#আকাশপ্রিয়া
#পর্ব ৪৭
#dure_dilshad_dua_দুর_এ_দিলশাদ্_দুআা
অস্বাভাবিক ভ্রু কুচকে দাড়িয়ে আছে আকাশ । শিয়া রা রওনা দেবে কিছুক্ষণ এর মধ্যেই। তাকে থাকতে হবে ওখানটায় । বন্ধু দের খোঁজ করতে এদিকটায় এসে যেনো মাথায় বাজ পরলো আকাশের । এতক্ষণ ঘটে যাওয়া সবকিছু সাক্ষী সে । যা শুনলো , এতক্ষণ এখানে যা ঘটলো তা আদৌ ঘটেছে ? নাকি সবটা তার ভ্রম ছিলো বুঝে উঠতে পারছে না যেনো।
আকাশকে আচমকা দেখে থমকালো তিনজনই । চক্ষু ছানাবড়া হলো । শুকনো ঢোক গিলে নিজেদের প্রস্তুত করলো যেনো । রাকিব রেদোয়ান এর মধ্যে খানিকটা ভয় ভয় রেশ থাকলেও রাতুল আজকে বড্ড অন্য রকম। আকাশকে দেখে যেনো স্বস্তিই পেলো সে । রাতুল কিছু বলার আগেই আকাশই এগিয়ে এলো। কঠিন গলায় বললো,
____”রিয়ান কি বলে গেলো ? কাকে চাই ওর ? বুঝলাম না আমি বিষয়টা।”
রাতুল চাওয়াচাওয়ি করলো রাকিব আর রেদোয়ান এর দিকে । স্বাভাবিক গলায় বললো,
____”যদি মিনিট পাঁচেক আগে এসে থাকিস । তবে যা যা শুনেছিস একদম ঠিক শুনেছিস।”
আকাশের হতভম্বতায় ছেয়ে থাকা মুখে আচমকা কাঠিন্য নামে । হাতের মুঠো শক্ত হয়।
____”ইজ হি রিয়েলি টকিং এবাউট প্রিয়া?”
মাথা নাড়লো রাতুল। প্রায় সাথে সাথে একটা আঘাত এসে লাগলো নাকের ওপর । সময় মতো মাথা সরিয়ে নিতে না পারার দরুন ঠোঁট কেটে একসাড় হলো সঙ্গে সঙ্গে। রাকিব,রেদোয়ান ও চমকেছে বইকি। চমক কাটতেই ছুটে এসে আটকালো আকাশকে । রাতুল মোটেই রাগ করলো না আকাশের ওপর । এটা তার প্রাপ্যই ছিলো। আজ রিয়ান যতটা বারাবাড়ি করে গেলো না জানি সামনে আর কি কি করে । আকাশ কে শুরুতে সবটা বলে দিলে হয়তো এরকম নাও হতে পারতো । আকাশ রাগে কাঁপছে। সবটা যেনো মাথায় এসে ঠেকলো তার । এতক্ষণ শোনা সব কথা ছকে বসতে শুরু করলো । রাকিব, রেদোয়ান কেও ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো দূরে । আঙ্গুল তুলে চিৎকার করে উঠলো,
