#আমার_বোবাফুল(৫৪.২)
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরাহ্
৫৪–শেষার্ধ·
১৭ ফেব্রুয়ারি,বুধবার। সন্ধ্যা ৭টা’য় ”এওয়ার্ড সেরিমনি” অনুষ্ঠিত হবে জেলার বাহিরে।সুখ ও তার পরিবার আমন্ত্রিত।এটা হবে সুখের সফলতার প্রথম ধাপ।বিয়ের ডেট ফিক্স হওয়ার আগের দিনি এক্সিভিশন দিয়েছিল। প্রথমবার হিসেবে পেইন্টিং খুব চড়া মূল্যে বিক্রি হয়েছে। রয়্যালটিও পেয়ে গেছে ইতোমধ্যে।তার নিজের যোগ্যতায় প্রথম আয় ছিল সেটা।কী যে খুশি হয়েছিল সেদিন সুখ। আব্বু-আম্মু বাড়ির প্রতিটি সদস্য, এমনকি গার্ড থেকে শুরু করে মেইড এবং দারোয়ান কাকাকেও উপহার দিয়েছিল। নিজের টাকায়, নিজের পছন্দমতো।তবে একজন মানুষ বাদে।তার এক সময়ের শখের পুরুষ আসফিয়ান বর্ণ।কতো নামি-দামী মানুষ তিনি।তার জিনিস নেবে? অবশ্য বর্ণ’র জন্যেও কিছু কিনেছিল সুখ, কিন্তু দেখায়নি কাউকে!
স্থানটা বেশ জাঁকজমকপূর্ণ সাজানো, গুছানো।লাল নীল নিয়ন আলোয় চারপাশ রঙিন।ফুলের গেট পেরিয়ে লাল কার্পেট বিছানো সরু পথ ধরে আব্বু আম্মুকে সাথে করে ভেতরে প্রবেশ করে সুখ।নূরাও আছে রুবাইয়্যাতের হাতের মুঠোয়। সুখের সাথে আসবে বলে বায়না ধরে বসেছিল গতকাল থেকে। অতিথিদের নির্ধারিত আসনে গিয়ে বসল তারা। সুখের হাতে দুটো গোলাপ। ভেতরে প্রবেশের সময়কালে ফুল দিয়ে বরণ করে নিয়েছে।
বর্ণ এখনো এসে পৌঁছায়নি হয়তো।খুব কঠিন গলায় সুখকে বলেছিল তখন; আব্বুর গাড়িতে না উঠে যেন তার জন্য অপেক্ষায় থাকে। সুখ কানেই তুলেনি। আগে-ভাগেই নূরাকে নিয়ে গাড়িতে উঠে বসেছে।পাছে শাড়ির আঁচল টেনে ধরে ”আমার বউফুল বউফুল” না করে। বিশ্বাস নেই।
অনুষ্ঠান শুরু হতে কিছুটা সময় বাকি। অতিথিবৃন্দ প্রায় এসেই পড়েছে।গুটি কয়েক আসন ফাঁকা-ও আছে।তুহফা কল দিচ্ছিল সুখকে। ভেতরে নেট কাজ করছে না। মেসেজ সেন্ট হচ্ছে না।তুহফা বলেছে ইম্পর্ট্যান্ট কিছু বলতে চায়।ব্যাস,কলে এলেই হবে। সুখকে প্রত্যুত্তর করতে হবে না।
নেটওয়ার্কের খোঁজে হাঁটতে হাঁটতে কখন গেট পেরিয়ে এসেছে –সুখের ধ্যানই ছিল না।তুহফার কল প্রবেশ করল অবশেষে। রিসিভ করে কানে তুলল। সূর্য ডোবার পথে,সন্ধ্যা প্রায় হয়েই এলো।
সুখের পড়নে সিল্কের কালো শাড়ি।রঙটা ঘুটঘুটে আঁধার তুল্য ঘন কালো। শাড়ির উপরে সোনালি আর রূপালি জরির কাজ। বাঁ হাতের উপর আঁচল খোলা।মুখে খুব বেশি প্রসাধনী ব্যবহার করেনি। ঠোঁটে লিপ গ্লস দিয়ে হালকা একটু পিচ কালার লিপস্টিক ছুঁয়েছিল।এই অল্পতেই মায়া মাখা মুখখানা কী যে মোহময় স্নিগ্ধ দেখতে লাগছে সুখকে। আসফিয়ান বর্ণ দেখলে নির্ঘাত বুকে হাত চেপে বেহায়ার মতো চেয়ে থাকতে থাকতে এতোক্ষণে লাগামহীন অস্বস্তিকর বাক্য ছুঁড়ে দিতো কয়েকটা।
‘ হ্যালো ম্যাডাম!’
