বৃষ্টি_ছুঁয়ে_দিক_সন্ধ্যা – [৩৮] |২য় খণ্ড| #বেলতুলি

0
49

#বৃষ্টি_ছুঁয়ে_দিক_সন্ধ্যা – [৩৮]
|২য় খণ্ড|
#বেলতুলি
লাবিবা ওয়াহিদ

[অন্যত্র কপি সম্পূর্ণ নিষেধ]

হলুদের অনুষ্ঠানে সবাই উপস্থিত। বাড়ির পাশাপাশি বাগানেও রং-বেরঙের সাজ। মাথার ওপর দড়ির মতো টেনে সুন্দর ডেকোরেশন করা হয়েছে। এরকমটা প্রায় সময় মেলাতে দেখা যায়, তবে আজকাল বিয়েতেও সাজানো হচ্ছে এভাবে। গান বাজছে সাউন্ড বক্সে। দূর-দূরান্তে গানের শব্দ পৌঁছাচ্ছে। এখনই নাচের আয়োজন হবে। কাজিনরা নাচবে। হিজরারাও এসেছে নিজেদের চাঁদা তুলতে, তারাও নাচবে, বখশিশ নিবে। নিবিড় মূল ডেকোরেশনের মধ্যেই দাঁড়ানো, তবে কিছুটা কোণ ঘেঁষে। এখানে আলো পৌঁছিয়েছে কম। নিবিড়ের হঠাৎ দূরে নজর পড়ল।

মৌনো আসতে চাচ্ছে না। জুনায়েদ তার হাত-পা ধরার মতো করে নিয়ে আসছে। নিবিড় নজর সরিয়ে ফেলল। সরাসরি তাকালে মৌনো আসবে না, আবারও পালাবে। আজ প্রথমবারের মতো মৌনোকে সে মনোযোগ দিয়ে দেখেছে, খুবই সূক্ষ্ম নজরে। এখন মনে হচ্ছে তার ওভাবে তাকানো উচিত হয়নি। কেমন যেন হৃদপিণ্ডের ওঠানামা বেড়ে গিয়েছে। অনুভূতির সাথে বিবেকের বোঝাপড়াটা বেশ কঠিন। নিবিড় আগে সেভাবে কখনো এই বোঝাপড়ার সম্মুখীন হয়নি। হয়তো ইয়ামিন মামারা আজ এই প্রসঙ্গ না তুললে এই সঙ্গোপনের অনুভূতি তার অজানাই থেকে যেত।

তবুও তার এখনো সময় দরকার, এত বড়ো শক সে হজম করতে পারছে না। বারবার জাবিরের কুলাঙ্গার মুখটা সামনে আসছে। আবারও মুখটা লাল হয়ে এলো তার। এই রাগটা সংবরণ করা মুশকিল হয়ে পড়ছে। কিন্তু জাবির এখন আইনের হাতে। নিবিড় তাকে পেলে হয়েছিল কাজ। সে তো চাইলেই আর আইন হাতে তুলে নিতে পারবে না। কিছুক্ষণ আগেই বাবার সাথে নিবিড়ের ফোনালাপ হয়েছে। মশিউর সাহেব ছেলেকে বর্তমান কেসের আপডেট দিয়েছে, এমনকি ভালো লইয়্যার যে এই কেস লড়ছে তাও জানা যায়। এতটুকুও নিবিড়কে শান্ত করতে পারছে না। এখনো তার হাত পেছনের দিকে নিয়ে মুষ্ঠিবদ্ধ করে রাখা।

সে মৌনোকে ছোটোবেলা থেকেই পাখির মতো উড়তে দেখেছে, তার চঞ্চলতা দেখেছে, হাস্যোজ্জ্বল মুখ দেখেছে। মায়ের তাড়া খেয়ে মৌনো সবসময় তাদের বাড়িতেই এসে লুকাত, নাহিয়ান এবং সোফিয়া খানমের কাছে। হ্যাঁ, এটা ঠিক.. নিবিড়ের সাথে তার সাপে-নেউলে সম্পর্ক। তাদের মধ্যে মারামারিও হয়েছে। একবার মৌনো তাকে খামচি দিয়েছিল। নিবিড় কখনোই মেয়েদের এই খামচা-খামচি পছন্দ করত না। এজন্য প্রায়ই চড় মে(১)রে বসত। যদিও মৌনো তখনো খুব ছোটো, কিশোরীর একদম শুরুতে। কিন্তু যখন দেখত মৌনো কাঁদত এই চড়ে, নিবিড়ের ভালো লাগত না। এজন্য সে কখনো নিজের বোনের গায়েও হাত তোলেনি। মৌনোকে অপমান করলেও কখনো আর হাত তোলেনি। রাগ-ঝাঁঝ হলেও নিবিড় কীভাবে যেন মৌনোকে রন্ধ্রে রন্ধ্রে চিনে গেল। সেই নিজের চোখের সামনে বড়ো হওয়া মেয়েটার ওপর দিয়ে এত বড়ো একটা দূর্ঘটনা হয়েছে তার মানতে অসহ্য অনুভব হচ্ছে। এটা দূর্ঘটনা নয়, এক শব্দে জুলুম। ক্ষমাহীন জুলুম।

