#Tell_me_who_I_am
(#বলোতো_আমি_কে?)
#পর্ব_৩
#আয়েসা_ইসলাম_মনি
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)
🔺Trigger Warning: This post is a fictional story that contains sensitive content related to sexual violence. It is intended solely for awareness and educational purposes. It does not promote or glorify any form of abuse.
__________________________________________☞
জলজ অনিশ্চয়তায় দোল খেতে খেতে মিরা রিকশা থেকে নামল। চারপাশের শব্দ, মানুষের পদচারণা আর হঠাৎ জড়ো হওয়া কৌতূহলী ভিড় তার মনে অদ্ভুত আলোড়ন তুলল। গন্তব্যের কথা ভুলে গিয়ে সে অজান্তেই ভিড়টার দিকে এগিয়ে গেল।
মানুষগুলো বৃত্ত আকারে দাঁড়িয়ে আছে। কেন্দ্রবিন্দুতে কী ঘটছে, তা স্পষ্ট নয়, কিন্তু জনস্রোতের মধ্য থেকে হালকা গুঞ্জন ও উত্তেজনার আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। গা ঘেঁষাঘেঁষি ভিড়ে একটু দমবন্ধ লাগলেও মিরার ভেতরে অজ্ঞেয় টান, আর অন্তর্লীন আগ্রহ তাকে সামনে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল।
সে পাশের এক মধ্যবয়সী মহিলার কাঁধ ছুঁয়ে নম্রস্বরে বলল, “আসসালাতু আলাইকুম। একটু সাইড দিবেন, আন্টি?”
তার কণ্ঠে ছিল মিষ্টি সৌজন্য আর চোখে-মুখে অনবদ্য ভদ্রতা। মহিলার মুখে একরাশ কোমলতা খেলে গেল। অর্থাৎ ভিড়ের চঞ্চলতার মধ্যেও মেয়েটির আচরণ তার হৃদয়ে অদ্ভুত প্রশান্তি ছড়িয়ে দিল।
“অবশ্যই, মা,” একরাশ স্নেহের হাসি নিয়ে বললেন তিনি।
মিরা তার প্রতি কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে তাকিয়ে নরম স্বরে বলল, “ধন্যবাদ।”
ভদ্র মহিলা তার জন্য পথ তৈরি করে দিলেন। এরপর মিরা কয়েক পা এগোতেই যে দৃশ্যটা সামনে এলো, তাতে তার শিরদাঁড়া দিয়ে শীতল কিছু একটা বয়ে গেল। মানুষের ভিড়ের ঠিক মাঝখানে এক পুরুষ আরেকজনকে নির্মমভাবে প্রহার করছে। আ*ঘাতের প্রতিটি শব্দ যেন বাতাসকেও ছিন্ন করছে। লোকটির গায়ে কালো রঙের স্যুট। তার চওড়া কাঁধ, দৃঢ় পেশি আর নড়তে থাকা গাঢ় ব্রাউন চুল তাকে অন্য সবার চেয়ে আলাদা করে দিচ্ছে।
মিরার কপালে চিন্তার রেখা পড়ে গেল। এমন হিংস্র আচরণ তার কোমল হৃদয়ে অস্বস্তির সঞ্চার করল। সে কয়েক কদম সামনে পা বাড়াতে চাইল, যেন বলেই ফেলবে, ‘এই থামুন!’ কিন্তু তখনই পাশের দুই তরুণীর খিলখিল শব্দ কানে এলো।
একজন চোখ গোল করে ফিসফিসিয়ে বলল, “ছেলেটা কি হট, ইয়ার!”
পাশের জন উত্তেজনায় ঝুঁকে বলল, “হট তো হবেই। হি’জ দ্য ওয়ান অ্যান্ড অনলি কারান চৌধুরি। আই’ভ টোটালি গট আ থিং ফর হিম, ভাইইইই!”
‘কারান চৌধুরি’— নামটা যেন মাদকতাময় তীর হয়ে মিরার হৃদয়ে বিঁধে গেল। সে নিথর হয়ে গেল। চঞ্চল চোখজোড়া ধীরে ধীরে পিছনে সেই দুই মেয়ের দিকে সরে গেল। তার মনের গোপনতম কুঠুরিতে অচেনা কোনো অনুভব মৃদু করাঘাত করল।
ঠিক তখনই কারান ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখে ছিল আগুনের দীপ্তি। ঠোঁটে নিঃশব্দ অভিসম্পাতের আভাস নিয়ে বলল, “এভাবে সবাই তাকিয়ে আছেন কেন? এখানে কি সিনেমার শুটিং চলছে?”
তাতেই একে একে মাথা নীচু করে মানুষ ছড়িয়ে পড়তে লাগল। চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কিন্তু মিরা ঠায় দাঁড়িয়ে রইল।
সে ঘুরে কারানের চোখ বরাবর তাকিয়ে রইল। তাকিয়ে রইল এমন দৃষ্টিতে, যেন অবচেতনে আত্মসমর্পণ করে বসে সে। কারানের চোখের প্রতাপ, মুখের তীব্র গাম্ভীর্য মিরাকে স্থির করে দিল।
ছবিতে তাকে যতটা আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল, বাস্তবে সে তার থেকেও বেশি সুন্দর। একটা অদ্ভুত মোহ মিরার ভেতরে ঢুকে পড়ে, হৃদয়কে ধুকপুকিয়ে তোলে। তার চোখ কারানের চোখে আটকে গেল।
এদিকে কারান সেই আহত লোকটাকে হিঁচড়ে দাঁড় করালো। অগ্নিমূর্তি হয়ে ওঠা কারানের আঘাতে লোকটার হাত-পায়ে গভীর দাগ পড়ে গেছে। ক’টা থাপ্পড় পড়েছে তা গুনে বলা যায় না, কিন্তু গালের নীলচে ফোলাভাব দেখে মনে হচ্ছিল, রক্ত জমাট বেঁধে সময়ের আগেই মুখে বসন্ত ফুটে উঠেছে। কারান হাতের বেতখানা ধপ করে মাটিতে ছেড়ে দিল।
তারপর লোকটার কলার ঠিক করতে করতে, ঠোঁটদুটি কঠিন একটা রেখায় আটকে রেখে হিমশীতল গলায় বলল, “এরপর থেকে ওই মেয়েটার গায়ে আর একবারও হাত তুলতে দেখলে, তোর কলিজা ছিঁড়ে কুকুরের থালায় সাজিয়ে দেবো।”
সেই কণ্ঠস্বরের ভিতর ছিল দাবানলের তাপ আর বরফের মতো ধারালো নির্মমতা। লোকটা মুহূর্তেই ভেঙে পড়ল। শরীরটা এমনভাবে কাঁপতে লাগল, মনে হয় ভয় তার হাড়ে হাড়ে বসে গেছে। লোকটা কারানের পায়ের ওপর ধপাস করে বসে পড়ে কান্নায় ভেঙে পড়ল, “আর-আর কোনোদিন না, সা-স্যার। আমি শ…শপথ করে বলছি, আর কখনো করবো না। ক্ষমা করে দিন।”
কারান ঠোঁটের কোণে একটুখানি তুচ্ছ হাসি ফুটিয়ে লোকটার কাঁধে হাত রেখে তাকে তুলে দাঁড় করাল। তারপর কর্তৃত্বপূর্ণ কণ্ঠে বলল, “যার সাথে অন্যায় করেছিস, তার কাছেই মাথা নীচু কর।”
লোকটা তখন লজ্জা, ভয় আর অনুশোচনায় ভেঙে পড়া এক পরাজিত সৈনিকের মতো পাশেই গুটিসুটি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার দিকে এগিয়ে গেল। মেয়েটির চোখ লাল হয়ে আছে। ভেতরের সমস্ত অসহায়তা আর অপমান সেই চোখের জলে ধুয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। ওড়নার খুঁট দিয়ে সে গায়ের আঘাতগুলো আড়াল করে রেখেছে। শ্যামবর্ণা চেহারাটা রক্তাভ লজ্জায় কাঁপছে। শরীরটাও অস্পষ্ট ব্যথায় জর্জরিত, আর আত্মাটাও বিবস্ত্র হয়ে নিঃশব্দ আর্তি জানাচ্ছে।
লোকটা মেয়েটার পায়ের কাছে পড়ে গিয়ে বুক চাপড়ে কাঁদতে লাগল, “ক্ষমা করে দাও। ভুল হয়ে গেছে। আর কখনো এমন করবো না। তোমার পায়ে পড়ছি… বিশ্বাস করো, এই শেষবার…!”
যেহেতু লোকটা তার অপরাধ বুঝতে পেরেছে এবং নিজের ভুলের জন্য পা ধরে ক্ষমা চাচ্ছে, তাই মেয়েটা অবশ্যম্ভাবীভাবে তাকে ক্ষমা করে দিল। মেয়েদের হৃদয় এমনই, যতই তাদের স্বামী ভুল করুক, দিন শেষে তাদের সেই একই হৃদয়ে স্থান থাকে, যেখানে ক্ষমার সুর বাজে। মেয়েটা চোখের কোণের অশ্রু মুছে, নিজেকে একটু শান্ত করতে চাইল।
তারপর একটা গভীর নিশ্বাস ফেলল। নিস্তব্ধ গলায় বলল, “ঠিকাছে, উঠেন।”
এটি যেন এক ধরনের অন্তর্নিহিত লড়াই, যেখানে তার মুখাবয়বে কষ্টের আঁচ স্পষ্ট হলেও, সামনের ব্যক্তিটি স্বামী হওয়ার খাতিরে; সেই কঠিনতা ভেঙে সহানুভূতি ও ভালোবাসার সংকেত ফুটে উঠেছে।
কারান তখন এগিয়ে গিয়ে পকেট থেকে একটা চেক বের করল। একটানে সেখানে মোটা অঙ্ক বসিয়ে লোকটার দিকে এগিয়ে দিল। চেকটা হাতে গুঁজে দিয়ে বলল, “এই টাকা দিয়ে নিজের আর তোর স্ত্রীর চিকিৎসা করিয়ে নিস।”
তারপর লোকটার পিঠে এক চাপড় মেরে সে নিরুত্তাপভাবে সামনে হাঁটতে শুরু করলো।
এদিকে মিরা এসবের কিছুই বুঝতে পারল না। অথচ চারপাশের কোলাহলে, লোকজনের মুখে ঘুরেফিরে আসা গুঞ্জনে তার মন সজাগ থাকলেও, দৃষ্টিটা শুধু কারান চৌধুরীর ছায়ামূর্তির মধ্যেই বন্দি হয়ে পড়েছিল। তার চোখ ছিল স্থির, অথচ চোখের ভেতরে ছিল অস্থিরতার ঝড়। একটা অদৃশ্য চৌম্বক টান তাকে ধীরে ধীরে কারানের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল।
হঠাৎ পাশের সেই মধ্যবয়স্কা বলে উঠলেন, “দেখেছ মা, দেখতে যেমন, তার ব্যক্তিত্বটাও ঠিক সেরকম।”
শব্দগুলো মিরার কানে ঢুকে ঘোর ভাঙিয়ে দিল। সে একটু কেঁপে উঠে সচকিত কণ্ঠে বলল, “জি?”
মহিলা হালকা হাসলেন, “কারান চৌধুরীর কথাই বলছিলাম। এতক্ষণ ধরে ছেলেটা ওর বউকে রাস্তায় বেধড়ক মারছিল, সবাই চোখের সামনে দেখেও চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল।
দুজন লোক সাহস করে আটকাতে গেল, তখন সেই ছেলে বলে উঠল, ‘আমার বউ আমি মারছি, কার কী তাতে?’
