যাত্রাপথ লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই [পর্ব:৫৪]

0
30

#যাত্রাপথ
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:৫৪]

মাঘের অবসান ঘটিয়ে ফাগুন এসেছে ধরায়। গাছের জীর্ণ পাতারা ঝরে পড়ছে বাতাসের প্রখর হাওয়ায়। পুরোনো পঞ্জিকা বদলে সূচনা ঘটেছে ইংরেজি নতুন বৎসরের। এখন সাল, ১৯৯৭।

নাজির ভেবেছিল, চেয়ারম্যান আতাউর রহমানকে দিয়েই তার প্রতিশোধের সূচনা ঘটাবে। কিন্তু কথায় আছে না, মানুষের চেয়ে আল্লাহর পরিকল্পনা অতি উত্তম। গত মাসের কনকনে শীতে শহরে কোনো এক দলীয় সমাবেশ থেকে ফেরার পথে কয়েকজন কালো মুখোশধারী লোক মাঝরাস্তায় গাড়ি থামিয়ে আতাউর রহমান আর তার পুত্রকে কুপিয়ে জখম করেছে। ক্ষত গভীর, হাসপাতালে মাস খানেক পড়ে থেকে এখন বাড়িতে ফিরে বিছানার সঙ্গে সন্ধি বেঁধেছেন তিনি। ঠিকমতো হাঁটতে পারেন না, রগ নাকি ছিঁড়ে গিয়েছে। সোহেল হত্যা মামলাটাও নতুন কোনো মামলার নিচে চাপা পড়ে গিয়েছে। এখন আর পুলিশ তদন্ত করছে না। যতবার বড়ো ছেলেকে নিয়ে সিরাজ উল্লাহ থানায় গিয়েছেন, ততবারই নানান অজুহাতে কর্তৃপক্ষ এড়িয়ে গিয়েছে তা। দেশীয় আইন তো এমনিতেই নড়বড়ে।

জোয়ারের পানি শুকিয়ে যেতেই কর্দমাক্ত জমিতে সেচ দিয়ে রোপণ করা হয়েছে ধানের চারা। সেই চারা হাঁটু অবধি বড়ো হয়ে সবুজে ভরে উঠেছে দ্বিগিদ্বিক। এ বছর আর শীতের কুয়াশা গায়ে মেখে কাঁদা মাড়িয়ে ধান ক্ষেত করতে নামেনি নাজির। যা করার মিল্টন আর লতিফদের দিয়েই করিয়ে নিয়েছে।

কিছুক্ষণ আগে ভোরের আলো ফুটেছে। বেলা হতে এখনো বেশ দেরি। নাজির ক্ষেতের আইলে দাঁড়িয়ে আছে। হিমেল হাওয়ায় পরনের লুঙ্গি, চাদর উড়ছে। পাশে কারো উপস্থিতি টের পেয়েও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না সে। চেহারায় কৌতূহলের বদলে পূর্বের মতো গম্ভীরতা লেপ্টে আছে। জিজ্ঞেস করল,“এত সকালে! ঘুম শেষ?”

মিল্টন মৃদু হেসে প্রত্যুত্তরে বললো,“হ, ভাইজান। এহন একটু তাড়াতাড়িই উঠি।”

“আইজ গাছগুলায় একটু কীটনাশক ছিটাইয়া দেইস, মাঝখানের গাছে পোক ধরছে মনে হয়।”

“আইচ্ছা।”

কথা আর এগোয় না। নাজির থেমে যায়। আজকাল মেপে মেপে কম কথা বলে সে। মিল্টন যেন কিছুতেই আগের নাজিরের সাথে এই নাজিরের মিল খুঁজে পায় না। জিজ্ঞেস করল,“হুনছি আমনের সম্বন্ধির নাকি বিয়া?”

