রোদ্দুরের_ছেঁড়া_মানচিত্র /সূচনা_পর্ব

0
44

শ্বশুর বাড়িতে প্রথম পা রাখার মুহূর্তেই শাশুড়ি মা তীব্র চিৎকারে তিক্ত কণ্ঠে বললেন,
“এই মেয়ে যেন আমার ঘরে প্রবেশের সাহস না করে। আমি এই মেয়েকে কোনোভাবেই আমার ঘরের পুত্রবধূ হিসেবে মেনে নেব না!”
​নতুন বউ হয়ে আসা তৃণা নামক মেয়েটা মাথায় ঘোমটা টেনে দরজার বাইরে থমকে নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইলো। শাশুড়ির মুখ থেকে এমন কটূক্তি শুনে যেকোনো মেয়েই হয়তো বিস্মিত হতো, কিন্তু সে হলো না। কারণ, এমনটাই যে ঘটবে, তা আগে থেকেই প্রত্যাশিত ছিল। ঠায় দাঁড়িয়ে রইল, আর দু’চোখে জল ভরে আসতে লাগল।
পাশে দাঁড়ানো স্বামীটির দিকে তাকালো। তাঁর মুখের দিকে সরাসরি তাকাতে সাহস পেল না তৃণা,শুধু দেখল, শেরওয়ানি পরিহিত লোকটি নিবিষ্ট মনে কাউকে মেসেজ পাঠাচ্ছে।​ লোকটির শরীরে অস্থিরতা বিরাজ করছে তা স্পষ্ট। বুঝতে পারল লোকটি নিজের স্ত্রীর অপমানে চিন্তিত না বরং অন্য কোনো কারণে। তবুও ভেবেছিল তিনি নিজ স্ত্রীর অপমানে অন্ততপক্ষে কিছু বলবে।কিন্তু তৃণার ধারণা ভুল প্রামানিত করে লোকটি তড়িঘড়ি কাউকে ফোন করতে করতেই বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেলেন।তৃণাকে বাইরে একা দাঁড় করিয়েই, একবারের জন্যও পেছন ফিরে তাকালো না।হৃদয়টা আরও শূন্য ও চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল।

​শাশুড়ি মা আরও সামনে এগিয়ে এলেন, ক্রোধে কপাল কুঁচকে, তৃণার গালে আঙুল দিয়ে শক্ত করে চাপ দিয়ে বললেন,
“কী রে দুশ্চরিত্রা, শেষ পর্যন্ত আমার ঘরে ঢোকার জন্য আমার ছেলেটাকে বিয়ে করলি? যা, এই মুহূর্তে আমার চৌকাঠ থেকে বিদায় হ!”

​তৃণা শুধু চিৎকার করে কেঁদে উঠতে পারলো না। এত এত মানুষ আর সকলের দৃষ্টি আজ তৃণার এই অপমানের সাক্ষী!এবার একজন মহিলা তৃণার শাশুড়ীকে টেনে নিয়ে বোঝানোর স্বরে বলল,
​“আপা এসব বাইরে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে বললে তো আমাদের পরিবারের মানসম্মান যাবে। যা হওয়ার হয়েছে, আগে বউকে ঘরে তুলি, তারপর না হয় সব কথা হবে।”

​মির্জা পরিবারের নতুন বধূর এই অপমানের দৃশ্য এলাকার সবাই খুব মজা নিয়ে দেখছে। এই সময় দুজন মহিলা এগিয়ে এসে তৃণাকে ভেতরে নিয়ে গেলেন। এই দুজনকে তৃণা চিনে একজন চাচি শাশুড়ি আর অন্যজন কাকি শাশুড়ি। মির্জা পরিবার বিরাট বড়। বিয়ের আগে শুধু তাদের নামডাক শুনেছিলো।
তৃণাকে ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখল বিশাল বড় একটি ড্রয়িংরুম। বাড়িতে অনেক মানুষ, যৌথ পরিবার বলে কথা।কিন্তু কারো মুখে নতুন বধূর জন্য কোনো উচ্ছাস লক্ষ্য করা গেল না।
★★★
​আজ বিয়ের প্রথম রাত।একজন মেয়ে তৃণাকে একটা ঘরে বসিয়ে দিয়ে গেল।ওই মেয়েটা হয়তো তৃণার ভাসুরের স্ত্রী তার ঠিক জানা নেই।শুধু যাওয়ার আগে বলে গিয়েছে,
“আজ রাতে যাই হোক না কেন মুখ বুঁজে সহ্য করে নিও বোন।”

