#আকাশ_জুড়ে_একা_আমি
#লামিয়া_ইসলাম
#পর্ব_১৪
(শব্দসংখ্যা ১৫০০+)
“মিহির চিলেকোঠার মেয়েটা কি একটু বেশি রাত করে বাড়িতে ফেরে নাকি?
“হ্যা, মা মেয়েটা নাকি জব করে। নাইট শিফট থাকলে তখন ফিরতে দেরি হয়। আমাকে বাসা ভাড়া নেয়ার আগেই বলেছিলো।”
“আহারে অতটুকু একটা মেয়ে। এই বয়সেই কত কষ্ট করছে। মেয়েটার নাম কি যেনো?”
নাজমা বেগম সহানুভূতির সাথে কথা গুলো বললো।
“লিলি।তবে মা মেয়েটা কেমন অদ্ভুত যেনো? মাহিরা আমাকে বলছিলো সেদিন। এই গরমেও নাকি রুমের কোনো জানালা খোলে না। বিল্ডিং এর সেরকম কারো সাথে কথাও বলে না।”
“আহা, খুব কম বয়সেই পৃথিবীর বাস্তবতা দেখে ফেলেছে।তাই হয়তো একা থাকতেই পছন্দ করে। এতে অদ্ভুতের কি আছে।”
মিহির তাঁর মায়ের কথায় বাধ সেধে কিছু বলতে যাবে তাঁর আগেই কলিং বেলের শব্দ ভেসে এলো। কলিং বেলের শব্দ পেয়ে নাজমা বেগম দরজা খুলতেই এক বয়স্কা মহিলাকে ছোট একটি বাচ্চা ছেলে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো।
“আপনি কে ? চিনলাম না তো?”
“আমি মেঘলার মা। মেঘলা বাসায় আছে?।”
মেঘলার মা শব্দ টা শুনতে পেয়েই নাজমা বেগম ভালো করেই বুঝতে পারলেন মহিলাটি তাঁর প্রয়াত স্বামীর প্রাক্তন স্ত্রী নীলা বেগম । এমন একটা সিচুয়েশনে সে কি করবে তা তিনি বুঝে উঠতে পারলেন না।
————-
মেঘলা বাজার থেকে ফিরে বাসার সামনে ছোট সাইজের জুতা দেখে অবাক হলো। এমন সময়ে আবার কে বাচ্চা নিয়ে এলো। দরজায় নক করলে মাহিরা দরজা খুলে দিলো। মেঘলা হাতের বাজার গুলো মাহিরার হাতে দিয়ে ড্রয়িংরুমে পৌঁছাতেই সে যেনো হঠাৎ করে একটা ঝটকা খেলো। এতো বছর পর উনি এখানে কেনো? এই মহিলাকে দেখলেই তাঁর পুরানো ক্ষতগুলো জেগে ওঠে। মেঘলা প্রচন্ড ক্ষিপ্ত হয়ে নাজমা বেগমকে বললো,
“মা এই মহিলাটা এখানে কি করছে? তুমি ওনাকে বাসায় কেনো ঢুকতে দিয়েছো? আর উনি বিল্ডিং এর গেটের ভেতরেই বা ঢুকলো কিভাবে? ”
মেঘলার গর্ভধারিনী মা নীলা বেগম এবার কণ্ঠস্বর নরম করে তাকে বললো,
“মা এভাবে কথা বলছিস কেনো? আমি তো তোর নিজের মা।”
“মা, এই কথাটার মানেও আপনি বোঝেন নাকি? ছোট একটা বাচ্চাকে একা রেখে যখন চলে গিয়েছিলেন তখন আপনার মমতা কই ছিলো? আপনার এভাবে চলে যাওয়ার জন্য আমি আমার পুরা লাইফে পদে পদে ছোট হয়েছি। যখনই কেউ আমাকে কোন কথা দিয়ে কাবু করতে পারত না তখনই হুট করে বলে বসত তোর মা তো পরকীয়া করে পালিয়ে গিয়েছে। আর এখন এসেছেন মমতা দেখাতে।”
মেঘলা নিজের গলার সর্বোচ্চ জোর দিয়ে কথাগুলো চিৎকার করে বলতে লাগলো। বাসার মেইন দরজা খোলাই ছিলো। তাই কথাগুলো খুব সহজেই বাসায় বাহিরেও শোনা যেতে লাগলো। ইরিনা আর আদিবের রিসিপশন পার্টির ইনভিটেশন দিতে আরশাদকে মিতু ফরাজী মেঘলাদের বাসায় পাঠিয়েছে। কিন্তু বাসার দরজায় আসতেই এরকম চিৎকার শুনে আরশাদ কিছুটা ভড়কে গেলো। প্রথমে পারিবারিক কোনো সমস্যা ভেবে সে ফিরে যেতে চাচ্ছিলো কিন্তু মেঘলাকে এভাবে চিৎকার করতে শুনে কিছুটা ইতস্তত করে সে ভিতরে গেলো।
