যাত্রাপথ লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই [পর্ব:৬২]

0
25

#যাত্রাপথ
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:৬২]

উঠোনে, রান্নাঘরে বাড়ির গৃহিণীরা যে যার কাজে ব্যস্ত। ফরিদার হঠাৎ চিৎকারে হাতের কাজ ফেলে সবাই দৌড়ে এলো আমিরুল শাহর দালানে। ফটকের বামে অবস্থিত কাচারি ঘরের সম্মুখে মোজাইক টাইলসের উপর আমিরুল শাহর নিথর দেহ পড়ে আছে। মাথার নিচ থেকে চুইয়ে পড়ছে রক্ত। উদ্ভ্রান্তের মতো স্বামীর কাছে মেঝেতে গিয়ে বসে পড়লেন ফরিদা। মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে গাল চাপড়ে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন,“হায় আল্লাহ! কী হইছে আমনের? ও সামিউলের বাপ, কথা কন। সুস্থ মানুষডা এমনে পইড়া রইছে ক্যান? কথা কন আমনে।”

স্ত্রীর ডাকে তিনি সাড়া দিলেন না। মৃত মানুষ কী কখনো সাড়া দেয়? কচু শাক ভাপে বসিয়ে ঘরে এসেছিলেন ফরিদা। ঘরে বিদ্যুৎ নেই, লোকটা খুব একটা গরম সহ্য করতে পারে না। দেখা যাবে, গরমে অতিষ্ঠ হয়ে রেগে গিয়েছেন। রেগে গেলেই তাঁর প্রধান কাজ স্ত্রীর গায়ে হাত তোলা। ভাইটা নিখোঁজের পর থেকে সাহস যেন আরো বেড়েছে। ক’দিন অসুস্থ থাকায় যা একটু রক্ষে। তাই বিলম্ব না করে হাতপাখা নিয়ে সেদিকে ছুটলেন তিনি। স্বামীকে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখে অবাক হলেন। যাওয়ার আগে কাচারি ঘরে দেবরের সঙ্গে তাকে কথা বলতে দেখে গিয়েছিলেন। সেই মানুষটার একি হাল?

মর্জিনা পুত্রবধূকে দিয়ে পুকুর থেকে বালতি ভরে পানি আনালেন। বিথীর উদ্দেশ্যে বললেন,“এনে দাঁড়াইয়া রইছো ক্যান? যাও, শ্বশুরের মাথায় পানি ঢালো।”

বিথী কী করবে বুঝতে পারছে না। চাচী শাশুড়ির নির্দেশে বালতি নিয়ে এগিয়ে গেলো। ওই অবস্থায় মগ দিয়ে একনাগাড়ে মাথায় পানি ঢাললো। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। ফরিদা ভয়ে কেঁদে ফেললেন। বাচ্চাদের মতো করে বললেন,“শ্বাস চলে না, মাথা থাইক্যা রক্ত বাহির হইতাছে ক্যান? কেডায় বাড়ি মারছে? ওই মর্জিনা! সবাইরে ডাক। তোর ভাসুররে হাসপাতালে লইয়া যাইতে হইবো।”

মর্জিনা কাকে ডাকবেন ভেবে পেলেন না। ঘর থেকে বেরিয়ে চারিদিকে তাকালেন। বাড়িতে কোনো পুরুষ মানুষ নেই। এ সময়ে থাকার কথাও নয়। উপায় না পেয়ে প্রতিবেশীদের ডাকতে তাদের বাড়ি ছুটলেন। এক পর্যায়ে তাদের মাধ্যমেই লোকটাকে নিয়ে যাওয়া হলো হাসপাতালে।

