রোদ্দুরের_ছেঁড়া_মানচিত্র #পর্ব_৫৪ (প্রথমাংশ)

0
32

#রোদ্দুরের_ছেঁড়া_মানচিত্র
#পর্ব_৫৪ (প্রথমাংশ)
#নিলুফা_নাজমিন_নীলা

★★★
আজ মির্জা বাড়ি আলোকসজ্জায় ঝলমল করছে। সদর দরজা থেকে ড্রয়িংরুম পর্যন্ত টাটকা কাঁচা ফুলের সুবাসে ম ম করছে চারপাশ। সময়ের স্বল্পতায় নৌশির বিয়ের আয়োজনটা বাড়িতেই করা হয়েছে, কিন্তু আভিজাত্যের কোনো কমতি নেই। মেহমানদের আনাগোনা আর হইহুল্লোড়ে মুখরিত পুরো বাড়ি। অথচ এই উৎসবের মধ্যমণি নৌশি নিজের ঘরে পাথরের মূর্তির মতো বসে আছে। তাকে সাজানো হচ্ছে কনের সাজে, কিন্তু তার চোখের কোণে কোনো আভা নেই যেন এক প্রাণহীন পুতুল।
​আজ সকালেই ঘটে গিয়েছিল এক অদ্ভুত কাণ্ড।
বাড়ির সবাই যখন ব্যস্ত, তখন আদনান ঝড়ের বেগে নৌশির ঘরে ঢুকে পড়েছিল। তার উসকোখুসকো চুল আর রক্তাভ চোখ দেখে নৌশি শিউরে উঠেছিল। সে কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে ধমকের সুরে বলেছিল,
“কী হয়েছে তোর? এভাবে অনুমতি ছাড়া পাগলের মতো রুমে ঢুকলি কেন?”

​আদনান কোনো কথা না বাড়িয়ে ঝাপটে ধরল নৌশির দুহাত। তার স্পর্শে যেন আগুনের তাপ ছিল। সে মরিয়া হয়ে বলল,
“এখনো সময় আছে নৌশি, প্লিজ এই বিয়েটা করিস না! এখনো সব ঠিক করা সম্ভব।”

​নৌশি নিজের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা না করেই শীতল গলায় প্রশ্ন করল,
“কেন করব না?”

​আদনান এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল,
“কথায় কথায় কেন এমন করিস? কেন বুঝিস না যে আমি তোকে ভালোবাসি? তোকে ছাড়া আমার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়!”

​নৌশি থমকে গেল। তার হৃদপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়েছে। যান্ত্রিক গলায় অস্ফুট স্বরে আবারও বলল,
“কী বললি? আর একবার বল!”

​আদনান এবার কান্নায় ভেঙে পড়ল। নৌশির চোখের দিকে তাকিয়ে আর্তনাদ করে বলল,
“ভালোবাসি তোকে! নিজের চেয়েও বেশি, এই মহাবিশ্বের চেয়েও বেশি। তুই কেন বুঝতে চাসনি এতদিন?”

​নৌশির দুই চোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ল তার সাজানো গালে। আদনান এবার হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে নৌশির পায়ের কাছে বসে পড়ল। তার হাতদুটো শক্ত করে ধরে পাগলের মতো বলতে লাগল,
​“এই নাদানের বাচ্চা, চল না আমরা এখান থেকে অনেক দূরে কোথাও পালিয়ে যাই! আমি তোকে ছাড়া বাঁচতে পারব না রে। আমার সত্যি পাগল পাগল লাগছে। তুই অন্য কারও হয়ে যাবি এটা ভাবলেই আমার কলিজা ছিঁড়ে যাচ্ছে!”

আদনানের কথায় নৌশি হেঁসে দিল।নৌশির সেই হাসি আদনানের বুকটা যেন ধারালো ছুরি দিয়ে চিরে দিল। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না, ছিল একরাশ অবজ্ঞা আর হাহাকার। নৌশি রক্তাভ চোখে তাকিয়ে ধরা গলায় বলল,
​“একই ছাদের নিচে ১৯টা বছর কাটিয়ে দিলি আদনান, অথচ নিজের মনের কথাটুকু বলতে পারিসনি? আজ যখন আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর আমি অন্য কারোর হয়ে যাব, তখন তুই এসে বলছিস পালিয়ে যেতে? তুই আমাকে নাদান ডাকিস, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে নাদান তো তুই! ভালো থাকিস আদনান। এই মুহূর্তে বাড়ির মান-সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে পালিয়ে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। এক জীবনে না হয় অপূর্ণতা নিয়েই বাঁচলাম। চিন্তা করিস না, সেই অচেনা মানুষটার সাথে আমি মানিয়ে নিতে পারব। আর যদি কোনোদিন দেখি আর পারছি না, তখন না হয় এই পৃথিবী থেকেই বিদায় নেব।”

