যাত্রাপথ লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই [পর্ব:৬৯]

0
24

#যাত্রাপথ
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:৬৯]

চারিদিকে মানুষের কোলাহল, আহাজারি ভেসে বেড়াচ্ছে। রক্ত, ইনসুলিনের বিদঘুটে গন্ধে নাকে আঁচল চেপে ধরলেন পারুল। গতকাল বিকেল থেকে মিছরি হাসপাতালে ভর্তি। হাতে স্যালাইন ঝুলছে। পাশে বসে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছেন পারুল। স্বামীর মরণাপন্ন অবস্থার সংবাদ পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বেশ কয়েকবার জ্ঞান হারিয়ে দুর্বল হয়ে গিয়েছে মেয়েটা। নাওয়া-খাওয়া বাদ দিয়েছে। শেষে আর উপায়ন্তর না পেয়ে মেয়েকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন কাশেম আলী। সন্তান প্রসবের সময় এখনো হয়নি। ডাক্তার বলেছে, স্যালাইন শেষে বাড়ি গিয়ে বিশ্রাম নিতে।

স্ত্রীকে সরিয়ে দিয়ে মেয়ের শিয়রে বসলেন কাশেম আলী। মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,“এহন কেমন লাগে, আম্মা?”

“ভালো না, আব্বা। মনে হচ্ছে, মরে যাবো।”

“এমন কথা মুখে আনতে হয় না, আম্মা। তোমার ভিতরে এহন আরো একটা প্রাণ আছে। তুমি এমন করলে তার কী হইবো? সে কেমনে দুনিয়ার আলো দেখবো? নাজির জানলে কতটা কষ্ট পাইবো কও তো?”

“আমিও তো কষ্ট পাচ্ছি। তোমরা আমায় নিয়ে যাচ্ছো না কেন? উনি কেমন আছেন? কী অবস্থায় আছেন? আমি নিজ চোখে দেখতে চাই। বেঁচে আছে তো?”

“হায়াৎ মউত আল্লাহর হাতে। হায়াৎ ফুরানের আগে যাই হইয়া যাক, কেউ মরে না। তোমার অবস্থা দেহো, আম্মা। এই অবস্থায় তোমারে ঢাহা শহর লইয়া যাওয়া সম্ভব? আল্লাহর কাছে দোয়া করো, তোমার স্বামীরে সুস্থ অবস্থায় যাতে তোমার কাছে ফিরাইয়া দেয়। মন থাইক্যা আল্লাহর কাছে কিছু চাইলে আল্লাহ বান্দারে কহনো ফিরায় না। এহন তোমারে অনেক ধৈর্য ধরতে হইবো, মাইয়া মাইনষের এইটুকু ধৈর্য না ধরলে চলে? তুমি তো আমার বোঝদার মাইয়া।”

মিছরি মাথা নাড়ালো। চোখের কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল অশ্রু। এখন এসব কঠিন কঠিন কথা তার মাথায় ঢুকছে না। মন পড়ে আছে দূরের হাসপাতালে মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকা জ্ঞানহীন স্বামীর উপর।

পারুল স্বামীকে আড়ালে নিয়ে গেলেন। উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন,“আমি তো চিন্তায় চিন্তায় শেষ, তালেবের আব্বা। জামাই বাঁচবো তো? আমার মাইয়াডা অল্প বয়সে বিধবা হইয়া যাইবো না তো?”

