#যাত্রাপথ
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:৭১]
আকাশে শরতের শুভ্র মেঘ জমেছে। রাস্তায় একদল কুকুর ঝগড়া করছে। রান্নাঘরে বসে পাকা তালের রস ছেঁকে পিঠে বানানোর প্রস্তুতি চলছে পারুল, দিলারার মধ্যে। সৈয়দুন নেছা কেদারায় বসে পুত্রবধূদের কাজ দেখছেন। শুকনো খড়ি মাচায় তুলে রাখছে জেসমিন আর রুহুল স্ত্রী খুশবু। পলি তেমন একটা কাজ করে না। বাচ্চাটার একটুতেই সর্দি কাশি হয়ে যায়। শালিক বাপের বাড়িতে গিয়েছে। অলিউল খান এসে মেয়েকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছেন। বলেছেন,“পরিস্থিতি তো ভালা না। জামাই ফিরা না আওয়া পর্যন্ত মাইয়া না হয় আমার কাছেই থাকুক। ওর মায়ের চিন্তা হয়।”
শালিক যদিও রাজি ছিল না। সবাই অনেক বুঝিয়ে একপ্রকার জোর করেই তাকে পাঠিয়েছে।
সৈয়দুন নেছা হাঁক ছেড়ে বললেন,“কুত্তাগুলারে কেউ খেদাইয়া দিয়া আয় তো। মাথা ধরাইয়া ফেলতাছে। ভাদ্দর মাস আইলেই হেগো উজানি উডে।”
দাদী শাশুড়ির নির্দেশে শুকনো খড়ি নিয়ে ফটকের বাইরে চলে গেলো জেসমিন। বৃদ্ধা ছোটো পুত্রবধূর উদ্দেশ্যে বললেন,“তোমার মাইয়ার হাবভাব তো ঠিক লাগে না, বউ। যেকোনো সময় পানি কাইট্টা দিবো। তাই সব জোগাড় যন্ত হাতের কাছে রাইখো।”
তালটাকে ভালোমতো চটকে জবাব দিলেন পারুল, “গুছানোই আছে, আম্মা। তালেবের বউয়ের সময় সব আলাদা কইরা রাখছিলাম। এহন খালি নতুন অতিথি আওয়ার অপেক্ষা।”
“পেট দেইখা আমার মনে হয় মাইয়া হইবো। পলি, ফাহমিদারও তো মাইয়া হইছে। এইডা মনে হয় মাইয়া হওয়ার মরশুম।”
“বুঝতাছি না, আম্মা। যেই লাত্থি মারে! পোলাও হইতে পারে।”
দিলারা বললেন,“যেইডাই হোক, সুস্থ হোক। কয়দিন আগে মাইয়াডা শুকাইয়া যা হইছিল! খাওয়া-দাওয়া সব বাদ দিছিলো।”
“এহন আবার ঠিক হইয়া যাইতাছে। নিজে নিজেই দেখলাম খায়। কাইল রাইতে আইয়া কইতাছে, হাঁসের গোশ খাইতে মন চায়। আমি কইলাম, এই সময় হাঁস খাওয়া উচিত না। পোলাপাইনের গলার স্বরও হাঁসের লাহান হইয়া যাইবো।”
“এইগুলা কুসংস্কার। আমার বোইন পোয়াতি থাকতে কত হাঁস খাইলো! কিছু হইছে আমগো তারার? কী সুন্দর গলার স্বর মাইয়ার! ওহ, বড়ো বউরে হাঁস বাছতে দেখলাম। কেডায় আনছে?” দিলারা বললেন।
