যাত্রাপথ লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই [পর্ব:২৩]

0
31

#যাত্রাপথ
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:২৩]

নতুন বউয়ের আগমনের অপেক্ষায় বাড়ির মেয়ে- বউরা মূল ফটকের সামনে এতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। পালকি এসে থামতেই তারা এগিয়ে গেলো সামনে। ফরিদার হাতে বরণ ডালা, মর্জিনা আর বিথীর হাতে ফুলে ভর্তি ঝুড়ি। নাজির সেসব দেখে জিজ্ঞেস করল,“এই সমস্ত নিয়ম আবার কইত্তে টপকাইলো? সরেন, বাড়িতে ঢুকমু।”

মর্জিনা ধমকালেন,“তোর লাইগা সমাজের নিয়ম বদলাইবো? তুই ভিতরে যা। নতুন বউরে বরণ কইরা আমরা ঘরে তুলমু।”

কড়া কিছু বলার জন্য নাজির ঠোঁট ফাঁক করল।‌ কিন্তু পরমুহূর্তেই কিছু একটা ভেবে মৌন রইলো। বউ রেখেই বড়ো বড়ো কদম ফেলে সবাইকে পাশ কাটিয়ে চলে এলো ভেতরে।
লিলি বারান্দার পাল্লা ধরে পায়ের আঙুলে ভর করে দাঁড়িয়ে ছিল। কৌতূহলী দৃষ্টি ফটকের দিকে স্থির। বরযাত্রীর সাথে সে যায়নি। পুরোটা সময় বাড়িতেই ছিল। নাজিরের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ঘোমটা টানলো। নাজির ঘরে যেতে যেতে বললো,“ভাব মারানি গো জীবনে কহনো সুখ, শান্তি থাকে না। এত ভাব না মারাইয়া সবার লগে গিয়া দাঁড়াইলেই তো হইয়া যায়। কেউ কী তাড়াইয়া দিবো?”

ভাসুরের কথায় এই প্রথম লিলি রাগ করল না। গত রাতে স্বামী তাকে বুঝিয়েছে। ভাইকে নিয়ে করেছে অনেক গল্প। তাই ওদের সাথে গিয়ে যোগ দেবে কী দেবে না ভাবতে ভাবতে পূর্বের স্থানেই ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইল। অপরিচিত কারো সাথে সরাসরি সে মিশতে পারে না। জড়তা কাজ করে। তার উপর শ্বশুরবাড়ির কেউই তাকে তেমন একটা গুরুত্ব দেয় না। কেমন যেন পর পর মনে করে দূরত্ব বজায় রাখে।

মিছরিকে বরণ করে ঘরে তোলা হলো। আশেপাশের সমস্ত মানুষ বউ দেখতে চলে এসেছে। নাজির পোশাক বদলে সোজা কলপাড় থেকে গোসল করে এসেছে। এক গোসলেই যেন দেহের সব ক্লান্তি দূর হয়ে গিয়েছে। এখন আগের তুলনায় মন মেজাজ ফুরফুরে লাগছে। ফরিদা তাকে ডেকে বললেন,“যা, বউ লইয়া বাপের লগে দেখা কইরা আয়।”

এই কথাটা ফেলতে পারলো না নাজির। অস্বস্তি নিয়ে ঘোমটার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা মিছরির হাতটা বগল দাবা করে বললো,“চলেন বেগম সাহেবা, আমনেরে আমনের শ্বশুর আব্বার লগে দেহা করাইয়া আনি।”

মিছরি কিছু বলার সুযোগ পেলো না। তার আগেই তাকে টানতে টানতে নিয়ে যাওয়া হলো একটি ঘরে। যেখানে অপরিচিত একজন লোক বিছানায় চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছেন। পরনে মলিন লুঙ্গি আর সাদা গেঞ্জি। চুল, দাড়িতে পাক ধরেছে। শরীরের চামড়া কুঁচকে গেছে। বয়স বায়ান্ন হলেও দেখতে লাগে যেন ষাটোর্ধ্ব।

