#যাত্রাপথ
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:৫৮]
ফাল্গুনের শেষ সকাল। রোদের উত্তাপে ঝিমিয়ে পড়া সোনালী ধানের ক্ষেতে সেচ দিচ্ছে কৃষাণের দল। এই বছর ফসলে পোকার আক্রমণ বেড়েছে। তাই দুবেলা ছিটাতে হচ্ছে কিটনাশক। নাজির উঁচু ঢিবিতে বসা। মুখে গামছা বেঁধে ফসলে কিটনাশক ছড়াচ্ছে লতিফ আর মোখলেছ। একটু পরপর চিৎকার করে তাদের দিকনির্দেশনা দিচ্ছে সে,“বামে দেস না ক্যান, ব্যাডা? ওই পাশের গুলায় লাগেই নাই। একটা ধানও যদি নষ্ট হয়, দুইডার কপালেই দুঃখ আছে।”
তার কথার মধ্যেই সেখানে এসে উপস্থিত হলেন আমিরুল শাহ। নিজের জমি পরিদর্শন করে সোজা এখানে এসেছেন। লুঙ্গিতে এখনো কাঁদা লেগে আছে। মাথার উপরে ছাতা ধরে পাশেই দাঁড়িয়েছে আব্বাস। খুক খুক কেশে দুই হাত পেছনে রেখে বলে উঠলেন, “এইবারেও তোর ভালাই ফলন হইবো মন হইতাছে। আমারটায় গিয়া দেহি পোকে ধরছে। তোর ভাগের জমিডা ভালা পড়ছে।”
কথা থামিয়ে বসা থেকেই সেদিকে তাকালো নাজির। হেসে বললো,“সবই আল্লাহর রহমত, চাচা।”
মাথা নাড়ালেন তিনি। নাজিরকে উঠতে না দেখে নিজেই ঘাসের উপর বসে পড়লেন। কিছুক্ষণ নীরব থেকে জিজ্ঞেস করলেন,“সিরাজে কই, নাজির? এত খুঁজলাম, কিন্তু!”
ভ্রু জোড়া কুঁচকে গেলো নাজিরের। বললো,“এমন কইরা জিগাইতাছেন যেন আমিই তারে হামলাইয়া রাখছি?”
“রাখোস নাই?”
“কোনো কারণ আছে?”
“নাই কইতাছোস? তরতাজা একটা মানুষ কেমনে গায়েব হইয়া যায়?”
“আমি তো কারণ দেহি না। হেয় আমার কোন পাকা ধানে মই দিছে যে তারে আমি হামলাইয়া রাখমু? আর রাখলেও কই রাখমু? আমনেরা খুঁইজা পাইতেন না?”
আমিরুল শাহ কী জবাব দিবেন বুঝে উঠতে পারেন না। চোখে সন্দেহ নিয়ে তাকিয়ে থাকেন ভাতিজার দিকে। একদিন এই পৃথিবী থেকে যেভাবে সোহেল হারিয়ে গিয়েছিল ঠিক সেভাবেই হারিয়ে গিয়েছে তার পিতা সিরাজ উল্লাহ। তবে সোহেলের দেহাবশেষ মিললেও সিরাজের শেষ চিহ্নটুকুও পাওয়া যায়নি কোথাও।
এ নিয়ে আমিরুল শাহর চিন্তার শেষ নেই। যাকে পান তাকেই সন্দেহের চোখে দেখেন। নিখোঁজের সপ্তাহ খানেক পর একদিন পিতাকে খুঁজতে শাহ বাড়িতে সাদ্দাম এসেছিল। মাঝেমধ্যেই বাড়িতে না জানিয়ে লোকটা বোনের বাড়ি চলে আসতেন। তাই ছেলে বউ ভেবেছিল এবারেও হয়তো সেখানেই আছে। তাই প্রথমে এত খোঁজ করেনি। কিন্তু সপ্তাহ পেরোতেই নতুন চিন্তার উদয় হলো। শুরু করল খোঁজাখুঁজি। তার থেকে সংবাদ পেয়েই বুঝতে আর বাকি রইলো না যে লোকটা কয়েকদিন ধরে নিখোঁজ।
আমিরুল শাহ তৎক্ষণাৎ লোক লাগিয়ে শ্যালককে অনেক খোঁজা খুঁজেছেন। আচানক কোথায় গায়েব হয়ে গেলো সে? যেই লোভী প্রকৃতির মানুষ! এত সহজে গা ঢাকা দেওয়ার তো নয়। তবে কী কোনো বিপদ হয়েছে? যত ভাবেন ততই ধীরে ধীরে আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন। এইতো কয়েকদিন আগে ইউনিয়নের নির্বাচন শেষ হয়েছে। চেয়ারম্যান পদে এবার বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন নূরুজ্জামান। আতাউর রহমান এখন লাঠি নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটেন। গত কয়েক বছর জনসাধারণের উপর যেই অত্যাচার জুলুম করেছিলেন! তার ফলস্বরূপ এবার আর ইউনিয়ন থেকে বেশি একটা ভোট পাননি। প্রচারণাও ছিল কম, সাথে ছিল অসুস্থতা। আমিরুল শাহ এ নিয়েও ভীষণ চিন্তিত। সব জারিজুরি ক্ষমতা এত সহজে শেষ হয়ে যাবে ভাবতেই পারছেন না যেন।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,“তুই হঠাৎ এত শান্ত ক্যান, নাজির?”