” আমি কি এভাবে তোর বাবার কাছ থেকে চলে গিয়েছিলাম? তোর বাবা অক্ষম ছিলো তাই চলে গিয়েছিলাম। ”
” একদম মিথ্যা বলবেন না। আমার বাবা অক্ষম হলে আমার ছোট ভাই বোন গুলো কোথা থেকে আসলো? ”
এবার নীলা বেগম নাজমা বেগমের দিকে আঙ্গুল তাক করে ক্ষিপ্ত স্বরে বললেন,
” তা আমি কিভাবে জানবো।দেখ গিয়ে এই মহিলা হয়তো সম্পত্তির লোভে অন্য কারো রক্ত তোর বাবার ঘাড়ে গছিয়েছে। ”
নাজমা বেগমের লজ্জায় মাটির মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছা করলো। আরশাদ যে এখানে উপস্থিত হয়েছে সে ইতিমধ্যে তা খেয়াল করেছে। এভাবে সদ্য বিবাহিত মেয়ের জামাইয়ের সামনে নিজের চরিত্র নিয়ে এরকম বাজে কথা শুনতে তার একটুও ভালো লাগছে না। কিন্তু তার আর কিছু বলা লাগলো না তার আগেই মেঘলা আবার চিৎকার করে বলে উঠলো,
“আপনি কি নিজের মত সবাইকে মনে করেন?নিজের সাময়িক আনন্দ ফুর্তির জন্য আপনি আমাকে আর আমার ভাইকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। আর যে মহিলার চরিত্র নিয়ে আপনি আঙ্গুল তুলছেন সেই মহিলা আমাদের দুজনকে মায়ের মমতা দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে।”
“শোন তুই আমার মেয়ে, তাই তোর সাথে এসব নিয়ে ঝামেলা করতে চাচ্ছি না।আমি তোর বাবাকে এখনো ডিভোর্স দেইনি। আর তোর বাবা যেহেতু মারা গেছে তাহলে তার সম্পত্তির কিছু অংশ তো আমি পাব। আমাকে আমার সেই অংশ বুঝিয়ে দে আমি চলে যাব।”
” বাহ এত বছর অন্য লোকের সাথে থেকে একটা বাচ্চা জন্ম দিয়ে এখন এসে বলছেন যে আমার বাবার সম্পত্তিতে আপনার ভাগ লাগবে। আমার বাবা অনেক আগেই আপনাকে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দিয়েছিলো।”
কথাটি বলেই মেঘলা দৌড়ে নাজমা বেগমের রুমে গিয়ে ঢুকলো। আলমারি থেকে তার বাবার সাইন করা ডিভোর্স পেপার নিয়ে এলো। কাগজগুলো এনে নীলা বেগমের সামনে ছুঁড়ে ফেললো।
“ভালো করে দেখে নিন। আমার বাবার সিগনেচার। আমার নিজের সামনে আমার বাবা আপনাকে ডিভোর্স দিয়েছে। ভবিষ্যতে আর কখনো আমাদের জীবনে আসার চেষ্টা করবেন না। যদি এরকম আর কখনো এই বাড়িতে আসেন তাহলে আমিও এটা ভুলে যাব যে আপনি কখনো আমার মা ছিলেন।”
টেবিলে ছড়িয়ে রাখা ডিভোর্স পেপার দেখে নিলা বেগম মনে মনে কপাল চাপড়াতে লাগলো।সে যার সাথে পরকীয়া করে চলে গিয়েছিলো, সে কখনোই তাকে বিয়ে করেনি কারণ সেই পুরুষ আগে থেকেই বিবাহিত ছিলো।সে এত বছর তাকে রক্ষিতা হিসেবে রেখেছে। এমনকি তার ছেলেটার ও কোনো জন্ম নিবন্ধনই নেই কেননা সমাজের চোখে তার ছেলে তো জারজ। ওই লোক ও কিছুদিন আগে হঠাৎ করে মারা গিয়েছে আর তার ছেলেমেয়েরা নীলা বেগমকে তার ফ্ল্যাট থেকে বের করে দিয়েছে। তাই কিছু টাকা পাওয়ার আশায় সে এই বাড়িতে এসেছিলো।
