#যাত্রাপথ
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:৩২]
গোয়াল ঘরের তীব্র, বোঁটকা গন্ধে নাকে ওড়না চেপে ধরলো মিছরি। গা গুলিয়ে আসছে। কলিমের মা তাকে সবকিছু বুঝিয়ে দিয়ে কাজের অজুহাতে চলে গিয়েছে কোথাও। মিছরি ক্লান্ত দৃষ্টিতে গরুগুলোকে দেখলো। মোটা দড়ি দিয়ে খুঁটির সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। তবুও তাকে দেখে হাম্বা হাম্বা করে চিৎকার করছে। বাছুরগুলো একটু পরপর এসে গা ঘেঁষে দাঁড়াচ্ছে। শিং না থাকায় যা রক্ষা। নইলে গুঁতা দিয়ে এতক্ষণে তার দফারফা অবস্থা করে ফেলতো। ছোটো থেকেই সে গরুকে ভীষণ ভয় পায়। যদি গুঁতা মেরে দেয়? এমন পরিস্থিতিতে পড়ে হাত-পা ছড়িয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করল মিছরির। সব দোষ মায়ের। কেন যে নাজিরকে তখন এসব বলতে গেলো?
গোয়াল ঘরটা বেশ বড়ো। গরুর সংখ্যাও কম নয়। অনেক কষ্টে অর্ধেক পরিষ্কার করে সামনে এগোতেই দুটো গরু পুনরায় পটি করে দিলো। মিছরি আহত দৃষ্টিতে তাকালো সেদিকে। এবার সত্যি সত্যিই কেঁদে ফেলল। কলিমের মা এসে হেঁড়ে গলায় বললেন,“হায় আল্লাহ, এহনো পরিষ্কার করতে পারো নাই! এমনে দাঁড়াইয়া থাকলে হইবো?”
“করেছি, কিন্তু ওই গরু দুটো আবার নোংরা করে ফেলেছে।”
“চোরামি কইরা গরুর উপরে দোষ চাপাও? মিছা কথা বাদ দিয়া কাম করো। না হইলে কপালে দুঃখ আছে।”
দুঃখের পাশাপাশি মহিলার উপর ভীষণ রাগও হলো মিছরির। কাজের মেয়ে কী সে নাকি ওই মহিলা? সাহস হয় কীভাবে তাকে নির্দেশ দেওয়ার? কাটকাট জবাব দিলো,“এটা আমার স্বামীর গোয়াল ঘর। আমার যা ইচ্ছে তাই করবো।”
মেয়েটার দুর্ব্যবহারে কলিমের মা অবাক হলেন। হায় হায় করে বললেন,“মাইয়ার কী চোপা! আমার লগে চ্যাটাং চ্যাটাং কইরা কথা কইতে আইয়ো না। পরিণাম ভালা হইবো না। দুইদিনের মাইয়ার কী দেমাগ!”
বকবক করতে করতে তিনি চলে গেলেন। মিছরি আবারো কাজে লেগে গেলো। গোবর আর বাসি খড় মিশ্রিত স্যাঁতসেঁতে গন্ধে মাথা ধরে আসছে। হাত-পা নাড়তে নাড়তে হঠাৎ তার পেটের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠলো। আর সামলাতে না পেরে একপর্যায় ঝুঁকে বমি করে দিলো মাটিতে।
কি দুর্গন্ধ এখানে! একটামাত্র গোয়ালঘর পরিষ্কার করতে গিয়েই সকাল গড়িয়ে দুপুর হলো। হাত-পা ব্যথায় অবশ। নাকে এখনো কটু গন্ধ লেগে আছে। তখনি মর্জিনা ডাকলেন,“ওই বউ! আমার খোপ দুইডাও একটু পরিষ্কার কইরা দেও দেহি। আমার তো আর পোলার বউ নাই। মাজায়ও বিষ। কেডায় কইরা দিবো?”