“কেডায় আবার? জামাই আনছে। আমার কথা হুইন্না মাইয়া গোস্বা কইরা জামাইরে মনে হয় কইছে। হেয়ই ভেইন্নাবেলা কইত্তে জানি হাঁস দুইডা আইন্না আমার হাতে ধরাইয়া দিয়া কইলো, এনতে আস্তা একটা হাঁস আমনের মাইয়ারে রাইন্ধা দিবেন। যত খাইতে পারে। আমি আর কী কমু? এই মাইয়া একে তো নাচুনি বুড়ি তার উপর ঢোলের বাড়ি দেওয়া জামাই পাইছে।” হাসলেন পারুল।
সৈয়দুন নেছা মুখ বাঁকালেন,“কয়দিন আগে ঠিকই তো কত কথা কইছো।”
“সাধে কই নাই, আম্মা। একটা মাত্র মাইয়া আমার। মাইয়ার মা হওয়া যত জ্বালা। এমনিতেই তহন একটা কলঙ্কের দাগ চরিত্রে লাইগা গেছিলো। আমনের পোলায় পারলে আমারে তালাক দিতো। তার মাঝে ভাইজান করুণা কইরা আরিফের লগে বিয়ার প্রস্তাব দিয়া আমার সংসার বাঁচাইলো। আমি চাইছি প্রায়শ্চিত্ত করতে। আমার মাইয়াডার সুখ আর সুন্দর একটা সংসার দেখতে। শাহ বাড়ি এমনিতেই আব্বার শত্রু, সংসার পোলার চাচীগো হাতে। আবার এহন দেহেন, কীসব সত্য সামনে আইলো! নরপিশাচগো মাঝখানে আমার মাইয়াডা রইছে। আল্লাহ না করুক, তারও যদি কিছু একটা হইয়া যাইতো? মা হইয়া কেমনে সহ্য করি? আমার কষ্ট কেউ কহনো বুঝে নাই, আম্মা। আর বুঝবোও না।”
“এসব কইয়া আর লাভ নাই। দোয়া করো, পোলাডা যাতে সুখের মুখ দেহে। তোমার মাইয়া তো জন্মের পর থাইক্যাই আহ্লাদী। বিয়ার আগে আছিলো বাপ, ভাই, মামাগো। বিয়ার পর যোগ হইছে জামাই। কী কষ্ট আর সহ্য করছে? যা করার তো জামাইডাই করল।”
সৈয়দুন নেছা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কথার প্রসঙ্গ ধীরে ধীরে অন্যদিকে মোড় নিলো।
নাজির দাঁড়িয়ে আছে উত্তরের জমিতে। আমড়া খেতে খেতে মিস্ত্রীদের কাজ দেখছে। টিন, কাঠ দিয়ে ঘর বাঁধা শেষ। এখন ঘরের মেঝে পাকা করা হচ্ছে।দালানের কাজ কদিন পরেই ধরবে। লতিফ সেখান থেকেই চিৎকার ছেড়ে বললো,“আমনের ঘা ঠিক হইছে, ভাই? টক আমড়া খান ক্যান? পাক ধরবো তো।”
“পাক ধরলে তুই আইয়া টিইপা দেইস।”
মিল্টন কচুরিপানা কেটে এনে গরুদের চাড়িতে দিয়ে বললো,“আমগো ভাইজানের খাওন-দাওনের ধরণ আলাদা। যেমনঃ দুধের লগে আনারস, জামাল গুডা খাইয়া পেট খারাপ করা, কাঁচা ডুমুর চাবাইয়া খাওয়া, এহন আবার শরীর ভর্তি ঘা লইয়া আমড়া খাইতাছে। ভাইজান, পাগলা গুডা খাইবেন না?”
নাজির চোখমুখ কুঁচকে নিলো। ছেলেপেলেদের সাহস দিনদিন বাড়ছে। সুযোগ পেলেই সবাই তাকে শাসন করতে চলে আসে। ত্যাছড়া স্বরে বললো,“না, তোরে খাওয়ামু, গোলামের পুত। খাবি?”
