আকাশ_জুড়ে_একা_আমি #লামিয়া_ইসলাম #পর্ব_৯

0
40

#আকাশ_জুড়ে_একা_আমি
#লামিয়া_ইসলাম
#পর্ব_৯

(শব্দসংখ্যা ১৪০০+)
(কপি পোস্ট করা একদম নিষিদ্ধ)

ড্রয়িং রুমের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা হেনা খাতুনের চোখ দু’টো বারবার ঘুরে ঘুরে আরশাদ, আদিব আর আশপাশের পরিবেশটা পরখ করে নিচ্ছিল। ফরাজী ভিলার এই বিশাল বাড়ি, এই ঐশ্বর্য, এই নাম সবকিছুই যেন তার মাথার ভেতরে একটার পর একটা অঙ্ক কষে চলেছে।

হেনা খাতুন ধীরে ধীরে কেয়ার হাতটা টেনে তাকে নিজের ঘরে নিয়ে এলেন। আশপাশে কেউ শুনছে কি না, সেটা নিশ্চিত হওয়ার জন্য একবার চারদিকে তাকিয়ে নিলো। তারপর কণ্ঠটা ইচ্ছে করেই একটু নিচু করে বললো,

“শোন কেয়া, আমি তো তোর ভালো চাই। দুনিয়াতে আপন বলতে এখন আর কেউ নাই আমাদের। তোর বাপ নাই, আমার স্বামী নাই। এই বাড়িটাই এখন আমাদের একমাত্র ভরসা।”

কেয়া চুপ করে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। মায়ের চোখের চাহনিতে যে অদ্ভুত এক চাপ আছে, সেটা সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে।হেনা খাতুন আবার বলতে লাগলো,

“এই ফরাজী বাড়ির দিকে তাকাইসিস। কি কম আছে? জমি, বাড়ি, গাড়ি, নাম-সম্মান সবকিছু আছে। এই বাড়ির কোনো এক ছেলের বউ হইতে পারলে আমাদের ভবিষ্যৎ একদম পাকা হয়ে যাবে।”

কেয়ার বুকের ভেতরটা কেমন জানি মোচড় দিয়ে উঠলো।
“মা… এইভাবে বলছো কেন? বিয়ে তো জোর করে হয় না…”

হেনা খাতুন সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হয়ে গেলেন।
“জোর করে না হইলেও সুযোগ বানাইতে হয়। সুযোগ না বানাইয়া সুযোগের অপেক্ষায় বসে থাকলে সারাজীবন খালি হাতেই থাকে। তুই কি চাস, সারাজীবন আমার মতো আশ্রিতা হইয়া থাকবি?”

কেয়া মাথা নেড়ে না বললো।
“তাইলে শোন, এই বাড়ির আরশাদ হোক বা আদিব যে কোনো এক পোলারে নিজের দিকে টানতেই হবে। বুঝছিস? যেভাবেই হোক।”

কেয়া হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে বললো,
“মানে? যেভাবেই হোক বলতে কি বুঝাচ্ছো?”

হেনা খাতুন ঠোঁট চেপে একটু বাঁকা হাসি দিলেন।
“মানে এই যে, তুই সুন্দর, পড়াশোনা করছিস, তোকে দেখে এমনিতেই ছেলেদের চোখ আটকে থাকার কথা। তুই একটু স্মার্ট হইলে, একটু কাছে ঘেঁষলে, একটু মিষ্টি করে কথা বললে দেখবি ওরাই তোর পেছনে ঘুরবে।”

কেয়া অস্বস্তিতে বললো,
“মা, এটা তো ঠিক না…”

হেনা খাতুন এবার কণ্ঠে একটু রাগ মিশিয়ে বললেন,
“ঠিক-ভুলের কথা ভাবলে পেটে ভাত জুটবো না কেয়া। আমরা কারো সম্পত্তির মালিক না। এই বাড়িতে আমরা শুধু আশ্রয়ে আছি। কালকে যদি ওরা কয় চইলা যাইতে, আমরা কই যামু?”

কেয়ার চোখে পানি চলে এলো।
“তুই কি চাস আমি রাস্তায় বসে ভিক্ষা করি? না কি তোর জন্য মানুষের বাড়িতে কাজ খুঁজি?”