​নৌশির মুখে মৃত্যুর কথা শুনে আদনান পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার সমস্ত পৃথিবী যেন দুলে উঠল। সে শেষবারের মতো অসহায় কণ্ঠে বলল,
“আমি বাঁচব না তোকে ছাড়া নৌশি, সত্যিই বাঁচব না।”

​নৌশি ওপাশে মুখ ফিরিয়ে নিল। নিজের চোখের অবাধ্য জলটুকু কোনোমতে গিলে নিয়ে পাথরচাপা কণ্ঠে বলল,
“কাউকে ছাড়া কেউ মরে না। সময় সব শিখিয়ে দেয়।”

​আদনান এবার অদ্ভুত এক শান্ত স্বরে বলল,
“মরে, মানুষ মরে। তুই জানিস না, শুধু নিঃশ্বাস নেওয়া মানেই বেঁচে থাকা না। কিছু মানুষ দিনের পর দিন বেঁচে থাকে মরার মতো। সেই তিল তিল করে মরে যাওয়াটা যন্ত্রণাময়ী মৃত্যুর চেয়েও হাজার গুণ বেশি ভয়ঙ্কর।”

​নৌশি আর কোনো উত্তর দিল না। ঘরের নিস্তব্ধতায় কেবল বাইরে সানাইয়ের সুর ভেসে আসছিল, যা আদনানের কানে বিসর্জনের বাজনার মতো বাজছিল। সে ধীরপায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তার চোখে তখন কোনো পানি নেই, আছে কেবল এক স্থির অন্ধকার সঙ্কল্প।
আদনান ঘর থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় শেষবারের মতো নৌশির দিকে ফিরে তাকাল। তার দুচোখে তখন আর মিনতি নেই, আছে এক অদ্ভুত শূন্যতা। সে ফিসফিস করে বলল,
“চল না নৌশি, এখনো বলছি পালিয়ে যাই। এছাড়া আমাদের এক হওয়ার আর কোনো রাস্তা খোলা নেই। আমি তোকে ছাড়া নরকযন্ত্রণায় ছটফট করছি।”

​নৌশি নিজের কাঁপাকাঁপা হাতদুটো শক্ত করে মুঠো করল। পাথরের মতো কঠিন হয়ে জবাব দিল,
“আদনান, দোহাই তোর, রুম থেকে বের হ! আর আমাকে এভাবে জ্বালাস না। আমি আর পারছি না।”

​আদনান হঠাৎ করেই শব্দ করে হেসে উঠল অট্টহাসি, কিন্তু সেই হাসিতে এক তীব্র যন্ত্রণা মেশানো। সে বিড়বিড় করে বলল,
“আর জ্বালাব না তোকে? আচ্ছা, আর জ্বালাব না। এবার তোকে আমি পুড়াবো নৌশি!”

​নৌশি আদনানের কথার গূঢ় অর্থ বুঝতে পারল না। সে ম্লান হেসে উত্তর দিল,
“আমি তো অনেক আগেই পুড়ে ছারখার হয়ে গেছি আদনান। পোড়া জিনিসকে আর নতুন করে কী পুড়াবি?”

​আদনান আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। ঝড়ের বেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে।

​বর্তমানে ফিরে এল নৌশি। আয়নার সামনে মিতু তখন কাজলের তুলি হাতে দাঁড়িয়ে। মিতু বলে উঠল,
“এভাবে চোখের জল ফেললে কাজলটা দেব কীভাবে? সব তো লেপ্টে যাচ্ছে!”

