#হৃদয়_এনেছি_ভেজা – [৩৪]
জোছনা রাঙা রাত। আকাশে থালার ন্যায় চাঁদখানা তার আলোর রশ্নি জমিন বুকে ছড়িয়ে দিয়েছে। কী এক রোমাঞ্চকর মুহূর্ত, দমকা হাওয়া বারবার ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে। তরী জানালা মেলে দিয়ে বিছানায় শুয়ে এই মুহূর্ত ভীষণ রকম উপভোগ করছে।
কানে তার ব্লুটুথ গোঁজা। সিদাতের কন্ঠস্বর শুনছে সে। বিয়ের পর থেকে সিদাতের শো-এর রেগুলার স্রোতা হয়ে গিয়েছে সে। যখনই মিউজিক, বাদ্যযন্ত্র কানে বিঁধত, সঙ্গে সঙ্গে কান থেকে ব্লুটুথ খুলে ফেলে সে। যদিও সিদাতের শো-তে ইদানীং বাদ্যযন্ত্র শোনা যায় কম। কেন তা তরীর জানা নেই।
সিদাতের কথাগুলো তার কাছে অন্যরকম ভালো লাগে। অনুভব-ই হয় না সিদাত তার পাশে নেই। মনে হয় সিদাত যেন তার সাথে নিঃশ্বাসের মতো করে মিশে আছে।
কয়েক মাস আগেও ভাবেনি এই ছেলেটা-ই তরীর ভাগ্যে আছে, এই ছেলেটার-ই অর্ধাঙ্গিনী হবে। আজও মাঝেমধ্যে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় এই ছেলেটাই তার বর, তার সবথেকে কাছের মানুষ।
তরী খেয়াল করেছে সিদাতকে ভেবে সে আনমনে হাসে, সিদাতের আশেপাশে থাকার জন্যে তার হৃদয় ব্যাকুল থাকে। সিদাতকে দীর্ঘক্ষণ দেখার পর তার হৃদয় সিক্ত হয়। অথবা সিদাতের ভাষায় ভালো লাগায় ভিজে যায়।
সিদাতের ভেজা হৃদয়ের সাথে মিশতে মিশতে ইদানীং তার হৃদয়টাও কেমন ভেজা, সিক্ত লাগে। এরকম আকাশ-পাতাল ভাবতে গিয়ে তরী আপনমনে হাসল।
দিয়া কিছুক্ষণ আগেই তার রুমে গিয়েছে। সাইফ সারাক্ষণ বিভিন্ন কাজে বাইরে থাকে। তাই যখন সাওফ ফিরে, দিয়াকে তাকে সঙ্গ দিতে হয়। সাঈদ সাহেব এবং ফিরোজা হজ করতে গিয়েছেন আজ প্রায় পাঁচ দিন হল।
তরী কী ভেবে তার গোপন সখটাকে উম্মুক্ত করল। স্কেচবুক, পেন্সিল নিয়ে বসল। চাঁদকে লক্ষ্য করে একটা একটি দৃশ্য স্কেচ করল।
চাঁদের চারিপাশে ধবধবে মেঘ উড়ে বেড়াচ্ছে। চাঁদ মেঘকে সরিয়ে দিয়ে জমিনে নরম, শান্ত আলো ছড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। তরীর অধরে লেপ্টে আছে অদ্ভুত হাসি।
কানে বেজে চলেছে প্রিয় পুরুষের কন্ঠস্বর, আর আনমনে প্রিয় মুহূর্তটি স্কেচ করে সংগ্রহ করছে তরী।
আজ বেশ রাত করেই সিদাত বাড়ি ফিরল। রুমে এসে দেখল তরী পেন্সিল, ইরেজার, স্কেচবুক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখেছে। সেগুলোর পাশেই জানালার দিকে মুখ করে সুখ ঘুমে তলিয়ে আছে তরী। জানালা ভেদ করে আসা নরম বাতাস তরীর মুখশ্রী ছুঁয়ে দিচ্ছে।
যার ফলস্বরূপ তরীর সামনের চুলগুলো মৃদু দুলছে। সিদাতের চোখ জুড়িয়ে গেল যেন এই দৃশ্য দেখে। রুমে আসার আগেই দিয়া বলেছিল,
–“তরীকে দেখলাম ঘুমিয়ে গেছে। এখনো কিছুই খায়নি মেয়েটা। দেখো তো উঠিয়ে খাওয়াতে পারো কী না! আর নিজেও আসো খেয়ে যাও।”
কিন্তু সিদাতের ইচ্ছে করল না, এই ঘুমন্ত নিকাব রাণীকে ডেকে তোলার। সে এই মুহূর্তে ঘুমন্ত অবস্থাতেই সুন্দর। পৃথিবীর সর্বোচ্চ সুন্দর।