সুন্দর কথার বিপরীতে মিছরির মুখ থেকে না’ শব্দটা কেন যেন বের হয় না। তাই বাধ্য মেয়ের মতো এই কাজটাও সে করল। হাত দুটোতে ফোস্কা পড়েছে। এত কঠিন কঠিন কাজ হয়তো জীবনের প্রথম শাহ বাড়িতেই সে করছে। রান্নাবান্নার কাজে আজ আর তাকে ডাকা হলো না। গোয়ালঘর, মুরগির খোপ, বিশাল এক উঠোন তাকে দিয়েই পরিষ্কার করানো হলো। নাজিরের অবর্তমানে যেন সুযোগের সদ্ব্যবহার করে নিলো সকলে। যহরের নামাজ আজ আর সময় মতো পড়া হলো না।
পেছনের দিকটা লেপে এসে কলিমের মা চেঁচালেন, “কী বউ? বইয়া রইছো ক্যান? গইট্টা দিবো কেডায়? যাও, গোবর মাখাইয়া ওই লাঠির মধ্যে গইট্টা দেও। হেরপরে রোইদে আবার শুকাইতে হইবো।”
“হাত দিয়ে মাখাতে হবে?”
“হাত দিয়াই তো মাখায়। তুমি পারলে পা দিয়া মাখাও।”
শরীর কাঁপছে মিছরির। মাথাটা ভনভন করে ঘুরছে। সে খুঁটি ধরে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। কিন্তু বাঁধা পেলো কারো কণ্ঠে,“দরকার নাই। যাও গোসল কইরা আইয়ো।”
ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতেই দেখতে পেলো নাজিরকে। শরীরে লেগে আছে কাদামাটি। স্ত্রীর দিকে তাকালো না সে। কলিমের মা জিজ্ঞেস করলেন,“তাইলে এই গোবর দিয়া কী করবি?”
“সবজি ক্ষেতের গাছের গোড়ায় না হয় বিকালে গিয়া দিয়া আইমু।”
ফরিদার দুপুরের রান্না শেষ। রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে বললেন,“রানমু কী দিয়া? সব গুইট্টা তো শেষ। শুধু পাতা, খড়ি দিয়া কী রান্ধা হয়?”
“তাইলে নিজেরা বানাইয়া লন। এতকাল কেমনে রানছেন?”
প্রত্যুত্তর করলেন না ফরিদা। মিছরি আর সেখানে দাঁড়ালো না। পোশাক নিয়ে চলে গেলো কলপাড়। এমনিতে বমি করে শরীর আরো দুর্বল হয়ে গিয়েছে। এই নোংরা শরীর নিয়ে বেশিক্ষণ থাকলে এখানেই জ্ঞান হারাবে। আজ অনেক সময় নিয়ে সে গোসল করল। গোসল সেরে বেরিয়ে আসতেই নাজিরও গিয়ে পরিষ্কার হয়ে এলো। খিদেটা আজ তার একটু বেশিই লেগেছে। বেশি কাজ করায় নাজিরের খাবারও লাগে বেশি। নির্ঝঞ্ঝাটে খেয়ে উঠতেই ফরিদা বললেন, “তোর বউ কই? ভাত খাইবো না? ডাক দে।”
“বাইড়া দেন, লইয়া যাই।”
ফরিদা ভাত বেড়ে দিলেন থালায়। নাজির তা দেখে নাকমুখ কুঁচকায়,“মুরগির খাওন বাড়েন, মিয়া? এর লাইগাই আমার বউডা শুকাইয়া গেছে। আর তার লাইগা শাশুড়ি রাগ ঝাড়লো আমার উপরে। ট্যাহা লাগলে কইবেন। না হয় বাড়াইয়া দিমু। তবুও আমার বউ যাতে খাওনের কষ্ট না করে। আরো দুই হাতা ভাত দেন, মাছের ভালা পিছটা দেন, গুঁড়া মাছও দিয়েন।”
ফরিদার ললাটে ভাঁজ পড়ল। কথা মোতাবেক আরো দুই চামচ ভাত বেশি দিয়ে বললেন,“আমারে কী তুই দজ্জাল মনে করোস, নাজির? তোর দুই চাচায় তগো কবেই আলাদা কইরা দিতে চাইছে, অনুষ্ঠান ছাড়া মর্জিনায় দুগা ভাত খাওয়ায় নাই। আমি, এই আমি সবার বিরুদ্ধে গিয়া তোরে আগলাইয়া রাখছি। তোর বউরে না খাওয়াইয়া রাখার মানুষ আমি? এনে আওয়ার পর থাইক্যা ওয় নিজেই বাইড়া খায়। আমার কী দোষ?”