নাজির কানের কাছে ফিসফিস করে বললো,“ঘোমটা তুলো।”

মিছরি সেকথা শুনলো না। তাই নাজির নিজেই সরিয়ে দিলো। ঘোমটা সরাতেই হাফ ছেড়ে বাঁচলো মেয়েটা। মাথা তুলে তার থেকে কয়েক হাত লম্বা নাজিরের দিকে বিস্ময় ভরা চোখে তাকালো। নাজির সেই দৃষ্টি খেয়াল করল না। হাত ছেড়ে দিয়ে বসলো গিয়ে বিছানায়। বাবার হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে কোমল স্বরে ডাকলো,“আব্বা! ও আব্বা! ঘুমাইয়া গেছো?”

সুবহান আলী শাহর চোখে সবেমাত্র তন্দ্রা ভাবটা এসে নেমেছিল। রাত, দিনের পার্থক্য তেমন একটা বুঝতে পারেন না ভদ্রলোক। জানালার সামনে বিশাল এক সজনে গাছ। তার ফাঁক দিয়ে যতটুকু আলো আসে তা দিয়েই কিছুটা আন্দাজ করতে পারেন শুধু। আবার কখনো কখনো মাথা ধরে যায়।
পিটপিট করে চোখ মেলে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন সামনে বসা অবয়বের দিকে। নাজির তাকে সময় দিলো। তবে চিনতে বেশি একটা সময় নিলেন না তিনি। ফাঁকা ঘরে মা ফিরলে যেমন আনন্দে আটখানা হয়ে ওঠে বাচ্চারা? তেমনি তাঁর কৌতূহলী মুখে সূর্যের মতো উদিত হলো ঝলমলে হাসি। অ্যা অ্যা শব্দের ঝংকার উঠলো।

মিছরি ভয়ে দু কদম পিছিয়ে গেলো। লোকটা এমন কেন করছে বুঝতে পারলো না যেন। নাজির তার দিকে তাকিয়ে বললো,“শ্বশুররে সালাম দেও।”

“আসসালামু আলাইকুম।”

“আব্বা কইবো কেডায়? আবার দেও।” ধমকের সুরে বললো।

“আসসালামু আলাইকুম, আব্বা।”

সন্তুষ্ট হলো নাজির। বাবার উদ্দেশ্যে বললো,“তোমার নাজিরের বউ, আব্বা। কাশেম আলীর মাইয়া।”

লোকটার হাসি আরো প্রসারিত হলো। লাল বধূয়া রূপে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির দিকে তাকিয়ে হাতের ইশারায় কাছে ডাকলেন। কিন্তু মিছরি সেই ডাকে সাড়া দিলো না। ভয় পাচ্ছে সে। নাজির একপলক স্ত্রীর দিকে তাকালো। ভয়ার্ত মুখখানা দেখে যা বুঝার বুঝে গেলো। বাবার উদ্দেশ্যে বললো,“খাইছো দুপুরে? আমি খাওন পাডাইয়া দিতাছি। ওয় নতুন বউ তো তাই শরম পায়। পরে গপ্পো কইরো।”

সুবহান আলী শাহ এবারেও ছেলের কথা মেনে নিলেন। তাঁর কাছে মিল্টনকে বসিয়ে রেখে মিছরিকে নিয়ে বের হলো নাজির। দরজার বাইরে পা রাখতেই দেখা হয়ে গেলো বাকি নারীদের সাথে। তাদের অপেক্ষাতেই যেন এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল তারা।
মিছরিকে নিজের সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন ফরিদা।এখন সবে সন্ধ্যা। ঘরের ভেতর এনে মাথা থেকে দুপাট্টা খুলে দিয়ে তাকে বিছানায় বসালেন তিনি। বিথী হাতপাখা এনে বাতাস করতে করতে বললো, “আমি তোমার কী লাগি, কও তো?”