“হ, রুহুলের বিয়া। আইজ মনে হয় মেন্দি, কাইল গায়ে হলুদ। ব্যাডা মাইনষের এতকিছু করতে হইবো ক্যান? আমি একদিনও যাই নাই। দুইদিন ধইরা ঘরের সিংহি হাউকাউ করতাছে।”

মিল্টন হাসে। নাজির ত্যাছড়া স্বরে বলে,“খালি হাসি আইয়ে তোমার? বিয়া করবি কবে? তোর লাইগা মোখলেছটা আটকাইয়া গেছে। বোইনগুলারও তো বয়স হইছে, মাইনষের নজর কিন্তু ভালা না।”

“আম্মায় কইলো, ঘরে বউ আইলে নাকি ননদগো দেখতে পারবো না। আমিও বউয়ের আঁচলের তলে গিয়া সংসারের খরচ দিমু না। তাই আগে বোইনগো বিয়া দিবো। ওইদিকে যৌতুক ছাড়া কথা আগায় না। আমার কী যৌতুক দেওয়ার সামর্থ্য আছে, ভাইজান? আগে মাইনষের পিছনে ঘুইরা ঘুইরা ফায় ফরমায়েশ খাটতাম। এহন আমনের কাছে কাম করি, দিন আনি দিন খাই। সেই পয়সায় সাতজনের সংসার, পেট চলে। আব্বা ভিটার একটু জমি ছাড়া কিছুই রাইখা যায় নাই। আমি আর কী করমু?”

“হতাশ হইস না, আল্লাহর উপর ভরসা রাখ। খারাপ সময় আমিও পার কইরা আইছি‌। পরিশ্রমী মাইনষেরা কহনো না খাইয়া থাকে না। রাজার ধনও একসময় ফুরাইয়া যায়। কার ভাগ্যে কী আছে আল্লাহ জানে। বাপ-মা সব সন্তানের কথা চিন্তা কইরাই সিদ্ধান্ত নেয়, তাই তোর মায়ের ভরসায় থাকলে হইবো না। ধন সম্পদের খোঁজ না কইরা বড়ডার লাইগা পরিশ্রমী, সৎ কাউরে খোঁজ। আল্লাহ দিতে কতক্ষণ? হেরপরে নিজে ঘরে বউ তোল। পরে বাকি বোইনগো লইয়া চিন্তা।”

মিল্টন শুধু মাথা নাড়ালো। নাজির পুনরায় বললো, “ওই পাড়ার মেম্বরের মাইয়ার পিছনে সময় নষ্ট কইরা লাভ নাই। মেম্বরে তোর কাছে কহনো মাইয়া বিয়া দিবো না। ওই মাইয়াও কহনো তোর সংসার করতে পারবো না। এই ধরণের মাইয়া সোনার চামচ মুখে লইয়া জন্মায়। এই যে আমার জন, প্রথম প্রথম ইটের বড়ো দালান ছাইড়া আমার মাটির ঘরে আইয়া আর থাকতে পারে না। গরমে অস্থির, কল চাপতে গেলে হাতে ঠোসা পড়ে, একটা কামও পারতো না, খালি নাখরা করতো। কিন্তু আমার তো বাপ-মা নাই, একলা মানুষ। তাই ধইরা ধইরা শিখাইয়া সংসার টিকাইছি।” কথায় বিরতি টেনে বললো,“পাত্রী দেখমু নাকি?”

মিল্টন লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল। মিনমিন করে বললো,“আমনের ইচ্ছা, ভাইজান।”

“দাঁড়া, বর্ষাকালডা আইতে দে। ঘটকালি করতাছি।”

“নওশাদ ভাইয়ের কী খবর? হেয় আর বিয়া করবো না?”

“করবো না ক্যান? বিয়া না করলে জীবন চলবো? ওর লাইগাও মাইয়া দেখছি। হাতে কিছু কাম আছে, ওইগুলা শেষ হইলেই ধইরা দিয়া দিমু।”

ক্ষেতের আইল পেরিয়ে হাটের দিকে হাঁটা ধরলো নাজির। মিল্টন তার পিছুপিছু হাঁটছে। ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে নাজির বললো,“আয় দেহি, বাজারে মনমতো মাছ পাই কিনা। এইবার শীতের মাঝে বউয়ের জ্বালায় রাইতে আর মাছ ধরতে বাহির হইতে পারি নাই। ভাবছিলাম, বিয়ার পর বউরে ছ্যাচার উপরে রাখমু। কিন্তু নিজেই এহন ঝাড়ি খাই, চোখ রাঙানিরে ডরাই। নাজির শাহর এই কী অবস্থা!”