____”সবকটা বেইমান তোরা । সবকটা। কবে থেকে নিজেদের মধ্যে এসব সাজাচ্ছিস হ্যা?”
রাকিব এগিয়ে এলো আকাশকে শান্ত করতে।
____”দোস্ত শোন আগে। আমরা…”
____”কিচ্ছু বলিস না তোরা। আমি অবাক হচ্ছি। আজ আমার অবাক হওয়ার দিন।”
____”বোঝার চেষ্টা কর। আমরা অন্য কোনো কিছু ভেবে…”
____”প্রিয়া আমার । জানতি না তোরা? তারপরও রিয়ানের পাগলামি কে প্রশ্রয় দিয়ে গেছিস কেনো?”
রেদোয়ান ব্যাস্ত ভাবে বন্ধু কে বোঝাতে এগিয়ে এলো । দু হাত তুলে ওকে শান্ত হতে ইশারা করে বললো,
____”আমরা ভেবেছিলাম ওটা ওর নিছক ক্রাশ। পাগলামি। ঠিক হয়ে যাবে দু এক এর মধ্যে। কিন্তু ও যে বিষয়টা এতো সিরিয়াস টানবে বুঝি না আমরা কেউ-ই।”
রাতুল চুপ করে আছে। তার নিজের দায় মনে হচ্ছে সবটা।বন্ধুত্ব একা একা বাঁচাতে চাইলে হয়না। অপর মানুষ টারও ইচ্ছে থাকতে হয়। রিয়ান কখনো চায় নি সেটা। মিথ্যা তারা চেষ্টা করে গেলো। মাঝখান থেকে তাদের তিনজন এর খাটি বন্ধুত্বে ভরসা হারালো আকাশ।
আকাশ রাগ নিয়ন্ত্রণের কঠোর চেষ্টা করে গেলো চোখবুজে । হচ্ছে না, কিছুতেই হচ্ছে না। তারই। বেস্ট ফ্রেন্ড এতো টা নোংরা ভাবে দিনের পর দিন তার ভালোবাসা কে কেড়ে নিতে মরিয়া ! ভাবলেই রাগ মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। আর এই তিন গাধা! এই তিন গাধা সব জেনেও চুপ করে ছিলো!
বিয়ে বাড়ির আত্মীয় সজনের আওয়াজ ভেসে আসছে কানে । শিয়া অয়ন আজকে ফিরবে আবার শিয়াদের বাড়িতে। বের হচ্ছে সকলে। আকাশের মেজো চাচার কণ্ঠস্বর শুনতে পাওয়া গেলো। আকাশকে ডাকা হচ্ছে সম্ভবত। বন্ধু দের দিকে তপ্ত দৃষ্টি দিয়ে গটগট করে প্রস্থান করলো আকাশ।
*
একেএকে গেটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সকলে। প্রিয়ারা বের হচ্ছে চট্টগ্রাম এর উদ্দেশ্যে। তবে এতো এতো মানুষ জনের ভিরে টান পরলো হাতে। প্রিয়া দেখার আগেই রিমি খেয়াল করলো আকাশকে। সবাই অয়ন শিয়াকে নিয়ে ব্যাস্ত। ওদিকে খেয়াল দেয় নি কেউ। সবার থেকে দূরে নিয়ে বাগানের এদিকটায় এসে থামলো আকাশ। আপাতত সবাই অতিথি বিদায়ের ওদিকে থাকায় এদিকটা নিরব। প্রিয়া ছুটে ছুটেই এসেছে একপ্রকার আকাশের সাথে তাল মেলাতে।
_____”আরেহ্ গাড়িতে উঠবে এখন সকলে। আমাকে না দেখতে পেলে খুজবো তো।”
আকাশ একটানে প্রিয়াকে নিজের সাথে মেশালো। মাথাটা চেপে ধরলো নিজের শক্তপোক্ত বুকের বা পাশে। প্রিয়া খেয়াল করলো ঝড় উঠেছে সেখান টায়।
আকাশ ঠান্ডা স্বরে বললো,
_____”রাকা দেখেছে আমার সাথে তুমি। সামলে নেবে কিছুটা সময়।”
প্রিয়ার হাত উঠে এলো আকাশের বুকের ওপর। নরম গলায় বললো,
_____”কি হয়েছে আপনার? সমস্যা বেড়েছে অফিসের?”
_____”উহু।”
_____”তাহলে এতো অস্থির লাগছে কেনো আপনাকে?”
_____”সাবধানে যাবে। গিয়ে কল করবে। রাস্তায় কোনো সমস্যা হলে সঙ্গে সঙ্গে কল করবে কিন্তু। ”
প্রিয়া মাথা ঝাকালো। মাথা তুলতে চাইলো। তবে আকাশ তা হতে দিলো না। চেপে ধরে রাখলো মাথাটা।