স্ত্রীর কথায় কাশেম আলী মেজাজ হারালেন। ধমক দিয়ে বললেন,“একটা দিমু ধইরা। এইগুলা কেমন কথা? আল্লাহ নিশ্চিত ভালা কিছু করবো, দোয়া কর। পোলাডায় জীবনে অনেক কিছু সহ্য করছে। শেষ সময়ে আইয়া একটু সুখের মুখ না দেইখা এইভাবে শেষ হইতে পারে না।”

পারুল মেয়ে আর মেয়ের অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। রবের কাছে কম দোয়া তো করছেন না। প্রয়োজনীয় ওষুধ নিয়ে তালেব ফিরতেই পুনরায় মিছরির কাছে গেলেন।

নাজিরের জ্ঞান ফিরলো তিনদিন পর। মুখে এখনো অক্সিজেন মাস্ক লাগানো। স্যালাইন দ্রুত চলছে। চোখ খুলে অপরিচিত স্থান দেখে মস্তিষ্ক কিছু সময়ের জন্য কাজ করা বন্ধ করে দিলো। তার মধ্যেই হঠাৎ শোনা গেলো অপরিচিত এক নারী কণ্ঠস্বর,“রোগীর জ্ঞান ফিরেছে, স্যারকে ডাকুন।”

ঘাড় কাত করে নারী কণ্ঠস্বরের অধিকারী কে তা দেখার শক্তিটুকুও নাজির পেলো না। কিছুক্ষণ পর শোনা গেলো অপরিচিত পুরুষ কণ্ঠস্বর,“এখন কেমন অনুভব করছেন? কোথাও কষ্ট হচ্ছে?”

সাদা এপ্রোন পরা লোকটাকে চিনতে পারলো না সে। চেনার অবশ্য কথাও নয়। কিছুক্ষণ ভাবার পর ঠাহর করতে পারলো, ভদ্রলোক ডাক্তার। উত্তরের আশা না করে তিনি নিজেই নাড়ি নক্ষত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখলেন। হাতের স্যালাইনের পাওয়ার কমিয়ে দিয়ে বললেন,“সব ঠিক আছে। ইনশাআল্লাহ, খুব শীঘ্রই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাবেন। চিন্তা নেই।”

আরো কী কী বললো তার কিছুই নাজিরের শ্রবণালী পর্যন্ত পৌঁছালো না। মুখ থেকে অক্সিজেন মাস্ক খোলা হলো। বুক ভরে প্রাকৃতিক শ্বাস নিলো সে। কেবিনও বদলানো হলো।
নাজির বেঁচে আছে, আবার পৃথিবীর আলো দেখতে পাচ্ছে এটাই তো অবাক করা বিষয়! পেটের ভেতর ধারালো অস্ত্র যখন প্রবেশ করেছিল তখনি সে ভেবে নিয়েছিল, এখানেই হয়তো তার জীবনের সমাপ্তি। তার যাত্রাপথের সমাপ্তি। তবুও মনে ক্ষীণ আশা ছিল, হয়তো ছিল রবের প্রতি বিশ্বাস। নিজেকে ধাতস্থ করে আশপাশে কাউকে খুঁজলো সে। না পেয়ে হতাশ হলো। সাদা পোশাক পরিহিত সেবিকাকেই জিজ্ঞেস করল, “আমার বউ কই?”

“ওয় বাড়িত, দাদী আর আব্বায় আইতে দেয় নাই। এই অবস্থায় এতটা পথ আওয়া সম্ভব?” উত্তর দিলো মাসুম।

“এইডা সদর হাসপাতাল না?”

“না, ঢাহা হাসপাতাল।” মাসুম পুনরায় বললো,“তোর অবস্থা অনেক খারাপ আছিলো। পরে সদর থাইক্যা ঢাহা পাঠাইছে। আইজ তিনদিন পর জ্ঞান ফিরলো।”

“তাল মিছরি ঠিক আছে? ওয় জানে? না জানলে জানানের দরকার নাই।”

“ওয় সব জানে। পুরা গেরামে এই খবর ছড়াইয়া গেছে, ওর থাইক্যা কেমনে গোপন রাখি? তুই নিজের কথা ভাব। তাড়াতাড়ি সুস্থ হইতে হইবো, আগের মতন আবার দৌড়াদৌড়ি করতে হইবো, কত কাম ক তো! আমি ডাক্তরের লগে কথা কইয়া দেহি, মনে তো হয় না এত তাড়াতাড়ি বাড়িত যাইতে পারবি। যদি আবার সদরে বদলি করা যায়।”

