হৃদয়_এনেছি_ভেজা – [২৭]

0
28

#হৃদয়_এনেছি_ভেজা – [২৭]

সেদিনের পর তরীর বাসার বাইরে বা ছাদে অকারণে যাওয়াটা নিষেধাজ্ঞায় পরিণত হয়েছে। অবশ্যই সিদাতের জন্যে নয়। অন্য এক কারণে। বাড়িওয়ালা তার বখাটে ভাতিজার জন্যে তরীর প্রস্তাব নিয়ে এসেছে। সে নাকি প্রায়-ই ছাদে ওঠলে তরীকে দেখতো। যুবতী মেয়ে যতোই নিজেকে ঢেকে চলাচল করুক না কেন, কিছু পুরুষদের নজর তাদের ওপর পরেই। এজন্য আকবর সাহেব ইদানীং ভীষণ দুশ্চিন্তায় আছেন।

যেই বাড়িতে ভাড়া থাকছে সেই বাড়িতেই এরকম একটা দম বন্ধকর পরিস্থিতি। আকবর সাহেব প্রস্তাবে “না” করে দিলেও ওই ছেলে নির্ঘাত তার মেয়ের পিছু নিবে, মেয়েকে উত্ত্যক্ত করবে। মেয়েকে নিয়েই আকবর সাহেবের যত দুশ্চিন্তা। একজন মেয়ের বাবা হিসেবে সে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় থাকেন তার মেয়েকে নিয়ে, মেয়ের সুরক্ষা নিয়ে। নয়তো আজকাল যা দিন পরেছে, কোথাও মেয়েদের সুরক্ষা নেই। ওদিকে সিদাত অস্থিরতায় কাহিল এই ভেবে যে তরী তাকে নীরবে রিজেক্ট করেছে।

রাতে ঘুম হয় না তার, খাওয়া-দাওয়া ঠিক ভাবে হয় না। তার নিজস্ব হৃদয় তার বেঁচে থাকাটাই কেমন দুর্বিষহ করে তুলেছে। এ মন বন্ধু নাকি শত্রু? উত্তর পায় না সিদাত। সাহস করেও সিদাত তার বাবাকে কিছু বলতে পারে না। বাবাকে খোলামেলা এসব বলা সম্ভব? সে তো আর সাইফ নয়, তার যথেষ্ট জড়তা কাজ করে বাবার সম্মুখে। একজন মানুষ কথা বলায় যতই পটু হোক না কেন সে কোনো এক জায়গায় গিয়ে ঠিকই থমকায়। সিদাতের বেলায় হয়েছে ঠিক সেরকম।

যবে থেকে তরীকে নিয়ে উপলব্ধি করতে শিখেছে ঠিক তখন থেকেই তার কাঙ্খিত চোখ জোড়া তাকে খুঁজে বেড়ায়। সেদিন ছাদের ঘটনার পর আর চোখের দেখা মিলেনি তরীর। সেই থেকেই সিদাত ব্যাকুল। সে প্রতিনিয়ত বুঝতে পারে তরী শুধু তার মায়ের পছন্দ নয়, তরী তার বাজে রকম পছন্দের। যেই পছন্দকে সিদাত খুইয়ে ফেলবে ভাবলেই চোখ জোড়ায় অন্ধকার দেখে। অনয়ের বলা টিপসে সে অনয়ের বাসাতে এখন তেমন যায় না বললেই চলে।

বাঙালি মেয়ের বাবারা ছেলেদের নিজের বাড়ি থেকে বন্ধুর বাসায় পড়ে থাকাটা মোটেও ভালো ভাবে নেয় না। ওদিকে অনয়টাও নাকি বাসা চেঞ্জ করবে, কয়েক মাস পর তার বিয়ে। এজন্যে আরও সাজানো-গোছানো ভালো বাসাতে কিছুদিনের মধ্যেই যাবে। তখন সিদাতের কী হবে?

————–
আকবর সাহেব চিন্তিত মনে বাসা থেকে বের হতেই দেখলো অনয়ের ফ্ল্যাট থেকে জিনিসপত্র নামছে। আকবর সাহেব ভুরু কিঞ্চিৎ কুচকালো। অনয় হঠাৎ বেরিয়ে আসতেই তাকে দেখতে পেলো। অনয় চওড়া হাসির সাথে সালাম দিয়ে খুবই নম্র গলায় বলল,
–“কী অবস্থা স্যার?”

আকবর সাহেব তার পেশাগত দিক দিয়ে একজন শিক্ষক। এজন্য অনয় তাকে স্যার বলেই সম্বোধন করে। আকবর সাহেব ম্লান হেসে বললো,
–“আলহামদুলিল্লাহ, ভালো। হঠাৎ বাসা বদলাচ্ছো যে?”

