আমার_বোবাফুল(৪৫.১) #তৃপ্তি_এহসান_নাওরা

0
57

#আমার_বোবাফুল(৪৫.১)
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরা

৪৫–প্রথমার্ধ·
শিকদার নিবাসে এসে খানিক পর থেকে মায়রা একটা জিনিস লক্ষ্য করছে।আসফিয়ান বর্ণ কেমন অদ্ভুত সূক্ষ্ম নেত্রে দেখছে তাকে।সে তাকালেও নজর সরায় না মানুষটা। অস্বস্তি হচ্ছিল মায়রা’র। নড়েচড়ে বসে জোরপূর্বক হাসে।রামসা এসে টি-টেবিলে নাস্তা পানীয় দিয়ে গেল।আইজা বসেছিল অতিথির সাথে।বর্ণকে আসতে দেখে তাকে ড্রয়িং রুমে বসার অনুরোধ করে রুমে গিয়েছেন।দুই শিকদারের একজনও বাড়িতে নেই।অতিথি আসার সংবাদটি আযাদ সাহেবের কানে পোঁছে দেবেন তিনি। সুখকে নিয়ে মধ্যাহ্নের দিকে কোথাও একটা গিয়েছেন তামিজ সাহেব।এখনো ফিরেনি।

বর্ণ’র কপালে গাঢ় ভাঁজ। তর্জনী ঠোঁটে ঘঁষে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মায়রার দিকে স্থির রেখেছে। রমণী গলা খাঁকারি দেয়,

‘ হাই!’

উপর নিচে মাথা নেড়ে বর্ণ অন্যরকম এক প্রশ্ন করল,- ‘ মিস আব্ মিসেস.. আপনার মন ভালো?’

অপ্রস্তুত হাসল মায়রা, -‘ শ্_শিওর!কেনো নয়?’

বর্ণ কাঁধ ঝাঁকায়। সন্দিহান গলায় ঠোঁটে বাঁকিয়ে অল্প হেঁসে বলল, -‘ দেখে তো লাগছে না। হৃদয়ের কোথাও ভারী আঘাত লাগেনি তো?’

থমকে যাওয়া চোখে চাইলো মায়রা। দৃষ্টিতে অত্যাধিক আশ্চর্য !এটা সত্যি যে –একটা জঘন্য কারণে তার মনটা বিষিয়ে আছে। শুধু বিষিয়ে নয়; তার বিশ্বাস,তার ভরসা কোন এক নিকৃষ্ট ছুতোয় চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেছে। অথচ সে ঠোঁটে হাসি রেখে দিব্যি নিজেকে প্রাণবন্ত-খুশি প্রমাণের সম্পূর্ণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।এমনকি মেহরাবও যা ধরতে পারেনি; আসফিয়ান বর্ণ কীভাবে?বিষ্ময়ভরা চোখে বাকশূণ্য তাকিয়ে রয় মায়রা।হাসি মিইয়ে এলেও সম্পূর্ণ উবে যায়নি,

‘ আপনার হয়তো বুঝতে ভুল হচ্ছে মিস্টার। আমার মনটা আজ খুব ভালো। একদাম ফুরফুরে!’

সোফায় পিঠ এলিয়ে ঠোঁট গোল করে অন্যত্র চেয়ে বর্ণ হাসে , -‘ওও.. একদম ফুরফুরে?’ –স্বর থেকে মৃদু তাচ্ছিল্য হাসি ছিটকে আসে।

মেহরাবের আসন খানিক দূরে। বর্ণ -মায়রার কথোপকথন কানে পৌঁছাচ্ছে না তার।তবে, যথাসাধ্য চেষ্টা করছে।কন্ঠ খাদে নামিয়ে কথা বলছে তারা; ফলে আরো শুনতে পারছে না।

‘ হ্যালো ডক্টর!সব ঠিকঠাক?’

প্রতিটি বাক্য উচ্চারণের সময় আসফিয়ান বর্ণ’র ঠোঁটে সূক্ষ্ম বাঁকা হাসির এক রেখা জড়িয়ে তাকে –অন্যরকম, রহস্যময়।যে ব্যাপারটা সকলকে বিব্রতবোধ করিয়ে দিতে সক্ষম। মেহরাব সৌজন্য হেসে জবাব দেয়,

‘ ইয়াহ্.. এ্যাভরিথিং ইজ অল রাইট। আপনার কেমন চলছে রকস্টার?’

‘ বিন্দাস!’

