যাত্রাপথ লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই [পর্ব:৩৪]

0
29

#যাত্রাপথ
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:৩৪]

নওশাদের দুই কামড়ার ছোট্ট ভাড়া ভাড়িটায় আজ গুরুত্বর বৈঠক বসেছে। সোফা, বিছানায় গম্ভীর মুখে শ্বশুর-শাশুড়ি আর মেজো সম্বন্ধি নয়ন বসে আছে। তাদের এই আকস্মিক আগমনে নওশাদের ভেতরে অস্বস্তি হচ্ছে, মাথা যন্ত্রণা করছে খুব। ইচ্ছে করছে বিছানায় হাত-পা ছড়িয়ে এক গভীর ঘুমে ডুবে যেতে।

লিলির মেজো ভাই নয়ন সরাসরি ভগ্নিপতির উদ্দেশ্যে বললো,“তুমি আসলে চাও কী, নওশাদ? পড়ানোর নাম করে প্রেমের ফাঁদে ফেলে আমার বোনটাকে বিয়ে করেছিলে। অথচ এখন ওকে একটু শান্তিতেও থাকতে দিচ্ছো না?”

নওশাদ সেকথার উত্তর দিলো না। কয়েক মাসের নামমাত্র সংসার সংসার খেলায় অতিষ্ঠ হয়ে গিয়েছে ছেলেটা। ফাইনাল ইয়ারে পড়ছে সে। প্রেজেন্টেশন, পড়াশোনা, পরীক্ষা, টিউশন, পার্ট টাইম জবসহ স্ত্রীর নিত্যনতুন তৈরি ঝামেলা আর অশান্তিতে কারো মাথা ঠিক থাকে? নওশাদ এসব নিয়ে আর ভাবতে চায় না। ভাবলেই মনে হয় সে পাগল হয়ে যাচ্ছে।

লিলির পিতা ফারুক তার নীরবতায় ক্ষুব্ধ হলেন কিছুটা। বললেন,“এখন তো চুপ থাকলে হবে না। তোমার পরিবার আমার মেয়েকে অপমান করেছে, গ্ৰাম থেকে ফিরেই কারো সঙ্গে পরামর্শ না করে তুমি উঠে এসেছো ভাড়া বাড়িতে। আমরা কিছু জিনিসপত্র পাঠিয়েছি সেসব নিয়েও ঝগড়া করেছো। এসবের মানে কী?”

বিপরীত পাশে আবারো নীরবতা। মেঝের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে কিছু ভাবছে ছেলেটা। ফারুকের রাগ ক্ষোভ তড়তড় করে বাড়তে লাগলো। হাঁটুর বয়সী এক ছেলে তাকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। কত বড়ো সাহস! তিনি গর্জে বললেন,“এবার তুমি বাড়াবাড়ি করছো, নওশাদ। এভাবে দাম্পত্য জীবন সুখের হয় না। এমন চলতে থাকলে আমাকে আবার তোমাদের সম্পর্ক নিয়ে কিন্তু ভাবতে হবে। লিলিকে এখানে আর রাখা যাবে না। সঙ্গে করে একেবারের জন্য নিয়ে যাবো।”

চট করে মাথা তুললো নওশাদ। সুন্দর মুখখানায় লাল লাল ব্রণ উঠেছে বেশ কয়েকটা।চোখের নিচে পড়েছে কালো দাগ। দীর্ঘ সময়ের নীরবতা ভেঙে এবার সে মুখ খুললো,“দয়া করে নিয়ে যান। আমাকে এসব জটিলতা থেকে একটু মুক্তি দিন। এভাবে কোনো মানুষ সুস্থ থাকতে পারে না।”

“কী বলছো এসব! মাথা গেছে?” লিলি চেঁচিয়ে উঠলো।

“আপাতত ঠিকই আছে। তবে তোমাদের জন্য মনে হয় না আর বেশিদিন ঠিক থাকবে। দয়া করে আমায় একটু শান্তি দাও, মুক্তি দাও। আমি আর পারছি না।মাফ করো আমায়।”

উপস্থিত সকলের চোখেমুখে বিস্ময়। নয়ন উঁচু স্বরে বললো,“ফাইজলামি পেয়েছো নাকি? মেয়েটার তো ভালো ঘরেই বিয়ে হচ্ছিলো, কিন্তু তুমি ওকে ভাগিয়ে এনে নিয়ে গিয়েছিলে নিজের গ্ৰামে। এখন আবার ফেরত নিয়ে যেতে বলছো?”