কানে ফোন চেপে তুহফার কথা শুনতে শুনতেই আনমনে হাঁটছিল সুখ, বেখেয়ালে। জায়গাটা এমন আকর্ষণীয় ভাবে সাজানো হয়েছে,চোখ উল্টেপাল্টে দেখছিল।পুরুষালী গলা কর্ণকৌঠরে পৌঁছাতেই স্থির হয়ে গেল সে।মনে হলো কন্ঠের অধিকারী মানব তার পিছে,গা ছুঁই ছুঁই। তড়িৎ পিছু ঘুরে অপরিচিত চেহারা দেখে ছিটকে দূরে সরে দাঁড়ায়।
‘ ম্যাডাম দেখি ভয় পাইছে?তোরা দেখছোস ম্যাডাম ভয় পাইছে আমারে?হে হে হে…’—কেমন বিশ্রীভাবে হেসে উঠল ছেলেটা।তার সাথে আরো দুজন।গা গুলিয়ে উঠলো সুখের।ভালো মানুষ বলে মনে হচ্ছে না এদের।ভুল জায়গায় এসে পড়েছে নিশ্চয়ই। দ্রুত মাথা নামিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে আসতে ধরলে ছেলেটা এক লাফে পথ আটকে দাঁড়ায়।
‘ আরে ম্যাডাম যাওয়ার এতো তাড়া কিসের?একটু সময় দিন আমাদের? অনুষ্ঠান শুরু হতে আরো অনেক সময় বাকি!’
ভীষণ ভয় পেয়ে গেল সুখ। ঢোক গিলে মণিদ্বয় ঘুরিয়ে আশেপাশে অবলোকন করে। অনেকেই আছে উপস্থিত অথচ কেউ এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করছে না–
‘ মেয়েটার পথ আটকে দাঁড়িয়েছেন কোন সাহসে?মেয়ে দেখলেই মাথা ঠিক থাকে না, না?
সুখ হাত নেড়ে নিজস্ব ভাষায় বুঝাতে চাইল,
‘ প্লীজ যেতে দিন ভাইয়া!’
তিনজন পরষ্পরের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠলো হো হো! একজন বলল,
‘ ভাইজান মাইয়া দেখি কথা কইতে পারে না!এর উপর আপনার নজর পড়ল কেমনে?’
ছেলেটা অপর এক ছেলে কাঁধে হাত রাখে আয়েশি ভঙ্গিতে। ঠোঁটে কদাকার হাসি টেনে বলল,
‘ কথা দিয়া আমি কী করমু!মাল ঝাক্কাস হইলেই বলবো…মজা হবে,মাস্তি হবে…
চোয়াল থরথর কেঁপে উঠে সুখের। দুহাতে শাড়ি খামচে ধরে। ওদের এই বিশ্রী হাসি,লুলুপ চাহনি খুব বাজে স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে তাকে। সেদিন এভাবেই কিছু জঘন্য, নিকৃষ্ট লোক তার কাছে এসেছিস। শ্বাসকষ্ট উঠে যায় সুখের, মেডিকেলের পরিভাষায় প্যানিক অ্যাটাক। মৃদু গোঙিয়ে মুখ চেপে ধীরে ধীরে পিছিয়ে যেতে ধরে।
‘ পাখি পালাচ্ছো কেনো? বিশেষ কোন ক্ষতি করব না। শুধু একটু গল্পই তো করতে চাইছি।বুঝোই তো যৌবনের জ্বালা? সুন্দরী নারী দেখলে গল্প করার লালসা জেগে উঠে!’
