আকাশপ্রিয়া #পর্ব_২২

0
36

#আকাশপ্রিয়া
#পর্ব_২২
#dure_dilshad_dua_দুর_এ_দিলশাদ_দুআ

[🚫কপি করা নিষেধ ]

সময়ের স্রোতে পার হয়ে গেছে প্রায় দু দুটো মাস।তবে এখানকার এলাকার বৃষ্টির অভিমান কমেনি খুব একটা।সকাল বিকাল অভিমান করে বর্ষা নামায় প্রকৃতির বুকে।রোদের দেখা পাওয়া যায় কালেভদ্রে। বৃষ্টির অভিমান ক্ষেত্র বিশেষে কমতে দেখা গেলেও,কিছু মানব মনের অভিমান বোধহয় সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে।সম্পর্ক,অনুভূতি মুখে মুখে ভিষন জোর দিয়ে অস্বীকার করা যায়,কিন্তু নিজের মন?নিজের মন কে কোন জোরে আটকে রাখা যায়?যায়কি।হয়তো ক্ষনিকের জন্য দমিয়ে রাখা যায়,মুছে ফেলা বোধহয় যায়না।

****

প্রিয়ার গতকাল এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হয়েছে।আপাতত পুরো দমে কয়েকটা দিন পড়াশোনা থেকে বিরতি নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সে।যদি সামনে ভর্তি পরীক্ষা অপেক্ষা করছে,তবে বোনকে রেখে দূরে যাওয়ার ইচ্ছা বা আগ্রহ কোনোটাই নেই তার।তাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া আর কোথাও পরীক্ষা দেওয়ার কথা ভাবছে না সে।শিয়া যথারীতি সকাল সকাল বেড়িয়ে গেছে অফিসে।মেয়েটা আজকাল একদম চুপ হয়ে থাকে,চোখমুখ কেমন একটা দেখায় সবসময়। চোখের নিচে কালি পরা।প্রিয়া ভেবে পায়না,এতো চাপ নেওয়ার দরকার টাই বা কি।এতো চাপের চাকরি সে থোরাই করবে।
আরামে জানালার পাশের সোফায় গা এলিয়ে বসে প্রিয়া।একটাই জীবন,এতো চাপ নেওয়ার মানে হয় নাকি।দু হাতে ফোন উঁচু করে মুখের ওপর ধরে চাপাচাপি করছে।

রিমিটাকে বারবার বলেছে আজকে আসতে।অথচ দেখো বেলা এগারোটা অথচ আসার নাম নেই।কয়েকবার কল দিয়েও পাওয়া গেলো না।প্রিয়ার ভয়াবহ রাগ হচ্ছে। বেয়াদব মেয়েটা নিশ্চিত ঘুম থেকেই ওঠেনি এখন।কতো গল্প জমে আছে,এ দুই মাসে পড়াশোনার চাপে একপ্রকার খাওয়া নাওয়া ভুলেই গেছিলো সে।জীবনে যে পড়াশোনা ব্যাতিত করার মতো আরও কিছু আছে সেগুলো মনে করার সময়ই পেতো না।
তবে সবকিছুর মধ্যে একজন মানুষ কে কখনো ভুলতে পারে নি সে।সে কথা মনে পরতেই মুখে একরাশ হাসি খেলা করে গেলো। একা একাই হাসতে লাগলো মানুষ টার কথা মনে করে।
এ দু মাসে হাতে গোনা কয়েকবার সামনে পরেছে মানুষ টার।লোকটা কেমন জানি পাত্তা দিতে চাইছে না তাকে। এই যেমন গত সন্ধ্যায় সে নিচে কফি আনতে যাচ্ছিলো।সিড়ির গোড়ায় যেতেই চোখে পরলো আকাশ ওপরে আসছে।সে নিজে একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলো,কারণ তার গায়ে এই মূহুর্তে ওড়না নেই,কারণ বরাবরের মতো সে ভেবেছিলো বাসায় কেউ নেই এই অসময়ে,তবে বরাবর এর মতোই তার ধারনা কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এই লোক অসময়ে এসে হাজির।প্রিয়া এক দৌড় দেবে কিনা ভাবতে ভাবতেই খেয়াল করলো আকাশ একনজর তাকালো তার দিকে।যাহ্ দেখে ফেললো তো এই অবস্থাতেই।এখন দৌড় দেওয়াটাই বোধহয় বেশি লজ্জার হবে।ঠায় দাড়িয়ে রইলো মূর্তির মতো ওখানেই।
কি আশ্চর্য। আর ভুলেও তাকালো না।পাশ ঘেষে চলে গেলো,সেই মাতাল করা পারফিউম এর ঘ্রানে তাকে এলোমেলো করে দিয়ে গেলো,অথচ ফিরে তাকালো না তার দিকে। কি পারফিউম ব্যবহার করে লোকটা।জানতে হবে,একদিন ঘরে লুকিয়ে গিয়ে দেখতে হবে।নিশ্চয়ই দামি খুব।ঘ্রানেই কেমন ডার্ক ভাইব দেয়।
প্রিয়া হতভম্ব হয়ে দাড়িয়ে রইলো।লাস্ট দু মাস হলো আকাশ এর সাথে তার কথা হয়না।সেই যে তার রুমে গিয়েছিলো তারপর আর সে নিজেও দুরত্ব বজায় রেখেছে লজ্জায় তবে লোকটার ব্যাপার কি সেটা সে বুঝতে পারছে না।মুখ ভেংচি কেটে নিচে নেমে গেলো সে।