রুবাইয়্যাত এসে দেখল নাস্তা এখনো ছুঁয়েনি কেউ। ভদ্রমহিলা হতাশ হলেন,

‘ আরে দ্যাখো কান্ড.. কেউ কিছু টেস্ট-ই করোনি দেখছি? এভাবে খালি মুখেই গল্প করে যাবে?’

‘ ইটস্ ওকে আন্টি।আপনারাও আসুন না।বসুন একসাথে।সুখকে দেখছি না যে?বাড়ির ছোট সদস্যরা নেই? বিশেষ করে নূরা!’

বর্ণ’র সামনে অস্থিরতা ঢাকতে একনাগাড়ে প্রশ্ন করে এদিক ওদিক তাকালো মায়রা। রুবাইয়্যাত ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বললেন,

‘ সুখ একটু বেরিয়েছে আব্বুর সাথে।একটু পরেই ফিরবে।আর নূরাটা নিশ্চয়ই কোথাও বসে অভ্র- বীরের সাথে পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করছে।বুঝোই তো বাচ্চা…

‘ আমার তো ওর এই ব্যাপারটাই ভীষণ সুইট লেগেছে, আন্টি। প্রথমে হতবাক হয়ে গিছিলাম মেহরাব কী না একটা আট বছরের বাচ্চা মেয়ের সাথে ফ্রেন্ডশিপ করেছে! কিন্তু পরে কথা বলে বুঝলাম দেখতে বাচ্চা সাইজের হলেও…

‘ এক্সকিউস মি!’ –বলে বর্ণ উঠে চলে গেল ফোন কানে চেপে। কল এসেছে কারো।চেপে রেখে শ্বাসটা মায়রা ধীরে ধীরে ছাড়ল।চোখটা ভীষণ জ্বলছে। বুকের ভেতর এক অসহ্য যন্ত্রণা।


পিচঢালা রাস্তায় সাঁই সাঁই গাড়ি ছুটে চলছে একমনে।এসি বন্ধ।গাড়ির জানালা খুলা।খুলা জানালা থেকে মুখ বের করে হা করে বাতাস খাচ্ছে সুখ।ঝালে কানের পর্দাগুলোও জ্বলছে বোধহয়। কর্ণকৌঠরে ভোঁ ভোঁ শব্দ তৈরি হচ্ছে।তামিজ সাহেব ফ্যালফ্যাল চোখে মেয়ের কান্ড দেখছেন।বাবা-মেয়ে দুজনের খানিক আগে ফুচকা খাওয়া হয়েছে তৃপ্তি নিয়ে।একটা মধুর সময় কেটেছে তাদের।শেষ কবে মেয়ের সাথে এমন মিষ্টময় মূহুর্ত কাটিয়েছেন মনে নেই তামিজ সাহেবের।
অবশ্য আজও কাটানো হতো না –যদি না সুখ জোর করে গাড়ি থামিয়ে তার সাথে ফুচকা খাওয়ার বায়না না ধরতো।

জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে আব্বুর দিকে করুন চোখে তাকায় সুখ। চোখ চিকচিক করছে।ঝালের তোড়ে চোখে জল এসে গেছে প্রায়।এতোটা ঝাল না খেতে বারণও করেছিলেন ভদ্রলোক।

‘ কমেছে?’

বলার ফাঁকে টিস্যু দিয়ে চোখের জল মুছে দিলেন।মুখে হু হা করার পরও উপর নিচ মাথা ঝাঁকিয়ে ‘হ্যা’ বোঝায় সুখ। চোখে চোখ রেখে মিথ্যে বলে দিল মেয়ে’টা।তামিজ সাহেব ঢের বুঝে নিলেন।

আইসক্রিম খেয়ে জিভখানা একটু মিষ্টতা পেল।ঝাল কমে এসেছে এখন। ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা আইসক্রিম মুছে দিয়ে মেয়ের মুখে আঁচড়ে পড়া চুল সরিয়ে দিয়ে একদৃষ্টে চেয়ে রইলেন মুগ্ধ চোখে।রোজ তিনি শুকরিয়া আদায় করেন –জীবনে হয়তো কোন পূণ্য কাজ করেছিল বলে এই ভাগ্যলক্ষিকে উনার সংসারে পাঠিয়েছিলেন স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা।এই পৃথিবীতে তিন’জন মানুষ ব্যাতীত কেউ বলতে পারবে না সুখ তার র/ক্তের কেউ নয়।

