হৃদয়_এনেছি_ভেজা – [১৪]

0
35

#হৃদয়_এনেছি_ভেজা – [১৪]

সাইফ ভ্রু কুচকে চেয়ে আছে রাস্তার দিকে। তার গাড়ির সামনেই একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে রঙিন কাগজে মোড়ানো বড়ো একটি বাক্স। সাইফ কিছুক্ষণ তার ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়ে জানালার কাচ নামিয়ে সাইফ মাথা বের করে মেয়েটির দিকে তাকালো। কপাল কুচকে বললো,
–“পথ থেকে সরে দাঁড়ান। মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন কেন?”

জায়গাটা নীরব। সেরকম দোকান-পাঠ বা মানুষজন নেই। একপাশে সারি দিয়ে মোটা গাছ দাঁড়িয়ে আছে। গাছের পেছনে আবার বড়ো দেয়াল, অনেকটা জুড়ে। গাছের শুকনো পাতা ঝড়ে পরায় পথটা শুকনো পাতায় ভর্তি। দেখতে মন্দ লাগছে না। বরং সুন্দর লাগছে। রাস্তার অপর পাশেও বড়ো দেয়াল। এক দুটো গাছ ছাড়া সেদিকটায় তেমন কিছু নেই। তবে সবমিলিয়ে এই জায়গাটা সুন্দর, স্বচ্ছল!

মেয়েটি সাইফের কাছে এগিয়ে এসে বললো,
–“আপনার মনোযোগ পাইনি কখনো। পাত্তাও সেরকম কাউকে দেন না। এজন্য বাধ্য হয়েই মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়েছি।”

সাইফ কুচকানো কপাল আরও কুচকে বললো,
–“বাই চান্স যদি কোনো এক্সিডেন্ট হয়ে যেত? তখন তার দায়ভার কে নিতো শুনি?”

মেয়েটি একগাল হেসে বলে,
–“অবশ্যই আপনি!”

বলেই কোনো কথা ছাড়াই দরজার সামনে দিয়া হাঁটু গেড়ে বসে পরলো। দিয়াকে হঠাৎ এভাবে মাটিতে বসে পরতে দেখে সাইফের কুচকানো কপাল মসৃণ হলো। চোখ-মুখ জুড়ে ছড়ালো বিস্ময়। দিয়া হাতের প্যাকেটটা এগিয়ে দিয়ে বলে,
–“আপনি কী আমার উপহার গ্রহণ করবেন সাইফ?”

সাইফ ‘থ’, হতভম্ভ, বিমূঢ়। এভাবে কেউ কখনো তাকে উপহার সাধেনি। এরকম ঘটনার সম্মুখীন বোধহয় প্রথম হলো। সাইফ গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। সাইফ দিয়ার হাত থেকে উপহারটা নিয়ে বললো,
–“করছেন কী? এভাবে হাঁটু গেড়ে কেন বসলেন?”

দিয়া উত্তর দিলো না। শুধু অধরে তৃপ্তির ফোটালো। সেই হাসির মানে সাইফের বোধগম্য হলো না। সাইফ বললো,
–“এভাবে উপহার কেন দিলেন? উপহার দেওয়ার থাকলে কারো থেকে আমার ঠিকানা নিয়ে পাঠাতে পারতেন!”

দিয়া এবারও হাসলো। হেসে বললো,
–“সরাসরি দেওয়ার ইচ্ছে ছিলো। দিয়েছি। এখন শান্তি। আসি নাহয়! উপহার আবার ফেলে দিবেন না। ভেতরে হয়তো-বা এমন কিছু আছে, যা অমূল্য। দয়া করে আমার অমূল্য সম্পদের হেফাজত করবেন। আমার এটা প্রথম এবং হয়তো শেষ চাওয়া!”

