#হৃদয়_এনেছি_ভেজা – [৩২]
দিন পেরিয়ে রাত হলো। মাঝে দিয়ে কেটে গেল আরও একটি বিষাদময় দিন। আত্নীয়-স্বজন এখনো অনেকেই রয়ে গেছে। আবার কিছু জন চলে গেছে। দ্বিতীয় দলে যুক্ত হবে আকবর সাহেব এবং তার পরিবার। তরীকে এখানে রেখে আজ তারা বিদায় নিবে। প্রয়োজনে কাল আবার আসবে। তবুও আর একদিনও থাকা সম্ভব না।
সাঈদ সাহেব জোর করেও রাখতে পারল না। আকবর সাহেব হাসি-মুখে জানায়,
–“আর আটকাবেন না ভাই। দরকার লাগলে আবার আসব। তবুও আজকের মত বিদায় চাচ্ছি!”
সাঈদ সাহেব হতাশ হলেন। তরী যখন জানতে পেরেছে তার বাবা-মা চলে যাচ্ছে তখনই সে মাকে জড়িয়ে ধরে চুপ করে কাঁদল কিছুক্ষণ। তার ভেতরটা খাঁ খাঁ করছে কেমন! কামরুন নাহার চমৎকার মানুষ। তিনি এই কঠিন পরিস্থিতিতেও বেশি না কেঁদে মেয়েকে বোঝাচ্ছেন। বলছেন এটাই জাগতিক নিয়ম। একজন মেয়ে সারা জীবন তার বাবা-মায়ের কাছে থাকতে পারে না। কিন্তু তরী একসঙ্গে দুটো শোক কিছুতেই নিতে পারছে না। হঠাৎ তরী কেমন অবুঝ হয়ে পড়েছে। কামরুন নাহার হার না মেনে ধৈর্য ধরে মেয়েকে বোঝাচ্ছে।
কামরুন নাহারের পরিবার মোটেও পুরোপুরি ধার্মিক না। সকলেই আধুনিক জগতের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পছন্দ করত আগে থেকেই। কিন্তু কামরুন নাহার তাদের মতো পরিবারে একজন ব্যতিক্রমধর্মী মেয়ে হল। পর্দা, নামাজ-কালাম, তিলওয়াত, জিকির সবটাতে-ই সে ধীরে ধীরে ডুবে গেল। এতে অবশ্য সবাই বেশ সন্তুষ্ট ছিল। রাজিবের ইচ্ছে হল তার বোনকে তার সেরকম-ই নামাজ-কালাম করা ছেলের সাথে বিয়ে দিবে। সেই ছেলের আয় রোজগার কম হলেও তার কোনো সমস্যা নেই। কামরুনের মাও এতে সম্মতি জানায়। মাস ছয়েক পরপরই ঠিক এরকমই মনমতো এক প্রস্তাব আসল। ছেলে মোয়াজ্জেম। পাশাপাশি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছে। সেই ছেলেটাই আজকের আকবর সাহেব।
এত বছর পর আকবর সাহেবেরও এরকমই তীব্র এক ইচ্ছে ছিল। কিন্তু মাবুদের পরিকল্পনা ভিন্ন ছিল দেখেই তরী এরকম একটি পরিবেশে জড়িয়ে গেল। বিয়ে হল এক মিডিয়া পাড়ার ছেলের সাথে। সিদাতের তরফ থেকে প্রস্তাব আসার পরে আকবর নিজেই সিদাতের অফিস গিয়েছিল সিদাতের কার্যক্রম দেখতে। সিদাত তখনো জানত না যে আকবর সাহেব এসেছে। আকবর সাহেব নিজের পরিচয় গোপন করে সিদাতের কলিগদের থেকে টুকটাক জিজ্ঞেসও করেছে সিদাতকে নিয়ে। সিদাতকে নিয়ে সকলের ইতিবাচক কথা শুনলেও আকবর সাহেব স্বস্তি পাননি। এজন্যই সে বারণ করে দিয়েছিলেন।
আকবর সাহেব অবশ্য অফিসে ঢুকেছিল রাজিবের সাথেই। রাজিব-ই সিদাতকে কল করে জানিয়েছে সে অফিস যাবে, সিদাতের সাথে দেখা করতে। এজন্য সিদাত আগেই অফিসের ঢোকার মুখে সিকিউরিটি গার্ডদের ব্যাপারটা জানিয়ে রেখেছিল। রাজিবের সাথে সিদাতদের এত সুন্দর সম্পর্কের কারণ আকবর সাহেব জানে। সাঈদ সাহেব নিজেই জানিয়েছিল। সাত বছর আগে যখন জয়া এক্সিডেন্ট করে তখন রাজিব-ই নাকি তাকে হসপিটাল নিয়ে গিয়েছিল। সেই থেকেই তাদের মধ্যে পরিচিতি।