তাই সবাই পিছু হটল। আর ঠিক তখনই এদিকে গাড়ি দিয়ে চলে যেতে যেতে ওসব দেখে কারান চৌধুরি থেমে গেলেন। যে বেতটা দিয়ে মেয়েটিকে মারা হচ্ছিল, সেটাই তুলে নিয়ে ছেলেটাকে পেটাতে শুরু করলেন।”
এই কথাগুলো শোনার পর মিরার চোখে অদ্ভুত আলো জ্বলে উঠল। ঠোঁটের কোণে মুগ্ধময় মৃদু হাসি ফুটে উঠল। মুখ দিয়ে হঠাৎ করেই বেরিয়ে এলো, “তার মানে বাবা ভুল মানুষকে পছন্দ করেনি।”
সে হেসে ফেলল। হাসির মধ্যে ছিল প্রশংসা, আর অন্তর্নিহিত ছিল অজানা আকর্ষণের কাঁপুনি। মনে মনে ভাবল, “যে পুরুষ অন্যের স্ত্রীর প্রতি এমন স্পষ্ট প্রতিবাদ করতে পারে, নিজের স্ত্রীর জন্য তো সে ঢাল হয়ে আগুনের মধ্যেও রক্ষা করবে। হায় আল্লাহ! এ তো বুঝি আমার আজ রাতের নিদ্রাও ছিনিয়ে নেবে।”
তার চোখে এখন গভীর মোহের ছায়া খেলা করছে। কারানকে দেখতে দেখতে তার মনে হলো, সে যেন নৈর্ব্যক্তিক বাস্তবতার কঠিন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা এক জীবন্ত ন্যায়বিচারক। কালো স্যুটের পেছনে লুকানো কঠোর শারীরিক কাঠামোর মাঝে এক অভিজাত পুরুষসত্তার গন্ধ মিরাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে।
আর তখনই কারান মিরার দিকেই এগিয়ে এলো। মুহূর্তেই মিরার ভেতরটা প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে উঠল, হৃদস্পন্দনের গতি বেড়ে গিয়ে গলা শুকিয়ে এলো। আর কিছুই ভাবতে পারল না। চোখ কারানের পানে স্থির, আর সাথে নিঃশ্বাসও ভারি হয়ে আসছে।
তবে কারানের সেই গভীর নীল চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারেনি। এক সময় চোখ নামিয়ে ফেলল। তার সমস্ত শক্তি যেন টালমাটাল হয়ে যাচ্ছিল। কারান ধীরে ধীরে কাছে পৌঁছাতেই তার হৃৎস্পন্দন আরো দ্রুত বাড়ছিল।
কারান মিরার ঠিক পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছিল। পাশ থেকে যেতেই সুগন্ধির গাঢ় উষ্ণ অ্যাম্বার আর মিষ্টি গোলাপের রাজকীয় সুবাস ছড়িয়ে গেল মিরার নাকে। এবার মিরার হৃৎস্পন্দন এত দ্রুত হয়ে ওঠে যে, তার মনে একটাই ভাবনা আসে, “এ-এটা আসলেই কি হচ্ছে?”
হঠাৎ কারান পেছন ফিরে মিরার দিকে তাকিয়ে বলল, “এক্সকিউজ মি।”
শব্দটা শুনেই মিরার অন্তর্গত আত্মা কেঁপে উঠল। মুহূর্তে মনে হল, পায়ের নিচের জমিন সরে যাচ্ছে, বুকের মাঝে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। প্রথমবার কোনো পুরুষ তাকে ডাকল, অথচ সেই পুরুষই তার নিয়তি হয়ে আসতে চলেছে। অর্থাৎ তারই হবু বর। অজানা শিহরন তার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। সে কী করবে, কী বলবে—কিছুই বুঝতে পারল না। এমনকি পিছনে কারানের দিকে মুখও ঘুরানোর সাহস পেল না।
মিরার চোখে তখন দ্বিধার খেলা চলছে। চোখ তুলে তাকাতেও ভয় করছে, আবার চোখ না তুললেও অনুচিত হবে। অথচ পা যেন মাটি ভেদ করে শেকড় গেঁথে ফেলেছে, এক চুলও নড়তে পারছে না সে।
কারান পিছন থেকেই মিরার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল, “এইভাবে রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে থাকলে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। প্লিজ মুভ টু দ্য ফুটপ্যাথ।”
এরপর সে পা বাড়িয়ে দ্রুত উঠে পড়ল তার চকচকে বুগাটি শিরন গাড়িতে। গাড়ির চাকায় ধুলো উঠে এলো, আর মিরার সামনে থেকেই শহরের রাস্তায় হাওয়ার বেগে মিলিয়ে গেল। তবুও মিরা নিশ্চল, নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
ততক্ষণে পাশের মহিলা একটু দূরে সরে গিয়েছিলেন। কিন্তু মিরার এমন অস্বাভাবিক নিঃসাড় দাঁড়িয়ে থাকা দেখে এগিয়ে এসে মিরার হাত ধরে ঝাঁকি দিয়ে বললেন, “মরতে চাও নাকি মেয়ে?”
চমকে উঠল মিরা। তারপর সচকিত হয়ে বলল, “আ… আমি যাচ্ছি, আন্টি।”
সামনে একটা রিকশা দেখে হাত নাড়ল সে, “এই মামা, যাবেন?”
রিকশাটা তার সামনে এসে থেমে গেল। মিরা ভদ্রভাবে মহিলাটিকে বিদায় জানাল। তবে ভিতরে তখনো চলছে অজানা আবেগের স্রোত, যা থামার নয়—শুধু বেড়েই চলেছে।
রিকশায় বসে হঠাৎ হেসে ফেলল মিরা। চোখের কোণে আনন্দ, আর ঠোঁটে লাজুকতা ফুটে উঠিল। মনে হলো, কারান নামের সেই অপরিচিত অথচ চেনা মানুষটি তার হৃদয়ের গোপন কুঠুরিতে প্রবেশ করে ফেলেছে।
‘এক্সকিউজ মি’ শব্দদুটি মন্ত্রের মতো বারবার বাজতে লাগল তার মনে। অন্তরের গভীরে ঢেউ তুলল সেই দৃঢ় স্বরের প্রতিধ্বনি।
আপনমনে একসময় গুনগুনিয়ে উঠল সে,
“চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে জো দিল কো,
নজর নেহি চুরানা সানাম…
বাদালকে মেরি তুম জিন্দেগানি,
কাহি বাদাল না জানা সানাম…”
তারপর হঠাৎ থেমে মুচকি হাসল। নিজের কাঁধে মাথা হেলিয়ে, চোখ বুজে আপন মনে উচ্চারণ করল,
“কবে আপনি এসে বলবেন,
বাহার বানকে আউ কাভি তুমহারি দুনিয়া মে।
গুজার না জায়ে ইয়ে দিন কাহি ইসি তামান্না মে…”
আলতো সমীরে তার স্কার্ফটি নির্জন কোনো ছন্দে উড়ছিল। কিন্তু সে হারিয়ে ছিল নিজের ভাবনায়। কারানের সেই মৃদু ‘এক্সকিউজ মি’ উচ্চারণেই মিরার হৃদয়ের গভীরে কোনো নিষ্কলুষ আবেগ এক লহমায় জেগে উঠল। সেই এক নিমিষেই, ভেতরের অদৃশ্য এক সত্তা প্রথমবার কোনো পুরুষকে নিবিষ্টভাবে নিজের ভবিষ্যতের সঙ্গে জুড়ে ফেলল।
______
বাড়ির দরজায় পা রেখেই মিরা চোখ নামিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ে।
রান্নাঘরে মা ব্যস্ত, টেবিলের এক কোণে বসে ইলিজা খাওয়ায় মন দিয়েছে। মিরাকে দেখেই ইলিজা উচ্ছ্বসিত গলায় বলে উঠল, “মিরু আপু! জানো আজকে সেনু কী করেছে?”
কিন্তু মিরা কোনো শব্দেই সাড়া দিচ্ছিল না। সে নেকাব খুলতে খুলতে সিঁড়ি বেয়ে উপরের দিকে উঠে গেল। মুখে তখনো অচেনা চাপা হাসি খেলা করছে।
ইলিজা আবারও ডাকল, “এই মিরু আপু!”
এবারও কোনো উত্তর নেই।
মিরার এই অদ্ভুত নির্বাক আচরণে কিছুটা অবাক হয়ে সে বিড়বিড়িয়ে বলল, “বুঝছি, আপুর কানের ডাক্তার দেখানো লাগবে। নাহলে জিজাজি একদিন ঠিকই বলবে—’এই মেয়ে তো কানে কালা!'”
একটা হালকা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে আবার খাবারের দিকে মন দিল।
এদিকে উপরতলায় পৌঁছে মিরা নিজের ঘরের দরজা টেনে দিল। দরজার কপাট বন্ধ হতেই যেন বাইরের পৃথিবী থেকে নিজেকেও বন্ধ করে দিল সে।
এরপর বোরখা খুলে, হাতমুখ ধুয়ে এসে বিছানায় এলিয়ে পড়ল। মধ্যাহ্নের নিঃসঙ্গ আলো জানালা গলে বিছানার চাদরে এসে পড়ছে।
অথচ বুকের গভীরে তখনো প্রতিধ্বনিত হচ্ছে সেই কণ্ঠস্বর, ‘এক্সকিউজ মি…’
এটা মনে হতেই হালকা হেসে জানালার বাইরে চোখ মেলে তাকাল সে। আকাশে দুপুরের রোদ গলে গিয়ে নরম রং ছড়িয়ে দিচ্ছে। মনে হলো, তার জীবনেও কে যেন নতুন রং ছুঁয়ে দিয়ে গেছে।
এই কি তবে প্রেম?
এই কি সেই অজানা আকর্ষণের কুয়াশা?
নাকি নিছকই এক সম্ভাবনার রঙিন বিভ্রম?
হঠাৎ বুকের ভেতর কেমন যেন করে উঠল। সে মনে মনে প্রশ্ন করল, “এই মানুষটা… এই কারান… ও সত্যিই কি আমার সমস্ত স্রোতের দিক পাল্টে দিতে চলেছে? এতটা অস্থির কেন হচ্ছি আমি? উফফ, এখন যে ভিতরে ভিতরে অশান্তি শুরু হয়ে গেছে।”
সে হেসে বালিশের নীচ থেকে একটি পুরোনো ডায়েরি বের করল। অনেকদিন পর ডায়েরির ভাঁজ খুলল। কলম তুলে আজকের তারিখ লিখল। তারপর শব্দ না বলে কলমের খোঁচায় শুধু লিখল, “আজ প্রথমবার কোনো পুরুষের স্বরে নিজেকে চিনলাম। কিন্তু কেন যেন মনে হয়, ঠিক এমন শব্দেই ডুবে যাওয়ার অপেক্ষায় আমি এতোদিন ছিলাম।”
ডায়েরিটা বন্ধ করে এক পাশে রাখা সাউন্ড বক্সে হাত রাখল। অত্যন্ত নীচু ভলিউমে গান ভেসে আসল,
“পেহেলি পেহেলি বার মোহাব্বত কি হ্যায়,
কুছ না সামাঝ মে আয়ে ম্যায় কেয়া কারু…
ইশক নে মেরি এইসি হালাত কি হ্যায়
কুছ না সামাঝ মে আয়ে ম্যায় কেয়া কারু…”
চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইল মিরা। ঠোঁটে তখনো সেই অনুচ্চারিত হাসির খেলা চলছে। অজান্তেই সে হয়ত ভালোবেসে ফেলেছে। কিংবা ভালোবাসার দিকে পা বাড়িয়েছে।
কিন্তু তাতে ক্ষতি কী? আর তো ক’টা দিন।
তারপরই সে হয়ে উঠবে কারান চৌধুরীর অর্ধাঙ্গিনী। তখন সমস্ত অপেক্ষা গিয়ে মিশবে এক অমোঘ ভালোবাসায়।
_________
[🔺রেড অ্যালার্ট: সহিং*সতা ও নির্মম নি*র্যাতনের বিবরণ সহ্য করা আপনার পক্ষে কঠিন হলে, অথবা আপনি যদি দুর্বল হৃদয়ের হন, অনুগ্রহ করে নিচের একটা প্যারা (___) এড়িয়ে পড়ুন।]
অ্যাব্যান আজও খু*নের উদ্দেশ্যে প্রস্তুত। কালো কোট-প্যান্টের সঙ্গে নিখুঁতভাবে ইস্ত্রি করা সাদা শার্ট চাপিয়ে নিল সে। ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা কালো কাচের পারফিউমের বোতল নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে তুলে নিল। ক্রীড অ্যাভেন্টাসের সুগন্ধ গায়ে মাখতেই মিশ্র ফলের সুবাস বাতাসে মিশে গেল। তার সাজগোজ দেখে যে কেউ ভাববে, সে বুঝি কোনো বিশেষ সভায় যোগ দিতে যাচ্ছে। অথচ তার লক্ষ্য ভয়াবহ, নৃ*শংস।
কালো ঘড়ির ফিতে শক্ত করে আঁটিয়ে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল।
ধীরে ধীরে হলঘরে নামতেই পিছন থেকে রোজালিনের আকুল কণ্ঠস্বর তার কানের পর্দায় ঝনঝনিয়ে উঠল, “অ্যাব্যান, প্লিজ! প্লিজ, মে*রো না আর কাউকে।”
অ্যাব্যানের পায়ের গতি থামল। ধীরে ধীরে ঘুরল সে। রোজালিন ইতোমধ্যেই এগিয়ে এসেছে। তার কাঁপতে থাকা হাত অ্যাব্যানের গালের ওপর রাখতেই তার মুখে শীতল দৃষ্টি নিবদ্ধ করল সে। রোজালিনের ঠোঁট কাঁপছিল, চোখের কোণে জমে থাকা জল টলমল করছিল, কিন্তু সে কান্না চেপে রাখল। ভয় আর ভালোবাসার অদ্ভুত দ্বন্দ্বে গলা ভার হয়ে উঠল। তার ভেতরে আতঙ্ক, কিন্তু সেই আতঙ্ক পেরিয়ে সে সাহস করে অ্যাব্যানকে থামাতে চায়। আর্দ্র চোখের গভীর আকুতি নিয়ে রোজালিন বলল, “প্লিজ, আর মে*রো না।”
অ্যাব্যানের চোয়াল শক্ত হলো। দাঁতে দাঁত চেপে সে শীতল কণ্ঠে বলল, “তোর এই বাধা দেওয়ার অভ্যাসটা বদলাস, রোজ। তোরই উপকার।”
রোজালিনের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠছিল, কিন্তু সে পিছু হটল না৷ চোখে ঝাপসা আবেগের আবরণ দেখা গেল। তার ঠোঁট কাঁপছিল; ভয় না প্রেমে, সে জানে না।
হঠাৎ কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই, সে কাতর আকুতি নিয়ে অ্যাব্যানের ওষ্ঠাধর নিজের ঠোঁটের মধ্যে নিয়ে চুমুর স্বাদ নিতে লাগল। কিন্তু অ্যাব্যান? সে নিথর দাঁড়িয়ে রইল, যেন কোনো পাথরের মূর্তি, নাকি অনুভূতিহীন কোনো অজানা অস্তিত্ব। তার মুখভঙ্গিতে কোনো নড়নচড়ন নেই, চোখে শূন্যতা খেলা করছে।
সে তাকিয়ে আছে শুধু৷ অথচ চোখে কোনো তাপ, কোনো বিস্ময় কিংবা কোনো প্রত্যাখ্যান নেই। রোজালিনের উষ্ণ ঠোঁট তার কঠিন ঠোঁটের দেয়ালে ঠেকে গেল।
একটু পর রোজালিন ধীরে ধীরে ঠোঁট সরিয়ে নিল। অ্যাব্যানের চোখে চোখ রেখে, বিষণ্ন কণ্ঠে বলল, “আমি শুধু একটা সুন্দর সংসার চাই, অ্যাব্যান। তা দেওয়া যায় না?”