নাজির মনে মনে বললো,“আমনে কত যে ভালা আর আগলাইয়া রাখছেন জানা আছে।” তবে মুখে বললো, “থাক কাইন্দেন না। গোলামের পুতের ঝিয়ের সব দোষ।” তারপর তাড়া দিয়ে বললো,“মাছের ওই বড়ো টুকরাডা দেন।”
“তোর চাচার জন্য রাখছিলাম।”
“বয়স তো কম হয় নাই। এত খাইয়া কী করবো?”
ফরিদাকে থেমে যেতে দেখে সে নিজেই মাছের বড়ো টুকরোটা থালায় তুলে নিয়ে ঘরে চলে এলো।
মিছরি বিছানায় চোখ বুজে শুয়ে আছে। চুলগুলো এখনো ভেজা। চুঁইয়ে পড়া পানিতে ভিজে গিয়েছে বিছানার অর্ধেক। নাজির এসে বসলো বিছানায়। থালা একপাশে রেখে ডাকলো,“ঘুমাইয়া গেছো?”
উত্তর এলো না কোনো। তবে চোখ জোড়া পিটপিট করে নড়ছে। নরম স্বরে জিজ্ঞেস করল,“খাইবা না? গরম থাকতে থাকতে খাইয়া নেও।”
“খাবো না।”
“ক্যান? পরে তো কঙ্কাল হইয়া গেলে তোমার বাপ, ভাই আমারে আইয়া পিডাইবো।”
বিপরীতে কিছু বললো না মিছরি। শোয়া থেকে উঠে গুটিসুটি মেরে বসলো। নাজির ভালো করে তাকিয়ে আপাদমস্তক তাকে দেখলো। ফোলা ফোলা গাল দুটো চেপেছে, চোখ দুটো ডেবে গিয়েছে, ঠোঁট দুটো শুষ্ক। ক্ষণে ক্ষণে কাঁপছে মেয়েটা। অথচ বাপের বাড়ি থেকে যখন এ বাড়িতে এসেছিল তখন তো পুরোপুরি অন্য রূপ ছিল। তাহলে দোষ কী নাজিরের? নাজিরই তবে কাশেম আলীর মতো করে মেয়েটিকে আদর, যত্নে রাখতে পারেনি? এটা যেন তার আরেকটা হার।
“খাইবা না ক্যান? কাম করাইছি বইল্যা? সংসারের কাম করা কী তোমার দায়িত্ব না? তোমার মা, চাচীরা করে না?”
“করলেও গোয়ালঘর কেউ পরিষ্কার করে না।এসবের জন্য আলাদা লোক রাখা আছে। এসব করতে গিয়ে আমি দুইবার বমি করেছি, পড়ে গিয়ে হাঁটুতে ব্যথাও পেয়েছি। সুযোগ পেয়ে ছোটো চাচী মুরগির খোপ পরিষ্কার করিয়ে নিয়েছে, কলিমের মা বকেছে।”
স্ত্রীর হাত জোড়া টেনে নিলো নাজির। নরম, ফর্সা হাত দুটো লাল হয়ে আছে। এখানে ওখানে ছিঁলে গিয়েছে নয়তো ফোস্কা পড়েছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। এ মেয়ে সত্যিই রাজার হালে বড়ো হয়েছে। নাজির বারবার বুড়োকে বলেছিল অথচ বুড়ো শুনলোই না। তাদের শত্রুতার জের ধরে মাঝখান থেকে মেয়েটার জীবন নষ্ট হলো।
নিজ হাতে ভাত মাখিয়ে এক লোকমা মুখের সামনে ধরে বললো,“খাওয়ার উপরে রাগ দেখাইয়া লাভ নাই। তোমারে খাওয়াইয়া আমি বাহির হইমু।”
“ছোটো মাছ আমি খাই না।”
“ক্যান খাও না? ছুডো মাছে পুষ্টি বেশি।”
“কাঁটা অনেক।”
“এর লাইগাই তোমার শরীরে জোর নাই। নলার লগে ভালা কইরা চাবাইয়া গিল্লা ফেলবা। হা করো। হেরপর বড়ো মাছ দিমু।”
বাধ্য হয়েই মিছরি হা করল। খিদে সে সহ্য করতে পারে না। তাই রাগ ভুলে শব্দ করে খেতে লাগলো। মিনমিনে স্বরে জিজ্ঞেস করল,“আপনি কী আমার উপরে এখনো রেগে আছেন?”
