#আকাশপ্রিয়া
#পর্ব_৩৫ (প্রথম অংশ)
#dure_dilshad_dua_দুর_এ_দিলশাদ্_দুআা
[🚫কপি করা নিষেধ ]
বসন্তের শেষ ভাগ।পাতাঝরা মৌসুমের সমাপ্তি ঘটে গাছে গাছে নতুন সবুজের সমাহার এখন।প্রিয়াদের কটেজের আশপাশ টা এখন অন্য রকম লাগে।আশেপাশে বনবাদাড় একপ্রকার। তার মাঝে সাজসজ্জা সম্মত কয়েকটি উন্নত মানের কটেজ।এতদিন বেশিরভাগ গাছেরই পাতা ঝড়ে গিয়েছিলে,এখন নিয়মমাফিক নতুন পাতা গজাচ্ছে।
এলোমেলো বাতাসে এক নিমিষেই হৃদয় শীতল করে।
কটেজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে প্রিয়া।এই মূহুর্তে কটেজে সে বাদে আর কেউ নেই।কক্সবাজার থেকে ফিরেছে তারা প্রায় পনেরো দিন হয়েছে।ঘোরাঘুরি শেষে ফিরেই সবাই পুনরায় ব্যাস্ততায়।সামনে মাসে প্রিয়ার ভর্তি পরীক্ষার ডেট।মোটামুটি তাকেও ব্যাস্ততার ওপরেই থাকতে হয়।নিয়ম করে রিমির কাছ থেকে নোট সংগ্রহ, পড়াশোনা এই করেই তার দিন কাটছে।আকাশের দেখা মেলে একমাত্র রাতেই।ডিনার টেবিলে।তাও সেটাও কালেভদ্রে। বেশিরভাগ সময়ই বেশ রাতে ফেরে সবাই।প্রজেক্ট এর কাজ এখন পিক পয়েন্টে।সবার ব্যাস্ততা তুঙ্গে।সবাই একসাথেই ফেরে বেশির ভাগ দিন।ততক্ষণ অবশ্য প্রিয়ার একা একাই সময় কাটে।প্রিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে।আকাশের ওপরে ভয়াবহ রেগে সে।কক্সবাজার থেকে আসার পর থেকে লোকটার সাথে একটু দশ মিনিট সময়ও কাটাতে পারে না সে,আর না তো দু দন্ড শান্তিতে মানুষ টাকে দেখতে পারে।এতো কিসের ব্যাস্ততা মাথায় ঢোকে না তার।
তবে অসভ্য মানুষটা যে নিয়ম করে তাকে দেখে সে সেটা টের পায়।রোজ রাতে তার ঘরে আসে।খোলা জানালা আটকানো পায় রোজ সকালে।কখনো মশারি টাঙানো থাকে,এসির পাওয়ার কমবেশি করা থাকে,গায়ে সুন্দর মতো কাঁথা ঢাকা থাকে।শিয়া কে জিজ্ঞেস করেছে সে।শিয়া করেনি এসব।অবশ্য জবাবে তাকে হেসে এড়িয়ে যাওয়া দেখেই সবটা আন্দাজ করে নিয়েছে সে।প্রতি রাতে অপেক্ষা করে মানুষ টার জন্য। একনজর দেখতে,অথচ অপেক্ষা করতে করতে কখন ঘুমিয়ে যায় টেরই পায়না।
গাল ফুললাো প্রিয়া,গাছের আগায় কি সুন্দর একজোড়া পাখি বসে আছে।পাশেই পাখিদের বাসাটা।কি সুন্দর সংসার।শিয়া তাও অয়ন ভাইয়ের সাথে সারাক্ষণ থাকে।অফিসে একসাথেই কাজকারবার। তাদের সর্বক্ষণ দেখা সাক্ষাৎ হয়,একে অপরকে মিস করার সময়ই বোধহয় পায়না।অন্তত শত কাজের পর ভালোবাসার মানুষ টাকে চোখের সামনে দেখতে তো পায়।তার সে কপালও নেই।দুদিন হলো দরজা লক করে ঘুমায় সে।বিধায় আকাশের সাথে দুদিিন হলো জ্ঞানে অজ্ঞানে কোনো ভাবেই তার সাক্ষাৎ হচ্ছে না।বুকটা যন্ত্রণা করে মানুষ টাকে না দেখতে পেলে,রাগ করে সে থাকতে পারে না।প্রিয়া ঠিক করেছে আজ যে করেই হোক,রাত জাগবে,দেখবে আকাশ সত্যি তার রুমে আসে কিনা,আসলে সে মোটেই আহ্লাদ করবে না আজ।উচিত শিক্ষা দেবে একদম।
____
“আসবো?”