তার কণ্ঠে ছিল না কোনো অভিযোগ, ছিল শুধু আবেগঘন অনুনয়। অথচ অ্যাব্যান চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে হালকা বিস্ময় খেলে গেল, যেন মেয়েটা এখনও বোঝেনি সে কার সঙ্গে কথা বলছে। নিশ্চয়ই রোজালিনের জ্ঞানবুদ্ধি লোপ পেয়েছে। সংসার? তার সঙ্গে?
সে কি জানে না—অ্যাব্যান নামে কোনো মানুষ নেই!
আছে কেবল এক অন্ধকার অস্তিত্ব, যে সৃষ্টি হয়েছে শুধু র*ক্তের ক্ষুধা নিবারণের জন্য।
তার ঠোঁটের কোণে একটুখানি বাঁকা হাসি ফুটল। তবে কোনো শব্দ বের হলো না, এটা তো শুধু নীরব উপহাস। সে রোজালিনের কথায় কান না দিয়ে, আবার সামনের দিকে পা বাড়াল।
রোজালিন তার পথ আটকে দুই হাত ছড়িয়ে সামনে দাঁড়াল। এবার তার চোখে কান্না নেই, আছে তীক্ষ্ণ বিদ্রোহ। কণ্ঠে আগুন মেশানো শীতলতা নিয়ে বলল, “আমাকে মে*রে ফেলছো না কেন?”
অ্যাব্যান রোজালিনের সামনে এসে হালকা ঝুঁকলো। তার ঠোঁটে বিদ্রূপাত্মক হাসি খেলে গেল। ঠান্ডা স্বরে বলল, “ম*রতে চাইলে বল। সময় নষ্ট করব না।”
রোজালিন চোখ নামিয়ে ফেলল। হ্যাঁ, সে মর*তে চায়। কিন্তু কেন জানি পারে না। প্রতিবারই কীসের যেন একটা আকুল টান তাকে আটকে রাখে।
অতিরিক্ত কথা বলা অ্যাব্যানের বরাবরই অপছন্দের। সংক্ষিপ্ত বাক্যে সার কথাটি বলে দেওয়াই তার স্বভাব। অথচ এই মেয়েটার জন্যই বারবার মুখ খুলতে হয় তাকে।
গভীর দৃষ্টিতে রোজালিনের চোখে চোখ রাখল অ্যাব্যান। আপনমনে বলল, “তোকে শিকার হিসেবে তুলে রেখেছি, নাহলে কবেই শেষ করে দিতাম। যেদিন কোনো শিকার মিলবে না, সেদিন তোর খেলা শেষ। তবে ভাগ্য ভালো, প্রতিদিনই কেউ না কেউ ধরা পড়ে যাচ্ছে।”
একটু থেমে সে চোখ তুলল। তার ঠোঁটে সেই রহস্যময় হাসি খেলা করল, “আজ অন্য খেলায় মন গেছে আমার। চলো, উপরে চলো, ডার্ক এঞ্জেল।”
এরপর কোনো সতর্কতা ছাড়াই রোজালিনকে কোলে তুলে নিল সে। রোজালিন নির্বিকার। জানে, কী ঘটতে চলেছে। অভ্যস্ত ক্লান্তির মতো সে নিজেকে ছেড়ে দিল অ্যাব্যানের হাতে। অথচ তার হৃদয়ের এক কোণে নিঃশব্দ চিৎকার জেগে উঠেছিল, ‘আমাকে যেতে দাও, অ্যাব্যান। প্লিজ যেতে দাও।’
কিন্তু শব্দগুলো উচ্চারণ করলে পারেনি সে। হয়ত বা চায় নি।
উপরতলায় পৌঁছে অ্যাব্যান তার কাপড় টেনে টেনে ছিঁড়ে ফেলতে লাগল। তার সব কাপড় মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল। তবুও রোজালিন চুপ।
তারপর অ্যাব্যান তাকে বিছানায় ঠেলে ফেলে দিল। নিজেকেও সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে প্রস্তুতি নিতে লাগল। একসময় রোজালিনকে বল প্রয়োগের মাধ্যমে বেঁধে নিজের করে নিতে হতো, কিন্তু এখন আর তার প্রয়োজন পরে না। রোজালিন এখন এসবে অভ্যস্ত। অ্যাব্যান নিঃশব্দে বিছানার উপর উঠে এলো। মুহূর্তেই এক নিশ্বাসে রোজালিনের ঘাড়ে দাঁত বসিয়ে দিল। কা*মড়টা শুধুই হিংস্র ছিল না—তা ছিল অস্তিত্বভেদী ও ধ্বংসাত্মক। রোজালিনের ত্বকের নিচে গুমরে ওঠা শিরা চিরে উষ্ণ র*ক্ত গড়িয়ে পড়ল। টুপটাপ শব্দে ফোঁটা ফোঁটা করে র*ক্ত চুঁইয়ে পড়ল বিছানায়। চাদরের শুভ্র অংশ রাঙিয়ে দিল।
ব্যথা যেন তার শিরা উপশিরায় আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল। শরীরটা যন্ত্রণার ভারে পাথর হয়ে গেল। অথচ রোজালিনের মুখে একটুও টান পড়ল না, কপালে বিন্দুমাত্র ভাঁজ পড়ল না।
রোজালিন নিজেকে ফিসফিস করে বলল, “আরেকবার তুমি ধ্বংস হতে যাচ্ছ, রোজালিন। চুপ। একদম চুপ। কান্না করবে না। ওর সামনে একটুও দুর্বল হবে না।”
কিন্তু বুকের গভীরে ছিল এক বিষাক্ত দহন। মনে হয়, কেউ ওর হৃদয়ে ধীরে ধীরে একটা জ্বলন্ত কয়লা পিষে দিচ্ছে। শ্বাসপ্রশ্বাস এলোমেলো হয়ে গেল, নিশ্বাস নিতে গিয়েও মনে হচ্ছিল কেউ যেন বুকের উপর ঠেসে বসে আছে।
অ্যাব্যানের শীতল নিশ্বাস তখন ওর ঘাড় বেয়ে নিচে নামছিল। যা বিষের মতো কাঁপুনি জাগালো রোজালিনের শরীরে। রোজালিন অনুভব করল ভয় নয়, বরং নিঃস্বতা তাকে গ্রাস করছে। শরীরের প্রতিটি কোষ থেকে সাহস ছিঁড়ে নিয়ে যাচ্ছে কেউ।
তারপর শুরু হলো সেই বিকৃত খেলা। শরীরের একের পর এক অংশ র*ক্তাক্ত হতে লাগল। ত্বক ফুঁড়ে লাল রেখা গড়িয়ে পড়ল, ব্যথার ঢেউ স্নায়ুর উপরে আছড়ে পড়ল। কিন্তু রোজালিন পাথরের মতো স্থির। এত যন্ত্রণা হচ্ছে, তবুও সে নীরব কেন?