“না, রাগমু ক্যান?”
“অন্ধকার ঘরে আমি একলা থাকতে পারি না।”
“তহন দিন আছিলো।”
“আকাশে গর্জন শোনা যাচ্ছিল, ঘর অন্ধকার ছিল। এ বাড়ির কেউ আমার সাথে দুটো কথা বলে না। শুধু শত্রু বাড়ির মেয়ে বলে দূরে ঠেলে দেয়। আপনাদের সাথে কী শত্রুতা করেছি? আমি তো কিছু জানিও না। সুজাতা বিকেলে এলো, তাই কিছু না ভেবেই ওর সাথে চলে গিয়েছিলাম। সবাইকে পেয়ে ফেরার কথা মনে ছিল না।”
“আর অত্যাচারের কথা?”
“এসব আমি কাউকে বলিনি। ভাতের ফেন গালাতে গিয়ে হাতে কিছুটা পড়ে দাগ হয়েছে। সেটাই মা দেখে নিয়েছিল, তাই…”
“যদি সুযোগ থাকে তাইলে কী তুমি চইল্যা যাইবা?”
“কোথায়?”
“বাপের বাড়ি।”
“একেবারে?”
“হ, একেবারে। আমারে ছাইড়া।”
“তালাক দিয়ে?”
ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো নাজির। মাছের কাঁটা বেছে আরেক লোকমা মুখের সামনে তুলে ধরলো। মিছরি তা মুখে তুললো না। বললো,“লাভ কী? আবার বিয়ে দিয়ে দেবে। মা বলে, মেয়েদের বিয়ে একবারই হয়। বিয়ের পর স্বামীই সব।”
“এতকিছু বুঝোস অথচ জামাইয়ের বাড়িত কাম করতে হয় এইডা বুঝোস না, নডী?”
“আপনি নডী।”
“চুপ!”
খাওয়ানো শেষ করে হাত ধুয়ে উঠে গেলো নাজির। শার্টের পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে স্ত্রীর হাতে দিয়ে বললো,“এইডা কলিমের মায়ের ট্যাহা। আইজ গোয়াল, উঠান আর ঘর পরিষ্কার করছো তুমি। আব্বারে দুপুরে খাওয়াইছি আমি। হেয় শুধু ভিটার পিছন দিক লেপছে। তাই ট্যাহা সেই অনুযায়ী দিয়া গেলাম। জিগাইলে এইডাই কইবা। মনে থাকবো?”
“আমি কেন? আপনি দিয়েন। নইলে বড়ো চাচীকে দিয়ে যান।”
“হিসাব পারো না?”
“পারি।”
“তাইলে? ঘরের বউ তুমি। ঘরের খবর, সাংসারিক ট্যাহা পয়সার লেনদেন তোমারেই রাখতে হইবো।”
“আপনি কোথায় যাচ্ছেন? ফিরলেনই তো দুপুরে। বিশ্রাম নিবেন না?”
“সেই সুখ তোমার সোয়ামির কপালে নাই। সব কাম শেষ কইরা হাইনজা হইলে আব্বার ঘরে আলো আর তালা দিয়া নিজের ঘরে ঢুইকা দরজা আটকাইবা। আমি ছাড়া আর কারো ডাকে খুলবা না। গেলাম, এশার আগেই আইয়া পড়মু। আর হ, ওই ড্রয়ারে ব্যথার মলম আছে। হাতে লাগাইয়া নিও।” কথা শেষ করে নাজির গামছাটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল বাড়ি থেকে।
__________
গত চার বছর ধরে সরিষা ক্ষেত করে নাজির। ফলন আর লাভ ভালোই হয়। মৌসুম অনুযায়ী ধান চাষ, সবজি চাষ, সরিষা চাষসহ মোটামুটি সবই সে করে। কখনো জমি বর্গা নিয়ে, আবার কখনো বা নিজের জমিতে। এই কয়েক বছরে নিজেও কম দামে বেশ কয়েক বিঘা ফসলি জমি সে কিনেছে। মাথার ঘাম পায়ে ঝরানো পরিশ্রমের অর্থ দিয়ে। এসব অর্জন করতে গিয়ে কত রাত যে ঠিকমতো ঘুমায়নি নাজির! শূন্য থেকে শুরু করা কী এতই সহজ?