আর কখনো আগের মতো পুরোদমে চলতে ফিরতে পারবে কিনা নাজির নিশ্চিত নয়। কিডনির পাশ ঘেঁষে আঘাত লেগেছে। আদৌ ঠিক হওয়া সম্ভব? জড়ানো কণ্ঠে ভাঙা ভাঙা শব্দ প্রয়োগ করে বললো,“আর হেগো কী খবর? সবাই জানার পরেও…

“ওগো লইয়া চিন্তা নাই। তহনি সামিউলডারে ধইরা আমি আর সুজন ভাইয়ে বাড়িত নিয়া বানছিলাম। এমন মাইর দিছি না হালার পুতরে! তাও কি সাহস! সময়মতো মিল্টন না দেখলে কী যে হইতো? পরদিন মুমিনুল শাহ পলানোর সময় চাচা, রুহুলের কাছে ধরা খাইছে। বটতলায় শালিস হইছে, চেয়ারম্যান চাচায় দুইডারেই পুলিশে ধরাইয়া দিছে। এহন বইয়া জেলের হাওয়া খাইতাছে। ছুডো দুইডার খবর নাই। কই পলাইছে কেডায় জানে? আমি সবাইরে কইয়া দিছি, গেরামে ঢুকলেই যাতে বাইন্ধা ফেলায়। হেগো নানার বাড়ির কাছে লোক ঠিক কইরা রাখছি। হেনে গেলেও ধরা খাইবো। কত্ত বড়ো জানোয়ার হইলে এমন করে? একেবারে বাপ চাচার মতন হইছে। দেখ, কেমন বংশ লইয়া এতকাল বড়াই করছোস। সুস্থ হওনের পর আমার লগে থানায় যাবি। হত্যা মামলা দিতে হইবো। যাতে কয়েক বছর জেলে পঁইচা মরে।”

আরো কিছুক্ষণ কথা বলে মাসুম চলে গেলো। মিল্টন প্রবেশ করল ভেতরে। ছেলেটা কাঁদছে, তবে এ কান্না কষ্টের নয় বরং আনন্দের। নাজির তার দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল,“তুই ব্যাডা মানুষ হইয়া কান্দোস ক্যান, বলদ? তোরে আবার কিছু করে নাই তো?”

“তো কানমু না? আমি তো মনে করছিলাম আমনেরে হয়তো আর দেখতেই পামু না। আরেকটু আগে আইলে এমন কিছু হইতো না। সব দোষ আমার, ভাইজান। সব দোষ আমার।”

“দোষ তোরও না, আমারও না। এইডা হইলো ভাগ্য। আল্লাহ যা করে ভালার লাইগাই করে। তুই সময় মতন আইছোস।”

“রক্তের লগে মাইনষে কেমনে বেঈমানি করে, ভাইজান? আর কেউ না জানুক, আমি তো জানি ওই নাজমুল, শাহরিয়াররে আমনে কহনো নওশাদ ভাইয়ের থাইক্যা আলাদা মনে করেন নাই। সামিউল ভাইরে নিজের বড়ো ভাই মনে করছেন। এমন একটা কাম করার আগে তাগো হাত কাঁপলো না?”

নাজির বিষণ্ণ হাসলো। জন্মদাতা পিতা আর আপন ভাইকে যারা লোভের কাছে বলিদান করেছিল, তাদেরই তো সন্তান এরা। ব্যতিক্রম হবে কী করে? আম গাছে কী আর কখনো জাম ধরে? চোখ বুজলো নাজির। ভাগ্যিস নওশাদটাকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছিল! ভেবেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। নইলে এই ঝড় তার উপর দিয়েও বইতো। ছেলেটা নাজিরের মতো এত শক্তিশালী নয়। নরম মনের সরল মানুষ। তবুও কীভাবে যেন সিরাজের বেলায় কঠোর হয়ে গিয়েছিল।

নাজির জিজ্ঞেস করল,“ঘরের কামের কী খবর?”