যখন সিদাত রাজিবের সাথে কথা বলতে ব্যস্ত তখনই আকবর সাহেব এসব করেছেন। শেষে গিয়ে সিদাত দেখতে পায় আকবত সাহেবকে। সাধারণ কুশল বিনিময়ের পরপরই তাদের বিদায় জানায় সিদাত। কারণ আকবর সাহেবের বাসায় যাওয়ার তাড়া ছিল।
আকবর সাহেব সিদাতের হাতে তরীর হাত তুলে দিল। ব্যথিত স্বরে বলল,
–“আমি বুঝতে পারছি এই সময়টা খুব কঠিন। তবুও আমার মেয়েটাকে, আমার রত্নকে তোমার হাতে তুলে দিচ্ছি। এত বছর আমি আমার মেয়েটাকে যেভাবে রেখেছি, তোমার কাছে অনুরোধ রইল তুমি আমার মেয়েটাকে নিজের সাধ্য মতো গুছিয়ে রেখ। আমার মেয়েটা অল্পতেই খুশি, অঢেল ধন-সম্পদের প্রয়োজন নেই তার। শুধু তরীর বক্ষ-ছায়া হয়ে থেক।”
তরী অধর চেপে ঝাপসা চোখে আকবর সাহেবের দিকে তাকিয়ে আছে। কান্না থামানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে সে। সিদাত দু’হাতে তরীর হাত আগলে বলল,
–“আমি তরীর জন্যে বক্ষ-ছায়ার সঙ্গে একজন ভরসার মানুষও হব আঙ্কেল। আপনি শুধু দোয়ায় রাখবেন। আপনাকে কোনো অভিযোগ করার সুযোগ দিব না আমি। তরী আমার জীবনের অংশ।”
তরী মাথা নিচু করে ফেলল সিদাতের কথা শুনে। আকবর সাহেব ভরসা পেলেন। যেই ছেলে মায়ের জন্যে এতটা ভেঙে গুড়িয়ে গেছে সে নিশ্চয়ই পারবে তার মেয়েকে আগলে রাখতে। ছেলেটার মায়ের প্রতি ভালোবাসা অসীম। আকবর সাহেব তরীকে আগলে নিলেন। কিছুক্ষণ মেয়েকে সময় দিয়ে ওরা বিদায় নিল। যাওয়ার আগে সাবিয়া খুব কান্না-কাটি করেছিল। তার একমাত্র সঙ্গী, তার একমাত্র ভালোবাসার বোনকে ছাড়া তাকে একা থাকতে হবে। তরী বোনের এরকম কান্না দেখে নিজেকে সামলে উঠতে পারেনি। দুই বোন একে অপরের প্রাণ ছিল। সেখানে দুজন আলাদা হয়ে গেল!
দিয়া তরীকে সিদাতের রুমে দিয়ে এল। সাঈদ সাহেব তার ম্যানেজারকে দিয়ে তরীর যাবতীয় প্রয়োজনীয় সবকিছু তরীর বাড়ি থেকে আনিয়ে নিয়েছে। বিয়েটা আয়োজন ছাড়াই হয়েছে। এতে আকবর সাহেবের কোনো সমস্যা নেই। কারণ জাকজমকপূর্ণ বিয়ের চাইতে কম খরচের বিয়ে ভালো। আয়োজন ছাড়া বিয়ে নিয়ে তরী বা সিদাতের মধ্যেও ভ্রুক্ষেপ দেখা যায়নি। এছাড়া পরিস্থিতিও এরকম হয়েছে যে বিয়ের আয়োজনের কথা কারো মাথাতেই বিরাট প্রভাব ফেলেনি।
তরী ফ্রেশ হয়ে রুমে আসতেই দেখল সিদাত রুমের অন্য পাশে টি-শার্ট খুলছে। কী ভেবে পিছে ফিরে তাকাতেই সে অপ্রস্তুত হল৷ কোনো রকমে গায়ে শার্ট জড়িয়ে বোতাম লাগাতে লাগাতে বলল,
–“দুঃখিত। বুঝতে পারিনি এই সময়েই চলে আসবে। আমি মোটেও তোমাকে অস্বস্তিতে ফেলতে চাইনি!”
