আমার_বোবাফুল(৬৯•২) #তৃপ্তি_এহসান_নাওরাহ্

0
58

#আমার_বোবাফুল(৬৯•২)
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরাহ্

দিশেহারা সুখ দিগ্বিদিক ভুলে ছুটে গেলো মাঝ রাস্তায়। বেখেয়ালে চলার ফাঁকে এলোমেলো মস্তিষ্ক অনুধাবন করতে পারল না -সে ছুটার পাশাপাশি তার দুদিক দিয়ে একই গেটাপ’ধারী চারজন লোকও ছিল।তারা যেনো সুখের প্রতিরক্ষকের ভূমিকা পালন করেছিল।সায়মাকে ঘিরে রেখেছে মানুষজন।সুখ রাস্তায় বসে গলগলিয়ে রক্তক্ষরণ হওয়া মাথাটা কোলে তুলে নিল। অশ্রুসিক্ত চোখে অস্থির হয়ে ডাকল ঢোক গিলে,“ মাঃ ”

বাঁ হাতে বিতৃষ্ণায় কন্ঠস্বর ঢলে সুখ।কেন যে কন্ঠণালীর অবরোধ ভেঙে শব্দ বের হয় না আর।সায়মা নিভু নিভু চোখের ব্যথাতুর হাসে। “মাঃ” এর পূর্ণরূপ সায়মা।বাকি শব্দ কন্ঠে মিলিয়ে গিয়ে “মা” তেই আটকে যায় সুখের স্বর। অবশ্য হাতে গুনা ক’টা শব্দই সে উচ্চারণ করতে পারে। নিবাসে থাকাকালীন রুবাইয়্যাতের ঈর্ষার মুখোমুখি হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল এটাই।এমনিতেই সায়মার মমতা সবার চেয়ে সুখের জন্য আলাদা, উপরন্তু সুখ সায়মা বলতে গিয়ে কেবল “মা” ই উচ্চারণ করতে পারত।স্বেচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, স্বয়ং ‘মা’ মজুদ থাকতে অন্য কাউকে ‘মা’ সম্বোধন করলে কে না হিংসে করবে?যদিও সুখ আম্মুর ফ্যাকাশে মুখশ্রী দেখে খুব গুরুত্বপূর্ণ না হলে শব্দটা কারো ক্ষেত্রে ব্যবহার করে না।

[তথ্যঃ- স্বাভাবিক মানুষের জন্য রাতের ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে একজন কোমা পেশেন্টকে ডক্টর ঘুমের ইনজেকশন দেবে না?অনেকের ধারণা ছিল সুখ সেদিন রাতে কিছু শুনে নিয়েছে। কিন্তু সে তো ঘুমে ছিল। জাগতিক চিন্তাধারা থেকে মস্তিষ্ক সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।]

“ ম্যাম, আমরা দেখছি। আপনি সরে আসুন,প্লীজ।”

চোখ তুলল সুখ।ওই যে, একটু আগে সুখের পাশাপাশি এলো যারা?তাদের মতোই অনেকে রয়েছে এখানে ।তাদের মধ্যেই একজন উৎসুক চেয়ে সুখকে সরে যেতে বলল।

সুখ সরলো না। শক্ত করে একহাতে সায়মাকে আগলে রাখার বৃথা চেষ্টা করে, অপর হাতে সায়মার একটা হাত ধরল। ইঙ্গিতে অনুনয় করছে যাতে চোখ না বুজে।