_____”অন্য কিছু হয়েছে আপনার?”
_____”কিছু না।”
_____”মিথ্যা বলছেন কেনো?”
_____”প্রিয়া…আমি কিন্তু তোমাকে এক আকাশ সমান ভালোবাসি। এ ভালোবাসার অন্ত নেই। কোনোভাবেই এর পরিমান করে উঠতে পারবে না তুমি। কখনো,কোনো পরিস্থিতিতেই এই ভালোবাসার শক্তিকে দূর্বল ভাববে না। আমি সবসময় থাকবো তোমার সাথে। যেকোনো পরিস্থিতিতে। ভালোবাসায় সবসময় ভালো সময় চলতে থাকবে,মাখোমাখো প্রেমময় হবে সর্বক্ষণ। এমনটা হয়না। ভালো মন্দ,দুঃখ কষ্ট, উত্থান পতন সব মিলিয়ে ভালোবাসা বাঁচিয়ে রাখতে হয় কিন্তু। ”
হঠাৎ এখন এসব কথার মানে বা কারণ বুঝলো না প্রিয়া। তবে অষ্টাদশীর মন স্পষ্ট বলে দিলো তার প্রেমিক পুরুষ এর মনটা ভীষন খারাপ। সম্ভবত তাদেরই কোনো বিষয় নিয়ে। আচ্ছা তখন ওভাবে কথা বলায় অভিমান করেছে কি মানুষ টা! দু হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো আকাশের কোমড়। বুকের মধ্যে মুখ গুজলো।
_____”এই যে এই খানে লুকালাম। বাকি সব আপনি সামলে নেবেন কিন্তু। কেমন? আমার কাছে আপনাকে এক আকাশ সমান ভালোবাসা ছাড়া দেওয়ার তো কিছুই নেই।”
_____”এক আকাশ সমান ভালোবাসাই যথেষ্ট পাখি। কখনো সেই পরিমাণ এর এক পারসেন্ট ও ভুল বুঝে সরে যেতে চেয়ো না। তাহলে মৃত্যু নিশ্চিত আমার।”
*
আনিসুল সাহেব মেয়ে, মেয়ে জামাই কে নিয়ে রওনা হলেন সন্ধ্যার পরপরই । অতিথি রাও একে একে বিদায় হচ্ছে।
আকাশ দের আজকে চট্টগ্রাম ফেরার কথা না থাকলেও রিয়ান এর কর্মকাণ্ডের জের ধরে আকাশ এক সেকেন্ড প্রিয়ার থেকে দূরে থাকতে রাজি নয়।
তাছাড়া বিয়েশাদির ঝক্কিতে কাজ আটকে আছে তাদের। কাল থেকেই সেটা শুরু করে দেওয়ার অর্ডার দিয়ে দিয়েছে আকাশ । অযথা সব বন্ধ রেখে বাড়িতে নাকে তেল দিয়ে ঘুমানোর মানেই হয় না।
অয়ন দের অবশ্য এতসব কিছুি জানানো হয়নি। এমনকি আকাশের যাওয়ার খবর সয়ং প্রিয়াও জানে না । রাকা, তুষি আগেই গিয়েছে শিয়াদের সাথে। ওরা রওনা দেওয়ার কিছুক্ষণ এর মধ্যে বাড়িতে জানিয়ে রওনা দিয়েছ আকাশ। সাথে রাকিব,রাতুল আর রেদোয়ান।
গাড়ি ঢাকা পার হয়েছে সবে। ড্রাইভিং করছে রাকিব। আকাশ মুখচোখ গম্ভীর করে বসা। বন্ধু দের সাথে একটা কথাও বলছে না। সবাই হাজার বার কথা বলানোর চেষ্টা করেছে আকাশকে । ছেলে টা একটা শব্দও উচ্চারণ করেনি । মুখের আদল জানান দিচ্ছে কতটা বিরক্ত সে সবার ওপর । সবথেকে আহত হচ্ছে রাতুল । বাকিদের সাথে যেমন তেমন সে আকাশকে ছাড়া এক মূহুর্ত বোঝে না । বন্ধু কম ভাই বেশি।