বর্তমানে ফিরে এলো প্রিয়া। এখন পরীক্ষার চাপ নেই।মানুষ টার মনের ভিতর ঢুকতে হবে।কি আছে সেটা না জানা অবধি শান্তি নেই তার।

______________

“কাম ইন।”
দরজা ঠেলে আকাশের রুমে ঢুকলো রেদোয়ান,রাকিব আর রাতুল।গিয়ে এক এক করে বসলো আকাশের ডেস্কের সামনে রাখা চেয়ারগুলো তে।আকাশ ল্যাপটপ টা বন্ধ করে নিজের ঘুরে বসলো বন্ধুদের দিকে।
“রিয়ান? “
“ওর দাদির অবস্থা আবার খারাপ, একটু আগেই বাড়িতে গেলো।”
আকাশ মাথা নাড়ে।রিয়ান অবশ্য তাকে বলেছিলো দু এক মধ্যে বাড়ি যাবে।

“হ্যা রে আকাশ। সৌমির কল রিসিভ করিস না কেনো বল তো।মেয়েটা আমাকে কল করে করে পাগল করে ফেললো।”
রেদোয়ান এর কথায় কোনো হেলদোল দেখা গেলো না আকাশের মধ্যে। আকাশের রেসপন্স না পেয়ে আবার কাতর গলায় বললো,”দেখ ভাই কলটা ধরিস।সময় অসময় আমাকে জ্বালায়।আমার তো ঘরে বউ আছে রে ভাই।রাকা এমনি উঠতে বসতে সন্দেহ করে।তার মধ্যে সৌমির সন্ধান পেলে সংসার টা আমার আর টিকবে না বিশ্বাস কর।এখনো বউ ঘরে তুলে নেই নি,বিয়ে করেও শশুর শালা তুলে দিচ্ছে না বউটাকে।এই বারো**** এর খোঁজ সোজা ডিভোর্স নোটিশ পাঠিয়ে দেবে।”

আকাশ নির্বিকার চোখে তাকালো রেদোয়ান এর অসহায় মুখের দিকে,”আমি যেমন কল ধরি না, তোরাও ধরবি না। ব্যাস।ঝামেলা কিসের।”
“অতো সোজা?ওর বাপ যে আমাদের কোম্পানির শেয়ার হোল্ডার ।ভয়ই পাই আমি।”
আকাশের বোধহয় কথাটা পছন্দ হলো না।কপাল কুচকে তাকালো,”রাবিস।আমার বেস্ট ফ্রেন্ড হয়ে তুই এসব ছোটলোকি বিষয় নিয়ে ভাবিস!আকাশ এহনাজ এর কোম্পানি ওর বাপের টাকায় চলে?”