মিছরি অপরিচিতা রমণীর দিকে তাকালো। শ্যাম বর্ণের স্নিগ্ধ মুখের রূপবতী এক নারী। পরনে কাতান শাড়ি। চিকন হাত দুটোতে দ্যুতি ছড়াচ্ছে স্বর্ণের দুই জোড়া বালা। বয়স কত? আনুমানিক চব্বিশ, পঁচিশ হবে হয়তো। মিছরির প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টি দেখে হাসলো বিথী। মর্জিনা খোঁচা মেরে বললেন,“না চিনাইলে চিনবো কেমনে?”

বিথী বললো,“আমি হইলাম সম্পর্কে তোমার চাচতো জা। আমারে নিজের বড়ো বোইনও মনে করতে পারো।”

মিছরি ঘাড় কাত করে বাধ্য মেয়ের মতো মেনে নিলো কথাটা। বিথীসহ উপস্থিত সকলেই সন্তুষ্ট হলো। মর্জিনা জিজ্ঞেস করলেন,“আমারে চেনা চেনা লাগে?”

“হ্যাঁ।”

“কেডা আমি?”

“ছোটো চাচী শাশুড়ি।”

মর্জিনার খুশি যেন ধরে না। বিয়ের কথাবার্তা শেষে ফরিদাকে নিয়ে একবার আংটি পরাতে গিয়েছিলেন ও বাড়ি। তখনি মেয়েটিকে পাশে বসিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলেছিলেন,‘আমি হইলাম তোমার ছুডো চাচী শাশুড়ি। তোমার জামাইয়ের শত্রু। মনে রাইখো কিন্তু।’ সেকথা কিনা এখনো মনে রেখে দিয়েছে মেয়েটা! মর্জিনার মন জয় করা যদিও সহজ নয় তবু মিছরির প্রতি তাঁর মন যেন কিছুটা গললো। তারপর ঘরে এলো সুমা। একে একে সবার সঙ্গেই পরিচয় পর্ব শেষ হলো। বউ দেখতে আসা নারীদের মধ্যে ছড়িয়ে গেলো, ‘নওশাদ শহর থাইক্যা চুন্নি ধইরা আনলেও নাজির আনছে একেবারে গেরামের ভদ্র, শালীন একটা মাইয়া।’

লিলির খুব কান্না পেলো। ঘরে এসে বসে রইলো চুপ করে। নওশাদ তার মলিন মুখখানা দেখে জিজ্ঞেস করল,“মুখ বেজার কেন? ভাবির সাথে পরিচয় হয়েছে?”

“না।”

“কেন?”

“তোমার বাড়ির লোকেরা একদম ভালো নয়। আমায় একটাবার ডাকলো না পর্যন্ত। তোমার কথায় নিজ থেকেই গিয়েছিলাম কিন্তু পাত্তাই দিলো না। উল্টে ঠেলেঠুলে বাইরের মানুষদেরকে সুযোগ করে দিয়েছে।”

“দোষ তো তোমারই। প্রথমেই তো তাদের মনে নিজের সম্পর্কে বিরূপ ধারণা গেঁথে দিয়েছো। এখন হুট করে তো আর সব ঠিক হবে না। অন্তত নতুন ভাবির সঙ্গে সম্পর্কটা ভালো করো। জা হয় তোমার।”

“মেয়েটা ছোটো।”

“তাতে কী? সম্পর্কে তো বড়ো।”

“তাই জন্য ওইটুকু একটা মেয়েকে তোমার ভাই বিয়ে করে আনবে? এই পরিবেশে সংসার করতে পারবে ও?”