তরী অবাক চোখে দেখল সিদাতের এরকম ব্যস্ত হওয়া দেখে। এখন তারা স্বামী-স্ত্রী। ঘরের মধ্যে যেকোনো কিছুই ঘটতে পারে। তরী নিজেকে সামলে নিল। বুঝল সিদাতের এসব বলার কারণ। তবে মনে হলো তরীর চাইতে সিদাত দ্বিগুণ অবাক হল। তরীকে ভেজা চুলে এই প্রথম দেখল সে। রূপ যেন মেয়েটার চুইয়ে চুইয়ে পরছে। এই পবিত্র মুখটা, এই পবিত্র মেয়েটা তার স্ত্রী, ভাবলেই কেমন গা শিউরে উঠছে তার। পরমুহূর্তেই চোখ নামিয়ে ফেলল। মায়ের শূন্যতার পাশাপাশি হৃদয় জুড়ে অন্য রকম অনুভূতি বিচরণ করছে। সেই অনুভূতি অবশ্য ক্ষণস্থায়ী ছিল। সিদাত মাথা নিচু করে বলল,
–“আমি নিচে থেকে খাবার আনিয়ে নিচ্ছি। তোমার এখন রুম থেকে বেরুনোর দরকার নেই। এখানেই খেয়ে নাও। আমি নাহয় নিচে থেকে খেয়ে আসছি!”
সিদাতের কথা শুনে তরীর মন খারাপ হয়ে যায়। পরিবার থাকতে সে কেন একা খাবে? একা খাওয়ার অভ্যেস যে একদমই নেই তরীর। তবুও তরী মুখ ফুটে কিছু বলল না। কিন্তু সিদাত তরীর চেহারা জুড়ে থাকা বিষণ্ণতা কিছুটা আঁচ করতে পেরে ফ্যাকাসে মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল,
–“বেশি চিন্তা করিও না তরী। তুমি বেশি মানুষদের মাঝে অস্বস্থি অনুভব করো। তাই আমি নিচে বাবাদের সঙ্গ দিয়ে শুধুমাত্র কয়েক লোকমা খাব। বাকিটা রুমে এসে তোমার সাথে বসে খাব। চলবে?”
মুগ্ধতায় তরীর দেহ জুড়ে প্রতিটি রন্ধ্র কেমন সুভাসিত হয়ে গেল। তরী তার ভালো লাগার রেশ কাটাতে পারল না। সিদাত তরীর কাছে এসে তরীর গাল আলতো ছুঁয়ে বলল,
–“তবে অপেক্ষা করো। আমি বেশি সময় নিব না।”
সিদাত প্রায় আধঘন্টা সময় নিল। এখনো আসেনি। তরী খাবার সামনে নিয়ে বসে আছে সিদাতের অপেক্ষায়। তরী আগে দেখত তার বাবা বাড়ি না ফিরলে কামরুন নাহারও এভাবে খাবার নিয়ে বসে থাকত। অপেক্ষা করত আকবর সাহেবের। এই ছোটো ছোটো ভালোবাসা, অনুভূতি গুলো তরী খুব পছন্দ করে।
সাথে তরী মনে-প্রাণে মাবুদের নিকট ক্ষমা চাইছে সিদাতের সেই ভুলের জন্য। সিদাত ওই অখাদ্য জেনেই খাক কিংবা না জেনে, সিদাতকে যেন পরম করুণাময় মাবুদ তাকে ক্ষমা করে দেয়।
সিদাত আসল চল্লিশ মিনিটের মাথায়। এসে দেখল মাথার ওপরের সিলিং ফ্যানটা খুব অল্প গতিতে ঘুরছে। এসিটাও বন্ধ। বোধহয় তরী খাবার যাতে ঠান্ডা না হয় সেই চেষ্টাই করছে। সিদাত তরীর সামনে রাখা খাবারের প্লেটটি ঢেকে রাখা অবস্থায় দেখতে পেল। সিদাত ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে হাত ধুঁয়ে তরীর পাশে বসে। খাবারের প্লেট হাতে নিতে নিতে বলল,
–“বেশি দেরী করে ফেললাম বুঝি?”
তরী মাথা নিচু করে নেতিবাচক মাথা নাড়ায়। কেমন লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে যাচ্ছে সে। সিদাত মুচকি হেসে এসিটা অন করে দিল। বলল,
–“আর কষ্ট করে গরম সহ্য করতে হবে না!”
–“কিন্তু আমার গরম লাগছিল না!”