ঝাপসা হয়ে আসছে পৃথিবী; সায়মা কান সজাগ রেখে একবার চোখ তুলে সুখকে দেখে পুণরায় বুজে নিল।এখান থেকে বেঁচে উঠতে পারবে কী না সৃষ্টিকর্তা জানেন।তবে আফসোস নেই আর, শেষ মূহুর্তে এসে মিথ্যে হলেও সুখ তাকে ‘মা’ তো ডেকেছে। কতোদিন পর এই ডাক শুনলো! ও’বাড়িতে কতোবার যে সুখের মুখ থেকে এই শব্দ বের করতে ইচ্ছে করে হোঁচট খেয়ে পড়েছে, ফল কাটতে গিয়ে হাত কেটেছে, রান্না করতে গিয়ে জলন্ত আগুনের তাপ গায়ে লাগিয়েছে হিসেব নেই। সত্যি সত্যিই সুখ দূর থেকে তা দেখে সায়মা বুয়া বলতে গিয়ে কেবল “মাঃ” উচ্চারণ করেই ছুটে আসতো।

`
বর্ণ উপস্থিত হয় হন্তদন্ত।সুখকে ছাড়িয়ে নিয়ে জড়িয়ে রাখল বুকে। মেয়েটার শরীর কাঁপছে থরথর।চোখ ছাপিয়ে ঝরঝর অশ্রু কণা গড়িয়ে পড়ছে।স্ব ভাষায় বুঝাচ্ছে-

“ বুয়া!উনাকে বাঁচান। কষ্ট হচ্ছে তো তার। র/ক্ত…!”

“ রিল্যাক্স… কাম ডাউন। হসপিটাল নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাকে।”

হিমো-ফোবিয়া তৈরি হয়েছিল সুখ, অথচ আজ দিব্যি র/ক্ত গায়ে জড়িয়ে আছে। বুকের ভেতরটা কেমন যেন করছে।মনে হচ্ছে বুক থেকে কিছু একটা হারিয়ে যাচ্ছে ছিঁড়েখুঁড়ে।সায়মাকে কোলে তুলে নিয়ে গাড়ির দিকে ছুটে চলল একজন।তার সাথে আরও চারটে লোক।সুখ তাদের আগেও দেখেছে এই পোশাকে। যেখানে-যেখানে বর্ণ’র উপস্থিতি থাকে,তার আশেপাশেই দেখেছিল হয়তো।তারা কী বর্ণকে প্রোটেক্ট করে সবসময়?

বর্ণ’র বাহু ধরে ঝাঁকাল সুখ।বুঝায়,“ আমিও যাবো বুয়া’র সাথে।উনার তো কেউ নেই।”

বর্ণ’র তার মাথায় হাত বুলিয়ে ছোট বাচ্চাকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো আদর মিশিয়ে বলল,“ যাবো আমরা। রিল্যাক্স এন্ড টেইক অ্যা ডিপ ব্রেথ।সব ঠিক হয়ে যাবে।”

`
বর্ণ বলেছিল সব ঠিক হয়ে যাবে। অথচ কিছুই ঠিক হলো না।এই মারাত্মক দুর্ঘটনা সায়মা’র পা দুটো প্যারালাইসড করে দিল,গলার স্বর কেড়ে নিল। এমনকি অর্ধ-চেতন বানিয়ে ছাড়ল।বলতে পারে না,নিজ হাতে খেতে পারে না,চলতে পারে না। কেবল পিটপিট করে চোখ মেলে তাকায়। অদৃশ্যে চেয়ে থাকে নিশ্চুপ। রুবাইয়্যাত দীর্ঘ শ্বাস ছাড়লেন।আজ সায়মা’র ডিসচার্জ। তিনি খুব স্বাভাবিক ভাবেই বললেন তামিজ সাহেবের দিকে চেয়ে,“ ওকে শিকদার নিবাসে নিয়ে যাওয়া হোক!”