যেদিন সুখকে পেয়েছিল সেদিন একবার হানিফা বেগমের কাছে গিয়েছিলেন রুবাইয়্যাত এবং তামিজ শিকদার।আযাদ সাহেব বাড়িতে ছিলেন না।বর্ণ হওয়ার পর থেকেই তিনি ছেলে আর স্ত্রীকে নিয়ে দেশ–বিদেশে ট্রাভেল দিতেন। তখনও কোন এক দেশে ছিলেন তাদের সাথে করে।

সেদিন রাতেই রুবাইয়্যাত আর সুখকে নিয়ে হানিফা বেগমকে বলে বাড়ি ছেড়ে দূরে সরে গিয়েছিলেন তামিজ। পাঁচ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরেও সন্তান দিতে পারছিলেন না রুবাইয়্যাত।কাছের, দূরের সকলের কতো কথা শুনতে হতো রোজ।কেউ মুখ ভেংচাতো, কেউ সহানুভূতি দেখাতো।এমনও সময় গেছে যে আত্মীয়দের কারো বাচ্চা কোলে নিতে গেলে বাচ্চার মা মুখের উপর বলে দিয়েছে,–

‘ তুমি তো বোধহয় বন্ধ্যা! কখনো মা ডাক শুনতে পাবে কী না সন্দেহ।আমার ছেলেকে ছুবে না।ওর ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।’

দীর্ঘ দিন পর হঠাৎ যখন তিনি মা হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করলেন।তামিজ সাহেবের খুশি দেখে কে?পুরো এলাকায়, পুরো গুষ্টিতে মিষ্টি বিতরণ করে আসলেন। সংবাদ দিলেন,–

‘আমিও বাবা হবো এবার!’

এতো সবের পর রুবাইয়্যাতের মিসক্যারিজ হওয়ার ঘটনাটি কাউকে জানাননি।কী লাভ হতো? আবার সেই পুরনো কথাগুলো তাকে ভেতর থেকে গুঁড়িয়ে দিতো।

অতঃপর তার কিছুদিনের মধ্যেই শূণ‌তা ভরা দুজন কপোত-কপোতীর সংসারে পূর্ণতা রূপে সুখ এলো নিজ থেকেই।তামিজ শিকদার সেদিনি সবার থেকে দূরে অন্য একটা দেশে চলে গেলেন স্ত্রী সন্তান নিয়ে। ফিরলেন প্রায় সুখের আড়াই বছর পর। পৃথিবীর সামনে পরিচয় করিয়ে দিলেন তামিজ শিকদার এবং রুবাইয়্যাত সুলতানার একমাত্র মেয়ে ফারিস্তা সুবহান সুখকে। স্বয়ং আইজা কিংবা আযাদ শিকদারও জানে না –সুখকে রুবাইয়্যাত গর্ভে ধারণ করেনি। মায়ের পর পরিবারের বড় হিসেবে আযাদ শিকদারকে বলতে চেয়েছিলেন তামিজ সাহেব। কিন্তু রুবাইয়্যাত চায়নি।মুখে ইজাযাত দিতো ঠিকই, তবে চোখের দৃষ্টিরা যেনো নিরবে অশ্রু বিসর্জন দিয়ে বলতো,

– ‘ সুখ আমার গর্ভ ছেড়া ধন নয়। কথাটি আরো একজন মানুষ বেশী জানুক এটা আমি চাই না।’

সুখকে অপছন্দ করার দোয়াই দিয়ে সত্যিটা তাকে বার কয়েক বলে দিতে চেয়েছিলেন হানিফা বেগম।তবে পারেননি ছেলের মুখের দিকে চেয়ে।তামিজ শিকদার বলে দিয়েছেন –যেদিন তিনি মুখ খুলবেন সেদিনই ছোট ছেলেকে চিরজীবনের জন্য হারিয়ে ফেলবেন।

‘ বাঃ ..

চোখের সামনে তুড়ি বাজিয়ে সুখ ইশারায় জানতে চাইলো,

‘ হঠাৎ স্ট্যাচ্যু হয়ে গেলে কেনো আব্বু?’

ভদ্রলোক প্রসস্থ হাসলেন, -‘ মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে!’

‘ এই ব্যাপার?’

সুখ খানিক নিকটে চলে এলো। মিছে মিছি মুখ গম্ভীর করে ইশারায় কাঁধ দেখিয়ে বোঝায়,

‘এখানে মাথা রাখো!’