অর্থাৎ রোজালিনের ভিতরে এক ভয়ংকর যুদ্ধ চলছে। তার আত্মা যেন ধীরে ধীরে গলতে থাকা বরফ, যার প্রতিটি ফোঁটা দগ্ধ হয়ে পড়ছে হৃদয়ের অন্ধকার কুঠুরিতে। ভয়, লজ্জা, ঘৃণা আর বিদ্রোহ একসাথে কুণ্ডলী পাকিয়ে গলায় উঠে আসতে চাইছে, কিন্তু বিষণ্নতায় কণ্ঠ আটকে আছে। কারণ সে জানে, এই চিৎকার ওর পরাজয়ের স্বীকৃতি হয়ে যাবে।
কয়েক ঘণ্টা ধরে অ্যাব্যানের নৃ*শংসতা অব্যাহত থাকল। রোজালিনের মুখের পেশি ব্যথায় কুঁচকে গেল, কিন্তু কোনো চিৎকার বের হলো না। চোখে পানিও জমলো না। কি জানি, সে মানুষ নাকি পাথর!তবে চোখে এক বিন্দু জল না থাকলেও, মনের ভিতর নিঃশব্দ কান্না নিরন্তর বয়ে চলেছে। সে নিজেকে ঘৃণা করে, এই চামড়া, এই স্ত* নকে ঘৃণা করে, দেহের প্রতিটি ক্ষ*তকে ঘৃণা করে, এই অক্ষমতা আর নীরবতাকে ঘৃণা করে।
অবশেষে অ্যাব্যান উঠে দাঁড়ালো। তার শিকারের উপর চোখ বুলিয়ে ঠোঁট চাটল। ট্রাউজার পড়ে নিয়ে আরও ভয়াবহ এক খেলায় প্রবেশ করল সে।
একটা চাবুক টেনে নিয়ে এলো। চাবুকের প্রথম বারিতেই রোজালিনের শরীর কেঁপে উঠল, মেরুদণ্ড বেঁকে এলো। সে শক্ত করে বিছানার চাদর খামচে ধরল, ব্যথায় গুটিয়ে গেল, কিন্তু তবুও চিৎকার করল না। তারপর রোজালিনের ন*গ্ন শরীরে একের পর এক আ*ঘাত করতে লাগল। সে বারবার স্ত* নের উপর আঘাত করে ক্ষ*তবি*ক্ষত করে ফেলল। আ*ঘাতের তীব্রতায় র*ক্ত ঝরলো, ব্যথায় স্ত* নবৃন্ত ফুলে উঠল।
হালকা গোঙানির শব্দ বের হলো, কিন্তু তাতে কোনো করুণতা নেই, কোনো আকুতি নেই। সে জানে, অ্যাব্যান চিৎকারের শব্দ ভালোবাসে।
তাই রোজালিন মনে মনে বলল, “আমাকে সহ্য করার শক্তি দাও, সৃষ্টিকর্তা। আমি ওর বিজয়ের আনন্দ দেখতে চাই না।”
অ্যাব্যান একটানা রোজালিনের দিকে তাকিয়ে রইল৷ ঠান্ডা স্বরে বলল, “তোর ভাগ্য ভালো, আমি এখনো তোকে বাঁচিয়ে রেখেছি। কিন্তু কবে পর্যন্ত, জানি না।”
রোজালিন এক মুহূর্ত তার চোখে চোখ রাখল, তারপর আবার দৃষ্টি নিচে নামিয়ে ফেলল। কিন্তু কিছুই বলল না। মৃ*ত্যু তার জন্য মুক্তি ঠিকই, কিন্তু কোনো একটা কারণে সে মৃ*ত্যুকে বরণ করে চায় না।
হঠাৎই অ্যাব্যান রোজালিনের চুলের মুঠি ধরে তাকে টেনে তুলল। সে এক ঝটকায় রোজালিনকে দেয়ালের দিকে ছুঁড়ে দিল। ধাক্কার শক্তিতে তার হাড় কেঁপে উঠল, পিঠের নিচের অংশে যন্ত্রণার স্রোত বয়ে গেল। কিন্তু তবুও সে কোনো শব্দ করল না। শুধু এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করে নিজেকে সামলে নিল।
অ্যাব্যান এগিয়ে গিয়ে তার চিবুকের নিচে আঙুল রাখল, মুখটা তুলে আলোতে ধরল। তারপর একটা থাপ্পড় মারল। রোজালিনের মাথা একপাশে ঘুরে গেল, ঠোঁট ফেটে থুতনিতে র*ক্ত গড়িয়ে পড়ল।
সে ফিসফিস করে বলল, “আমি তোর চিৎকার শুনতে চাই, রোজ।”
কিন্তু কোনো উত্তর এলো না। সে কার সাথে কথা বলছে? রোজালিন কি তবে মানুষ নয়? এত যন্ত্রণার পরও কেউ কীভাবে টু শব্দ না করে থাকে? এটাও কি সম্ভব? হয়ত সম্ভব! যদি মনের জোর অটল থাকে।
এবার অ্যাব্যান ক্রোধে ফেটে পড়ে কোমরের বেল্ট খুলে এক ঘূর্ণিতে সেটাকে রোজালিনের গায়ে নামিয়ে আনল। চটাং করে তার পিঠের উপর বেল্টের বারি পড়ল। বাতাসে কেটে যাওয়া আওয়াজ যেন মাংস ভেদ করে আত্মায় গিয়ে বিঁধল। প্রথম আঘাতেই ত্বক ফেটে ক্ষ*ত দেখা দিল। এরপর নরম দেহটার উপরে একের পর এক আ*ঘাত নামতে থাকলো। বেল্টের ধাতব অংশ গায়ে লেগে মাংস চি*রে দিচ্ছে—প্রতিটি ঘায়ে নতুন করে র*ক্ত ঝরছে। কোথাও ত্বক ফেটে নীলচে-লাল হয়ে ফুলে উঠেছে, কোথাও আবার পু* ড়ে যাওয়া মাংসের মতন কালচে ছোপ দেখা যায়।
সে আবার আঘাত করল। এবার কাঁধে মারলো, তারপর পাঁজরে। হাড় যেন গুঁড়িয়ে গেল। র*ক্ত গড়িয়ে পড়ছে বিছানার কিনারে। অথচ সে নড়ল না। কাঁপলও না। শুধু ঘন ঘন নিশ্বাস নিচ্ছে। জিভে র*ক্তের লবণাক্ত স্বাদ জমে আছে। গালের পাশ বেয়ে ঘাম মিশে গেছে র*ক্তের সঙ্গে। হাতের আঙুলগুলো বিছানার চাদরে শক্তভাবে গেঁথে গেছে। কিন্তু কোনো আর্তনাদ নেই। প্রতিটা আ*ঘাতে তার পেশিগুলো অনিয়মিতভাবে কেঁপে উঠছিল, নখগুলো নিজের তালুর মাংসে গেঁথে গেছে। ঠোঁট কামড়ে রাখার এত চেষ্টা সত্ত্বেও, একবার ঠোঁটের কোণ থেকে চাপা গোঙানির শব্দ বেরিয়ে এলো। তার শীতল ভাব অ্যাব্যানকে আরও ক্ষিপ্ত করে তুলছে।
একসময় সে বিরক্ত হয়ে বেল্ট ফেলে দিল। রোজালিন তখনো চোখ বন্ধ করে পড়ে আছে। অ্যাব্যানের ঠোঁটে পৈশাচিক হাসি ফুটে উঠল। সে ধীরে ধীরে নীচু হয়ে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে এলো।
ফিসফিস করে বলল, “আর ইউ ওকে, বেইব?”
নিঃশব্দ হিংস্রতায় আচমকা তার কানে দাঁ* ত বসিয়ে দিল সে। প্রথম কাম*ড়েই কান ছিঁড়ে র*ক্তের ফোঁটা গালের কিনার বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। দ্বিতীয় কা*মড়ে মাংস ছিঁড়ে ক্ষ*ত আরও গভীরে পৌঁছাল। মুহূর্তেই কানের পাশে লালচে র*ক্ত ছড়িয়ে পড়ল, গলার রেখা ধরে গাঢ় হয়ে নামতে থাকল। ব্যথায় চোখজোড়া ছলছল করলেও রোজালিন ঠোঁট চেপে ধরে রাখল।
এবার অ্যাব্যান পেছনে সরে গেল। তবে তার র*ক্তাক্ত শরীরটাকে দেখে আরও আনন্দ পেল।
অ্যাব্যানের প্রতিটি আ*ঘাত তাকে ভেঙে ফেলেছে, কিন্তু ভেতরে সে প্রতিজ্ঞা করে বসে আছে, “আমি চিৎকার করব না। আমাকে কাঁদাতে পারবে না। আমার দেহ তার খেলার মাঠ হতে পারে, কিন্তু আত্মা নয়।”
এদিকে অ্যাব্যান আরেকটা নতুন অস্ত্র খুঁজতে চলে গেল।
আর রোজালিন ঠোঁট কা*মড়ে ধরে তখনো শুয়ে আছে। নিজের সঙ্গে নিজের যুদ্ধ চলছে তার। রোজালিন আপনমনে বলল, “আরেকটু, আরেকটু সহ্য করো, রোজালিন।”
শরীর থেকে র*ক্ত গড়িয়ে গড়িয়ে বিছানার চাদরে র*ক্তিম রেখা আঁকছে, অথচ সে নির্বিকার। শ্বাস ভারী হয়ে আসছে, তবু তার ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে একটি শব্দও বের হলো না। রোজালিনের র*ক্তাক্ত চামড়ার নিচে দগদগে ক্ষ*ত ফুটে উঠছে, অথচ সে একটিবারও চিৎকার করেনি। নিঃশব্দ কষ্টেরও তো এক প্রকার অহংকার থাকে।
অ্যাব্যান পুনরায় রোজালিনের শরীরটাকে র*ক্তাক্ত করার জন্য ফিরে এলো। অ্যাব্যান এক ঝটকায় তাকে বিছানার একপাশে উল্টে দিল। তারপর শরীরের নরম স্থানে আঙুল চালিয়ে আঁ*চড় দিতে লাগল, যেন যন্ত্রণা দ্বিগুণ তীব্র হয়। পিঠের নিচের অংশে হাত চালিয়ে খামচে ধরল, এমনভাবে যেন চামড়াটা তুলে ফেলতে চায়। গরম র*ক্ত বিছানার চাদরের সাথে ভিজে গিয়ে একটা তামাটে ছোপ তৈরি করেছে। চাদরের একপ্রান্ত স্যাঁতস্যাঁতে, বালিশের পাশ ঘামে আর র*ক্তে ভিজে গিয়ে অদ্ভুত রকমের দাগ তৈরি করেছে। ঘরে ভ্যাপসা গরম আর গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসছে রোজালিনের।
পিঠের মাঝ বরাবর লালচে কালো দাগ উঠেছে, কিছু জায়গায় চামড়ার ওপরের স্তর উঠে গিয়ে কাঁচা মাংস বেরিয়ে পড়েছে। কিছু ক্ষ*ত এখনো র*ক্তাক্ত, আর কিছুটা ঘন হয়ে শুকিয়ে খয়েরি হয়ে গেছে। রোজালিনের নিশ্বাস কেঁপে উঠল, কিন্তু তবুও শব্দ করল না। অথচ রোজালিনের এতক্ষণের সমস্ত প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে একফোঁটা জলরাশি নীরব অভিসম্পাত হয়ে গড়িয়ে পড়ে। গাল বেয়ে নিচে নামতে না নামতেই অ্যাব্যান থেমে গেল। কিন্তু সে দয়ার বশে থামেনি; তার জয় হয়ে গেছে, তাই থেমেছে। রোজালিন কষ্ট পাচ্ছে। আর এই অশ্রুবিন্দু তার চূড়ান্ত বিজয়ের সাক্ষী। তাছাড়া অ্যাব্যান তো কেবল যন্ত্রণা দেখতেই ভালোবাসে।
অ্যাব্যান ঠোঁটের কোণে এক চিলতে নির্মম হাসি টেনে সিগারেট ধরায়। সিগারেটের আগুন ধীরে ধীরে জ্বলে উঠল। র*ক্তের দাগে ভেজা আঙুলে ধোঁয়ার কুণ্ডলী ছড়িয়ে ফ্রিজের দিকে এগিয়ে যায়। দরজা খুলতেই লাল রঙের কয়েক বোতল তাজা র*ক্ত দেখা যায়। এক বোতল তরল উঠিয়ে নিয়ে, কোনো বিরক্তি বা ঘৃণা ছাড়াই তৃষ্ণার্ত দানবের মতো সে গলা দিয়ে র*ক্ত ঢেলে দেয়। অর্থাৎ এটাই তার জন্য সবচেয়ে পবিত্র পানীয়।
রোজালিন স্তব্ধ, নিঃসাড় শরীরে শুয়ে রইল। একবার অ্যাব্যানের দিকে চোখ তুলে তাকালো।
রোজালিন আনমনে বলল, “বড় দাঁত ছাড়া ভ্যাম্পায়ার হয়ত কেউ দেখেনি। কিন্তু আমি দেখেছি। আমার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে সেই ন*রখাদক দানব।”
হঠাৎ অ্যাব্যানের দৃষ্টি আবার রোজালিনের দিকে ফেরে। তার ঠোঁটের কোণে শয়*তানি হাসি খেলে গেল। সে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে, হিংস্র শ্বাপদের মতো তার ক্ষ*তবিক্ষত শরীরের উপর ঝুঁকে পড়ে। তার র*ক্তাক্ত স্ত* নের ওপর তর্জনী বুলিয়ে নেয়। পরে তর্জনীর ডগায় র*ক্তের গাঢ় বেগুনি আভা তুলে নিয়ে তা নিজ ঠোঁটে মেখে নেয়। ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা র*ক্ত চেটে খেতে খেতে এমন স্বাদ উপভোগের মুখভঙ্গি করে, যেন কোনো মহার্ঘ খাবারের স্বাদ গ্রহণ করছে সে।