মৌনো ধীরে ধীরে নিবিড়ের পাশে দাঁড়াল। তাদের মধ্যে দেড় হাত দূরত্ব। নিবিড় মাথা নিচু করে তাকাল মেয়েটার দিকে। মেয়েটার মুখে চঞ্চলতা নেই, আছে একরাশ আতঙ্ক.. ভয়। নিবিড়ের মনে পড়ে গেল ইয়ামিন মামার বর্ণনা, ঠিক সেই মুহূর্তে মৌনোর আচরণ সম্পর্কে। এছাড়া এই তিন মাসের সবকিছু। নিবিড়ের নিঃশ্বাস গলায় আটকে রইলো। সেই মুহূর্তে নিবিড় উপস্থিত থাকলে মৌনোর সেই রূপ দেখার সাহস তার হতো? নাকি সেই দূর্ঘটনা নিবিড় হতে দিত? কখনোই না। কিন্তু তার অনুপস্থিতিতেই কেন এত বড়ো ঘটনা ঘটল?নিবিড়কে আহত দেখাল, সেই আহত রূপ মৌনো দেখল না। সে যে মৌনোর জন্য ভাঙছে সেটা মৌনোর ভয় তাকে অনুভব করাতে পারল না। এই ক্ষণিকের রূপটা মুহূর্তেই আবারও রাগে পরিবর্তন হয়ে গেল।

নিবিড় সম্মুখে তাকিয়েই সোজা-সাপটা প্রশ্ন করল,
–“ঠিক আছিস?”

–“হুঁ।”

মৌনোর গলায় স্পষ্ট কম্পন। নিবিড় মৌনোর দিকে না তাকিয়েই বলল,
–“কাঁপছিস কেন?”
–“ঠা..ঠান্ডা।”

–“আমাকে ভয় পাচ্ছিস?”

মৌনো জবাব দিল না। সে নিবিড়কে নয় নিবিড়ের প্রত্যাখান, ঘৃণাকে ভয় পাচ্ছে। মৌনো অন্যদিকে ফিরে বলল,
–“না।”

–“লুক এট মি, মৌনো।”

মৌনো প্রথমে নিবিড়ের দিকে তাকাল না, অন্যদিকেই ফিরে রইলো। কিন্তু যখন দেখল নিবিড় আর কিছু বলছে না, তার তাকানোর অপেক্ষা করছে— মৌনো ধীরে ধীরে তাকাল। মুহূর্তেই সে আঁতকে উঠল। নিবিড়কে খুব অচেনা লাগছে। খু(১)ন করে দেয়া চাহনি, রাগে লাল হয়ে থাকা চেহারাটা ভয়ের কারণই বটে। মৌনো ভয়ে দুই ধাপ পিছিয়ে গেল। সর্বনাশ! নিবিড় কী তবে সব জেনে গেছে?

নিবিড় যথাসাধ্য চেষ্টা করল নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করার। অন্তত কণ্ঠস্বর শীতল রাখার চেষ্টা করল। কিন্তু তা আর হয়ে উঠল না। কাঠ কাঠ গলাতেই সে বলল,

–“দেখি, হাত দেখা।”

মৌনো চমকে উঠল। দুই ধাপ পিছিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল,
–“কেন?”
–“কেন’র উত্তর তুই জানিস।”

মৌনো জানে নিবিড় তার পোড়া হাতের কথা জেনে গেছে। লোকটার চোখ-মুখের আগুন ঝরা অবস্থায় তাই বোঝা যাচ্ছে। সে পারছে না যেন মৌনোকেও সবার সাথে ভষ্ম করে দিতে। তার এই পুরো জীবনের অভিজ্ঞতায় নিবিড়কে কখনো এতটা রাগতে দেখেনি। মৌনো সাহস দেখিয়ে বলল..