“আমি ভাগিয়ে আনিনি, ও নিজেই আমার কাছে এসেছিল। তাই বলে আপনারা সর্বদা আমায় ছোটো করে দেখতে পারেন না। আমার সংসারে নাক গলাতে পারেন না। পারেন না আমার স্ত্রী, সংসার পরিচালনা করতে। সেই অধিকার আপনাদেরকে আমি দেইনি।”

ফারুক ছেলেকে শান্ত থাকতে বলে নিজেই বললেন, “এটাকে পরিচালনা বলে না। এটাকে বলে দায়িত্ব। আমার একমাত্র মেয়ে লিলি। আদর, ঐশ্বর্যের মধ্যে বড়ো করেছি ওকে। সেই মেয়ে ওই প্রত্যন্ত গ্ৰামে কিংবা এই টিনের চালার ফাঁকা ভাড়া ঘরে থাকবে কীভাবে? ওর সংসার গোছানোর দায়িত্ব কী বাবা হিসেবে আমার নয়? তোমার ভরসায় আমরা ওকে গরীবি জীবনের দিকে ঠেলে দেবো?”

“না, আপনার দায়িত্ব নয়। বিয়ে দিয়েছেন মানে সব দায়িত্ব শেষ। হ্যাঁ, আপনার মেয়ের ভালো মন্দ জানা আপনার অধিকার তবে সংসার গোছানোর দায়িত্ব তার স্বামীর। আমি এখনো ছাত্র, ভালো চাকরি পাবো কোথায়? ওর উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণ করবো কীভাবে? ও সেসব জেনেই কিন্তু আমার কাছে এসেছিল। তাহলে কেন এই জীবন নিয়ে এখন এত আফসোস? কেন সর্বদা বাপের বাড়ির লোকের কাছে নিজের স্বামীকে নিচু দেখানোর এত প্রচেষ্টা? তাকে আমি না খাইয়ে রেখেছি? নাকি কাপুরুষের মতো অত্যাচার করি? আপনাদের কাছে যৌতুক চেয়েছি? নাকি লোভ করেছি? তবুও কেন শান্তি দিচ্ছেন না?”

দুই পুরুষের কথার সামনে তার যুক্তি বড়োই দুর্বল ঠেকলো। লিলির মা রেবেকা মেয়েকে সান্ত্বনা দিতে দিতে বললেন,“আগেই তোকে সাবধান করেছিলাম। কিন্তু শুনলি না তো মায়ের কথা। এখন দেখ কোন নর্দমায় এসে পড়েছিস। সেদিন আমাদের পছন্দের ছেলেকে বিয়েটা করে নিলে আজ বিদেশে থাকতি, সুন্দর একটা সংসার পেতি।”

নয়ন বললো,“এখনো সুযোগ শেষ হয়নি, মা। সম্পর্ক বেশিদূর এগোয়নি। এখানে ডিভোর্স করিয়ে আরো ভালো জায়গায় বিয়ে দেওয়া যাবে।”

নওশাদ এবারেও সামনাসামনি কিছু বললো না। শুধু মনে মনে আওড়ালো,“বিয়ে হয়তো দিতে পারবেন কিন্তু আপনাদের মতো অসভ্য, বর্বর পরিবারের মেয়ে আর যাই হোক সংসার করতে পারবে না।”

ফারুক উঠে দাঁড়ালেন। এখানে আর এক মুহূর্তও নয়। তিরিক্ষি মেজাজ নিয়ে বললেন,“এত সহজে তোমায় আমি ছেড়ে দেবো না। আমাদের মেয়ে আমরা এখনি নিয়ে যাচ্ছি। যা কলঙ্ক লাগার তা তো লেগেছেই, এর শোধও তোমাকেই করতে হবে। কোথায় তোমার ভাই আর চাচারা? বেশ তো উচ্চ বংশ নিয়ে বড়াই তাদের। বড়ো বড়ো অনেক কথাও বলেছিল। ডাকো তাদের, নইলে মামলা করবো তোমার নামে। এই শহরে টিকতে পারবে না।”