নাজির বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা চলে এলো নিজের ধান মিলে। অসুস্থ, বয়স্ক একজন মানুষ একসঙ্গে এতসব নিকৃষ্ট সত্যের মুখোমুখি হলে কী আর সুস্থ থাকতে পারে? প্রথম জ্বর আসার পরেই বিষয়টা নাজির বুঝতে পেরেছিল। তাই সুযোগটা হাত ছাড়া করল না। শত্রুদের বেশি দিন বাঁচিয়ে রাখতে নেই। নইলে সেই শত্রুই একসময় নিজের জন্য বিপদ হয়ে দাঁড়ায়। তাছাড়া নাজির নিজের কাজে দেরি করতে পছন্দ করে না। সহজ পথ থাকতে কী প্রয়োজন জটিল পথ ধরে বিপদকে ঘাড়ে নিয়ে ঘুরার? নাজির শব্দহীন হাসলো। দুই হাত মাথার পেছনে ঠেকিয়ে ঝেড়ে ফেলল সব অলসতা।

হিসেবের খাতায় কিছু লিখতে লিখতে বাকিদের দিয়ে কাজ করাচ্ছে নওশাদ। রোজকার মতো ধান মিল জমজমাট। নাজির তাকে একপাশে ডেকে নিয়ে এলো। জিজ্ঞেস করল,“সবার হিসাব লেখছোস?”

“হ্যাঁ, তিনজনের টাকা দেওয়া এখনো বাকি।”

“ওইগুলা আমি দেইখা নিমু। নে, চাবিটা ধর। ড্রয়ার থাইক্যা ট্যাহা নিয়া দলিলের রেজিস্ট্রির কাগজগুলা লইয়া আয়। এতদিনে হইয়া যাওয়ার কথা।”

চাবিটা নওশাদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে হিসাবের খাতা কেড়ে নিলো নাজির। নওশাদ অলস কণ্ঠে বললো, “স্ট্যাম্প তো আমাদের কাছেই আছে। একসময় গিয়ে আনলেই হবে। তাড়াহুড়োর কী প্রয়োজন?”

“প্রয়োজন আছে। যা তুই।”

“পোশাক পাল্টাতে হবে। লুঙ্গি পরে যাওয়া যায়?”

“এইখানেই কাপড় আছে। কাম শেষে দলিল হাতে বাড়িত ঢুকবি।”

বড়ো ভাইয়ের হঠাৎ ভিন্ন আচরণ বুঝতে পারলো না নওশাদ। বিরক্ত হলেও পাছে কোনো প্রশ্ন করল না। ভেতরের ঘর থেকে পোশাক বদলে তখনি চলে গেলো শহরের উদ্দেশ্যে।
_____

আমিরুল শাহকে টেম্পুতে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরে মৃত ঘোষণা করা হলো। মৃত সনদে কারণ হিসেবে লেখা হলো হৃদাঘাতে মৃত্যু। মাথা থেকে রক্তক্ষরণ হয়েছে শক্ত মেঝেতে চিৎ হয়ে পড়ে যাওয়ার কারণে। তবে মৃত্যুর সাথে এর কোনো সংযোগ নেই। ফরিদা ওখানেই জ্ঞান হারালেন। যতই স্বামীর প্রতি মনের ভেতরে ঘৃণা থাকুক, তবু সন্তানের পিতা সে। কতগুলো বছর একসঙ্গে কাটিয়েছেন দুজন। তাঁর আচানক মৃত্যু কেই বা মেনে নিতে পারে?

দীর্ঘদিন জ্বরে ভোগার পর হৃদাঘাতে শাহ বাড়ির কর্তা আমিরুল শাহর মৃত্যু খবর পৌঁছে গেলো গ্ৰাম থেকে শুরু করে সারা ইউনিয়ন জুড়ে। চুলায় রান্না চড়ালো শালিক আর শিউলি। মর্জিনা মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। আহাজারি করে বলছেন,“কী হইলো মানুষডার? সুস্থ একটা মানুষ হঠাৎ কইরা কতগুলা দিন জ্বরে ভুগলো। পরশু বিছানা থাইক্যা উঠতে দেখলাম। আর আইজ কিনা বুকের বিষে মইরা গেলো? মাথা কাম করতাছে না। পাপ লাগছে পাপ।”

মুমিনুল শাহ ঝড়ের গতিতে বাড়ি ফিরলেন। দম ফেলে হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করলেন,“কী ঘটছে বাড়িত? ভাইজানরে নাকি হাসপাতালে লইয়া যাওয়া হইছে?”

