#আকাশ_জুড়ে_একা_আমি
#লামিয়া_ইসলাম
#পর্ব_৬
(শব্দসংখ্যা ১১৫০+)
“সার, এইহানে ধইরা আনছেন কেন? আমি গরিব মানুষ আমি কার কি ক্ষতি করছি?
অটো চালক হারুন মিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে আসা হয়েছে। আরশাদ তার সামনে বসে থমথমে গলায় বললো,
“দেখ যা জিজ্ঞেস করবো ঠিকঠাক উত্তর দিবি। একটা যদি মিথ্যে বলিস একদম চৌদ্দ শিকের পিছনে পাঠিয়ে দেবো। ২০ তারিখ রাতে পূর্বাচল ব্রিজের শেষ প্রান্তে কি করছিলি?”
“সার কোন ২০ তারিখ।”
“শবে মেরাজ এর পরের দিনের কথা বলছি।”
“ওহ ঐদিন ঐডা আমার লাস্ট খ্যাপ ছিলো। এক বেডা আর মহিলা উঠছিলো আমার অটোতে। ঐখানে আইয়া আমার হাতে ৫০০ টাহা দিয়া কইলো আদা ঘন্টা খাড়াইতে। হেরপর বেডা আর আর ঐ মহিলা জঙ্গলের মধ্যে চইলা গেলো।মিনিট বিশেক পর মহিলা একলা আইয়া অটোতে উডলো। পড়ে নীলা মার্কেটে নাইমা গেলো।আর পরের দিন স্ট্যান্ডে গিয়া শুনি ঐ বেডার লাশ নাকি ঐ জঙ্গলে পাওয়া গেছে।আমি একটু ডরাইছিলাম তাই আর কাউরে কিছু কই নাই।”
“মহিলা দেখতে কেমন ছিলো মনে আছে?”
“না সার, মহিলা কালা বোরকা পইরা ছিলো।তয় মহিলাডা মনে হয় খারাপ লাইনের। কথা শুইনা ওমনি লাগছে।”
“তুই মহিলার কণ্ঠ শুনেছিস? মহিলার বয়স কেমন হতে পারে?”
“সার ৩০-৩৫ হইবো হয়তো।”
“শোন, এখন তোকে ছেড়ে দিচ্ছি। কনস্টেবেলের কাছে তোর ফোন নাম্বার দিয়ে যা। ভুলেও ঢাকা ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করবি না।”
“সার অনেক ধন্যবাদ আপনারে।”
জিজ্ঞাসবাদের শেষ পর্যায়ে মাজহারুল হক কক্ষে প্রবেশ করলো। সাদাত হারুনকে নিয়ে বের হয়ে যেতেই সে বলতে শুরু করলো,
“আরশাদ, কেসের তদন্ত কতদূর?ওর কাছ থেকে কোনো ইনফরমেশন পেলে?”
“স্যার, খুনি হয়তো মহিলা। বয়স ৩০-৩৫ হবে। আর অটো চালকের ভাষ্যমতে মহিলাটা একজন প*তিতা।কিন্তু উনি নাকি মহিলাটার ফেইস দেখে নি।”
“তাহলে নেক্সটে কি করবে?”
“স্যার পূর্বাচলে আমাদের ইনফরমার দিয়ে ঐ বয়সের প*তিতাদের একটা লিস্ট তৈরি করবো তারপর জিজ্ঞাসাবাদ করবো। ”
“ব্যাপারটা কিন্তু খুব সেনসিটিভ হয়ে যাবে। ”
“ডোন্ট ওরি স্যার, ব্যাপারটা ডিপার্টমেন্ট এর বাহিরে যাবে না। কনফিডেন্সিয়াল রাখা হবে।”
মাজহারুল হক চলে যেতেই আরশাদের ফোনে কল এলো। স্ক্রিনে আদিবের নাম্বার ভেসে ওঠেছে।
“ভাইয়া বিকালে বসুন্ধরায় যাবো। তুমিও অফিস থেকে ডিরেক্ট এসো। আজকে থেকে বিয়ের শপিং শুরু হবে।”
“এসব মেয়েলি শপিং এ আমি গিয়ে কি করবো?
“ওহো ভাইয়া, মা তোমাকে আসতে বলেছে। আর ইরিনাদের বাসার ও সবাই আসছে।”
“সবাই বলতে?”