অফিসের দরজায় চিরপরিচিত কণ্ঠস্বরে মৃদু হাসলো অয়ন।গম্ভীর গলায় বললো,”আসুন।”
শিয়া একগাল হাসি হাসি মুখ নিয়ে দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকলো।হাতে একটা ফাইল।এগিয়ে এসে ডেস্কের ওপর ঠেলে দিলো অয়নের দিকে।অয়ন ল্যাপটেপের দিকে তাকিয়েই ফাইল হাতে নিলো।খুলে চেক করতে লাগলো একে একে সব পাতা।শিয়া ভ্রু জোড়া কোচকালো।কি ব্যাপার! অয়ন একবারও তাকালো না তার দিকে।অয়ন একেরপর এক দেখেই যাচ্ছে,ভুলেও শিয়ার দিকে তাকাচ্ছে না।শিয়া শব্দ করে চেয়ার টেনে মুখোমুখি বসলো।উহু তাও তাকাচ্ছে না।দু চার বার টেবিলের ওপর টকটক শব্দ করলো আঙুলের উল্টো পিঠ দিয়ে।এবারেরও না।বিরক্ত হলো শিয়া।এতো কি ইম্পরট্যান্ট ফাইল এটা!যে সে এসেছে তাও একবার মুখ তুলে তাকানো যাচ্ছে না।শিয়া আবার একই ভাবে দ্বিগুণ জোরে শব্দ করলো।অয়ন মনে মনে খুব হাসছে,ম্যাডাম ইগনোর নিতে পারছে না।শিয়ার এহেন কান্ডে গলায় আওয়াজ ভারি করলো,মুখ তুললো বস বস ভঙ্গিতে, মুখে কপট একরাশ বিরক্তি এনে বললো,”সমস্যা কি মিস ইনশিয়া! “
এ লোক বলে কি! শিয়া আকাশ থেকে পরলো এবার।তার সমস্যা! সমস্যা কি সে সেটা টের পাচ্ছে না?শিয়া রুমে এসেছে সেই কখন,ফাইল তো অযুহাত মাত্র,ওই ফাইল টা যে একদম ইম্পরট্যান্ট নয় এই মূহুর্তে, এটা এখন আনার কথা ছিলো না অ্য়ন কি সেটা টের পাচ্ছে না?এত মন দিয়ে দেখছে তাও সেটাই।সে এখানে নির্লজ্জের মতো কাজ বাদ দিয়ে এসেছে কার জন্য? তার জন্যই তো।শিয়ার মুখ ফোলালো,কপট রাগী গলায় বললো,”কিছু না স্যার।দয়া করে ফাইল টা দেখে দিন।আমি যাই।”
বলেই দাড়িয়ে পরে যাওয়ার জন্য উদ্ধত হতেই অয়ন শব্দ করে হেসে কবজি টেনে ধরে।নিজে উঠে আসে চেয়ার থেকে পাশ ঘুরে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে শিয়াকে।শিয়া নিঃশব্দ হাসে,তবে প্রকাশ করে না।
“অফিসে এমপ্লয়ির সাথে এটা কি ধরনের ব্যাবহার স্যার।”
“অসভ্যতা?”
“নয়?”
“বউকে ভালোবাসা অসভ্যতা লাগে আপনার ম্যাডাম?”
“কে বউ কার বউ?”