“দালানের কাম এহনো শুরু হয় নাই। আমনের যেই অবস্থা! মাডিরটা শুকাইলে পরের দেয়াল দিবো।”

“শুরু করতে কইয়া দেইস। না হইলে থাকমু কই? এক কাম করিস, মাডির ঘরের পাশে টিনের ঘর তোল। দালান না হয় পরে ধীরে সুস্থে করা যাইবো।”

“আইচ্ছা, ভাইজান। আমনে বিশ্রাম নেন। এসবের লাইগা আমি আছি।”

“তার আগে ক, গরুডি সরাইছোস?”

“সুযোগ পাই নাই।”

“দুধ ধোহাস নাই?”

“লতিফ আর মোখলেছে মিল্যা রোজ ধোহাইয়া ঠিক জায়গায় পৌঁছাইয়া দিছে। দুইডার বাছুর হইবো।”

“একটা গরু বেইচ্চা বাকিগুলা রাইখা দে। যেই অবস্থা আমার! আদৌ সুস্থ হমু কিনা ঠিক নাই। নতুন কইরা গোয়াল ঘর করতে হইবো। কত খরচ!”

“ভাই, এমনে কইয়েন না।”

“নওশাদে চিঠি পাঠাইছে?”

“না, এই মাসেরটা এহনো আইয়ে নাই মনে হয়।”

“আইজ ওয় বিদেশ না থাকলে আমার জায়গায় ওরে থাকতে হইতো।”

মিল্টন দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ভাই সমতুল্য নাজিরের কথা শুনে তার কষ্ট হচ্ছে। দুপুরের দিকে মিল্টনকে জোর করেই খেতে পাঠিয়ে দিলো নাজির। ছেলেটা আঠার মতো লেগে ছিল। তার আপাতত খাবার খাওয়া নিষেধ। স্যালাইন চলছে।

পাশের বিছানায় এক বৃদ্ধ লোক নামাজ পড়ছে। বুক সমান দাড়ি। মোনাজাত শেষে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন তিনি। তা দৃষ্টি এড়ালো না নাজিরের। অনেক দিন সে নামাজ পড়ে না, রবের সামনে সিজদা করে না। প্রতিশোধ আর রক্তের স্বাদ পাওয়ার পর থেকে আমূল পরিবর্তন হয়েছে তার। পাপের তকমা লেগেছে নামের পাশে। অথচ কথা ছিল, জন্ম যার যথাতথা কর্ম হোক ভালো।

বৃদ্ধ তাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ফোকলা দাঁতে হাসলেন। খুক খুক করে কেশে বললেন,“আল্লাহ ছাড়া মাইনষের আর কেউ নাই। দুনিয়াত তো আরো নাই। তাই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে হইবো, সৎ পথে চলতে হইবো।”

“জীবনে কহনো অসৎ পথে চলেন নাই মনে হয়? বুইড়াকালে যত জ্ঞান বিতরণ।”

বৃদ্ধর হাসি চওড়া হলো। আজকাল চোখে বোধহয় কম দেখেন। তাই সামান্য এগিয়ে এসে ছেলেটাকে ভালো করে দেখলেন।এই বয়সী ছেলেরা গুরুজনদের মুখের উপর এভাবে কথা বলে না। তবে এই ছেলে বলছে। তিনি বুঝে গেলেন, ছেলেটা ত্যাড়া। জিজ্ঞেস করলেন,“এই অবস্থা কেডায় করছে? কোন আকাম করতে গেছিলা?”

“আকাম করলে কী এই অবস্থা আমার হইতো?”

“এই বয়সে বেশি ত্যাড়ামি করা উচিত না।”

“তো কোন বয়সে করমু?”

হাসির চোটে গা দুলে উঠলো বৃদ্ধর। নাজির বিরক্ত হলো,“বুইড়া মানুষগুলা জন্মের বিরক্তিকর। হাসেন ক্যান, মিয়া?”

“এমনি হাসি। বিয়া-শাদী হইছে?”