এই মুহূর্তে এসে অনয় কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পরে। মাথা চুলকে লাজুক হেসে বললো,
–“একচুয়ালি স্যার, মাসখানেক পরেই বিয়ে তো। এজন্যে ভালো পরিবেশে…”

আকবর সাহেব অনয়ের ইনিয়ে বিনিয়ে বলা কথার অর্থ বুঝে মুচকি হাসলো। পরমুহূর্তে কী ভেবে আবার চিন্তিত হয়ে পরল। বলল,
–“তোমার চেনা-জানা ভালো পরিবেশে কোথাও বাসা আছে? আসলে আমিও কিছুদিন যাবৎ চাচ্ছি এই বাসাটা ছেড়ে অন্য কোথাও শিফট হবো। থাকলে জানিও তো!”

অনয় বেশ চমকালো। অস্ফুট স্বরে বলল,
–“হঠাৎ? কোনো সমস্যা?”

–“না, বাবা। তেমন কিছু না। তবে বাসা চেঞ্জ করাটা খুব জরুরি! আমিও সময়, সুযোগ পাচ্ছি না নতুন বাসা খোঁজার। এজন্যে একপ্রকার বাধ্য হয়েই তোমাকে বললাম।”

———–
তরী গলির মুখে রিকশা থেকে নেমে আপনমনে হাঁটতে লাগলো। বাসার পথ মিনিমাম পাঁচ মিনিট। এজন্যে হেঁটেই যাওয়ার সিদ্ধান্তি নেয় তরী। কিছুদূর যেতেই হঠাৎ কিছু বখাটে তরীর পথ আটকে দাঁড়ায়। তরী এতে ভীষণ ঘাবড়ে যায়। তবে সে নিজেকে নীরবে সামলে নিলো। মাঝের একদম সামনের ছেলেটাকে তরী চিনে। এটাই বাড়িওয়ালার সেই বখাটে ভাতিজা। বখাটে সোলেমান সিগারেট ফুঁকে তরীর দিকে তাকিয়ে বিশ্রী হাসি দিলো। তরী আগেই নজর অন্য দিকে ফিরিয়ে রেখেছে। এসব ছেলেদের দিকে তাকাতেও তরীর ঘেন্না করে। সোলেমান বিদঘুটে গলায় বলল,
–“চাইছিলাম পর্দানীরে বিয়ে করে ভালো হবো। কিন্তু কেউ চায়-ই না আমি ভালো হই। এটা কী ঠিক বলো তো?”

তরী অস্বস্তিতে পরে গেলো। সৎ সাহস টুকু পাচ্ছে না এদের সবাইকে একসাথে দেখে। হাঁটু জোড়া ইতিমধ্যে কাঁপতে শুরু করেছে তার। মনে মনে দোয়া-দরুদ পড়ে কম্পিত গলায় বলল,
–“পথ ছাড়ুন!”

তরীর ভীতিগ্রস্ত কন্ঠস্বর শুনে সোলেমান হো হো করে হেসে উঠলো। সোলেমানের সাথে তার চ্যালারাও না বুঝেই হাসিতে তাল মেলাল। তরী তার হাত জোড়া মুঠি বদ্ধ করে এদিকে সেদিক কিছু একটা খুঁজতে থাকল। কিন্তু সেরকম কিছুই নজরে পরছে না।

সোলেমান হাসি বজায় রেখেই তরীর দিকে দুই কদম এগিয়ে এলো। তরী ভয়ে পিছিয়ে গেলো। সোলেমান বলল,
–“বাহ! ভয় লাগছে আমাকে? তা তোর হুজুর বাপের ভয় লাগেনি আমার প্রস্তাবে না করার সময়? বুঝে নাই তার একটা “না” তে আমি তোর কী হাল করতে পারি? তোর তো বেহাল করবোই সাথে তোদের সবগুলাকেও বাড়ি ছাড়া করব। তখন রাস্তায় বসে পর্দা চর্চা করিস কেমন?”

সোলেমানের এই ধরণের বিশ্রী কথায় তরী কেঁদে দিল। বলতে চাইল, “তোরা আল্লাহ্কে ভয় কর!”

সোলেমান তরীর হাত ধরতেই নিবে ওমনি কেউ তার হাত ধরে ফেলে। তরী “আল্লাহ্” বলে চিৎকার দিয়ে সরে আসে ভয়ে। চোখ জোড়া বন্ধ। সোলেমান রাগাম্বিত হয়ে সামনে তাকাতেই দেখলো সিদাত ধরে আছে তার হাত। সিদাতের পেছন থেকেই সাইফ মাথা বাঁকিয়ে সোলেমানের দিকে চেয়ে চওড়া হাসি দিয়ে বলল,

–“ভালো আছো ছোটো ভাই?”