“আমার বউ।অয়ন মেহনাজ চৌধুরির ওয়াইফ মিসেস ইনশিয়া মেহনাজ চৌধুরি।”
পরিচয় টা শিয়ার বুকে গিয়ে লেগেছে।একরাশ প্রশান্তি এসে ভর করেছে তার মধ্যে। হাসলো। তবে উল্টো থাকায় অয়নের চোখের আড়ালেই রইলো সেটা।শিয়া নড়াচড়া থামালো।অয়নেরএক হাত তার ডান হাত চেপে ধরে রাখা বুকের ওপর।অন্য হাত বা হাত চেপে পেটের ওপর।অয়ন চিবুক ঠেকালো শিয়ার উন্মুক্ত কাঁধে। চাপ দাড়ির খোঁচা লাগছে শিয়ার কাধে।শরীর শিরিশির করছে।বুকটা ধরফর করছে।এতগুলো বছর পার হয়ে গেছে তাদের।তার কিশোরি বয়সের প্রেম থেকে এখন দুজনেই ভয়াবহ ম্যাচুয়র।তবুও অয়ন যতবার কাছে আসে সেই প্রথম দিনের অনূভুতিতে ছেয়ে যায় মনটন।শিয়া চোখ বন্ধ করে রাখে।
“কখন হলায় মিস থেকে মিসেস?হুম?আমি চিরকুমারী। অযথা দুর্নাম করবেন না বললাম।”
“কুমারি? উমমম তা আছো।তবে তোমার এই কুমারি থাকার গৌরব আর হাতে গোনা কয়েকদিন ম্যাডাম।তারপর আয়োজন করে সে তকমা গা থেকে সরিয়ে হালাল কলঙ্ক লেপটে দেবো। “
“সে অধিকার আপনাকে দিলে তবে তো!ছাড়ুন। না হলে কেউ দেখে ফেললে কালকের খবরের হেডলাইন হবে চৌধুরী গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিস এর বড় মালিক অয়ন মেহনাজ চৌধুরি এক এমপ্লয়ির সাথে অনৈতিক কাজ করতে গিয়ে অফিস কক্ষে ধরা।ছিহ্।আপনার মানসম্মান না থাকলেও আমার আছে।সরুন সরুন।”
অয়ন বাকা হাসলো।সরলো না একদমই,উল্টো আলতো চুমু আকলো কাঁধে। শিওড়ে উঠে শক্ত করে মুঠো করে নিলো নিজের হাত।অয়ন অনূভব করলো সবটাই।আরও গভীরে মিশিয়ে নিলো নিজের সাথে।
“ভালোবাসি শিয়া।খুব ভালোবাসি কিন্তু। “
শিয়া কিচ্ছু বললো না।বলতে পারলোই না।অয়নের স্পর্শে সে কাবু।
____
সুইজারল্যান্ড এর আকাশ আজ রোদ ঝলমলে।বাংলাদেশের মতো সময় অসময় বৃষ্টি এখানে হয় না। আনিসুল রহমান ব্যাস্ত পায়তারা করছে।আজ তার ইউনিভার্সিটি বন্ধ। সাপ্তাহিক ছুটির দিন আরকি।আনিসুল রহমানে স্ত্রী রেনুকা রহমান বসে আছেন সোফায়।অসহায় দৃষ্টিতে স্বামীর পায়চারি দেখছেন।বেশ কয়েকবার ডেকেছেনও একটু স্থির হয়ে বসতে,স্বামী তার কথা কানেই নিচ্ছেন না।একপর্যায়ে উঠে গিয়ে হাত ধরলেন আনিসুল সাহেবের।তিনি হতাশ নয়নে তাকালেন স্ত্রীর দিকে। টেনে এনে বসালেন স্বামী কে।হাতের ওপর হাত রাখলেন।নরম গলায় বললেন,”এতো অস্থির হওয়ার কারণ জানতে পারি?সেই সকাল থেকে এমন করছো।”
আনিসুল সাহেব তাকালেন না স্ত্রীর দিকে।মাথা নুয়িয়ে রাখলেন।ধীর গলায় বললেন,”মেয়ে দুটোর সঙ্গে কথা হয়েছে?”
রেনুকা মাথা নাড়লেন।”রাতেও তো হলো।মেয়েদের জন্য মন খারাপ করছে?”
আনিসুল সাহেব মলিন হাসলেন।”সে তো সবসময়ই করে।ওদের ছাড়া ভালো লাগে কখনো?”
রেনুকা রহমান নিজেও হাসালেন।সত্যিই তাই।প্রায় ছয় মাস হলো এসেছে। এতগুলো দিন মেয়েদের দেখেনি।মাথা হাতড়ে আদর করেনি।এ জীবনে কখনো এতদিন মেয়েদের ছাড়া থাকেন নি তারা।সাতকুলে নিজেদের আত্মীয় সজন কেউ নেই।বছর ত্রিশ আগে আনিসুল সাহেব কে ভালোবেসে বিয়ে করার অপরাধে তাদের পরিবার এর সাথে সম্পর্ক শেষ করতে হয়েছিলো। দুজনের কেউ অযোগ্য ছিলো না,আর নাতো একে অপরের পরিবার এর থেকে কেউ কারোর থেকে কম জৌলুশ এর ছিলো।কিন্তু সমস্যা টা বোধহয় সেটাই ছিলো।বেশি জৌলুশ। অতি রক্ষনশীল মুসলমান পরিবার।