কেয়া দ্রুত বললো,
“না মা, আমি তা চাই না…”

“তাইলে আমার কথা শোন। দরকার হলে এমন কিছু পরিস্থিতি তৈরি করবি যাতে বিয়ে ছাড়া উপায় না থাকে।”

কেয়া আঁতকে উঠে বললো,
“কি রকম পরিস্থিতি?”

“ধর, কেউ যদি দেইখা ফেলে তোরা একসাথে ঘরে তাইলে একদম প্ল্যান সাকসেস। এই সমাজ এমনই, তখন আর কিছু ভাববো না। সম্মানের ভয়ে ওরা নিজেরাই বিয়েতে রাজি হইবো।”

কেয়ার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
“মা, এসব আমি পারবো না…”

হেনা খাতুন কেয়ার হাত শক্ত করে চেপে ধরলেন।
“পারতেই হবে। মনে রাখবি, তুই যদি এই বাড়ির বউ হইতে পারিস, তাহলে আমি তোর মা হিসেবে মাথা উঁচু কইরা বাঁচতে পারমু। না পারলে… আমরা দু’জনেই সারাজীবন পরের দয়ায় পইরা থাকমু।”

কেয়া চুপ করে রইলো। চোখ বেয়ে টুপটাপ করে পানি পড়ছে, কিন্তু মায়ের সামনে কোনো প্রতিবাদ করার শক্তি তার নেই।হেনা খাতুন শেষবারের মতো চাপ দিয়ে বললেন,
“ভালো করে ভাইবা দেখ। সুযোগ কিন্তু বারবার আসে না।”

এই কথার পর হেনা খাতুন উঠে দাঁড়ালেন, যেনো কিছুই হয়নি এমন ভান করে ড্রয়িং রুমের দিকে চলে গেলেন।আর কেয়া সেই জায়গাতেই নীরব হয়ে বসে রইলো।

তার সামনে তখন দু’টা রাস্তা। একটা নিজের বিবেকের। আরেকটা মায়ের বেঁধে দেওয়া স্বার্থের।
কোনটা সে বেছে নেবে এই প্রশ্নটাই যেন ধীরে ধীরে তার বুকের ভেতর বিষ হয়ে জমতে লাগলো।

—————-

রাতের অন্ধকার তখনো পুরোপুরি কাটেনি। পুরান ঢাকার এক গলির ভেতরে ঢুকে পড়া ছোট্ট একটা ভাঙাচোরা বিল্ডিং। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে পরিত্যক্ত। কিন্তু ভেতরে ঢুকলেই বোঝা যায় এখানে নিয়মিত লোকজনের যাতায়াত আছে।সাদাত দুইজন কনস্টেবলকে সাথে নিয়ে ভেতরে ঢুকলো।

ঘরের মাঝখানে কয়েকজন মহিলা বসে। কারো মুখে বিরক্তি, কারো চোখে ভয়, আবার কারো চোখে নির্লিপ্ত শূন্যতা।অটো চালকের বর্ণনার সাথে মিলে যায় এমন কয়েকজন পতিতাকেই এখানে নিয়ে আসা হয়েছে।

সাদাত চেয়ার টেনে বসে শান্ত গলায় বললো,

“ভয় পাওয়ার কিছু নাই। আমরা কাউকে অ্যারেস্ট আসিনি। কিছু তথ্য দরকার। সত্যি সবাইকে নিরাপদে তোমাদের জায়গায় ফিরিয়ে দিয়ে আসা হবে।”

একজন মহিলা ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো,
“সার, আমরা তো প্রতিদিনই পুলিশের সামনে দিয়ে যাই। আজ হঠাৎ এত কিসের খোঁজ?

সাদাত একটু সামনে ঝুঁকে বললো,
“২ সপ্তাহ আগে পূর্বাচল ব্রিজে কে গিয়েছিলে?”