মর্জিনা আঁচলে চোখ মুছলেন,“আমরা তো নামার ক্ষেতে আছিলাম, নাজমুলের বাপ। বাড়ি ফিরা চুলায় কচু ভাপে দিয়া বড়োজন গেছে ঘরে। একটু পর হুনি হের চিল্লান। গিয়া দেহি কাচারি ঘরের দরজার সামনে ভাইজানে চ্যাগাইয়া মাডিট পইড়া রইছে। মাথা থাইক্যা রক্ত পড়তাছে। হেরপর ওই বাড়ির মোস্তফারে ডাইকা আইন্না ধরাধরি কইরা হেরে হাসপাতালে লইয়া যাওয়া হইছে। এহন আবার মোস্তফা আইয়া কইয়া গেলো, তিনি নাকি আর নাই।”

“বাড়ির বাকি পোলারা কই? নাজির কই?”

“ওয় তো কোন সকালেই কামে গেছে গা।”

মুমিনুল শাহ আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালেন না। কী হচ্ছে এসব? বুঝতে পারছেন না। ছেলেরা খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে গেলো। সেখান থেকে পিতার মরদেহ আনতে আনতে বিকেল হলো।

দুদিন পরপর মৃত্যু যেন শাহ বাড়ির মানুষদের জীবনে স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। খবর পেয়ে বাজার থেকে নাজিরও বাড়ি ফিরে এলো। এমন ভাব যেন কিছুই সে করেনি, কিছুই সে জানে না। উল্টে নিজেও মনমরা হয়ে এতক্ষণ লাশের জন্য অপেক্ষা করে বসেছিল।

আমিরুল শাহর মুখখানা কালচে বর্ণ ধারণ করেছে। ফরিদা কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত হয়ে গেলেন। মুখে যাই বলুক, স্বামী ছাড়া এই বাড়িতে তাঁর কোনো ক্ষমতা নেই, মূল্য নেই। স্বামীর দ্বারাই তো এতকাল এই সংসারে তিনি রাজ করেছেন। সাথে ভাইটাও নেই, নেই ভাইপো। সাদ্দাম নিজের পরিবার নিয়েই ব্যস্ত থাকে। ফুফুর খোঁজ নেওয়ার সময় কোথায়? এখন কী হবে ফরিদার?

লাশ নিয়ে ফেরার পর থেকে মুমিনুল শাহ তব্দা খেয়ে বসে আছেন। বড়ো ভাইয়ের প্রতি তাঁর আকাশসম রাগ আর ঘৃণা। এই লোককে ধ্বংস করার জন্য বহু ফন্দি তিনি এঁটেছেন। সুবহান আলীর পুত্রদের তো এই জন্যই বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। অথচ তাঁর সব পরিকল্পনা বৃথা করে দিয়ে কত সহজে আমিরুল শাহ মুক্তি নিয়ে দুনিয়া ছেড়ে পালিয়ে গেলেন। এত সহজ মৃত্যু কী তার প্রাপ্য ছিল? নাকি মৃত্যু কখনো সহজ হয়?

আশেপাশের সবাই মৃত ব্যক্তিকে দেখতে এসেছে। কেউ কেউ ফরিদাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। নাজির ছোটো চাচার পাশে এসে বসলো। হতভম্ব মুমিনুল শাহর মুখখানা দেখে মনে মনে কুটিল হাসলো। তার পরের শিকার হচ্ছে এই লোক। নাজির খুব ভালো করেই জানে, বড়ো চাচার থেকেও ছোটো চাচা বেশি চতুর। তার আজ আনন্দের দিন। সে একে একে প্রতিশোধ নিতে সফল হয়েছে। ওইতো ছলনাময়ী ফরিদা কাঁদছে। নিঃসঙ্গ হয়ে যাওয়ার শোক তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরেছে। নাজির তো এটাই চেয়েছিল। মুখ ভার করে বললো,“আমার বিশ্বাসই হইতাছে না। যেই লোক কয়দিন আগেও রাইতের আন্ধারে আমার ধান ক্ষেতে আগুন দিছে; সে আর দুনিয়াত নাই। সব ধন সম্পদ, ক্ষমতা পইড়া রইছে। কার মৃত্যু যে কহন কেমনে লেখা থাকে? এর লাইগাই কয়, লোভ করা ভালা না।” দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে।