বলেই দিয়া চলে গেলো। সাইফ তখন আগের জায়গাতেই বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। দূর থেকে তরী সবকিছু দেখলো। তবে সাইফের চেহারা অস্পষ্ট ছিলো। এই পথটা তার প্রিয়। ছবি আঁকার জন্যেও বেস্ট। এজন্যে মন ভালো রাখার জন্যে মাঝেমধ্যেই এখানে এসে এক কোণে বসে স্কেচ করে। এই বিষয়টা তরীকে দারুণ উপভোগ করায়। কিন্তু এই পর্যায়ে দিয়াকে হাঁটু গেড়ে বসে সাইফকে উপহার দেওয়ার দৃশ্যটা দেখে ফেলে। আশেপাশের ব্যস্ত অনেকেই দেখেছে। সকলের জন্যে এটা সেরা এবং সুন্দর দৃশ্য লাগলেও তরীর ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম দেখালো। তরীর এই অবস্থা দেখে নাক কুচকে ফেললো। মিনমিন করে বললো,
–“আস্তাগফিরুল্লাহ্। আজকালকার মেয়েদের লাজ কোথায় গিয়ে পৌঁছিয়েছে মাবুদ!”

তরী সেখানে আর থাকলো না। অর্ধেক স্কেচ ব্যাগে ভরে চলে গেলো। এখানে সিএনজি পাওয়া যায়। নির্দিষ্ট একটি জায়গায় সিএনজি গুলো যায়। তরীদের বাড়ির গলি সেই রাস্তাতেই পরে। এজন্যে তরী সিএনজিতে উঠে বসলো। তরীর পাশের একটি সিট খালি ছিলো। সেখানে একজন লোক বসতে নিচ্ছিলো ওমনি কেউ একজন লোকটির হাত টান দিয়ে ধরে বললো,
–“কী করেন মিয়া! মহিলা আসছে তারে বসতে দেন!”

কন্ঠ চেনা-জানা লাগলো। তরী বিস্ফোরিত চোখে বাইরে তাকালো। সিদাত দাঁড়িয়ে। সত্যি সত্যি-ই একজন মহিলা উঠে বসলো। মহিলার বেশ-ভূষা দেখে মনে হলো ভালো পরিবারের থেকেই এসেছে। সিদাত লোকটিকে ছেড়ে মহিলার উদ্দেশ্যে ঝুঁকতেই তরীর দিকে চোখে গেলো। এবং সে চমকে গেলো। দুজন দুজনের দিকে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে। সিদাত কয়েক সেকেন্ড তরীর দিকে চেয়ে অধর বাঁকিয়ে হাসলো। আপনমনেই বললো,
–“বাহ! পৃথিবী দেখছি আসলেই গোল!”

তরী শুনলো সিদাতের কথা। কিন্তু স্বভাবসুলভ নীরব রইলো। তবে ফিরোজা খাতুন বুঝলো না সিদাতের কথা। ফিরোজা বললো,
–“কী বললে, বুঝলাম না বাবা!”

সিদাত হাসি বজায় রেখে মৃদু গলায় বললো,
–“কিছু না ছোটো মা। তুমি এই সিএনজি করে আপাতত অনয়ের বাসায় যাও। চাবি তো দিলাম-ই। আমি গাড়ি ঠিক করে আসছি। ঠিক করতে ঘন্টাখানেক লাগবে, এর চাইতে বরং তুমি অনয়ের বাসাতেই চলে যাও। যেতে বেশি সময় লাগবে না। আর তুমি না চিনলেও কোনো সমস্যা নেই। তোমার পাশেরজন চিনিয়ে দিবে!”

বলেই সিদাত তরীর দিকে অদ্ভুত চোখে চেয়ে চলে গেলো। আর কাউকে সিদাত উঠতে দেয় না। সিএনজি ড্রাইভারকে দুজনের জন্যে রিজার্ভ করে দিলো। সিএনজি ড্রাইভার টাকা পেয়ে বিনা-বাক্যে উঠে বসে এবং সিএনজি চালু করে।

–“তুমি কী সিদাতকে চিনো?”

তরী চমকে চাইলো ভদ্র মহিলার দিকে। ফিরোজা খাতুন উৎসুক নজরে চেয়ে আছে তার দিকে। ফিরোজা খাতুন একটি বোরকা এবং হিজাবের ওপর নিকাব পরে আছে। তাই জন্য ওনার মুখ দেখতে পারেনি তরী।

ওনার এহেম প্রশ্নে তরী কন্ঠস্বর যথেষ্ট নরম করে বললো,
–“ওনার বন্ধু আমাদের পাশের ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকে!”