“বয়সে কিছু যায় আসে না। গ্ৰামে তেরো, চৌদ্দ বছর হলেই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয় নিজের থেকে বয়সে দ্বিগুণ পুরুষদের সঙ্গে। থাকতে থাকতে শিখে যাবে।”

লিলি বিপরীতে আর কিছু বললো না। তার চিন্তা হচ্ছে। মাথায় শুধু এই বিষয়টি ঘুরে বেড়াচ্ছে।

রাত বাড়লো। সব আচার অনুষ্ঠান আর বাসর ঘর সাজানো শেষে মিছরিকে নিয়ে আসা হলো নাজিরের ঘরে। বিছানার মাঝখানটায় গোলাপ ফুলের পাপড়ি দিয়ে ভরিয়ে রেখেছে ঘর সাজানো শাহরিয়ার, জাহিদ, মিল্টন আর প্রতিবেশী মেয়েরা। চতুষ্কোণে পর্দার মতো টানানো হয়েছে গাঁদা ফুলের মালা। মিছরিকে ফুলের ঠিক মাঝখানটায় নিয়ে বসানো হলো। পরনের ভারি বেনারসি বদলে গায়ে জড়ানো হয়েছে আরেকটি হালকা বেনারসি। আপাদমস্তক ঢেকে রাখা গহনাগুলো খুলে রেখে পরানো হয়েছে প্রয়োজনীয় হালকা গহনা। সারাদিনের ক্লেশ ক্লান্তি দূর হয়ে এখন একটু স্বস্তি আর শান্তি ফিরে এসেছে মেয়েটার জীবনে। যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো সে।

পুরুষেরা আশেপাশে নেই। বিথী দুষ্টু হেসে বললো, “এই যে দুধের গেলাস রাইখা গেলাম। সোয়ামি আইলে তারে খাইতে দিবা। আর যা কয় তাই কিন্তু হুনবা।”

ফরিদা, হেলেনা তার কানে কানে আরো কিছু বললেন। এই রাতে কী কী হয় তা সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা দিয়ে সব বুঝিয়ে চলে গেলেন ঘরের বাইরে। ভয় কিংবা লজ্জায় ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছে মিছরির দেহ। গলা ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে তার। বাবা তাকে এ কোথায় পাঠালো? অত বড়ো একটা লোককে সামলানো কী তার পক্ষে সম্ভব?

ধীরে ধীরে ঘর ফাঁকা হতে লাগলো। দরজা চাপিয়ে যে যার মতো বেরিয়ে গেলো। থুতনি পর্যন্ত ঘোমটা টেনে হাঁটু মুড়ে পুতুলের ন্যায় ফুল সজ্জিত বিছানায় বসে রইল মিছরি। ঠিক কতক্ষণ যে এভাবে সে বসে রইল তার হিসেব নেই। বসে থাকতে থাকতে একপর্যায়ে পায়ে ঝিম ধরে গেলো।

চাচাতো ভাইদের মাঝখানে আটকে আছে নাজির। দুষ্টগুলো ইচ্ছেমতো তাকে খোঁচাচ্ছে। বিরক্ত হয়ে এবার সে ধমক দিলো,“তগো সাহস তো বাইড়া গেছে! ভিতরে ঢুকতে দিবি নাকি মাইর খাবি?”

নাজমুল দুদিকে মাথা নাড়ালো,“না, ট্যাহা দাও আগে। তুমগো বাসরঘর সাজাইছি। এহন ট্যাহা লাগবো।”

“আমি কইছি সাজাইতে? হুদাই ঘর নোংরা করলি। কে পরিষ্কার করবো এহন?”

“ট্যাহা দিলে আমরাই কইরা দিমু। তাড়াতাড়ি ট্যাহা দেও। না হইলে ঢুকতে দিমু না।”

“শালার সবকয়ডা লোভী। একেবারে বাপের মতন হইছে। নে ধর।” লুঙ্গির ভাঁজ থেকে কিছু খুচরো টাকা বের করে ওদের হাতে ধরিয়ে দিতেই সবকটা আনন্দে চেঁচিয়ে উঠলো। দরজার সামনে থেকে সরে চলে গেলো নিজেদের দালানের দিকে। মিল্টন মুখ চেপে হেসে বললো,“ভাইজান, শুভকামনা আমনেরে।”

নাজির ভ্রু কুঁচকালো,“গোলামের পুত!”