পা দুটো অবশ হয়ে এসেছে সুখের। ছেলেটা এগিয়ে এসে গায়ে হাত দিলে গেলেই আতঙ্কে থরথর কাঁপা হাতে চোখ চেপে ধরে।
প্রায় অনেক্ষণ ঘৃণ্য স্পর্শের ছোঁয়া না পেয়ে ভয়ার্ত চোখে দুটো আস্তে আস্তে মেলল। অবাক হয় ভীষণ। পেছন থেকে একটা হাত এসে ছেলেটার হাত মুচড়ে রেখেছে। অনুভূত হয় পেছনে কেউ আছে।কারো বুকের সাথে পিঠ ঠেকেছে তার। অশ্রু গড়িয়ে পড়ে ঝরঝর।ভেজা চোখে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকাতেই ঠোঁট ভেঙে কান্না এলো সুখের। অচিরেই ছুটে মানুষটার পেছনে লুকিয়ে গিয়ে পিঠের জ্যাকেট খামচে ধরে। এতোটাই জোরে যে জ্যাকেট পারলে ছিঁড়ে হাতের তালুতে নিয়ে আসে।বর্ণ শীতল চোখ নামিয়ে একবার সুখের হাতের দিকে চেয়ে, এরপর সামনে দৃষ্টিপাত করে।
‘ শালা এতো মানুষের কেউ এগিয়ে এলো না।তুই কোন বিদ্রোহী বে?হাত ছাড় আমার!’ –হার না মানা কন্ঠ হলেও,স্বর ব্যাথাতুর।হাতটা বুঝি ভেঙেই গেলো।এমন বলীয়ান কারো শরীর হয় নাকি আবার?
বর্ণ মেনে নিল এক কথাতেই।যুক্তি তর্ক ছাড়াই উচ্ছিষ্ট, আবর্জনা নিক্ষেপ করার মতো হাতটা ছুঁড়ে দিলো। কাঁধ দুলিয়ে বলল–
‘ দিলাম ছেড়ে! তারপর?’
তিনজন একে অপরের গা ঘেঁষে জড়ো হলো তারা। চোখে চরম ক্ষোভ।হয়না, উঠতি বয়সের তেজ!বর্ণ যার হাত মুচড়ে ধরেছিল,সে নিজের হাত মালিশ করতে করতে দম্ভ নিয়ে বলল,
‘ এটা আমাদের এলাকা! আমার এরিয়ায় এসে আমার সাথে পাঙ্গা?মেয়েটাকে দে এদিকে। ভেবেছিলাম হালকা পাতলা টাচ করে ছেড়ে দেবো কিন্তু একে নিয়ে আজ খেলা হবে!’
সুখ আরো গুটিয়ে নিল নিজেকে।কী বিশ্রী মুখের ভাষা।অসম্ভব কাঁপছে শরীর।বর্ণকে আঁকড়ে ধরে দুহাতে।এই কঠিন মূহুর্তে এটিই যেন আশ্রয়স্থল।
‘ ফুল… সামনে আয়!’
আরো দৃঢ় হয় হাতের বাঁধন। বর্ণ’র গম্ভীর কন্ঠের আদেশ তোয়াক্কা না করে আতঙ্কচিত্তে ঘনঘন দুদিক মাথা ঝাঁকায়।সে যাবে না।বর্ণ জোরপূর্বক পিছু থেকে ছাড়িয়ে পাশে এনে দাঁড় করায়। অত্যন্ত শীতল গলায় বলল–
‘ ছোঁয়া নয়,যদি বলি ওর দিকে সের্ফ আড়চোখে তাকানোর অপরাধে ভয়ঙ্কর শাস্তি ভোগ করতে হবে! বিশ্বাস হয়?ভীতি জাগবে মনে?’