লিলি অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো স্বামীর দিকে। কিন্তু মুখ তুলে তাদের কারো দিকেই আর তাকালো না নওশাদ। কথায় কথায় রাগ করে বাপের বাড়ি গিয়ে মায়ের কাছে স্বামীর নামে নালিশ করা মেয়ের প্রতি তার আর মায়া হয় না। তবুও যদি অত্যাচারি স্বামী হতো। তাও তো সে নয়।
একসময় ফারুক আর রেবেকা মেয়েকে নিয়ে চলে গেলেন। আর নয়ন যাওয়ার আগে গেলো শাসিয়ে।
____________

সারা শরীর ব্যথায় টনটন করছে মিছরির। লজ্জায় মুখ তুলে তাকাতে পর্যন্ত পারছে না সে। ভেজা চুল থেকে গড়িয়ে পড়া পানিতে ভিজে উঠেছে পরিধেয় পোশাকের পেছনটা। বিথী তবুও তাকে ডেকে এনে বসিয়ে দিয়েছে পেঁয়াজ, রসুন ছোলার কাজে। সামনে বসেই সবজি কাটতে কাটতে আড়চোখে তাকিয়ে জাকে লক্ষ্যও করছে। নীরবতা ভেঙে আচমকা চাপা স্বরে সে বলে উঠলো,“হায় হায়! তোমার গলায় কী হইছে? লাল ক্যান? কীয়ে কামড়াইছে?”

চমকে গেলো মিছরি। অসাবধানতায় কেটে গেলো হাতের বুড়ো আঙুল। সামান্য কাটলেই হাত থেকে প্রচুর রক্ত ঝরে তার। তা দেখে বিথী পুনরায় বললো, “মন কই থাহে? প্রত্যেকদিন কোনো না কোনো অঘটন এই মাইয়া ঘটাইবো।”

বিথীর কণ্ঠস্বর ভয়ংকর। বাড়ির পুরুষদের সামনে নরম হলেও নারীদের সামনে হয়ে ওঠে দজ্জাল, কুচুটে। আর এই ভয়ানক কণ্ঠস্বর শুনলেই মিছরির আত্মা কেঁপে ওঠে। হাতের ক্ষতের থেকেও এখন তার ভয় লাগছে এই মহিলাকে।

নাজির গতকাল রাত থেকে বাড়িতে। অন্যান্য দিনের তুলনায় আজ সে ভীষণ শান্ত একটা ছেলে। শোর নেই, হাসি নেই, আগ বাড়িয়ে কারো সাথে কথা নেই, আর না বাড়ির বাইরে যাওয়ার জন্য আছে চঞ্চলতা। গরু, ছাগলকে খাবার দিয়ে বারান্দায় বসে আছে সে। তার উপর দিয়ে লাফাচ্ছে ছাগল ছানা। দুটোর নামও অবশ্য নাজির দিয়েছে। কালি আর লালি। নাম ধরে ডাকলেই দুটো দৌড়ে আসে। রান্নাঘর থেকে বিথীর চিৎকার করা কথা শ্রবণাতীত হতেই ভ্রু জোড়ায় চিন্তার রেখা ফুটে উঠলো তার। জিজ্ঞেস করল,“কার হাত কাটছে? আমারটার?”

বিথী মাথা নাড়ালো,“হ, দেহেন কী অবস্থা। প্রত্যেক দিন এই মাইয়া এমন করে। এহনো রক্ত পড়তাছে। টিপ দিয়া ধরো।”

নাজির ডাকলো,“বউ, এইদিকে আইয়ো দেহি।”

মিছরি জমে গেলো। শরীরে কাঁপন ধরেছে। হাতের ব্যথার থেকেও স্বামীর কাছে যেতে হবে ভেবেই চক্কর দিচ্ছে মাথা। নাজির উঠে ঘরের দিকে হাঁটা ধরলো। বললো,“তাড়াতাড়ি আইয়ো। আইয়া যাতে তোমারে এনে বওয়া দেখি।”

বিথী ফিসফিস করে বললো,“বইয়া রইছো ক্যান? যাও তাড়াতাড়ি। জামাইয়ের কথা লগে লগে হুনতে হয়।”