–“না জানি না, আমি হাত দেখাব না। আপনার ঘৃণা লাগবে দেখলে।”

–“গড়িমসি করবি না, ঘৃণা করব নাকি চুমু দিব সেটা আমি বুঝব। শোও মি ইওর হ্যান্ড! ইট’স এন অর্ডার, মৌনো।”

মৌনো যেন আকাশ থেকে পড়ল নিবিড়ের বাঁচনভঙ্গি দেখে। এ কোন নিবিড় দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে? নিবিড় এমন করছে কেন? নেশা-টেশা করেছে নাকি? নাকি শরীফের মতো লাল পানি খেয়েছে। মৌনো আবারও দুই ধাপ পিছিয়ে যায়। ভয়ার্ত গলায় বলল,
–“নিবিড় ভাই, শান্ত হোন। কথাতে লাগাম টানুন।”

–“তোর মনে হচ্ছে আমি এখন লাগাম টানার অবস্থায় আছি? ভাষা মাই ফুট! ফাস্ট মৌনো, অপেক্ষা করাস না।”

মৌনো আবারও কাঁপল। সে যথেষ্ট শক্ত হয়ে এসেছিল নিবিড়ের সামনে। কেন বারবার আবারও ভয়ে বুক কাঁপছে। সবাই তার হাত দেখলে নিবিড় কেন নয়? কিন্তু সে কেন এত কাঁপছে? কেন বারবার কল্পনা করে বসছে নিবিড়ের বিকৃত মুখটা? কেন তার ভেতরে এত ভয়? পছন্দ তাকে অপছন্দ করলেই বা তার কি আসে যায়? সে তো সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছে অনুভূতিদের দাফন করে দিবে। দেরী করে হলেও।

নিবিড় এবার কিছুটা চোখ-মুখ সহজ করল। গলা নামিয়ে খুবই নমনীয় গলায় আওড়াল,
–“প্লিজ মৌনো, আমায় একটু দেখতে দে?”

নিবিড়ের গলাটা কেমন যেন ভেঙে আসল। মৌনো আরেক দফা চমকাল। সে অনুভব করল তার চোখ জোড়া ঝাপসা হয়ে এসেছে। তার হৃদয় আবারও ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে। মৌনো এই মুহূর্তে কাউকে বোঝাতে পারবে না নিবিড়ের সামনে তার দাঁড়ানোটা কতটা চ্যালেঞ্জিং, সে ঠিক কত গাঢ়ভাবে পুড়ছে। ধ্বংস হয়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি হচ্ছে। মৌনো কম্পিত বা-হাতটা শুধু বাড়িয়ে দিতেই পারল, কাপড়টা খোলার মতো শক্তি হলো না তার। গাল বেয়ে তার জল গড়িয়ে পড়ছে। সে এই কান্না নিবিড়কে দেখাতে চাইছে না, কিন্তু অশ্রুরা আজ বড্ড অবাধ্য। তার ভেতরে চেপে রাখা সব দুঃখ বেরিয়ে আসছে। মৌনোর বিবেকও তার অশ্রুকে আটকে দিতে পারছে না।

নিবিড় হাত বাড়িয়ে দিল। মৌনোর সাথে আজ নিবিড়ের শক্ত হাত দুটোও কাঁপছে। যেই হাতে অস্ত্র ওঠে, সেই হাত মৌনোর জন্য কাঁপছে। মৌনো সেই দৃশ্য ঘোলাটে নজরে দেখল। নিবিড় ধীরে-সুস্থে কাপড়ের হালকা বাঁধন খুলে দিল, পরপর কাপড়টা সরিয়ে দিল। যদিও সার্জারির কারণে তার হাত অনেকটাই আগের জায়গায় এসেছে, তবুও পুরোপুরি সেই দাগগুলোকে মুছে দেয়া যায়নি। নিবিড় দুহাতে মৌনোর হাতটা ধরে একমনে তাকিয়ে রইলো। মৌনো নিবিড়ের দিকে তাকাল। সে দেখতে চায়, মৌনো নিবিড়ের অভিব্যক্তি দেখতে চায়। নিবিড়ও কি তাকে বাকি সবার মতো ঘৃণা করবে?

কিন্তু নিবিড় নিরুত্তর। সে শক্ত চোখে প্রতিটা দাগ দেখছে সে। সেই দাগের মতো করেই ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে সে নিজেও। নিবিড়ের নিজেকে নিয়ে বড্ড অনুশোচনা হচ্ছে। সে কেন আগে থেকে জাবিরের ব্যাপারগুলো খেয়াল করেনি? সে কেন আগে থেকেই মৌনোকে সুরক্ষা দিতে পারেনি? মেয়েটা এত যন্ত্রণা কী করে সহ্য করল? সে জানত সে মৌনোকে খুব ভালো করেই চিনে, তাহলে কেন মেয়েটা তার থেকে এসব লুকিয়ে গেল? মৌনো কবে এত বড়ো হয়ে গেছে যে এখন নিজের সমস্যাগুলো নিজের মধ্যে রাখতে শিখে গেছে?