এই কক্ষটা বিশাল বড়।আধুনিক আসবাপত্র দিয়ে সাজানো।তৃণা এখনো তার স্বামীর মুখ দেখিনি। ঘরে একটি ছবিও নেই।শুধু পুরুষটির নামটাই তার জানা।পুরুষটির নাম বিয়ে পড়ানোর সময় কাজীর মুখ থেকে শুনেছিলো #আরিয়ান_মির্জা।

এবার তৃণার পুরো পরিচয়টা দেওয়া যাক।মেয়েটির নাম #তৃণা_হাওলাদার। হাওলাদার বাড়ির বড় মেয়ে। বড় মেয়ে হলেও কখনো বাড়ির মেয়ের মতো মর্যাদা পাইনি। মেয়েটির সাথে সব সময় কাজের মেয়ের মতোই ব্যবহার করা হতো। মা না থাকলে তো তাই হয়।
​বাবা উমর হাওলাদার, একজন ডক্টর।মা মারা যাওয়ার পর বাবা তৃণার কথা চিন্তা করে দ্বিতীয় বিয়ে করলেন, তখন তৃণার বয়স ছিল এগারো বছর। দ্বিতীয় মা (সৎ মা) তৃণার সাথে সব সময়ই খারাপ ব্যবহার করতেন। তৃণার সৎ মায়ের আগের পক্ষের স্বামীর ঘরে একটি মেয়েও ছিল, যার বয়স তখন চৌদ্দ বছর।
বেশ কিছুদিন খুব আদর করতেন কিন্তু কিছুদিন পরই মায়ের আসল রুপ বেরিয়ে গেল।​তখন থেকেই তৃণার জীবনের মোড় ঘুরে যায়।মায়ের অত্যাচারের সাথে বড় বোন রিনির থেকেও অত্যাচারিত হতে হতো। বাবা যখন বাসায় থাকতেন না, তখন সব সময় তৃণার সৎ মা তৃণার ওপর অত্যাচার করতেন এবং বাড়ির সব কাজ ছোট মেয়েটিকে দিয়েই করাতেন।তৃণা সব কিছু সহ্য করে নিলো।প্রথম প্রথম বাবার সাথে সব কিছু বলতো।বাবা রেগে মায়ের সাথে এই বিষয়ে ঝগড়া করত কিন্তু মাকে বুঝাতে বাবা কখনো সক্ষম হয়নি।যখন থেকে বুঝ হলো তখন বাবা কেও এসব বিষয়ে বলা ছেড়ে দিল তৃণা।
​এভাবেই তৃণার জীবন কেটেছে। বাড়িতে বসেই টেনেটুনে পড়াশোনা করে কলেজ পাশ করলো মেয়েটি। এরপর আর পড়তে দেওয়া হলো না।
পড়াশুনা করার ভীষণ ইচ্ছে ছিল কিন্তু কথায় আছে না সবার কপালে সবকিছু থাকে না।

​ঘড়ির দিকে তাকালো, রাত প্রায় সাড়ে বারোটা বাজে। ভীষণ ঘুমও পেয়ে গেছে।তৃণা বিছানায় গা এলিয়ে দিলো। চোখ লেগে আসার আগেই হঠাৎ দরজা খোলার আওয়াজ হলো।মেয়েটির ভেতরটা থরথর করে কেঁপে উঠল।
​দরজা দিয়ে প্রবেশ করলেন, লম্বা চওড়া পুরুষ। বুঝতে পারলো এটাই হয়তো তার স্বামী। এক কথায় বলা যায় সুদর্শন পুরুষ। পুরুষটির তৃণার গায়ের রংয়ের চেয়ে ওনার গায়ের রং ফর্সা। মুখে কুচকুচ হালকা চাপ দাঁড়ি।
​তবে পুরুষটিকে দেখে একদমই স্বাভাবিক লাগছে না। আঁকাবাঁকা পা ফেলে সামনে এগিয়ে আসছেন। লোকটি হয়তো মদ্যপান করেছেন। তৃণার বুক দুরুদুরু করে কাঁপছে, ভেতরে ভয়টা ক্রমশ বেড়েই চলেছে।

​লোকটি একদম তৃণার সামনে এসে দাঁড়ালো। তৃণা ভয়ে পেছনে সরে গেল।লোকটি তৃণার দিকে বেশ কিছুক্ষন অদ্ভুত নয়নে তাকিয়ে রইল।পা থেকে মাথ পর্যন্ত পরখ করে বলল,
​“তুই তাহলে আমার বউ?”