শেষ কথাটুকু নাজির বিড়বিড় করে বললো। মিল্টন কাঁপতে কাঁপতে হা করে তাকিয়ে রইল। শেষমেশ কিনা তার সাহসী ভাইজান ওই হাঁটুর বয়সী বউকে ভয় পায়!

সকালের রান্না শেষ করে খেতে বসেছে মিছরি। আজ নাশতা হিসেবে ভাত আর ডাল ভর্তা করেছে। ইদানিং দিনকাল তার ভালো যাচ্ছে না। শরীর খারাপ, হুটহাট গা গুলিয়ে ওঠে, মাথা ঘুরায়। শিউলি দরজায় উঁকি দিয়ে বললো,“ভর্তা করছো?”

আচমকা তাকে দেখে চমকে গেলো মিছরি। মুখের খাবার গিলে বুকের মধ্যে থুথু ছিটিয়ে মাথা নাড়ালো। ভাতের থালা নিয়ে ভেতরে ঢুকে তার সামনে বসে পড়ল শিউলি। বললো,“আমার হড়ি রুডি আর লাউ রানছে। আমার আবার এইসবে পোষায় না। দুগ্গা ভাত আছিলো ওগুলাই লইয়া আইছি। দাও দেহি একটু ভর্তা। মেলা সুগন্ধ ছুটছে।”

ভর্তার বাটি এগিয়ে দিয়ে নিজের খাওয়ায় মনোযোগ দিলো মিছরি। শিউলি মেয়েটা বিথীর বিপরীত স্বভাবের। বেশি কথা বলে, মিশুক প্রকৃতির মেয়ে। তবে মিছরির সঙ্গে তেমন একটা সখ্যতা তার নেই। এ বাড়ির কারো সঙ্গেই মিছরি আগ বাড়িয়ে কথা বলে না। শিউলি বা মর্জিনা কিছু বললে বিপরীতে শুধু হা হু ছাড়া আর আগ্ৰহ দেখায় না। ফরিদা, বিথী তাকে এড়িয়েই চলে। মাঝেমধ্যে চোখাচোখি হলে ঠোঁট নাড়িয়ে গালি, অভিশাপ দেন ফরিদা।

পোড়া মরিচ পান্তা ভাতে ডলে ভর্তা দিয়ে মেখে খেতে খেতে শিউলি জিজ্ঞেস করল,“তোমার জামাই কই? মানে আমার ভাসুর।”

“ফজরের নামাজের পর বাড়ি থেকে বেরিয়েছে। কে জানে কোথায় গেছে?”

“তোমার দেওর?”

“নামাজ পড়ে এসে আবার মনে হয় ঘুমিয়েছে।”

“হুনছি, হের নাকি বউ গেছে গা?”

“কে বলেছে? যায়নি, নিজে তালাক দিয়েছে।”

“ক্যান?”

“কারণ ছিল বলেই হয়তো।”

“তুমি কী কম কথা কও?”

“না তো।”

“তাইলে এমন কইরা থাকো ক্যান? কারো লগে কথা কও না, পাতা আনতেও যাও না। রান্ধো কী দিয়া?”

“খড়ি আছে। উনি মিল্টন ভাইকে দিয়ে বাগান থেকে আনান, আর পাতা সবাই যা ঝাড়ু দিয়ে আনে তার থেকে অর্ধেক আমায় দিয়ে যায়।”

“তোমারই তো আরামের সংসার। আর আমার উনার সংসারের ব্যাপারে মন নাই, উদাসীন। কিছু কইলে কয়, আমি কিছু জানি না। যা কওয়ার আম্মারে গিয়া কও।”

“তোমার তো আরো ভালো। শ্বশুর-শাশুড়ি, স্বামী, দুই দেওর নিয়ে ভরা সংসার। কোনো চিন্তা নেই।”

মেয়েটা বেজায় খুশি হলো,“তোমার বাপের বাড়ি কই? হুনছি, এই গেরামেই নাকি?”