রেদোয়ান ঠোঁট উল্টালো।সাফাই দিতে দিতে বললো,”সেটা কখন বললাম।লোকটা ডেঞ্জারাস কিনা।মেয়ের শোকে আবার কি না কি করে বসে।”

তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো আকাশ।,”আমি থাকতে ওইসব চুনোপুঁটি আমার ফ্রেন্ড বা কোম্পানি কোনোকিছুরই কিছু করতে পারবে না।নেহাৎ বাবার বন্ধু তাই সম্মান করি,যদিও উনি সম্মান না পাওয়ার মতো কিছু করেননি।ওনার মেয়ের দোষ ওনার ওপর চাপিয়ে সম্পর্ক খারাপ করতে চাইনা।জাস্ট ইগনোর হার।”

রেদোয়ান মাথা ঝাকায়।যদিও সে খুব ভালো করে জানে সৌমি কল দিলে সে ধরবেই।আকাশের মতো সাহসী সে না।মেয়ের বাপ যেমন ডেঞ্জারাস, মেয়ে তার দশ কাঠি ওপরে।আকাশের জন্য পাগল দিওয়ানা যাকে বলে।তাদের ভার্সিটির ব্যাচমেট ছিলো।গায়ে পরা স্বভাবের মেয়ে যাকে বলে।কতজনের গায়ে পরে আর কত জায়গায় উঠে গেছে তার হিসেব নেই।মেয়ে আকাশের পিছনে হাত ধুয়ে পরে আছে।তবে মেয়ের বাপ বোধহয় অয়ন ভাইয়ের সাথে মেয়ের সম্পর্ক বানাতে চায় কিছু একটা।তাতে যে সৌমির খুব একটা আপত্তি তা বোধহয় নেই।সে হয়তো তাতে বেশ খুশি। দুটো হ্যান্ডসাম ভাইকে একসাথে পাওয়ার পরিকল্পনা তার মধ্যে দেখতে পাওয়া যায়।তারা সবাই সেটা টের পায়।শুধু মাত্র আকাশ,অয়নের পরিবার এর মানুষ ছাড়া। সৌমি মেয়েটা গিরগিটির মতো রং পাল্টায়।আকাশের বাবা, চাচার কাছে এমন সুশীল মেয়ে আর দুটো হয়না।তার কারণও অবশ্যই সৌমির নিখুঁত অভিনয়।
আকাশ বা অয়ন ভাই দুজনের কেউই এ মেয়ের দিকে ভুলেও চোখ তুলে তাকায় না।তখনই মেয়েটা পরিবার বশ করেছে।আর তারপরও মেয়েটা আদাজল খেয়ে লেগে আছে আকাশকে কাছে পেতে।

দরজায় আবার কড়া নাড়ার শব্দে নড়েচড়ে বসলো সবাই।ভদ্র হয়ে যাকে বলে আরকি।অফিসের কোনো এমপ্লয়ি এসে যদি বসেদের এমন চ্যাংদোলা অবস্থা দেখে বিষয়টা নিশ্চয়ই ভালো দেখাবে না।
দরজা ঠেলে অয়ন ভেতরে আসলো।সবাই এবার স্বাভাবিক হলো।
“এসো।তোমাকে আজকাল দেখাই যায়না।”
অয়ন হালকা হাসলো।এসে বসলো ভাইয়ের পাশের চেয়ারে।
“তোদেরও তো দেখা পাওয়া যায়না।একা আমার দোষ?”
আকাশ মাথা নাড়ে,”তোমার উচিত নয় কি আমাদের সময় দেওয়া?এখনকার প্রজেক্ট টার আগ্রহ তোমার বেশি ছিলো।ইনফ্যাক্ট আমাদের টেনে হিচড়ে তুমিই নিয়ে এসেছিলে।”