রুবাইয়্যাতের মুখে বিষ্ময়কর একটা বাক্য! তবে আজকের এই মূহুর্তে এটা না বললে নির্দ্বিধায় তাকে অ-কৃতজ্ঞের কাতারে ফেলা যেতো।

আইজাও ছোট জা’র সাথে একমত হলেন। সায়মা দীর্ঘ বছর ধরে ও’বাড়িতে একসাথে ছিল।নিঃস্বার্থ ভাবে সেখানে কাজ করেই জীবনের অর্ধেক কাটিয়ে দিয়েছে। বিনিময়ে অর্থ দাবি রাখেনি, শুধু মাথা গুঁজার ঠাঁই আর ভাত-কাপড়ই চেয়েছে নিজের জন্য।

সায়মাকে নিবাসে আনতে কারো আপত্তি ছিল না। হোম নার্সিং-য়ের জন্য একজন নার্সও রাখা হলো।রুগীর মন ফ্রেশ রাখতে ছোট বড় সবাই সহযোগিতা করছে বাড়ির।তাকে শুনিয়ে শুনিয়ে এটা‌ ওটা বলে গল্প করে। আশ্বাস দেয় -ঠিক একদিন সে আগের মতোই সেরে উঠবে।

আজও হুইলচেয়ারে নার্স আলিয়া তাকে ড্রয়িং স্পেসে নিয়ে এলো। সেখানে আগে থেকে হানিফা বেগম, আইজা, নূরা বসা ছিল।

“ সামু ক্যামন লাগে রে তোর এখন?কথা ক-বি না আর আমাদের সাথ?”–হানিফা বেগম বললেন শুধু। প্রত্যুত্তরের আশা করা বোকামি হবে।সায়মা একদৃষ্টে চেয়ে রয় ফ্যাকাশে মুখে। এক দুবার পলকও ফেলে ক্ষণে ক্ষণে।নূরা বলল টিভির দিকে চেয়ে,“ ন্যানি, দ্যাখো!টিভিতে আমাদের রকস্টারকে দেখাচ্ছে।কী সুন্দর লাগছে। তুমি দেখবে না?”

অনেক আগেই বুয়া ডাকতে নিষেধ করা হয়েছিল তাকে।তবে কী ডাকবে এর পরিবর্তে? দু’দিন খোঁজে খোঁজে তখন ‘ন্যানি’ নামটা রেখেছিল নূরা। যেহেতু সে ছোট থাকতে কোলে-টোলে নিয়ে বড় করেছিল।

রুবাইয়্যাত এলেন সেখানে। শাশুড়ির ওপাশে সোফায় আসন নিলেন।তার নিকটে সাময়া, হুইলচেয়ারে।

“ ও কাম্মা সুখ এলো?”

সুখ গিয়েছে ফাহার বাড়ি।ফাহার বিয়ে আজ। রুবাইয়্যাত সায়মার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নূরাকে জবাব দেয়,“ এলে দেখতে না?তার অপেক্ষাতে দুপুর থেকে তো এখানে বসেই আছো আম্মা।”

“ একা একাই গেলো?নিয়ে গেলো না আমায়! মানুষ এমন বে-রহম কীভাবে হয়?”

সায়মার জন্য মেডিসিন খুলতে খুলতে ফিক করে হেসে ফেলল আলিয়া। হানিফা বেগম বললেন,“ আরো যাও খালার বাড়ি!”

“ আমার কী দোষ?রুশ্মিতা চণ্ডী’র একা যেতে ভয় করছিল বলে আমাকেও নিজের সাথে ঝুলিয়ে নিয়ে গেল শুধু শুধু।আর রাজাকার’টাকে…”

“ নূর!” –আইজার স্বর গম্ভীর। সন্তানের ক্ষেত্রে এটাকে শাসনের সুর বলা হয়।নূরা ঠোঁট উল্টেপাল্টে মিনমিনিয়ে বলল,“
রাজবীর ভাইয়াকে তাড়াতাড়ি এখানে পৌঁছে দিতে বললাম এত্তো বার।তাও দিল না।” –বিড়বিড় করল,“ রাজাকার একটা।”

ফের বিড়বিড় করে ফোসে উঠে,“ রশ্মিতা চণ্ডী! তোকে আমাদের বাড়ি কে আসতে বলেছিল?আমি?এলিই যখন,আমাকে নিয়েই কেনো গেলি।সুখ আজ চলে গেলো আমাকে রেখে। উঁহুমম…!”