“তো কী চিল্লামু?”
“আমি যতটুকু চিনি জানি, তুই শান্ত থাকার মানুষ না। সব কিছু জানার পর তো আরো না।”
চোখেমুখের প্রবল আত্মবিশ্বাস সরে সেখানে ঠাঁই পায় কৌতূহল। নাজির ঘাড় ঘুরিয়ে চাচার দিকে পুনরায় তাকালো। মিলিত হলো দুজনার কঠোর দৃষ্টি। হাতের ইশারায় আব্বাসকে দূরে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন আমিরুল শাহ। বললেন,“তোর চাচীর কথাই কী তবে হাছা? সোহেলরে কী তুই?”
দৃষ্টি সরিয়ে নিলো নাজির। এবার শব্দ করেই হেসে ফেলল। তার চাচাটা না! নাজির কী ভেবেছিল আর তিনি কী বলছেন। যদি জানতে পারেন শুধু সোহেল নয়, সাথে সোহেলের বাপকেও এই পৃথিবী থেকে খুব কষ্ট দিয়ে বিদায় দিয়েছে সে, এমনকি বহু বছর আগে করা তাদের পাপের কথাও সে জেনে গিয়েছে। তখন কী হবে? নাজিরের হাসি আরো চওড়া হয়। মনে মনে আওড়ায়,“জানার আগে আমনেরেও পথ থাইক্যা সরাইয়া দিমু, চাচা। তহন আমনে অনেক আফসোস করবেন, ক্যান যে সুবহান আলীর পোলা দুইডারে বাঁচাইয়া রাখলাম?”
আমিরুল শাহর ভেতরে আজ বহুদিন পর ভয় দেখা দিলো। এই হাসিটাই যেন তাঁর সব প্রশ্নের উত্তর। মাটি আঁকড়ে ধরে বললেন,“আমি বিশ্বাস করি নাই। সামিউলের মায়, সিরাজ কওয়ার পরেও বিশ্বাস করি নাই। আমি আরো কইছি, নাজির আর যাই হোক মানুষ মারতে পারে না।”
“ক্যান? আমিরুল শাহ পারলে নাজির শাহ ক্যান পারবো না? নাজিরের কী মন নাই? কষ্ট নাই? নাজিরের কী বাঁচার অধিকার নাই? সুন্দর জীবন পাওয়ার ইচ্ছা নাই?”