“শুনলে জিজ্ঞেস করছো কেন?”

“ধুরু, তোমার লগে গপ্পো কইরা মজা নাই। বয়সে যদিও আমার ছুডো হইবা তবে তুমি সুন্দর আছো।”

“তুমিও।”

মেয়েটা লজ্জা পেলো। মিছরি খাওয়া শেষে এঁটো থালা নিয়ে উঠে গেলো। শিউলিও তার পিছুপিছু বের হলো। থালা ধুয়ে কলপাড় থেকে ফেরার পথে দেখা হয়ে গেলো নাজিরের সাথে। তাকে দেখে দাঁত কপাটি বের করে নাজির হাসলো। হাতের থলেটা দেখিয়ে বললো,“মাছ আনছি।”

“কী মাছ?”

“কাজলি মাছ আর গলদা। বেশি না, এক কেজি কইরা আনছি।”

“আজ আমাদের দুজনের ও বাড়িতে যাওয়ার কথা ছিল। আপনি রাজিও হয়েছিলেন। এখন এই মাছ কে কুটবে আর কে খাবে?”

“রাগ করো ক্যান, ময়না পাখি? আইয়ো একলগে কাইট্টা ফেলাই। হাটে গিয়া দেহি, তাজা মাছ ফাল পারতাছে। তাই লইয়া আইলাম। তোমার না বড়ো ইচা পছন্দ? আর নওশাদের পছন্দ কাজলি মাছ।”

“খাবে কে?”

“দুপুরে না খাইয়া যাইবাগা নাকি? বাকি যা থাকবো আমি আর নওশাদ মিল্যা খাইয়া ফেলমু।”

রান্নাঘরে ব্যাগটা রেখে চুলা থেকে ছাই উঠাতে লাগলো নাজির। মিছরি থালাটা ঘরে রেখে এলো। শীতল কণ্ঠে বললো,“আপনারও যাওয়ার কথা ছিল। আব্বা বলে দিয়েছে, বউ ভাত পর্যন্ত ওখানে থাকতে।”

“কাছে থাইক্যা কাছে। থাকতে হইবো ক্যান? বিয়ার দিন পৌঁছাইয়া যামু।”

এবার আর নিজেকে শান্ত রাখতে পারলো না সে। মেজাজ বিগড়ে গেলো। রাগত স্বরে বলে উঠলো, “বাবার বাড়ির সবার সামনে আমায় ছোটো না করলে আপনার শান্তি হয় না, তাই না? বাকিদের স্বামীরা সপ্তাহের পর সপ্তাহ থাকতে পারলে আপনি কেন পারবেন না? আমায় বাহানা শেখান?”

নাজির চমকে তাকালো। এই মেয়ের সাহস আজকাল বেড়ে গিয়েছে। সাথে বেড়েছে রাগও। হুটহাট স্বামীকে রাগ দেখায়, চোখ রাঙায়। নাজির দীর্ঘশ্বাস ফেলে বালতির পানিতে হাত ধুয়ে এগিয়ে এলো। চাপা স্বরে বললো,“কত্ত বড়ো সাহস, সোয়ামিরে ধমকায়! পাপ হইবো, ময়না পাখি।”

“আর আপনি যে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেন, নিজের বউয়ের কথা শুনেন না, তখন পাপ হয় না?”