আকাশ সবচেয়ে রেগেছে তার ওপর। তাছাড়া আকাশ কখনোই তাদের কাউকে কম-বেশি করে দেখেনি। ভাইয়ের মতোই আগেলেছে বরাবর। রিয়ান এর বিষয় টাতে আকাশ মুখে প্রকাশ না করলেও ভীষন কষ্ট পেয়েছে।
রাতুল পিছনে বসা । পাশে রেদোয়ান। গলা খাঁকারি দিয়ে ডাকলো আকাশকে।
____”আকাশ? বিশ্বাস কর ভাই আমি চেয়েছিলাম ও শুধরে যাক । অযথা ঝামেলা হতো…”
আকাশ জবাব দেয় না । রেদোয়ান ইশারা করে এখন আর কিছু না বলার । তবে রাতুলের সত্যিই অশান্তি লাগছে। এই চক্করে প্রিয়া রা চলে যাওয়ার সময় একটা বার রিমির সাথে কথাও বলতে পারে নি । চলে যাওয়ার সময় কেনো! সারাদিন এও কথা বলার সুযোগ হয়ে ওঠে নি। ওটা নিয়ে আরেক টেনশনে আছে।
আকাশের ফোন বাজছে ক্রমাগত । আকাশ ধরার প্রয়োজন বোধ করছে না । চতুর্থ বারের মতো কল কেটে সঙ্গে সঙ্গে বেজে উঠলো রেদোয়ান এর কল। রেদোয়ান ফোন বের করতেই চমকালো । বিপদ কল করেছে । এই মেয়ে কল করে তাকে আকাশকে না পেলে । অন্য দিকে তুষি ক্ষেপে যায়। কি যে জ্বালা।
____”আকাশ, সৌমি বোধহয় কল করছে তোকে।”
____”করুক।”
রেদোয়ান বোঝে আকাশ কিছুতেই এখন কল তুলবে না। আর এ মেয়ের যা ধৈর্য সহজে কল করা বন্ধও করবে না। বাধ্য হয়ে রিসিভ করলো। ওপাশ থেকে শোনা গেলো নরম কন্ঠ,
____”আকাশ তোমাদের সাথে? “
____”হ্যা।”
____”ওকে একটু দেওয়া যাবে? আরজেন্ট।”
রেদোয়ান ইতস্তত করো খানিকটা। হাসফাস কন্ঠে বলে,
____”আমাকে বলো কি দরকার। আমি জানিয়ে দেবো। অফিসের ঝামেলায় ও একটু ডিসটার্ব আছে।”
সৌমি বেশ খানিকক্ষণ চুপ করে রইলো সম্ভবত টের পেলো আকাশ কিছুতেই এখন কথা বলবে না । কিন্তু আকাশের সাথে কথা বলা এই মূহুর্তে ভীষন দরকার তার।
____”আচ্ছা রাখি । ওর সময় হলে একটু কনটাক্ট করতে বলবে।”
সৌমির আচরনে আজ খানিকটা অবাকই হলো বোধহয় রেদোয়ান । আজকে কথাবার্তায় কোনো অশ্লীল ইঙ্গিত বা টোন নেই । কেমন নরম সরম কন্ঠ। তার মনে হলো মেয়েটার বুঝি সত্যিই দরকার আকাশের কাছে। তবে আকাশকে কথাটা আবার বলার আর সাহস করলো না। এমনিই যে রেগে আছে । আর একবার সৌমির কথা বললে গাড়ি থেকে ফেলে চলেও যেতে পারে।