মুমিনুল শাহ ভাতিজার দিকে ফিরে তাকালেন। গলা দিয়ে বোধহয় কোনো শব্দ বের হতে চাইলো না। আয়েশা, বদরুল চলে এসেছে। এসেছে নজরুল আলম, কাশেম আলী আর তাদের পুত্ররা। একটু পরপর হাতের পিঠে চোখ মুছছে সামিউল। বদরুল সম্বন্ধিকে সান্ত্বনা দিতে বললো,“কাইন্দেন না, ভাইজান। মানুষ মরণশীল। কাইন্দা আর কী হইবো? এহন থাইক্যা সবকিছু সামলানের দায়িত্ব তো আমনেরই।”

“সকালেও আব্বার লগে ব্যবসায়িক কথাবার্তা কইয়া গেলাম। আব্বায় কইলো, দুইদিন পর ধান কাইট্টা ফেলাইস। ভাইডারে লইয়া ব্যবসার সব দায়িত্ব বুইঝা লইস। আল্লাহ বাঁচাইয়া রাখলে বাজারে এই বছর একটা মিল দিমু। আমার সেই আব্বা এহন মৃত। ক্ষেতে যাইতেই হুনি আব্বা আর…

গলা ধরে এলো সামিউলের। বদরুল ভ্রু কুঁচকে বলে উঠলো,“নাজিরের না মিল আছে? তাইলে আমনেরা আবার ক্যান খুলবেন?”

সামিউল সেকথার উত্তর দিলো না। আয়েশা কাঁদছে। মেয়েকে খুব আদরে বড়ো করেছেন লোকটা। বড়ো হওয়ার পরেও সেই আদর একটুও কমেনি। যেদিন বাপের বাড়িতে বেড়ানো শেষে শ্বশুরবাড়ি ফিরে যেতো সেদিন মেয়ের সঙ্গে মাসকাবারি বাজার পাঠিয়ে দিতেন আমিরুল শাহ। মানুষ, সন্তান, স্বামী হিসেবে জঘন্য হলেও পিতা হিসেবে তিনি ছিলেন আদর্শ। পারভেজ থম মেরে উঠোনের এককোণে বসে আছে। কি অনুভূতি প্রকাশ করা উচিত বুঝে উঠতে পারছে না। পিতার সাথে তার সম্পর্ক কখনোই গভীর ছিল না। ভয়ে দূরে দূরে থাকতো, সর্বদা মুখোমুখি হওয়া থেকে এড়িয়ে যেতো। সেই পিতা হঠাৎ করে কিনা এভাবে চলে গেলো?

সন্ধ্যায় কাজ সেরে নওশাদ বাড়ি ফিরলো। মরদেহ গোসল করানো শেষে কাফনে বেঁধে ফেলা হয়েছে। লোকমুখে ঘটনা শুনে, লাশ দেখে বাকিদের মতো নওশাদও অবাক হলো। সময়মতো আমিরুল শাহর জানাজা সম্পন্ন হলো, দেওয়া হলো ভাইয়ের পাশে কবর। জানাজায় তেমন একটা মানুষ হয়নি। মোটে দুই কাতার। গ্ৰামের হতদরিদ্র মানুষগুলোকে কম অত্যাচার তো আর তিনি করেননি! সেগুলোই যেন অভিশাপ হয়ে ফিরে এলো। সব সম্পদ পড়ে রইলো মাটির উপরে। অথচ তাঁর ঠাঁই হলো এক টুকরো কাফনের সাথে মাটির নিচে।

সুযোগ বুঝে নাজিরকে টেনে আড়ালে নিয়ে গেলেন কাশেম আলী। আশেপাশে সতর্ক দৃষ্টিতে নজর ঘুরিয়ে চাপা স্বরে বললেন,“আসলেই কী আমিরুলে বুকের বিষে মরছে?”