তামিজ সাহেব মেয়ের কথায় মৃদু হেসে ধীরে মাথা ঠেকালেন তার কাঁধে।

‘ আব্বুকে ভালোবাসো?’
‘ আন্নেক!’ –হাতের ইশারায় জানিয়ে দেয় সুখ।তামিজ সাহেব স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে চোখ বন্ধ করলেন।সুখ নিজেও আব্বুর মাথায় নিজের মাথা ঠেসে চোখ বুজে।বাড়ির কাছাকাছি এসে পৌঁছেছে গাড়ি।ব্যাস, আর কিছুটা পথ বাকি।

আর্ট গ্যালারি ওয়েবসাইটে সিভি পাঠিয়েছিল সুখ; তিন-চার সপ্তাহ আগে। সেদিন গ্যালারি থেকে ই-মেইল এসেছিল।সিভি সিলেক্ট করে নিয়েছে তারা।আর এটাই ছিল আব্বুর জন্য সুখের সার্প্রাইজ।আজ আর্ট গ্যালারিতে আব্বুর সাথে পেইন্টিং নিয়ে গিয়েছিল।পুরোটা সময় অস্থিরতায় কেটেছে আর আব্বু পাশে থেকে তাকে সাহস দিয়েছে।


হানিফা বেগম নিজ শয়নকক্ষে। বিছানায় পড়ে আছেন বৃদ্ধা।শীতের আগমনী বার্তা পাওয়ার সাথে সাথে উনার সর্দি-কাশি দেখা দিয়েছে। এখন আবার জ্বরও উঠেছে। রুবাইয়্যাত দুপুরের খাবার খাইয়ে মেডিসিন দিয়ে এসেছেন।

গুটি গুটি পায়ে ড্রয়িং রুমে কদম রাখল নূরা। বাড়ির প্রত্যেকে অষ্টমাশ্চর্য হলো যেনো।সে নাকী মায়রাকে লজ্জা পাচ্ছে। অবশ্য এর যথেষ্ট কারণ আছে। ফোনালাপে কথায় কথায় মায়রা একবার বলেছিল,

‘ হায়.. আমার একটা ছেলে থাকলে নূরা বুড়িকে নির্ঘাত ছেলে-বউ বানিয়ে আনতাম। আফসোস!’

ইশশ্, না হওয়া শাশুড়ির সামনে একটু তো লজ্জা বাঁচিয়ে রাখতে হয়!নাকী? অথচ দ্যাখো, তুহফা আর বীর কেমন গোল গোল চোখে দেখছে।অভ্র নেই আজ। বন্ধুদের সাথে কোথাও পিকনিক বানাতে গেছে।

মিরাভ’কে পেয়ে লজ্জা টজ্জা ছুঁড়ে ফেলল। মেহরাবের পাশে গিয়ে ধুপ করে বসে মিরাভের গাল টেনে দিল,

‘ পিচ্চি তো অনেক কিউট!আমার চেয়েও!তাই না বাড্ডি?’ –একটু মন খারাপ হলো শেষে।

মেহরাব হাসল। মনক্ষুণ্ন নূরার চুল এলোমেলো করে দিয়ে বলল,

‘ নেভার, একদমই না!তোমরা দুজনেই কিউটি পাই,প্রিন্সেস!’

‘ রিয়্যালি?’
‘ নো ডাউট!’

মায়রা আর তুহফা কথা বলছিল।নূরার কথাগুলোতে হাসলো দুজন।

‘ ওই তো সুখ এসে গেছে!’

নূরা ছুটে গেলো তড়িৎ।সুখের চারপাশে ঘুরে ফিরে তার হাতের বাক্সটা কেড়ে নিল আগেভাগেই,

‘ আমার আইসক্রিম!’
‘ কে বলল এটা নূরা’র?’ –তামিজ সাহেবের প্রশ্নে ভাব নিয়ে জবাব দেয় নূরা,

‘ কে আবার!তুমিই তো!’

ইতস্তত নিয়ে এগিয়ে আসে সুখ। অস্বস্তি হচ্ছিল নতুন কারো সামনে যেতে।মেহরাব একঝলক চেয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসল। এরপর নজর সরিয়ে নেয়।

‘ সুখ এসো না!’

