হৃদয়_এনেছি_ভেজা – [১২]

0
35

#হৃদয়_এনেছি_ভেজা – [১২]

–“ফুপির এভাবে ওই ভাইয়াটার সামনে এগুলো বলা উচিত হয়নি!” নিচু গলায় বললো সাবিয়া।
চোখ-মুখ তার ভার।
তরী বিছানার এক কোণে চোখ বুজে হাঁটুতে মাথা ঠেকিয়ে বসে বসে। একমনে। সাবিয়া টেবিলে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার এখন অনেক কিছু বলতে ইচ্ছে করছে কিন্তু বোনের চুপসে যাওয়া দেখে কিছুই বললো না। শুধুমাত্র সান্ত্বনাস্বরূপ ওই বাক্যটাই বললো। সাবিয়াও তরীর মতো কথা বলায় অপটু। কোন মুহূর্তে কী বলা উচিত তা ঠিকভাবে ঠাওর করতে পারে না। এইতো, বোন তাকে চাপা অভিযোগের স্বরে বললো,

–“পরপুরুষের সামনে ফুপি আমার নামে অভিযোগ কেন করলো রে সাবিয়া? আমার খুব বিব্রত অনুভব হচ্ছে!”

অথচ তার চাইতেও বড়ো কথা হচ্ছে তরীর চোখ জোড়া কিছুটা লাল হয়ে ঝাপসা হয়ে এসেছে। চোখ জোড়া রঙিন ছবি দেখতে পারবে না, অনুষ্ঠান উপভোগ করতে পারবে না। আজকের দিনেই কেন সে অসুস্থ হতে গেলো? কেন-ই বা আজই সিদাতের সম্মুখে পরতে হলো? তরীর মন আকাশে লজ্জার সাথে একরাশ দুঃখও মেঘ হয়ে জমেছে। এই দুঃখ সে মাটিচাপা দিয়ে বসে আছে। কাউকে বলছে না, বুঝতেও দিচ্ছে না। চিনচিন করছে তার মাথা। জ্বর আসছে নাকি?

সাবিয়া যখন নানা ভাবনায় মত্ত তখন হঠাৎ তরী ক্লান্তিভরা কন্ঠে বললো,
–“সিলিং ফ্যানটা বন্ধ করে দে সাবিয়া। ঠান্ডা লাগছে!”

সাবিয়ার টনক নড়তেই সে দ্রুত গিয়ে মাথার ওপরে শব্দ করে ঘোরা সিলিং ফ্যানটা বন্ধ করে দিলো। তরী ততক্ষণে পাশ থেকে উষ্ণ কম্বলটা টেনে গায়ে জড়িয়ে নিলো।


সিদাতের অবসর সময় ছিলো। এজন্য ঘুরতে ঘুরতে তরীদের ভার্সিটিতে চলে আসলো। দেখলো বেশ চকচকে পরিবেশ৷ যেন কোনো প্রোগ্রাম চলছে। সিদাত কয়েকটা ছেলেকে জিজ্ঞেস করলো। জানতে পারলো আজ চারুকলা বিভাগে প্রতিযোগিতা আছে। সিদাত চমকালো। সে যতদূর জানে তরীর মতো মেয়ে অন্তত চারুকলাতে পড়বে না।

এজন্যে সিদাত আরও কয়েকবার জিজ্ঞেস করলো, অন্যান্য ডিপার্টমেন্টে কিছু হচ্ছে নাকি? ছেলে গুলো বারণ করে বললো,”শুধু চারুকলা বিভাগেই।”

সিদাত চিন্তায় পরে গেলো। পরমুহূর্তে হাসি-মুখে ছেলেগুলো কে বিদায় জানিয়ে চলে এলো!

তার মাথায় নানান চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। তরী তাহলে কেন অসুস্থ শরীরে ভার্সিটি আসতে চেয়েছিলো? যদি তার ক্লাস না-ই থাকে। আজ তো চারুকলার প্রোগ্রাম শুধু। আর কিছুই না। তাহলে কী তরী এই প্রতিযোগিতাতেই আসতে চেয়েছিলো? কিন্তু এটা কেন করতে যাবে? সিদাত আকাশ পাতাল ভাবলো। নীরব বন্ধু সম্পর্কে কিছুই জানে না সে। শুধু জানে নীরব বন্ধুর দুই অক্ষরের নামটি। এছাড়া কোন বর্ষ, কোন বিভাগ, কী পছন্দ, ভালো লাগা- মন্দ লাগা কিছুই জানে না। তরী-ই যে কিছুই জানতে দেয়নি।

অবশ্য সিদাতের এবার একটু শান্তি লাগছে। কার জীবনে এরকম একটা নীরব বন্ধু থাকে? তাও তরীর স্বভাবের। হোক একটু ভিন্ন, ভিন্ন অভিজ্ঞতাও নাহয় সিদাত পেলো।

সিদাত আর দেরী না করে বাইক ঘুরিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিলো। মায়ের সাথে কতদিন গল্প হয়নি।

সিদাত বাড়ী ফিরতেই দেখলো বাগানে সাঈদ সাহেব এবং বেশ কিছু কমিটির লোকেরা ছোটো-খাটো মিটিং বসিয়েছে। সাঈদের পাশে সাইফও আছে। অন্যান্য সময়ের তুলনায় সাইফের মুখ জুড়ে শক্ত-পোক্ত একটা ভাব আছে। সিদাত চাপা হাসি দিয়ে ভেতরে যাওয়ার জন্যে পা বাড়ালো। মিনমিন করে বললো,
–“থ্যাঙ্ক গড, আমি এসব ঝামেলার মাঝে নেই!”