তবে এবার নাজির ভেবে রেখেছে, এখান থেকে যা আয় হবে তা দিয়ে সরিষা চাষের জন্য আলাদাই একটা জমি কিনে নেবে। ওই পাড়ার সেলিম মোল্লার জমিটা দারুণ, চাষের মাটিও ভালো।শুনেছে, লোকটা নাকি জমি বিক্রি করতে চাইছে। ভালো খদ্দের পেলে কম দামেই বিক্রি করে দেবে। যদিও গ্ৰামের জমির দাম আশানুরূপ কমই।
নাজির উঁচু ঢিবিতে দাঁড়ালো। মিল্টনের সেজো ভাই মোখলেছ আর লতিফ মিলে আগাছা পরিষ্কার করে মাটি ঝুরঝুরে করছে। নাজির হাঁক ছেড়ে বললো, “কাম শেষ হইলে উপরে নীল পলিথিন বিছাইয়া দেইস। হুট কইরা বৃষ্টি আইয়া পড়লে আবার সমস্যা।”
“আইচ্ছা, ভাইজান।” লতিফ বললো।
“মিল্টন কইরে মোখলেছ?”
“ভাইরে আম্মায় নানীর বাড়ি পাঠাইছে। মামার নাকি অসুখ।”
“ফিরলে আমার লগে দেখা করতে কইস।”
“আইচ্ছা।”
নাজির সেখান থেকে চলে এলো। কাঁচা মাটির পথ ধরে হাঁটা ধরলো অন্যদিকে। সবাই তাকে সঙ্গে করে আসবাবপত্র নিয়ে আসতে দেখলেও শহরে সে গিয়েছিল ঠিক অন্য কারণে। গত মাসেই সামাদ মিয়ার থেকে ভালো মানের কমদামি একটা পিকআপ কিনেছিল। সামাদ মিয়ার কাছে এসব জিনিসের অভাব নেই। মহাজন হিসেবে তার নামডাক দশ গ্ৰামে ছড়িয়ে আছে। চড়া সুদে টাকা লাগান। দেনাদার সঠিক সময়ে টাকা পরিশোধ করতে না পারলে কব্জা করেন জিনিসপত্র। এটাও সম্ভবত কোনো এক দেনাদারেরই। নাজিরের সাথে বহুদিনের সখ্যতা থাকায় মাঝেমধ্যেই কিছুর খোঁজ করলে তিনি এনে দেন। যদিও এমনি এমনি নয়। অর্থের বিনিময়েই। সেই ছোটো থেকে ছেলেটা তো তারই ন্যাওটা ছিল।
মিলের ব্যবসা দাঁড় করাতে গিয়ে আর সামাদ মিয়ার সাথে চলতে গিয়ে এই জীবনে বহু মানুষের সাথেই নাজিরের পরিচয় হয়েছে। মিশুক প্রকৃতির ছেলে সে। অল্পতেই কথার জালে মানুষকে কাবু করার ক্ষমতা যেমন আছে, তেমনি মন জয় করার ক্ষমতাও আছে। সেখান থেকেই পরিচয় হয়েছে জেলা শহরের এক মিষ্টি কারিগরের সঙ্গে। নামকরা দোকান ভদ্রলোকের। বিভিন্ন উৎসব থেকে শুরু করে বহু জায়গা থেকে মিষ্টির বায়না আসে। যার ফলে খাঁটি দুধও লাগে কেজির উপর কেজি। সে নিয়েই নাজির কথা বলে এসেছে। গোয়ালাদের কাছে দুধ বিক্রি করে আর পোষাচ্ছে না। সারাজীবন কী এভাবেই সে গাধার মতো খাটবে নাকি? তাই মনঃস্থির করেছে, পিকআপে করে দুধগুলো সোজা পাঠাবে দোকানে। সঠিক দাম মান অনুযায়ী অর্থ পাঠিয়ে দেওয়া হবে তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে।
বইয়ের সব বিদ্যা মাথায় না থাকলেও বংশ পরম্পরা আর বাস্তবিক অভিজ্ঞতায় এসব বুদ্ধিতে ছেলেটা ভালোই এগিয়ে। কোনোমতে অর্থ উপার্জনের পথটা শক্ত করে দাঁড় করাতে পারলে তার জীবনে আল্লাহর রহমতে শুধু শান্তি আর শান্তি।
পথ চলার সময় আচমকা ডাক পড়ল,“নাজির! দাঁড়া ভাই।”
নাজির দাঁড়ালো। দেখতে পেলো আকবর মিয়াকে। বুড়োর অধরে ঝুলছে সবসময়কার মতো মিষ্টি হাসি। এক হাতে বালতি, বরশি আর অপর হাতে নিজের লাঠিতে ভর দিয়ে কাছাকাছি এসে দাঁড়ালেন। নাজির জিজ্ঞেস করল,“সবসময় পিছু ডাকেন ক্যান?”