প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন না তিনি। নাজিরের হাসি থেমে গেলো, চোয়াল হলো শক্ত। বললো,“আমার লগে এতকাল যা করার করছেন। আমি মুখে অনেক কিছু কইলেও সরাসরি প্রতিবাদ করি নাই। আমনেগো কাছে কিচ্ছু চাই নাই। যা করার নিজে করছি, শেষে শুধু একটু ভালো থাকতে চাইছি। বউ লইয়া শান্তিতে সংসার করতে চাইছি। এতটুকুও আমনেরা সহ্য করতে পারলেন না? ফরিদা বানুরে তো আমি নিজের মা মনে করছি, হেয় কেমনে পারলো এমন করতে? দেওরের পোলা বইল্যাই কী? যাক গা, যা হওয়ার হইয়া গেছে। আমার কোনো অপরাধবোধ নাই। যা করছি নিজের লাইগা, নিজের বউয়ের লাইগা করছি। আমনে তো জানেনই, নাজির শাহ আল্লাহ ছাড়া আর কাউরে ডরায় না।”
“তবুও তো পাপ! মানুষ মারা বড়ো পাপ। সবার লগে পাপ যায় না।”
“দুনিয়াতে কী সবাই পবিত্র? কাউরে পবিত্র রাখার লাইগা একজনরে না একজনরে পাপ করতেই হয়। আমি পাপ না করলে আমার বউ অপবিত্র হইতো, আমার সুন্দর একটা সংসার নষ্ট হইতো, হয়তো বাপ হওয়ার আনন্দ কী জানতেই পাইতাম না। নিজের মানুষের লাইগা মানুষ অনেককিছুই করতে পারে। এইডা তো সামান্য একটা খুন!”
ঘামে আমিরুল শাহর পরনের পাঞ্জাবী ভিজে উঠেছে। দুদিনের স্ত্রীর জন্য যার কাছে খুন সাধারণ ব্যাপার, সে যখন জানতে পারবে তার বাবা-মায়ের পরিণতির কথা তখন কী হবে? অনেক কষ্টে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,“আমারে বাড়িত লইয়া চল, আব্বাস। আইজ অনেক গরম পড়ছে।”
আব্বাস দৌড়ে এসে মালিকের হাত ধরলো। অপর হাতে মাথার উপর ছাতা ধরে চললো বাড়ির পথে। নাজিরের মধ্যে কোনো ভাবান্তর লক্ষ্য করা গেলো না। না দেখা গেলো ভয়। সে ওখানেই বেখেয়ালে ঠাঁয় বসে রইলো।
________
ঘর গোছানো, খাওয়া-দাওয়া বাদে সংসারের যাবতীয় কাজ মিছরির জন্য নিষিদ্ধ। বিয়ে খেয়ে বাপের বাড়ি থেকে ফেরার সপ্তাহ খানেক পরেই তাকে শহরে নিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে এনেছে নাজির। দাদীর সন্দেহ ভুল নয়। আসলেই মেয়েটা গর্ভবতী। এ নিয়ে নাজিরের খুশি যেন ধরে না। আশেপাশের সবাইকে ধরে ধরে মিষ্টি খাইয়েছে। সাথে ঘোষণা দিয়েছে, সন্তান হওয়ার পর গ্ৰামবাসীকে একবেলা ভোজন করাবে। যা কাজ মিল্টনের মেজো বোন এসেই করে দেয় এখন। সাথে বোন রূপী জা শালিক তো আছেই।
ফরিদা সেসব দেখে মুখ বাঁকালেন,“দুনিয়াত আর কেউর তো পোলাপাইন হয় নাই। যত ঢং! নয় মাসের পেট লইয়া তিনবেলা ভাত রানছি, সকালে আতরঘরে নাড়ি ছিঁড়া পোলাপাইন জন্ম দিয়া দুপুরে রানছি। তো হইছে কী? এহনো তরতাজা শরীর।”
মিছরি জবাব দিলো না। এই মহিলাকে সে মনে প্রাণে ঘৃণা করে। ভাইরা জানলে এতদিনে এর জবান কেটে নিতো।মিল্টনের বোন চুমকিকে তাগাদা দিয়ে বললো, “আলুটা লম্বা লম্বা করে কাটো। কাটা শেষ হলে চাল ধুয়ে চুলায় বসিয়ে দিও। বাদবাকি রান্না আমি করে নেবো।”
“নাজির ভাই আমনেরে চুলার পাড় যাইতে দিতে নিষেধ করছে, ভাবি।”
“রাখো তোমার ভাইয়ের কথা। উনি বেশি বেশি করেন। প্রথম বাপ হতে যাচ্ছেন তো।”
চুমকি মুচকি হাসলো। শালিক এসে বসলো পাশে। গতকাল বাপের বাড়ি থেকে ফিরেছে। নওশাদ গিয়ে নিয়ে এসেছে। বললো,“নিষেধ করছে যহন দরকার নাই। তুই পাশে বইয়া থাকিস, আমিই রানমু।”
“তুই পারিস?”
