আকাশ_জুড়ে_একা_আমি #লামিয়া_ইসলাম #পর্ব_১১

0
33

#আকাশ_জুড়ে_একা_আমি
#লামিয়া_ইসলাম
#পর্ব_১১

“মা, ওনারা আমাদের এত বছর ধরে আশ্রয় দিয়েছেন। মাথার উপর ছাদ দিয়েছেন। তাঁদের ছেলের চরিত্র নিয়ে আমি এভাবে খেলতে পারবো না। এমন নোংরা কাজ আমি করতে পারবো না।”

কেয়া কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে কথাগুলো বললো। কিন্তু হেনা খাতুনের চোখে তখন লোভের আগুন। তিনি ঠোঁট বেঁকিয়ে বললেন,

“আমরা গরিব মানুষ। আমাগো এত পাপ-পুণ্য খুঁজলে চলবো না। এই বাড়ি দিয়া তাড়াই দিলে কই যাবি?”

“দরকার হলে গার্মেন্টসে কাজ করবো। না খেয়ে থাকবো। তবুও এমন পাপ করবো না।”

কথাগুলো বলতে বলতে কেয়ার গলা ভারী হয়ে এলো।হেনা খাতুন মেয়ের মুখের ভাব বুঝলো।এই মেয়েকে কথা দিয়ে রাজি করানো যাবে না। বিছানার নিচে লুকিয়ে রাখা ছোট্ট শিশিটা বের করলো সে।শিশির ভেতর কালচে তরল বিষ।

“আজকে তুই ওই ঘরে যাবি। নইলে আমার মরা মুখ দেখবি।”

কেয়ার বিস্ফারিত চোখে তাঁর মায়ের দিকে তাকালো। মুহূর্তেই সে মায়ের হাত থেকে শিশিটা ছিটকে ফেলে দিলো। কাঁদতে কাঁদতে বললো,

“না মা! তুমি এমন কিছু করবে না। তুমি ছাড়া আমার কেউ নেই। আমি… আমি যাচ্ছি। এখনই যাচ্ছি।”

তার ভেতরটা যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে। তবু মায়ের জন্য সে আরশাদের ঘরের এগোতে বাধ্য হলো।

দোতলার একদম শেষের ঘরটা আরশাদের। সন্ধ্যার অনুষ্ঠান শেষে বাড়ির সবাই ক্লান্ত। আরশাদ ও তাই তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়েছে।আর সেই সুযোগটাই হেনা খাতুন কাজে লাগিয়েছে।কিছুক্ষণ আগে হেনা খাতুন গোপনে আরশাদের ঘরে শর্বরী পাতার ধোঁয়া দিয়ে এসেছে। দরজার অতিরিক্ত একটা চাবি তার কাছেই ছিল। শর্বরী পাতার যে তীব্র গন্ধ তাঁতে সে সম্পূর্ণ নিশ্চিত যে এখন আরশাদের কোনো হুঁশ নেই।

মেঘলার ঘরও বেশ কাছেই। বোটানি নিয়ে পড়াশোনা করার কারণে সে ও গন্ধটা চিনতে পারলো। মাঝরাতে এই ধোঁয়া কেন? দরজা খুলে করিডোরে এসে দাঁড়াতেই গন্ধটা আরও স্পষ্ট হলো। তাঁর বুঝতে বাকি রইলো না ধোঁয়া আরশাদের ঘর থেকেই আসছে।

মেঘলার মনে হঠাৎ ভয় ঢুকে গেলো। কোনো বিপদ হলো নাকি ?সে দৌড়ে গিয়ে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো। ঢোকার সাথে সাথেই তাঁর মাথার ভেতরে চক্কর দিয়ে উঠে চোখের সামনে সবকিছু ঝাঁপসা হয়ে এলো। মুহূর্তের মধ্যে সে ও অচেতন হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লো।

এদিকে কেয়া ধীরে ধীরে এসে দাঁড়ালো আরশাদের ঘরের সামনে। দরজার হাতলটা যেন তাঁর কাছে আগুন হয়ে আছে। ভেতরে যাবে? নাকি ফিরে যাবে?
ঠিক তখনই তাঁর ফোনে নোটিফিকেশনের শব্দ বেজে উঠলো । শব্দটা যেন তাকে ঘোর থেকে টেনে তুললো।নিজ মনেই সে ফিসফিস করলো,