উপায়ান্তর না পেয়ে ধীরে ধীরে বারান্দায় এসে বসলো মিছরি। নাজির বেরিয়ে এলো। হাতে তুলা আর এন্টিসেপটিক। মাঝেমধ্যে কাজ করতে গিয়ে হাত-পা কেটে যাওয়ায় বাবাকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে ফেরার পথে প্রয়োজনীয় সবকিছু কিনে এনেছিল সে। মাটিতে বসেই স্ত্রীর হাতটা টেনে নিলো নিজের কাছে। ডান হাতের আঙুলটাই কেটেছে। ক্ষত স্থান পরিষ্কার করতে করতে বললো,“কাটছে তো কাটছে একেবারে ডান হাতই কাটছে। এহন ভাত খাইবা কেমনে? তোমারে লইয়া আমি কই যামু? পোলাপাইন বউ।”

লজ্জায় জুবুথুবু হয়ে গেলো মিছরি। শরীরের কাঁপন কিছুতেই থামছে না।

“আবার জ্বর আইছে? শরীর তো ভালাই গরম। ওষুধ দিছি খাও নাই সকালে? আবার কাঁপতাছে। শীত করে, ময়না পাখি?” কপালে, গলায় হাত ছুঁইয়ে চিন্তিত কণ্ঠে বললো নাজির।

মিছরি দুদিকে মাথা নাড়ালো। কান্না পাচ্ছে খুব। জ্বর এলে বা গুরুত্বর অসুস্থ হলে নিজেকে সামলাতে পারে না সে। হয়ে ওঠে ছোট্ট শিশু। আঙুলে ছোট্ট একটা ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়ে আনত স্বরে নাজির জিজ্ঞেস করল,“গোসল করছো?”

“হ্যাঁ।”

ভাবির উদ্দেশ্যে গলা উঁচিয়ে বললো,“জ্বর আইছে ওর। আমনেরা আইজ সব কাম নিজেরা নিজেরা কইরা লন, ভাবি। ওয় বিশ্রাম নিক, না হইলে অসুখ বাড়লে পরে আমারে সামলাইতে হইবো।”

মনে মনে ক্ষুব্ধ হলেও বাইরে কৃত্রিম হেসে সায় জানায় বিথী। নাজির শরীর ঝেড়ে উঠে দাঁড়ায়। টেনে তুলে মিছরিকে। ঘরের দিকে ঠেলে দিয়ে বললো,“দুইডা বিস্কুক খাইয়া জ্বরের ওষুধ খাইবা। তারপর দিবা ঘুম। অসময়ে জ্বর আওয়া ভালা না।”

মিছরি আর অবাধ্য হলো না। মাথা ঘুরাচ্ছে তার। কাজ থেকে মুক্তি মিলেছে, বিশ্রামের সুযোগ পেয়েছে। এই সুযোগ হাতছাড়া করে কে? তাই ঘরে চলে গেলো। নাজিরের কথামতো বিস্কুট আর ওষুধ খেয়ে বিছানায় শরীরটা ছেড়ে দিলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই তলিয়ে গেলো ঘুমে।

দুপুরের রান্নাবান্নার কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। মর্জিনা চুলা জ্বালাতে জ্বালাতে চেঁচামেচি করছেন,“তিনডা পাডা জন্ম দিছি। এই বয়সে মাইনষে আরাম করে, বইয়া বইয়া খায়, পোলার বউয়ের সেবা লয় অথচ আমি পাডাগুলার লাইগা তিনবেলা রান্ধি। চাচতো ভাই গো দেইখা তো মাইনষে কিছু শিখে। মায়ের পছন্দ মতো বিয়া না করলে মাইয়া ভাগাইয়া আন একটা। তবুও বিয়া কর।”

নাজমুল মুখ ভার করে সিঁড়িতে বসে আছে। শুকনো গাছের ডাল দিয়ে আঁকিবুঁকি করছে মাটিতে। পাশে বসেই চাচীর কথায় হাসলো পারভেজ। ফরিদা বলে উঠলেন,“হেগো আবার পছন্দ অপছন্দের কী আছে? আমার সামিউলের বউ আমি নিজে পছন্দ করছি। বিয়ার আগে বউয়ের মুখটা পর্যন্ত দেহে নাই আমার বড়ো পোলায়। তারপরেও মায়ের উপরে ভরসা রাইখা বিয়া করছে। এগারো বছর ধইরা সংসারও করতাছে। আশা করি পারভেজও হুনবো। তুই করোস না ক্যান? মাইয়া খালি পছন্দ করবি গিয়া।”