ফিরোজা খাতুন বুঝতে পারলো। তরী এর বেশি কিছু বলেনি। ফিরোজা বুঝলো তরী অল্প ভাষী। এই গুণ তার পছন্দ হয়েছে। তাই সে নিজেও আগ বাড়িয়ে কিছু বলেনি। তরী কী মনে করে ব্যাগ থেকে কিছু টাকা বের করে ফিরোজা খাতুনের দিকে বাড়িয়ে দিলো। বললো,
–“ভাড়াটা আপনি নিন আন্টি।”

ফিরোজা খাতুন ভারী অবাক হলো তরীর কথায়। চোখ বড়ো বড়ো করে অবাক সুরে বললো,
–“ওমা। কিসের ভাড়া আবার?”

তরী কিছুটা বিব্রত সুরে বললো,
–“আপনার ছেলে রিজার্ভের ভাড়া দিয়ে দিয়েছে। আমি মোটেও নিজের ভাড়া অন্যকারো বহন করাটা পছন্দ করছি না। তাই আপনি এই টাকাটা রাখুন। মনে দুঃখ নিবেন না আন্টি, তবে আমি সত্যি-ই এটা সহ্য করতে পারি না!”

ফিরোজার যেন আজ চমকানোর দিন। মেয়েটার স্বভাব, আচরণ বড়োই ভাবাচ্ছে তাকে। ছোটো মেয়েটার থেকে টাকা নিবে, কেমন দেখাচ্ছে না? তার ওপর বারণও করতে পারছে না। কার খপ্পরে পরলো সে কে জানে। তবে মেয়েটির কন্ঠে বিব্রতবোধ স্পষ্ট ছিলো। হয়তো ফিরোজা স্মার্ট পরিবেশে ওঠা-বসা করায় এই ব্যাপারগুলো হজম করাটা কষ্টকর। তবে ফিরোজা খাতুন দীর্ঘক্ষণ ভেবে টাকাটা নিলো। সঙ্গে সঙ্গেই তরীর চোখ জুড়ে স্বস্তি দেখতে পেলো ফিরোজা। এতে ফিরোজাও স্বস্তি পেলো। ফিরোজা হেসে বললো,

–“তোমাকে আমার ভীষণ মনে ধরেছে। একদিন চায়ের দাওয়াতে চলে এসো আমাদের বাড়ীতে। নিজ হাতে চা বানিয়ে খাওয়াবো!”

তরী হাসলো। বললো,
–“ধন্যবাদ দাওয়াতের জন্য!”

ওরা ত্রিশ মিনিটের মধ্যে-ই পৌঁছালো। তরী অনয়ের ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দিয়ে নিজেও বাড়িতে চলে আসে। ফুপি সোফায় বসে টিভি দেখছে। কোথাও অগ্নিকান্ড ঘটেছে। সেটারই খবরা-খবর খুব মনোযোগ সহকারে দেখছে। তরী একপলক টিভির দিকে তাকিয়ে ভেতরে চলে গেলো ফ্রেশ হতে। সকালেই ফুপি শাওনকে বহু হুমকি-ধামকি দিয়ে বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছে। তরী বলেছিলো শাওন থাকুক, কিন্তু ফুপি শোনেনি। কখন কী কান্ড করে বসে সে নিয়ে ফুপির আবার ভীষণ ভয়। বড়ো ভাইয়ের কানে কিছু গেলে ফুপি তাকে কী উত্তর দিবে? এজন্যে ফুপি আর সাহস করেনি।

সাবিয়াও এখন মাদ্রাসাতে। ফিরতে আরও অনেক সময় বাকি। তরী চিন্তা করলো সাবিয়াকে মাদ্রাসা থেকে তরী-ই নিয়ে আসবে।

————
সাইফ বক্সটা রাতে গিয়ে খুললো। এবং সে দারুণ অবাক হলো। এ যে এলাহি কান্ড।

©লাবিবা ওয়াহিদ
~[ক্রমশ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here