“আর দুই তিন মাস পর বাপ হমু।”

“বউ কই? এই দুইদিনে তো দেখলাম না।”

“গর্ভবতী মাইয়া মানুষ। তাই শ্বশুর আইতে দেয় নাই। মনে হয় কাইন্দা ভাসাইতাছে।” থেমে পাল্টা প্রশ্ন করল,“আমনেরটা কই? আছে না গেছে?”

“গেছে।”

“ইন্না লিল্লাহ।”

“ধুর ব্যাডা, মরে নাই। এহনো জীবিত আছে।”

“তাইলে গেছে কইলেন যে? তালাক হইছে?”

“না, চাইছিল কিন্তু আমি দেই নাই। গোস্বা করছে।”

“বুইড়া বয়সে এত গোস্বা আইয়ে কইত্তে?”

“জোয়ানকালেই করছিল। সেই যে মুখ দেখমু না কইয়া গেলো আর আইলো না। পোলাপাইনডি হইছে মা ভক্ত। এহন হেগো লগেই থাহে।”

“পরকীয়া করতে গিয়া ধরা খাইছিলেন নাকি? ব্যাডা মানুষগুলা এত্ত খারাপ! আমি তো জীবনে একটার মিহি যা ভালা কইরা চাইছিলাম, ওইডারেই এহন বিয়া কইরা সংসার করতাছি।”

“ওইসব কিছু না। তার থাইক্যাও বড়ো কোনো অন্যায়।”

নাজিরের আগ্ৰহ বাড়লো।
“চুরি ডাকাতি? খুনখারাবি? বউ পিডানো? না, বউ পিডাইলে তো সংসার ভাঙে না।”

বৃদ্ধর অধরের হাসিটা মিলিয়ে গেলো। বালিশ উঁচু করে পিঠে হেলান দিলেন। বললেন,“কিছু একটা তো করছি। তবে তা ভুল। জাইন্না বুইঝা করা ভুল হয়তো ক্ষমা করার যোগ্য না। হাতে-পায়ে ধরার পরেও ফিরা চাইলো না। মাইয়া মানুষ অনেক অভিমানী হয়, তবে রাগলে হইয়া ওঠে ভয়ংকর। তাগো অভিমান ভাঙা সহজ হইলেও রাগ ভাঙা কঠিন। সেই মাশুল এতগুলা বছর ধইরা দিতাছি, একাকিত্বের যন্ত্রণা ভোগ করতাছি। এই যে বছর খানেক আগে ধরা পড়ছে একটা কিডনি নষ্ট, পাকস্থলীর অবস্থাও ভালা না, যেই কিডনি ভালা আছিলো হেইডাও নষ্ট হওয়ার পথে। বেশিদিন মনে হয় বাঁচমু না। শেষদিন পর্যন্ত আল্লাহর কাছে মাফ চাইমু, নিজেরে আল্লাহর পথে বিলাইয়া দিমু। আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নাই। আহা, সঠিক সময়ে যদি বুঝতাম?”

হতাশার শ্বাস ফেললেন বুড়ো। বিজ্ঞের মতো বললেন, “জীবনে আর ভুল পথে হাঁটিস না, ভাই। আইজকার অবস্থা থাইক্যা শিক্ষা নে। আল্লাহরে নারাজ করিস না, বউয়ের মনে কষ্ট দেইস না। শেষ বয়সে একলা থাকা অনেক কষ্টের।”

“হ, বইয়া বইয়া অন্যের অন্যায় সহ্য করমু।”

“যে সয় সে রয়। বিচারের মালিক আল্লাহ। আমি আর তুই কেডা? আল্লাহর কাম আল্লাহরে করতে দে। অপরাধ কইরা মানুষ কহনো পলাইতে পারে না। তাই নিজের মিহি চাইয়া দেখ; তুই নিরপরাধ, সৎ তো?”