প্রেম ভালোবাসা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ। তবে প্রেম ভালোবাসা কি বাধা মানে!দুজনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সেসময়।একই ব্যাচের।বন্ধুত্ব পরিনত হয় প্রনয়ে।পরিবার কে সাহস করে জানায় দুজনেই।মানতে পারেনি কোনো পরিবারই।আনিসুল সাহেবের পরিবার শেষমেশ মানতে চাইলেও প্রিয়ার মা রেনুকা রহমানের পরিবার কঠোর ভাবে নাকচ করে দেয়।অগত্যা আত্মমর্যাদায় আঘাত পান আনিসুল সাহেবের পরিবারও।একপ্রকার আটকে ফেলে দুজনকে।বিয়ে ঠিক করেন যার যার মতো।তবে সেসবের তোয়াক্কা করেননি দুজনের কেউই।তাদের ভালোবাসা না মানার মতো কিচ্ছু ছিলো না।অথচ পরিবার এর মিথ্যে অংকার,জেদের বসে সেই ভালোবাসা জলান্জলি দিতে দুজনের কেউই রাজি ছিলো না।এক কাপড়ে বাড়ি ছাড়েন একে অপরকে আকড়ে ধরে।সেই থেকে এতগুলো বছর পেরিয়ে গেছে,কেউই ফিরতে চায়নি নিজের পরিবারে।আর না তো তাদের পরিবার ও তাদের খোঁজ কখনো করেছে।
রেনুকা রহমান স্বামীর দিকে অনিমেষ তাকিয়ে থাকেন।এক পৃথিবী সুখ এনে দিয়েছে এই মানুষ টা তাকে।দু দুটো কন্যা সন্তাতের বাবা মা তার।পরিপূর্ণ সংসার তাদের।এক জীবনে কোনো আক্ষেপ করার সুযোগ দেয়নি।এই ত্রিশ বছরের একটা বারের জন্যও মনে হতে দেয়নি আনিসুল সাহেবের হাত ধরে বাড়ি ছাড়া তার ভুল ছিলো।একে অপরের সাথে ছায়ার মতো লেগে থেকেছে দুজন।এখন মুখে না বললেও দুজনই বুঝে যায় অপরজনের অস্থিরতা।
“বললে না কি হয়েছে?”
আনিসুল সাহেব দু হাতে মুখ ডলে।
“…আমি আমার মেয়ে দুটোকে সবসময় ওদের পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে চেয়েছি।”
“দিয়েছোও তো।”
“দিয়েছি।আজীবন দেবো এই অঙ্গিকারও করেছি।ওরাও তাদের বাবার কথা সবসময় ভেবে এসেছে।”
রেনুকা রহমান চুপ করে শোনেন স্বামীর কথাগুলো।বোঝার চেষ্টা করেন।
“প্রিয়া টা ছোট।কিন্তু শিয়া বড় হয়েছে।যথেষ্ট বড় হয়েছে। তবুও আমি সেই মেন্টালির বাবা মোটেই নই যার এই সাতাশ বছরেই মেয়েকে বোঝা লাগবে,বিয়ে দিতে উঠেপড়ে লাগবো।”
“জানি তো সেটা।”
“ওদের যখন মনে হবে ওরা বিয়ে করতে চায়,জীবনসঙ্গী চায়,আমি আটকাবো না।চাই নি কখনো। কিন্তু…
“কিন্তু.?”
“আজগরের মা গতকাল রাতে ব্রেইন স্ট্রোক করেছে।আজগরের স্ত্রীরও তো ক্যান্সার।”
এতটকু বলে থামলেন তিনি।স্ত্রীর এবার বুঝতে বাকি রইলো না স্বামীর অস্থিরতার কারণ।কাঁধে হাত রাখলেন।
“ওরা কি এখনি শিয়া আর নিলয়ের বিয়ের কথা বলছে?”
আনিসুল রহমান মাথা নাড়লেন।রেনুকার মলিন মুখ আরও মলিন হলো।
“শিয়া বারবার না করছিলো। এখনই..
“ জানি।তার জন্যই আমি চিন্তিত।মেয়েটা চায়না এখন বিয়ে করতে।সবে ওর চাকরিটায় জয়েন করেছে।আরও সময় চেয়েছে আমার থেকে।তাছাড়া…
থামলেন খানিকক্ষণ। দম নিলেন।
“তাছাড়া আমর কেউই দেশে নেই।আমার মেয়েদের বিয়ে আমি দশ এলাকা জানিয়ে দেবো।ধুমধামে দেবো।সেখানে এভাবে আমার মেয়ের বিয়ে।আমার বড়মায়ের বিয়ে…”
চোখ ছলছল করে রাহমানে।
“শিয়া কি নিলয় কে পছন্দ করে না?”
রেনুকা চুপ করে থাকেন।মাথা নামিয়ে ফেলেন।মেয়ে কে চেনে।নিলয় ছেলেটাকে আলাদা করে পছন্দ অপছন্দের কথা শিয়া কখনোই স্বীকার করেনি।তবে ভালো যে বাসে না এখনো সেটা সে টের পেয়েছে।
আনিসুল সাহেব স্ত্রীর দিকে এতক্ষণে তাকালো।
“মেয়েটাকে জোর করছি আমরা?”
