছে সবাইকেই একই উত্তর দিয়েছে। বর্ণ’র কানেও পৌঁছেছে কথাটি। সারাবেলা দুজন আর মুখোমুখি হয়নি।বিকেলের দিকে গার্ডেনে যাওয়ার পথে মানুষটি পাশ কাটিয়ে হেঁটে চলার সময় কানে কানে বলেছে,
‘ বোকা ফ্লাওয়ার কুইন.. বিয়ের আসল গিফট তোলা আছে। সঠিক সময়ে সার্প্রাইজ দেব।এটা আপাতত বিয়েতে ‘হ্যাঁ’ বলার গিফট ধরে
নে!’ –বলার সময় ধূর্ত চোখ জোড়া কেমন একটা ইশারা দিচ্ছিল।সুখ বুঝল না এর অর্থ।
ওহ্ হ্যাঁ, মেহরাবের পক্ষ থেকে দেওয়া স্বর্ণের বালা-টিও তখন ফিরিয়ে দিয়েছে বর্ণ। এবং শান্ত গলায় বলেছে,
‘ এই চুড়ি যেমন তোর হাতে নট ফিট। তেমনি চুড়ির মালিকও তোর জন্য উপযুক্ত নয়।মাইন্ড ইট!’
·
সারাদিনের এসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনা বলি মস্তিষ্কে এখন হানা দিচ্ছে সুখের।আবারো এক প্রলম্বিত দীর্ঘ শ্বাস।তার দৃষ্টি ওই দূর আকাশের বুকে চুপটি করে জোৎস্না বিলাতে নিয়োজিত চাঁদের দিকে।চোখ চিনচিন করছে।হৃদ যন্ত্রটি মনে হয় শক্ত করে কেউ চেপে ধরে আছে। শ্বাস নিতেও কষ্ট হয়।
হঠাৎ…
চোখের কোটর ফেটে টুপটাপ অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।সুখ থামানোর চেষ্টা করেনা তাদের।নিরবে ঝরতে দিলো অ-ঝোরে। কাঁদলে হালকা লাগে। হৃদয়ের চাপা যন্ত্রণাদের কিছুটা লাঘব হয়।
‘ এই অশ্রু কী আমার জন্য?তোর এই শখের পুরুষকে ছেড়ে অন্য কারো হওয়ার কথা কল্পনা করেই অবাধে গড়াচ্ছে?’ – সুখ চকিত হয়।চোখের সামনে রোমাল ধরে কেউ বলল বাক্যকটা।না দেখেও কন্ঠের অধিকারী মানুষটিকে চোখ বুজে চিনে নেওয়া যায়।
রোমাল সে নিল না।ডান হাতের পিঠে চোখ মুছে আস্তে করে পাশে ঘাড় ফিরিয়ে ঠোঁট নাড়ল,
‘ সবসময় ভুল ভাবনা ভেবে নেওয়াকে নিজের অভ্যাসে পরিণত করে নিয়েছেন নাকি?’
বাড়িয়ে দেওয়া রোমাল সমেত হাত গুটিয়ে নেয় বর্ণ। একদৃষ্টিতে অপলক তাকিয়ে রয়। সুখের অশ্রুতে সিক্ত আঁখি যুগল অপূর্ব লাগল তার চোখে।ঠিক যেমন শিশির ভেজা প্রস্ফুটিত গোলাপ। মুখশ্রীতে আগের তুলনায় পরিবর্তন এসেছে সুখের। গম্ভীর গম্ভীর একটা কঠোর ভাব। মলিনতার আঁচ আছে অল্প।বর্ণ অল্পক্ষণ ঠোঁট কামড়ে জবাব দেয়,
‘ কারেক্ট.. বাট নট কারেক্ট।আমি তোর কাছে চাঁদের অনুরূপ।আর তুই দূর আকাশের চাঁদের দিকে চেয়ে কাঁদছিলিস।দ্যাট মিন্স এই চাঁদ, ওই চাঁদ কাউকেই ছুঁতে না পারার দায়ে তুই অশ্রু ঝরাচ্ছিস!এম আই রাইট?’
‘ আবা_র ভুল বকছেন!’