অ্যাব্যানের চোখদুটো তীব্র উল্লাসে চকচক করছিল। সে যেন প্রতিটি যন্ত্রণার স্তরে আনন্দের নতুন সুর খুঁজে পাচ্ছে। র*ক্তাক্ত আঙুল চেটে খেতে খেতে তার চোখের তারা বড় হয়ে উঠছে।
রোজালিন নিস্পন্দ, অথচ তার চোখের গভীর শূন্যতার নিচে ধিকিধিকি ঘৃণা জ্বলছে।
অ্যাব্যান আজকাল কিছুটা কথা বলে, যা আগে শোনা যেত না বললেই চলে। কিন্তু তার বলা প্রতিটি শব্দ ধ্বংসের দোরগোড়ায় টেনে নিয়ে যায়।
অ্যাব্যান একটানা র*ক্ত চেটে খাওয়ার পর কটাক্ষভরা হাসি ছুঁড়ে দিয়ে একপাশে মাথা কাত করে বলল, “এভাবে ন*গ্ন হয়েই থাকবি? থাক, তোকে এমনভাবে দেখতে চোখের তৃপ্তি মেলে, ডার্ক এঞ্জেল।”
রোজালিন প্রতিক্রিয়াহীন তাকিয়ে থাকে। অ্যাব্যানের অনুতপ্তিহীন কণ্ঠস্বর আর কোনো বিষ ঢালে না তার র*ক্তে, কারণ সে এখন সমস্ত অনুভূতির সীমা পেরিয়ে গেছে। এক গহিন অবচেতনতায় ঢুকে গেছে যেখানে বেঁচে থাকাটা শুধুই এক নিষ্ঠুর সময়ের অপেক্ষা।
তার শরীরটা এখন আর শরীর নেই; মাংসপিণ্ড আর ছিন্নবিচ্ছিন্ন চামড়ার এক ধ্বংসস্তূপ। পিঠজুড়ে ন*খের খামচে তোলা গভীর আঁ*চড়, কাঁধের কাছে জ্বলন্ত সিগারেটের ফোঁড়ন, ঊরু থেকে হাঁটু পর্যন্ত লাল-নীল ক্ষ*তের ছোপ, আর বুকে জমে থাকা র*ক্ত যেন এক ঘনচাপা পাথরের মতো ভার হয়ে আছে।
শরীরের প্রতিটি জোড় এখন কাঁপতেও ক্লান্ত। চোখজোড়া ফেটে পড়ার মতো লাল, কিন্তু কান্না নেই। কেবল একফোঁটা পানি, যা ঠিক চোখের কোণেই জমে থাকে, ঝরে পড়ে না। ফোঁটাটা অভিমান নিয়ে আটকে থাকে সেখানে।
এমন একটা ভয়াবহ সময়ে পিছন থেকে নরম মিষ্টি এক কণ্ঠস্বর বাতাসে ভেসে আসে।
“পাপ্পা।”
রোজালিনের বুকে শব্দটা বজ্রপাতের মতো আ*ঘাত হানে। সে দ্রুত পাশ ফিরে তাকায়। তার চোখ বিস্ফারিত হয়। গলা শুকিয়ে আসে। শরীর কাঁপতে থাকে। তার দেহের প্রতিটি কোষ আতঙ্কের শীতল স্রোতে জমে যায়।
তার শুষ্ক ঠোঁট ফিসফিস করে নড়ে উঠল, “ক্লেরা… মা, মা তুমি এখানে কেন এসেছ? হে ঈশ্বর, আমার মেয়েকে রক্ষা করুন।”
তার বুক ধড়ফড়িয়ে ওঠে। ক্লেরা রোজালিনেরই এক অপরিণত প্রতিচ্ছবি; কোঁকড়ানো রক্তলাল চুল, দুধে ধোয়া মুখশ্রী। তবে চোখ দুটো অ্যাব্যানের মতো গভীর, আর চোখের রংটাও তার মতোই। ক্লেরার মধ্যে শিশুসুলভ সরলতা এখনো জীবিত। গায়ে লাল কালোর মিশ্রণে গোল ড্রেস, চোখে উৎসুক বিস্ময় খেলা করছে।
অ্যাব্যান আড়চোখে ক্লেরার দিকে তাকায়, তার ঠোঁটের কোণে নিষ্ঠুর হাসি খেলা করে।
সে ঠান্ডা, গভীর কণ্ঠে বলল, “এদিকে এসো, মাই হার্ট।”
ক্লেরা হেসে ছোট্ট পায়ে তার দিকে এগিয়ে আসে। র*ক্তাক্ত এই ঘর, আর বিষাক্ত বাতাসের মাঝে শিশুটির সেই হাসি যেন এক নিষ্পাপ ফুল। সে তো বুঝতেও পারছে না, কী ভয়াবহ মৃত্যুফাঁদের মধ্যে পা ফেলেছে সে। কাছে আসতেই অ্যাব্যান তাকে কোলে তুলে নেয়।
র*ক্তাক্ত ঘরের কুৎসিত বাস্তবতা তার বুদ্ধিতে ধরা পড়ে না, কিন্তু হৃদয়ের ভাষা তো শিশুরাও বোঝে।
তার দিকে চেয়ে থেকে রোজালিনের নিশ্বাস আটকে এলো। তার হৃদস্পন্দনও যেন বন্ধ হয়ে আসছে। সে দ্রুত বিছানার চাদরটা গায়ে জড়িয়ে নিল। অর্থাৎ মেয়ের সামনে নিজের ক্ষ*তবিক্ষত কায়া আড়াল করতে চাইছে।
কিন্তু অকস্মাৎ ক্লেরা যখন রোজালিনের আহত মুখাবয়বের দিকে তাকাল। তার নিষ্পাপ চোখে ধরা পড়ে র*ক্তে ভেজা, ছিন্নভিন্ন এক শরীর। র*ক্ত-আঁচড়ে ছোপ ছোপ হয়ে আছে চাদর, বালিশ, এবং মায়ের বুক। এসব অবলোকন করে তার ছোট্ট থুতনি কাঁপতে লাগল। চোখ বড় বড় হয়ে গেল। মায়ের শরীরের র*ক্তাক্ত চিত্র দেখে শিশুমন অসহায় হয়ে পড়ে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল সে। তার কচি কণ্ঠে বলল, “পাপ্পা… মামমাম… কি ওয়েচে (হয়েছে) মাম্মামের?”
ক্লেরার কান্না ফেটে পড়তেই রোজালিন আর নিজেকে সামলাতে পারল না। এক ঝটকায় উঠে বসে মেয়েকে নিতে গেল সে।
ঠিক তখনই অ্যাব্যানের চোখ লোহিত আভায় দপদপ করতে লাগল। সে আড় চোখে রোজালিনের পানে তাকালো। তার চোখের আগুন দেখে রোজালিন থমকে গেল, গিলে ফেলল সব কথা। তার হাত থেমে যায়। শরীরের সমস্ত শক্তি লোপ পেয়ে যায়।
অ্যাব্যান চোখ সরু করে ক্লেরার দিকে তাকায়। তার ঠোঁট থেকে শীতল অথচ ভয়ানক শব্দমালা নিসৃত হয়, “অ্যাব্যান ডি রেভেনের মেয়ের চোখ থেকে পানি পড়া মানায় না। পানি মুছে ফেলো জলদি, নাহলে তোমার ওই চোখই আমি তুলে ফেলবো।”
অথচ এক নিষ্পাপ শিশুকে ভয় দেখানোর মধ্যে একটুও করুণা নেই তার কণ্ঠে। ক্লেরা যদিও পুরোপুরি বোঝে না কথাগুলোর অর্থ, তবুও আতঙ্কিত হয়ে দু’হাতে চোখ মুছতে থাকে।
এদিকে রোজালিনের গা ঠান্ডা হয়ে আসে। হাত-পা কাঁপতে থাকল। তার স্নায়ু যেন পাথর হয়ে গেছে। এই ছোট্ট শিশুটিই তো একমাত্র কারণ, যে কারণে সে ম*রতে চেয়েও পারে না।
________
ঢাকার এক অভিজাত পাঁচতারকা হোটেলের ছাদবাগানে আয়োজিত হয়েছে মিরা ও কারানের বিবাহোৎসব।
সূর্যাস্তের ঠিক প্রাক্কালে শুরু হয় এই মোবারক আনুষ্ঠানিকতা। পশ্চিমাকাশের বিদায়ী নরম আলো যখন ধীরে ধীরে ঝিমিয়ে আসছে, তখন সোনালি ফেয়ারি লাইটে সেজে ওঠা বাগান যেন বাস্তব আর কল্পনার মাঝামাঝি কোনো জাদুকরী প্রান্তর বলে মনে হয়।
বাগানের কেন্দ্রে সুচিন্তিত নকশায় বিভক্ত করা হয়েছে নারীদের ও পুরুষদের পৃথক বসার জায়গা। পুরো আয়োজন পর্দা ও পরিমিত দূরত্ব বজায় রেখে করা হয়েছে।
কনের প্রবেশ ঘটে পবিত্র ধ্বনিতে মুখরিত পরিবেশে “সুবহানাল্লাহ”ও “বারাকাল্লাহু লাকা” পাঠের মাধ্যমে। চারপাশে অতিথিরা দাঁড়িয়ে দোয়া করেন নবদম্পতির জন্য। মিরা মাথা নীচু করে ধীরগতিতে হাঁটে। অর্থাৎ অন্তর্গত আবেগের ভারে পায়ের গতি শ্লথ হয়ে এসেছে। আনন্দ, সংশয়, আর শঙ্কার এক নিবিড় মিশ্রণ ফুটে উঠেছিল তার মুখাবয়বে।
তার সাজসজ্জা ছিল পরিশীলিত ও প্রাচুর্যমণ্ডিত।মাথায় ছিল সোনালি জরির পাতলা টিস্যু কাপড়ের ঘোমটা, যা সামনের অংশে নেমে মুখখানি আবছা ঢেকে রেখেছিল। চোখে ছিল সুগভীর কাজল আর গালে স্নিগ্ধ রঙের আলিপ্ত মেকআপ। হাতে ফুটে ছিল মেহেদির ঘন অলংকরণ, যেখানে এক কোণে অতি সূক্ষ্মভাবে খচিত ছিল ‘K’।
তার পরনে ছিল রাজকীয় মেরুন রঙের কাঞ্চিপুরম সিল্ক শাড়ি, যার গায়ে সোনালি জরির অপরূপ সূক্ষ্ম কাজ করা। শাড়ির পল্লু জুড়ে ছিল খাঁটি সোনার তারে বোনা জটিল নকশা, তাতে বসানো ছিল ক্ষুদ্র হীরা, রুবি ও এমারেল্ড পাথর। সিল্কের কোমল ভারি কাপড়ে যখন আলো পড়ছিল, তখন মনে হচ্ছিল যেন রোদের ঝিকিমিকি ছড়িয়ে পড়েছে তার গায়ে।
একটু পর কারানও উপস্থিত হলো। সবাই তার আগমনের জন্যই প্রতীক্ষায় ছিল। কারান পরেছিল নিখুঁত কাটিংয়ের বারগান্ডি স্যুট; যার উপর সূর্যের আলো পড়লে গাঢ় রঙে একটা রাজকীয় ছটা মেলে। ভিতরে ছিল অ্যাশ গ্রে ওয়েস্টকোট, সাদা শার্ট আর গাঢ় রঙের টাই। বুকপকেটে হালকা সিলভার টোনের রুমালটিও সুবিন্যস্তভাবে রাখা ছিল। পায়ে চকচকে কালো লেদারের অক্সফোর্ড জুতা। আর কব্জিতে বাঁধা ছিল উজ্জ্বল ধূসর ধাতব বডির পাটেক ফিলিপ কালাত্রাভা।
তবুও কারানের পোশাক কারো মন জয় করতে পারল না। আসাদ কিছু বলেনি; কারণ সে জানে বিয়েটা একটি চুক্তির পরিণতি, তাই তার মন্তব্য করা বেমানান। আশমিনির কপালে ভাঁজ পড়ে, সে চোখ সরু করে কেবল একবার তাকিয়েই মুখ ফিরিয়ে নেয়।
আপনমনে বলে ওঠে, “ছেলেটাকে আর বদলানো গেল না। অন্তত আজকের দিনে তো একবার শেরওয়ানি পরে আসতেই পারতো।”
এদিকে কারানকে দেখে আরিয়ান ঠোঁটে অদ্ভুত হাসি মেখে এগিয়ে এলো। ভাইয়ের বাহুতে আলতো করে হাত রেখে বলল, “তোর জন্য তো শেরওয়ানি রাখা ছিল, পরিসনি কেন?”
তবে কারান তার কথায় কর্ণপাত করল না। চোয়ালে কঠোরতা, চোখে নিঃস্পৃহ দৃষ্টি নিয়ে সামনে এগিয়ে চলল। এমন অগ্রাহ্য আচরণে আরিয়ানের ভিতরটা খচখচ করে উঠল। বারবার এমনভাবে এড়িয়ে যায় কারান, কিন্তু কেন? তা সে আজও জানে না। অথচ জিজ্ঞেস করতেও পারে না। হয়ত কারণটা স্পষ্ট; সে কারানের কোম্পানির অধীন কর্মচারী। এই নীরব অনিশ্চয়তা নিয়ে আরিয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের স্যুটের বোতাম গুছিয়ে সামনে এগিয়ে গেল।
দুই পক্ষের মাঝে নরম কাপড় আর সুগন্ধি ফুলের বুননে গাঁথা পর্দা টানানো। দুই ভিন্ন জীবন, আজ এক পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পূর্বক্ষণে একে অপরের থেকে শেষবার আলাদা হয়ে বসে আছে।
মিরা কারানকে দেখতে পায়নি, কারানও মিরাকে দেখল না। যদিও দেখা নিয়ে কারানের বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। তার মনোযোগে বিয়ে নেই, আছে কেবল দায়মোচনের তাড়না। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিদায় নিতে পারলেই স্বস্তি পাবে সে।
কারান সামনে বসতেই আসাদ হেসে এসে তার কাঁধে হাত রাখল, “তাহলে শুরু করা যাক?”