রেনুকা রহমান ব্যাস্ত হলেন।”না না সেটা কিন্তু বলেনি।তুমি কেনো চিন্তা করছো এ নিয়ে। “
স্বামী কে কথাটা বলে নিজেই ধুম ধরে যায়।আনিসুল সাহেবের কয়েক বছর আগে বর সড় হার্ট সার্জারী হয়েছে।কোনো ধরনের চিন্তা,প্রেশার কিচ্ছু নিতে কঠোর ভাবে নিষেধ করেছেন ডাক্তার।
“তাহলে আমরা দেশে যাবো?”
“তোমার ছুটি? “
“এক মাসের জন্য নিতে পারবো হয়তো।”
“শিয়া কে জানাবে না? “
“দেশে যাবো সেটা জানাও।বিয়ের বিষয় সামনাসামনি বলা ভালো হবে।”
“ঠিক আছে।”
“ওরা বোধহয় শিয়ার অফিস কেটেজে থাকে।আমরা সোমবারে দেশে যাবো।ওদের তাহলে কাল পরশুর মধ্যে বাড়ি ফিরতে বলো।আমরা যে কয়দিন আছি সে কয়দিন বাড়ি থেকেই অফিস করুক।”
“আমি রাতে জানাবো ওদের।”
_____
ঘড়ির কাটায় সময় রাত সাড়ে আটটা।অফিসে নিদারুণ ব্যাস্ততা সবার।মাঝখানে কয়েকদিনের ছুটি দেওয়ায় কাজ জমে একপ্রকার পাহাড় হয়ে আছে।নাকেমুখে গুজে সেসবই ম্যানেজ করতে ব্যাস্ত সবাই।আকাশদের হোটেল এর কাজ সম্পূর্ণ হতে আরও বছর খানেক ভালোমতো লাগবে।ওপেন প্রজেক্ট সাইটে কাজ দেখছিলো আকাশ।সাথে অয়ন,শিয়া রাতুল,রেদোয়ান সকলেই আছে।রাকিব, রিয়ান কিছু ক্লায়েন্ট দের সি অফ করতে গিয়েছে এয়ারপোর্টে।এতক্ষণে অবশ্য ফিরে আসার কথা।আকাশ ব্যাস্ত হয়ে পায়চারি করছে।এখন কটেজে ফেরা দরকার। গত দুদিন হলো প্রিয়াকে দেখে না।মেয়েটা দারুণ অভিমান করে আছে বোঝা যাচ্ছে।কোনোভাবে রাতে তার রুমে গিয়ে প্রিয়াকে দেখার সিক্রেট টা মেয়েটা জেনে গেছে।মুচকি মুচকি হাসে আকাশ,ওইটুকু বাচ্চা একটা মেয়ে,তার ভয়ে নাকি আজকাল তটস্থ থাকে আকাশ এহনাজ।
“হাসছিস কেনো!”
আকাশ স্বাভাবিক চোখে পাশ ফিরে তাকায়।গোল গোল চোখ করে রাতুল দাড়ানো।আকাশ লেভারদের কাজের ওদিকে দৃষ্টি বুলায়।
“কই হাসছি।”
রাতুল ততক্ষণে এসে দাড়িয়েছে আকাশের গা ঘেষে।
“আমাকে অন্ধ লাগে তোর?”
“তুই তো তাই-ই।”
রাতুল নাক সিটকায়,আঙ্ঙুল তোলে আকাশের দিকে।ফিচেল গলায় বলে,”আগে অয়ন ভাইয়ের মতো জেন্ট্যালম্যান ছিলিস,এখন রাকিব,রেদোয়ান দের তাল ধরেছিস।আমাকে হেনস্তা করিস উঠতে বসতে।”
আকাশের মুখের কোনো ভাবান্তর হয়না।
“হেনস্তা তো তুই করিস আমাকে!”
“আমি?”
“নয়?”
“কোনটাকে হেনস্তা বলিস তুই?প্রিয়ার কথা টা জানিয়ে দেয়া?”
আকাশ জবাব দেয় না।গভীর মনোযোগ তার কাজের দিকে।রাতুল খানিকক্ষণ জবাবের আশায় হা করে তাকিয়ে থাকে।জবাব না পেয়ে একই উৎসাহে পুনরায় বলে,”প্রিয়ার কথা তো?ওটা সবাইকে না জানালে তুই জীবনে স্বীকার করতি?এ জীবনে করতি না।তখন আমি কি তোর বাচ্চাকাচ্চার চাচা হওয়ার সপ্ন ওপরে জান্নাতে বসে দেখতাম?”
আকাশ মুখ বাকায়।গম্ভীর অথচ টিটকারির সুরে বলে,”আর ইউ সিওর?”