“তোর মতো নাকি? শালিক সব পারে।”
তাদের দেখে ফরিদা বসে এখনো বিড়বিড় করছেন। শিউলি, বিথী মিলে নামার জমি থেকে শুকনো পাতা টাবায় করে এনে উঠোনের রোদে মেলে দিচ্ছে। বড়ো আম গাছটার ছায়ার নিচে পিঁড়ি পেতে বসে মর্জিনা চাল বাছছেন। জিজ্ঞেস করলেন,“এহনো আমনের ভাইরে খুঁইজা পান নাই? এত বড়ো একটা মানুষ গেলো কই?”
“শকুনের নজর লাগছে। প্রথমে আমার ভাইপুতরে খাইলো, এহন আবার আমার আমার ভাইডারে। কই গেছে? এমনে তো নিখোঁজ হওয়ার মানুষ আমার ভাই না। বিলকিসের জামাইও খুঁজছে, পায় নাই। হুনছি শেষ নাকি বাজারের চায়ের দোকানে দেখা গেছিলো। তারপর আর কেউ দেহে নাই।”
“হেরে কেডায় কী করবো? করলে তো এত বছরেই করতে পারতো। কানাওলায় ধরে নাই তো?”
ফরিদা কিছুক্ষণ থম মেরে বসে রইলেন। গ্ৰামবাংলায় প্রচলিত কানাওলা এক ধরণের অপ্রাকৃতিস্থ রোগ বা জ্বীনের আছড়। যখন কোনো মানুষ কানাওলার পাল্লায় পড়ে, তখন সে নিজের চেনা জায়গাকেও অচেনা মনে করে। এতে মানুষ দিকভ্রান্ত হয়ে একই পথে বারবার ঘুরতে থাকে। বেশিরভাগ সময় এটি ঘুমন্ত মানুষদের নিয়ে খেলা করে, স্মৃতি বিভ্রাট ঘটিয়ে খাল-বিলে নিয়ে ডুবিয়ে মারে। এমন ঘটনা গ্ৰামে অহরহ ঘটছে।
ফরিদার মনে সন্দেহ ডানা বাঁধে। তার সঙ্গেও এমন ঘটনা দুয়েকবার হয়েছে। ঘুমের ঘোরে রাতের বেলা দরজা খুলে বেরিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। তৎক্ষণাৎ স্বামী তাকে ধরে নিয়েছিলেন। ঘুম থেকে জেগে তো তাঁর আর কিছুই মনে পড়ে না। ভাইয়ের সঙ্গে এটাও হতে পারে। নাজির না হয় সোহেলকে হত্যা করেছে তার স্ত্রীর ঘরে ঢুকে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করায়। কিন্তু সিরাজকে কেন খুন করতে যাবে? সে কী আদৌ কিছু জানে? জানলে তাদের কেন কিছু বলছে না? চুপ থাকার ছেলে তো নাজির নয়।
“এত কী চিন্তা করতাছেন, বুবু?”
মর্জিনার কথায় হুঁশ ফিরলো ফরিদার। ভাবুক কণ্ঠে বললেন,“ভুল কিছু কস নাই। এইডাও হইতে পারে। আমারে আর তোর ভাসুররেও কয়বার যে ধরছিল! সময় মতন টের পাইয়া একজন আরেকজনরে রক্ষা করতে পারছি। সিরাজটারে কতবার কইছি, একলা একলা রাইতে বাহির হইস না। কিন্তু হুনলোই না। এহন ফল ভুগতাছে।”
“চিন্তা কইরা লাভ নাই। কানাওলা ধরা মানুষ সহজে পাওন যায় না। পাইলেও সুস্থ অবস্থায় পাওয়ার তো চিন্তাই করা উচিত না। আল্লাহ রক্ষা করুক।”
ফরিদা আর কথা বাড়ালেন না। পুত্রবধূকে চুলায় ভাত বসানোর নির্দেশ দিয়ে পটের বিবি সেজে বসে রইলেন বারান্দায়। অসুস্থ আমিরুল শাহকে ধরে ধরে বাড়িতে নিয়ে এলো আব্বাস। কাচারি ঘরে কেদারায় বসালো। ফরিদা স্বামীর এই অবস্থা দেখে পিছুপিছু দৌড়ে এলেন। জগ থেকে গ্লাসে পানি ভরে টেবিলে রেখে ফ্যান ছেড়ে দিলেন। বিচলিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, “আমনের আবার কী হইলো? ভালা, সুস্থ মানুষ ঘর থাইক্যা বাহির হইলেন। এহন এই অবস্থা ক্যান? ঘাইমা কী হইছে!”