কাউকে ভালোবাসলে বুঝি তাকে সবসময় সেরা লাগে? তার ঘর্মাক্ত, গুটি গুটি ব্রণ, বাম্পস এর দাগেও বুঝি তাকেই অসাধারণ লাগে, তাকেই আমার জীবনে চাই এরকম অনুভব হয়? সিদাতের মনে হয় তরী-ই তার জীবনে দেখা সেরা নারী, সেরা স্ত্রী। যাকে সিদাত প্রথম ভালোবাসার স্থান দিয়েছে, যাকে স্ত্রী রূপে পেয়েছে।
অবশ্যই মায়েরাও সেরা হয়। কিন্তু ওইযে, সকলেরই নির্দিষ্ট একটা অবস্থান রয়েছে। তাদের নিজেদের অবস্থান থেকে তারা সুন্দর, অমায়িক সুন্দর। একজন জননী রূপে, আরেকজন সহধর্মিণী রূপে।
সিদাত আলতো পায়ে জানালার কাছাকাছি গেল। স্কেচবুক শব্দহীন হাতে নিল। পৃষ্ঠা উলটে দেখল দুইটা স্কেচ। একটি চাঁদের আশেপাশে মেঘের আনাগোণা, অপরটি বিরাট চাঁদের মাঝে একটি তরী নদীতে ভাসছে।
দ্বিতীয় ছবিটি-ই সিদাতকে বেশি আকর্ষণ করল। মন বলল এই ছবিটার অর্থ আছে। সিদাত গভীর চোখে ছবিটা দেখল। হঠাৎ তার মাথায় দুটো এলোমেলো লাইন এল। সিদাত ছবিটি থেকে চোখ সরিয়ে তরীর দিকে তাকালো। ঘোর লাগা কন্ঠে আওড়ালো,
–“আকাশে চাঁদ, নদী কুলে প্রেমের তরী
অসংখ্য চন্দ্র বিলাসে
তরী জুড়ে হারাব, হারাচ্ছি আমি।”
সিদাতের হঠাৎ কী হলো জানা নেই। সে তরীর দিকে এগিয়ে তরীর দিকে ঝুঁকে কপালে অধর ছোঁয়াল। সেই ছোঁয়া দিতে গিয়ে সিদাতের সর্বাঙ্গ জুড়ে শীতল অনুভূতি ছড়ালো। বিছানাটা নীরবে গুছিয়ে সিদাত তরীর পাশেই শুয়ে পড়ল। শুয়ে শুয়ে এক নজরে তরীকেই দেখতে লাগল।
আলতো হাতে তরীর লালাভ গাল ছুঁয়ে দিল। মেয়েটাকে সিদাতের হৃদয়ে বন্দি করে রাখতে ইচ্ছে করে। মায়াভরা মুখশ্রী, লালাভ গাল, চেহারার লাবণ্য সবটাই সিদাতকে অসংখ্যবার পিছলে পড়তে বাধ্য করেছে।
দিয়াকে সিদাত মেসেজ করে জানিয়ে দিয়েছে আজ তারা কেউ-ই খাবে না। এজন্য দিয়াও নিজের রুমে এসে শুয়ে পড়েছে। সাইফ তখনো ল্যাপটপে ডুবে আছে। দিয়া আড়চোখে সাইফের এরকম ব্যস্ততা দেখে গাল ফোলাল। একপ্রকার রাগ করেই চোখ শক্ত করে শুয়ে রইল। সাইফকে দেখবেও না, কথাও বলবে না।
মিনিট দুয়েকের মাঝে সাইফ গায়ের পারফিউমের ঘ্রাণটা দিয়া খুব কাছ থেকে পেল। সেই ঘ্রাণ পেয়েও দিয়া ভ্রুক্ষেপ করল না। আগের ন্যায় নড়াচড়া ছাড়া শুয়ে রইল। হঠাৎ সাইফের শীতল স্পর্শ পেতেই দিয়া দূরে সরে যেতে চাইল। কিন্তু সাইফ তাকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে বলল,
–“জামাইয়ের ব্যস্ততা সহ্য করতে পারো না? সহ্য করতে না পারলে পেট চলবে কী করে বউ?”
দিয়া তাও সাইফের থেকে ছোটার চেষ্টা করতে লাগল। সাইফ আবার বলল,
–“আহা, অভিমানী বেগম। এভাবে রাগছ কেন? এসেছি তো সব ব্যস্ততা ফেলে। তাও দূরে সরিয়ে দিবে?”
দিয়া এবারও জবাব দিল না। সাইফ হাল ছেড়ে বলল,
–“ওকে, কিচ্ছু বলতে হবে না। এভাবেই থাকো! ঘুমাতে দাও। নিজেও ঘুমাবা!”
বলেই দিয়াকে জড়িয়ে ধরে সাইফ চোখ বুজল। দিয়া চাপা স্বরে বলল,
–“ঘুমালে আমার ছেড়ে ঘুমান। আমার ভালো লাগছে না!”
সাইফ চোখ বুজেই বলল,
–“আরেকবার নড়াচড়া করলে কালকের ছুটি আমি ক্যান্সেল করে দিব কিন্তু বউ!”