বিনিময়ে ভীত সন্ত্রস্ত হওয়ার বদলে ছেলেটা হাত ঝাড়া দিয়ে তাচ্ছিল্য হেসে বলে,
‘ ওও… হিরো! নিজে এসেছিস মুখ ঢেকে ডাকাত বেশে। আবার ভয়ঙ্কর শাস্তির কথাও বলিস?’–একে অপরের দিকে চেয়ে হাত তালি দিয়ে হাসতে হাসতে,-‘ শুনেছিস তোরা? ভয়ঙ্কর শাস্তি ভোগ করতে হবে আমাদের! ভীষণ ভয়ঙ্কর!হে প্রভু! প্লীজ রক্ষা করো এই যাত্রায়। তোমার পাপী বান্দারা ভয় পেয়ে গেছে!’
তখনো ক্ষিপ্র হয়নি বর্ণ। মুখের ভেতরে দাঁতের নিচে দাঁত নিষ্ঠুরভাবে পিষ্ট হলেও ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি।হাত দুটো নিসপিস করছে। প্রথমের ছেলেটা হেলেদুলে এগিয়ে এলো দু কদম।বর্ণ’র মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হেঁয়ালি সুরে বলল–
‘ ওকে শুধু ছুঁবো না।আরো অনেক কিছু করবো!কোন বাপের ব্যাটা কী করবে?’
‘ তো ছোঁ!’
‘ তোর চোখের সামনে ছুঁবো।কী করবি তুই?’
‘ ইয়্যু রাসকেল।আগে হাত বাড়িয়ে ছোঁ ওকে!’
বাঘের মতো অধৈর্য হুঙ্কার ছেড়ে উঠল বর্ণ। চোখের রঙ অরুণাভ।সুখকে ছোঁয়াতে যেন ছেলেগুলোর চেয়ে তারই খুব তাড়া। হুঙ্কারে কেঁপে উঠে সামনের ছেলেটা।তবু দমে গেল না।এই ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের ভাগিনা সে।দাপট নিয়ে পা ফেলে হামেশা। বর্ণ’র দিকে কঠোর চোখে তাকিয়ে সুখের দিকে হাত বাড়ায় স।
আতকে ওঠে দুহাতে মুখ চেপে সুখ এক কদম পিছু হটে গেল ।তাকে ছোঁয়ার জন্য নয়,বর্ণ মুষ্টিবদ্ধ হাত উঠে গেছে ছেলেটার চোখ বরাবর।এক ঘুষিতেই এতোটা আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে যে, চোখ গলে রক্ত বেরিয়ে এসেছে। প্রতিক্রিয়া দেখানোর আগে মাটিতে ছিটকে পড়া ছেলেটাকে কলার চেপে তুলে ফের ঘুষি বসালো সেই চোখে। এরপর আরো একটা।বাকি যে দুটো ছ্যালা ছিল তারা বর্ণ’র উপর ঝাপিয়ে পড়তে এগুনোর আগে কালো মুখোশধারী দু’জন পালোয়ান তুল্য মানবের আয়ত্তে বন্দী হয়ে গেল।
ছেলেটার নাম সজীব। দু’জনের মাঝে একজন ভয়ার্ত গলায় বলল–
‘ কে তোরা,ছাড় আমাদের।এই সজীব__ সজীব…’
জবাব আসে না। জ্ঞান হারিয়ে ছেলেটা ঢলে পড়ার উপক্রম। এতোক্ষণের ছটফটে মেজাজের ছেলেটা এক লহমায় দূর্বল,ক্ষীণ শক্তিতে ঢলে পড়ছে লুটিয়ে। নিজেকে বাঁচানোর শক্তিটুকু কুলাতে পেরে উঠছে না।বর্ণ থেমে নেই। চোখের রঙ যতো গাঢ় হচ্ছে,হাতের ছাপ ততো গভীর।টুটি চেপে ধরে সামনে এগুতে লাগলো,দেয়ালের উদ্দেশ্যে।সজীব দুটো হাত কোন রকম বর্ণ’র হাতের উপর রাখল। জিভ বেরিয়ে এসেছে।চোখ থেকে নির্গত র/ক্তে ভেসে গেছে মুখের একপাশ।কী ভয়ানক দেখতে। হিসহিসিয়ে বলল বর্ণ–
‘ যেটা আমার,সেটা শুধু আমারই!এর দিকে চোখ তুলে তাকানোর পার্মিশন আমি কাউকে দেইনি। আমার পার্মিশন ছাড়া আমার কলিজায় হাত বাড়ানোর চেষ্টা?’