আমিরুল শাহ জবাব না দিয়ে কেদারায় হেলান দিয়ে চোখ বুজে বসে রইলেন। আব্বাসকে আদেশ দিলেন, “মুমিন কইরে, আব্বাস? আইতে ক ওরে। হেরপর তুই বাড়িত যাইস গা। আইজ আর আইতে হইবো না।”
আব্বাস মালিকের বিশ্বস্ত লোক। তিনি যা বলেন তাই বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে চলে। তাই মাথা নাড়িয়ে চলে গেলো। মুমিনুল শাহ বাড়িতে নেই। কোথায় গিয়েছে কে জানে? তবুও রোদ মাথায় নিয়েই আব্বাস তাকে খুঁজতে বের হলো।
মুমিনুল শাহ এলেন দুপুরে। খাবার খেয়েই অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করলেন কাচারি ঘরে। আমিরুল শাহ ততক্ষণে খেয়ে এসে চুরুট ধরিয়েছেন। বেশি চিন্তিত হলে একের পর এক চুরুট টানতে থাকেন তিনি। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। মুমিনুল শাহ ভাইয়ের সম্মুখ কেদারায় বসলেন। টেবিলে রাখা কিছু কাগজ পত্র নাড়াতে নাড়াতে জিজ্ঞেস করলেন,“ডাকছিলা, ভাইজান?”
“হ, অনেকদিন এই ঘরে আইয়োস না যে?”
“আর কইয়ো না, ধানের মৌসুম না এহন? সারাক্ষণ দৌড়ের উপর থাকতে হয়। ব্যবসায়ও মন্দা যাইতাছে।”
“কয়দিন পর তো আরো মন্দা যাইবো। ফাল্গুন শেষে চৈত আইতাছে। খড়া পড়লে সব শেষ।”
“এর লাইগা জরুরী পণ্যগুলা গুদামে রাখার চিন্তা করতাছি।”
প্রত্যুত্তর করলেন না তিনি। ঘরে নেমে এলো নীরবতা। শুধু শোনা যাচ্ছে বাইরে থেকে ভেসে আসা মুরগি ছানাদের কিচিরমিচির। মুমিনুল শাহ অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,“ক্যান তলব করলা কইলা না তো, ভাইজান।”
“নাজিররে তোর সন্দেহ হয় না?”
“সন্দেহ হইবো ক্যান?”
“ভবিষতে আমগো বিপদ হইতে পারে জাইনাও সেই রাইতে বাঁচাইছিলি ক্যান ওরে?”
“আমি বাঁচাইলাম কই, ভাইজান? ভাবি যা কইছে তাই তো করছি।”
কিছুক্ষণের জন্য আবারো চুপ রইলেন আমিরুল শাহ। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,“মাস্টর বাড়ির লগে সম্পর্ক ঠিক হওয়ার পর থাইক্যা ওর সাহস দিন দিন বাড়তাছে। এমনিতেই ওরে আমার ডর লাগে, এহন তো কইলজা কাঁপে। কী করমু, মুমিন? আমরা মনে হয় বড়ো কাঁচা কাম কইরা ফেলাইছি। আতাউর এইবার হাইরা গেলো, নূরুলের লগে মাস্টর বাড়ির মাইনষেগো সম্পর্ক অনেক ভালা। বুইড়া আকবরে হের বিয়ার সাক্ষী হইছিল। হেরপর থাইক্যাই যাতায়াত লাইগা থাহে। তার উপরে সিরাজ নিখোঁজ। কী করমু আমি? কয়দিন ধইরা রাইতে আমার ঘুম আইয়ে না। হাত গুটাইয়া তো আর বইয়া থাকা যাইবো না।”
“কী কও, ভাইজান? তুমি ওই নাজিররে ডরাইতাছো? ছুডো মানুষ, কী করবো ওয়? কিছু করলে নিজে বাঁচতে পারবো? আমগো পোলারা আছে না?”
“পোলা! সামিউল বাদে আমার আর কাউরে বিশ্বাস হয় না। বাদবাকি সব কয়ডা নাজিররে ডরায়। একটা ধমকেই কাঁপে। আমার পারভেজ তো আরেকটা পাডা।”
“আমি আছি না? আমি থাকতে কীয়ের এত চিন্তা তোমার? এতকালও কিছু হইতে দেই নাই, ভবিষ্যতেও দিমু না। তোমার জীবনে এত জটিলতা কবে থাইক্যা আইছে জানো?”