পারভেজের হাসি মিইয়ে গেলো। নাজমুল নাজিরের উদ্দেশ্যে বললো,“কিছু কও তো, ভাই। একটু শান্তি দেয় না। সারাক্ষণ বিয়া বিয়া করে।”

“তো করোস না ক্যান? পছন্দের কেউ আছে? থাকলে কইয়া দে। আমগো মাজেদা চাচী তো তাতেও রাজি।” নাজির বললো।

মর্জিনা আজ আর ভুল নাম শুনে রাগ করলেন না। তরকারিতে ঝোল দিয়ে বললেন,“ওগো একটু বুঝা, নাজির। তোর কথা যদি হুনে। এহনি তো বিয়ার সময়। আমি আর কয়দিন সংসারের লাইগা করমু?”

নাজমুল মুখ ভার করে বসেই রইল। একটি দড়ি নিয়ে সুমা দৌড়ে এলো। আবদার করে বললো,“নাজির চাচা, একটা দোলনা বানাইয়া দেও।”

“ইশকুলে যাস নাই ক্যান?”

“বন্ধ।”

“কীয়ের বন্ধ?”

“অন্য ধর্মের কী জানি এক উৎসব‌ তাই বন্ধ দিছে। দেও বানাইয়া।”

আব্দুল্লাহও বোনের সাথে সাথে বললো,“দেও, দুল কামু।”

“এই দড়ি দিয়া হইবো না, আরো মোডা দড়ি লাগবো। দাড়া লইয়া আসি।”

ছাগলের ঘরের চাল থেকে বিশাল মোটাসোটা একটা দড়ি নিয়ে এলো নাজির। সুমা গিয়েছে পিঁড়ি আনতে। চালতা গাছের দিকে যেতে যেতে ছোটো চাচীর উদ্দেশ্যে বললো,“আমনে মাইয়া ঠিক করেন, চাচী। দেখমু নে ওয় বিয়া না কইরা কই যায়।”

ফরিদা বললেন,“হ, তুই নিজেই ঠিক কর। পোলাগো পছন্দ ভালা না। ওই যে আমগো নওশাদে একটা বিয়া কইরা আনছে, একেবারে খারাপ মাইয়া। ব্যবহার ভালা না। নাজিরে আনছে আকাইম্মা ধইরা। উচ্চ বংশীয় থাকলে কী হইবো? সংসারের কাম পারে না।”

নাজির শুনে রাগ করল না। স্বাভাবিক স্বরে বললো, “উচ্চ বংশীয়, চালচলন ভালা, চোগলখোরী করতে পারে না, কাইজ্জা করতে পারে না, জামাইয়ের মুখে মুখে তর্ক করে না, দেখতেও সুন্দর। এমন মাইয়া পায় কয়জন? সংসারের কাম আস্তে আস্তে শিইখা যাইবো। সবাই কী আর সব কিছু শিইখা আইয়ে? আমি তো হুনছি বিয়ার পর আমনেও নাকি কিছু পারেন নাই। সব কাম করছে আমার মায়।”

চট করে মাথা তুলে তাকালেন ফরিদা। অসাবধানতায় কড়াই থেকে গরম তেল ছিটকে এলো হাতে। সেদিকে গুরুত্ব না দিয়ে বললেন,“তোরে কেডায় কইছে এইসব?”

“মাইনষের কী আর অভাব আছে?”

“হের নাম মুখে নিবি না। জামাই, পোলাপাইন রাইখা পলাইছে। সহ্য হয় না।”

“আমনে দেখছেন যে পলাইছে?”

সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিতে পারলেন না ফরিদা। মর্জিনা বললেন,“আমি তো বাপের বাড়িত আছিলাম। তহন আমার পেডে শাহরিয়ার। তিন মাস মনে হয় চলে। তোর দাদার কাহিনী হুইন্না আমার বাপজানে আমারে লইয়া গেলো। কইলো, এই অবস্থা লইয়া এই বাড়িত থাকতে হইবো না। তোর চাচায়ও সায় দিছিলো। তাই নাজমুলরে লইয়া উনেই আছিলাম। যাওয়ার আগেও দেইখা গেলাম মেজো বুবুরে। হাসি খুশি মানু, সারাদিন শুধু সংসারের কাম আর তগো দুই ভাইরে লইয়া ব্যস্ত থাকে। আতর ঘর থাইক্যা দুই দুইডা পোলাপাইন লইয়া বাড়িত ফিইরা হুনি সে নাই। রটনা ছড়ছে, বাপের বাড়ির কোন পোলার লগে নাকি রাইতের আন্ধারে পলাইছে।”

“আমনের বিশ্বাস হইছে কথাডা?”

“তা তো হয় নাই। মানুষ ভালা আছিলো। আমারে ধইরা ধইরা সংসারের সব কাম শিখাইছে। বিদায়ের দিনও কত উপদেশ দিছিলো! সেই মানুষ এমন কাম করছে তা কী বিশ্বাস হয়? কিন্তু বড়ো বুবু কইলো…

ফরিদা ছ্যাৎ করে উঠলেন,“চুপ থাক। পোলাপাইন আছে বাড়িত। এহন আর অতীতের নষ্টামি টাইনা আনার দরকার কী? যা হওয়ার হইছে।”

“কেডায় জানে, আসলেই পলাইছে নাকি অন্য কিছু ঘটছে?”

“অন্য কিছু ঘটছে মানে? তোর মাথায় কে ঢুকায় এইসব? আজেবাজে সঙ্গ বাদ দে। তোর চাচায় অনেকবার আমারে কইছে, খারাপ মাইনষের লগে চলোস। কিন্তু আমি তো বিশ্বাস করি নাই। এহন তার ফল নিজ চোখে দেখতাছি। কাম নাই? অন্যদিন তো ডাইকাও বাড়িত পাওয়া যায় না।”

নাজির সন্দেহ নিয়ে কিছুক্ষণ মহিলার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর শুরু করল দোলনা বাঁধার কাজ,“না নাই, এত কাম কইরা লাভ কী? দুনিয়াত আমনেরা ছাড়া সবাই শুধু খারাপ।”

ঘটনাটা আর বেশি ঘাঁটানো হলো না। যহরের আজান দিতেই গোসল সেরে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ে এলো নাজির। বাড়ির নারীরাও আগে আগেই রান্না শেষ করে নামাজ পড়ে খাবার বাড়ছে। সেই খাবার নিয়ে নাজির সর্বপ্রথম গেলো বাবার ঘরে। গতকাল আকবর মিয়ার সঙ্গে দেখা করে বাড়ি ফিরে একটা ঘোরের মধ্যে ছিল ছেলেটা। সেই ঘোর তার কাটেনি। জীবনে যা দেখেছে, জেনেছে সব মনে হচ্ছে মিথ্যা। বিশ্বাস অবিশ্বাসের মাঝখানটায় এতদিন বন্দি ছিল সে।

ছেলেকে দেখতেই সুবহান আলী শাহ ইশারা ইঙ্গিতে প্রথমে জিজ্ঞেস করলেন, সে কোথায় ছিল। নাজির সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলো না। কয়েক লোকমা খাইয়ে বললো,“বাড়িতেই আছিলাম। তোমার বৌমার অসুখ। নিজের খেয়ালই রাখতে পারে না।”

উদ্বিগ্ন হলেন লোকটা। নাজির আশ্বস্ত করল,“চিন্তা কইরো না। ঠিক হইয়া যাইবো।”

তবুও চিন্তা কমলো না। উল্টো ছেলেকেই ধমকাতে লাগলেন। নাজির শুকনো হাসলো,“পোলার বৌয়ের লাইগা এত দরদ? বাব্বাহ!”

খাওয়ানো শেষে হাত ধুয়ে বাবার মুখ মুছিয়ে দিলো। কিছু সময় চুপ থেকে গম্ভীর হয়ে বললো,“কাইল আকবর মিয়ার লগে দেখা হইছিল। বেলাই গেছিলাম মাছ ধরতে। অনেক কথাই হইছে, অনেক কিছুই জানছি। এহন আসল কথায় আসি। আমার আর ভাল্লাগতাছে না, আব্বা। এই মিছা নাটক অনেক হইছে। আমনের থাইক্যা এইবার আমি সব জানতে চাই। আমনে ছাড়া এই দুনিয়ার আর কোনো মানুষরে আমি বিশ্বাস করি না, আব্বা। আমারে আর ধোঁয়াশার মধ্যে রাইখেন না। আমনের এই অবস্থা কেডায় করছে?”