“তাইলে কই থাইক্যা ডাকমু? তোর মতন জোয়ান মর্দের লগে আমি পারি?”
“কী কইবেন?”
“মেলা দিন মাছ ধরি না। আয় দক্ষিণের বেলাইয়ে যাই। রুহুল কইলো, ওইখানে নাকি ভালা পানি উঠছে, মাছে কিলবিল করতাছে?”
“আমনে যান। আমি আজাইরা না। আমার কাম আছে।”
“কোনদিন তোর কাম থাহে না? সারাক্ষণ কাম করলে আমার নাতনিডারে সময় দিবি কহন? এহনই তো সময় ফুর্তি করার, বউয়ের লগে পেরেম করার।”
“সরেন মিয়া।”
আকবর মিয়া তাকে বগলদাবা করে টেনে নিয়ে যেতে যেতে বললেন,“খালি মেজাজ দেখায়। তোর বয়সে থাকতে আমার শক্তি আছিলো আরো বেশি। একলাই দশজন উঠাইয়া ফেলার মতন শক্তি।”
“খালি চাপা।”
“আয় গপ্পো করি। তোর লগে আমার অনেক কথা আছে।”
“শত্রুর লগে কোনো গপ্পো নাই।”
“এহন আর আমরা শত্রু না। দাদা শ্বশুরের চোখে দেখ। দিনকাল ভালা যাইতাছে না, বয়স অনেক হইছে। কহন কী হইয়া যায় আল্লাহ জানেন। আয়, না হইলে পরে আফসোস থাইক্যা যাইবো। তোরে কিছু করার ক্ষমতা এহন আর আমার নাই। আয়।”
বাধ্য হয়েই নাজির বুড়োর কথায় নীরব সায় জানিয়ে বরশি আর বালতিটা কেড়ে নিয়ে আগে আগে হাঁটতে লাগলো।
বেলাইয়ের পানিতে সাগরের মতো স্রোত। সেই স্রোতের তালে প্রকৃতির কোলে বয়ে চলেছে দেহ শীতল করে দেওয়া মৃদু ঠান্ডা বাতাস। মাঝখানে বালতি রেখে আকবর মিয়া আর নাজির পাশাপাশি বসলো। মাছ ধরতে আগে কখনো এদিকে আসা হয়নি নাজিরের। হয় সে নৌকা নিয়ে একেবারে চিলাই নদীতে যায় নয়তো লুঙ্গি কাছা দিয়ে নেমে পড়ে চাচাদের ধানের জমিতে ভেসে আসা বানের জলে। আকবর মিয়া আধার বানাতে বানাতে দাম্ভিক কণ্ঠে বললেন,“জোয়ান কালে প্রত্যেক বর্ষায় আমি আর তোর দাদা মিল্যা এইহানে মাছ ধরতে আইতাম। কে বেশি মাছ ধরতে পারে হেইডা লইয়াই হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতা চলতো। আর প্রত্যেকবারই বিজয়ী হইতাম আমি। আমার লগে টেক্কা দেওয়া এত সহজ? আগে দাদারে হারাইছি, আইজ নাতিরে হারামু।”
নাজির সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলো না। কেউ সরাসরি তার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে এলে সে খেলায় অংশগ্রহণ করে জয়ী হয়ে তারপর জবাব দেয়। এইবারও তাই করল। বরশিতে আধার লাগিয়ে ছিপ ফেলল পানিতে। দুজনে প্রতিপক্ষের মতো নিঃশব্দে অপেক্ষা করতে লাগলো। হঠাৎই বুড়োর ছিপটা নড়ে উঠলো। পুনরায় দাম্ভিক হাসলেন। বললেন,“কইছিলাম না? আমিও সৈয়দ সলিমুল্লাহর পোলা।”
বরশিটা উঠাতেই হাস্যোজ্জ্বল মুখখানা মলিন হলো তাঁর। ফাঁদে পড়েছে পটকা মাছ। পরপর নাজিরের বরশিতেও টান অনুভব হলো। সাবধানে বরশি উঠাতেই দেখা গেলো রুই মাছের বাচ্চা। এবার শব্দ করে হেসে উঠলো নাজির। বালতিতে মাছটা তুলে রেখে বললো,“এইডা আমনের বন্ধু ফতেহ আলী শাহ না। এইডা হইলো তার বংশধর আর আমনের শত্রু নাজির শাহ। নাজির শাহরে হারাইবো কেডায়?”