‘ সঠিকটা তুই জানিয়ে ধন্য কর তবে? বিষয়টা ক্লিয়ার না হলে শান্তি পাবো না! ’ –শেষোক্ত করার সময় দুহাত প্রসারিত করে আড়মোড়া ভাঙল।
সুখ বুকে হাত ভাঁজ করে তাকায়, এরপর ‘হাহ্’ করে শ্বাস ছেড়ে অন্যত্র সরিয়ে আনে। আড়চোখে দেখে বর্ণ তখনো জবাবের আশায় চাতক পাখির মতোন চেয়ে। চোখাচোখি হতেই ভ্রু নাচালো অসভ্যের মতো।
‘ কদিন পর এই বাড়ি ছেড়ে, প্রত্যেকে ছেড়ে…’
‘ আমাকে ছেড়ে..’ –বর্ণ মৃদু হেসে কথা কেড়ে নিল।হতাশ চোখে চায় সুখ।
‘ বিরক্তিকর!’ –ঠোঁঠ ছিড়বিড় করে শব্দটি আওড়ে পাশ কাটিয়ে চলে আসতে ধরে।
চুলে বিনুনি গাঁথা।দাদু করে দিয়েছিল বিকেলের দিকে।এখন তিনি সুখকে প্রচন্ড ভালোবাসেন।আগে যতটুকু অবজ্ঞা করতেন, সব যেন কড়ায়-গন্ডায় মিটিয়ে দিচ্ছেন এখন।সুখ প্রাণ ভরে সেসব আদর গ্রহণ করে।
চুলের গোড়ায় টান অনুভব হয়।সাহসা মাথায় হাত উঠে এলো। বুঝে উঠার আগেই লম্বা বিনুনি ধরে হেঁচকা টানে সুখকে মুখোমুখি নিয়ে এলো বর্ণ। চোখে চোখ রেখে বলল,
‘ তিন বছরের ভালোবাসা এতো সহজে ফুরিয়ে গেল?ভুলে গেলি সব?এতো সহজে কীভাবে?’
ঈষৎ ব্যথায় মুখ কুঁচকে সুখ জবাব দেয় ঠোঁটে,
‘ আমি আমার মতো। আমার ভালোবাসার ধরন ছিল আলাদা। অতএব, আমার ভুলে যাওয়ার অযুহাতও আলাদা।এর কোন ব্যাখ্যা হয়না!’
সুখের কথা বুঝে নিতে তার ঠোঁটে একদৃষ্টে চেয়ে থাকার মাঝে শুষ্ক ঢোক গিলে বর্ণ।গলা খাঁকারি দিয়ে কোমল স্বরে ধীরে বলে,
‘ ছেড়ে যেতে কষ্ট হবে না?পারবি সহ্য করতে?’
নজর সরায় না সুখ।চেয়ে থেকেই স্বীকার করল,
‘ হবে.. ভীষণ কষ্ট হবে।তবে আপনাকে চাই না আমার। সবকিছু পেয়ে গেলে আফসোস করবো কী নিয়ে?আর.. রইল বাকি সহ্য করা নিয়ে। জানেন তো, পৃথিবীতে অসম্ভব বলে কিছু হয়না।’
বর্ণ’র হুটহাট মনে পড়ে সুখের ডায়রিতে লেখা সেই শব্দ গুচ্ছ, -‘ হয়তো একজনম আফসোস নিয়ে কাটিয়ে দিতে হবে –আপনি ইচ্ছে করেই আমার হোননি বর্ণ ভাই!’
রাগ উঠে। প্রচন্ড রাগ উঠে বর্ণ’র। দাঁতে দাঁত নিষ্পেষিত করে সুখকে ছেড়ে দিল। গম্ভীর মুখে বলল,
‘ পলক ফেলার আগে চোখের সামনে থেকে দূর হ্।নয়তো…’ –বাক্যটি অসম্পূর্ণ রেখে দুহাত মুঠোবন্দী করে।সুখ জেদি হলো একটু।জানতে চাইলো কঠিন মুখে,
‘ নয়তো কী ?’
হুট করে বর্ণ ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। সুখের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল ফিসফিসিয়ে,
‘ হাগ করবো..শক্ত করে।চাস এমন কিছু করি? আমার কিন্তু কোন আপত্তি নেই!’
#চলবে|