স্থির দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন সুবহান আলী শাহ। বিচলিত হয়ে হাত চেপে ধরলেন ছেলের। আগেও বেশ কয়েকবার এই প্রশ্ন নাজির তাকে করেছে। কিন্তু উত্তর না পেয়ে, অস্থির হতে দেখে একপর্যায়ে থেমে গিয়েছে। তবে আজ আর তার মায়া হলো না। পুনরায় জিজ্ঞেস করল,“কেডায় করছে? মাস্টর বাড়ির ওই বুইড়া আর তাঁর পোলারা?”

সুবহান আলী শাহর চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। শরীরে অদ্ভুত এক কম্পনের সৃষ্টি হয়, শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বৃদ্ধি পায়। নিজের হাত ছাড়িয়ে বাবার হাত চেপে ধরলো নাজির। বললো,“চুপ থাইক্যা লাভ কী? আমনের চুপ থাকাতে কী কেউ ভালা আছে? আমনে ভালা আছেন? আমার মায় ভালা আছে? নাকি আমি আর নওশাদ ভালা আছি? আমার ভিতরটা কহনো কেউ দেখে নাই, আব্বা। কেউ কহনো মাথায় হাত দিয়া জিগায় নাই, কেমন আছোস নাজির? আমি আছি তুই চিন্তা করিস না। কেউ কয় নাই। অসুখ হইলে কেউ মাথার কাছে বসে নাই। আমি যে কী কষ্ট করছি আমনেও তা দেখেন নাই। আমনের ভাইরা আমারে এই বংশের দোহাই দিয়া কোণঠাসা কইরা রাখছে। সবকিছু থাইক্যা বঞ্চিত কইরা এহন নজর দিছে আমার পরিশ্রমের ফসলে। অথচ আমি কিছুই করতে পারি না। কতটা অকৃতজ্ঞ, কন তো?”

অবাক হলেন লোকটা। সর্বদা হাসিখুশি থাকা ছেলের চোখে চিকচিক করা অশ্রু দেখে, মুখ থেকে অভিযোগ শুনে অসহায় হয়ে উঠলেন। দুদিকে মাথা নাড়াতেই নাজির চট করে জিজ্ঞেস করল,“মাস্টর বাড়ির কেউ করে নাই?”

আবারো দুদিকে মাথা নাড়ালেন।

“আর আমার মা? সে হাছাই পলাইছে, আব্বা?”

উত্তর একই। নাজিরের দেহটা দোলাচল খেয়ে গেলো। এই জীবনটাই তার ভ্রান্ত বিশ্বাসের উপরে কাটলো। দুর্বল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,“তো কই সে, আব্বা? আমনে আছেন কিন্তু সে নাই। ক্যান? এত ঘৃণা কারে করলাম আমি?”

এই পর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন তিনি। হাউমাউ করে বাচ্চাদের মতো কাঁদছেন। কিন্তু নাজির কাঁদতে পারে না। কান্না শব্দটা তার সাথে যায় না। যখন তার কান্নার বয়স ছিল তখন সে ছোটো ভাইয়ের কান্না থামাতে ব্যস্ত ছিল। তাই কান্না তার জন্য নয়। দুর্বল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,“সে আদৌ বাইচ্চা আছে তো, আব্বা?”

উত্তর দেওয়ার মতো অবস্থায় রইলেন না সুবহান আলী শাহ। নাজির চেয়ে চেয়ে শুধু বাবাকে দেখলো। আরো কত প্রশ্ন তার করার আছে! আরো কত উত্তর জানার আছে! কিন্তু করতে পারে না। ওই কান্নাই যেন বুঝিয়ে দেয় তার বাবা ঠিক কতটা অসহায়। কতটা ঝড় সহ্য করে বেঁচে আছে এই পৃথিবীর বুকে।

চলবে __________

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here