​তৃণা কথা বলতে পারল না, ভয়ার্ত চেহারা নিয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলো। লোকটির চোখ অস্বাভাবিক রকম লাল।
​“তুই এখানে কী করছিস? যা, বের হ আমার রুম থেকে!”
​লোকটি চিৎকার করে কথাটা বললেন।

​তৃণা কাঁপা কন্ঠে তোতলিয়ে বলল,
“কো…কোথায় যাব আমি?”

​“তুই জাহান্নামে যা! তোকে যেন আমার ঘরে না দেখি।”

তৃণা গেল না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। তৃণাও দেখতে চায়, তার জীবনে আর কত খারাপ দিন আসে। তৃণা বুকে সাহস সঞ্চয় করে বলল,
​“আপনি আমার সাথে এভাবে কথা বলতে পারেন না। আমি আপনার বিবাহিত স্ত্রী।”

​লোকটি চিৎকার করে দাঁত কিঁচিয়ে বলল,
​“ মাই ফুট! আই সেড, গেট আউট অফ মাই রুম!”

লোকটির চিৎকার কেঁপে উঠল তৃণার পুরো শরীর। তৃণা শুধু অসহায় দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলো। সকল মেয়েদের বিয়ে নিয়ে কত স্বপ্ন থাকে। আর তৃণা ভেবে পাচ্ছে না তার সাথে এসব কী ঘটছে!

তৃণাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে স্বামী নামক লোকটি রাগে তৃণাকে জোরে ধাক্কা দিল।মেয়েটি গিয়ে পড়লো শো-পিসটার ওপর। মাথায় প্রচণ্ড আঘাত লাগলো। কপালে হাত দিয়ে বুঝতে পারলো কপাল কেটে গেছে।মেয়েটি কুঁকড়ে কেঁদে উঠলো।
​লোকটির আর সাড়াশব্দ না পেয়ে তৃণা পেছন ফিরে তাকালো। দেখলো, লোকটি বিছানায় উপুড় হয়ে পড়ে আছে, হয়তো মাতাল থাকার কারণে ঘুমিয়ে গেছেন।

তৃণা লোকটির পায়ের জুতো জোড়া খুলে দিতে চাইলো,কিন্তু লোকটি পা সরিয়ে নিলেন। হয়তো লোকটি সম্পূর্ণ অচেতন হননি। আরিয়ান তৃণার দিকে মিটমিট করে তাকালেন এবং বললেন,
​“দাঁড়িয়ে আছিস কেন? যা, গিয়ে ঘুমা।”

​বলেই একটি বালিশ তৃণার দিকে ছুঁড়ে মারলেন।
​তৃণা সেভাবেই দাঁড়িয়ে রইলো,বালিশটা তুলে নিলো তৃণা। চোখের সামনে নিজের স্বপ্নগুলো ভেঙে যেতে দেখার চেয়ে বড় কষ্ট পৃথিবীতে আর নেই। কত স্বপ্ন ছিল কোনো একদিন কেউ এসে মেয়েটিকে এই কষ্ট থেকে মুক্তি দেবে। কিন্তু এই মেয়েটির জীবনে আবারও কষ্ট এসে ভিড় করল।
​এত কিছুর মাঝে হঠাৎ মনে পড়ে গেল তৌহিদের কথা। ছেলেটা এখন কী করছে? তৌহিদ ছিল তৃণার প্রথম ভালোবাসা। সে ছেলেটাকেই নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলো, একটি সুখের সংসার গড়বে, কিন্তু তা আর হলো না।

চলুন, আসল ঘটনাটা জেনে আসা যাক…

​তৃণার সৎ বোন রিনির আজ এই বাড়িতে আরিয়ান মির্জার স্ত্রী হয়ে আসার কথা ছিল।
​তৃণার বোন রিনি আর আরিয়ানের বিয়েটা ঠিক হয় পারিবারিকভাবেই। আরিয়ানের বাবা আর তৃণার বাবা স্কুলজীবনের বন্ধু ছিলেন। সেই হিসেবেই তাঁদের স্বপ্ন ছিল ছেলেমেয়েদের বিয়ে দিয়ে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে অটুট রাখবেন। কিন্তু বিপত্তি ঘটল তখন, যখন বর চলে এলেন অথচ রিনিকে নিজের ঘরে খুঁজে পাওয়া গেল না। পুরো বাড়ি খোঁজা হলো, কিন্তু কোথাও রিনি নেই। এরপর রিনির পড়ার টেবিল থেকে একটি চিঠি পাওয়া যায়, যেখানে লেখা ছিল সে তার বয়ফ্রেন্ডের সাথে পালিয়ে গেছে।