“পারভেজের কাছ থাইক্যা হুনলাম, ডাক্তরে নাকি এইডাই কইছে।”

“ডাক্তর না, আমি তোর কথা হুনতে চাই। আমার বিশ্বাস হয় না ক্যান? এইসবের পিছনে তুই নাই তো?”

“কী যে কন না, শ্বশুর আব্বা? আমি কী করমু? আমার মতন ছুডো একটা মানুষ চাচার বালডাও ফালাইতে পারবো না।”

“এত বড়ো জালেম বুকের বিষে মরে?”

“কে কেমনে মরবো এইডা আমি কেমনে জানমু? কয়দিন ধইরা অসুখ আছিলো হুনেন নাই? মাঘ আর চৈত মাসে বয়স্ক মাইনষেরা বেশি মরে। চাচা দুই মাস দেরি কইরা ফেলাইছে। তাছাড়া আমি কিছু করলে ডাক্তরগো কাছে ধরা পড়তো না?”

কাশেম আলীর সন্দেহ তবুও যায় না। নাজির আড়াল থেকে বেরিয়ে মাটির রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগলো। নিজেকে বাহবা জানালো। তবে মনটা ফুরফুরে লাগার পরেও সে আনন্দ করতে পারছে না। একেই বুঝি এক ঢিলে দুই পাখি মারা বলে? নওশাদ দৌড়ে এসে তার পথচলার সঙ্গী হলো। জিজ্ঞেস করল,“ভাই, এটা কীভাবে সম্ভব? সকালেও তো লোকটা ঠিক ছিল। এখন কিনা সে নেই?”

“মৃত্যু যে কহন কার দুয়ারে কড়া নাড়ে!”

“তার মানে তুমি কিছু করেছো?”

নাজির নিঃশব্দে হাসলো,“ভাবছিল নাজির দুর্বল। আমারে হালকা হিসাবে লইয়া ধান ক্ষেতে আগুন লাগাইছে, মিল্টনগো রক্তাক্ত করছে। বারবার সাবধান করার পরেও বলদের লাহান এমন কাম কেমনে করে মাইনষে?”

নওশাদ কী বলবে বুঝে উঠতে পারলো না। বাকিদের মতো তারও বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। এই জন্যই ভাই তাকে জমির দলিল আনতে পাঠিয়েছিল? আজকের দিনটাই বা বেছে নেওয়ার উদ্দেশ্যে কী? কাল নওশাদ এই দেশ ছাড়বে বলেই? মাথায় তার অজস্র প্রশ্ন ঘুরতে লাগলো। নাজির কৈফিয়ত দেওয়ার প্রয়োজন মনে করল না। গলা ঝেড়ে বললো,“বাড়িত যা, বউরে একটু সময় দে। এই বছর তো আর দেশে আইতে পারবি না। কাইল কয়ডায় পৌঁছাইতে হইবো?”

“যদি কেউ জানতে পারে? ওরা এবার আরো হিংস্র হয়ে যাবে, ভাই।”

“হোক, নদীত বাস কইরা কুমিরের লগে লড়াই না করলে বাঁচবি কেমনে?”

“লড়াই? তুমি আমায় লড়াই করতে দিচ্ছো? বরং এসবের থেকে দূরে রাখার জন্য তাড়িয়ে দিচ্ছো।”

নাজির চুপচাপ হাঁটতে লাগলো। কিছুদূর গিয়ে হুট করে বললো,“তোর বউরে বাপের বাড়িত রাইখা যাইস। এই বাড়ি নিরাপদ না। আমি ভাসুর লাগি। কারে কেমনে সামলামু?”