মিল্টনকে আর পায় কে? লুঙ্গি উঁচিয়ে দৌড়ালো বাকিদের সাথে। নাজির দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভেতরে প্রবেশ করল। এক বিয়ের চক্করে যে যেভাবে পারছে তাকে খোঁচা মারছে। এমনকি যারা তার ভয়ে চোখ তুলে তাকাতে পারে না তারাও। কি কপাল! কাঠের দরজায় খিল দিয়ে পিছু ফিরতেই নজরে পড়ল ফুলে ফুলে সজ্জিত বিছানার মাঝখানে বসে থাকা আরেক ফুল পরীকে। হারিকেনের টিমটিমে আলোয় অস্পষ্ট কিছুটা। নাজির সর্বপ্রথম হারিকেনের আলো বাড়ালো। তারপর এগিয়ে গিয়ে ঢপাস করে বসে পড়ল বিছানায়। মিছরি কেঁপে উঠলো খানিক। নাজির তা অনুভব করল। নিচু স্বরে বললো,“ঘোমটা তোল। গরম লাগে না?”

“ভাবি বলেছে, আপনি খুলবেন।”

“কোন ভাবি কইছে? একশবার এই ছাতার মাথা খুলতে পারতাম না। নতুন দেখতাছি নাকি?”

অপরিচিত ঘর, বর আর পরিবেশে শরীর এখনো ক্রমান্বয়ে কাঁপছে মিছরির। কম্পনরত হাতে সে ঘোমটা তুলে আঁচল নামিয়ে রাখলো মাথা থেকে। টিমটিমে হলদে আলোয় নাজির তাকে গভীর দৃষ্টিতে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো। মিছরি সেই দৃষ্টিকে অবজ্ঞা করে সারা ঘরে চোখ বুলিয়ে জিজ্ঞেস করল,“বিদ্যুৎ নেই? চলে গেছে?”

“জানি না।”

“আলো জ্বলছে না কেন?”

“হারিকেন চোখে লাগে না? কানা নাকি?”

“বৈদ্যুতিক আলোর কথা বলছি।”

“নাই।”

“ওই দালানে তো দেখে এলাম।”

“ওই দালানে থাকলেও এই দালানে নাই। পুরা বাড়িতে মিটার মাত্র একটা। সেই মিটার থাইক্যা চাইরডা ঘরে আলো জ্বলে, আর দুইডা ঘরে চলে ফ্যান। গেরামে এহনো ঠিকমতো বিদ্যুৎ আসে নাই।”

“কই, আমাদের বাড়িতে তো আছে।”

“তগো বাড়ি তো উত্তর পাড়ায়। পিছনের রাস্তা দিয়া অন্য গেরামে যাওয়া যায়। তাই আনা গেছে। আমরা থাকি পশ্চিমে, তাই বিদ্যুতের তার এতদূর ঠিকমতো আইয়ে না। আইলেও লোড নেয় না।”

নীরবে শুনলো মিছরি। নিচ থেকে দুধের গ্লাসটা উঠিয়ে এবার সামনে ধরলো নাজিরের। নাজির একপলক তাকিয়ে রইলো তার হাতের দিকে। মিছরি মিনমিনে স্বরে বললো,“এটা আপনার।”

“আমার কেমনে? গরুর।”

ভড়কে গেলো মিছরি। বললো,“আপনাকে খেতে বলে গেছে।”

নাজির কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। দুধের গ্লাস হাতে নেয় না। বলে,“তুই খা।”

“আমি কেন খাবো? আপনারটা আপনি খান।”

“ব্যাপার কী? মতলব তো ভালা ঠেকতাছে না। দুধে কিছু মিশাইছোস নাকি?”

“কী মেশাবো?”

“বিষ।”

আঁতকে উঠলো মিছরি,“কী বলছেন! বিষ কেন মেশাবো?”

“আমারে মারতে।”

“আপনাকে কেন মারবো? আমাদের বিয়ে হলো না? আপনি তো এখন থেকে আমার স্বামী।”

“তাইলে স্বামী হিসাবে মানছোস?”