–“তাই? এসো। আজ আমি তোমাকে খাইয়ে দিব।”
তরী ভীষণ অবাক হল। লজ্জায় আবৃত হয়ে বারণ করল। কিন্তু সিদাত শুনেনি। তরীকে খাইয়ে দিল এবং নিজেও খেয়ে নিল।
সবকিছু স্বাভাবিক হলেও রাতের অন্ধকারে সিদাত নীরবে চোখের পানি ফেলল। মা হারানোর শোক এত জলদি ভুলা সম্ভব? সিদাতের পাশে অর্থাৎ কিছুটা দূরত্বে শোয়া তরী সিদাতের নীরব কান্না টের পেল। তরী ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল। সিদাতের কাঁধে কম্পিত হাত খানা ছুঁয়ে খুবই নরম, মৃদু গলায় বলল,
–“মায়ের কথা মনে পড়ছে?”
সিদাত ভাঙা গলায় “হুঁ” বলে তরীর হাতটা দু’হাতে জড়িয়ে নিল। যার ফলস্বরূপ তরী অর্ধেক বসা অবস্থাতেই রইল। এভাবে ঘন্টাখানেক কেটে যায়। তরীর পা ভয়াবহ রকম ঝিমঝিম করছে। সে না পেরে শুয়ে পড়ল। কিন্তু ঝিমঝিমের মাত্রাটা যেন খুব বেড়ে যায়। তরী সেই মাত্রাটা সহ্য করতে না পেরে কিছুটা সিদাতের দিকে হেলে পড়ল। মৃদু আওয়াজ বেরুল মুখ থেকে। সিদাত তরীর মুখে এরকম আওয়াজ শুনে কিছুটা বিচলিত হয়ে উঠে বসতে চায়, কিন্তু তরী এতে বাঁধা দিয়ে বলল,
–“উঠবেন না। শুয়ে থাকুন। আমি ঠিক আছি!”
–“কী হয়েছিল? কোনো সমস্যা?”
তরী কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,
–“এক ভাবে অনেকক্ষণ বসে থাকায় পা গুলো একটু ঝিমঝিম করছিল।”
–“এখন?” সিদাতের চিন্তিত সুর।”
–“স্বাভাবিক হচ্ছে!”
–“এতক্ষণ বলো নি কেন?”
তরী আঁধারেই সিদাতের চোখ জোড়া খুঁজে বেড়াল। অনুমান করে সিদাতের দিকে চেয়ে বলল,
–“আপনার স্বস্থিতে ব্যঘাত ঘটাতে ইচ্ছে করেনি!”
তরীর এ-কথা শুনে সিদাত বিস্মিত হয়। বেশ কিছুটা সময় নিয়ে বলল,
–“বিয়ের আগে তো আমাকে পছন্দ করতে না, কঠিন কথা ছাড়া কিছু বলতে না। হঠাৎ পরিবর্তন?”
–“বিয়ে সম্পর্কটা আমার কাছে খুব দামী। তাই বিয়ের আগের সময় গুলোতে আমি কঠিন ভাবে থাকার চেষ্টা করেছি, যেন আমার এই সরলতা আমার স্বামী সবটা জুড়ে পায়। হয়তো আপনার সাথে সবটা মানিয়ে নিতে আমার একটু সময় লাগবে। তবে আমি এখন থেকেই চেষ্টা করছি, আপনার সাথে মেশার। আপনাকে বোঝার। যাতে আন্ডারস্ট্যান্ডিং-টা সহজ হয়!”
সিদাত মুগ্ধ হল। এরকম স্ত্রী পাওয়া সত্যি-ই তার জন্যে ভাগ্যের ব্যাপার। খুব কম মানুষের ভাগ্যেই বোধহয় এরকম স্ত্রী জুটে। যারা নিঃসন্দেহে ভাগ্যবান। সিদাত বোধহয় সেই ভাগ্যবান পুরুষদের খাতায় নিজের নাম লিখিয়েছে। এরকম স্ত্রীর জন্যে সিদাত তার সাধ্যমতন সব কিছুই করতে রাজি। সিদাত অস্ফুট স্বরে বলল,
–“মা চলে যাওয়ার আগে আমাকে এক দারুণ উপহার দিয়ে গেছে। এই উপহারের সঠিক মর্যাদা আমি কী দিতে পারব?”
তরী কিছু বলল না, নীরবে হাসল। কিছুক্ষণ বাদে বলল,
–“তাহাজ্জুদের সময় হয়ে গিয়েছে। আসুন এক সাথে নামাজটা পড়ি। মাকে দোয়ায় রাখলে মনে শান্তি অনুভব করবেন!”
©লাবিবা ওয়াহিদ
~[ক্রমশ]
বিঃদ্রঃ ভুলত্রুটি ক্ষমাসুলভ দৃষ্টিতে দেখবেন। গগঠনমূলক মন্তব্যদের প্রত্যাশায় রইলাম।