মুখ গুঁজ করে রাখে নূরা।বাড়িটা আজকাল শান্ত,নীরব হয়ে থাকে।অভ্র নেই,তার উপর বাড়িটা ফাঁকা ফাঁকা করে দিয়ে তুহফাও বিয়ে করে শশুর বাড়ি চলে গেছে।নূরার সঙ্গী হিসেবে এখন দু’জনই ।টমি আর সুখ। সেদিন তো বর্ণ আর সুখের মাঝে বসে বলল,“ আমার আর এবাড়িতে থাকতে ভালো লাগে না। কান্না পায়।সুখ তুমি তাড়াতাড়ি বেবী কিনে আনো না?”

নূরা’র ধারনা -দুজন ছেলে-মেয়ের বিয়ে হলেই বেবী কিনতে পাওয়া যায়।এর বাইরে বিশেষ কিছু করতে হয়না। অবশ্য এই ধারণা এমনি এমনি তৈরি হয়নি।আইজা ই ছোট বেলায় তাকে বলেছিল একবার,“ বেবী কিনে আনতে হয়।”

একধ্যানে সায়মাকে দেখছিলেন রুবাইয়্যাত। প্রায়শই দেখেন।কতো উদার, পাষাণ; কতো নিষ্ঠুর-ধৈর্যশীল এই মহিলা?সেতো কলিজা ছিঁড়ে কেউ নিয়ে নেওয়ার হুমকি দিলেও পারতো না সুখকে অজানা অচেনা কারো হাতে তুলে দিতে! দিনের পর দিন, বছরের পর বছর সুখ অন্য কাউকে ‘মা’ ডাকছে তার সামনে,যেটা ভাবতে গেলেই বুকটা ঈর্ষা’য় ফেটে যেতে চায়! সেখানে এই মহিলা এতো বছর কীভাবে দিন যাপন করল!ধীরে হাতটা সায়মা’র হাতের উপর রাখলেন। ভীষণ ভীষণ কৃতজ্ঞ তিনি এই মহিলাটির প্রতি। এখানে সায়মা আ-মৃ/ত্যু থেকে যেতেই পারে।তবে উনার একটাই চাওয়া- অতীতের সেই কঠিন সত্যিটা সুখ যেনো কখনো জানতে না পারে।মেয়ের বেলায় তিনি বড্ড স্বার্থপর ছিলেন, এখনো আছেন, হয়তো আজীবন থাকবেন।

`
ফাহার বিয়েতে সবাই কতো মজা করছিল।হৈ চৈ নাচ গান আরো কতো কী! অথচ অসহায়ের মতো সুখ শুধু দূর থেকে দেখে গেছে সব।তাতে শামিল হতে পারেনি। আসফিয়ান বর্ণ নামের মহাপুরুষ একজন আছেন না, তার নিষেধাজ্ঞার কারণে।

শুধু তাই নয়!কনেকে বিয়ের গাড়িতে তুলে চাকা একটু ঘুরতে না ঘুরতেই তাকে ধরে বেঁধে তাদের বাড়ি থেকে নিয়েও এলো।

গাড়ি চলছে নিজস্ব গতিতে। কোথায় যাচ্ছে কে জানে।তবে এটা শিওর -এই রাস্তা বাড়ির পথের নয়।ড্রাইভিং করছে বর্ণ। ভাবভঙ্গি নির্বিকার।পাশে মুখ কুঁচকে সিটে মাথা এলিয়ে সুখ চোখ বুজে।বিয়েতে যাওয়ার অনুমতিই দিচ্ছিল না পাষণ্ডটা।পরে কতো কী করে রাজি করিয়েছে -সেটা বিরাট এক ইতিহাস!

ঘাড়ে,গলায় আলতো আঙুলের বিচরণ পেয়ে ধীরে চোখ মেলল সুখ।চোখ উল্টে মাথা ঘুরাতেই আসফিয়ান বর্ণ আবদার করল যেনো, “ একটা চুমু চুরি করি বউ?”

#চলবে🦋

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here