নাজির দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। সে নিরপরাধ নয়। হয়তো একসময় সৎ ছিল। তবে নিজের সাথে পবিত্র শব্দটা জুড়তে আর ইচ্ছে করে না। সে যে কী ভয়ানক কাজ করেছে তা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানেন না। অথচ মূর্খ নাজির রবের কাছে একবারও ক্ষমা চাওয়ার কথা ভাবেনি। স্ত্রী কিছুটা জানে, ফলে মেয়েটাকে বহুদিন ধরে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। কত স্বার্থপর হয়ে গেলো নাজিরটা? তার কী নিজের কর্মের জন্য কিছুটা হলেও অপরাধবোধ হচ্ছে? সে কী নিজেকে অতিরিক্ত সাহসী, বুদ্ধিমান ভাবেনি? নিজের থেকেই নিজে পালিয়ে বাঁচেনি? করেনি কী ছলনা? আসলেই তো, সে কে বিচার করার? আর এটাই বা কেমন বিচার?

মৃত্যু অনিবার্য। মৃত্যু কখনো কারো পূর্নাঙ্গ শাস্তি হতে পারে না। মানুষের দেওয়া শাস্তি স্রেফ মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু রবের শাস্তি তারচেয়েও ভয়ংকর।

নাজির চোখ বুজে রইল। এতটুকু পথ যাত্রা করতে যা যা জীবনে করেছে সব চোখের সামনে ভেসে উঠছে। মনে জাগছে প্রশ্ন। মস্তিষ্ক বলছে, যদি আজ সূর্যের আলো দেখতে না পেতাম? যদি মরে যেতাম? কী নিয়ে দাঁড়াতাম রবের সামনে? কী উত্তর দিতাম?

অস্থিরতায় ঘাম ছুটে গেলো নাজিরের। টের পেলো, সেই ঘাম কেউ মুছে দিচ্ছে। হয়তো মিল্টন। চোখ খুলে দেখতে ইচ্ছে হলো না। নাজিরের মনে হলো সে মরার মতো বেঁচে আছে। যেই জীবনে রবের সান্নিধ্য নেই, সঠিক একটা যাত্রা নেই; সেই জীবন কখনো সফল হতে পারে না। মানুষ পাপ করতে ভয় পায় নয়তো পাপের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে আফসোস করে। কিন্তু নাজির বোধহয় মাঝপথেই আফসোসে জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। যতদিন হাসপাতালের বিছানায় ছিল ততদিন সে ভেবে ভেবেই পাড়ি দিয়েছে দিন।
______

কোনো এক সময় বনখড়িয়া গ্ৰামে প্রতাপের সহিত মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা শাহ বাড়িতে আজ আর আনন্দ নেই, সম্মান নেই। সারাক্ষণ চিৎকার চেঁচামেচি করা মর্জিনা নিশ্চুপ। ছোটো ছেলে জাহিদকে নিয়ে পড়ে আছেন সংসারে। থানায় যাননি আর। স্বামীর মুখোমুখি হওয়ার ইচ্ছে নেই। ভাইয়েরা গতকাল এসে ঘুরে গিয়েছে। বোনকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে চাচ্ছে। তবুও যে কীসের আশায় তিনি পড়ে আছেন এখানে? মর্জিনা কঠোর এক নারী। অন্যায়, মিথ্যা সহ্য করতে পারেন না। তাই একজন ঠকবাজ, খুনির সাথে জীবনের বাকি দিনগুলো পার করতে তাঁর বিবেকে বাঁধবে। অথচ কত যুগ সত্য না জেনে লোকটাকে ভালোবেসে গেছেন, বিশ্বাস করেছেন! যদি আত্মহত্যা পাপ না হতো তাহলে এতক্ষণে হয়তো এই লজ্জা থেকে পালিয়ে যেতেন তিনি।

শিউলি এসে ডাকলো,“আম্মা!”

