#আকাশ_জুড়ে_একা_আমি
#লামিয়া_ইসলাম
#পর্ব_২৭
(শব্দসংখ্যা ১০০০+)
মোতালেব সর্দারের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট নিয়ে সিনথিয়া জামান আজকে ডিএমপির হেডকোয়ার্টারে এসেছে। আরশাদের হাতে রিপোর্টগুলো তুলে দিয়ে বলল,
” আপনার ধারণাই ঠিক ছিল এটা সুইসাইড। কিন্তু মৃত্যুর আগে ভিক্টিমকে অনেক টর্চার করা হয়েছে।”
” এই কেসটা আমার ক্যারিয়ার সবচেয়ে বড় জটিল কেস। সমাধানই করতে পারছি না। ”
সিনথিয়া জামান সতর্কতার সাথে আরশাদকে জিজ্ঞেস করল,
” এখনো কি কোনো ক্লু পাননি? ”
” রিসেন্টলি চট্টগ্রামে আমরা কিছু লিড পেয়েছি। আমি কাল-পরশুর মধ্যে চট্টগ্রামে যাব। আশা করি ওখানের পাওয়া ক্লু থেকে কেসটা সমাধান হয়েই যাবে। ”
আরশাদের মুখে চট্টগ্রামের নাম শুনে সিনথিয়া জামানের মুখের হাবভাব বদলে গেল। তাই সে আর কিছু না বলেই সেখান থেকে চলে গেল।
—————
পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে বের হয়ে সিনথিয়া জামান রিফাত নামক একটা লোককে ফোন করে বললো,
” আরশাদ ফরাজী বেশ ভালোই এগিয়েছে। একে আর এগোতে দিলে আমার জন্যই বিপদ। এক কাজ করো একে শেষ করে দাও। ”
“কাজটা কোথায় করবো ম্যাডাম?”
অপর পাশে থাকা লোকটির কথা শুনে সিনথিয়া জামান কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
” পুলিশ হেডকোয়ার্টারে অনেক সিসি ক্যামেরা প্লাস গার্ড রয়েছে। শুধু শুধু রিস্ক নেওয়ার দরকার নেই। এক কাজ করো, একটা গাড়ি নিয়ে আরশাদ ফরাজীকে ফলো করতে থাকো। সুযোগ পেলেই শেষ করে দেবে। আর শোনো তোমার অ্যামাউন্ট তোমার একাউন্টে পৌঁছে যাবে। ”
” ওকে, ম্যাম। কাজ শেষ করে আপনাকে জানাচ্ছি। ”
—————
রেস্টুরেন্টে ঢুকতেই মেঘলার নাবিলের সাথে দেখা হল। নাবিলকে ইগনোর করে মেঘলা ভিতরের দিকে যেতে নিলে নাবিল তার পথ আটকে বলল,
” তোমার সাথে আমার কথা আছে মেঘলা। ”
” তোমার সাথে আমার কোন কথা নেই। আমি আর তুমি দুইজনেই এখন বিবাহিত। তাই আমাদের দেখা না করাই ভালো। ”
” মেঘলা ব্যাপারটা তোমার স্বামী আরশাদকে নিয়ে। ”
মেঘলা এবার রেস্টুরেন্টে একটা চেয়ারে বসে নাবিল কে বলল,
” কি বলবে তাড়াতাড়ি বলো।ফালতু কথা শোনার সময় আমার নেই।
” তোমার হাসব্যান্ড তোমাকে ঠকিয়ে বিয়ে করেছে। ”
” তা কিভাবে ঠকালো আমাকে? ”
” উনি তোমাকে দশ বছর যাবত ভালোবাসত। উনি আমাদের সাথে সেইম ইউনিভার্সিটিতে পড়তো। যখনই দেখেছে তোমার সাথে আমার ব্রেকআপ হয়েছে ঠিক সেই সুযোগে উনি তোমাকে বিয়ে করে নিয়েছে। ”
নাবিল এর কথা শুনে মেঘলা বেশ অবাক হলো। আগে থেকে আরশাদের আচরণে তার কিছুটা হলেও সন্দেহ লাগতো, এ জন্যই কি আরশাদ তার প্রতি এত দুর্বল? তারপরও সে নাবিলকে কিছু বুঝতে না দিয়ে খুব শান্ত ভাবে বলল,
” তো তুমি কি মনে করেছ এসব কথা বললে আমি আমার স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে দেবো?”