“না, আমনেই খান। আমার এহনো বিয়া হয় নাই।”
“হ, বিয়া অনেক সাধ। আয় করাইয়া দেই।”
“কবে ধইরা শুধু দিবেনই কইতাছেন।”
“দেখ লতিফ, দেখ। বল্টু বিয়া পাগলা হইয়া গেছে। লাল মিয়া ঘটক কী এহনো বাজারে বয়? আমার লগে দেখা করতে কইস। বল্টুর বিয়া দিমু।”
লতিফ মাথা নাড়ালো,“আইচ্ছা, ভাই।”
মিল্টন লাজুক হেসে বললো,“আইজ রাইতে এনে মোখলেছে থাকবো, ভাইজান।”
“তুই কই যাবি?”
“মাছ মারতে, এই বছর একবারও যাই নাই।”
“আমিও যাই নাই। বিয়া করার পর থাইক্যা ঘরের সিংহির লাইগা যাইতে পারি না। এহন বাপের বাড়ি আছে। আমারেও লইয়া যাইস।”
“আমনে অসুস্থ।”
“চুপ।”
পেছন থেকে হঠাৎ ডাক এলো,“ভাই!”
আমড়ার আঁটি পুরোটা মুখে পুরে পেছন ফিরে তাকায় নাজির। মলিন মুখে পারভেজ দাঁড়িয়ে আছে। চুল উসকোখুসকো, পরনের পোশাক অগোছালো। মিল্টন রাগত স্বরে সেখান থেকেই বলে উঠলো,“এনে কী? তোরে ভাইজানের আশেপাশে আইতে নিষেধ করছি না?”
নাজির চাপা ধমক দিলো,“তুই মুখ বন্ধ কইরা কাম কর, ব্যাডা।” পারভেজের দিকে এগিয়ে এলো সে। দুই হাত পেছনে রেখে হাস্যোজ্জ্বল মুখে জিজ্ঞেস করল, “আরেহ পারভেজ শাহ যে! খবর কী?”
“এমনে কথা কইয়ো না। এমনিতেই লজ্জায় বাঁচি না।”
সামনের সরু পথ ধরে হাঁটতে লাগলো দুজন। মিল্টন এতে বিরক্ত হলো। হাতের কাজ ফেলে তাদের পিছু ছুটলো। যেন কাউকে সে আর বিশ্বাস করে না। উসখুস করতে করতে পারভেজ জিজ্ঞেস করল, “কেমন আছো?”
“সবাই খালি এককথাই জিগায়। আল্লাহর রহমতে এহনো বাইচ্চা আছি।”
পারভেজ বলার মতো কথা খুঁজে পাচ্ছে না। অথচ দেখা করার জন্য এতদিন কত পাগলামিই না করেছে। নদীর ধারে এসেই বসে পড়ল নাজির। জিজ্ঞেস করল,“চেহারার এই অবস্থা ক্যান? গাঞ্জা টাঞ্জা খাস নাকি?”
“জীবনে হুক্কায়ও টান মারি নাই, তুমি গাঞ্জার কথা কও?”
“তাইলে ভাত খাস না নাকি? আর বাড়িত যাস না ক্যান?”
“ওই বাড়ি আর ভাল্লাগে না। কিচ্ছু আগের মতো নাই। সুমা আর আব্দুল্লাহরে লইয়া ভাবি বাপের বাড়ি চইলা গেছে। ছুডো চাচীও জাহিদ, নাজমুলের বউরে লইয়া গেছে গা। আর ফিরবো না কইলো। আমি একলা একলা কী করমু? মায়ের মুখটাও এহন আর দেখতে ইচ্ছা করে না। আমার সহজ সরল মায়ের আড়ালে এতদিন শয়তান লুকাইয়া আছিলো! কেমনে বিশ্বাস করি কও? দুলাভাই, আয়েশা বুবু একবারও আইলো না। আইজও বাজারে একজন ডাক দিয়া সবার সামনে জিগায়, হাছাই তগো বাড়িত এইসব ঘটছে? তুইও কী সাথে আছিলি? তোমার বিশ্বাস হয় আমি এইসবে আছিলাম?”