“বলেছিলাম, রাজি হয়নি। বলেছে, বাপের বাড়ি চলে গেলে নাকি আশেপাশের মানুষেরা পিঠপিছে খারাপ কথা বলবে। নারীদের জন্য স্বামীর ভিটেই সব।”

“তাইলে থাক। আমি বরং তোর ভাবির বাপের বাড়ির মাইনষের লগে কথা কমু। ওইখানেই না হয় থাকবো। মাসে মাসে খরচাপাতি যা লাগে পাঠাইয়া দিবি।”

“ভাবির যেই অবস্থা! তুমি সারাদিন কাজকর্মে বাইরে থাকো। একা কীভাবে থাকবে? শালিক বাড়িতেই থাকুক। দুই বোন একসঙ্গে মিলেমিশে থাকলে সময় কেটে যাবে।”

“বাড়িত যা, আমি হাট থাইক্যা ঘুইরা আইতাছি।”

অন্ধকার পথের দিকে নাজির হারিয়ে গেলো একসময়। নওশাদ বাড়ি ফিরে এলো। ভেতর ঘর থেকে একাধিক লোকের কথার আওয়াজ ভেসে আসছে। সেদিকে কান না দিয়ে ঘরে প্রবেশ করল সে। শালিক যেন তার অপেক্ষাতেই এতক্ষণ বসেছিল। জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে এগিয়ে দিলো। ঘর্মাক্ত শরীরে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে করতে বললো,“সারাদিন কই আছিলেন? বাড়িত কী একটা ঘটনা ঘইট্টা গেলো! আমার তো ডর লাগতাছে এহন।”

“তোমার ভয় লাগবে কেন?”

“মানুষ মরলে আমার ডর লাগে। এত বড়ো বাড়িত আস্তা একটা মানুষ মইরা গেলো। আমি একলা একলা থাকমু কেমনে?”

“এই জন্যই তো বাপের বাড়ি চলে যেতে বলেছি।”

“যামু না।”

“নাছোড়বান্দা নারী।”

“আমনে কাইল যাইবেন গা?”

“হ্যাঁ।”

“আমার কান্দোন আইতাছে।”

“তো কান্দো।”

“আমনের লগে একটু সংসার করার সুযোগ পাইলাম না। একটু আদর, ভালোবাসাও দিলেন না। আমনে খুব পাষাণ।”

“পাষাণ? তা পাষাণ খেতাব থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য এখন আমায় কী করতে হবে?”

শালিক মুখ বাঁকিয়ে চলে যেতে চাইলো। নওশাদ তাকে যেতে দিলো না। খেয়াল করল, মেয়েটার অঙ্গে তার উপহার দেওয়া শাড়িটি ঠাঁই পেয়েছে। শাড়ির আঁচল টেনে ধরলো সে। চুলের বেনুনী মুঠোয় নিয়ে বললো,“আমি সব করতে রাজি।”

ঘাড়ে গরম নিঃশ্বাস পড়তেই শালিকের সর্বাঙ্গ খানিক কেঁপে উঠলো। আসন্ন ঝড় বুঝতে পেরে খিচ মেরে বন্ধ করে নিলো আঁখি। কম্পিত কণ্ঠে বললো,“ছাড়েন আমারে। মরা বাড়িত এহন এত আদিখ্যেতার দরকার নাই।”

“তোমার কেউ মরেছে?”

“আমনের তো মরছে। কষ্ট পান, দোয়া করেন।”

নওশাদ তাকে সেভাবেই ধরে রাখলো। সমস্ত দূরত্ব মিটিয়ে ঘাড়ে থুতনি ছোঁয়ালো। তার বাবার মৃত্যুর সময় চাচারা কী দুঃখ বিলাস করেছিল? করেনি তো। উল্টে করেছিল আনন্দ উৎসব। তাহলে তার কীসের দুঃখ? বরং তার আজ আনন্দের দিন। আরো একজন খুনির পতন ঘটেছে।
_____

মুমিনুল শাহ বিছানায় অন্যমনস্ক হয়ে বসে আছেন। মর্জিনা স্বামীর জন্য স্যালাইন গুলিয়ে আনলেন। গ্লাস বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,“ধরেন, খাইয়া লন।”

মুমিনুল শাহ দুর্বল হাতে গ্লাসটি ধরলেন কিন্তু ঠোঁটে ছোঁয়ালেন না। বললেন,“এইসব কী হইতাছে, বউ? আমি কিচ্ছু ভাবতে পারতাছি না। হঠাৎ একটা মানুষ চোখের সামনে লাশ হইয়া গেলো?”