ভাইয়ের কথায় শব্দ করে হেসে ফেললো অয়ন।সত্যিই তো।শিয়ার খোঁজ পেতেই এখানে এসেছিলো সে।শিয়ার কোম্পানির সাথে ডিল করে,সব তার প্ল্যানই ছিলো।আকাশ তাকিয়ে রইলো ভাইয়ের দিকে।ভাই ঠিক কি কারণে এতো আগ্রহী ছিলো এখানে আসার সবটা সে জানে।মনটা দমে আসে তার হুট করে।শিয়ার সাথে যেমন তেমনই রয়েছে সবটা।দু’জনেই যেনো চুক্তি নিয়েছে একে অপরকে এড়িয়ে চলার।দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকায়।অয়ন রাকিব দের সাথে গল্প করতে ব্যাস্ত।আকাশ তাকিয়ে রয় ভাইয়ের দিকে।এখানে আসার পর এ তিন মাসে অন্য রকম হয়ে গিয়েছে একদম।আগের সেই হাসিখুশি, প্রাণোচ্ছল মানুষ টা আর নেই।অয়ন এর দরকারি মিটিং এর ডাক আসতেই উঠে চলে গেলো সে।
“এক কাজ করলে হয়না আকাশ?”
রাতুল এর কথায় সবাই ফিরে তাকালো তার দিকে।আকাশ ভ্রু তুলে শুধোলো,”কি কাজ?”
রাতুল বিজ্ঞের মতো পায়ের ওপর পা তুলে সোজা হয়ে বসলো, “ধরে বেধে অয়ন ভাই আর শিয়ার বিয়ে দিয়ে দেই।একবার কবুল বললে আর পালাবে কোথায়।বাসর ঘরে আটকে দেবো।মারামারি করতে করতে উহুম উহুম…দু মাস পর শুনবো আমরা মামা,চাচা হচ্ছি।আমাদের ভাতিজা-ভাতিজি আসবে।এদের ঝামেলাও মিটে যাবে।কেমন বুদ্ধি? “

একদমে বলে রাতুল মহা আগ্রহে তাকিয়ে রইলো বাকিদের মতামত এর জন্য। আকাশ বিরক্ত চোখে তাকালো।রাকিব চাটি মারলো একটা রাতুল এর মাথায়,”বলদ কোথাকার।অতোই সোজা সব? উজবুক।”

রাতুল প্রতিবাদ করলো সাথে সাথে, “আলবাত সোজা।একবার বাসরে ঢুকলে সব কপোত-কপোতীরই পুরানো স্মৃতি লোপ পায়।পুরানো কেনো তারা তখন নিজেরা কোথায় আছে কি করবে সেটাই তো ভুলে যায়।উহুম উহুম…”

আকাশ হতাশ চোখে তাকিয়ে রয় গাধাটার দিকে।রেদোয়ান দাঁত খিচিয়ে ওঠে রাতুল এর দিকে,”তা তোর কয়বার বাসর হয়েছে?”
“ওটাই তো সমস্যা। হচ্ছে না তো একবারও।”
আকাশ মাথা নাড়ে হতাশায়।সবকটার মাথায় খালি উল্টাপাল্টা চিন্তাভাবনা। তারমধ্যে এই গাধাটার মাথায় একটু বেশি।

“তবে আমি একটা জিনিস খেয়াল করেছি,তোরা করেছিস কিনা।এরা দু’জনেই কেমন জানি আগের থেকে নরম হয়েছে।মানে আগে যেমন একে-অপরের দিকে এমন ভাবে তাকাতো দেখে মনে হতো হায়না শিকারের দিকে তাকাচ্ছে।এখন তেমন মনে হয়না।কেমন একটা শফট শফট করে তাকায়।”
রাতুলের এ কথাটা অস্বীকার করতে পারলো না কেউই। সত্যি এটা।আকাশ নিজেও খেয়াল করেছে সেটা।একপ্রকার খুশিই হয়েছে।সেদিন তার কথাগুলোয় শিয়ার ওপর প্রভাব কিছুটা পরেছে সেটা সে বুঝেছিলো।