“আজকাল আর কাউরে বিশ্বাস করতে পারিনা। তোরও করা উচিত না। দুনিয়ার মানুষ খুব খারাপ, পারভেজ। এইখানে বাপ, মা, ভাই-বোন, সন্তান কেউ কারো নিজের না। কহন যে কেডা বদলাইয়া যায়!”
“ওগো কী ফাঁসি হইবো?”
“কী যে কস না? এই দেশে সাধারণ মানুষগো মারলে কারো ফাঁসি হয়? বেশিদিন জেলে থাকবো কিনা তাই সন্দেহ।”
দুদিন আগেই তালেব আর চেয়ারম্যানের সাথে গিয়ে থানায় হত্যা মামলা দায়ের করে এসেছে নাজির। পুলিশ বলেছে, পলাতক আসামিদের খুঁজে বের করা হবে। এই সপ্তাহে মুমিনুল শাহ আর সামিউলকে তোলা হবে আদালতে। তবে মুমিনুল শাহকে মনে হয় না বেশিদিন জেলে আটকে রাখা যাবে। হত্যার চেষ্টা বা আদেশের কোনো সাক্ষী প্রমাণ নেই। সামিউলের সাক্ষী কতই বা গুরুত্বপূর্ণ? যা করেছে সব সামিউল, শাহরিয়ারই তো করেছে। তাই নাজমুলেরও বেশিদিন জেল হবে বলে মনে হয় না।
পারভেজ উদাস হয়ে বসে আছে। নাজির বললো, “ব্যবসা হাতছাড়া করিস না। তোর পুরা একটা জীবন পইড়া রইছে। তোর ভাই নিজের স্বার্থে কম ট্যাহা সরায় নাই, লগে চাচা তো আছেই। আইজ যদি এমন ঘটনা না ঘটাইতো তাইলে তোর কপালেও দুঃখ আছিলো। প্রতিবাদ করলে পরিণতি হইতো সুবহান আলী শাহর মতন, আর প্রতিবাদ না করলে হইতি মুমিনুল শাহ।”
“আমি ওগো মতন না। আইজ পর্যন্ত কারো কোনো ক্ষতি করছি? তাও আমার ভুগতে হইতাছে। মাইনষের কথা হুনতে হইতাছে। সমাজে ঘেডি সোজা কইরা চলতে পারতাছি না।”
“তো বাপ-মায়ের কর্মফল ভোগ করবি না? আমিও তো করছি। কী করি নাই? ডাক্তর কইছে, আর কহনো ভারী কাম করতে পারমু না। মোদ্দা কথা, উপুড় হওয়াই নিষেধ। নিজের ভিটে ছাড়ছি, শ্বশুরবাড়ি থাকতাছি, মরার মুখ থাইক্যা ফিরা আইছি, জীবনে আরো কত কী সহ্য করছি। তুই দেহোস নাই? এই সমাজে জায়গা করার লাইগা কত কী করছি। কিন্তু তোরা? তোরা কী সহ্য করছোস? জন্মের পর বাপ-মা, সাজানো সংসার সব পাইছোস। তৈয়ার ব্যবসা, সম্পদ। তারপরেও এই কথা?”