​মিতুর কথায় নৌশির ঘোর কাটল। সে খেয়াল করল, দীর্ঘক্ষণ ধরে সে নুসরাত আর তৃণাকে দেখছে না। তার মনের ভেতর এক অজানা আশঙ্কা দানা বাঁধতে শুরু করল। সে কাঁপা গলায় প্রশ্ন করল,
“নুসরাত আপু আর বউমনি কোথায় ? ওদের তো অনেকক্ষণ ধরে দেখছি না।”

​মিতু সাজগোজের জিনিসে হাত চালাতে চালাতে হালকা স্বরে বলল,
“বাড়িতে কত কত মানুষ এসেছে দেখছিস না! হয়তো মেহমান সামলাতে কোথাও ব্যস্ত আছে।”

​নৌশির বুকটা কেন জানি কু গাইছে। সকালেই সে আদনানকে শেষ দেখেছিল, তারপর আর কোনো হদিস নেই। সে আবারও জিজ্ঞেস করল,
“আদনান কোথায়? ও কি ড্রয়িংরুমে?”

​মিতু এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আদনান তো সেই সকালেই বাড়ি থেকে বের হয়েছে, এখনো ফেরেনি। বড় বাবা আর ছোট কাকা বারবার কল করেছেন, কিন্তু ওর ফোন বন্ধ দেখাচ্ছে। মেজাজটাই খারাপ করে দিল ছেলেটা, আজকের দিনেও এমন দায়িত্বজ্ঞানহীনতা!”

​নৌশির বুকের ভেতরটা মুহূর্তেই দুমড়ে-মুচড়ে গেল। ‘ফোন বন্ধ’ এই শব্দ দুটো তার মাথায় হাতুড়ির মতো বাজছে। আদনানের সেই শেষ কথাগুলো মনে পড়ে গেল তার, ‘তোকে আমি পুড়াবো’। নৌশির ইচ্ছে করছে এই মুহূর্তে কনের সাজ ছিঁড়ে ফেলে সব কিছু থেকে মুক্তি পেতে। কিন্তু সামাজিক শৃঙ্খল আর পরিবারের সম্মানের এই জাঁতাকল থেকে মুক্তি পাওয়া কি এতই সহজ?
★★★
উৎসবে মাতোয়ারা মির্জা বাড়ির হইচই থেকে নিজেকে আড়াল করে তৃণা করিডর দিয়ে প্রায় ছুটছিল। তার কপালে চিন্তার সূক্ষ্ম ভাঁজ। ঠিক নিজের রুমের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আচমকা একটা শক্ত হাতের টানে তার গতি থমকে গেল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই কেউ তাকে ঝটকা দিয়ে রুমের ভেতর টেনে নিল।
​ভয়ে চিৎকার দিতে গিয়েও পারল না তৃণা, তার আগেই একটা উষ্ণ হাতের তালু শক্ত করে চেপে ধরল তার মুখ। ভয়ে চোখ বুজে ফেলেছিল সে, কিন্তু অতি পরিচিত সেই গায়ের ঘ্রাণ নাকে আসতেই ধক করে উঠল বুকটা। চোখ মেলতেই দেখল সামনে দাঁড়িয়ে তার আরিয়ান। তবে এখন তার চোখে রাগ নেই, আছে এক ভুবন ভোলানো দুষ্টুমিমাখা হাসি।

​তৃণা নিজের মুখ ছাড়িয়ে নিয়ে ভ্রু কুঁচকে বিরক্তির ভান করে বলল,
“ধ্যাৎ! আপনি সবসময় এমন কেন করেন?”

​আরিয়ান এক পা এগিয়ে এসে তৃণার কোমরে হাত রাখল। গাঢ় স্বরে শুধাল,
“কেমন করি, হুম?”

​“এই যে… এরকম হুটহাট!” তৃণা আমতা আমতা করে বলল।

​“এরকম ‘কী’?” আরিয়ানের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি।

​“কিছু না!”

​“কিছু না ‘কী’?” আরিয়ান এবার আরও কাছে ঝুঁকে এল।

​তৃণা চোখ সরিয়ে নিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল,
“জানি না।”

​আরিয়ান এবার তৃণার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আজ বড্ড মায়াবী লাগছে তোমায়, আমার শ্যামলিনী।”

​তৃণা লজ্জা পেয়ে একটু আড়ালে যেতে চেয়ে বলল, “শ্যামলা মানুষকে আবার সুন্দর লাগে নাকি?”

​আরিয়ান তৃণার চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল। তার চোখের গভীরতা মেপে নিয়ে ধীরস্থির কণ্ঠে বলল,
“সত্যি বলছি, আমার দেখা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর নারী তুমি। এই কালচে বরণেই তো আমি বারবার হারি!”