ফোন রেখে বিছানায় গা এলিয়ে দিলো সৌমি। বিছানার একপাশে প্রেগন্যান্সি কিট সাথে আল্ট্রার কাগজপত্র। সে প্রেগন্যান্ট । মা হতে চলেছে সে । কথাটা আজকে জানলো এমনটা নয় । আন্দাজ করেছিলো আরও দু চারদিন আগেই । সে কারণেই হুট করে সেদিন রাত্রে রিয়ান এর চট্টগ্রাম যাওয়ার খবর পেয়ে সেও চলে গিয়েছিলো। রিয়ান কে সবটা খুলে বলতে । তবে সে সুযোগ হয়ে ওঠেনি। রিয়ান দেয়নি সে সুযোগ। কথাবার্তায় স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছে সে প্রিয়ার প্রতি অবসেসড । সৌমি দু হাতে মুখ ডলে। বাবা দেশের বাইরে গিয়েছে আজ সাতদিন। কবে ফিরবে সেটা সে জানে না । গোটা বাড়িতে গুটি দশেক কাজের লোক আর সে। এমন একটা অবস্থায় এমন একটা বিষয় কাকে জানাবে বুঝে উঠতে পারছে না সে। আজকে মেডিকেল রিপোর্ট গুলো হাতে পেয়েছে। সন্দেহ একদম ঠিক। দু মাসের প্রেগন্যান্ট সে। সময় থমকে গেছে তার সমানে। বিয়ে, সংসার, সন্তান এসবে বিশ্বাস না করা মেয়েটা আচমকা মা হয়ে বসে আছে ! এ অনূভুতি অন্যরকম। আশ্চর্যের বিষয় সন্তান টাকে কিছু করতে তার মন একদম সায় দিচ্ছে না । উল্টো ওর অস্তিত্ব টের পেতেই কেমন সব পরিবর্তন লাগছে ওর। ক্লাব,মদ, ঔদ্ধত্যপনা সব অসহ্য লাগছে।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে সৌমি । ভালোবাসা কি এটা তালাশ করতে করতে আজকে টের পাচ্ছে ভালোবাসা আদতে কি। সব ছেড়ে দিতে পারবে ,নিজের জীবন থেকে সব কিছুর অস্তিত্ব মুছে ফেলতে পারবে। কিন্তু এই বাচ্চাটার নয়। দু দিন হলো জানলো এরই মধ্যে কিভাবে এতো মায়া এসে ভর করলো জানা নেই তার।
কি করবে সাতপাঁচ ভেবে না পেয়ে আল্ট্রার ছবি তুলে পাঠিয়ে দিলো রেদোয়ান এর নাম্বার এ। ছোট্টো করে লিখলো,
____”আকাশকে ছবি টা দেখাও। আমি প্রেগন্যান্ট। রিয়ানের বাচ্চার মা হতে যাচ্ছি আমি।”
সবেই বোতল থেকে পানি মুখে নিয়েছে রেদোয়ান। টুং টাং শব্দে মেসেজ বের করতেই মুখের সবটুকু পানি গিয়ে ভিজিয়ে দিলো রাতুলের প্যান্টের ওপর। রাতুল মুখ বাকিয়ে তাকালো রেদোয়ান এর দিকে।
____”ইস্টুপিট একটা। এটা একটা কাজ করলি? আমার নতুন স্যুট টা। অয়ন ভাইয়ের বিয়ের জন্য বানিয়েছিলাম। দিলি তো মুখের পানি দিয়ে নষ্ট করে।”
রেদোয়ান টিপটিপ করে ফেলছে চোখের পাতা। হা হয়ে যাওয়া মুখ নিয়ে রাতুলের দিকেই তাকানো। একহাতে পানির বোতল অন্য হাতে ফোন। রাতুল আবার কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই ফোনের মেসেজ টা ধরলো রাতুল এর দিকে। গাড়ির ঝাঁকিতে রেদোয়ান এর হাত থেকে ভালোমতো দেখা যাচ্ছে না লেখাগুলো। কিসের একটা ছবি! ফোনটা বিরক্ত মুখে হাতে নিয়ে ভালোমতো খেয়াল করতেই। চিৎকার করো উঠলো।
