#আকাশ_জুড়ে_একা_আমি
#লামিয়া_ইসলাম
#পর্ব_২১
(শব্দসংখ্যা ১০৫০+)
“যদি আপনার কোনো দোষই না থাকে তাহলে এই মেয়েটার কথা আপনি আমাকে আগে কেনো জানাননি?”
“আমি ভেবেছিলাম হয়তো ওর কথা তোমাকে জানালে তুমি কষ্ট পাবে। তাই আমি তোমাকে জানাইনি।”
রিসিপশন এর পার্টির মাঝেই আদিব তার এক্স গার্লফ্রেন্ডের ব্যাপারে সবটা ইরিনাকে খুলে বলেছে। এমনকি সেদিন এর সিসিটিভি ফুটেজ ও তাকে দেখিয়েছে।ইরিনা কিছু বলছে না দেখে আদিব আবার বললো,
“এখন থেকে তোমার কাছ থেকে আমি কিছু লুকাবো না। আর এই মেয়েকে আমার কেবিনের আশেপাশে ও এলাউ করবো না।”
“সত্যি বলছেন তো?”
“হ্যা, তিন সত্যি।”
সব ভুল বোঝাবুঝি শেষ হতেই ইরিনা আদিবকে জড়িয়ে ধরলো। আদিব ও তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো,
“অনেক ভালোবাসি তোমাকে। প্লিজ এরকম আর ছেড়ে যেও না আমাকে।”
“আমার ভয় হয় আদিব। আপনি আমার জীবনের দ্বিতীয় বসন্তের মতো। আপনাকে হারিয়ে ফেললে আমি বাঁচতে পারবো না।”
আদিব তার পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বললো,
“কখনো এমন হবে না। আমার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমার হৃদয়ে শুধু তুমিই থাকবে।”
—————-
আরশাদ আর মেঘলা হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি থেকে বেশ দূরেই এসে পড়েছে। তাঁদের কারোরই অনুষ্ঠানের কোলাহল ভালো লাগছিলো না। তাই ইচ্ছে করেই আর বাড়িতে ফেরেনি। হঠাৎ সামনে একটা কফিশপ দেখে মেঘলা উচ্ছাসের সাথে বললো,
“বাহ্, সামনে একটা কফি শপ আছে। চলুন একটু বসে কফি খাওয়া যাক।”
মেঘলা তার সাথে বসে কফি খেতে চাইছে বিষয়টা যেনো আরশাদের কাছে মেঘ না চাইতে বৃষ্টির মতো। তাই সে ও সাথে সাথে রাজি হয়ে গেলো। ওয়েটার অর্ডার নিতে আসলে আরশাদ কফির সাথে সাথে মেঘলার জন্য ফ্রায়েড চিকেন আর নিজের জন্য স্যান্ডউইচ অর্ডার দিলো। ওয়েটার চলে যেতেই মেঘলা আরশাদকে বললো,
“শুধু কফি অর্ডার দিলেই হতো।”
“ধ্যাত কি যে বলো না। বউয়ের সাথে প্রথমবার কফি খেতে এসেছি, বউকে তো কিছু ট্রিট ও দিতে হয়। আর ফ্রায়েড চিকেন তো তোমার পছন্দের।”
আরশাদের কথা শুনে মেঘলা এবার সন্দীগ্ন চোখে বললো,
“আমার যে ফ্রায়েড চিকেন পছন্দ সেটা আপনি কিভাবে জানেন?”
আরশাদ এবার থতমত খেয়ে গেলো। সে আমতা আমতা করে বললো,
“আসলে তোমার ভাই মিহির চট্টগ্রামে বসে বলেছিলো।”
এর মধ্যে খাবার চলে আসতেই মেঘলা খাবার খাওয়া শুরু করলো। আরশাদ ও হাফ ছেড়ে বসলো। আরেকটু হলে আজকে মেঘলার কাছে সে ধরা পড়ে যেত।
————————
রাত ১১ টার দিকে মোতালেব সর্দারের লাশটা সিনথিয়া জামান যাত্রাবাড়ী ব্রিজের নিচে ফেলে এলো। বাসায় ঢুকেই সে সেই অজানা ব্যাক্তিকে ফোন করে বললো,
“কাজ হয়ে গেছে। ”
“ভালো করেছো। তুমিও শিওর তো যে বাকি দুইজন মৃত?”