​তৃণা আলতো করে আরিয়ানকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“সরুন তো! আমি খুব টেনশনে আছি।”

​আরিয়ান এবার একটু গম্ভীর হলো।
“কী বিষয় নিয়ে এত টেনশন? বিয়ে নিয়ে?”
​“হুম।”

​আরিয়ান কিছুক্ষণ কী যেন ভাবল। তারপর জিজ্ঞেস করল,
“আচ্ছা, আদনানের কী হয়েছে বল তো? ছেলেটাকে কদিন ধরে কেমন জানি মনমরা দেখছি। কোনো ঝামেলা হয়েছে ওর?”

​তৃণা মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেল। নিজের চোখের পলক লুকিয়ে নিয়ে শুকনো গলায় বলল,
“কিছু না তো, এমনি হয়তো।”

​আরিয়ান তৃণার চোখের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীর পায়ে ওর আরও কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বলল,
“কিছু একটা লুকাচ্ছ তুমি, শ্যামলিনী। তোমার ওই চঞ্চল চোখ দুটোতে মিথ্যে কথা একদম ধরা পড়ে যায়। বলো তো, আদনান আর নৌশিকে নিয়ে কোনো গোপন কথা জানো তুমি?”

​তৃণা আর লুকাতে পারল না। আরিয়ানের বুকের ওপর হাত রেখে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নৌশি আর আদনানের সেই অব্যক্ত প্রেম আর তিলে তিলে পুড়ে যাওয়ার গল্পটা বলতে শুরু করল।
★★★
নৌশির সাজগোজ তখন শেষ পর্যায়ে। আয়নার প্রতিবিম্বে নিজেকে চিনতে কষ্ট হচ্ছে তার টকটকে লাল বেনারসি আর গয়নার ভারে তাকে রাজকন্যার মতো দেখালেও, ভেতরটা শ্মশানের মতো খাঁ খাঁ করছে। ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরে এসে ঢুকল নুসরাত। নৌশি অবাক হয়ে লক্ষ্য করল, নুসরাতের চোখেমুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি, ঠোঁটের কোণে ঝুলে আছে এক চিলতে হাসি।
​নৌশি ধরা গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কোথায় ছিলে এতক্ষণ আপু? কতক্ষণ ধরে তোমায় খুঁজছি।”

​নুসরাত সহজভাবে জবাব দিল,
“এই তো , নিচেই ছিলাম একটু কাজে।”

​ঘরের বাকি সবার চেয়ে নুসরাতকে আজ বেশি প্রফুল্ল দেখাচ্ছে। নৌশি বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে রইল। ছোটবেলা থেকে নৌশির সামান্য মন খারাপেও যে মানুষটা হাজারবার কারণ জানতে চাইত, আজ তার জীবনের সবচেয়ে বড় যন্ত্রণার দিনেও নুসরাত এত নির্লিপ্ত কী করে হতে পারে? নুসরাত কি তবে কিছুই বুঝতে পারছে না?
​হঠাৎ নিচ থেকে শোরগোল ভেসে এল। কচিকাঁচারা চিৎকার করে বলতে লাগল,
“বর এসেছে! বর এসেছে!”

​সেই শব্দটা নৌশির কানে যেন মরণঘণ্টার মতো বাজল। সে নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করল, ‘
বেঁচে থেকেও মরার স্বাদ পাওয়ার দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলাম।’

​নৌশি স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। নুসরাত ওর কাঁধে হাত রেখে আদুরে গলায় বলল,
“আরে, মুখটা অমন করে আছিস কেন? আজ তো তোর খুশির দিন, তাই না?”

​নৌশি এবার আর চুপ থাকতে পারল না। তার ভেতরে জমানো সবটুকু অভিমান যেন বিস্ফোরিত হলো। সে নুসরাতের চোখের দিকে তাকিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করল, “আপু, তুমি তো একসময় দাদাভাইকেআরিয়ান) ভালোবাসতে, তাই না? কিন্তু ভাগ্যের ফেরে তাকে পাওনি। সেই কষ্টটা কি আজ ভুলে গেছ?”