সিদাত সর্বপ্রথম রান্নাঘরে গিয়ে ফিরোজা খাতুনকে সালাম দিলো। ফিরোজা তখন তরকারিতে খুন্তি নাড়ছিলো। সিদাতের আকস্মিক উপস্থিতিতে কিছুটা চমকে যায়। পরমুহূর্তে আলতো হেসে সালামের উত্তর নিয়ে বলে,
–“এসেছো আব্বু?”

সিদাত ফিরোজা খাতুনের শাড়ির আঁচলের কিছুটা অংশ হাতে নিয়ে ফিরোজা খাতুনের ঘর্মাক্ত কপাল মুছে দিতে দিতে বললো,
–“হ্যাঁ। এইতো এসেছি। আজ কিন্তু বাড়িতেই লাঞ্চ করবো ছোটো মা। তোমার বেশি কিছু রান্না করার দরকার নেই!”

বলেই সিদাত চলে গেলো। আর ফিরোজা খাতুন মুগ্ধ চোখে সিদস্তের চলে যাওয়া দেখলো। এত সোনায় সোহাগা ছেলে পাওয়া ভাগ্য ক’জনের হয়? ফিরোজা খাতুন অনুভব করলো তার ভেতরে শান্তির বর্ষণ বইছে। ছেলেটাকে দেখলেই মাথায় মমতা চাড়া দিয়ে ওঠে। ইচ্ছে করে মমতায় জড়িয়ে নিতে। সিদাত বাড়ি না ফিরলে অস্থির অনুভব হয়। যেন সিদাতের কাছেই তার মন পরে আছে।

নিত্যদিনকার মতো জয়া ছেলের কথাগুলো খুব মনোযোগ সহকারে শুনছেন। সিদাতের কথায় আলাদা স্বস্তি পায় সে। ছেলেটা তার কথা বলায় কতটা পটু। কথা কেউ সিদাতের থেকে শিখুক। সিদাত তরীর বর্ণনা দিয়ে হেসে বললো,
–“শুনেছো সব মা?”

জয়া পলক ফেললো৷ সিদাত শান্তি পেলো মাকে সঙ্গ দিতে পেরে। এমন সময় সাঈদ সাহেব উঁকি দিলো রুমে। সাঈদ সাহেব ঠিকই লক্ষ্য করেছিলেন ছেলেকে ফিরতে দেখে। এজন্যই তো কোনো রকমে গুরুত্বপূর্ণ কথাবার্তা সেরে ভেতরে চলে আসলেন। বড়ো ছেলে সাইফ গিয়ে জরুই কাজে। ছেলের মুখখানা একটু দেখার জন্যেই এসেছেন। ছেলে এবং স্ত্রীকে একসাথে দেখে চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। করুণ চোখে স্ত্রীর মুখপানে একপলক চেয়ে চলে গেলো। স্ত্রীর প্রতি চাপা অভিমান তাকে স্ত্রীর কাছাকাছি যেতে দেয় না। দূর থেকেই বেশিরভাগ সময় দেখে নেয় তাকে।

দুপুরে সকলে একসাথেই খাবার খেলো। এ যেন অনন্য অনুভূতি। সাঈদ সাহেব নিজ হাতে দুই ছেলের পাতে এটা ওটা তুলে দিয়েছে। দুই ভাই-ই নানান গল্প করতে করতে খেয়েছে। আর সাঈদ সাহেব দুই ছেলেকে একসাথে দেখে চোখ জুড়িয়েছে। ছেলেরা যে সাঈদ সাহেবের ভীষণ আদরের, ভালোবাসার।

ফিরোজা খাতুন একপলক স্বামীর দিকে তো আরেক পলক ছেলেদের দিকে তাকাচ্ছে। এখানে কোথাও না কোথাও জয়ার শূন্যতা অনুভব করছে সে। মানুষটা একা ঘরে পরে আছে আর এখানে সকলে একসাথে। ভারী দীর্ঘশ্বাস ফেললো ফিরোজা।

—————–
বিকালের দিকে ফুপির ছোটো ছেলে শাওন এসেছে। শাওন এবং সাবিয়া সমবয়সী। শাওনকে হুট করে তরীদের বাড়িতে দেখে ফুপি অবাক হলো। অবাক সুরে বললো,
–“একা একা তুই এখানে এসেছিস?”

শাওন দাঁত কেলিয়ে বলে,
–“বাবার রান্না খেতে আর ভালো লাগছিলো না। এজন্যে চলে এলাম। রাস্তা তো চিনি-ই!”

ফুপি এবার শাওনের কান ধরে বললো,
–“খুব বড়ো হয়ে গেছিস না? ‘বাবার রান্না খেতে ভালো লাগছিলো না!’ আহারে ঢং। এতদিন বলতি আমার রান্না ভালো লাগে না। এখন বাবা। তুই কী ভেবেছিস, তোর এসব চালাকী আমি বুঝি না?”

শাওন চাপা আর্তনাদ করে বললো,
–“লাগছে মা। ছাড়ো! কেউ দেকগে ফেলবে। মান-সম্মান আর থাকবে না আমার। আহ্!”

সৌভাগ্যবশত তরী এবং সাবিয়া নামাজ পড়ছিলো এজন্যে শাওনের এই অবস্থা কেউ-ই দেখতে পেলো না।

©লাবিবা ওয়াহিদ
~[ক্রমশ]
বিঃদ্রঃ ভুলত্রুটি ক্ষমাসুলভ দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্যের অপেক্ষায় রইলাম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here