নাবিল অনুনয়ের স্বরে মেঘলা কে বলল,
” প্লিজ মেঘলা তুমি আমার কথাটা বিশ্বাস কর। আমি সত্যি বলছি ”
” আমি তোমার কথা বিশ্বাস করেছি তো। থ্যাংকস,আমার মধ্যে অনেক কনফিউশন ছিল যেটা আজকে তুমি দূর করে দিলে। ”
” মানে? ”
” এই যে দেখো আমার হাসবেন্ড আমাকে এত বেশি ভালবাসে যে আমি আগে ভেবেই পেতাম না যে উনি কেন আমাকে এত বেশি ভালোবাসে। তো এখন আমি বুঝতে পারলাম যে, আমি ওনার জীবনে প্রথম ভালোবাসা। ইউ নো আমার নিজের কাছে এখন আমার নিজেকে অনেক অনেক বেশি স্পেশাল মনে হচ্ছে। ”
নাবিল মনে করেছিল হয়তো আরশাদের এই ব্যাপারটা শুনলে মেঘলা রেগে যাবে। কিন্তু ব্যাপার এখন উল্টো হলো। মেঘলা তো এখন উল্টো আরশাদের ভালোবাসার প্রশংসা শুরু করে দিয়েছে। নাবিল প্রায় রেগেই রেস্টুরেন্ট থেকে চলে গেল।
নাবিল চলে যেতেই মেঘলা আরশাদের নাম্বারে ডায়াল করলো। কল রিসিভ হতেই মৃদু স্বর বললো,
” কই আছেন আপনি?একটু আমার সাথে দেখা করতে পারবেন? ”
“আচ্ছা।তুমি কি রেস্টুরেন্টে? ”
“জি, তাড়াতাড়ি আসুন।”
——————
পাক্কা ৪৫ মিনিট পর আরশাদ রেস্টুরেন্টে এসে পৌঁছালো। মেঘলা রেস্টুরেন্টের সামনেই দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেছিলো। আরশাদ তড়িঘড়ি করে গাড়ি থেকে নেমে মেঘলাকে বলল,
“এতো জরুরি তলব করছিলে কেনো?সব ঠিক আছে তো? ”
মেঘলা কিছু বলার আগেই হুট করে দুইটা গুলি আরশাদের বুক ছুঁয়ে গেল। আরশাদ সাথে সাথে কিছু বুঝতে পারলো না, কিন্তু নিজের বুকের দিকে তাকিয়ে রক্ত দেখে থুবড়ে মাটিতে পড়ে যেতে নিলো।কিন্তু তার আগেই মেঘলা তার মাথাটা নিজের কোলে নিয়ে নিয়েছে। গুলির শব্দ পেয়ে আরশাদের ড্রাইভার ও গাড়ি থেকে নেমে এলো। সে এসেই মেঘলা কে বলল,
” ম্যাডাম স্যারের গুলি লেগেছে। ইমিডিয়েটলি স্যারকে হসপিটালে নিতে হবে। ”
মেঘলার রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার আর ড্রাইভার মিলে আরশাদকে গাড়িতে তুললো। মেঘলা আরশাদের মাথাটা নিজের কোলে যত্ন করে আগলে নিলো।
আরশাদের সাদা শার্ট রক্তে ভিজে লাল টকটকে হয়ে গিয়েছে । মেঘলা তার ক্ষতর উপর হাত চেপে ধরে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলতে লাগলো,
“আমাকে ভালোবাসেন তা ১০ বছর আগে কেনো বললেন না? দরকার হলে জোড় করে ভালোবাসতেন। আমি আপনাকে এতো তাড়াতাড়ি হারিয়ে ফেলতে চাই না। আপনার সাথে আমি ছোট্ট একটা সংসার চাই।”
রক্তাক্ত অবস্থায়ই আরশাদ তাকে মৃদু স্বরে বললো,
“সরি বউ। কথা দিচ্ছি এবার যদি বেঁচে ফিরি তাহলে আমাদের ছোট্ট সুন্দর একটা সংসার হবে।”
————–