ঘরের ভেতর মুহূর্তেই নিস্তব্ধতা নেমে এলো।কয়েকজন একে অপরের দিকে তাকালো। কেউ কথা বলছে না।সাদাত গলার স্বর শক্ত করলো,

“ঐখানে একটা খুন হয়েছে। যা জানো সব বলে দেও। কিছু লুকালে তোমরাই ঝামেলায় পড়বে।”

এক কোণে বসে থাকা মাঝবয়সী এক মহিলা ধীরে মুখ খুললো,
“স্যার, রাবেয়া গেছিলো।রাবেয়া আমাদের লাইনের মেয়ে, সার। কিন্তু ও নিয়মিত থাকে না।”

“কেমন মেয়ে সে?”

“চালাক। খুব কম কথা বলে। বেশিরভাগ সময় বোরকা পরে থাকে। কারো সাথে সহজে মিশে না।”

আরেকজন যোগ করলো,
“সার, ও ক্লায়েন্ট খুব বাছ বিচার কইরা নেয়। হুটহাট কারো লগে যায় না।

সাদাত প্রশ্ন করলো,
“সম্প্রতি ওর কোনো ঝামেলা হয়েছিল?

মাঝবয়সী মহিলা একটু ভেবে বললো,
“দুই সপ্তাহ আগে ও খুব রাইগা ছিলো। বলতেছিল, একটা লোক নাকি ওর কাছ থেকে টাকা নিয়া কথা রাখে নাই।

“তারপর কি হয়েছিলো?”

“ঠিক বলতে পারমু না, সার। তবে রাবেয়া বলতেছিল লোকটা নাকি ওর লগে প্রতারণা করছে।”

সাদাত নোট নিতে নিতে বললো,
“এখন রাবেয়া কোথায় আছে জানো?”

একজন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
“সার, ঐ ঘটনার পরের দিন থেকেই ও আর আসে নাই। ফোনও বন্ধ।”

সাদাত চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো।
“ঠিক আছে। আজকের ব্যাপারে কাউকে কিছু বলবে না।”

বাইরে বের হয়ে সাদাত সঙ্গে সঙ্গে আরশাদকে ফোন দিলো।
“স্যার, কিছু আপডেট দেয়ার ছিলো।

” বলো।”

” ঐ মহিলার নাম রাবেয়া। বয়স আনুমানিক ত্রিশের কাছাকাছি। সবসময় বোরকা পরে, কম কথা বলে। দুই সপ্তাহ আগে এক লোকের সাথে টাকা নিয়ে ঝামেলা হয়েছিল বলে অন্যরা জানিয়েছে। ঐ ঘটনার পরের দিন থেকেই নিখোঁজ।”

আরশাদ কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বললো,
“বুঝলাম। এখন তোমার কাজএই খুনের সাথে জড়িত এই রাবেয়াকে খুঁজে বের করো। যেখানে আছে, যেভাবেই হোক লোকেশন বের করো।”

“কপি স্যার।”

—————-

রাত প্রায় দু’টো ছুঁইছুঁই, অথচ মেঘলার চোখে ঘুমের লেশমাত্র নেই। এপাশ-ওপাশ করে শুয়েও শান্তি পাচ্ছে না। একটু আগেই সোশ্যাল মিডিয়ায় নাবিলের এনগেজমেন্টের কয়েকটা ছবি দেখেছে। বুকের ভেতর কেমন একটা অস্থিরতা লাগছে। ধীরে ধীরে বিছানা ছেড়ে উঠে সে। পা টিপে টিপে দরজা খুলে বেরিয়ে ছাদের সিঁড়ির দিকে যায়।

রাত নামলেই ফরাজী বাড়িটা যেন অন্য এক রূপ নেয়।দিনের আলোয় যে রাজকীয়তা চোখে পড়ে, রাতের অন্ধকারে সেটাই ধীরে ধীরে বদলে যায় রহস্যময় নীরবতায়। বিশাল ছাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা পুরোনো কারুকাজ করা দেয়ালগুলো চাঁদের আলোয় লম্বা লম্বা ছায়া ফেলছে। কোথাও যেন বাতাসে শুকনো পাতার মর্মর শব্দ, কোথাও আবার দূরের কোনো পাখির অচেনা ডাক।ছাদের এক কোণে রাখা পুরোনো লোহার বেঞ্চটা অন্ধকারে শটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাতাস একটু জোরে বইলেই বেঞ্চটার নিচে রাখা ভাঙা টবটা হালকা কেঁপে ওঠে, আর সেই শব্দে মনে হয় কেউ যেন পা ফেলছে।

সিঁড়ি বেয়ে উঠতেই ঠান্ডা বাতাস এসে মুখে লাগল।
ছাদে পা রাখতেই মেঘলার বুকটা একটু কেঁপে ওঠে।
চারপাশে নিস্তব্ধতা। শুধু বাতাসের শব্দ।সে চাদরটা শক্ত করে গায়ে জড়িয়ে নেয়।

“আল্লাহ… এমন সময় কেন আসলাম!”