নিবিড় ঘৃণা তো দূর, আলতো হাতে সে মৌনোর দাগগুলো ছুঁয়ে দিল। সেই ছোঁয়ায় অদ্ভুত অনুভূতি পাচ্ছে মৌনো। সে দুনিয়া বলে ডান হাত মুখে চেপে হুঁ হুঁ করে কেঁদে দিল। সে ভুল, সে ভুল। নিবিড় তাকে ঘৃণা করেনি, করেনি। নিবিড় তার দাগগুলোকে ছুঁয়ে দিচ্ছে। সেই ছোঁয়াকে সুরক্ষা, যত্ন, হাহাকার মিশে আছে। নিবিড় মৌনোর দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস পেল না। নিবিড় তার হাতে খুব যত্নের সাথে চেপে দিল, যেন সে তাকে নীরবে ভরসা দিচ্ছে। বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে মৌনোর উলটোপিঠে বুলিয়ে দিয়ে খুব চাপা স্বরে জিজ্ঞেস করল,
–“এখনো জ্বালাপোড়া করে?”

মৌনো হেঁচকি তুলে বলল,
–“না।”

–“ডাক্তার শেষ করে দেখিয়েছিস?”

–“স..স..সোমবারে।”

নিবিড় থেমে গেল, এখনো তার নজর স্থির সেই দাগগুলোতে। দুজন দুজনের নীরবতার গল্প চলল কিছুক্ষণ। নিবিড় সেই নীরবের ইতি ঘটিয়ে বলল,
–“এই দাগগুলো কীভাবে ঘৃণা করতে হয়, তা আমি জানি না মৌনো।”

মৌনো ঘোলাটে চোখে নিবিড়ের দিকে তাকাল। তীরের মতো লেগেছে এই বাক্যটা তার জন্য। নিবিড় আবারও বলল,
–“আমাকে কেন কখনো বললি না জাবিরের ব্যাপারে?”

–“ভ-ভয় পেয়েছিলাম।”

নিবিড় এবার চোখে চোখ রাখল।
–“কিসের ভয়? তোর প্রতি আমার কোনো অধিকার নেই বলেই কি বলিসনি?”

মৌনো দ্রুত নেতিবাচক মাথা নাড়ায়। আবার নিজেও চিন্তায় পড়ে যায়। অধিকার? যেমনটা পরিবার থেকে হয়? নাকি ভালোবাসার অধিকার? কিন্তু নিবিড় তো তাকে ভালোবাসে না। তাহলে কিসের অধিকারের কথা বলল সে? মৌনো নিবিড়ের দিকে তাকাল। আজ সে চোখের ভাষায় নমনীয়তা খুঁজে পাচ্ছে কেন? এই নিবিড়ের ভাবটা সেই জন্মদিনের আগের রাত থেকেও গাঢ়। যেন গাঢ় কোনো অনুভূতিতে বন্দী সেই চোখ জোড়া।
–“এমনটা নয়।”

নিবিড় থেমে আবারও প্রশ্ন করল, মৌনোর হাত এখনো তার হাতে বন্দী।
–“ঘটনা কী হয়েছিল?”

মৌনো মাথা নিচু করল। মিনমিন করে বলল,
–“জাবির জুনায়েদকে মারধর করে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছিল। আমি শুধু তার প্রতিবাদই করতে গিয়েছিলাম। নিষেধ করেছিলাম যেন আমার ধারে-কাছে আসার চেষ্টা না করে। কিন্তু বুঝতে পারিনি যে.. এতে আমার কী দোষ নিবিড় ভাই?”

মৌনোর চোখ বেয়ে আবারও অশ্রু ঝড়ছে। এই পর্যায়ে নিবিড়ের দম ফুরিয়ে আসার উপক্রম। নিবিড় মৌনোর হাত শক্ত করে ধরল, যেন ছেড়ে দিলেই মৌনোকে হারিয়ে ফেলবে। কিছু সময় পর নিবিড় মৌনোর হাত ছেড়ে দিল। স্টেজে এবার শিহাব নাচছে। একমাত্র বোনের বিয়ে, বুশরার ঘ্যানঘ্যানে বেচারা আর না করতে পারেনি। মৌনো ফোঁপাতে ফোঁপাতে সেই নাচ দেখতে লাগল। চোখ আগেই মুছে নিয়েছে। কিছুক্ষণ পরপর মৌনো তার বাম হাত চুলকাচ্ছে। এটা তার প্রতিদিনই অসংখ্যবার করতে হয়, নতুন কিছু নয়। নিবিড় আড়চোখে এটা খুব ভালো করেই খেয়াল করল। আচমকা মৌনোর অন্যদিক থেকে ডাক পড়ল, মৌনোও দ্রুত পালানোর চেষ্টা করল। তার বাম হাতের তালু এখনো শীতল অনুভূতি দিচ্ছে। নিবিড় পরম যত্নে ছুঁয়ে দিয়েছিল যে।