কারান একপলক তাকিয়ে বলল, “যা করার, তাড়াতাড়ি করো।”
শব্দগুলো এত নীচু স্বরে বলল যেন কেবল আসাদই শুনতে পায়। কারণ বিয়েতে মত থাকুক বা না থাকুক, কিন্তু বাহিরের দৃষ্টির সামনে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করাটা বরাবরই অপছন্দ তার।
অন্যপ্রান্তে বসে থাকা মিরা কারানের উপস্থিতি টের পেয়ে ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটিয়ে তোলে। নিজের ভেতরের অস্থিরতা সামলাতে না পেরে ফিসফিস করে বলে, “উফ… আল্লাহ, শান্ত করো আমাকে। এমন অনুভব কখনও হয়নি। কাঁপছি আমি।”
তার কণ্ঠে উদ্বেগ আর ভালোবাসার সংমিশ্রণ খেলা করছে। বুকের ভেতর যেন বিদ্যুৎ খেলে যাচ্ছে, হাত-পা হালকা কাঁপছে। সে চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস নেয়। এ অনুভব ভীতিও নয়, রোমাঞ্চও নয়—এ যেন কোনো অনির্বচনীয়, গভীর টান।
এদিকে কাজী সাহেব বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করলেন। বিনয়ের হাসি মুখে এনে প্রশ্ন করলেন, “দেনমোহর কত নির্ধারণ করা হবে?”
আরিয়ান রসিকতা করে বলল, “পাঁচ, দশ কিংবা বিশ কোটি, যেকোনোটা লিখে দিন।”
ইসহাক সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, “দশ কোটি লিখুন।”
এটা শুনে কারান ঠান্ডা চোখে একবার তাকাল ইসহাকের দিকে, তারপর আরেকবার আরিয়ানের দিকে। এরপর গম্ভীর গলায় বলে উঠল, “আমার সব প্রোপার্টির অর্ধেক ওর নামে লিখে দিন। এটাই হবে দেনমোহর।”
এক মুহূর্তে চারপাশের লোকজন স্তব্ধ হয়ে গেল। এমন সিদ্ধান্ত কেউ কল্পনাও করেনি। আসাদ তড়িঘড়ি করে সামনে এসে বলল, “তুই কী বলছিস, কারান?”
কারান তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে বলল, “কারান চৌধুরি এক কথা দু’বার বলে না, এটা তোমার জানা থাকার কথা।”
আসাদ আর কিছু বলার সাহস পেল না। বাকি সবাইও অবাক চাহনিতে চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
কাজী সাহেব থমকে গিয়ে বললেন, “বাবা, দেনমোহর তো নগদে কনের হাতে দিতে হয়।”
কারান চোখ না তুলে বলল, “সামওয়ান, প্লিজ ব্রিং দ্য প্রপার্টি ডিড।”
ইসহাক পাশ ফিরে আশমিনির কানে ফিসফিস করে বলল, “একে আমি কখনোই বুঝে উঠতে পারিনি, আশমিনি। কী করছে ও এখন?”
আশমিনি চোখ না সরিয়ে শুধু বলল, “দেখে যাও।”
সম্পত্তির দলিল আনা হলে কারান তা স্বাক্ষর করে দেয়। এরপর কাজী সাহেব শুদ্ধভাবে আরবি খুতবা পাঠ করেন। সূরা পাঠের পর শুরু হয় নিকাহ।
কারানকে তিনবার কবুল বলতে বলা হয়। কারান ভারী কণ্ঠে বলল, “কবুল।”
অন্যদিকে পর্দার ওপারে বসে থাকা মিরার গলায় ছিল কাঁপা কাঁপা সুর। এই কদিন ধরে এই দিনটার প্রতীক্ষায়ই তো সে ছিল। অবশেষে সেই বহু প্রতীক্ষিত মুহূর্তটি এসে দাঁড়িয়েছে তার সামনে।
ঢোক গিলে নিল সে। তার শরীরটা হালকা কেঁপে উঠল, ঠোঁটও অনিচ্ছাসত্ত্বেও কাঁপল। চাপা উত্তেজনা, ভয়, ভালোবাসা আর ভরসার এক জটিল সংমিশ্রণে বুকের গভীরে যেন একটা ঢেউ উঠল। কারানের সাথে ভাগ করে নেওয়ার জন্য তার মনের আঙিনায় ছায়া ফেলে দাঁড়িয়েছে ভবিষ্যতের প্রতিটা মুহূর্ত।
তার মন বলল, ‘এই তো শুরু, এখন থেকেই তো সেই চিরদিনের পথচলা শুরু হবে; যার যাত্রী আজ থেকে শুধু সে আর কারান।’
সে স্পষ্ট উচ্চারণ করল, “কবুল। কবুল। কবুল।”
পর্দার দুই প্রান্তে বসে থাকা দুইটি ভিন্ন সত্তা আজ একটি পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হলো। অর্থাৎ দুটি ছেঁড়া সূক্ষ্ম জীবনের অংশ সেলাই হয়ে একাকার হয়ে গেল।
কাজী সাহেব সংক্ষিপ্ত একটি দোয়ার মাধ্যমে দাম্পত্য জীবনের সূচনা করলেন, “হে আল্লাহ, এই নবদম্পতিকে তোমার ভালোবাসায় আবদ্ধ রাখো। তাদের জীবনে মেহেরবানি, বরকত ও হৃদ্যতা নসিব করো। দাম্পত্য জীবনের প্রতিটি দিনে যেন তুমি রিজিক, শান্তি ও রহমতের দরজা খুলে রাখো। আমিন।”
এটা শুনে সবাই যখন একত্রে হাত তুলে “আমিন” বলল, তখনই অন্যপ্রান্তে কারান দ্রুত উঠে দাঁড়াল। তার চোখে মুখে কোনো আবেগের রেখা নেই, কারণ সে তো এসব চায় না। কোনো কিছু না বলে, না তাকিয়েই জলদি বিয়ের আসর ত্যাগ করল সে। তার এই হঠাৎ প্রস্থান দেখে অনেকে থমকে গেল। মুহূর্তের মধ্যে অজানা বিস্ময়ে ভরে উঠল সমগ্র প্রাঙ্গণ। উপস্থিত অতিথিরা বিস্ময়ে একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল।
আরিয়ান ঝুঁকে এসে রোমানার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, “ব্যাপারটা কি হলো, বলো তো?”
রোমানা হালকা বেঁকে ঠোঁটের হাসি ছুঁড়ে দিলো। তারপর বলল, “কি আর হবে! তোমার একরোখা ভাই একটু ত্যাড়ামি করলো আরকি। তবে ও তো আর তোমার মতো গোদা গরু না, নিশ্চয়ই গভীরে লুকোনো কোনো না কোনো কারণ আছে।”
আরিয়ান এবার চোখে-মুখে কঠিন ছায়া মেখে, নিশ্বাস গরম ফেলে গলা নামিয়ে বলল, “শালির ঘরের শালি, ঘরে একবার যাই শুধু… কারানের থেকেও পাঁচ গুন ত্যাড়া আমি। জাস্ট তোকে একা পেয়ে নেই।”
রোমানা মৃদু হেসে বলল, “হ্যাঁ, তাইতো। শুধু একবার একা পাই তোমাকে, তারপর তোমার ওই অহংকারের জিনিসটা কেটে টুকরো টুকরো করে ঝাল দিয়ে রান্না করবো আমি। পরে খেয়েও মুখ ফিরিয়ে বলব, ছি! কি জঘন্য স্বাদ!”
তার চোখে তখন নিখুঁত নিষ্ঠুরতার বিদ্রুপ খেলে গেল।
আরিয়ান নীচু গলায় বিড়বিড় করে বলল, “শালি ধান্দাবাজ, জাউরা একটা।”
রোমানা এবার নিজেকে অভিজাত মঞ্চে তুলে ধরলো। সে একবার তাকালো আরিয়ানের দিকে, তারপর নিজের সাজের দিকে। তার চোখে তখন নারীত্বের অহংকার, আর ঠোঁটে নির্লজ্জ সৌন্দর্যের ঘোষণা খেলা করল। সে হেসে বলল, “তোমার মতো নিরুচ্চার মুলোটা আমার মতো ঝাঁঝালো মেয়ের পাশে মানায় না। দেখেছ, শাড়িতে কি সুন্দরটাই না লাগছে আমাকে! যদি এই দুই পরিবারের মানুষ বাদ দিয়ে বাইরের কোনো ছেলে থাকতো, নির্ঘাত আমার সৌন্দর্য দেখে জ্ঞান হারাতো।”
আরিয়ানের দৃষ্টি তখন ঝাঁঝালো আগুনে জ্বলে উঠলো। দাঁতে দাঁত চেপে, কণ্ঠে নরম গর্জন করে বলল, “ইশশ, রোমানা… তোর জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে রে। তোকে যদি এক ঠেলায় ছাদ থেকে ফেলে দিই, সেই মুখখানা আর আয়নাও চেনা যাবে না। কি বিশ্রী অবস্থাই না হবে!”
রোমানা ভেংচি কেটে এক ঝলক বিদ্রুপ ছুঁড়ে দিয়ে বলল, “হ্যাঁ, আমি তো বসে বসে মুড়ি চাবাবো! মরলে তোমাকে নিয়েই মরবো। যদিও শয়*তান কোনোদিন মরে না। তবু চেষ্টা করবো মারার।”
আরিয়ান এবার আর কিছু বললো না। শুধু হালকা হাসল। কারণ সে জানে, এই মেয়েটার সাথে কথার যুদ্ধে জেতা অসম্ভব। তাকে ভালোবাসায়, কৌশলে, কিংবা হয়ত পরাজয়ের ভেতর দিয়েই জিততে হবে।
ওদিকে কারান চলে যাওয়ায় আসাদ তৎক্ষণাৎ পরিস্থিতি সামাল দিতে হালকা হাসি হেসে সামনে এসে বলল, “আরে, সবাই এমন অস্থির হচ্ছেন কেন? একটু অস্বস্তি করছে ওর। বিয়েটা তো শেষ, এখন একটু বিশ্রাম নেবে না?”
তার কথায় একটা কৃত্রিম হাসির আবরণ থাকলেও চোখের গহীনে কিছু একটা লুকিয়ে ছিল, যেটা সহজে ধরা যায় না। সে বুদ্ধিমত্তায় সবাইকে শান্ত করতে থাকল।
এরপর ধীরে ধীরে খাওয়ার আয়োজন শুরু হলো। অতিথিরা পুনরায় নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে আস্তে আস্তে পরিবেশে স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনল। এমন সময় আসাদ এগিয়ে গিয়ে আব্দুর রহমানকে আলিঙ্গন করলেন। পিঠে সস্নেহ চাপড়াতে চাপড়াতে বললেন, “অবশেষে বেয়াই হয়েই গেলাম, আব্দুর রহমান। কি বলিস?”
আব্দুর রহমান হালকা হাসলেন, তবে সেই হাসির আড়ালেও চোখ দুটো ভিজে উঠল। কণ্ঠে কাঁপন এনে বললেন, “আমার কলিজার টুকরোটাকে কেড়েই নিলি রে।”
তার গলায় গুমরে ওঠা বেদনা জেগে উঠল।
এ দৃশ্য দেখে আসাদের চোখেও কোমলতা খেলে গেল। আসাদ এবার তার দুটো কাঁধ জড়িয়ে ধরলেন, স্বর নীচু করে বললেন, “ঘরের পরীকে কেউ স্পর্শও করতে পারবে না, এটা আমি নিশ্চিত করে বলছি। আর কারান? ও ওকে রানীর মতোই রাখবে, কথা দিলাম তোকে।”
আব্দুর রহমান এবার খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়ে মাথা নোয়ালেন।
অন্যদিকে মিরার মনোলোকে অদ্ভুত উথালপাতাল শুরু হয়ে গেছে। বাস্তবতা যেন পর্দার পেছনে লুকিয়ে থাকা কোনো অনুচ্চারিত সত্য। বিয়েটা তবে সত্যিই হয়ে গেল? তবু যেন কিছুই বাস্তব মনে হচ্ছে না তার কাছে। তার হৃদয়ের প্রতিটি কোণে মিলেমিশে আছে বিস্ময়, লজ্জা, আনন্দ আর বিদায় বেলায় জমে ওঠা শূন্যতা। তার ঠোঁটে লজ্জা ও সংশয় মেশানো নিঃশব্দ হাসি ফুটে উঠল। এরপর চোখ নামিয়ে মাথা নীচু করে বসে রইল।
বিয়ের সমস্ত মায়া যখন ভর করে হৃদয়ে, তখন বিদায়ের ছায়া ধীরে ধীরে চারপাশে নামতে থাকে। মিরা অনুভব করল, এই আনন্দের আসরের মাঝেও কান্না লুকিয়ে আছে, যা শুধু নারীর মন বোঝে। কারণটা এই যে, এবার নিজস্ব ঘর ত্যাগ করে, মা-বাবা, বোনকে ছেড়ে অন্যের ঘর করতে হবে। অথচ এটাই পৃথিবীর নিয়ম, যা নারী চাইলেও ভাঙতে পারে না।
পাশে বসা মমতাজ হঠাৎই তাকে জড়িয়ে ধরলেন। কাঁপা কাঁপা হাতে তার মাথায় হাত বুলিয়ে চোখের জল ফেললেন। কিন্তু কোনো শব্দ উচ্চারণ করেননি। অর্থাৎ তার কান্নাই ছিল হাজার কথার বিকল্প। মিরাও আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল কষ্টমেশানো ভালোবাসার কয়েকফোঁটা অশ্রু। এ যেন জীবনের এক পর্বের অবসান, আর এক অজানা ভোরে যাত্রা শুরুর পূর্বমুহূর্ত।
এদিকে এক কোণে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকা ইলিজাকে কেউ যেন দেখলই না। সে যে প্রতিটি বিয়েতে আনন্দের ঝরনাধারায় ভাসে, অথচ আজ নিজের বোনের বিয়েতেই নিস্তব্ধতার প্রতিমূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিয়েটা এত দ্রুত হওয়ায়, সে আর আয়োজন করে সাজগোছ করেনি। তাই পরনে খুব সাধারণ একটি লেহেঙ্গা, সাজও তেমন কিছু নয়, তবুও তার সৌন্দর্য ম্লান হয়নি একরত্তিও। কিন্তু তার চোখে যে ভার, সেই ভারের চেয়ে বড় আর কোনো অলংকার নেই। ভিতরে ভিতরে বিষণ্নতা আর শূন্যতা তাকে গিলে খাচ্ছে। মনে হচ্ছে কেউ যেন তার পৃথিবীটাকে বা তার হৃদয়টাকে কেড়ে নিচ্ছে।
হ্যাঁ, নিয়েছেই তো। তার অস্তিত্ব থেকে ছিঁড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে একমাত্র বোনটাকে। এখন আর কার জন্য মাতামাতি করবে সে? কার কোলে মাথা রাখবে ক্লান্ত বিকেলগুলোতে? কার খোপায় চুপিচুপি গুঁজে দেবে প্রিয় গোলাপটা? মায়ের বকুনিতে ভয় পেলে কার পেছনে নির্ভার হয়ে লুকাবে? আর সব অনুভব, সব আবেগই বা আর কাকে নিঃশঙ্ক চিত্তে বলবে? কে থাকবে এখন তার দুঃখ-সুখের অবিনশ্বর ঠিকানা হয়ে?