“মা অকৃতজ্ঞ হতে পারে,কিন্তু আমি না। এই বাড়ির পুরুষরা কখনো আমাকে অসম্মান করেনি। তাদের বিশ্বাস ভাঙার অধিকার আমার নেই।”

সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালো না। নিঃশব্দে নিজের ঘরে ফিরে গেলো।কিন্তু তার এই ফিরে যাওয়া হেনা খাতুনের চোখ এড়িয়ে গেলো। তাই তিনি ভেবেই নিলেন তাঁর পরিকল্পনা মতো সব এগোচ্ছে। তাঁর ঠোঁটের কোণে কুটিল হাসি ফুটে উঠলো। মুখে শাড়ির আঁচল চেপে তিনি আবার আরশাদের ঘরের দিকে গেলেন । দরজা খুলেই প্রথমে জানালাগুলো খুলে দিলো যেন ধোয়া বাইরে বেরিয়ে যায়।তারপর মেঝেতে পড়ে থাকা অচেতন শরীরটা দেখে কিছুটা শয়তানি হাসি হাসলো। তিনি ভেবেই নিলেন এটাই কেয়া।কেয়া আর মেঘলার গড়ন প্রায় এক। ঘরটা বেশ অন্ধকার তাই সে তাঁদের পার্থক্য বুঝতে পারলো না।

সে অচেতন মেঘলাকে টেনে বিছানায় তুললো। মেঘলার শরীর একদম পুতুলের মতো নিস্তেজ হয়ে আছে।তাকে আরশাদের বুকে শুইয়ে দিলো ।ঘরটার একবার চারপাশে দেখে নিলেন। খুব গুছানো লাগছে। নাহ এভাবে তাঁর কাজ হবে না।সে বিছানার চাদর কিছুটা এলোমেলো করে দিলো।মেঘলার শাড়ির আঁচলটা ফেলে দিলো।আরশাদের শার্টের দু-একটা বোতাম ও খুলে দিলো।এখন ঘরের পরিবেশটা ঠিক যেমন তিনি চেয়েছিলেন। এখন যেকোনো কেউই খুব সহজেই আঁচ করতে পারবে জে এখানে কি ঘটেছিলো।

তারপর সে দরজা খুলে করিডোরে বেরিয়ে এলো । মুহূর্তেই মুখে আতঙ্কের ছাপ ফুটিয়ে তুলে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন।

“কে কোথায় আছো? তাড়াতাড়ি আসো! আরশাদ বাবার ঘরে যেন কী হয়েছে!”

তার চিৎকার রাতের নিস্তব্ধতা ছিঁড়ে দিলো।বাড়ির দেয়ালগুলো ও যেনো কেঁপে উঠলো । একে একে প্ৰত্যেকটা ঘরের দরজা খোলার শব্দ পাওয়া গেলো।
মিতু ফরাজী দৌড়ে এসে করিডোরের লাইট জ্বালালেন।

“কি হয়েছে আরশাদের?”

হেনা খাতুন কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন,

“আমি পানি খাইতে উঠছিলাম।আরশাদ বাবার রুমে কেমন যেনো শব্দ হইতাছিলো। তাই সবাইরে ডাকলাম।”

মিতু ফরাজীর কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বললো,

“বয়সের সাথে সাথে কি কান-মাথা সব গেছে নাকি তোমার ? আরশাদের আবার কি হবে? আরশাদ তো সেই কখন ঘুমিয়ে গিয়েছে।দাঁড়াও, আমি দেখছি।”

তিনি দ্রুত পা চালিয়ে আরশাদের ঘরের দিকে এগোলেন।হেনা খাতুনের চিৎকার শুনে বাড়ির বাকি সদস্যরা আর বিয়ে উপলক্ষে আসা আত্মীয় স্বজন সবাই ইতিমধ্যে করিডোরে এসে হাজির হয়েছে। তাই তাঁরা সবাই ও মিতু ফরাজীর পিছে পিছে আরশাদের ঘরের দিকে যেতে লাগলো।

মিতু ফরাজী দরজাটা ঠেলে রুমের লাইট জ্বালাতেই ভেতরের দৃশ্য দেখে তাঁর পা যেন মাটিতে গেঁথে গেলো।বিছানায় আরশাদ শুয়ে আছে , আর তার বুকের উপর এক নারীদেহ নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে। মেয়েটার শাড়ির আঁচল নিচে পড়ে আছে।

আদনান সাহেব সামনে এগিয়ে এসে স্থির চোখে তাকালেন। সে কিছুটা কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন,

,”এসব, কী হচ্ছে এখানে?”