হুট করে মেঘলার মাথা ঘুরাতে লাগলো, তার হাত পা ও খুব ধীরে ধীরে কাঁপতে লাগলো।মেঘলা বুঝতে পারলো তার প্যানিক অ্যাটাক হয়েছে তাই সে দৌড়ে তার রুমের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলো।কিন্তু সে রুমের দরজায় পৌঁছানোর আগেই মেঝেতে লুটিয়ে পড়লো। আরশাদ দৌড়ে এসে মেঘলার মাথাটা তার কোলের মধ্যে নিলো। মেঘলা কোনমতেই শ্বাস নিতে পারছিল না,মিহির দৌড়ে এসে বোনের পাশে বসে বোনকে শান্ত করতে লাগলো। এদিকে নাজমা বেগম এবার ক্ষিপ্ত স্বরে নীলা বেগমকে বললেন,
“আপনাকে বাসায় ঢুকতে দেওয়াই আমার ভুল হয়েছে।আপনার জন্য আমার মেয়ের আজকে এই অবস্থা। এখনই বেরিয়ে যানএই বাসা দিয়ে,তা না হলে আমি পুলিশ ডাকতে বাধ্য হবো।”
অবস্থা বেগতিক দেখে নীলা বেগম নিজের ছেলেকে নিয়ে দ্রুত বাসা থেকে বেরিয়ে পড়লেন। মেঘলার কি অবস্থা দেখার জন্য একবার পিছনে ফিরেও তাকালেন না।সে শুধুমাত্র এই বাড়িতে এসেছিলো টাকার লোভে। আসলে আমাদের সমাজে এমন কিছু মানুষ থাকে যারা পরকীয়ার জন্য নিজের স্বামী,সংসার, সন্তান সবকিছু বিসর্জন দিয়ে দেয়। তারপরও তাদের মধ্যে কোনো অনুশোচনাবোধ দেখা যায় না।
হুট করেই মেঘলা সম্পূর্ণ শরীর ছেড়ে দিলো।সে আস্তে করে অজ্ঞানের মত হয়ে পড়লো।আরশাদ ভয় পেয়ে মিহির কে বললো,
“তাড়াতাড়ি ওকে তোলো। ওকে এখনই হসপিটালে নিতে হবে।”
“ভাইয়া ভয় পাবেন না। আপু এখন শান্ত হয়ে গিয়েছে, তাই এভাবে ওর শরীর ছেড়ে দিয়েছে। ও এখন কিছুক্ষণ ঘুমাবে তারপরও আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে।”
“ঠিক আছে। আমি তাহলে ওকে নিয়ে ওর রুমে শুয়িয়ে দেই।”
—————-
হুট করে অফিস থেকে ফোন আসায় মেঘলাকে ঘুমন্ত অবস্থায় রেখেই আরশাদ অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেলো। অফিসে পৌঁছাতেই দেখলো পুরা অফিসে হুলস্থুল অবস্থা।
“সাদাত সবকিছু ঠিক আছে তো? সবাই এরকম ছোটাছুটি করছে কেনো?”
“স্যার সিরিয়াল কিলিং কেসে একটা ইম্পোর্টেন্ট ডকুমেন্ট পাওয়া গেছে।আমাদের লাস্ট যে ভিকটিম ছিলো ওনার মেয়ে আজকে অফিসে এসেছিলো,উনি আমাদের একটা ছবি দেয়। এই ছবিটা স্যার,আর এই ছবিটার মধ্যে মজার বিষয় কি স্যার জানেন এখন পর্যন্ত যে কয়জন খুন হয়েছে সবাই এই ছবির মধ্যে আছে। ”
“কি বলো? উনি তাহলে আগে আমাদের কেনো জানায়নি? ”
“স্যার উনি নিজেও জানতো না।উনি নাকি ওনার বাবার রুম পরিষ্কার করতে গিয়ে একটা অ্যালবামের মধ্যে ছবিগুলো পেয়েছে।”
“ইন্টারেস্টিং ছবিটার পেছনে ডেট ও লেখা আছে। প্রায় অনেক আগের ছবি এটা। এ ছবিতে যারা আছে তিনজন বাদে বাকি সবাই অলরেডি খুন হয়েছে।এরা সবাই একে অপরকে চিনতো।তাহলে বলা যায় যে সিরিয়াল কিলার আরো তিনটা খুন করবে। তারপরেই সে থামবে।”
“জি স্যার তাই মনে হচ্ছে।তার জন্য আমাদের পুরা টিম বাকি তিনজনকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে।”