____”এটা কিইই ভাই?”
রেদোয়ান এর দিকে তাকাতেই দেখলো রেদোয়ান তার দিকে হতাশ চোখে তাকিয়ে। সামনে রাকিব লুকিং গ্লাসে বারবার দেখছে ওদের। ড্রাইভিং করতে গিয়ে কি মিস করে ফেললো সেটা ভাবছে। তবে আকাশের মতিগতি দেখে ভয়ে উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস ও করতে পারছে না। আকাশ অবশ্য নির্বিকার। পিছনের কোনো কিছুতে ওর মন নেই এই মূহুর্তে।
রাতুল আবার চোখ ডলে ভালো করে দেখলো মেসেজ টা। একটু পরেই টুংটাং শব্দে আরেকটা ছবি আসলো। ডিএনএ রিপোর্ট। রাতুল মৃদু আর্তনাদ করে ডাকলো আকাশকে।
____”রাগ পরে করবি দোস্ত। আগে এটা দেখ।”
আকাশ তাকালো না। রেদোয়ান হাত বাড়িয়ে ফোন টা ধরতেই সরু চোখো তাকালো আকাশ। থমকালো সেও। সত্যিই থমকালো। হাতে নিলো ফোন টা। গম্ভীর হয়ে দেখলো। রাকিব এবার থাকতে না পেরে বলেই ফেললো,
____”কি দেখাচ্ছিস না তোরা আমাকে?”
রাতুল একপ্রকার কাটকাট কন্ঠে বললো,
____”সৌমি প্রেগন্যান্ট। রিয়ান বাচ্চার বাপ।”
চমকানোর মাত্রা এতো বেশি ছিলো যে শব্দ করে ব্রেক করলো গাড়ি টা। চিৎকার করে উঠলো সেও। আকাশ একে একে সব চেক করলো। নিজের ফোনে ছবিগুলো ট্রান্সফার করে পাঠালো কাউকে। মিনিট দশেক এর মাথায় হসপিটালে থেকে খবর এলো রিপোর্ট এর সত্যতা শতভাগ। আঙুলে কপাল চেপে ধরলো আকাশ।
____”রিয়ান কে কল কর। খোঁজ কর ও কোথায়?”
জবাব টা রাতুলই দিলো। মিনমিন গলায় বললো,
____”চট্টগ্রাম রওনা দিয়েছে। হাসান বললো।”
আকাশ এর অসহ্য লাগছে এখন। রিয়ান এর ওপর যেটুকু রাগ কম ছিলো তার শতভাগ পূর্ণ হলো এবারে।
*
ঘড়ির কাটায় রাত একটা। আকাশ রা কটেজে এসে পৌছেছে কিছুক্ষন আগেই। আকাশের মা খাবার দিয়ে দিয়েছে, সেসব এ ডিনার করে নিয়েছে সকলে। রিয়ান কটেজে ফেরেনি এখনো। নিচে ডাইনিং এই বসে আছে খাবার শেষ করে সকলে।
আরও আধঘন্টার মাথায় ফিরলো রিয়ান। খোলা দরজা পেয়েও তেমন অবাক হলো না। ভিতরে ঢুকেই সকলে দেখলো একসাথে।
আকাশের অগ্নিদৃষ্টিতে নজর মিলিয়ে এগিয়ে এলো।
আজকে কোনোরকম এর অভিনয়ই করলো না। উল্টো বাঁকা কন্ঠে বললো,
____”আমাকে খুঁজতে এতো জলদি এসে পরেছিস বুঝি?”
আকাশ উঠে দাড়ালো শব্দ করে চেয়ার পিছিয়ে। বলা বাহুল্য রাকিব,রাতুল,রেদোয়ান ও ভয়ার্ত মুখে তাকিয়ে। আকাশ এর রাগ সম্পর্কে তাদের ধারনা আছে। সহজে না রাগলেও যখন রাগবে কাউকে মানবে না। আর এটা তো মানার মতো বিষয় নয়ও।
রিয়ান এর কথা উত্তরে বাঁকা হাসলো আকাশ।
____”আমার খেয়ে আমার পিছনেই ছুড়ি মারতে চাস। সাহস আছে বলতে হবে।”
____”পিছনে কোথায় ছুড়ি মারলাম! সামনে থেকেই মারবো। প্রিপারেশন নিচ্ছিলাম। তাছাড়া তোর খেয়ে মানে কি বোঝাতে চাচ্ছিস? পরিশ্রম করি তার বিনিময়ে কামাই আমি। তুই বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াস না।”
শব্দ করে হাসলো আকাশ। বাকি তিনজন রিয়ান এর দিকে রাগে রক্তিম চোখে তাকিয়ে। কতটা বেইমান হলো মানুষ কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে না। আকাশ দু কদম এগিয়ে বুকে আড়াআড়ি হাত ভাজ করে বললো,