মিছরি নিশ্চুপ। নাজির তাড়া দিলো,“তাড়াতাড়ি খা। আমার সামনে খাবি। তগোরে বিশ্বাস নাই। সারাক্ষণ মাথার ভিতরে কু বুদ্ধি লইয়া ঘুরোস।”

মিছরির কিশোরী মনে রাগের সঞ্চার ঘটলো। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে এক নিঃশ্বাসে গ্লাস থেকে তরল দুধটুকু গলাধঃকরণ করল। নাজির ঠোঁট চেপে হাসলো। হঠাৎ খাটের তল থেকে বের করল মাঝারি আকারের একটি বাঁশ। মিছরির রাগ ভয়ে রূপ নিলো। লোকটা কী তাকে এখন মারবে? তবে সেই ভাবনাকে বিস্তার লাভ করতে না দিয়ে বাঁশটাকে হাঁটুতে চেপে দ্বিখণ্ডিত করে এক খন্ড বধূর দিকে এগিয়ে দিলো নাজির। বললো,“নে, আখ খা। তুই ছুডো মানুষ। তোর লগে আবার কীয়ের বাসর করমু? পরে কানবি।”

হাত বাড়িয়ে তা নিলো মিছরি। আখের রস খেতে তার ভালো লাগে। ছোটো ভাই সুন্দর করে ছিঁলে, বঁটি দিয়ে ছোটো ছোটো টুকরো করে কেটে তাকে খেতে দিতো। তবে নাজির তা করল না।সে দাঁত দিয়ে ছিঁলে নিজেরটা খাচ্ছে, আর কিছুক্ষণ পরপর একটি ডেচকিতে ছিঁকলা ফেলছে। মিছরি চেষ্টা করল কিন্তু পারলো না। এই মুহূর্তে ভাইয়ের কথা খুব মনে পড়ছে তার। তাই নাক টানলো। নাজির আড়চোখে দেখে বললো,“আবার কোন বিরহ জাগলো মনে? দাঁতে জোর নাই তোর?”

“আপনি খুব খারাপ মানুষ।” কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললো।

“তুই আর তোর গুষ্টি বুঝি ভালা?”

“হ্যাঁ।”

“আইছে ভালা মানুষ। কী খারাপি করছি তোর লগে?”

“তুই তুকারি করছেন কেন? বউদের কেউ তুই করে বলে?”

“তো কী কয়, শুদ্ধমারানি?”

“তুমি করে বলতে হয়, সুন্দর করে কথা বলতে হয়।”

“আইচ্ছা, তুমি না কইলে জানতেই পারতাম না, বউ।”

নাজিরের কণ্ঠ থেকে ঢং করে বলা বউ শব্দটা শুনে লজ্জায় মাথা নুইয়ে নিলো মিছরি। আড়ষ্ট হয়ে বললো,“শুদ্ধমারানি কী?”

“যারা শুদ্ধ কথা কয় তারাই শুদ্ধমারানি। এইবার ঘুমা।”

জগের পানি দিয়ে হাত ধুয়ে পরনের পাঞ্জাবিটা খুলে আলনায় ঝুলিয়ে রাখলো নাজির। হারিকেনের আলো কমিয়ে সটান হয়ে শুয়ে পড়ল বিছানায়। মিছরি ঘাবড়ে গেলো।

“আমি কোথায় শোবো?”

“যেই জায়গায় বইয়া আছোস! ও না না, যেই জায়গায় বইয়া আছো সেই জায়গায়।”

“আপনার পাশে?”