“হ্যা রে আকাশ।ওদের মারামারির চক্করে তুই প্রিয়াকে কবে জানাবি সব?ওর তো এক্সাম শেষ।এখন অ্যাপরোচ করে ফেল।”

রাকিব কথা উদাস চোখে তাকায় আকাশ।তার জীবন টাও পেচাচ্ছে দিনকে দিন।মাথা হেলিয়ে বসে চেয়ারটায়।
“উহু।এখনই না।মেয়েটা বড্ড অস্থির প্রকৃতির। সারাদিন ছটফট করতেই থাকে।সামনে অ্যাডমিশনটা রয়েছে। এখন কিছু ইশারা দিলে আবার পড়াশোনা থেকে বেঁকে বসবে।আগের বার দেখিসনি?আর কটা মাস যাক।”

“ততদিনে পাখি উড়ে না যায়।”
আকাশ চোখ গরম করে তাকায় রাতুল এর দিকে।
“ভুল কি বললাম আমি।মেয়েটা বড় হচ্ছে। এ বয়সে মেয়েদের মনে হাজার একটা চিন্তাভাবনা আসে।আগ্রহ জন্মে।মন নরম থাকে।কতদিন রেসপন্স না পেয়ে একা একা অপেক্ষা করবে মেয়েটা?অন্য কেউ ওর মনে জায়গা করে নেওয়াটা কি খুব অসম্ভব। “

আকাশ চুপ করে রইলো।রাতুলের কথাগুলো সে নিজেও ভেবেছে।এ দুমাসে হাজার বার এসেছে এ কথা তার মাথায়।কিন্তু ভালোবাসার ওপর তার বিশ্বাস আছে,প্রিয়াকে সে যতটা চিনেছে এতো সহজে বদলে যাওয়ার মেয়ে সে নয়।তবুও সত্যিই তো।তার দিক থেকে কোনো আগ্রহ না দেখলে মেয়েটাই বা কোন যুক্তিতে অপেক্ষা করে বসে থাকবে।এদিকে প্রিয়ার পড়াশোনা টা ছাড়া শিয়া -অয়ন ভাই এর বিষয়টা সমাধান না হওয়াটাও আরও একটা কারণ।শিয়া বিষয়টা জানতে পারলে মোটেই এখন ভালোভাবে নেবে না।ভুলও বুঝতে পারে। আকাশ দু হাতে মুখ ডলে,স্থির দৃষ্টি রাখে শূন্যে,

“আরেকটু সময় নেবো তবু আমি।আর কটা দিন যাক।তাছাড়া চোখের সামনেই তো আছে।এতো সহজে আকাশ এহনাজ চৌধুরী তার জিনিস তার চোখের সামনে থেকে কাউকে নিয়ে যেতে কিভাবে দেয়!”