“১০০% শিওর। ”
“আফসোস বাকি দুইটা আগেই মরে গেলো। আর এই মোতালেব সর্দারকে ও মরার আগে বেশি কষ্ট দিতে পারলাম না। যাই হোক ফাইনালি আমাদের এই প্রতিশোধ শেষ হলো। ”
“হ্যা। এই দিনটার জন্য আমি অনেক বছর ধরে অপেক্ষা করেছি। আমার মনে হয় আমাদের দুইজনের এখন যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়া উচিত।”
“হ্যা। এক কাজ করো এই সিমটা ভেঙে ফেলো। আর কখনো জীবনে চলার পথে আমাদের দেখা হলেও আমাকে অপরিচিত হিসেবেই দেখবে। আশা করি তোমার সামনের জীবন যেনো সুন্দর হয়।”
কথাটি বলার সাথে সাথেই ওপাশ থেকে ফোনের লাইন কেটে গেলো। সিনথিয়া জামান ও নিজের ফোন থেকে সিমটা খুলে ভেঙে ফেললো। তারপর বাথরুমের কমোডে ফ্ল্যাশ করে দিলো।
——————-
আরশাদের বিল পে করা শেষ হতেই তার ফোনে সাদাতের কল এলো। ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে সাদাতের হতাশায় ভরা কণ্ঠের আওয়াজ ভেসে এলো।
“স্যার যাত্রাবাড়ী ব্রিজের নিচে মোতালেব সর্দারের লাশ পাওয়া গেছে।”
“শিট। জায়গাটাকে সিল করে দেও। একটা এভিডেন্স ও যেনো নষ্ট না হয়। আমি ১ ঘন্টার মধ্যে আসছি।”
কথা বলা শেষ করে আরশাদ মেঘলাকে বললো,
“একটা ডেড বডি পাওয়া গেছে। আমাকে ক্রাইম স্পটে যেতে হবে। চলো তোমাকে তোমাকে বাসায় ড্রপ করে দেই।”
“না না তার প্রয়োজন নেই। আমি একা চলে যাবো। আমার অভ্যেস আছে। ”
“হ্যা আমি জানি তোমার অভ্যেস আছে। তবে তখন তুমি আরশাদ ফরাজীর বউ ছিলে না। এখন তোমাকে সেইফ রাখা আমার দায়িত্ব। উবার বুক করে দিয়েছি। ১০ মিনিটের মধ্যে এসে পড়বে।”
আরশাদের কথা শুনে মেঘলা আবার থমকে গেলো। একটা পুরুষ কিভাবে এতটা পারফেক্ট হতে পারে। বিয়ের পর থেকে সে কতবার যে আরশাদের সাথে খারাপ বিহেভ করেছে। কিন্তু কখনো এই পুরুষটা এক মুহূর্তের জন্য ও তার প্রতি বিরক্ত হয়নি। বিয়ের দিন ও সে না জেনেই আরশাদকে কত বাজে বাজে কথা বলেছে। আরশাদের জায়গায় অন্য কোনো পুরুষ হলে তাকে এতদিনে ডিভোর্স দিয়ে দিতো। কেনো যেনো মেঘলার আজকাল নিজেকে আরেকবার সুযোগ দিতে ইচ্ছে করে। কিন্তু ভয় ও হয় আরশাদ ও যদি ফিউচারে নাবিলের মতো তাকে ঠকায়।
——————
মিকু আর পিকু হেনা বেগমকে ভালো ভাবেই শায়েস্তা করার প্ল্যান করেছে। হেনা বেগম আজ বেশ দামি একটা শাড়ি পড়েছে। আর সেই নিয়েই সবার সামনে শো অফ করছে। যদিও শাড়িটা মিতু ফরাজীই হেনা বেগমকে গিফট করেছে। পিকু আর মিকু প্ল্যান করলো তারা হেনা বেগম যেখানে বসে আছে সেখানে গিয়ে লুকিয়ে তার জুতার নিচে স্ট্রং আঠা লাগিয়ে দিবে, যখনি হেনা বেগম উঠে হাঁটতে যাবে সে উস্টা খেয়ে পড়বে। আর সবার সামনে একদম জব্দ হবে।