আকবর মিয়া বাচ্চাদের মতো রাগ দেখিয়ে থম মেরে বসে রইলেন। আবারো বরশি ফেললেন। কিছুক্ষণ পর জিজ্ঞেস করলেন,“আমারে তুই শত্রু মনে করোস ক্যান, নাজির? আমার প্রতি তোর অনেক ঘৃণা, তাই না রে? ক্যান এত ঘৃণা?”
“না জানার ভান করেন?”
“হাছাই জানি না।”
“ভালা সাজেন?”
“ভালা সাজার মানসিকতা আমার ভিতরে কহনোই আছিলো না। ভালা মানুষ আছিলেন আমার বাপ।”
“তাইলে জিগান ক্যান?”
“বহুদিনের ইচ্ছা তোর মুখ থাইক্যা হুনমু।”
“আমনে আমার দাদারে মারছেন।”
“এর লাইগা?”
“আমার আব্বার ওই অবস্থা করছেন, মায়রে পলাইয়া যাইতে সাহায্য করছেন।”
“আর?”
“এইটুকুই কী যথেষ্ট না ঘৃণা করার জন্য?”
“তা ঠিক।”
“আমি আমার আব্বার আঙুল ধইরা ঘুরতে পারি নাই, নওশাদ আব্বার কোলে চড়তে পারে নাই, আব্বা কী জিনিস ওয় বোঝে না,খেলার মাঠে পোলাপাইনের মাইর, কটু কথা, গালি খাওনের পর বাড়ি ফিরা মাথা রাখার মতো মায়ের কোল পাই নাই, ভালা পরিবেশ পাই নাই, দুই ভাই আমরা অভিভাবক ছাড়া বড়ো হইছি, আমগো ছেলেবেলা নষ্ট হইছে, কলম চালানোর বয়সে এই হাত দিয়া কাম করছি, চাচার দোরগোড়ায় দুই মুঠ ভাতের লাইগা অপেক্ষা করছি। ঘৃণা করার কী আরো কারণ লাগবো? চাইলে হয়তো তাও দিতে পারমু।”
“এতে কী তোর চাচাগো দোষ নাই?”
“আমি কী তাগো নির্দোষ কইছি কহনো? আমি তাগো রে কহনোই গুরুত্ব দেই না, তাগো কথা হুনি না, সম্মান দেই না। আর কী করা উচিত? সুযোগ পাইলে কত মানুষ কতকিছুই করে। সেই সুযোগ কইরা দিছেন আমনেরা। আমার আব্বার ওই অবস্থা না করলে কেউ আমগো ঠকাইতে পারতো না। হয়তো জীবন অন্যরকম হইতো। অথচ দেহেন, প্রতিশোধ না লইয়া শত্রুর লগে বইয়া রইছি। তার বাড়ির মাইয়া ঘরে তুইল্যা সংসার করতাছি।”
আকবর মিয়া থম মেরে বসে থাকেন। মুখে রা থাকে না বহু সময়। বুকটা হাহাকার করে ওঠে। বলেন, “আমিই যে তোর বাপ, দাদার এমন অবস্থা করছি কেডায় কইছে তোরে? আমার লাভ কী এতে?”
“লাভ তো কতই আছে। এই যে বিদ্যালয় একলা ভোগ করতাছেন, কত জমিজমা দখল করছেন।”
“আধা সরকারি ওইডা। শক্ত হাতে না ধরলে তোর চাচারা ভোগ করতো, চেয়ারম্যানের লগে মিল্যা দুর্নীতি করতো।”
“মিছা কথা কম কন। আমারে ভুলানো সহজ না।”
“আমি আমার জীবনে অযথা কহনো মিছা কথা কই নাই। তোরে ভুলানোও অনেক সহজ, নাজির। না হইলে এত বছর ধইরা চাচাগো কথা বিশ্বাস কইরা আইছোস কেমনে? একটুও যাচাই-বাছাই করার ইচ্ছা হয় নাই? তোর বাপের কথা তো তুই বুঝোস তাইলে তারে ক্যান জিগাস নাই কহনো?”