“জানি, তোর ভাবিরে বিয়া করা, হের ভাইরে এই বাড়িত জায়গা দেওয়ার পর থাইক্যা।”
“আব্বার কথা হুনলে আমগো এইদিন দেখা লাগতো না। যদি হেইদিনই ওই মহিলারে তুমি তালাক দিতা, যেইদিন আম্মার গায়ে হাত তুলছিল। তাইলে হয়তো আমগো জীবন আইজ অন্যরকম হইতো।”
“তোরও এই কথা মনে হয়, মুমিন? আমারো মনে হয়। খুব আফসোস হয়। কিন্তু লাভ কী? সময় তো শেষ। যহন বিয়াডা করছিলাম তহন অসহায়, ছুডো একটা মাইয়া আছিলো। সেই মাইয়া মানু… সংসার অনেক জটিল রে, মুমিন। অনেক জটিল।”
মুমিনুল শাহ মাথা নাড়িয়ে বিড়বিড় করেন,“আসলেই সময় শেষ। সময় গেলে সময় আর ফিইরা আইয়ে না।” কিন্তু মুখে আশ্বস্ত করে বললেন,“উড়তে দেও, ভাইজান। ওর ব্যবস্থা আমি করমু। ধানের কাম আগে শেষ করি।”
নওশাদ শহরে গিয়েছে। আজকাল প্রায়শই বিশেষ কোনো কাজে শহরে যায় ছেলেটা। প্রথমে জমিজমার কিছু জরুরী কাগজপত্র সংগ্রহ করে গেলো পাসপোর্ট অফিসে। বেশ কয়েক মাস ধরে দৌড়াদৌড়ি করতে হচ্ছে সেখানে। সাথে আরো কিছু প্রয়োজনীয় কাজ তো আছেই। নতুন বউয়ের জন্য কেনাকাটা করতে নাজির তাকে কিছু টাকা দিয়েছিল। এসব আর তার ভালো লাগে না। নিজের কাছেই ছোটো ছোটো লাগে। এখনো ভাইয়ের থেকে হাত পেতে টাকা নিতে হচ্ছে। অথচ সে ভাইয়ের জন্য কিছুই করতে পারেনি। তাই তো শেষ পর্যন্ত বিদেশে যাওয়ার জন্য রাজি হয়েছে। তার বিদেশে যাওয়ার জন্য এক জোড়া গরু বিক্রি করে দিয়েছে নাজির, এমনকি সামাদ মিয়ার কাছে বন্ধক রেখেছে ফসলি জমি আর স্বর্ণের বেশকিছু গহনা। অন্তত সেসব ছাড়িয়ে ভাইয়ের জন্য কিছু করতে হলেও তাকে এই দেশ ছাড়তে হবে।
প্রতিজ্ঞা করেছে নওশাদ, এবার সে আর আবেগের পেছনে ছুটবে না। কঠোর পরিশ্রম করে নিজেদের জীবন বদলাবে। শ্বশুর অর্থ দিয়ে সাহায্য করতে চেয়েছিল। নাজির রাজি হয়নি। উল্টে ভাইকে বলেছে,“আর যাই কর, শ্বশুরবাড়ি থাইক্যা কিচ্ছু নিবি না। একবার নিলে সারাজীবন এই খোটা শুনতে হইবো। মাথা উঁচা কইরা চলতে পারবি না। এই যে আমারেও ঘর সাজানি দিতে চাইছিল, কিন্তু আমি নেই নাই।”
প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করতে করতে বিকেল হলো। দোকান থেকে বের হওয়ার অভিমুখে হঠাৎ দেখা হয়ে গেলো পরিচিত মুখের অধিকারীর সঙ্গে। নওশাদ খুব একটা অবাক না হলেও সামনের মানুষটা যে অবাক হয়েছে বুঝাই গেলো। নওশাদ পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। লিলির যেন তা সহ্য হলো না। পাশের পুরুষটির হাত ছেড়ে দু কদম এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল,“চিনতে পেরেছো?”