সাইফের গলা শুনে তরী চোখ মেলে তাকায়। সিদাত, সাইফকে একসাথে দেখে ভীষণ অবাক হয়। তার চাইতেও বেশি অবাক হয় সোলেমান সহ তার সাঙ্গ-পাঙ্গরা। সিদাতের চোখ জোড়া রাগে টগবগ করছে। সে মুহূর্তেই সোলেমানের হাত মুঁচড়ে দিলো। সোলেমান দাঁত, চোয়াল খিঁচে চাপা আর্তনাদ করে উঠল। সিদাত ভীষণ গম্ভীর গলায় বলল,
–“এত সাহস এসব নোংরা চিন্তা-ভাবনা মাথায় আনার, তাও আবার নিকাব রাণীকে নিয়ে? তোর এই হাত যদি তোর গলায় না ঝুলিয়েছি…”

বলেই আরও জোরে মুঁচড়ে ধরলো। সাইফ চট করে সকলের ছবি তুলে নিলো মোবাইলে। সেই ছবি গুলো জুম করে দেখতে দেখতে বললো,
–“ওয়াও! বাট একটু হাসলে ছবি গুলো আরও সুন্দর লাগতো!”

বিপদ অতি সন্নিকটে তা চ্যালাগুলোর বুঝতে বাকি রইলো না। এজন্যে যে যেদিকে পারে সেদিকেই ছুটে পালিয়েছে। একজন চেয়েছিলো সাইফের মোবাইল ছিনিয়ে ভাঙার। কিন্তু সবকিছু কী এত সহজ?

———-

পুরো মহল্লায় খবর ছড়িয়ে গেলো। বখাটে সোলেমান সহ আরও কিছু ছেলেরা হাসপাতালে ভর্তি। সকলেই বাজে রকম আহত। কে বা কারা এই কাজ করেছে তা কেউ জানে না। তবে এটুকু জানা গেছে সোলেমান কোনো এক মেয়েকে বাজে ভাবে উক্ত্যক্ত করছিলো, এজন্যই তাদের এ দশা।

কিন্তু মেয়েটি কে, কী তার পরিচয় তার কিছুই জানা যায়নি। সোলেমানের বাবা, চাচারা থানা-পুলিশ অবধি গেছে কিন্তু কেউ-ই বিশেষ সুবিধা দিতে পারেনি।

এসবটাই সামলাচ্ছে সাইফ এবং সাঈদ সাহেবের ম্যানেজার। আর এদিকে সিদাত তরীকে একের পর এক কল দিয়ে-ই যাচ্ছে। সিদাতের কাছে সেই প্রথম দিকেই তরীর নাম্বার ছিলো। কিন্তু সিদাতের কখনো প্রয়োজন পড়েনি তরীকে কল দেওয়ার। তরীর পছন্দ, অপছন্দ সবসময়ই খেয়াল রেখেছে সে। কিন্তু সেই ঘটনার পরপর তরীকে সে অনবরত কল করছে। তীব্র দুশ্চিন্তা তাকেও জেঁকে ধরেছে। ওই ঘটনা খুবই অপ্রত্যাশিত এবং জঘন্য। যা তরীর মস্তিষ্কে খারাপ আঘাত আনতে পারে। তরীর মতো মেয়ে কখনোই এই ধরণের ঘটনার সম্মুখীন হয়নি। এজন্য এই ঘটনা মেনে নেওয়া তার পক্ষে ভীষণ দুঃসাধ্য ব্যাপার।

তরী প্রথমদিন সিদাতের কল ধরেছিলো যেদিন রাতের মধ্যে সোলেমান সহ তাদের সাথের গুলাকে ধরে উদুম মা* দেওয়া হয়েছিলো। সবই করেছে সাঈদ সাহেবের খুবই পুরানো লোক। স্বয়ং সিদাত করিয়েছে। এগুলা না করলে আগামী দিন তরীর মতো আরও মেয়েরা এদের কবলে পরবে। সবাই তো সবসময় তাদের বাঁচাতে আসবে না। এছাড়াও তরী এখন সিদাতের প্রাণ। প্রাণে কেউ খারাপ চিন্তায় স্পর্শ করতে আসলে তাকে অবশ্যই শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা সে রাখে।

তরী কল রিসিভ করার পরপর সিদাত শুধু এইটুকুই বলেছিলো,
–“এসবের চরম মূল্য চুকাতে হবে ওদের। শুধু কালকে থেকে চোখ-কান খোলা রেখো। সময় মতো সুন্দর খবর পেয়ে যাবে!”

ব্যাস! এটুকুই। তরীর অবস্থা আর জিজ্ঞেস করার সুযোগ পায়নি। তরী তৎক্ষনাৎ সিদাতকে ব্লকলিস্টে ফেলে দিয়েছে। যা সিদাত বোঝা সত্ত্বেও মনে ক্ষীণ আশায় অসংখ্যবার কল করে চলেছে। কিছুদিন পর সিদাত সেই বাড়ি যাওয়ার পর জানতে পারে তরীরা বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও শিফট হয়েছে। এ খবর শোনার পরপর সিদাতের মাথায় যেন পুরো আকাশটা দুম করে ভেঙে পরলো।

©লাবিবা ওয়াহিদ
~[ক্রমশ]

বিঃদ্রঃ খুবই তাড়াহুড়োয়, চোখে ঘুম নিয়ে লিখেছি। তাই ভুলত্রুটি ক্ষমাসুলভ দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্যের অপেক্ষায় রইলাম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here