“বহুবার জিগাইছি কিন্তু উত্তর দেয় না। জিগাইলেই কেমন জানি অস্থির হইয়া ওঠে। পাশের বাড়ির দাদা, চেয়ারম্যান, মামু সবাই কী আর মিছা কইবো?”
আকবর মিয়া মাথা নাড়ালেন,“মামু? কোন মামু? তোর মামুগো লগে যোগাযোগ আছে?”
“ওই হারামি গো কথা আর কইয়েন না। এইডা বড়ো চাচীর ভাই।”
“তার মানে যোগাযোগ নাই। কহনো যাস নাই তোর মায়ের বাপের বাড়ি?”
“না, যারা কহনো খোঁজ নেয় নাই তাগো কাছে গিয়া লাভ কী? যদিও একবার মন চাইছিলো কিন্তু আসল ঠিকানা জানি না। শুধু ইউনিয়নের নাম জানি। কম বড়ো ইউনিয়ন তো আর না। চাচারাও ঠিকানা কয় না।”
“কহনোই কইবো না। কইলে তো নিজেগো মুখোশ খুইল্যা পড়বো।”
“মুখোশ? আর কী মুখোশ আছে হেগো? সবই তো দেহা শেষ।”
“অনেক আছে যা তোর জানার বাহিরে। তোর আব্বার ডর কীয়ের? সবাই কইতে পারলে সে ক্যান কয় না তার অবস্থার জন্য কেডায় দায়ী? কহন মাইনষে ডরায়, চুপ থাহে?”
নাজির উত্তর খুঁজে পায় না। বুড়ো তাকে কথার জালে জড়াতে পেরেছে। পুনরায় বললেন,“আমারে ক্যান তাইলে সপ্তাহ খানেকও পুলিশে জেলে ভইরা রাখতে পারলো না? ক্যান চেয়ারম্যান, মেম্বররা সমাজ ছাড়া করতে পারলো না? তহন তো আমার এই ভরা সংসার আছিলো না। নাতিরা ল্যাদা পোলাপাইন। পোলা মাত্র দুইডা, বাপও আছিলো না। তাইলে?”
“আইন শৃঙ্খলায় দুর্বলতা।”
“তুই বহুত চালাক, নাজির। চালাক না হইলে তোর মতো জায়গা থাইক্যা কেউ ঘেডি সোজা কইরা উঠতে পারে না। সবার নাকের ডগা দিয়া চলতে পারে না। কিন্তু সমস্যা হইতাছে, আসল জায়গায় আইয়াই তুই হস বলদা।”
চোখমুখ কুঁচকে তাকালো নাজির। বৃদ্ধ সেই দৃষ্টি অবজ্ঞা করে বললেন,“আইজ তোরে কিছু কথা কই, নাজির। বহু বছর ধইরা আমি ঘুমাইতে পারি না, শান্তি পাই না, অপরাধবোধে আমারে ভোগায়। এতকাল আমি সুযোগের অপেক্ষা করতাছিলাম। আইজ সেই সুযোগ আইছে। আমি জানি আমার কথা তোর বিশ্বাস হইবো না। তোর চোখে আগে থাইক্যাই বিশ্বাসের পট্টি বান্ধা। তবুও আমি আইজ কমু। তোরে সব হুনতে হইবো। বিশ্বাস না করলে না কর, তবুও হুন। হেরপর বিবেক দিয়া ভাইবা সব রহস্য উদঘাটন নিজে কর। না হইলে অতীত পুনরাবৃত্তি হইতে কতক্ষণ?
একবার যে মিছা কথা কইয়া ফেলায় সে সারাজীবনই মিছা কথা কয়। একবার যার লোভ জাগে তার লোভ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত যায় না। রক্তে হাত ভিজলে বারবার রক্তের নেশা জাগে। একটা অন্যায় ঢাকতে বহু অন্যায়ের আশ্রয় নিতে হয়।”
চলবে_________
(কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