“আমি আর এইসবে অবাক হই না। চোখের সামনে কতকিছুই তো ঘটলো। সুস্থ মানুষ হিসাবে জমিত গিয়া আব্বায় ফিরা আইলো লাশ হইয়া। নাসরিন বুবু কত্ত ভালা মানুষ আছিলো? হেয়ও পোলাপাইন দুইডা রাইখা গেলো গা। সুবহান ভাইজানে কতগুলা বছর কষ্ট করল! বড়ো বুবুর ভাই পুতরে কেউ মাইরা নদীত ভাসাইয়া দিলো, হের ভাইডাও মাস খানেক ধইরা নিখোঁজ। নাজিরটার ক্ষেতে আগুন লাগছে। আইজ আবার ভাইজান! আমার মনে হয় এই বাড়িত অভিশাপ লাগছে, নাজমুলের বাপ। আমার ডর লাগতাছে। আমনে হুজুরের লগে কথা কন। ঝাড় ফুঁক কিংবা মিলাদের ব্যবস্থা করেন। তিন তিনডা পোলা আমার। ওই ঘরে হেগোও পোলাপাইন আছে। আমি চাই না আর কারো কোনো ক্ষতি হোক।”

স্ত্রীর সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করার সাহস পেলেন না মুমিনুল শাহ। কী করে তাকে বলবেন, এসব কোনো দুর্ঘটনা নয়। নয় কোনো অভিশাপ। এসবই তাদের পাপের ফল, কারো প্রতিশোধের আগুন। যার সাথে ওতপ্রোতভাবে মর্জিনা বেগমের স্বামীও জড়িত। যাকে তিনি চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করেন।

রাত ধীরে ধীরে গভীর হলো। কোলাহল কমে পৌঁছে গেলো শূন্যে। সুমা আজ আব্দুল্লাহকে নিয়ে ঘুমিয়েছে। বিথী শাশুড়ির ঘরে; পায়ে মালিশ করে দিচ্ছে গরম সরিষার তেল। শিয়রে বসে মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে আয়েশা। অন্য ঘরে বদরুল আর পারভেজ শুয়ে আছে। সেই নিস্তব্ধ রাতেই খুলে গেলো কাচারি ঘরের দরজা। বৈদ্যুতিক আলোর বদলে জ্বলে উঠলো হলদে মোমবাতি।

আমিরুল শাহ যে কেদারায় বসতেন সেটা ছিল শক্তপোক্ত সেগুন কাঠের তৈরি। বসার স্থানে শিমুল তুলো গোঁজা। পূর্বে এখানে বসতেন ফতেহ আলী শাহ। তাঁর মৃত্যুর পর থেকে কেদারাটা আমিরুল শাহর দখলে এসেছিল। হাতলে, পেছনে শৈল্পিক কারুকাজ। দেখলেই বুঝা যায়, আভিজাত্যের জৌলুস ছড়িয়ে আছে। এই কেদারার প্রতি মুমিনুল শাহরও ভারি লোভ ছিল। কিন্ত বড়ো ভাইয়ের সম্মুখে কখনো তা প্রকাশ করেননি। আড়ালে একই লোভ ছিল আরো একজনের। সে হচ্ছে সামিউল।

এক পা দু পা করে এগিয়ে এসে কেদারায় বসে পড়ল সামিউল। প্রশান্তিতে চোখ জোড়া বন্ধ করে পিঠ হেলিয়ে দিলো পেছনে। হাতলে হাত রেখে দক্ষতার সাথে আঙুল ঘুরাতে ঘুরাতে আচমকা হেসে ফেলল। বন্ধ ঘরে তার সেই হাসি প্রতিধ্বনিত হয়ে বাজতে লাগলো কানে।