মেঘলার ফোন পেয়ে মাহিরা তড়িঘড়ি করে ভার্সিটি থেকে বের হয়ে গেল। সন্ধ্যার সময় হওয়ায় ক্যাব ও পাচ্ছিল না আর কোন রিক্সাও পাচ্ছিলনা। কনসার্ট শেষে রওনক ও বের হয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ করে মাহিরাকে এভাবে অস্থিরতার সাথে দৌড়াদৌড়ি করতে দেখে তার কাছে এগিয়ে জিজ্ঞেস করল,
” মিস এভাবে দৌড়াদৌড়ি করছেন কেন? তাও মাঝ রাস্তায়? ”
রওনা হাসানকে দেখে হঠাৎ মাহিরার মনে পড়ল এর সাথে তো গাড়ি থাকার কথা। তাই সে কোনো চিন্তাভাবনা ছাড়াই তাকে জিজ্ঞেস করলো,
” আপনার সাথে গাড়ি আছে? ”
“হ্যা।”
” প্লিজ আমাকে স্কয়ার হসপিটাল পর্যন্ত লিফট দিন। আমার বোনের হাসব্যান্ডের গুলি লেগেছে। আমার সেখানে যাওয়ার খুব জরুরি। ”
” জি জি অবশ্যই আসুন। ”
রওনক গাড়িতে বসে মাহিরাকে জিজ্ঞেস করল,
” আপনার বোনের হাসবেন্ড পেশায় কি করে? আসলে গুলি লেগেছে বললেন তাই জিজ্ঞেস করলাম?”
” উনি বর্তমানে পিবিআই তে কর্মরত আছে। ”
” উনার নামটা কি? ”
” আরশাদ ফরাজী। ”
” কিহহ?তার মানে আপনি মেঘলা আপুর ছোট বোন? ”
“হ্যা। আপনি আপুকে চিনেন?”
“জী। আপনার আপু আর তার হাসব্যান্ড দুইজনের সাথেই আমার পরিচয় রয়েছে। ড্রাইভার একটু জলদি চালাও।”
—————
আরশাদকে ওটিতে নিয়েছে প্রায় ১ ঘন্টা হয়ে গেছে। মেঘলা ওয়েটিং এরিয়াতে বসে ছিলো এর মধ্যেই মাহিরা আর রওনক এসে পৌছালো। মাহিরা দৌড়ে গিয়ে মেঘলাকে নিজের বুঁকের সাথে জড়িয়ে ধরে বললো,
“কাঁদিস না আপু, সব ঠিক হয়ে যাবে।”
মেঘলা আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। সে হাউমাউ করে কেঁদে বললো,
“মাহিরা উনি অনেক কষ্ট পাচ্ছিলো। উনি ঠিকভাবে শ্বাস ও নিতে পারছিলো না। শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত মানুষটা আমার হাত ধরে ছিলো। ওই সুন্দর শরীরটা পুরো রক্তে ভিজে গিয়েছিলো। আল্লাহ কেনো আমাকে এতো কষ্ট দেয়?”
রওনক এগিয়ে এসে মেঘলার কাঁধে হাত রেখে বললো,
“আপু আপনি শান্ত হোন। ওনার এই অবস্থায় আপনাকে স্ট্রং থাকবে হবে।”
তাঁদের কথার মাঝেই ওটি থেকে নার্স বের হয়ে এসে বললো,
“পেশেন্টের জন্য ও পজেটিভ রক্ত প্রয়োজন। আমাদের ব্লাড ব্যাংকে আর রক্ত নেই। ওনার অনেক ব্লাড লস হয়েছে। ইমিডিয়েটলি রক্তের ব্যবস্থা করুন।”
মেঘলা বুঝতে পারলো না যে সে এই মুহূর্তে কি করবে। আরশাদের বাড়ির লোক ও কেউ এসে এখনো পৌঁছায়নি। মাহিরা আর তার ব্লাড গ্রুপ তো বি পজেটিভ। মেঘলার হতবিহব্বল অবস্থা দেখে রওনক নার্সকে বললো,
“সিস্টার, আমার রক্তের গ্রুপ ও পজেটিভ। আমার রক্ত নেয়ার ব্যবস্থা করুন।”
“ওকে আপনি আমার সাথে আসুন।”
চলবে………
কেমন লাগছে পাঠকরা? এই গল্পের আপনার সবচেয়ে পছন্দের চরিত্রের নাম কমেন্টে জানিয়ে যাবেন। আর টুস করে একটা লাভ রিয়েক্ট দিয়ে যাবেন ❤️