সে মনে মনে ক্ষোভের সুরে ফিসফিসিয়ে বলল, “আমার এঞ্জেল মিরু আপুর যদি এক বিন্দুও কষ্ট হয়, আপনাকে গু*লি করে দেব একদম। সে আপনি যতই হ্যান্ডসাম হোন, জিজাজি।”
এরপর আবার জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। অথচ সেই গাঢ় রাগের মধ্যেও একটা অসমাপ্ত ভালোবাসার শোক বয়ে যাচ্ছে।
মিরার চোখ এবার ধরা পড়ল সেই কোণে। ভিড়ের ফাঁক দিয়ে আবছাভাবে দেখা যায় ইলিজাকে। মিরা হঠাৎই মায়ের বাহু থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে মাথা উঁচিয়ে বলল, “মাহি…”
সেই একটি ডাকেই ইলিজার সমস্ত রাগ গলে গেল। এতক্ষণ বাদে বোন তাকে নজর দিয়েছে। কোনো কিছু না ভেবে সে ছুটে এলো বোনের দিকে। গলায় চেপে বসা কান্না আর বাঁধ মানল না। মিরাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল হাউমাউ করে। সে বলল, “তুমি কি ভেবেছো বিয়ে করে পালিয়ে যাবে? আমি কিন্তু তোমাকে রেহাই দিচ্ছি না। হাজারবার টেক্সট করে, ফোন করে জ্বালাবো মিরু আপু।”
মিরা কাঁদো কাঁদো চোখে হেসে উঠে, বোনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। অর্থাৎ এই আলিঙ্গনেই আটকে রাখতে চায় সব স্মৃতি, সব শৈশব, সব ভালোবাসা।
_______
আজ তাদের বাসর রাত; এক বিশেষ রাত, যেখানে তরুণীদের হৃদয় স্বপ্নের ফুলে ভরে ওঠে। মিরাও সেই স্বপ্নের আবেশে বোনা, যাকে সে চিনেও উঠতে পারেনি, অথচ আজ থেকে তার সঙ্গে সারাজীবন কাটাতে হবে।
কক্ষটি প্রশস্ত এবং শুভ্র। সাদা রঙের চারপাশে থাকা আসবাবপত্রগুলোও শুভ্রতার সূতিকাগার। এমনকি কক্ষে অবস্থান করা ফুলদানিসহ ফুলদানিতে রাখা আরটিফিসিয়াল অর্কিড ফুলগুলোও সাদা। কক্ষটি জুড়ে সাদা স্ফুটিকের আলো ঝলমল করছে, একমাত্র বিছানার ওপর ছড়িয়ে থাকা লাল গোলাপের পাপড়িগুলোই রঙিন আবহ তৈরি করেছে। কক্ষের কোণে জ্বালানো একগুচ্ছ সাদা মোমবাতি ও জলে ভাসমান লাল গোলাপের পাপড়ি। সব মিলিয়ে রোমান্টিক পরিবেশে প্রেমের ভাস্কর্য তৈরি হয়েছে। এরই মাঝে আরও একটা রঙের দেখা মিলে। সে হলো শুভ্র রাজকীয় দানবাকৃতির বিছানার মধ্যখানে বসে থাকা সদ্য বিবাহিতা নববধূ মিরা।
তার শরীরে শোভা পাচ্ছে গাঢ় লাল লেহেঙ্গা। আর সোনালি ডিজাইনের সূক্ষ্ম রেখাগুলো মিরার সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। মিরার প্রতিটি নড়াচড়ায় লেহেঙ্গাটি তরঙ্গের মতো উঠছে-নামছে।
মাথায় ঘোমটা দিয়ে সে কারানের জন্য অপেক্ষা করছে। এদিকে তার অন্তরের গভীরে অসংখ্য প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে। সে আপনমনে বলে, “এত লজ্জার কি আছে, মিরা? ইটস নর্মাল। ইশশ, এক মুহূর্তের মধ্যে আপনাকে নিয়ে কত যে নিঝুম স্বপ্নে ভেসে যাচ্ছি। আর কতক্ষণ? এবার আমার স্বপ্নটাকে সত্যি করে দিন, কারান চৌধুরি।”
মুহূর্তের জন্য থেমে গিয়ে আবার চিন্তা করে, “আচ্ছা, উনি কি এসে হাত ধরবেন, নাকি কিস করবেন? নাকি হাই হ্যালো দিয়ে শুরু করবেন? হায় আল্লাহ!”
আকাশের মতো বিশাল ভাবনার মধ্য পরে নিজেকে সম্বোধন করে বলে, “এবার থাম, মিরা। আর কত? ওর জন্য এই কয়দিন মাথাটাকে যে পরিমাণে খাটিয়েছি, তা তো পরীক্ষার আগের রাতেও খাটিনি।”
সে স্মিত হেসে নেয়। কিছু সময় পর আবার নিশ্বাস ছেড়ে আবেশমাখা স্বরে বলে, “কখন আসবে, কখন আসবে? কারান বেটা আসোস না কেন? আর কত ওয়েট করাবি বউকে? ধুরো।”
তার এই অপেক্ষার মধ্যে স্বপ্নের লুকোচুরি আরও গভীর হচ্ছে। সে জানে না কি আছে সেই পুরুষের মধ্যে; যা তার তিন দিনের ঘুম কেড়ে নিয়েছে।
এমন সময় হঠাৎ দ্বারপ্রাচীর কাঁপিয়ে কারান অন্তঃপ্রবেশ করল। তার আগমন যেন নির্জন ঘরটিতে হঠাৎ অন্তর্দাহ সৃষ্টি করল। কারানের প্রবল উপস্থিতি অনুভব করতেই মিরার মুখাবয়বে উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ল। মুহূর্তেই তার হৃৎকম্পন তালগোল পাকিয়ে ফেলল। অর্থাৎ এক অনিয়ন্ত্রিত আরোহ-অবনমনের ঘূর্ণিতে আটকে গেছে।
তার নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসে তীব্রতা এসে ভর করল; মনে হচ্ছিল প্রতিটি শ্বাস একেকটি অদৃশ্য ছুরির মতো ফুসফুসকে বিদ্ধ করছে। মিরা প্রাণপণে নিজেকে সংযত করার বৃথা চেষ্টা করে, দেহজ গভীর উদ্বেগের বিপরীতে সামান্য নড়েচড়ে বসল।
কারানের শরীরে ছিল সাদা-কালো মিশ্রিত দাগকাটা টিশার্ট আর কালো ট্রাউজার। তবে কারান প্রবেশ করতেই, তার শরীর থেকে ‘রোজা ওট লাক্স’-এর গোলাপ, চন্দন আর ভ্যানিলার গাঢ় মিশ্রণের মোহময় সুবাস ছড়িয়ে পড়ল।
সুগন্ধির প্রভাব মিরার নাকে পৌঁছাতেই সে চোখ বন্ধ করে নাকে হাত দিয়ে, মোহিত ভঙ্গিতে আপনমনে বলল, “উফফ, এই ঘ্রাণটা মনে হচ্ছে আমার পুরো মস্তিষ্কে ঢুকে যাচ্ছে, আর আমাকে ওর দিকে অদৃশ্যভাবে টানছে। হচ্ছেটা কি?”
এদিকে কারান ঘরে প্রবেশ করেই আপেলে কামড় বসাতে বসাতে, আড়মোড়া ভেঙে ভাবলেশহীনভাবে দুই পা ফাঁক করে ডিভানে বসে আপেল খাওয়ায় মনোযোগ দিল। মিরা চোখ খুলে ঘোমটার ভিতর থেকে কারানকে আবছা আবছা দেখে অবাকের স্বরে বলে, “বাসর রাতে শেরওয়ানি রেখে ট্রাউজার টিশার্ট কে পড়ে আসে?”
খানিক বাদে কারান আপেলের শেষ অংশে কামড় বসিয়ে, উঠে হিমায়ক থেকে একটা বিয়ার বের করল। পরে বোতলটা টেবিলে রেখে ডিভানে শুয়ে পা নাড়াতে নাড়াতে ফোন স্ক্রল করতে লাগলো। কারানের এহেন কর্মকাণ্ডে মিরা আশ্চর্যের সহিত তার দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে মনে মিরা নিশ্চয়ই তাকে অদ্ভুত কিছু কথাও শুনিয়েছে।
ক্ষণিকের পর কারান ডিভান থেকে উঠে মিরার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। তারপর টেবিলে রাখা দুধের গ্লাসটা ধরে গম্ভীর কণ্ঠে বলে, “সো, আর ইউ স্যাটিসফাইড নাও?”
মিরা ভ্রুকুঞ্চন করে বলে, “সরি?”
কারান তীর্যক তাচ্ছিল্যের সহিত হেসে বলে, “আমি মনে হয় স্প্যানিশ ভাষায় বললাম।”
মিরা একটু ভরকে গিয়ে ইশতিহারিত বোধ করলো। কিঞ্চিৎ নড়ে বসে, শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, “না মানে, আপনি কি খুশি না?”
মিরার কথা শুনে কারানের মুখে একটা ঠান্ডা হাসি ফুটে উঠল। তবে তার চোখে ক্ষোভ আর তাচ্ছিল্যের মিশেল স্পষ্ট। সে বিড়বিড় করে বলল, “আমার লাইফটাকে হেল করে জিজ্ঞেস করছে খুশি কিনা।”
একটু থেমে কারান নিজের রাগকে আর সংযত করতে না পেরে, হাতে ধরা দুধের গ্লাসটি নিচে ছেড়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে কাচের টুকরো ছিটকে সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ল। মিরা চমকে উঠে ঘোমটার আড়াল থেকে কারানের দিকে তাকিয়ে থাকে, তার এমন আচরণে মিরার বুক ধক করে উঠল।
কারান এবার হঠাৎ গর্জে উঠে বলল, “My freedom, my joy, and everything I once cherished have vanished, and it is you who bears the blame.”