পানির স্রোতের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে পারভেজ। নাজির বললো,“আমি সবসময় কই, দুনিয়াডা একটা পরীক্ষাক্ষেত্র। কইতে পারোস দীর্ঘ একটা যাত্রা। সেই যাত্রার শেষ পথ, গন্তব্য হইলো কবর। এহন তুই সেই পথ পর্যন্ত পৌঁছানোর লাইগা কেমনে যাত্রা করবি পুরাডাই তোর ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমি দেরিতে হইলেও বুঝছি, আল্লাহ যাগো বেশি ভালোবাসেন তাগোই পরীক্ষা নেন। কিন্তু আমরা না বুইঝাই উনারে দোষ দেই। এইডা উচিত না। আল্লাহর উপর আমগো বিশ্বাস রাখা উচিত। যেই আল্লাহ পরীক্ষা নিতে পারেন সেই আল্লাহ পাসও করাইতে পারেন। ছোট্ট একটা জীবনে কতকিছু ঘইট্টা গেলো, কতকিছু দেখলাম, জানলাম। সামনে আরো অনেক কিছু পইড়া রইছে। ভালা নাকি মন্দ আল্লাহ জানেন। তবুও আমগো চলতে হইবো, যাত্রা করতে হইবো। দুনিয়ায় থামা যায় না, অতীতে ফিরা যায় না। শুধু চলতে হয়। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে চলতে হয়।”
কথায় বিরতি টানলো সে। কণ্ঠস্বর নরম করে বললো,“তগো লগে আমার কহনো কোনো শত্রুতা আছিলো না। আমার যত সমস্যা তগো বাপ, চাচাগো লগে। আমি সামিউল ভাইরে নিজের বড়ো ভাই মানছি। তুই, নাজমুল, শাহরিয়ার, জাহিদরে ছুডো ভাইয়ের নজরে দেখছি। কহনো নওশাদের থাইক্যা আলাদা করি নাই। কেউ তগো কিছু কইলে ঝাঁপাইয়া পড়ছি, মারামারি করছি, দুইডা পয়সা কামাইলেও তগো লইয়া খাইছি। বড়াই কইরা সবাইরে কইতাম, আমরা সাত ভাই। সবাই ডরাইতো। এহন হেইসব মনে পড়লে লজ্জা লাগে। সম্পদ, হিংসার সামনে ভাই ভাই কিচ্ছু না। এমন কিছু হইবো আমি আগেই সন্দেহ করছিলাম। কিন্তু এত জঘন্য হইবো তা হয়তো আশা করি নাই। নওশাদ আমার উপরে রাগ। ক্যান তারে দূরে দূরে রাখলাম? ভাগ্যিস রাখছিলাম! না হইলে আমার ছুডো ভাইডাও হয়তো হেগো মতন হইয়া যাইতো, নয়তো হেগো শিকার হইতো। তুই অন্তত বাপ-চাচাগো পথে হাঁটিস না, পারভেজ। ভাইয়ের মতো ভুল যাত্রা করিস না। তুই নিজেরে প্রমাণ কর। সবাইরে দেখাইয়া দে, এক গাছের সব ফল টক হয় না। মাঝেমধ্যে মিষ্টিও হয়। জীবনডা গুছাইয়া নে। ওরা বাহিরের দুনিয়াত আওয়ার আগেই নিজের হিল্লে কর। ব্যবসাডা নিজের দখলে নিয়া নে।”
“তুমি আর ফিরবা না? তোমার ওই ভিটে খালি পইড়া থাকবো?”
“কিছুই খালি থাকবো না। শূন্য স্থান কহনো শূন্য থাকে না। হয়তো ওই ঘর আর থাকবো না, নয়তো তগো ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ওইখানে থাকবো। জাহিদ, সুমা, আব্দুল্লাহ একদিন ফিরা আইবো। বাপের ভিটে ছাড়া যাইবো কই? শুধু সময়ের অপেক্ষা। আমার বরং দূরে থাকাই ভালা।”
পারভেজ স্থির দৃষ্টিতে একই দিকে তাকিয়ে রইল। তার কিছু ভালো লাগছে না। নাজিরের মতো সাহস, শক্তি তার নেই। আর না কোনোকালে ছিল।
নদীর ধারে শরতের কাশফুল ফুটেছে। আকাশে ছুটে চলেছে দলবদ্ধ শুভ্র মেঘের দল। নাজির একগুচ্ছ কাশফুল ছিঁড়ে নিলো। রাতে মাছ ধরতে যাবে, তার জন্য বউকে মানাতে হবে। বাড়ি ফিরেই স্ত্রীকে ঘরে পেয়ে গেলো। পা ছড়িয়ে বসে ফ্যানের বাতাসে ভেজা চুল শুকাচ্ছে। নাজিরের হাসি পেলো। মেয়েটার চেহারা, সুরৎ সব বদলে গিয়েছে। কিশোরী নয়, মনে হচ্ছে যেন পূর্নাঙ্গ নারী। নাজির এসেই তার দিকে ফুলগুলো বাড়িয়ে দিলো।
মিছরি ভূত দেখার মতো চমকে গেলো। বুকে থুথু ছিটিয়ে আপাদমস্তক স্বামীকে দেখে ফুলগুলো হাতে নিলো। মুচকি হেসে বললো,“সূর্য আজ কোনদিকে উঠেছে?”