“কি?”
“তুই জান্নাতেই যাবি?”
“আমি বড্ড ভালো মানুষ আকাশ।তুই শুধু…না সরি..তোরা শুধু চিনলি না,কদর করলি না।”
আকাশ এবার হাসে।বন্ধুর কাধে হাত রাখে।
“মহা ভালো মানুষ তুই।মানবো।একটা কাজ কর তাহলে।”
রাতুলের খুশিতে দাঁত বেড়িয়ে পরেছে।
“বলে ফেল।”
“এখানকার সাইটের কাজ শেষ হতে রাত হবে।সব হিসেব নিকেশ বুঝে বাড়ি আসিস কেমন?আমি বাড়ি গেলাম।”
রাতুলের হাসিহাসি মুখ এক নিমিষে শুকনো পাতার মতো মুচড়ে উঠলো।প্রতিবাদ করে উঠলো,”অসম্ভব বাডি।আমাকে এভাবে ফাসাতে পারিস না।তোর আন্দাজ আছে কাজ কখন শেষ হবে!কাজ করতে তো সমস্যা নেই আমার।কটেজে একসাথে ফিরি চল,তোর সব কাজ করে দেবো,তুই রাতভর প্রেম করিস তোর বেবিগার্ল এর সাথে।কিন্তু এখানে একা…ততক্ষণ… আমি একা পারবো না।অতো রাতে……”
রাতুল থেমে যায়।সর্বনাশের মাথায় বাড়ি।মুখ ফসকে কি বলে ফেলছিলো।মানসম্মান এর ফালুদা তৈরি হতো আজকে।ঘাড় বাকিয়ে খেয়াল করলো আকাশকে।তার বাকি কথা টা আন্দাজ করে নিয়েছে কি না খেয়াল করার চেষ্টা করলো। আকাশের মুখ দেখে সহজে অবশ্য ধরতে পারা গেলো না।যে অতি সিরিয়াস মুখ সেরকম অতি সিরিয়াস হয়েই আছে।দৃষ্টি ও কাজের দিকে।হাফ ছাড়লো রাতুল।ভাগ্যিস মন এদিকে ছিলো না আকাশের।
“অতো রাতে কি?”
রাতুল চুপসে যাওয়া মুখ নিয়ে ধীরেসুস্থে তাকালো আকাশের দিকে।ছেলেটা তার মানে শুনছিলো তার কথা।রাতুল ঝটপট বলে উঠলো, “তুই একা একা ফিরবি।রাত হয়েছে। ওরকম জঙ্গলের রাস্তা আমাদের। রাকিব,রিয়ান এয়ারপোর্ট থেকে সোজা রাতে কটেজ ফিরবে,রেদোয়ান যাবে একবার শহরে,ওরও ফিরতে রাত,আর রইলো বাকি অয়ন ভাই আর শিয়া।কাপলের মধ্যে কিভাবে ঢুকি বল…”
“আমার আর প্রিয়ার মধ্যে তো ঠিকই নেচে-কুঁদে ঢুকে পরিস।”
রাতুলের মুখখানা কপট হতাশায় ভরে উঠলো।চোখমুখ বাচ্চাদের মতো কাঁদো কাঁদো করে ফেললো।একদিন একটু ঢুকে পরেছিলো দুজনের মাঝে।সে কি শখ করে ঢুকেছিলো নাকি!কক্সবাজার থেকে শেষরাতে রওনা দেয় বান্দরবান এর জন্য।ওখানে পৌছুনোর পর তার পেয়েছে হিশু। এদিকে বাসে সবাই ঘুমায়। ফাঁকা রাস্তা দেখে বাস থামতে বললো।সে একটু আধটু ওই আরকি..মানে ভয়টয় পায় আরকি।ওইসময় বাসে শব্দই পাওয়া যাচ্ছিলো প্রিয়ার কন্ঠের।সারা রাস্তা মেয়েটা রাজ্যের গল্প জুড়েছে।কথাই বলছিলো যখন সে তো স্বাভাবিকই ভাববে তাইনা?ভুল হয়েছে তার অবশ্য একটু।বাসের সিটের পর্দাটা টানার আগে একটু আধটু উহুম উহুম টাইপের শব্দ করতে হতো।তার এদিকে ইমারজেন্সি, তাছাড়া ওরাও জেগেই আছে।না জিজ্ঞেস করেই পর্দা টা একটু টান দিয়ে ফেলেছিলো।সে কি জানতো একজন রেডিওর মতো বকবক করছে,আরেক জন গলায় মুখ ডুবিয়ে রোমান্স এ ব্যাস্ত।ওই পরিস্থিতিতে দুইজনই ভূত দেখার মতো চমকে ওঠে।তিনজন বলার কারণ সে আর প্রিয়া।