মৌনো যাওয়ার আগেই নিবিড় তাকে আটকাল।
–“আগামীকাল সবার সামনে আসবি মৌনো। আর একা লুকিয়ে থাকিস না। একটু আগে জিজ্ঞেস করলি না, এতে তোর দোষ কী? তোর কোনো দোষ নেই। নিজের মতো করে বাঁচতে কোনো দোষ হয় না। আমাদের নিঃশ্বাস চলে আল্লাহ’র রহমতে, মানুষের কথাতে নয়।”

মৌনো চলে যাওয়ার পর ইয়ামিন মামা নিবিড়ের পাশে দাঁড়ায়। নিবিড়ের অবস্থা সে ভালো করে অনুধাবন করতে পারছে। নিবিড়কে জাগিয়ে দেওয়াটাই তার মূল লক্ষ্য ছিল। এবং সে এতে ভালো রকম সফল হয়েছে। ইয়ামিন মামা জিজ্ঞেস করল,
–“মৌনোর সাথে বিয়ের কথা বলেছ?”

–“না, এখনো বলিনি।”

–“তুমি রাজি তো? কী ভেবেছ ওর সাথে কথা বলার পর? কী মনে হয়েছে? ভেবো না আমি তোমাকে চাপ দিচ্ছি। আমি জানি তোমাদের দুজনের মাঝে কিছু একটা বোঝাপড়া চলছে। মৌনো তোমাকে বিশ্বাসও করে। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে মৌনো যেন একটা টোপ.. যে কেউই মাছ ধরতে তাকে বর্শিতে আটকানোর চেষ্টা করছে। অথচ মৌনোকে বোঝার মতো কেউ নেই। সবারই মতামত সেই শেষমেষ বিয়েতে গিয়েই ঠেকছে। আমি তো বলছি না বিয়ে খারাপ জিনিস। তবে পাত্র হিসেবে এরকম কেউ নেই যে কিনা মৌনোকে বুঝবে। অন্তত তোমার মতো করে কাউকে দেখি যে এই মেয়েটাকে বোঝে। আমার বড়ো ভাইয়ের ছেলেরও কুনজর পড়েছে ওর ওপর। আমি আর ইয়াসীন ভাই নিষেধ করতে গেলেই আবারও পারিবারিক দ্বন্দ্ব বাজবে। এখানে মৌনো বউ হয়ে এলে ওর অবস্থা আরও ভয়াবহ হবে, সেটা মৌনোও বোঝে। আমাদের দুই ভাইয়ের অনেক ভাবনা-চিন্তার পর ফলাফল হিসেবে তুমি এসেছ নিবিড়। তোমাকে যতটা ভরসা করতে পারি ততটা অন্য কাউকে নয়। ভেবে দেখো আমার কথাগুলো। তোমার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে তুমি কতটা মৌনোকে চেয়ে বসেছ। অনুভূতির ক্ষেত্রে লজ্জা আনতে নেই।”

————————————-
পরেরদিনও বিয়েতে মৌনোকে খুব সুন্দর করে সেজেছে। সিম্পল সাজেও মৌনোকে খুব মানায়। বুশরা না চাইলে আজও সাজার ইচ্ছে ছিল না তার। কিন্তু বিদায়মুখী বড়ো বোনকে সেই বা কেমন করে না করবে, তাও এই সামান্য কারণে? এমনিতেই বুশরা কেঁদে-কেটে লাল হয়ে আছে৷ এই বিদায় সে নিতে পারছে না। কিন্তু এতে যে কিছুই করার নেই। মেয়েদের আপন ঘর ছেড়ে যাওয়াটা প্রকৃতির নিকৃষ্ট নিয়ম। সেই নিয়মকে কোনো মেয়েই অবজ্ঞা করতে পারে না।

মৌনো আজ লাল রঙের একটা পুঁতিওয়ালা কামিজ সেট পড়েছে। আজও তার হাত কাপড়ে বাঁধা। তাই কেউ তাকে বিচার করার মতো নেই। সে অবশ্য নতুন মুখ এড়িহে যাচ্ছে, এই যা! খাওয়া-দাওয়া সেরে সবে হাত ধুয়েছে সে। এমন সময়ই খাবার পরিবেশনে ব্যস্ত শিহাব এসে মৌনোকে তাড়া দিল।
–“মৌনো, ওদিকে নিবিড় ভাই ডাকছে তোকে। বলল খুবই জরুরি তলব।”