হাঁটতে হাঁটতে ছাদের মাঝামাঝি পৌঁছাতেই হঠাৎ চোখে পড়ে এক ছায়ামূর্তি।মেঘলার শ্বাস আটকে যায়।অন্ধকারে বোঝা যাচ্ছে না মুখটা কার।
শুধু একটা মানুষের অবয়ব।

“চোর নাকি!”

কিন্তু মেঘলা ভয় না পেয়ে উল্টো ছায়ামূর্তির দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে।হুট্ করে বেশ গরম লাগছিলো আরশাদের। তাই ছাদে একটু ঠান্ডা বাতাস খেতে এসেছিলো। কিন্তু সে কিছু বোঝার আগেই মেঘলা নিজের চাদরটা টান দিয়ে তার মুখে পেঁচিয়ে ধরে।

“চোর! চোর!”

আরশাদ হাঁসফাঁস করতে করতে ছটফট করে।
“এই! এই! আমি—”

কিন্তু কথা বেরোনোর আগেই মেঘলা তাকে টেনে হিঁচড়ে সিঁড়ির দিকে নিতে থাকে।মেঘলার চেঁচামেচিতে পুরো বাড়ি যেন কেঁপে ওঠে। দরজা খুলে একে একে সবাই বেরিয়ে আসে।সবার প্রথমেই মিতু ফরাজী ছুটে আসে।
“কি হয়েছে! কি হয়েছে!চোর ধরেছো নাকি!”

পিকু আর মিকু দৌড়ে আসে পেছন থেকে।
“কই কই চোর!”

আদিব চাদরটা ধরে টান দিতেই আরশাদের মুখ থেকে চাদরটা সরে যায়।সবাই এক সেকেন্ড নিস্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। আরশাদের এমন করুণ অবস্থা দেখে সবাই একসাথে হো হো করে হেসে উঠে।

মিতু ফরাজী হেসে হেসে বলেন,
“আরে বাবা! এ তো আমার ছেলে!”

আদিব পেট চাপড়ে হাসতে হাসতে বলে,
“আপু, শেষমেশ পুলিশকেই চোর বানিয়ে দিলে।”

মিকু হো হো করে হেসে বলে,
“চোর ধরার ট্রেনিং কোথা থেকে নিয়েছিলে আপু?সব ঠিকি ছিলো। জাস্ট বাই মিস্টেক চোরের বদলে পুলিশ ধরে ফেলেছো।”

আরশাদ তখনো হাঁপাচ্ছে।মেঘলা ধীরে ধীরে বুঝতে পারে কী কাণ্ডটাই না করে ফেলেছে।লজ্জায় মুখ লাল হয়ে যায়।

“আমি তো… অন্ধকারে বুঝতে পারিনি।”

আরশাদ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলে,
“চোর ভেবে সরাসরি শ্বাস বন্ধ করে দেওয়ার প্ল্যান ছিল নাকি আপনার!”

মিতু ফরাজী মেঘলার মাথায় হাত রেখে বললো,
“তুমি ওকে দেখে ভয় পেয়েছিলে বুঝি? আসলে ও এমন সময়েই ছাদে যায়।”

মেঘলা আর কিছু বলতে পারলো না। লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললো।আরশাদ বিরক্ত মুখে দাঁড়িয়ে থাকলেও মেঘলার লাজুক চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে ওঠে।

চলবে………..

এর পরের পর্বে আদিব আর ইরিনার বিয়ের অনুষ্ঠান শুরু হবে। সবার দাওয়াত রইলো। সবাই অবশ্যই আসবেন। গিফট হিসেবে রিয়েক্টস, কমেন্টস নিয়ে আসবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here