“এত বড়ো মিছা অপবাদ! তোমার কথায় আমি উঠি আর বসি। সারাক্ষণ খেয়াল রাখি, সংসারে গাধার মতন খাটাই না, অসুখ হইলে রাইন্ধা খাওয়াই, এই যে ট্যাহা ভাইঙ্গা গলদা ইচা আনছি, বাপের বাড়ি যাইতে চাইলেও দেই। তোমার বোইনগো জিগাইয়ো তো হেগো জামাই এইগুলা করে কিনা? হেইদিন সুজন ভাই কইলো, ফাহমিদার নাকি পোলাপাইন পেডে। শুকাইয়া গেছে, হড়ি ঠিকঠাক খাইতে দেয় না, সারাক্ষণ কাম করায়, ডাক্তরের কাছে না লইয়া কবিরাজের কাছে লইয়া যায়। অথচ হের জামাই নাকি মাস্টর। যে ঘরের বউয়ের যত্ন নিতে পারে না, বউয়ের পক্ষে কথা কইতে পারে না হেয় মাইনষের পোলাপাইনরে কী শিখায়? আমি তোমার লগে কহনো এমন কিছু করছি, বউ? কত আদর যত্ন কইরা পাইলা পুইষা বড়ো করতাছি! আর তুমি আমারে অপবাদ দেও?”

মিছরি দীর্ঘশ্বাস ফেলল,“আপনি কিন্তু কথা ঘুরাচ্ছেন। এসব অভিযোগ আমি করেছি?”

“দেহো, তোমার আত্মীয়-স্বজন আমার পছন্দ না। তুমগো বংশে তোমার বাপ-চাচা আর সুজন, তালেব ভাইরে ছাড়া বাকি একটারেও বর্তমানে আমার সহ্য হয় না। এমনকি তোমার মা, নানা, মামাগোও না। প্রত্যেকবার কীসব প্রশ্ন করে। জমিজমা কতটুক? গরু কয়ডা? ছাগল কয়ডা? কামাও কত? চাচাগো লগে সম্পর্ক কেমন? ভাগে পাইছো কতটুক? পোলাপাইন লইয়া ফেলাও। এত এত প্রশ্ন! আমার মুখ তো এমনিতেই ভালা না, ধৈর্য কম। তুমি কী চাও, মুখের উপরে অপমান কইরা দেই?”

“এমন ভান করছেন যেন করেননি? বড়ো দুলাভাইকে কী বলেছিলেন?”

“কী কইছি?”

“বাপের পুটকির তলায় ম্যাও ম্যাও করি না। সব নিজে নিজে করি, আমনের থাইক্যা বেশি কামাই।”

দমে গেলো নাজির,“ট্যাহার বড়াই করতাছিল। তবে ভুল কিছু কই নাই। তোমার সোয়ামি হেগো থাইক্যা ধনী।”

“বড়ো মামাকে কী বলেছিলেন? অন্যের কাছে কামলা খাটি না। আমিই রাজা।”

“ভুল কী কইছি? কইতাছিল, আমরা শিক্ষিত বংশ। আমার বাপ সরকারি ইশকুলের শিক্ষক আছিলো, আমি কলেজের শিক্ষক, আমার পোলায়ও হইবো। কত বড়ো অপমান! আমি কী অশিক্ষিত? মাধ্যমিক শুধু দেই নাই। অমন বাপ, দাদা থাকলে বাংলাদেশ পাস কইরা ফেলাইতাম। আমার ভাই করছে না?”

মিছরি আর কথা বাড়ালো না। এই লোকের সঙ্গে কথা বলা মানেই হাজারটা যুক্তি দিয়ে তাকে হারিয়ে দেবে, মাথা নষ্ট করবে। ঘরে যেতে যেতে বললো,“খেতে আসুন। খাওয়া শেষে মাছ কাটবেন। ওসব আমি ধরবো না।”

কলপাড় থেকে হাতমুখ ধুয়ে নাজির চুপচাপ এসে খেয়ে নিলো। তারপর মিছরিকে টেনে নিয়ে বসালো মাছ কুটতে। মুখে বললেও স্বামীকে দিয়ে মাছ আর কাটালো না মিছরি। এইটুকু কাজ এখন সে করতে পারে। শিউলি তাকে কাজ করতে দেখে নিজেও বঁটি নিয়ে এসে বসে পড়ল। কথার ফাঁকে ফাঁকে বেশি একটা সময় লাগলো না কাজ শেষ করতে।
_______