____”একটা সময় কিন্তু তোকে বসিয়েই খাওয়াতাম।”
____’আকাশ এহনাজ চৌধুরী নিজের উপকার এর খোটাও দেয়?”
____”তোর মতো নেমকহারাম কে দেয়।”
চোখ উল্টালো রিয়ান। গায়ে লাগলো না কিছু বোধহয়।
____”সব কি শুনেছিস তোর সাগরেদ দের থেকে। নাকি আমাকে রিপিট করতে হবে?”
____”তোর মুখে শুনতে চাই আমি।”
রিয়ান কনফিডেন্স এর সাথে বললো,
____”আমি রিজাইন করছি কাল।”
চেয়ারের পাশে রাখা একটা হকিস্টিক হাতে নিলো আকাশ। সেটা ডাইনিং টেবিলেী ওপর রাখতে রাখতে বললো,
____”এতগুলো টাকা পকেটে আছে। গরম গরম বিজনেস আইডিয়া আসবেই তো। তা ওটা বাংলাদেশ ছিলো না। লন্ডন ছিলো। তোর একবারও মনে হলো না? ওখান থেকে টাকা পাচার বাংলাদেশ এর মতো এতো ইজি নয়? তার ওপর সেটা যদি হয় আকাশ এহনাজ এর কোম্পানি! “
এতক্ষণ এর কনফিডেন্স এ চিড় ধরলো বুঝি রিয়ান এর। মুখ রক্তশূন্য দেখালো এ যাত্রায়। রাকিব, রাতুল রাও ভ্রু কুচকে ফেলেছে। সবাইকে ক্লিয়ার করলো আকাশ নিজেই। ফোন বের করে রিয়ান আর লন্ডন এর অফিসের ম্যানেজার এর কথোপকথন চালিয়ে দিলো।
থমকালো সকলে। সকল টাকার গড়মিল সয়ং রিয়ান করেছে। হাতের মুঠো শক্ত হয়ে এলো বাকিদেরও। রাকিব হাত মুঠো করে এগিয়ে যেতেই হাত তুলে তাকে থামালো আকাশ।
রিয়ানের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে প্রশ্ন করলো,
____”উত্তর আছে তোর কাছে?”
____”এখন যা খুশি ব্লেম করবি! আশ্চর্য! “
আকাশ দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
____”টাকা টা তোকে দান করলাম যাহ্। টাকার গড়মিল কোন সাহসে করলি তার জবাব আমার দরকার নাই। ওই কয়টা টাকা আমার হাতের ময়লা। খালি উতলা হয়েছিলাম কেন হারামি কাজ টা করেছে আমারই নাকের ডগা থেকে। জানলাম, হারামি নিজ চোখে দেখলাম। ওটা বাদ দে এখন। এবার জবাব দে আমার কলিজার দিকে হাত বাড়ানোর সাহস কোথায় পেলি তুই? আকাশ এহনাজ এর ব্যাক্তিগত নারীর দিকে চোখ তুলে নোংরা দৃষ্টি তে তাকানোর কলিজা তোর হলো কি করে?”