চারজন কালো পোশাকধারী এসে সজীবকে ছাড়িয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে ধরল।বর্ণ এমন রক্তিম চোখ তুলে তাকালো ,যেনো চোখের পাবকে জ্বালিয়ে,পুড়িয়ে দেবে। তাদের একজন বলল–
‘ চীফ… ম্যাম ইজ ফেইন্টিং!’
অচিরেই হাত আলগা হয়ে এলো বর্ণ’র। চোখে নেমে এলো শীতলতা।সজীবকে তাদের হাতে ছেড়ে দিয়ে উল্টো ঘুরে সুখের কাছে ছুটে এলো।
‘ ফ_ফুল কাম ডাউন!’—বড্ড অস্থির তার স্বর।হা করে জোরে জোরে নিঃশ্বাস ছাড়ছে সুখ, কাঁপুনি অস্বাভাবিক এখনো।চোখ ঢুলুঢুলু। চোখের সামনে ভূবন যেনো ঘুরছে।বর্ণ এক ঝটকায় বুকে চেপে ধরে তাকে।চুলে হাত বুলিয়ে দেয়।
‘ রিল্যাক্স.. জ্ঞান হারাসনা ফুল, খবরদার!’–এরপর ভীষণ কোমল গলায় বলল,-‘ চোখ বুজ!’
ফুল বাধ্য মেয়েটির মতো আলগোছে চোখ বুজে।বর্ণ এবার বলল মিহি সুরে,-‘ বুকে কান পাত আর আওয়াজটা অনুভব কর!’
সুখ কান পাতে বুকে। স্পন্দনের সুমধুর শব্দ কর্ণকৌঠরে গিয়ে বিঁধছে ধ্রিম-ধ্রিম-ধ্রিম…! শব্দগুলো খুব টানছে সুখকে। বুকে এমনভাবে মুখ ঘষে,যেনো বুক ছিঁড়েখুঁড়ে হৃৎপিণ্ডের ভেতরে গিয়ে আওয়াজগুলো শুনে আসে।বর্ণ হাসে। দুহাতে আগলে রাখে ফুলকে।হঠাৎ চোয়াল শক্ত করে চতুর্দিকে চোখ বুলাল। দশের অধিক মানুষ উপস্থিত ছিল এখানে।তাদের সামনে ফুলকে কুলষিত করার চেষ্টা করেছে কিছু আবর্জনা।আর বাকিরা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছে।এদেরো কী শাস্তি পাওনা নয়? অবশ্যই… অচিরেই নিজেদের পাওনা পেয়ে যাবে সকলেই। কেউ ছাড় পাবে না।কেউ না!
•
স্বাভাবিক হয়ে এসেছে সুখ।আম্মুর হাত চেপে বসে রইলো। হৃদস্পন্দনের গতি অস্থির ।বর্ণ এসে দিয়ে গিয়ে কোথাও একটা বেরিয়েছে। কঠোর গলায় বলেছে–
‘ দ্বিতীয় বার যেন ফুরকে পাশ ছাড়া না করে।’
মেয়ের অস্থিরতা অনুভব করে রুবাইয়্যাত বার কয়েক জিজ্ঞেস করেছে।সুখ দুদিক মাথা নেড়ে “কিছু নয়’ উত্তর করেছে প্রতিবার। চোখের তারায় ভাসছে বাহিরের সেই পীড়াদায়ক দৃশ্যপট। ঘৃণা’য় মন কুঁকড়ে আসে।এমন নিকৃষ্ট মানুষ গুলো পৃথিবীতে এতো দাপটের সাথে শ্বাস নেয় কী করে?