মাস্টার বাড়িতে আজ প্রচুর ব্যস্ততা। গত মাসেই ঘটক মারফত মেয়ে পছন্দ করে রুহুলের বিয়ে ঠিক করে এসেছিলেন বাড়ির গুরুজনেরা। সেই উপলক্ষে সপ্তাহ খানেক শুধু চলেছে কেনাকাটা।

উঠোনের একপাশে একটি কেদারায় বসে আছে পলি। মেক্সির উপর দিয়ে উঁচু পেট ভাসমান। পারুল এগিয়ে এসে ধমকের সুরে বলে উঠলেন,“লাজ লজ্জার বালাই নাই? দেওর, ভাসুররা বাড়িত আছে, একটু পরপর বাহিরের মানুষ যাতায়াত করতাছে। সাত মাসের পেট লইয়া এমনে ঘুরাফেরা করো ক্যান?”

“লজ্জার কী আছে? পোলাপাইন কী আর কারো হয় না? হেগো বউ বুঝি পোয়াতি হইবো না?”

পারুল চটে গেলেন। মেয়ের চালচলন ভালো না। যার কারণে এই মেয়েকে পুত্রবধূ হিসেবে মোটেও পছন্দ ছিল না তাঁর। নেহাৎ ছেলে জেদ ধরেছিল। স্বামীও বলেছিলেন, বয়স কম তাই এমন করে। তুমি না হয় একটু শিখাইয়া পড়াইয়া নিও, বড়ো হইলে ঠিক হইয়া যাবে। কোথায় আর ঠিক হলো? দেবর, ভাসুর, শ্বশুর কাউকে মানে না। হুটহাট শব্দ করে হেসে ওঠে, ঘোমটা ছাড়া সবার মাঝে গল্প করতে বসে পড়ে। এমন বেহায়াপনা তো এ বাড়ির মেয়েরাও করে না।

দাঁতে দাঁত পিষে ধমকের সুরে পারুল বললেন,“মুখের উপরে কথা কইলে ঘাড় ধইরা বাপের বাড়ি পাঠাইয়া দিমু। ভালা হড়ি পাইয়া সাপের পাঁচ পা দেখছোস? ঘরে যা, বেহায়া মাইয়া মানু।”

পলি উঠে দাঁড়ালো। যেতে যেতে মুখ বাঁকিয়ে বললো, “ভালা না ছাই। আমনে একটা দজ্জাল বেডি মানুষ।”

পারুল হতভম্ব হলেন। সত্যি সত্যিই চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় করলেন।
_____

দুপুরের রান্না শেষে মিছরি গোসলে গেলো। নাজির, নওশাদের গোসল আগেই শেষ। ভাবির মুখোমুখি তেমন একটা হয় না নওশাদ। কখনো চোখাচোখি হয়ে গেলে সৌজন্যতার খাতিরে যতটুকু বলার বলে। ক্ষুধা লাগলে নিজে এসেই খাবার বেড়ে খায়। আজও তাই করল। দুপুরের খাবার খেতে বসেছে সে। বেলা অবধি ঘুমানোয় নাশতা করা হয়নি। নাজির এসে তার সামনে বসলো। নিজ দায়িত্বে পাতে তুলে দিলো আরো দুই টুকরো মাছ। সতর্ক কণ্ঠে বললো,“তোর ভাবি আইজ বাপের বাড়ি যাইবো। সপ্তাহ খানেক তো থাকবোই।”

“হ্যাঁ, রুহুল ভাইয়ের বিয়ে না! নজরুল চাচা আমায়ও দাওয়াত দিয়েছেন।”

“আয়, পরিকল্পনা বদলাইয়া কাইল রাইতটা কামে লাগাই।”

খাওয়া থেমে গেলো নওশাদের। প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। নাজির সামান্য হেসে বললো,“জমির ধানগুলা হাঁটু সমান লম্বা হইছে। লাশ পুঁতলে জানবো কেডায়?”