মৌনো জরুরি তলবের মানে বুঝল না। তবুও সে যেতে বাধ্য হলো। গিয়ে দেখল নিবিড় নীল শার্ট, কালো প্যান্ট পরে দাঁড়ানো। আজ মানুষটাকে বেশ সুপুরুষ লাগছে। মৌনো তার মুখোমুখি হতেই নিবিড় অনুমতিহীন মৌনোর বা-হাত তুলে নিল। মৌনোকে গুরুত্ব না দিয়েই সে কাপড়টা খুলে দিল। মৌনো অস্ফুট স্বরে থামানোর চেষ্টা করল,
–“কী করছেন নিবিড় ভাই?”

নিবিড় জবাব দিল না। সেই হাত মুহূর্তেই দিনের আলোতে পরিষ্কার হয়ে উঠল। বাদামী দাগগুলো কেমন মুখিয়ে আছে। নিবিড় আবারও সেই দাগগুলো ছুঁয়ে নিভৃতে আনা কাগজে মোড়ানো কাঁচের লাল রঙের চুড়ি মৌনোর সেই হাতে পরিয়ে দিল। মৌনো নির্বাক। নিবিড় বলল,
–“এই হাত বদ্ধ নয়, চুড়ির রঙে সাজিয়ে রাখতে হয়।”

মৌনোর ইমোশন কাজ করল। সে এমনিতেই গত রাতের কথাগুলো ভুলতে পারছে না। মানুষটা কেন তাকে এতটা বিস্ময়ে ডুবাচ্ছে। মৌনো যে নিজের দুঃখগুলোকে মেনে নিয়ে, তাদের বন্ধু করেই আগাতে চাইছিল। এই মানুষটা তার থেকে কী চাচ্ছে? কী সমস্যা নিবিড়ের?
–“এই অসুন্দর হাতকে..”

নিবিড় তার কথায় ফোড়ন কাটল অস্বাভাবিক শীতল গলায়,
–“দাগকে তুই অসুন্দর বলছিস? তাহলে চাঁদকে কেন বলিস সে পূর্ণিমা? তার আলো মনকে পরিপূর্ণতা দেয় কী করে? তারও যে দাগই আছে। তোর এই হাত যে অসুন্দর নয়, মৌনো।”

মৌনো চমকে তাকাল নিবিড়ের দিকে। চাঁদের বাক্য নিবিড়ের থেকে কখনো সে আশা করেনি। নিবিড়ের বচনভঙ্গিতে এই শব্দ, এই বাক্যগুলো খুব নতুন।

নিবিড় থেমে আবারও খুব কাতর গলায় বলল,
–“এই সুন্দর হাতটাকে রং দেওয়ার অধিকার দিবে আমায়, মৌনো?”

মৌনো থমকে গেল। তার গলা দিয়ে উচ্চারিত হলো একটি শব্দ।
–“মানে?”

–“তোমাকে আমি বিয়ে করার অনুমতি চাচ্ছি। আমার রঙে সাজাতে চাচ্ছি,
তোমার নামের পাশে আমার নাম চাচ্ছি
তোমার সবকিছুতে অধিকার চাচ্ছি
তোমার সুরক্ষা হতে চাচ্ছি
তোমার সুখে, দুঃখে সবসময় পাশে থাকতে চাচ্ছি
তোমার সেইফজোনটাও আমিই হতে চাচ্ছি, মৌনো।”

মৌনোর চোখে অশ্রু জমল। দুই ধাপ পিছিয়ে কাঁপা গলায় বলল,
–“আপনি আমাকে দয়া দেখাচ্ছেন? আমার এই অবস্থায় আমাকে করুণ ভাবছেন? আমি দয়ার পাত্রী নই নিবিড় ভাই। আমাকে দয়া করে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার দরকার নেই।”

নিবিড় পিছিয়ে না গিয়ে মৌনোর দিকে আগাল। চোখে চোখ রেখে সিংহের মতো আত্মবিশ্বাসের সাথে তাকাল।
–“আমার চোখে চেয়ে দেখো তো, দয়া খুঁজে পাচ্ছ? তোমার জন্য আমি প্রতিটা ক্ষণ পুড়ছি, এটাকে তুমি দয়ার নাম দিয়ে কাটিয়ে দিতে চাইছ? মৌনো, আ’ম নট দ্য ম্যান হু ক্যান পিটি ফর ইউ। আ’ম দ্য ম্যান, হু ক্যান প্রটেক্ট এন্ড.. লাভ ইউ।”

নিবিড়ের চোখের দিকে তাকিয়ে মৌনো হতাশাজনকভাবে কোনোপ্রকার দয়া খুঁজে পেল না। তার বুক কাঁপছে। এর মানে কি, নিবিড়ের প্রতিটা শব্দ সত্যি? তবুও সে প্রশ্ন করল,
–“এখন কেন এসেছেন অনুভূতি জানাতে? এটাকে কী দয়া বলব না?”