“যেইদিকে প্রত্যেক দিন ওঠে।”
“বিয়ের এতদিন পর নাজির শাহ তার গর্ভবতী স্ত্রীকে প্রথমবার ফুল দিচ্ছে? অবিশ্বাস্য!”
“তাও যে দিছি এইডাই তো অনেক।”
“সারা বেলা কোথায় ছিলেন?”
“আর কইয়ো না, আমার বাড়ির কামের কাছে বইয়া রইছিলাম। এই বাড়িত আর ভাল্লাগে না, তার উপর আবার শ্বশুরবাড়ি। জীবনেও ভাবি নাই, আমি যে ঘর জামাই থাকমু। নওশাদরে কত কথা শুনাইছিলাম! দেশে আইলে মাফ চাইমু না হয়।”
“ঢং! এটাকে ঘরজামাই থাকা বলে না। নেহাৎ পরিস্থিতি ভিন্ন। তা বাড়ির কাজ কতদূর?”
“মেঝে ঢালাই দিছে। শুকাইলেই বিদ্যুতের লাইন আনমু। জিনিসপত্রগুলাও ওই বাড়ি থাইক্যা আনতে হইবো। আপাতত টিনের বাড়ির ছোট্ট সংসার চলবো, ময়না পাখি?”
“মাটির বাড়ি চললে টিনের বাড়ি কেন চলবে না? আপনি সঙ্গে থাকলে দৌড়াবে।”
নাজির হেসে ফেলল,“এই অবস্থা না হইলে আগে দালানের কামই ধরতাম। সব আনা শেষ। কিন্তু এহন ঘরের দরকার পড়ছে। না হইলে আমগো ছানাপোনারা থাকবো কই?”
“যা ভালো মনে হয় তাই করুন। এবার যান গিয়ে গোসল সেরে আসুন। বেলা বয়ে যাচ্ছে। খেতে হবে না?”
“খাইছো তুমি?”
“না।”
“আয়হায়, দুপুর তো গড়াইয়া যাইতাছে।”
“তাহলে দেরি করেছেন কেন?”
“এহনো পোলাপাইনের মতো আচরণ করে। কয়দিন পর আমার দুইডা পোলাপাইন সামলাইতে হইবো। ধুরু, ভাল্লাগে না। একটা মাইনষের পক্ষে কয়দিক সামলানো সম্ভব?”