নওশাদ চমকে ওঠে। ভাইয়ের মনে যে কখন কী চলে সে বুঝতে পারে না। নিজেই তাড়াহুড়ো করতে নিষেধ করল, কত ফন্দি আঁটলো অথচ নিজেই এখন হুট করে এত গুরুত্বপূর্ণ একটা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। নাজির তার কৌতূহল দমাতে বললো,“শালারে দেখলেই গায়ে আগুন ধরে। মন চায়, যা যন্ত্রণা মায়রে দিছে তা দ্বিগুণ ফিরাইয়া দেই। কম আরাম তো করে নাই। পোলা হারাইয়া এহন মাইনষের সহানুভূতি আদায় করতাছে। তলে তলে প্রতিশোধ নেওয়ারও পাঁয়তারা করতাছে। শত্রুগো বেশি সময় দেওয়া বিপদজ্জনক।”

“তাই বলে কাল? দুদিন পরপর তোমার পরিকল্পনা বদলায়।”

“হ, কেউ সন্দেহ করতে পারবো না। হেইদিনের মতো প্রমাণও থাকবো না। রাইতে ফেরার তাড়া নাই। কেউ জিগাইলে কমু, শ্বশুরবাড়ির বিয়াতে আছিলাম।”

নওশাদের পছন্দ হলো বুদ্ধিটা। খেতে খেতে জিজ্ঞেস করল,“কীভাবে কী করবে? বিস্তারিত বলো।”

“পরে কমু না হয়। তোর ভাবিরে আগে দিয়া আসি।”

মিছরির আগমনে এখানেই দুই ভাইয়ের আলোচনার সমাপ্তি হলো। নওশাদ দ্রুত খাওয়া শেষ করে চলে গেলো। দুপুরের খাওয়া শেষে বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল নাজির। মিছরি বিরক্তি নিয়ে বললো,“সমস্যা কী আপনার? শুয়েছেন কেন? যাবো না আমরা?”

“এমন করতাছো যেন তোমার বাপের বাড়ি পদ্মা নদীর ওই পাড়? যাইতে যাইতে সারা রাইত লাগবো? আইয়ো, আমারে জড়াইয়া ধইরা একটু আরাম করো। আবার কবে না কবে ধরতে পারবা!”

তার কথাই তাকে ফিরিয়ে দিলো মিছরি,“এমন ভান করছেন যেন পদ্মা নদীর ওই পাড় আপনার শ্বশুর বাড়ি? বউকে বহু বছর ধরে দেখতে পাবেন না?”

নাজির হেসে ফেলল। তাকে টেনে বিছানায় ফেলে জড়িয়ে ধরে বললো,“আমার বউডা মেলা বড়ো হইয়া গেছে। একটা কথাও মাডিত পড়তে দেয় না।”

“আপনার থেকেই তো শেখা।”

“আর কিছু শিখো নাই? আদর সোহাগ শিখো নাই?”

“না।”

চেপে ধরে গলায় মুখ গুঁজলো নাজির। গম্ভীর স্বরে বললো,“বিয়া বাড়িতে পরিচিত অপরিচিত অনেক মানুষ থাকবো। কেউ ডাকলে একলা একলা যাইবা না, কাউরে কাছে ঘেঁষতে দিবা না। আগে কী হইছে মনে আছে তো? মামাতো, চাচাতো ভাইরা ডাকলেও যাইবা না। নিজের ভাই ছাড়া বাকি সবার থাইক্যা বিপদের আশংকা আছে।”

“আচ্ছা।”

“দুলাভাই, বেয়াইগো লগেও কথা কওয়ার দরকার নাই। গায়ে হলুদে বরাত যাওয়ার প্রয়োজন নাই।”

“বললেই হলো? কেন যাবো না? সুজন ভাইয়ের সময় আমি অনেক ছোটো ছিলাম, তালেব ভাইয়ের সময় ছোটো ভাইজান হাত ধরে রেখেছিল। এবার বড়ো হয়েছি, তাই যেতেই হবে। সাথে আপনিও যাবেন।”

প্রত্যুত্তর করল না নাজির। নইলে এই মেয়ের বায়না আরো বাড়বে। চোখ বুজে ঘুমানোর চেষ্টা করল।

চলবে _______

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here