__________

ক্লায়েন্ট মিটিং শেষে কিছু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঘেটে দেখছে শিয়া।তার সোজাসুজি টেবিল এর অপর পাশের চেয়ারে বসে আছে অয়ন।শিয়াকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কিছু ইনফরমেশন তাদের ফাইলে অ্যাড করতে।বাকিরা মিটিং শেষে বেরিয়ে গেছে রুম থেকে বেশ কিছুক্ষণ আগেই।পুরো রুমে এখন তারাই দুজন মাত্র।শিয়া প্রচন্ড জড়তার সাথে কাজগুলো তাড়াতাড়ি শেষ করার চেষ্টায় আছে।এমন মূহুর্তগুলো হচ্ছে ভয়াবহ রকমের ইমব্যারেসিং মোমেন্ট। না স্বাভাবিক হয়ে বসে থাকা যায় আর না তো ছুটে পালানো যায়।
অয়ন তখন থেকে শিয়ার কাচুমাচু ভাবভঙ্গি লক্ষ করছে।ঠোঁটের কেনে হাসি এসে মিলিয়ে গেলো সাথে সাথে। মেয়েটার জড়তা সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে।মাথা নিচু করে সেই যে লেখা শুরু করেছে,একটা বারের জন্যেও মুখ তুলে তাকাচ্ছে না অয়নের দিকে।
এসির নিচে থেকে কপাল থেকে ঘাম গড়িয়ে পরছে।
অয়নের দারুণ হাসি পাচ্ছে।তার অভিমানীনি টাকে কি মায়াবীই না লাগছে দেখতে।পেছনে খোঁপা করা চুল, মুখের ওপর একগোছা ছোট ছোট চুল ওড়াউড়ি করছে।বারবার ঠোট ভেজাচ্ছে।তেষ্টা পেয়েছে বোধহয়।
অয়ন পানির গ্লাসটা এগিয়ে দিলো শিয়ার দিকে।শিয়ার কলম থমকে গেলো।মাথার তুল প্রথমে গ্লাসের দিকে তারপর অয়নের দিকে তাকালো।অয়ন তখন স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে শিয়ার দিকে।এ দৃষ্টি তে সে অন্তত চোখ রাখতে পারবে না।ঝট করে নামিয়ে নিলো নিজের আখিপল্লব।
সত্যিই তেষ্টা পেয়েছে।লোকটা বুঝলো কিভাবে।কাঁপা হাতে পানির গ্লাসটা হাতে নিয়ে এক নিমিষে শেষ করে ফেললো পানিটুকু। পরম তৃপ্তি তে গ্লাসটা টেবিল এ রাখতেই আবার চোখ পরলো সামনের মানুষ টার চোখে।এখনও একই দৃষ্টি তে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
এবার অয়ন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ালো।এক হাতে চেয়ার সরিয়ে এগিয়ে এসে দাড়ালো শিয়ার পাশে।শিয়া চমকে উঠলো।হেলে গেলো চেয়ারে।অয়ন এক হাত চেয়ারের ওপর আরেক হাত টেবিল এ রেখে নিচু হলো শিয়ার ওপর।শিয়ার এই মূহুর্তে ইচ্ছে করছে কঠিন করে দুটো কথা শোনাতে।অফিসে এসে এমন অসভ্যতামির কারণ কি।কিন্তু কি সমস্যা, সে তো মুখটাই খুলতে পারছে না।কে যেনো মনে হচ্ছে গলা চেপে ধরে আছে।
অয়ন মুখটা আরও নামিয়ে আনলো।ফিসফিসিয়ে বললো,”এখন আমি চাইলে কিন্তু অনেক কিছু করতে পারি,তোমাকে আমার কথা শোনাতে বাধ্য করতে পারি।পারিনা বলো?”
শিয়ার কিছু একটা হলো বোধহয় বুকের ভিতরটায়।বাধ্য মেয়ের মতো নাড়িয়ে বসলো।অয়ন বাঁকা হাসলো।
“তাহলে?এখন?”
শিয়া কাঁপা গলায় প্রশ্ন করলো,”কি এখন?”
“” তুমি বলো।কি করতে চাও।”
গলা টা অন্য রকম শোনাচ্ছে।শিয়ার হাত পা শিরশির করে উঠলো।
“আমিই বলি তাহলে হ্যা?”
কথাটা বলেই ঠোঁট এগিয়ে নিলো শিয়ার ঠোঁট বরাবর।শিয়া খিঁচে চোখ বন্ধ করে নিলো।হঠাৎ কর্কশ আওয়াজে ফোনখানা বেজে উঠলো শিয়ার।ঘোর ভাঙলো দুজনের।শিয়া ধাক্কা দিলো অয়নেকে।অয়ন কয়েক পা পেছাতেই ঝট করে উঠে দাড়ালো শিয়া।ঠাস করে সজোরে থাপ্পড় মারলো অয়নের গালে।অয়ন এক মূহুর্ত স্তম্ভিত হয়ে গেলো।