তখন কত ছিল সামিউলের বয়স? প্রায় চৌদ্দ পনের তো হবেই। কৈশোরের গুরুত্বপূর্ণ সময়। সবই সে বোঝে, মাঝেমধ্যে সিরাজ মামুর সঙ্গে নদীর ধারে বসে চুরুট টানে। বাবা সেসব জানতেন না, ক্ষমতা লোভী বাবার পক্ষে অবশ্য তা জানার কথাও নয়। সেই প্রথম সে বাবার আসল রূপ দেখতে পেলো। হন্তদন্ত হয়ে বাড়িতে ফেরা বাবার লুঙ্গিতে রক্তের ছাপ দেখেই বুঝতে পারলো, লোকটা একজন খুনি। নিজের পিতার খুনি। ঘৃণা জন্মালো তার মনে। যে নিজের জন্মদাতা পিতাকে হত্যা করতে পারে সে আর কী না পারে? সামিউল সব দেখেছে, সব শুনেছে, সে সব জানে। দেখেছে প্রিয় চাচীর ঘরে পরপুরুষ ঢোকানো মাকে, শুনেছে বন্ধ ঘরে প্রিয় মামার দ্বারা নির্যাতিত হওয়া চাচীর আর্তনাদ। মেজো চাচাকে খুনের চেষ্টা থেকে শুরু করে দলিলে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়া সব দেখেছে। তারপরেও খুনি পিতার জন্য কোন পুত্রের মনে ভালোবাসা থাকে? সব তার অভিনয়। ভরসা স্থল হওয়ার অভিনয়।

সামিউল হাসতে হাসতে একসময় থেমে যায়। কঠোর হয় তার মুখমন্ডল। সেও কী খুব ভালো মানুষ? বাবার থেকে কম ছলচাতুরী শিখেছে? বাবার বিশ্বাস জয়ের জন্য সেও তো নষ্ট করে দিয়ে এসেছে চাচাতো ভাইয়ের পরিশ্রমের ফসল। পথেঘাটে দেখা হলেই হেসে সালাম দেওয়া মিল্টন আর লতিফকে পাষাণের মতো আঘাত করেছে। ব্যবসার মুনাফা থেকে ঠকিয়েছে চাচাকে। এসবের দায় কার? অবশ্যই তার বাবা-মায়ের। লোকে বলে, রক্ত কথা বলে। অসৎ লোকের ঘরে নেককার সন্তান জন্ম নেওয়া বড়োই দুর্লভ। অবশ্য পারভেজটা ভারি বোকা। সে কিছুই জানে না, বুঝে না। এতে সামিউলের লাভই লাভ।

সোজা হয়ে বসলো সে। টেবিলের উপর কনুই রেখে গাল ঠেকালো হাতে। লকারের চাবি আঙুলে ঘুরাতে ঘুরাতে বললো,“জীবনে কম খারাপ কাম তো আর করেন নাই, আব্বা। তাই জান্নাত আমনে পাইবেন না। তয়, আম্মারে রাইখা যাওয়াও আমনের উচিত হয় নাই। মহিলারে আম্মা কইতেও আমার গা গুলায়। কী আর করার? অসমাপ্ত কাম মনে হয় আমারেই সমাপ্ত করতে হইবো।”

ফের হেসে ওঠে সামিউল। এবার হাসির সাথে তার দেহখানাও দুলে ওঠে। আজ থেকে সে শাহ বংশের মুকুটহীন রাজা। বিশাল এই রাজত্ব এত সহজে পেয়ে যাবে তা হয়তো কস্মিনকালেও ভাবতে পারেনি সামিউল। দুই হাত মেলে লোভাতুর দৃষ্টিতে চারিদিকে তাকিয়ে মন্ত্রের মতো জপতে লাগলো,“এই সবকিছু আমার। শুধুই আমার।”

চলবে ________

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here