“মেঘলা আপু, আন্টি, মিহির,মাহিরা।”
মেঘলার নাম শুনতেই আরশাদ আর কথা না বাড়িয়ে বললো,
“৪ টায় পৌঁছে যাবো। তার আগে কল দিয়ে বিরক্ত করবি না।”
————-
শপিংয়ে যাওয়ার জন্য মেঘলা আর নাজমা বেগম ড্রয়িং রুমে রেডি হয়ে বসে আছে।মাহিরা আর ইরিনা এখনো রেডি হচ্ছে। মিহির ড্রয়িং রুমের দরজা দিয়ে একটা মেয়েকে নিয়ে ভিতরে ঢুকলো।
“আম্মু উনিই কালকে এসেছিলো উপরের চিলেকোঠার রুম টা ভাড়া নিতে।”
মেয়েটার নাম লিলি।বয়স ১৯-২০ হবে। দেখতে ও বেশ ভালোই।
“তুমি কি একাই থাকবে?”
“জি।”
“আসলে সিঙ্গেল মেয়েদের তোআমি রুম ভাড়া দেই না।”
“আসলে আন্টি আমি ছোটবেলা থেকেই এতিম। ১৮ বছর পর্যন্ত একটা আশ্রমেই ছিলাম। ১৮ বছর শেষ হওয়ার পর আর ঐখানে থাকা যায় না। আমি বর্তমানে একটা টেলিকম কোম্পানির কাস্টমার কেয়ারে জব করছি। আর পাশাপাশি একটা ইউনিভার্সিটিতে অনার্সে ভর্তি হয়েছি। আমি কোনো প্রকারের নিয়ম ভঙ্গ করবো না।আপনি যদি বাসাটা আমার কাছে ভাড়া দিতেন তাহলে আমার খুব উপকার হতো”
মেয়েটা এতিম শুনে নাজমা বেগমের একটু সহানুভূতি হলো।
“ঠিক আছে, তোমার কাছেই ভাড়া দেবো। কিন্তু মা কোনো ধরণের ঝামেলা করো না। আমি বিধবা মানুষ এতো ঝামেলা আবার সইতে পারবো না।”
“জি, আন্টি।”
নাজমা বেগম মিহিরের দিকে তাকিয়ে বললো ওর কাছে উপরের চিলেকোঠার চাবিটা দিয়ে দে। মায়ের কথায় সায় জানিয়ে মিহির মাথা ঝাকালো।
—————-
বসুন্ধরাতে সবাই প্রথমে শাড়ির দোকানে ঢুকলো। একে একে সবাই যে যার জন্য শাড়ি পছন্দ করে নিলো। বিল পে করার সময় মেঘলা নিজের কার্ড এগিয়ে দিলে আরশাদ মেঘলাকে থামিয়ে দিয়ে বললো,
-আপনি হয়তো সেদিন আম্মুর কথা খেয়াল করেননি। এই বিয়েতে সব খরচ আমরা বহন করবো।
মেঘলা মুচকি হেসে বললো,
-এটা কেমন কথা, অ্যাট লিস্ট আমাদের বিল টা না হয় আমি পে করি।
এবার মিতু ফরাজী অভিমানের স্বরে বললেন,
-আমাদের আর তোমাদের কি মেঘলা? তোমরা আমার কাছে মেয়ে মতোই। বিল টা আরশাদকেই পে করতে দাও।
মিতু ফরাজীর কথায় সম্মান জানিয়ে মেঘলা আর বাধা দিলো না। শপিং শেষে সবাই একটা রেস্টুরেন্টে বসলো। খাবার অর্ডার দিয়ে সবাই বিয়ে নিয়ে প্লানিং করছিলো। কিন্তু আরশাদের চোখ ঘুরে ফিরে বার বার মেঘলার দিকেই যাচ্ছে। আরশাদ নিজেকে মনে মনে গালি দিলো,
“বেহায়া চোখ আমার, যা আমার না সেটার দিকেই বার বার নজর যায়। আরশাদ কন্ট্রোল, মেঘলা অন্য কারো প্রেমিকা, কেনো অন্যের প্রেমিকার দিকে নজর দিচ্ছিস?”