বাধ্য হয়েই থেমে দাঁড়ালো নওশাদ। তবে হাসলো না সে। বললো,“না চেনার কিছু নেই। কেমন আছো?”
“স্বামী, সংসার নিয়ে ভালোই। তুমি?”
উত্তর না দিয়ে অপরিচিত লোকটার দিকে তাকালো নওশাদ। লিলি হয়তো বুঝতে পারলো,“আমার স্বামী আসাদ।”
একে অপরের সঙ্গে সাক্ষাৎ বিনিময় করল উভয়ে। তবে নওশাদ কথা বাড়ালো না। একপলক মেয়েটাকে দেখে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। খেয়াল করল, লিলি নামক মেয়েটির জন্য কোনো অনুভূতিই আর কাজ করছে না। এমনকি আজকের এই হঠাৎ সাক্ষাৎ কখনোই আশা করেনি সে। আসাদ তাড়া দিতেই মৃদু হাসলো লিলি। বললো,“তুমি যাও, আমি কথা বলে আসছি। বহুদিন পর উনার সঙ্গে দেখা হয়েছে। আবার কখনো দেখা হবে কিনা!”
“এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলার কী প্রয়োজন? চলুন ভাই, চা খেতে খেতে না হয় পরিচিত হওয়া যাবে।”
নওশাদ ভদ্রতার সহিত প্রস্তাব নাকোচ করে দিয়ে বললো,“না ভাই, আমার একটু তাড়া আছে।”
আসাদ মেনে নিলো। বুঝাই যাচ্ছে, পরপুরুষের সঙ্গে স্ত্রীর কথা বলা লোকটার পছন্দ নয়। নিতান্তই বাধ্য হয়ে আগে আগে দোকানের ভেতরে চলে গেলেন। সে যেতেই লিলি সুযোগ পেয়ে গেলো। কিছুটা কটাক্ষ করেই জিজ্ঞেস করল,“তো, কেমন চলছে দিনকাল? কী করছো আজকাল? চাকরি? ব্যবসা? নাকি যেভাবে রেখে এসেছিলাম সেভাবেই আছো?”
“দেখে তাই মনে হচ্ছে?”
“বুঝতে পারছি না। বিয়ে করোনি? নাকি এখনো পুরোনো স্মৃতি ভুলতে পারোনি?”
“তুমি এত তাড়াতাড়ি ভুলতে পারলে আমি কেন পারবো না? পাগলামি তো তোমারই বেশি ছিল।”
উত্তর পছন্দ হলো না লিলির। নওশাদ এবার কঠোর হলো খানিকটা,“সপ্তাহ দুয়েক আগে ভাইয়ের পছন্দে বিয়ে করেছি। মেয়ে সুন্দরী, উচ্চ বংশের। সম্পর্কে ভাবির ফুফুর মেয়ে। আর হ্যাঁ, সামনের মাসেই এই দেশ ছেড়ে সিঙ্গাপুর চলে যাচ্ছি।”
হাস্যোজ্জ্বল মুখখানা মলিন হয়ে গেলো লিলির। তা দেখে নওশাদ সন্তুষ্ট হলো। জিজ্ঞেস করল,“এবার সত্যি করে বলো, কেমন আছো? যেই সুখের আশায় আমায় ছেড়ে ছিলে সেই সুখের দেখা পেয়েছো?”
“পেয়েছি মানে? খুব সুখে আছি। আমার স্বামী আসাদ ব্যাংকের ম্যানেজার। শ্বশুরবাড়ির পরিবার বেশ সম্ভ্রান্ত। দেখে বুঝা যাচ্ছে না?”
“দামি শাড়ি, গহনা আর সুখের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। তোমার কপালে শুকিয়ে যাওয়া ঘা আর হাতের পোড়া দাগ দেখলেই বুঝা যায়। আজ আসি, ভালো থাকো। যদিও অন্যকে কষ্ট দিয়ে কখনো ভালো থাকা যায় না।”
নওশাদ আর দাঁড়ালো না। সোজা হেঁটে চলে গেলো নিজের গন্তব্যে। আজ আর তার কোনো পিছুটান বা মনখারাপ নেই। সেই ভার, আফসোস আজ থেকে লিলির। ওই তো মেয়েটার চোখ ঘোলাটে, জোরপূর্বক অধরে ধরে রাখা হাসি মিলিয়ে গিয়ে ফিরে এসেছে অসুখী রূপ। এভাবেই তো একদিন সে ছেলেটার হাত ছেড়ে চলে গিয়েছিল। কর্মফল বুঝি এটাই?