ড্রয়িং রুম ভিড়িয়ে যাচ্ছিলো সে।মায়রার ডাকে থামল। সৌজন্য হেসে একপল আব্বুকে দেখে হেঁটে গেলো সেদিক।


মায়রা কিছু বলতে চায়।আযাদ এবং তামিজ সাহেব সম্মতি জানালেন।

বর্ণ ও মেহরাব তখন মুখোমুখি সোফায় বসে।মায়রা মিষ্টভাষায় মেহরাবকে একঝলক দেখে শিকদারদের উদ্দেশ্যে বলল মোলায়েম কন্ঠে,

‘ বাবা-মা নেই।পৃথিবীতে আপন বলতে আমাদের দুজনের জন্য একে অপরই। ভাই কখনো কোনো আবদার করেনি।মুখ ফুটে বলেইনি।তার মুখ দেখে যেটুকু বুঝেছি এই যা। সেদিন সে প্রথমবার কিছু চাইলো; আর আমি কীভাবে হাত গুটিয়ে বসে থাকি বলুন?

থেমে পুণরায় বলল,– ‘হাজারো মেয়েদের ভিড়ে মেহরাব আপনাদের সুখকে পছন্দ করেছে। ভালোবেসেছে বলতে পারেন।আমি সবসময় যথাসাধ্য তার চাওয়া পাওয়া পূর্ন করার চেষ্টা করেছি একজন মা সমতুল্য ভালো বোনের মতো।আঙ্কেল, সুখের হাতটা কী আমার ভাইয়ের হাতে দিবেন প্লিজ?কথা দিচ্ছি ওর কোন অমর্যাদা হবে না।’

বর্ণ ভ্রু-ট্রু গুটিয়ে মেহরাবের দিকে তীক্ষ দৃষ্টি ছুঁড়ে হুট করে। মেঝেতে চেয়ে আছে সে। ভদ্রলোকের ন্যায় একপল চোখ তুলে চেয়েছিল বোধহয়। সচকিতে ভাইয়ের দিকে চাইলেন তামিজ সাহেব। অতঃপর মায়রা ‘র পাশে বসা সুখকে।আযাদ শিকদার অপ্রস্তুত হেসে অল্পক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

‘ আমি অত্যন্ত খুশি হয়েছি যে আমরা ব্যতীত আমাদের মেয়েকে বাহিরের কোন পুরুষ ভালোবাসে। তাকে আপনও করতে চায়। কিন্তু…
মেয়ের যে বিয়ের যোগ্য বয়স হয়নি এখনো। হুঁম.. বয়স অবশ্যই উপযুক্ত হয়েছে ।তবু, জানোই তো মা –সন্তান যতোই বড় হোক বাবা মায়ের চোখে সেই দু’বছরে ছোট্ট খোকা-খোকির মতোই।তবে…’

আশাহত হয়ে ভাইয়ের দিকে তাকায় মায়রা।আযাদ সাহেবের ‘ তবে’ শুনে আশার আলো দেখতে পাওয়ার মতোন আগ্রহ নিয়ে ফিরল।

‘ মানতে হবে আমার মেয়ে এখন যথেষ্ট পরিণত।একটা সুন্দর পবিত্র মনও আছে। কাউকে ভালো লাগতেও পারে। অভিভাবক হয়েছি বলে আমরা তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। এক্ষেত্রে তার মতামত প্রয়োজন।যদি সে চায় তাহলে..

সুখের দিকে তাকালেন তামিজ শিকদার।কন্ঠ আচানক কেঁপে উঠছিল উনার।কোমল গলায় জানতে চাইলেন,

‘ তুমি কী চাও আম্মু?’

সুখের জবাব শুনবে বলে বর্ণ চেয়েছিল শীতল চোখে।ডক্টর শুধু শুধু ইনসাল্ট ফিলিং নিতে এসেছে।তার দৃঢ় বিশ্বাস ফুল শুধু এবং শুধুমাত্র তাকেই ভালোবাসে।অন্য কাউকে বিয়ের কথা কল্পনাও করবে না।

অল্পক্ষণের জন্য স্তব্ধ থম মেরে বসে রইলো সুখ।গলা শুকিয়ে আসছে। মস্তিষ্কের চিন্তাধারা এলোমেলো। তবু, সে মুখাবয়ব যথেষ্ট শক্ত দেখালো। আসার পর থেকে মেহরাবের দিকে একবারো না তাকালেও লোকটা চোরা চোখে বার কয়েক তাকিয়েছিল হয়তো। প্রথমবারের মতো একবার আড়চোখে তাকে দেখলো সুখ। হৃদয়টা তখন অনুভূতি শূন্য।

সুখের জবাব শুনতে সকলে যখন তার দিকে তাকিয়ে –সে হঠাৎ নির্লিপ্তে আব্বুর দিকে চোখ তুলে তাকালো।ইশারায় বুঝিয়ে দিলো,