নিবিড় দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
–“আমি জানি আমি দেরীতে এসেছি মৌনো। আমারও নিজেরও কিছু বোঝাপড়া ছিল, তা মেটাতেই দেরী হয়ে গেছে। এর জন্য আমি সরিও। তুমি ভালো করেই জানো আমি ক্যারিয়ারের প্রতি কতটা ফোকাসড, আগেও আমি কতশত বিয়ে ভেঙেছি। কিন্তু আজ আমি সেই নিবিড় ইশতিয়াক আজ তোমার কাছে এসে হেরে গেছে। খুব বাজে করে হেরে গেছে। এই হেরে যাওয়া থেকে তুমিই আমাকে তুলে ওঠাতে পারবে।”

–“আপনার আমাকে অসুন্দর লাগছে না? আপনি বদলে যাবেন।”

নিবিড় দুই ধাপ এগিয়ে এলো। খুব ধীরে মৌনোর গাল ছুঁয়ে দিলে বলল,
–“তুমি সুন্দর, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর নারী আমার জন্য। এটা আমি বারবার স্বীকার করলেও কখনো লজ্জিত হবো না। তুমি আমার ওয়াইফ হবে, নিবিড় ইশতিয়াকের ওয়াইফ। বাকিটা তোমার হাতে। ভেবে দেখো, কী করবে। তোমাকে শুধু আমি কতটা সিদ্ধান্তে স্বচ্ছল এটা বোঝাতে পারব। বিয়ে না করাটা এখনো তোমারই হাতে। তবে আমি চাইব, তুমি ফিরিয়ে দিবে না। ইট’স আ হাম্বল রিকুয়েষ্ট মৌনো।”

এই নীরব বিস্ময় থেকে সেরে ওঠাটা সহজ ছিল না। সে দুইদিন জ্বরে আক্রান্ত ছিল এই এত বড়ো শক কাটাতে না পেরে। নিবিড় মৌনোর জন্য দুইবার এসে ফলমূল কিনে দিয়ে গেছে। কিন্তু মৌনোর সাথে দেখা করতে চায়নি। সে মৌনোকে সময় দিয়েছে।

চারদিন পর মৌনো সিদ্ধান্তে এলো। মৌনো বোরকা পরে সোজা মামার কাছে এলো। নিবিড় বলেছে, যদি মৌনো রাজি হয় তবে যেন ইয়ামিন মামাকেই আগে জানায়। বিয়েটা আপাতত গোপন থাকবে, শুধুমাত্র পরিবারের লোকেরাই জানবে। নিবিড় মৌনোকে আরেকটু সময় দিবে। মৌনো যখন চাইবে সবাইকে জানাতে, তখনই সে সরকারকে মৌনোর বায়োডাটা পাঠিয়ে দিবে। এরপর তাদের অনুমতি পেয়েই ধুমধাম করে মৌনোকে ঘরে তুলবে। ততদিন অবধি মৌনো নিজের বাড়িতে থেকেই নিজের স্বপ্নগুলো পূরণ করবে, পড়াশোনা শেষ করবে। নিবিড় তাকে সবসময় পূর্ণ সাপোর্ট দিবে। মৌনোকে দুঃখের আঁচও লাগতে দিবে৷ না। কিন্তু এখন সে মৌনোকে এক মুহূর্তের জন্যও হারানোর রিস্ক নিতে চায় না। সে চায় না আর কোনো কুপ্রভাব মৌনোর জীবনে পড়িক। তাই কাবিনটা সেরে ফেলাটাই উত্তম।

ইয়ামিন মামা আগেই মৌনোর বাবা-মা থেকে অনুমতি নিয়েছে। ওরা ছাড়া আপাতত কেউ জানে না। বিয়ে হয়ে গেলে বাকিদের জানাবে এবং ব্যাপারটা নিবিড়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গোপন থাকবে। খবর ছড়াছড়ির কোনো দরকার নেই।নিবিড়ও নিজেও বাড়িতে জানিয়েছে। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে সোফিয়া খানম দ্বিমত করেননি। বরং তিনি মিনমিন করে বলেছেন,
–“আল্লাহ আমার নিয়্যত পূরণ করতে যাচ্ছে।”