প্রত্যুত্তরে মিছরি শুধু হাসলো। নিজের হাতে খেতে তার ভালো লাগে না। মা যদিও খাইয়ে দিতে চেয়েছিল কিন্তু সে নিষেধ করেছে। স্বামী থাকতে মায়ের হাতে কেন খাবে? লোকটা এমনিতেই তাকে কম কষ্ট দেয়নি। সেগুলো শোধ করতে হবে না? তার হাসি দেখে নাজিরের গা জ্বলে গেলো। বিড়বিড় করে লুঙ্গি, গামছা নিয়ে চলে গেলো কলপাড়। এখন আর তার গোসল করতেও ভালো লাগে না। পুকুর নেই, সাঁতার কাটতে পারে না, ক্ষতও শুকায়নি। নড়াচড়া করলেই টান লাগে। যতটুকু পারলো শরীর মেজে গোসল সারলো সে।
বাড়ির বউরা দুপুরের রান্না শেষে গোসল সেরে ঘরে ঢোকে। বিকেল ছাড়া আর বের হয় না সহজে। এই জন্যই নাজির দেরি করে এলো। এদের মুখোমুখি হতে তার বিরক্ত লাগে। লুঙ্গি মেলে দিতেই কাশেম আলীর ডাক পড়ল,“জামাই বাবাজি! এত দেরি করলেন যে? আইয়েন, খাইতে আইয়েন।”
চোখমুখ কুঁচকে নিলো নাজির। বিড়বিড় করে বললো,“এই যে আরেক নাটকী! তুই থাইক্যা আমনেতে গেছে গা। যেমন বাপ, তেমন মাইয়া।” বিরক্তি প্রকাশ না করে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো, “আগে আমনের মাইয়ারে খাওয়াইয়া লই, শ্বশুর আব্বা। লগে আবার আমার একটাও আছে। হেরপর আমি গিলমু।”
“সেকি, আম্মাজান খায় নাই?”
“না, আমনের মতন নাটকী বাপের মাইয়া না?”
নাজির ঘরে চলে গেলো। কাশেম আলী হো হো করে হেসে উঠলেন। স্ত্রীকে ডেকে বললেন,“ঘাউড়াডারে আমার আম্মাজানে ভালা মতন টাইট দিতাছে।”
পারুল কিছু বললেন না। মাত্র মেয়ের ঘরে খাবার দিয়ে এসেছেন তিনি। রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে বললেন,“নিজের মাইয়া জামাইরে টাইট দেয় দেইখা মহাখুশি। আর নিজের বউ চোখ তুইল্যা চাইলে বান্দী। ব্যাডা জাতটাই খচ্চর।”
ঘরে এসে উদোম গায়ে ফতুয়া জড়িয়ে বিছানায় বসলো নাজির। ভাত মাখিয়ে স্ত্রীর মুখের সামনে ধরে বললো,“হাঁস খাইতে চাইছো তাই আনছি। আইজ আর কোনো নাখরা চলবো না।”
মিছরি কিছু বললো না। খেতে খেতে বললো,“আচ্ছা, বাচ্চাকাচ্চার নামধাম কিছু ভেবেছেন?”
“এই যা! তা তো ভাবা হয় নাই।”
“তা ভাববেন কেন? মাথা ভর্তি তো শুধু কুবুদ্ধি।”
“তোমার মাথায় বুঝি ভালা বুদ্ধি?”
“অবশ্যই, মেয়ে হলে ভেবেছি নামিরা রাখবো।”
“নামিরা? এইডা অর্থ কী? আমি তো ভাবছিলাম মিষ্টি রাখমু।”
“মিষ্টি?”
“হ, বউয়ের নাম তালমিছরি আর ছানার নাম মিষ্টি।”
“ধুর, মিষ্টি চলবে না। মেয়ের জন্য নামিরা সবচেয়ে সুন্দর নাম। এখন বলুন, ছেলের নাম কী রাখা যায়?”
নাজির ভাবলো কিছুক্ষণ। পরক্ষণেই বললো, “ইশরাক শাহ কেমন হয়?”
“ইশরাক?”
“হ, ইশরাক অর্থ হইলো ভোর, দিনের সূচনা। আমগো জীবনে পোলা কিংবা মাইয়া যেই আসুক, আলো হইয়াই তো আসবো তাই না?”
মিছরি মাথা নাড়ালো। নাম তার পছন্দ হয়েছে। খেতে খেতে দুজনার মধ্যে অসংখ্য কথা হলো। অথচ ক’দিন আগেই সম্পর্কের উপর দিয়ে কত ঝড় ঝাপটা গিয়েছে! খারাপ দিন চিরকাল থাকে না। আর ভালো দিন দ্রুত কেটে যায়।
চলবে _______
ফলো- উপন্যাস