‘ আমি বিয়েতে রাজি’

কিছুপলের জন্য ড্রয়িং রুমের পরিবেশ থমকে যায়। খানিক দূরে থাকা রুবাইয়্যাতের বুকটা যেনো ধ্বক করে উঠল অচিরেই। চোখের তারায় না চাইতেও ভেসে উঠল মেয়ের গায়ে জড়ানো টকটকে লাল শাড়ি।হাত ভর্তি চুড়ি-মেহেন্দির আঁকিবুঁকি।সুখকে পরিপূর্ণ রাজবধূ লাগছে।

ঠোঁট কামড়ে দ্রুত কিচেনে ঢুকে গেলেন ভদ্রমহিলা। বিয়ে করবে সুখ?তাদের ছেড়ে অনেক দূরে শশুর বাড়ি যাবে।সে কাকে বুকে জড়িয়ে বাঁচবে?

মায়রা চকচকে চোখে ভাইকে দেখল। মেহরাব ঠোঁট ঠোঁট গুঁজে গম্ভীর মুখ করে আছে। অথচ মনের আঙিনায় ঘুরে ফিরছে হাজারো প্রজাপতি। তৎক্ষণাৎ কিছু স্বপ্ন এসে ভিড় জমায় হৃদ-গহীনে।

সূক্ষ্ম নেত্রে অল্পক্ষণ চেয়ে থেকে বর্ণ ঠোঁট বাঁকিয়ে একটু হাসলো অদৃশ্য।আচমকা উঠে দাঁড়াল। সেখানে থেমে থাকল না।মেহরাবের পাশ কেটে হেঁটে এলো সুখের মুখোমুখি। অতঃপর এক ঝটকায় তাকে বসা থেকে টেনে তুলে হুট করে বুকের খাঁচায় বন্দীনি করে জড়িয়ে ধরলো। উচ্ছ্বাস মিশ্রিত গলায় বলল শব্দ করে,

‘ কংগ্রেটস্ সিস.’

আকম্মাৎ! অপ্রত্যাশিত কাজে মূর্তি বনে গেল সুখ।হাতে থাকা জুসের গ্লাস ফ্লোরে ছিটকে পড়ে ঝনঝন করে ভেঙে টুকরো টুকরো হলো।

বর্ণ’ চোখের-মুখের প্রখরতা প্রমাণ করে দিচ্ছিল সে কতোখানি খুশী,কতোটা না আবেগপ্রবণ।

সুখকে ছেড়ে দিয়ে পুণরায় তার মুখটা দুহাতের আঁজলায় তুলে দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলিয়ে উচ্ছাসিত স্বরে টেনে টেনে বলল,

‘ আ’ম সো এক্সাইটেড ফুল!’ —কন্ঠ খাদে নামিয়ে নিম্ন আওয়াজে ফের প্রশ্ন করে,

‘ তুই এমন অস্বাভাবিক কাঁপছিস কেনো ফুল?শীত লাগছে?নাকি অত্যাধিক সাহসীকতার পরিচয় দেওয়ার কুফল?’

অতঃপর সম্বিত ফেরার মতো হুট করে সুখকে ছেড়ে দিয়ে দূরে সরে এলো। বুকে হাত চেপে জোরে জোরে নিঃশ্বাস ছাড়ল।এ যেন রাগ সংবরণের ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা। আশেপাশের স্তম্ভিত চাহনি দেখে হুটহাট বোকাদের মতো হেসে বলল,

‘ স্যরি গাইজ!বি পজেটিভ!এক্সাইটমেন্টে কী যে করে ফেলেছি বোধে ছিল না।অ্যাকচ্যুয়েলি সি ইজ মাই কাজিন সিস্টার।প্রথম বার বাড়িতে বিয়ে অনুষ্ঠিত হবে। ভাবতেই…ডোন্ট মাইন্ড এনিথিং এলস্ ব্রো! ওকেহ?’ –শেষোক্ট কথাটি মেহরাবের উদ্দেশ্যে ছিল।

মায়রা হেসে ফেলল হঠাৎ, -‘ ইটস্ ওকে!ভাই বোনই তো!’

সজোরে উপর নিচ মাথা ঝাঁকালো বর্ণ। ঠোঁটে হাসি টেনে ফট করে সুখের চোখের দিকে চেয়ে ঠোঁট উল্টে বলল, ‘ ভাই—বোন-ই তো!নাথিং এলস্’

#চলবে🍂
|

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here