যেহেতু মৌনোকে ওনার আগে থেকেই পছন্দ ছিল, সেক্ষেত্রে তিনি খুশি যে তার ছেলেটা নিজে থেকে মৌনোকে বিয়ে করতে চাচ্ছে। ছেলের যেখানে মৌনোর এত বড়ো দূর্ঘটনায় সমস্যা নেই, তার কেন হবে? তার ছেলে তো আর অবুঝ নয় যে তাকে ধরে-বেঁধে সব শেখাতে হবে। নিজ সিদ্ধান্তে নিবিড় সবসময়ই স্বাধীন ছিল, এখনো হবে। তিনি শুধু দোয়া করছেন এবার যেন মৌনো একটু শান্তি পায়।

কামরুল তো আরও খুশি, দাঁত বের করে করে সবাইকে বলছে,
–“আমাগো বড়ো ভাই এক্কেবারে ফাশঠ কিলাস মানুষরে পছন্দ করছে। এবার ভাইয়ের কাছে বখশিশ চামু না৷ ভাইয়ে আমার দিল খুশ কইরা দিছে।”

মৌনো কাজী অফিসে গিয়ে দেখল নিবিড়, নিবিড়ের বাবা, রিয়াজ সাহেব আর ইয়াসীন মামা, প্রণভ উপস্থিত। রিমঝিমও মৌনোর সাথেই এসেছে। মশিউর সাহেব তো ছেলের বিয়ের কথা শুনে এক মুহূর্ত দেরী করেননি, সঙ্গে সঙ্গে চট্টগ্রাম ছুটে এসেছে। দুদিন যাবৎ মৌনোরই অপেক্ষায় ছিলেন, ছেলের কোয়ার্টারে। বড়ো ছেলের বিয়ে আর তিনি বেঁচে থাকতে থাকবেন না তা কী করে হয়?

নিবিড় আজ সবুজ রঙের কাজ করা এক পাঞ্জাবি পরেছে, মাথার চুলও যেন নতুন কাটিয়েছে। এত সুন্দর লাগছে মানুষটাকে। কিন্তু এখনো মৌনোর মনে নানাবিধ শঙ্কা। সে কোনো ভুল করছে না তো এই সিদ্ধান্তে? যখন কাজীর সামনে এবং নিবিড়ের পাশে মৌনোকে বসানো হলো, মৌনো ধীরে-সুস্থে তার নিকাব খুলে ফেলল। সঙ্গে সঙ্গেই রিমঝিম নিবিড়ের আনা লাল দোপাট্টাটি মৌনোর হিজাবের ওপরেই জড়িয়ে দিল। বড়োদের অনুমতিতে বিয়ে পড়ানো শুরু হলো। কিছু সময়ের ব্যবধানেই ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী তাদের বিয়ে সম্পন্ন হলো। কবুল বলতে গিয়ে মৌনো খুব কেঁদেছে। ইয়ামিন মামা তো ক্যামেরায় নতুন বর-বউয়ের ছবি ক্লিক করতে ব্যস্ত।

আপাতত বিয়ে গোপন থাকবে বিধায় রেজিস্ট্রি স্বাক্ষর করানো হলো না। অধিকার পেতেই নিবিড় মৌনোর কম্পিত হাতে নিজের হাত রাখল। মিনমিন করে বলল,
–“পূর্ণ অধিকার নিয়ে হাতটা ধরলাম মিসেস ইশতিয়াক। হাতটা ধরেছি যেহেতু, এই অধিকার এবং হাত কখনোই ছাড়ব না।”

মশিউর সাহেব অত্যন্ত খুশি হয়ে সদ্য বেয়াই অর্থাৎ রিয়াজ সাহেবকে কোলাকুলি করে হাসতে হাসতে বললেন,
–“দেখেন দেখেন। আমার ছেলের সিদ্ধান্তের কারণে আজ আমরা দুই বন্ধু থেকে দুই বেয়াই হয়েছি। এবার বেয়াইয়ে বেয়াইয়ে বেলতুলি খুব জমবে।”

®লাবিবা ওয়াহিদ
চলবে~~

[যাদের সামনে পর্বটি পৌঁছাবে সবাই রেসপন্স করবেন যেন বাকিদের ফিডেও পর্বটা পৌছাঁয়। খুশিতে চিক্কুর দিতে হলে দিয়ে ফেলুন। আজকেও প্রায় তিন হাজারের কাছাকাছি শব্দ। আশা রাখছি সবাই মন্তব্য করবেন। রিচেক দেয়া হয়নি তাড়াহুড়ায়। ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর নজরে দেখবেন।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here