​বাবা তাঁর মানসম্মান বাঁচাতে আরিয়ান মির্জার সাথে তৃণার বিবাহ দিলেন। একবারও কেউ ভাবলো না, এই বিয়েতে তৃণা রাজি আছি কি না। এই বিয়ে যে সুখকর হবে না, সেটা তৃণা জানে।
​আজীবনচক্র কেন এতটা ভয়াবহ হলো, তা তৃণার জানা নেই। জীবনে তো কখনোই সুখের মুখ দেখতে পারেনি। ভেবেছিলো একটা সুন্দর জীবন হবে, কিন্তু এখন বাঘের খাঁচা থেকে পালিয়ে সিংহের খাঁচার মুখে পড়ে গেলো মেয়েটি।

​বালিশটা ফ্লোরে মাথার নিচে রেখে শুয়ে পড়লো তৃণা।। পরনে তখনও সেই বেনারসি শাড়ি। কেউ বলেনি শাড়িটা পাল্টে নিতে। বলেনি বললে ভুল হবে, তৃণার শাশুড়ি কাউকে তৃণার ধারে কাছে ঘেঁষতে দেননি।
​কখন ঘুমিয়ে গেল, টের পেল না।

​ঘুম ভাঙল অনেকক্ষণ পর। কয়টা বাজে, তা আন্দাজ করতে পারল না। উঠে বসল তৃণা, ভীষণ খিদে পেয়েছে। সামনের সবকিছু কেমন যেন ঝাপসা ঠেকছে তৃণার কাছে। বিয়ের আগের দিন রাতে শেষ খেয়েছিলো মেয়েটি। এই বাড়িতে আসার পরও আবেগের তোড়ে খিদেটা ঠিক টের পায়নি। এই বাড়ির এতগুলো মানুষ অথচ কেউ একফোঁটা খাবারও খেতে দিল না। আর এখন ঘুম থেকে ওঠার কারণে খিদে আরও বেড়ে গেছে। পেটেও তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করলো।

​উঠে গিয়ে টেবিল থেকে জল পান করলো। কিন্তু জল খেয়েই আরও বিপত্তি হলো নাড়িভুঁড়ি যেন এখুনি উল্টে বেরিয়ে আসবে। দৌড়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল তৃণা, কিছুক্ষণ বমি করলো, এখন শরীরে এক ফোঁটা শক্তিও অবশিষ্ট নেই। ওয়াশরুমের ফ্লোরেই অবসন্ন হয়ে বসে পড়লো। তৃণার কাছে মনে হচ্ছে, এখুনি বুঝি দুনিয়া ছেড়ে চলে যাবে।

​তৃণার জন্মদাত্রী মায়ের মুখটা বারবার চোখের সামনে ভাসছে। কিন্তু তার মা কাছে এসে একবার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন না। তৃণার ইচ্ছে করছে মায়ের কোলে মাথা রেখে একটা গভীর ঘুম দিতে, কিন্তু তা আর হচ্ছে না।
তৃণা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো। দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসল। এই ঘরটা দ্বিতীয় তলায়। নিচতলায় ড্রয়িংরুমে মৃদু আলো।তৃণা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেলো। রান্নাঘরে ঢুকে চারদিক হাতড়ে খুঁজতে লাগলো খাবার। এখন না খাবার খেলে বাঁচব বলে তো মনে হয় না।

​ফ্রিজ খুলে দেখলো ভেতরে অনেক খাবার। অনুষ্ঠান উপলক্ষে হয়তো অনেক কিছু রান্না করা হয়েছিল। তৃণার মুখে এক চিলতে হাসি ফুটল। খাবার বের করে ফ্লোরে বসে খেতে শুরু করলো। আহা! কী শান্তি লাগছে খাবার খেয়ে!
​হঠাৎ টের পেলো,সামনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। তৃণার হাত থেমে গেল। আন্দাজ করতে পারলো, এতক্ষণ যে খাবারগুলো খেলো, সেটা হয়তো আর হজম করতে পারবে না। ভয়ে মেয়েটির গলা শুকিয়ে আসলো। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে লাগলো।

#চলবে…
#সূচনা_পর্ব
গল্প #রোদ্দুরের_ছেঁড়া_মানচিত্র
কলমে #নিলুফা_নাজমিন_নীলা
(প্রথম পর্ব কেমন হলো জানাতে ভুলবেন না।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here