আকাশের মধ্যে চমক টমকের বিষয়আশয় খুব একটা জাগে না।যেটা জাগে সেটা হলো বিরক্তি। বেচারা সে কি আর করতো।প্রিয়াটা লজ্জায় বসে রইলো।আকাশ তার সাথে বাইরে বের হলো।বিশেষ মূহুর্তে বিরক্ত করার শাস্তি সরুপ আকাশ এহনাজ চৌধুরী তাকে কি করতে পারে ভাবতেই তার সব শুকিয়ে এলো।আর এক নাম্বার কর্ম টা করতে যেতে হলো না।মাঝখান থেকে কিছু হলেই সেই খোটা আকাশ দেয়।রাতুল মুখ বাকায়।আকাশ টা এতো বেহায়া সে একদম জানতো না।একে তো মেয়েটা বাচ্চা,তার ওপর এতো অত্যাচার করে।আর সে তো আজীবনের বন্ধু, হয়েছে না হয় একটু আধটু ভুল।দিয়েছে না হয় বন্ধুর রোমান্সে ব্যাগড়া।দেবেই তো।বন্ধু হয়ে জন্মেছে আর এতটকু অধিকার থাকবে না!কি আশ্চর্য! বন্ধু কাকে বলে!বন্ধুর কাজই তো এটা।অন্য বন্ধুর রোমান্সে ঝামেলা করে।কিন্তু সে কি সবসময় করে নাকি!সবসময় ওদের আরো স্পেস করে দিতো আলাদা সময় কাটানোর।একদিনের একটু মিসটেকে সব ভুলে গেছে ছেলেটা।প্রেমে পরলে যা হয় আরকি।এসব অবশ্য মনের কথা মনেই রেখে বুকে আড়াআড়ি হাত গুজে সিরিয়াস ভঙ্গিতে বললো,”ওটা তো ইচ্ছে করেই করেছি।”
“ইচ্ছে করে!”
আড়চোখে আকাশের বাঁকা দৃষ্টি দেখে ঢোক গিললো রাতুল।মাথা ঝাকালো।
“ইচ্ছে করে না তো কি!নাএতটুকু বাঁধা না দিলে বিয়ের আগেই বাসর সেরে ফেলবি তুই।এটা তো আমি হতে দিতে পারি না বল।ধর্ম কর্ম বলে তো একটা বিষয় আছে নাকি।বন্ধু হয়ে বন্ধুর পাশে এভাবেই থাকতে হয়।”
“তাই নাকি!ভালো কথা।তবুও আজ তুই থাকবি এখানে।কেমন?বন্ধু হয়ে বন্ধুই তো পাশে দাড়ায় তাইনা?”
তার কথাতেই তাকে ফাঁসানো হচ্ছে! রাতুল হুড়মুড় করে হাত টেনে ধরলো আকাশের। আকাশ বিরক্ত মুখে তাকালো।
“মেয়ে মানুষের মতো এসে গা ডলছিস কেনো!”
“সে যাই বল।এখন মাইন্ড করবো না।আজকে অন্তত একা রেখে যাসনা কেমন?সাথে যাই চল।না হলে একটু অপেক্ষা কর।বসেই থাক।সব কাজ আমিই করে দেই।”
আকাশ নিঃশব্দে অদেখা হাসে।
“আই হ্যাভ টু গো রাতুল।তাছাড়া তোর সমস্যা কোথায়।এর বদলে যা কাল তোর ছুটি। “
রাতুল ব্যাস্ত হয়ে দুদিকে মাথা নাড়ে।
“আমার সাথে আজ থাক,কাল পরশু তুই বরং আসিস না।আমি সামলে নেবো।তাও আজ যাস না।”
আকাশ ভ্রু জোড়া ওপরে তোলে।জিজ্ঞাসু চোখে তাকায়।
“তুই কি এক ফিরতে বাই এনি চান্স ভয় পাচ্ছিস রাতুল?”
গেলরে গেলো।সব গেলো।আকাশটা ঠিক ধরে ফেলেছে।পুরুষ মানুষ হয়ে একা চলাফেরা করতে ভয় পায় রাতে।এটা প্রকাশ যোগ্য!
“সেটা একবারও বলেছি আমি?”
“তাহলে আমি তো সমস্যা দেখি না কোনো।”
“অবশ্যই সমস্যা আছে।”
“শুনি একটু।”
রাতুল খানিকক্ষণ চুপ করে কথা সাজায়।
“তুই অতি সুদর্শন পুরুষ।আমরা সকলেই জীবনে একটা ছোটখাটো… না না বিশাল আফসোস নিয়ে আছি যে আমরা কেনো নারী হলাম না।তোর মতো পুরুষ প্রত্যেক টা নারীর ড্রিম।”
“আসল কথা বল..”