​নৌশির মুখে এমন সরাসরি প্রশ্নে নুসরাত এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল। তার মানে নৌশি জানত! নুসরাত নিজেকে দ্রুত সামলে নিয়ে কিছুটা শক্ত গলায় বলল,
“অতীত নিয়ে কেন কথা তুলছিস নৌশি? ওটা আমার বোকামি ছিল। আজ দেখ আমি কত সুখে আছি। উপরওয়ালা যখন কোনো নারীর কাছ থেকে কিছু কেড়ে নেন, তার বদলে আরও উত্তম কিছু দান করেন। আমার ক্ষেত্রে নির্জন ইমতিয়াজ হলো সেই শ্রেষ্ঠ উপহার।”

​নৌশি এবার তীক্ষ্ণ স্বরে বলে উঠল,
“তাহলে আজ আমার এই অবস্থায় তুমি এত খুশি কেন আপু? কেন তোমার চোখেমুখে জয়ের হাসি?”

​নুসরাত কোনো উত্তর দিল না। তার সেই হাসিটা আরও চওড়া হলো মাত্র। সে পরম মমতায় নৌশির কপালে একটা চুমু খেয়ে মনে মনে বলল,
’আমি আজ পৃথিবীর সবচেয়ে খুশি।’
★★★
বিয়ের আসর তখন কানায় কানায় পূর্ণ। ঝাড়লণ্ঠনের আলোয় ঝলমল করছে মির্জা বাড়ির আঙিনা। লাল বেনারসিতে মোড়ানো নৌশি স্টেজের ওপর পাথরের মূর্তির মতো বসে আছে। পাশে বসা তার হবু স্বামী, যার দিকে একবারও ফিরে তাকানোর প্রয়োজন বোধ করেনি সে। লোকটা আমেরিকা থাকে না কি মঙ্গল গ্রহে তা নিয়ে নৌশির বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। তার দুচোখ বারবার ভিড়ের মাঝে খুঁজে ফিরছে সেই চঞ্চল, জেদি ছেলেটাকে। কোথায় আদনান? সে কি সত্যিই আজ আসবে না?

​কাজি সাহেব খাতা খুলে বসলেন। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হতেই চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। নৌশির মনে হচ্ছিল, প্রতিটি সেকেন্ড তার বুকের ওপর পাথরের মতো চেপে বসছে। কাজি সাহেব বরকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করতেই ওপাশ থেকে পুরুষটির জবাব এল,
“কবুল, কবুল, কবুল।”

​নৌশির নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। আর মাত্র কয়েকটা শব্দ, তারপরই সে অন্য কারো অন্দরমহলের বন্দি হয়ে যাবে। কাজি সাহেব এবার নৌশির দিকে ফিরলেন। বিয়ের বয়ান পড়তে শুরু করলেন তিনি। নৌশি ঝাপসা চোখে সামনের দিকে তাকাতেই দেখল, তার থেকে কিছুটা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে আদনান।
​নৌশি চমকে উঠল। আদনানের পরনে টকটকে লাল রঙের এক রাজকীয় শেরওয়ানি! এই অবেলায় আদনান কেন বরের সাজে সজ্জিত? নৌশির মাথায় হাজারটা প্রশ্ন ভিড় করল। ওদিকে কাজি সাহেব তাড়া দিচ্ছেন,
“মা বলুন, কবুল বলুন।”

​নৌশি সেদিকে খেয়ালই করল না। সে অপলক দৃষ্টিতে আদনানের দিকে তাকিয়ে রইল। আদনান কোনো বিশৃঙ্খলা করল না, বরং ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা বাঁকা হাসিটা ফুটিয়ে তুলল। সেই হাসিতে আজ কোনো হাহাকার নেই, আছে এক অদ্ভুত জয়ের আনন্দ।
​নৌশি অসহায় বোধ করল। বুক ফেটে কান্না আসলেও সে চোখ বন্ধ করল। নিজের নিয়তি মেনে নিয়ে ‘কবুল’ বলার জন্য ঠোঁট জোড়া কাঁপিয়ে প্রস্তুতি নিল সে।
​আর ওদিকে করিডরের থামে হেলান দিয়ে আদনান ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে সময় গুনতে শুরু করল,
​“এক… দুই… তিন!”

#চলবে..
(কমেন্টে লেখিকার উপর আক্রমণ করা থেকে দূরে থাকুন। গল্পে টানটান উত্তেজনা না থাকলে লিখতে ভালো লাগে না, পড়তেও ভালো লাগে না।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here