মর্জিনা তাকালেন একবার। নির্ঘুম চোখ জোড়া লাল টুকটুকে হয়ে আছে। গ্ৰামের আকাশে রোজ রোজ একেকটা নতুন সত্য সূর্যের আলোর মতো ঝলমল করে উঠছে। বাতাসের বেগে ছড়িয়ে যাচ্ছে মানুষের দ্বারে দ্বারে। ফতেহ আলীর মৃত্যু থেকে শুরু করে নাসরিনের খবরটাও অন্ধকারের নিচে এখন আর চাপা নেই। সবার সামনে সত্য উন্মোচন হয়ে গেছে। ন্যায় পেয়েছে নাসরিন।

মর্জিনা প্রাণহীন কণ্ঠে বললেন,“তোমার বাপে আইলে যাইয়ো গা।”

“আম্মা, কী কন এইসব? তিনি যদি আইয়ে?”

“এক খুনির লাইগা অপেক্ষা করবা? বিবেকে বাঁধবো না?”

“উনি কিছু করেন নাই, আম্মা।”

“অন্যায়ের সাথ দিছিলো, ঠিক সময় মাস্টর বাড়ির পুরুষরা না পৌঁছাইলে খুনটাও কইরা ফেলাইতো। এমন এক জানোয়ারের লগে কেমনে সংসার করবা?”

ডুকরে কেঁদে উঠলো শিউলি। শাশুড়ির গা ঘেঁষে বসে পড়ল। মর্জিনা নড়লেন না। গম্ভীর হয়ে বললেন,“এই সংসারে কী আছে তোমার? কিচ্ছু নাই। এইদিকে আমার সব আছে। স্বামী, সন্তান সব। এই সংসারের পিছনে আমি বহু বছর খাটছি। শেষমেশ পাইলাম কী? প্রতারণা। এক অমানুষের লগে ঘর করছি। যে নিজের বাপ, ভাই, ভাবি এমনকি ভাইপুতরেও ছাড়ে নাই। লগে দুই দুইডা খুনি পয়দা করছি। সবাই ছিঃ, ছিঃ করতাছে। এই মুখ আমি কেমনে দেখামু? কারে দেখামু? মর্জিনা বেগম তার পোলাগো মানুষ করতে পারে নাই। সে একজন খারাপ মা। এই সংসারের প্রতি আমার আর মায়া নাই। আমিও আইজ সমান অপরাধী। কার কাছে মাফ চাইমু, আল্লাহ?”

অধিক শোকে পাথর হয়ে গেছেন মর্জিনা। পুনরায় বললেন,“পারলে আমারে মাফ কইরা দিও। আমার পোলাডার লাইগা তোমার জীবনে কালি লাগলো। তবু চিন্তা কইরো না। ওই জানোয়ারের থাইক্যা তালাক নেওয়াইয়া ভালো এক পোলার লগে তোমার বিয়া দিমু।”

“এমন কথা মুখে আইনেন না, আম্মা।”

“পুরুষের প্রতি মাইয়া মাইনষের এত দুর্বল হইলে চলে না। আমারেই দেহো না। এই পাওনা আছিলো আমার? এর লাইগা এই সংসারে বান্দির মতন খাটছি?”

শিউলি নাক টানলো। মর্জিনা জাহিদকে ডাকলেন, “তুই আমার শেষ ভরসা, বাপ। এহন থাইক্যা আমার একমাত্র পোলা। তুই ক, বাপ ভাইয়ের পথে হাঁটবি নাকি আমার লগে যাইবি?”

জাহিদ ভাবার সময় নিলো না। বললো,“তোমার লগে যামু। তুমি যা কইবা তাই হুনমু। খুনি বাপ, ভাইয়ের দরকার নাই।”

মর্জিনা সন্তুষ্ট হলেন।

বিথী ব্যাগপত্র গোছাচ্ছে। সুমা মাকে সাহায্য করছে। আব্দুল্লাহ হাঁটতে হাঁটতে দাদীর ঘরে এলো। দাদীকে অন্যমনস্ক হয়ে বসে থাকতে দেখে বললো,“আমরা যাইগা, দাদী।”

ছেলে, দেবর জেলে যাওয়ার খবর শোনার পর থেকে তিনি চিন্তিত। কতবার পারভেজকে বলেছেন,“হয় আমারে নিয়া চল নয়তো সাদ্দামরে আইতে ক।”

পারভেজ মুখের উপর বলে দিয়েছে,“জেলে পঁইচা মরুক। আমগো বাড়িত কোনো অপরাধীর জায়গা নাই।”

আয়েশাও কী খবরটা শোনেনি? নাহলে জামাইকে নিয়ে এলো না কেন? সে তো বড়ো ভাই অন্ত প্রাণ! নাতির কথায় সোজা হয়ে বসলেন,“কই যাস?”