(অনুবাদ: “আমার স্বাধীনতা, আমার আনন্দ এবং আমার সবকিছু যা আমি লালন করতাম, সব হারিয়ে গেছে, আর তার জন্য দায়ী তুমি।”)
তার কথাগুলো মিরার হৃদয়ে শীতল শূলের মতো ধেয়ে এলো। স্বামীর মুখনিঃসৃত সেই কটাক্ষপূর্ণ অভিযোগ যেন মুহূর্তেই তার শ্বাসরুদ্ধ করে দিল। বক্ষের অন্তর্গূঢ়ে অজানা যন্ত্রণা স্নায়ুতন্ত্র জুড়ে শিহরন তুলে ছড়িয়ে পড়ল সর্বত্র। তবু মিরা নিজেকে ভেঙে পড়তে দিল না। চোখের কোণে উদ্গত অশ্রুকে কঠিন অভিপ্রায়ে দমন করে, ঠোঁট কামড়ে সংযমের আশ্রয়ে সে নিজেকে স্থির রাখল।
এরপর দ্বিধাচ্ছন্ন উচ্চারণ করল, “মানে? আপনি ঠিক কী বোঝাতে চাইছেন? আমি তো কিছুই বুঝতে করতে পারছি না।”
কারান বিরক্তি নিয়ে নিশ্বাস ছেড়ে বলল, “আন-এজুকেটেড গার্ল। এনিওয়েস, এই বিয়েটা শুধু একটা বোঝাপড়া ছাড়া কিছুই না। তাই আমাকে নিয়ে হাসব্যান্ড মেটেরিয়াল কোন এক্সেক্টেশন রাখবেন না। ওয়েইট আ মোমেন্ট, হোয়াই অ্যাম আই অ্যাড্রেসিং ইউ ফরমালি? এই মেয়ে, তোমার বয়স কত?”
তার এমন উৎকট আচরণে মিরা যে শুধু বিরক্ত বোধ করলো এমন নয়, সাথে তার মাথায়ও তরতর করে রাগ জেকে বসলো। নিজের বউয়ের সাথে কীভাবে আচরণ করা উচিত, সেটা না হয় শিখেনি। কিন্তু একটা মেয়ের সাথে কীভাবে আচরণ করতে হয় তাও কি জানা নেই এই লোকের?
কারানের উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ যেন ছুরির মতো বিদীর্ণ করে দিচ্ছে মিরার হৃদয়। অপমান, অবমাননা আর চাপা অভিমানের শিখায় জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির মতো ধেয়ে আসছে ক্ষোভ।
নিজেকে আর সংবরণ করতে না পেরে, ফণিমনির মতো তিরস্কারের দৃষ্টিতে তাকিয়ে, দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল, “আই অ্যাম টুয়েন্টি-টু ইয়ার্স ওল্ড, আ থার্ড-ইয়ার ফার্মাসি স্টুডেন্ট অ্যাট জগন্নাথ ইউনিভার্সিটি।”
কারান তির্যক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “এই হ্যালোওও, আপনার বায়োডাটা কেউ শুনতে চায় নাই। যতটুকু জিজ্ঞেস করেছি ততটুকুই বলবেন। আর হ্যাঁ, তুমি আমার থেকে ছয় বছরের ছোট। (বাঁকা হেসে) বাচ্চা মেয়ে। আই ডোন্ট নো, হোয়াট মাই ফ্যামিলি স’ ইন ইউ। বাট ডোন্ট বিলিভ দ্যাট ইয়োর লাভ ক্যান সফ্ন মি, ফর আই অ্যাম নট ইজিলি মুভড। রিমেম্বার দ্যাট।”
মিরা কিছু না বলে নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে শুধু তাকে দেখে যাচ্ছে, কিন্তু তার বুকের ভেতর বিস্ময় আর অপমানের ঢেউ বয়ে যাচ্ছে। প্রথম রাতের এমন অবমাননা কস্মিনকালেও কোনো মেয়ে ভাবতে পারে না।
মিরা ঢোক গিলে বিষাদময় কণ্ঠস্বর নিয়ে বলে, “When you have so many problems, why did you get married? (থেমে) And what is the meaning of ruining a girl’s life like this?”
“I’m not obligated (বাধ্য) to explain myself to you. This marriage is just a family deal.”
মিরা কারানের এমন বাক্যের মানে বুঝতে চেষ্টা করলো। বিয়েটা একটা পারিবারিক চুক্তি, এটা কেমন ধারা কথা হলো? কিন্তু কারানকে এই প্রশ্ন করার আর প্রয়োজন বোধ করলো না। কাকেই বা করবে? করেও বা কি হবে? একটা অদ্ভুত উত্তর পাবে বা তাই পাবে কিনা সন্দেহ।
কারান ক্ষণিক পর বাতায়নের পাশে গিয়ে বাহিরের প্রকৃতি দেখতে দেখতে একটু আড় হেসে বলে, “Nevertheless, if you’d like, we can enjoy a night together in bed, darling.”
এবার মিরার রাগ তার সমস্ত সত্তাকে ছাপিয়ে গেল। কারানের মুখ থেকে যে বাক্যটি বের হলো, তা যেন নিষিদ্ধ পল্লির মেয়েদের সঙ্গে কথোপকথনের বিকৃত প্রতিধ্বনি। একজন মানুষের বিয়ে যদি নিজের অনিচ্ছায় হয়েও থাকে, তাও হয়ত মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু এমন নির্লজ্জভাবে কি কেউ বলতে পারে, যে সে তার স্ত্রীর সঙ্গে রাত কাটাতে চায়। এ ধরনের কথা বলার আগে অন্ততপক্ষে একজনের বিবেকের দিকে তাকানো উচিত।
মিরা বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে বলল, “Pardon me Mr., I urge you to reconsider your words. What is your perception of Bangladeshi girls? We hold our self-respect in high regard.”
কারান হাসল, তার চোখে আর ঠোঁটে সেই বিদ্রূপটা ফিরে এলো। মিরার সন্নিকটে এসে তার মুখের দিকে ঝুঁকে আস্তে আস্তে বলল, “স্ট্রেঞ্জ। ডিড আই ইনসাল্ট ইউ? আচ্ছা, বাসর রাতে তাহলে কি করে? যদিও তোমার মতো মেয়ের সাথে আমার ঠিক যাবে না। তাই এইসব নাটক বন্ধ করো, বুঝেছো?”
মিরা আর কিছু না বলে গা জ্বালানো দৃষ্টিতে বিছানায় গিয়ে বসলো। শোবার প্রস্তুতি নিতে বালিশ ঠিক করতেই কারান হঠাৎ বলে উঠল, “তোমার সাহস তো কম না। আমার রুমে আবার আমার বেডেই ঘুমাতে যাচ্ছো? এক্ষুনি রুম থেকে বের হয়ে যাও।”
এটা বলে মুখ ঘুরিয়ে নিল সে।
মিরা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে মুখ ঘুরিয়ে বলল, “ভদ্রভাবে কথা বলুন। আমারও ইচ্ছে নেই আপনার সাথে ঘুমানোর।”
“ইয়াহ। নাও গেট আউট।”
মিরা রুম থেকে বের হতে যাবে তৎক্ষণাৎ পিছন থেকে কারানের ভয়ানক কণ্ঠস্বর শুনতে পেল, “আর হ্যাঁ, আই নেভার ওয়ান্ট টু সি ইয়োর ফেইস। কথাটা মাথায় ভালোভাবে ঢুকিয়ে নাও।”
মিরার কর্ণধারে কথাটা এসে পৌঁছাতেই অজানা ব্যথায় তার চোখের পাতা ভিজে গেল। তার হৃদয়ের ক্ষত তীব্র হয়ে উঠল, এক মুহূর্তেই তার সম্মানের প্রতিটি শিখা নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাই নিশ্চুপ হয়ে পাশের কক্ষে চলে গেল।
মিরা চলে যাওয়ার পর কারান বিছানার উপর ছড়িয়ে থাকা সব গোলাপের পাপড়ি ক্রোধভরে ছুঁড়ে ফেলে দিল। পাপড়ি ভাসানো স্ফটিকের জলের পাত্রটিও একঝটকায় আছড়ে মেঝেতে ফেলে দিল। এরপর ড্রয়ার থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে একটি সিগারেটে আগুন ধরিয়ে ধীরস্থিরভাবে ঠোঁটে তুলে নিল। ধোঁয়ার কুণ্ডলী ক্রমশ বাতাসে মিশে যেতে থাকলেও, তার মুখাবয়বের প্রতিটি ভাঁজে আক্রোশের ছায়া গভীর থেকে গভীরতর হয়ে ফুটে উঠল। অর্থাৎ তার অন্তর্গত আগুনকে আর কিছুতেই নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না।
অন্য ঘরের বিছানায় নিঃশব্দে শুয়ে থাকা মিরার চোখ থেকে বেদনাবাহী নোনাজল ধীরে ধীরে গড়িয়ে পড়ছে। যাকে নিয়ে অগণিত স্বপ্ন ছিল, অপরিসীম খুশির আশা ছিল, আর আকাঙ্ক্ষার শেষ ছিল না, সেই সমস্তকিছু মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। মানুষের চেহারার সঙ্গে যে তার মন বোঝা যায় না; এই সত্য আজীবন মিরার হৃদয়ে অমোচনীয়ভাবে গেঁথে থাকবে। নববধুরূপে সজ্জিত মহিমান্বিতা মিরা সারারাত নির্ঘুম কাটিয়ে ক্রমাগত একাকী কান্নায় ভেঙে পড়ছে।
এই রাত তার কাছে কতটা বিষম, ভয়ংকর এবং অসহনীয় যন্ত্রণার; সেটা কেবল সে-ই জানে। পৃথিবীর নিয়ম বড় অদ্ভুত, যার উপর দিয়ে তুমি যত স্বপ্ন বুনবে, সেই স্বপ্নই শেষে তোমার হৃদয়ের ভার হয়ে দাঁড়াবে। আর এখন থেকে এই কঠিন, বদমেজাজি মানুষটির সঙ্গে এক জীবনের পথ পাড়ি দিতে হবে তাকে।
মিরা ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে নাক টানতে টানতে ব্যথাভরা কণ্ঠে বলে উঠল, “রাতটা তো অন্যরকম হলেও পারতো।”
কত গভীর ভাব লুকিয়ে রয়েছে এই সামান্য বাক্যে! নারী চিরকাল তার সুখের ঠিকানা খোঁজে স্বামীর মাঝে, আর প্রথম রজনীর মাহাত্ম্য নারীর হৃদয়ে অন্যরকম দৃঢ়তা নিয়ে আসে। স্বপ্ন, প্রত্যাশা, অনুভূতির নিবিড় মেলবন্ধন থাকে। কিন্তু সেই বিশেষ রাতেই যদি নিজ স্বামীর কাছ থেকে এমন আঘাত আসে, তা কোনো নারীর পক্ষে সহনীয় হতে পারে না।
_________
ভোরের প্রথম আলোর রুপালি আভা ছড়িয়ে পড়তেই কারান নাশতা সেরে অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। অন্য কক্ষে লেহেঙ্গা বদলে ধবধবে ক্রিম রঙের শাড়ি পড়ে নেয়। তাতে সূক্ষ্ম রেশমি কারচুপি ছড়িয়ে রয়েছে পাড়জুড়ে। আঁচলটি পরিপাটি করে ডান কাঁধে তোলা। এরপর ফজরের নামাজ শেষ করে নিজের কক্ষটি পরিপাটি করে রাখে। কারান চলে যাওয়ার পর সে পাশের ঘরে গিয়ে বিশৃঙ্খল দৃশ্য দেখে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানাটা গুছিয়ে নেয়, নিচে ছড়ানো কাচের টুকরো সরিয়ে ঘরটিকে আবার তার নিজস্ব ছাদে ফিরিয়ে আনে। তারপর রান্নার উদ্দেশ্যে নিচে নেমে আসে।
নিচে এসে দেখে, ড্রইংরুমের রাজকীয় সোফায় আরাম করে আধশোয়া হয়ে বসে আছে বাড়ির বড় বউ রোমানা। তার এক পা আরেক পায়ের উপর তুলে রাখা। হাতে এক গ্লাস জুস, আর ঠোঁটে অলসভাবে টাটকা আঙুর চিবাচ্ছে।
রোমানার পরনে ছিল চোখধাঁধানো ঝলমলে পাকিস্তানি থ্রিপিস—প্যারট গ্রিন রঙের কামিজে ভারী জারদৌসি এমব্রয়ডারি করা। চুড়িদার গাঢ় গোলাপি আর সোনালি কারচুপির ওড়নাটা এক কাঁধে ঝুলিয়ে রেখেছে।
মিরা তার দিকে একবারও নজর না দিয়ে রসুইঘরে ঢোকার জন্য উদ্যত হলো।
ঠিক তখনই রোমানা কপাল কুঁচকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, “তা, কেমন কাটলো বাসর রাত? আমার হ্যান্ডসাম দেবর নিশ্চয়ই তোমাকে খুশি করতে পেরেছে?”
🍁চলবে?🍁