প্রিয়ার কথা বলছে বুঝতে পেরেই গা জ্বলা ভঙ্গিতে হেসে উঠলো রিয়ান। ঘাড় বাকিয়ে রাতুল দের দিকে তাকালো। ওর ধারনা রাতুলরা জানিয়েছে আকাশকে।
____”আই লাভড প্রিয়া।”
কথাটা বলার সাথে সাথে হকিস্টিক এর বারি পরলো রিয়ানের বাহুতে। পরপর কয়েকটা। হকিস্টিক এর আঘাতে ছিটকে পরলো রিয়ান। কেউ এগোলো না আকাশকে থামাতে। আকাশ অগ্নিমূর্তি ধারন করেছে। মেঝে থেকে মুখ তুলে রিয়ান ঠোঁটের কাটা থেকে রক্ত টুকু মুছে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
____”আমি কোনো কিছুর বিনিময়ে প্রিয়া কে তোর হতে দেবো না। আজীবন তোর জন্য সব হারিয়েছি। ওকে আমার চাই।”
এবার হকিস্টিক এর আঘাত পরলো রিয়ানের পেটে। উঠে দাড়ানোর আগেই বাকিয়ে গেলো শরীর। আকাশ গমগমে কন্ঠে চিৎকার করে উঠলো,
____”সৌমি ইজ প্রেগন্যান্ট বাস্টার্ড। তোর বাচ্চা ওর গর্ভে। আর তুই তোর ওই নোংরা মুখে প্রিয়ার নাম নিচ্ছিস? সি ইজ মাইন। প্রিয়া ইজ ওনলি বিলংস টু আকাশ এহনাজ চৌধুরী। আর কেউ ওর কথা কল্পনা করলেও খুন হবে সে।”
আকাশের বলা কথাগুলো কর্ণকুহরে পৌছুনো মাত্র থমকালো রিয়ান। প্রতিটা শব্দ মাথায় এসে ঘুরিয়ে পেচিয়ে গেলো। অবিশ্বাস এর কন্ঠে কোনোমতো বললো,
____ “কে প্রেগ্ন্যন্যান্ট?”
আকাশ হকিস্টিক তুললো এবার ওর মুখে আঘাত করার জন্য। তবে করলো না। চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,
____”কু*ত্তার বাচ্চা। যার সাথে শুয়েছিস দিনের পর দিন। আজ তাকে চিনতে পারছিস না?”
রিয়ান জবাব দিতে পারলো না। শুয়েছে সে অনেক মেয়ের সাথেই। হতবিহ্বলতায় এলোমেলো ঠেকলো সবকিছু।
____”সৌমি ইজ প্রেগন্যান্ট। তুই বাচ্চার বাপ।”
এতক্ষণ এ সবটা পরিষ্কার হলো রিয়ান এর কাছে। হুড়মুড়িয়ে উঠে দাড়ালো। হাতের উল্টো পিঠে মুছলো ঠোঁট। একে একে তাকালো সকলের দিকে। সবাই ঘৃনা মাখা চোখে তাকানো ওর দিকে। তবে রিয়ান এর মধ্যে কোনো ভাবাবেগ সম্ভবত উদয় হলো না। শত শত মেয়ের কাছে গিয়েছে সে। সৌমি কোনো স্পেসিফিক কেউ নয়। নাথিং। সৌমির গর্ভে তার সন্তান এটায় তার করনীয় কি! তারই যে সন্তান তার গ্যারান্টি কি। ওই ধরনের মেয়েকে এক পয়সার বিশ্বাস আছে! প্রিয়াকে ছাড়া সে ভাবতে পারবে না আর কিছু। এতদিন যেমন তেমন,এখন জানাজানি যখন হয়েই গেছে হার মানার প্রশ্নই আসে না। রিয়ান আকাশের দিকে তাকিয়ে পরমুহূর্তেই চেঁচিয়ে উঠলো,
____ “ আমি প্রিয়া কে ভালোবাসি। দরকার হলে খুন করবো সৌমি কে আমি। তবুও প্রিয়া কে আমার লাগবে।”
আকাশ তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো এবারে। হাতের হকিস্টিক টা ঘোরাতে ঘোরাতে বললো,
____”আর দরকার হলে আমি তোকে খুন করবো। তবুও প্রিয়া আমার। ওর নাম মুখেও আনবি না তুই।”
চলবে ইনশাআল্লাহ 🌷
[ রেসপন্স করবেন কেমন…সামনে কিছু একটা হতে চলেছে কিন্তু 🥹]