কিন্তু হঠাৎ করে রেস্টুরেন্টের সাউন্ড সিস্টেমে ভেজে ওঠা সুর যেনো আরশাদকে ১০ বছর পিছনে তার কলেজ জীবনে নিয়ে গেলো।
১০ বছর আগে,
আরশাদ তখন ইউনিভার্সিটির তৃতীয় বর্ষে পড়ে। তখনকার আরশাদ আর এখনকার আরশাদের মধ্যে আকাশ পাতাল তফাত। তখন কার আরশাদ ছিলো তরুণ্যের উচ্ছাসে পরিপূর্ণ, যেনো কোনো উপন্যাসের মেইন ক্যারেক্টার। আরশাদ ও এক জুনিয়রের প্রেমে পড়েছিল। হ্যাঁ সেই মেয়েটি ছিলো মেঘলা। মেঘলা তখন অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ে। প্রেমে পড়ার কিছুদিন পরেই আরশাদ জানতে পারে নাবিল আর মেঘলার মধ্যে সম্পর্ক আছে। জীবনের প্রথম প্রেম, সেও কিনা অন্য কারো প্রেমিকা। আরশাদের হৃদয় ক্ষত বিক্ষত হয়ে যায়। তার লাভ লাইফের প্রভাব তার একডেমিক লাইফেও পড়েছিলো। ব্যাচের টপার ছেলেটা হুট্ করে একদম বাজে রেজাল্ট করে ফেলে। মেঘলা তার জন্য অবশেসন হয়ে গিয়েছিলো ।যতই চেষ্টা করতো সে মেঘলার থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারতো না। প্রতিদিন ক্লাস শুরু হওয়ার আগে চাতক পাখির মতো করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকতো, শুধুমাত্র এক নজর মেঘলাকে দেখার জন্য। অবশেষে আরশাদ ও বাস্তবতা মেনে নেয়। গ্রাজুয়েশন শেষ করে জবে জয়েন করে। কিন্তু তার হৃদয়ে মেঘলা নামটা এখনো জীবন্ত। একবার ইউনিভার্সিটির প্রোগ্রামে লুকিয়ে মেঘলার একটা ছবি তুলেছিল। ছবিটা এখনো তার প্রিয় উপন্যাসের বইয়ের ভাঁজে লুকিয়ে রেখেছে।সে মনে করেছিলো হয়তো তার প্রথম প্রেমের গল্প ঐখানেই শেষ হবে। কিন্তু ভাগ্য যে খুব আজব জিনিস। ১০ বছর পর ভাগ্য আবার তাকে মেঘলার সামনে দাড় করিয়েছে। কিন্তু মেঘলা এখনো বিয়ে করে নি কেনো? আরশাদ শুনেছিলো নাবিল আর মেঘলারা নাকি প্রতিবেশী। তাহলে সেদিন অনুষ্ঠানে তো সে নাবিলকে দেখলো না। দেখে নি ভালোই হয়েছে। ওদের একসাথে দেখলে তার হৃদয়ের পুরানো ক্ষতগুলো আবার নাড়াচাড়া দিয়ে উঠতো।
আদিবের ডাকে আরশাদ বর্তমানে ফিরে এলো,
“কি বলছিলি?”
“ভাইয়া কি হয়েছে তোমার? কই হারিয়ে গিয়েছিলে?”
“কই না তো?”
“এই একদম মিথ্যা বলবে না। কয়েকদিন যাবত খেয়াল করছি তুমি কেমন যেনো অন্যমনস্ক থাকো।”
মিহির আদিবের কথায় পিঞ্চ মেরে বললো,
“দুলাভাই আরশাদ ভাইয়া মনে হয় কারো প্রেমে পড়েছে তাই তো এতো অন্যমনস্ক।”
মিহিরের কথা শুনে মিতু ফরাজী হো হো করে হেসে বললেন,
“ও আর প্রেম। ও শুধুমাত্র প্রেমে পড়তে পারে কোনো আসামির। দেখো গিয়ে নতুন কোনো কেস পেয়েছে সেই কেসের ভাবনায়ই হয়তো ডুবে আছে। ”
—————-
“মা এতো হালকা রিং কেউ নেয়? তানিয়ার রিং টা পছন্দ হয়নি।”
লাজু খাতুন কিছু বলার আগেই নাফিজা উত্তর দিলো।
“হালকা নেবে না তো কি করবে? গোল্ডের ভরি এখন আড়াই লাখের উপরে।”
“তারপর ও ২ আনার রিং দেয়া উচিত হয়নি।তাও আবার ২১ ক্যারেট।একটু চাপ লাগলেই তো ভেঙে যাবে।”
“মা দেখো, তোমার ছেলে বিয়ে করতে পারে নি এর মধ্যেই বউয়ের জন্য সুপারিশ করা শুরু করে দিয়েছে।”
ওদের দুজনের তর্ক থামাতে লাজু খাতুন বললেন,
“থাম তোরা এবার। নাবিল দেখ তোকে আমি অনেক কষ্ট করে মানুষ করেছি, দুইটা টাকা বাঁচালে তোরই বাঁচবে। তাই কম ওজনের নিয়েছি। তানিয়াকে বল যে বিয়ের পর ভারী দেখে কিনে দিবি।”
“বিয়ের পর কিভাবে কিনবো? বিয়েতেই তো কত টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে।”
“আহা, সত্যি সত্যি কিনে দেয়া লাগবে নাকি? বিয়ের পর ও আমাদের বাড়ির বউ হয়ে এলে তখন ওকে আমরা কন্ট্রোল করতে পারবো। আপাতত পরিস্থিতি সামাল দিতে এটা বলে দে।”
“ঠিক আছে।”
চলবে………
কেমন লাগছে? জানাবেন কিন্তু কমেন্টে…..