কিন্তু তারা দুইজন বাড়ির কোথাও স্ট্রং আঠা খুঁজে পাচ্ছিলো না। হঠাৎ তাদের মনে হলো তারা আরশাদের রুমে হয়তো আইকা গ্লু দেখেছে। সেই গ্লু খুঁজতেই তারা আরশাদের রুমের দিকে ছুটলো।
বেশ কিছুক্ষন খোঁজাখুঁজির পর ও যখন তারা আঠাটা পেলো না তখন তারা হতাশ হয়ে আরশাদের বিছানার উপর বসে পড়লো। মিকু বিছানার নিচে উঁচু কিছু ফিল করতেই লাফিয়ে উঠে বিছানা জাগালো। তবে সে জায়গায় সে শুধু কালো মলাটের একটা ডায়েরি দেখতে পেলো। পিকু ডায়েরিটা মিকুর হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে খুলে ফেললো।ডায়েরির প্রথম পৃষ্ঠা উল্টাতেই একটা মেয়ের ছবি দেখতে পেলো তারা।
“কিরে ভাই আরশাদ ভাইয়ার রুমে এই ডায়েরি আবার এর ভিতরে মেয়ের ছবি কাহিনীটা কি?”
মিকু মাথা চুলকাতে চুলকাতে বললো,
“কিন্তু ভাই এই মেয়েটাকে খুব চেনা চেনা লাগছে না?”
“হ্যা, আমার ও মনে হয় কোথাও দেখেছি।”
এর পর তারা দুইজনেই একসাথে চিৎকার করে বলে উঠলো,
“মেঘলা ভাবী।”
তারপর তারা তড়িঘড়ি করে ডায়েরির বাকি পেইজগুলো ও উল্টাতে লাগলো। বেচারা দুইজনই পুরো তব্দা খেয়ে গেলো।
“ভাই সবার সব গোপন কথা কেনো ঘুরে ফিরে আমাদের সামনেই আসে।”
“ধ্যাত, কিন্তু ভাই এটাও কিভাবে সম্ভব? এজন্যই বলে সবুরে মেওয়া ফলে। আরশাদ ভাইয়ের ভাগ্যটা কি ভালো। ওনার লাভ স্টোরি দিয়ে মুভি বানানো যাবে।”
“মুভি পড়ে বানাস। আগে এইগুলো সব গুছিয়ে ফেল। আরশাদ ভাইয়ের কাছে একবার ধরা পড়লে আমাদের দুইটাকেই উল্টা ঝুলিয়ে পেটাবে। রিভলবার দিয়ে শুট ও করে দিতে পারে।”
—————
“স্যার ফরেন্সিক টিম বলছে এটা সুইসাইড ।”
“কিন্তু ওনার গায়ে তো টর্চার এর দাগ রয়েছে?”
“স্যার ওনাকে প্রথমে টর্চার করা হয়েছে। তারপর হয়তো সে সহ্য না করতে পেরে সুইসাইড করে ফেলেছে।”
সাদাত একদম সোজাসুজি কথাগুলো বললো। তার কথায় সায় দিয়ে আরশাদ বললো,
“হ্যা, হয়তো তেমন কিছুই হয়েছে। কিন্তু এই কেসের খুনিকে ধরার চান্স অনেকটা কমে গেলো। কারণ আমার ধারণামতে এটাই লাস্ট মার্ডার। কারণ এই ছবিতে থাকা বাকি দুইজন মৃত। আমাদের ইনভেস্টিগেশন টিমের খবর কি? ওরা কি চট্টগ্রাম থেকে কোনো ক্লু যোগাড় করতে পারলো?”
“স্যার, কালকে ওরা রিপোর্ট পাঠাবে।”
“ওকে, রিপোর্ট আসলে আমাকে ইমিডিয়েটলি জানাবে।”
“জি স্যার অবশ্যই। আর পোস্টমর্টেম রিপোর্ট ও কালকের মধ্যে তৈরি হয়ে যাবে।”
“রাবেয়ার অবস্থা কি?”
“কোনো খবর নেই স্যার, এখনো কোমাতে আছে।”
“ওকে।”
চলবে…..