“নানার বাড়ি।”

ফরিদা উঠে এলেন। ছেলের ঘরে যেতেই দেখতে পেলেন পুত্রবধূ আর নাতনি মিলে সব গুছিয়ে নিচ্ছে। জিজ্ঞেস করলেন,“যাও কই তোমরা?”

বিথী জবাব দিলো,“আমার বাপের বাড়ি যাইগা। এইহানে থাইক্যা আর হইবো কী? আমনের পোলা এত সহজে ছাড়া পাইবো বইল্যা তো মনে হয় না। রোজ প্রতিবেশীরা আইয়া কী কয় না কয়? সুমায় ইশকুলে গেলেও ওরে ক্ষ্যাপায়। আইজ সকালেও কয়ডা ব্যাডায় আইছে। এই বাড়িত দুইডা পোলাপাইন লইয়া আমার আর থাকা সম্ভব না।”

“তোমার বাপেরে কও না ক্যান? যদি জামিনের চেষ্টা করতো?”

“আমার বাপের থানা পুলিশ করার বয়স আছে?”

সোনার গহনাগুলোও ব্যাগে ঢোকাতে লাগলো বিথী। ফরিদা হাত থেকে সেসব কেড়ে নিলেন,“এডি তো আমার গয়না। কহন আলমারি থাইক্যা সরাইছো?”

“জামাই নাই, পোলা জেলে। এসব দিয়া কী করবেন? আমি লইয়া গেলাম। পোলাপাইনডি লইয়া তো চলতে হইবো।”

ফরিদা আঁতকে উঠলেন। সামিউলের বিয়ের সময় যা গহনা দেওয়ার দিয়েছেন। এগুলো পারভেজের জন্য রেখেছিলেন। তা নিয়ে গেলে পারভেজটার কী হবে? বাইরে গিয়ে চিৎকার করলেন,“পারভেজরে কই তুই, বাপ? দেখ, সব লইয়া যাইতাছে তোর ভাবি।”

পারভেজ সবে বাড়িতে ফিরেছে। কলপাড় গিয়েছিল হাত-মুখ ধুতে। মায়ের চিৎকারে চলে এলো। জিজ্ঞেস করল,“হইছে কী?”

“তোর ভাবি একেবারে বাপের বাড়ি যাইতাছে গা। সব গয়নাগাটি, ট্যাহা পয়সা এমনকি ঘরের ঝাড়ু পর্যন্ত লুটপাট কইরা লইয়া যাইতাছে।”

“লইয়া যাক।”

“লইয়া যাক মানে? তোর কী হইবো? চলবি কেমনে? তোর বাপ নাই, ভাই কত জায়গা থাইক্যা ধারদেনা কইরা রাখছে। ব্যবসাডাই বা একলা একলা কেমনে সামলাইবি? ঋণ কেডা শোধ করবো? পাওনাদার তো তোরে ধরবো। বলদামি করিস না।”

ললাটে চিন্তার ভাঁজ পড়ল পারভেজের। মাল কেনার নাম করে অনেকগুলো টাকা ধার করেছে সামিউল। কিছু মালামাল গুদামে আটকে আছে। তার একার পক্ষে সব সামলানো আসলেই সম্ভব নয়। আব্বাসটাও কোথায় যেন ঘাপটি মেরে বসে আছে। আসন্ন ঝড় টের পায় সে। তাই মায়ের কথায় ভাইয়ের ঘরের দিকে হাঁটা ধরলো।

চলবে ______

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here