______
নাজিরের বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়েছে। সেই যে সকালে খেয়ে বেরিয়েছিল তারপর সারাদিনে আর বাড়ি ফিরেনি। তাই কলিমকে দিয়েই দুপুরের খাবার পাঠিয়েছিল মিছরি। ঘর্মাক্ত শরীর নিয়ে ঘরে আর সে ঢুকলো না। বারান্দায় দাঁড়িয়েই বললো,“লুঙ্গি, গামছা দড়িতে রাখো তো, বউ। দুইডা ডুব দিয়া আসি।”
মিছরি লুঙ্গি, গামছা নিয়ে বাইরে এলো। শাসন করার ভঙিতে বললো,“এখন আবার পুকুরে নামবেন? রোগ বাঁধানোর শখ হয়েছে? চুপচাপ কলপাড় থেকে গোসল সেরে আসুন। অবশ্যই সাবান মাখবেন।”
“আবার হুকুম দেয়?”
“যা বলেছি তাই করুন।”
“এহন আবার কল চাপতে হইবো! আচ্ছা, ঘরে যাও। হাইনজা বেলা পোয়াতি মাইনষে গো ঘরের বাহিরে আওয়া উচিত না। জ্বীনে আছড় করবো।”
“বয়স্কদের মতো কথাবার্তা।”
নাজির চোখ রাঙালো। মিছরি সেদিকে পাত্তা না দিয়ে ঘরে চলে গেলো। গোসল সেরে ঘরে এলো নাজির। দরজা আটকে বিছানায় শুয়ে পড়ল। সারাদিন পর পিঠের নিচে নরম বিছানা পেয়ে চোখে নেমে এলো শান্তির ঘুম।
“ভাত খাবেন না? খেয়ে তারপর ঘুমান।”
“এহন কীয়ের খাওয়া? এহন ঘুমামু, সারাদিন একটুও শুই নাই।”
লোকটার জন্য মিছরির মায়া হলো। তার কত খেয়াল রাখে, যত্ন করে অথচ নিজের বেলায় যত অযত্ন বেখেয়ালিপনা। বিছানায় বসে স্বামীর মাথায় হাত রাখলো সে। সমস্ত ক্লান্তি মুহূর্তেই যেন দূর হয়ে গেলো নাজিরের। বালিশ ছেড়ে মাথা রাখলো স্ত্রীর কোলে। বললো,“এই ঘরে তোমার অনেক গরম লাগে না?”
“গরম লাগবে কেন?”
“বিদ্যুৎ নাই, ফ্যান নাই, টিনের চাল তো রোদের তাপে সারাদিন গরম থাহে।”
“প্রথম প্রথম লাগতো, তবে এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছি।”
“মিস্ত্রির লগে আমি কথা কইছি। হেগো মিটার থাইক্যা তার টাইনা এইবার ঘরে একটা ফ্যান লাগামু।”
“কোনো প্রয়োজন নেই, ঘরে হাতপাখা আছে। টাকা কী গাছে ধরে? সারাদিন গাধার মতো খাটেন, আর প্রচুর খরচ করেন। কী প্রয়োজন ছিল চুমকিকে রাখার? এভাবে চলবে? বাচ্চা এলে তো খরচ আরো বাড়বে।”
“তোমার এত চিন্তা কীয়ের? আমার সন্তান আর যাই হোক, কহনো অভাবে মরবো না। আমি জীবনে যা পাই নাই আমার সন্তানরে সেই সবকিছু আমি দিমু। তোমারেও আর কোনো কষ্ট দিমু না। শুধু আরেকটু সময় দাও, আরেকটু ধৈর্য ধরো।”
“আমি আপনাকে বিশ্বাস করি।”
নাজির চোখ বন্ধ করেই হাসলো। এতদিন পর মিছরি খেয়াল করল, গায়ের রঙ তামাটে হলেও লোকটা সুদর্শন, সুপুরুষ। হাসিটা চমৎকার। মনোযোগী দৃষ্টিতে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে এই প্রথম ভয়ংকর একটা কাজ করে ফেলল সে। উবু হয়ে পুরুষ দেহের খসখসে ঠোঁটে গভীর চুম্বন করল।
চলবে _________