“আর কত নিচে নামবেন আপনি হ্যা?আমি আপনার অফিসের এমপ্লয়ি। আপনার বেড এনটারটেইনার নই।সেটা ভুলে যাবেন না।এগুলো আপনি অন্য মেয়েদের সাথে করতে পারেন,তারা আপনার কাছে সাচ্ছন্দ্যে ধরা দিতে পারে।কিন্তু সেই খাতায় ইনসিয়া রহমান কে ভুল করেও ধরবেন না।লিমিট এ থাকুন।”
এক নিঃশ্বাস এ কথা গুলো বলে থামলো শিয়া।
শেষের কথাটায় অয়নের মাথায় গিয়ে লাগলো। শক্ত হাতে চেপে ধরলো শিয়ার দু বাহু।ব্যাথায় চোখ মুখ খিঁচে নিলো মেয়েটা।রাগে মাথা ভনভন করছে অয়নের
,”নিজেকে কাদের সাথে তুলনা করছো?রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে বসেছো?বেড এনটারটেইনার!আমার দরকার হয়? হাহ্,মিস ইনশিয়া রহমান।কতটুকু চেনেন নিজেকে,কতটুকুই বা চেনেন আমাকে?সারাজীবন নিজেকে সবজান্তা ভেবে সামনের মানুষ কে অপমান আর ভুল বোঝা ছাড়া আর কিই বা করতে জানো তুমি।এ জীবনে যতটা কষ্ট দিলে তুমি আমাকে বিনা কারণে,যেদিন বুঝতে পারবে সেদিন ক্ষমা করতে পারবে তো নিজেকে?দেরি হয়ে যাবে না তো আবার সেদিন? ওহ আমারই ভুল।তোমার মনে আমার জন্য কিছু থাকলে তবে না গিলটি ফিল করবে।ইট’স ওকে।সরি সরি,অ্যাম সরি মিস ইনশিয়া রহমান।অ্যাজ আ বস আপনার সাথে আমি যা করলাম ভুল হয়ে গেছে। ক্ষমা করবেন আমাকে।আপনি চাইলে আমার নামে রিপোর্ট জানাতে পারেন। ডোন্ট ওয়ারি।আপনার চাকরির ওপর তাতে বিন্দুমাত্র ইফেক্ট পরবে না।”

দু হাত জোর করে উন্মাদ এর মতো কথা গুলো বলে এক ঝটকায় টেবিলের কাগজপত্র ফেলে দিয়ে মাথার চুল খামচে ধরলো অয়ন।
শিয়া বাকরুদ্ধ হয়ে নিজের জামা খামচ ধরে দাড়িয়ে আছে।সামনের মানুষ টা পুরো উন্মাদ এর মতো রেগে গেছে।পিছন ঘুরলো না অয়ন।রাগান্বিত গলায় শিয়া কে বেড়িয়ে যেতে বললো।শিয়া দাড়ালো না আর।কাঁপা পায়ে বেড়িয়ো এলো রুম থেকে।
অয়ন সজোরে লাথি মারলো পাশের চেয়ারটায়।এ মেয়ে সবেতে বেশি বোঝে।না কথা শুনতে চায়,না নিজের ধারনার বাইরে আর কিছু বুঝতে চায়।থাপ্পড় টা তার গায়ে লাগেনি।গায়ে লেগেছে পরের কথাগুলো।সে তাকে বেড এনটারটেইনার মনে করে,ছিহ্।এসব চিন্তা ধারণা ভুলেও আসেনি এ মেয়েকে নিয়।সে তো বরাবর হালাল ভাবে সম্মান দিয়ে ঘরের বউ করো নিতে চেয়েছে।অথচ আজ!আজকে ভুল বুঝতে বুঝতে কোন পর্যায়ে এসে পৌছেছে সবটা।অয়ন আর ভাবতে পারছে না কিছু।রাগে হা পা কাঁপছে। মাথা ঠান্ডা করা দরকার। গাড়ির চাবি হাতে বেড়িয়ে গেলো বারের উদ্দেশ্যে।জীবনে সিগারেট না ছোয়া পুরুষটাকেও নারীর মায়া নেশাখোর বানিয়ে ছেড়েছে পুরো।

চলবে ইনশাআল্লাহ….

[রেসপন্স করবেন দয়া করে।না হলে রোজ গল্প দেবো নাআআআআআআ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here