“তো কী মতিনের পাশে? বউরে তুমি ডাকতে হয় এইডা জানো কিন্তু বউ গো যে জামাইয়ের পাশে, জামাইরে জড়াইয়া ধইরা শুইতে হয় হেইডা জানো না? আধা পাকনি ছেরি।”

মিছরির লজ্জা লাগছে। বুক ধুকপুক করছে। একদিন যে এই লোকটার ঘরেই তাকে আসতে হবে কখনো কী ভাবতে পেরেছিল সে? তবে ভাবি, বোনরা যেই ভয় তাকে দেখিয়েছিল, তার কিছুই হলো না। তাতেই শান্তি। আর না ভেবে সেও পাশে গুটিসুটি মেরে শুয়ে চোখ বুজলো। নাজির অন্ধকারে কাছ ঘেঁষে একহাতে তাকে জড়িয়ে নিলো নিজের সাথে। ফিসফিস করে বললো,“আইয়ো বউ, সুখ দুঃখের গপ্পো করি। ঘুমানোর লাইগা তো সারাজীবন পইড়াই রইছে।”
_________

রাতের আঁধার কেটে ভোর এলো দ্রুত। অপরিচিত ঘরে ভালো ঘুম হলো না মিছরির। মোরগের ডাকে সে শোয়া থেকে উঠে বসলো। পাশেই নাজির শুয়ে আছে। সারারাত নাক ডেকে ঘুমিয়েছে। তখনি দরজায় কড়া নাড়লো কেউ। আঁচল ঠিক করে ঘোমটা টেনে দরজা খুলতেই দেখা মিললো বিথীর। মেয়েটি হাসলো,“ঘুম ভাঙছে? বাড়ির পুরুষ মাইনষেরা এহনো বিছানা ছাড়ে নাই। তাড়াতাড়ি আইয়ো। হেরা উঠতে উঠতে গোসল সাইরা নেও।”

“এত সকালে?”

“হ, মাইয়া দেহি কিছুই জানে না! আইয়ো, আইয়ো। কাপড় লগে আনছো? নাকি দিতে হইবো?”

“এনেছি।”

“আইয়ো তাইলে, আমি দুয়ারেই আছি।”

দরজা চাপিয়ে ঘরে এলো মিছরি। বিয়েতে আত্মীয়- স্বজনদের থেকে অনেক শাড়িই উপহার পেয়েছে সে। সাথে বাবার সঙ্গে গিয়ে মাও কিনে এনেছিল বেশ কতগুলো। সেগুলোই ফেরার পথে ব্যাগে গুছিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মিছরি নিজে নিজে শাড়ি পরতে পারে না। তাই শাড়ি হাতে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল এক স্থানেই। ফের ডাক আসতেই দ্রুত বেরিয়ে গেলো। বিথীকেই না হয় পরিয়ে দেওয়ার কথা বলবে।

সকাল সকাল টিউবওয়েলের ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করে ভেজা বিড়ালের মতো নেতিয়ে গেলো মিছরি। বিথীর থেকে শাড়ি পরে উঠোন পর্যন্ত আসতেই দেখা হয়ে গেলো নাজিরের সাথে।
নিমের ডাল দিয়ে সে মেসওয়াক করছে। পরনে শুধু একটিমাত্র লুঙ্গি আর গলায় ঝুলছে গামছা। লোম ভর্তি বুকে নজর যেতেই লজ্জায় আরো নেতিয়ে গেলো মেয়েটা। দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। নাজির থুথু ফেলে পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে বললো,“আলহামদুলিল্লাহ, বউডা মোডা হইলেও সুন্দর আছে। প্রত্যেকদিন ঘুম থাইক্যা উইঠা এই মুখ দেখলে দিনডা ভালাই যাইবো।”

লোকটা প্রশংসা করল নাকি খোঁচা মারলো তা বুঝতে পারলো না মিছরি। একপলক সেদিকে তাকিয়ে দৌড়ে চলে এলো ঘরে। সে এখন বিবাহিত, তার একটা স্বামী আছে ভাবতেই লজ্জায় শিহরিত হয়ে উঠছে দেহ। ইচ্ছে করছে খাটের নিচে ঢুকে বসে থাকতে। তার উপর আজ আবার বউ ভাত। বাড়ির লোকেদের সামনে মুখ দেখাবে কী করে? এই ভেবে লজ্জায় লজ্জায় অস্থির হয়ে উঠেছে তার মন।

চলবে _______

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here