হেনা খাতুন মুখে আঁচল চেপে কেঁদে উঠলেন, “আমি তো বললাম।শব্দ হইতাছিলো,কিন্তু আমি জানতাম না যে এইসব চলতাছে, কিন্তু মাইয়াডা কেডা?”

এই বলেই সে মেঘলাকে টেনে আরশাদের বুক থেকে সরালো। কিন্তু মেঘলার চেহারা দৃষ্টিগোচর হতেই সে যেনো নিজেই হতভম্ব হয়ে গেলো।

মেঘলাকে এই অবস্থায় দেখে আরশাদের এক দূর সম্পর্কের খালা ফিসফিস করে বললো,

“মেয়েটাকে দেখতে তো বেশ ভদ্রই মনে হতো। মনে হয় চরিত্র বেশি ভালো ছিলো না। তাই তো রাতের অন্ধকারে পরপুরুষের ঘরে ঢুকেছে।”

তাঁর কথায় সায় দিয়ে পাশে থেকে আরেকজন বললো,

“বিয়ে বাড়ি বলে কি ইচ্ছেমতো চলবে নাকি? এরা আজকালকার মেয়ে বাইরে একরকম, ভেতরে আরেকরকম।তাই তো নিজে থেকেই পর পুরুষের বিছানায় চলে গিয়েছে।”

সবার হাঁকডাকে আরশাদের ঘুম ও ভেঙে গেলো। নিজের পাশে মেঘলাকে এই অবস্থায় দেখে সে কিছুই বুঝতে পারলো না। এসব কি হচ্ছে তাঁর সাথে।সে চিৎকার করে বলে উঠলো,

“মেঘলা এখানে এভাবে কেনো?”

করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা নাজমা বেগম নিজের মেয়ের নাম শুনেই ভেতরে ঢুকে পড়লেন। মেয়েকে ওই অবস্থায় দেখে তাঁর মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেলো।

“আমার মেয়ে! এটা কী হলো?” তিনি ছুটে এসে মেঘলার মুখে হাত রাখলেন। “মেঘলা, চোখ খোল মা!”

ভিড়ের মধ্যে থেকে একজন মুখ ভেংচি কেটে বললো,
“এবার মা ও এসে অভিনয় শুরু করেছে মেয়ের সাথে। হয়তো মা ও এসবে জড়িত ছিলো।”

মাহিরার চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে।

“”আপু তো রাতে নিজের রুমেই ছিল। তাহলে সে এখানে কেনো আসবে?”

আত্মীয়দের মধ্যে একজন কটাক্ষ করে বললো,

“নিজে থেকে না এলে কেউ তো টেনে আনেনি! মেয়ে মানুষ রাতদুপুরে অন্য পুরুষের বিছানায়। নষ্টামী করতে এসেছিলো তোমার বোন। এখন ধরা পড়ে ঘুমের ভান করছে।”

মেঘলার ও ঘুম হালকা হয়ে গিয়েছে। সে নিজের এই অবস্থা দেখে সহ্য করতে পারলো না। সবার তাকে নিয়ে বলা কটু কথাগুলো তাঁর হৃদয়ে কাটার মতো বিধতে লাগলো।তাই তো বিকট আওয়াজে চিৎকার করে উঠলো।অবস্থা বুঝতে পেরে আরশাদ তড়িঘড়ি করে মেঘলার শরীর কম্বল দিয়ে ঢেকে দিতে চাইলো । কিন্তু মেঘলা উল্টো সবার সামনেই আরশাদকে ধাক্কা মেরে বললো।

“আপনি আমার এমন সর্বনাশ কেনো করলেন।কি ক্ষতি করেছিলাম আমি?”

কথাগুলো বলেই মেঘলা আবার নিজের মাথা নিচু করে বিছানায় বসে কাঁদতে লাগলো।

চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here