গলা শুকিয়ে এলো সুখের। বর্ণ’র প্রথম ঘুষিতেই চোখের কৌটর ফেটে র/ক্ত ছুটে এসেছিল গলগলিয়ে।ব্লিন্ড যে হবে এতে কোন সন্দেহ নেই! হসপিটাল, এরপর পুলিশ কেস করলে বর্ণকে ধরে নিয়ে যাবে না জেলে? ছেলেটার পরবর্তী অবস্থা তো একেবারে নাজুক হয়ে গিয়েছিল। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেলে যা তা ঘটে যাবে!আর… ওই মুখোশের আড়ালের লোকগুলো ছেলেটাকে নিয়ে কোথায় গেল! পরবর্তীতে সুখের মস্তিষ্কের অগোছালো চিন্তাগুলো নিমেষেই ফারার হয়ে গেল আরেকটি দৃশ্য মনে পড়তেই।সে তখন বর্ণ’র বুকে, বাহুডোরে আবদ্ধ ছিল।হৃদ যন্ত্রের নিকটে,খুব নিকটে।মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে আসে অচিরেই। এখন নিশ্চয়ই ওটা নিয়ে মজা লুটতে আসবে অসভ্য মানুষটা?
প্রায় দুই শতাধিক চিত্রশিল্পীর টপ টেনে নিজের নাম শুনে সুখ স্তব্ধ।অবাক , বিষ্ময়, আশ্চর্যে প্রতিক্রিয়া হারিয়েছে।ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না।এতো অল্প সময়ে,এও সম্ভব! এতো সম্মান পাওয়ার আদৌ যোগ্য সে!বর্ণ দূর আঁধার-নীল থেকে দেখেছিল তার অব্যক্ত উচ্ছ্বাস। ঠোঁট এলিয়ে হাসল সে।
উপস্থাপকের হিমশিম অবস্থা। ভদ্রলোক গত তিনদিন আগে স্পষ্ট দেখেছিল লিস্টে ফারিস্তা সুবহান সুখ নামটা আট নাম্বারে ছিল। কিন্তু এখন.. এক নাম্বারে। পাল্টে দিল কেউ?নাকি তার দেখার ভুল ছিল? নিজের উপর নিজেই সন্দিহান তিনি।
প্রথমেই তার নাম শুনে আরেক দফা চমকালো সুখ। অস্থিরতায় সর্বাঙ্গ কাঁপে। অদ্ভুত অনুভুতি হচ্ছিল। স্টেজে প্রধান অতিথির হাত থেকে এওয়ার্ড নিল। মূহুর্তেই করতালিতে মুখরিত হয়ে উঠে দর্শকের।উপস্থাপক লেকচার স্ট্যান্ড থেকে সহাস্যে বললেন–
‘ মিসেস ফারিস্তা সুবহান সুখ! আপনার এই সফলতার গল্পটা শুনতে চাই আমরা! এতো দূর পথচলার অনুপ্রেরণা কে ছিল? আপনার মনোবল শক্তিশালী করার ক্রেডিট কাকে দেবেন?’
কপাল কুঞ্চিৎ হলো সুখের।মিস থেকে মিসেস হলো কখন?ফর্মে তো আন-ম্যারিড ছিল!কেউ একজন হাতে মাইক্রোফোন দিয়ে যায়।
তার বক্তব্য শুনতে দর্শক অধির আগ্রহে চেয়ে। অস্বস্তিতে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়ায় সুখ।কথা বলবে কীভাবে?আর্ট গ্যালারিতে প্রতিবার যেই ভদ্রলোকের সাথে কথা আদান প্রদান হয়েছে উনাকেও দেখা যাচ্ছে না, তিনি কী জানতেন না বিষয়টি?তবে বলে দেয়নি যে! এখন কী করবে সুখ? বক্তব্য রাখতে না পারার দায়ে এক সমাবেশ অপমান গায়ে মাখবে?যা চিরজীবন কলঙ্কের মতো লেপ্টে রবে স্মৃতির পাতায়।মাথা তুলে সুখ। ইশারায় জানিয়ে দেবে সে কথা বলতে অক্ষম!
#চলবে🥀