“তবে আমার মনে হচ্ছে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য এদের খুন করা হচ্ছে। যেহেতু এরা সবাই একটি টিমের অংশ ছিলো।হয়তো এমন হতে পারে এরা অতীতে হয়তো কোনো পাপ করেছে আর তারই এখন শাস্তি পাচ্ছে।”
তাদের দুজনের কথার মাঝেই অনন্যা এগিয়ে এসে এসে বললো,
“একজনকে ট্রেস করা গিয়েছে। ওনার নাম মোতালেব সর্দার।উনি কেরানীগঞ্জে থাকে। পেশায় একজন ছোট খাটো মুদি দোকানদার। বাকি সবাইকে ও ট্রেস করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ”
“গুড জব, অনন্যা। একটা টিম কেরানীগঞ্জে পাঠিয়ে দাও ওনাকে ইমিডিয়েটলি নিয়ে আসো।”
“স্যার আমি অলরেডি টিম পাঠিয়েছি। আধা ঘন্টার মধ্যে ওনারা পৌঁছে যাবে। ”
—————
প্রায় দু’ঘণ্টার পর পুলিশের স্পেশাল টীম সর্বোচ্চ নিরাপত্তার সাথে মোতালেব সর্দারকে পুলিশ হেডকোয়ার্টারে নিয়ে এলো। তাকে নিয়ে আসতেই জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হলো। আরশাদ তার সামনে ছবিটা রেখে বললো,
” এই ছবির সবাইকে চেনেন? আপনাদের সবার মধ্যে তখন কি সম্পর্ক ছিলো? ”
ছবিটা দেখে মোতালেব সরদার কিছুটা চমকে গেলো।তারপরও নিজেকে সামলে নিয়ে বললো,
“আসলে তখন আমরা চট্টগ্রামে একটা ডকে সবাই একসাথে চাকরি করতাম। তখনের তোলা ছবি এটা।”
“এই যে মার্ক করা দুইজন।এরা দুইজন এখন কোথায় আছে, আপনি কিছু জানেন? ”
“স্যার এদের সাথে অনেক বছর যাবতই আমার কোন যোগাযোগ নেই। তাই কে কোথায় আছে তা জানিনা। ”
“ওকে আপনার সতর্কতার জন্য আপনাকে একটা খবর জানাতে চাই।এ ছবিতে থাকা আপনি আর বাকি দুইজন বাদে সবাই এখন মৃত। আর তাদের সাধারণ কোনো মৃত্যু হয়নি তাদের প্রত্যেককেই খুব নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। আপনি যখন চাকরি করতেন তখন কি এমন কিছু হয়েছিলো যার সাথে বর্তমানের ঘটনার কোনো সংযোগ আছে? ”
এবার মোতালেব সরদার কিছুটা ঘাবড়ে গেলো।তোতলাতে তোতলাতে বললো,
“না না স্যার এমন কিছুই হয়নি। আমরা তো শুধু একসাথে চাকরি করতাম।”
“কিছু হয়ে থাকলে বলতে পারেন কারণ খুনির হয়তো নেক্সট টার্গেট আপনি। যদি আগে থেকে আমাদের সত্যিটা বলে দেন তাহলে খুনিকে ধরতে আমাদের সুবিধা হবে।”
মোতালেব সরদার এবার কোন কথা বলল না। একদম চুপ করে বসে থাকলো।আরশাদ বুঝতে পারলো তার থেকে কোন কথা বের করা যাবে না।তাই সে অনন্যাকে ইশারা করে তাকে রুম থেকে বের করে নিয়ে যেতে বললো। অনন্যা মোতালেব সর্দারকে নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে যেতেই আরশাদ সাদাত কে বললো,
“এর মধ্যে কোন ঘাপলা আছে। কিছু তো একটা ঘটেছে। এক কাজ করো উনি যে ডকে কাজ করতো সেখানে গিয়ে ওনাদের ব্যাপারে ইনফরমেশন কালেক্ট করো।আর আমাদের দুইজন পুলিশ অফিসার কে সিভিল ড্রেসে উনার সাথে পাঠাও। ২৪ ঘন্টা ওনার উপর নজর রাখতে বলো।”
“জি স্যার।”
চলবে……..
রোজা রেখে প্রেসার একদম ডাউন হয়ে যায়। তাই ঠিকমতো পর্ব দিতে পারছি না। লেখায় কোনো ভুল ত্রুটি হলে ক্ষমা করবেন ❤️।