দিয়া সঙ্গে সঙ্গে নড়াচড়া বন্ধ করে দিল। সাইফ তবে কাল বাসাতেই থাকবে? মন জুড়ে ভালো লাগা ছেয়ে যায় দিয়ার। অধর বাঁকিয়ে হেসে সাইফের বাহুতে মুখ গুঁজে চোখ বুজল।
পরেরদিন সাইফ, সিদাত দুজনেই বাড়িতে। দিয়া এবং তরীরও আজ কোনো কাজ করা বারণ। খাবার আজ বাইরে থেকে অর্ডার করা হবে। আজ চারজন মিলে একসাথে সময় কাটাবে। আবার নিজেদেরকেও সময় দিবে। বাহির থেকে খাবার আসার পরপর চারজন ছাদের মেঝেতে বসে খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো।
তরী অন্যদিকে ফিরে বসল। আর সিদাত বসল তরীর পিছেই। যার ফলস্বরূপ দুজনের পিঠ একই সংস্পর্শে। সাইফ সিদাতের মুখোমুখি বসায় তরীর মুখ দেখার কোনো রকম পন্থা নেই। তরী খুব সন্তুষ্ট সিদাতের উপর। সিদাত তার পর্দার ব্যাপারটা সেই প্রথম থেকেই খেয়াল রাখছে। সিদাত একদিন উচ্ছাসের সাথে বলেছিল,
–“আমি ভাগ্যবান আমার মূল্যবান নিকাব রাণীকে পেয়ে। মন থেকে দোয়া করি আমার মূল্যবান রাণীর মায়াবী মুখখানা আমি ছাড়া আর কোনো পরপুরুষ স্বচক্ষে না দেখুক।”
—————
রাতে সিদাত এবং তরী পাশাপাশি বসে চা খাচ্ছে। সিদাত হুট করে বলে ওঠে,
–“নিকাব রাণী!”
তরী অস্ফুট সরে বলল, “হুঁ!”
–“তোমার মনে অনেক প্রশ্ন তাই না? আমি এলকোহল খাই..”
তরী সিদাতের এ কথা শুনে ভীষণ ঘাবড়ে যায়। ঘাড় বাঁকিয়ে সিদাতের চোখে চোখ রাখে। সিদাত আলতো স্বরে বলল,
–“একটা মিস আন্ডাস্ট্যান্ডিং হয়েছে তোমার। সেই মিস আন্ডাস্ট্যান্ডিং-টা আমি অনেকদিন যাবৎ দূর করতে চাইছিলাম, কিন্তু সময় সুযোগ হচ্ছিল না। সাথে কেন যেন বলতেও পারছিলাম না। শোনো তবে, আমি কখনো এলকোহল মুখে নেইনি। এটার থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকতাম। কিন্তু সেদিন…”
বলেই সিদাত ধীরে ধীরে সেদিনের ঘটনা খুলে বলল। তরীর চট করে সেদিনের গুন্ডা লোকগুলোর কথাও স্মরণে আসে। কী বিপদজনক ছিল সেই রাত। ভাগ্যিস আল্লাহ্ সহায় ছিল, নয়তো সেই রাত কীভাবে তারা দুজন মেয়ে এই বিপদ থেকে রক্ষা পেত। সত্যি-ই মাবুদ পাশে থাকলে ভয় কিসের?
সব বলা শেষে সিদাত বলল,
–“ভাইয়া তখন মাত্র ইলেকশনে দাঁড়িয়েছে। এজন্য বিপক্ষ দল ভেবেছিল আমাকে ড্রাগ দিয়ে দুর্বল করবে। কিন্তু সত্যি-ই সেদিন আমি বেঁচে গিয়েছিলাম!”
তরী বড্ড নরম গলায় বলল,
–“রক্ষা করার মালিক আল্লাহ্। তার কাছে ক্ষমার পাশাপাশি শোকরিয়া আদায় করুন।”
সিদাত তাই করল। পরমুহূর্তে দুষ্টু হেসে বলল,
–“সেদিন থেকে তো ঠিকই ভাবছিলে, বড়োলোকের বিগড়ে যাওয়া মাতাল ছেলে তোমার জীবন অতীষ্ঠ করে রেখেছে। তাই না?”
তরী ধরা খেয়ে চুপ করে রইল। আগে যেমন তেমন ব্যাপারটা হলেও এখন সিদাত তার স্বামী। চাইলেও লাজ-শরম গিলে সেসব কথার স্বীকারোক্তি উচ্চারণ করতে পারবে না। এজন্য চুপ থাকাকেই শ্রেয় মনে পরল। সিদাত তরীর এমন নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া দেখে হো হো করব হেসে ওঠল। হাসি থামিয়ে হঠাৎ বলল,
–“নিকাব রাণী! তোমায় বুকে আবদ্ধ করতে চাইছি। আসবে আমার এই তুমিহীন বুকে? মাথা রেখে চোখ বুজবে?”
©লাবিবা ওয়াহিদ
~[ক্রমশ]
বিঃদ্রঃ ভুলত্রুটি ক্ষমাসুলভ দৃষ্টিতে দেখবেন। আজ লেখার কোনো প্ল্যান ছিল না। কিন্তু হাতে অল্প একটু সময় পেয়ে দ্রুত করেই লিখেছি। কেমন লেগেছে জানাবেন কিন্তু।