“তো যেটা বলছিলাম।আগেই কথা বলবি না।আমি কথা এলোমেলো করে ফেলি।”
“বানিয়ে বানিয়ে বললে এলোমেলো হওয়া স্বাভাবিক। “
“তুই সুদর্শন এটা বানানো কথা?”
“সেটা কখন বললাম।”
“এইতো বললি।”
“এটা বানানো নয়।পরের তেল মালিশ টা বানানো হবে।ডেট এক্সপায়ার্ড তেল।ইউ কনটিনিউ। শুনছি।”
রাতুলের ভ্রু জোড়ার সরু ভাজ সোজা হয়।এখন কোনো জ্বালাময়ী কথায় কান দিয়ে নিজের কথাগুলো গুলিয়ে ফেলা যাবে না।
“তো যেটা বলছিলাম।তুই অতি সুদর্শন পুরুষ।হাজার হাজার নারীর রাতের ঘুম হরনকারী।চৌধুরী বংশের ছেলে।চৌধুরী গ্রুপ অফ ইনডাসট্রিস এর মালিক।তোকে একা একা এরকম প্রত্যন্ত অঞ্চলের রাস্তায় একা ছাড়তে তোর মা আমাকে পই পই করে বারণ করেছে।এতো টাকার মালিক তুই,এতো দায়িত্ব। তাছাড়া এখন তো আমার বোনটাকেও ফাসিয়ে ফেলেছিস।ওর জন্যেও আমাকে ভাবতে হয়।তোকে দেখেশুনে রাখতে হয়।চোখের সামনে রাখলে তাও বেড়াল কিছুতে মুখ দিতে পারেনা,আড়াল হলে কি না কি করে…”
আকাশের চোখ রাঙানিতে নিজের চোখ সরিয়ে নিলো রাতুল।গলার আওয়াজ দৃঢ় থেকে মিনমিনে হলো তবে থামলো না।
“তাই আরকি।তোকে একা রেখে যাবো না।তোর মা আর বউয়ের কড়া নিষেধ আছে তোকে একা ছাড়া নিয়ে।”
আকাশ সজোরে আঘাত করলো রাতুলের পেটে।আকাশের জিম করা শক্তপোক্ত হাতের গুষিতে পেট বাকিয়ে গেলো বেচারার।চোখমুখ কুচকে নিলো ব্যাথা।
“শালা ভুলভাল না বকে সত্যি স্বীকার কর।তাহলে ব্যাবস্থা করবো একটা।”
রাতুলের কোচকানো মুখ শত চেষ্টাতেও স্বাভাবিক হলো না।ব্যাথা টা জোরেশোরে লেগেছে।তবে আকাশের শেষ কথায় চোখমুখ খানিকটা উজ্জল হলো।
“নিয়ে চল দোস্ত।প্লিজ।”
“কি সমস্যা বল আগে।”
রাতুল এদিক ওদিক তাকালো।যেনো খেয়াল করলো কেউ আছে কিনা,শুনে ফেরার ভয় নেই যখন টের পেলো আকাশের দিকে মুখ এগিয়ে নিচু গলায় ফিসফিস করে বললো,”আ.।আমার না একটু আধটু ভয় টয় লাগে আরকি। “
আকাশ শব্দ করে হেসে ফেললো।রাতুলের এটা একটা সমস্যা। সাথে কেউ থাকলে সে বীরপুরুষ, অথচ একা একা রাতে ট্রাভেল করতে বাচ্চাদের মতো ভয় পায়।ভূতে নাকি কিসে সেটা অবশ্য স্বীকার করে না কখনো।কিন্তু ভয় পায়।এ যাবৎকাল কখনো স্বীকার করেনি।রাকিব,রেদোয়ান রা থাকলে এখনো করতো কি না সন্দেহ, বেশি সম্ভব করতোই না,তবে আকাশের সামনে সে প্রাণ খুলে মনের সব প্রকাশ করে ফেলে।
চলবে ইনশাআল্লাহ 🌼🍂
[লেখা ছিলো,তবে এতটুকুই এডিট করা ছিলো।পর্বটা বিশাল ছিলো,পুরো টা দিতে পারলাম না।বাকিটা দিয়ে দিবোনি দ্রুতই।#সাঁঝের_মায়া যতটুকু লেখা আছে কাল দেবোনি।মন ভালো করতে লিখি,আপনাদের রেসপন্স, কমেন্ট সত্যি বলতে আমার মন ভালো রাখার ওষুধ… পাশে থাকবেন হ্যা?🌼]

